| 28 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ইতিহাস

ভারতের বিবাহের ইতিহাস (পর্ব -১) । অতুল সুর

আনুমানিক পঠনকাল: 11 মিনিট

যৌন জীবনের পটভূমিকা

প্রাণী জগতে মানুষই বোধ হয় একমাত্র জীব যার যৌন ক্ষুধা সীমিত নয়। অধিকাংশ প্রাণীর ক্ষেত্রেই সন্তান উৎপাদনের জন্য যৌন মিলনের একটা বিশেষ ঋতু আছে। মাত্র সেই নির্দিষ্ট ঋতুতেই তাদের মধ্যে যৌন মিলনের আকাজক্ষা জাগে এবং স্ত্রী-পুরুষ একত্রে মিলিত হয়ে সন্তান উৎপাদনে প্রবৃত্ত হয়। একমাত্র মানুষেরই ক্ষেত্রে এরূপ কোন নির্দিষ্ট ঋতু নেই। মানুষের মধ্যে যৌন মিলনের বাসনা সকল ঋতুতেই জাগ্রত থাকে। এই কারণে মানুষের মধ্যে স্ত্রীপুরুষকে পরস্পরের সান্নিধ্যে থাকতে দেখা যায়। বস্তুত, মানুষের মধ্যে পরস্পরের সান্নিধ্যে থাকা, স্ত্রী-পুরুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি। এই সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই মানুষের মধ্যে পরিবারের উদ্ভব হয়েছে। পরিবার গঠন করে স্ত্রী-পুরুষের একত্র থাকার অবশ্য আরও কারণ আছে । সেটা হচ্ছে বায়োলজিকাল বা জীবজনিত কারণ। শিশুকে লালন-পালন করে স্বাবলম্বী করে তুলতে অন্য প্রাণীর তুলনায় মানুষের অনেক বেশী সময় লাগে। এ সময় প্রতিপালন ও প্রতিরক্ষণের জন্ত নারীকে পুরুষের আশ্রয়ে থাকতে হয়। মনে করুন অন্য প্রাণীর মত, যৌন মিলনের অব্যবহিত পরেই স্ত্রী-পুরুষ যদি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হতো, তা হলে মা ও সন্তানকে কী না বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হতো। বস্তুত, আদিম যুগে নারীকে সব সময়ই পুরুষের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হতো। যুগে যুগে যদিও নারী নির্যাতিত হয়েছে পুরুষের হাতে, তথাপি সে তার প্রেম, ভালবাসা ও সোহাগ দ্বারা পুরুষকে প্রলোভিত করেছে তার অতি নিকট সান্নিধ্যে থাকতে ।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে মনুষ্য-সমাজে পরিবারের উদ্ভব হয়েছে জীবজনিত কারণে। বিবাহ দ্বারা পরিবারের মধ্যে স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্ককে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে অনেক পরে এবং এক বিশেষ প্রয়োজনে। আদিম মানুষের পক্ষে খাদ্য আহরণ করা ছিল, এক অতি কুরাহ ব্যাপার। পশু মাংসই ছিল তার প্রধান খাদ্য। পশু শিকারের জন্য আদিম মানুষকে প্রায়ই নিজের আশ্রয় ছেড়ে অনেক দূরে যেতে হতো। অনেক সময় তাকে একাধিক দিনও দূরে থাকতে হতো। এভাবে পুরুষ যখন দূরে থাকতো, তখন তার নারী থাকতে সম্পূর্ণ অসহায় ও রক্ষকহীন অবস্থায়। অপর কোন পুরুষ তাকে বলপূর্বক হরণ করে নিয়ে গেলে, যুদ্ধ ও রক্তপাতের স্বষ্টি হতো। এরূপ রক্তপাত পরিহার করবার জন্তই, মনুষ্য সমাজে বিবাহ দ্বারা স্ত্রীপুরুষের সম্পর্ককে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। প্রখ্যাত নৃতত্ববিদ ওয়েস্টারমার্ক বলেন—“পবিবার গঠন করে স্ত্রী-পুরুষের একত্র বাস করা থেকেই বিবাহ প্রথার উদ্ভব হয়েছে বিবাহ প্রথা থেকে পরিবারের সূচনা হয় নি।”_ মহাভারতে বিবৃত শ্বেতকেতু উপাখ্যান থেকেও আমরা এব সমর্থন পাই। সেখানে বলা হয়েছে যে শ্বেতকেতুই ভারতবর্ষে প্রথম বিবাহ প্রথার প্রবর্তন করেন। কিন্তু বিবৃত কাহিনী থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, তার আগেই শ্বেতকেতু তাঁর পিতামাতার সঙ্গে পরিবার মধ্যে বাস করতেন।

যদিও পণ্ডিত মহলে আজ একথা একবাক্যে স্বীকৃত হয়েছে যে পরিবার থেকেই বিবাহ প্রথার উদ্ভব হয়েছে, তথাপি বাখোফেন, মরগান প্রভূতি নৃতত্ববিদগণ একসময় একথা স্বীকার করতেন না। তারা এই মতবাদ প্রচার করতে প্রয়াস পেয়েছিলেন যে, বিবাহ প্রথা উদ্ভব হবার আগে মানুষের মধ্যে কোনরূপ স্থায়ী যৌনসম্পর্ক ছিল না। র্তারা বলতেন যে অন্যান্ত পশুর মত মানুষও অবাধ যৌনমিলনে প্রবৃত্ত হতো। র্তাদের মতে আদিম অবস্থায় মামুষের মধ্যে যৌনাচার নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন অনুশাসন ছিল না। র্তারা বলতেন যে অনুশাসনের উদ্ভব হয়েছিল অতি মন্থর গতিতে, ধীরে ধীরে ও ক্রমান্বয়ে। র্তাদের সময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে নানারকম বিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল, সেগুলিকে তারা এক বিবর্তনের ঠাটে সাজিয়ে প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছিলেন যে মানুষের বর্তমান একপত্নীক বিবাহ প্রথা এই সকল ক্রমিক স্তরের ভেতর দিয়ে বিকাশ লাভ করেছে।

সন্তানকে লালন-পালন ও স্বাবলম্বী করে তোলবার জন্য মানুষের যে দীর্ঘসময়ের প্রয়োজন হয়, একমাত্র এই জীবজনিত কারণই একথা প্রমাণ করবার পক্ষে যথেষ্ট সহায়ক যে মনুষ্য সমাজে গোড়া থেকেই স্ত্রী-পুরুষ পরস্পরের সংলগ্ন হয়ে থাকতো। বস্তুত আদিম অবস্থায় স্ত্রী-পুরুষ যে অবাধ যৌনাচারে রত ছিল, এই মতবাদ পূর্বোক্ত নৃতত্ববিদগণের এক নিছক কল্পনামূলক অনুমান ছাড়া আর কিছুই নয়। এরূপ অবাধ যৌনমিলন মনুষ্যসমাজে কোনদিনই প্রচলিত ছিল না । এমন কি বর্তমান সময়েও অত্যন্ত আদিম অবস্থায় অবস্থিত বনবাসী জাতিসমূহের মধ্যেও অবাধ যৌনমিলনের কোন রীতি নেই। বস্তুত এই সকল বনবাসী অসভ্য জাতিসমূহের মধ্যে যে সকল বিবাহ প্রথা প্রচলিত আছে, তা অতি কঠোর অনুশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রকৃতির মধ্যে পর্যবেক্ষণ করলেও আমরা এর সমর্থন পাই। বনমানুষ, গরিলা প্রভৃতি যে সকল নরাকার জীব আছে, তারাও দাম্পত্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বাস করে, কখনও অবাধ রমনে প্রবৃত্ত হয় না। এই সকল কারণ থেকে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, বিবাহ আখ্যা দিয়ে তাকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে থাকুক আর না থাকুক, স্ত্রী-পুরুষের একত্রে মিলিত হয়ে পরিবার গঠন করে সহবাস করবার রীতি মনুষ্য সমাজে গোড়া থেকেই ছিল।

আদিম -মানবের পরিবার ছিল অনেকটা পাশ্চাত্য দেশসমূহে আজকাল যে রকম পরিবার দেখতে পাওয়া যায়, তারই মত। পিতামাতা ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক সস্তানদের নিয়েই এই পরিবার গঠিত হতো। কিন্তু আমাদের দেশের পরিবার ছিল স্বতন্ত্র রকমের। এ পরিবার ছিল অধিকতর বিস্তৃত। এ ছাড়া পাশ্চাত্য দেশের পরিবারের সঙ্গে ভারতের পরিবারের এক মূলগত পার্থক্য ছিল। ভারতের পরিবার ছিল অবিচ্ছেদ্য । একমাত্র যমরাজা বিচ্ছেদ না ঘটালে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক কখনও বিচ্ছিন্ন হতো না। তার কারণ পাশ্চাত্য জগতের হ্যায় ভারতে বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রথা প্রচলিত ছিল না । ভারতের পরিবার ছিল স্থায়ী পরিবার। এর পরিধি ছিল অতি বিস্তৃত। এজন্য একে যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবার বলা হতো। এই পরিবারের মধ্যে বাস করতে স্বয়ং ও তার স্ত্রী, স্বয়ং-এর বাবা-মা, খুড়ো-খুড়ি, জেঠ-জেঠাই, তাদের সকলের ছেলে-মেয়ের, স্বয়ং-এর ভাইয়েরা ও তাদের স্ত্রীরা ও ছেলেমেয়েরা এবং নিজের ছেলেমেয়েরা। অনেক সময় এই পরিবারভুক্ত হয়ে আরও থাকতে কোন বিধবা পিসি বা বোন বা অন্ত কোন দুঃস্থ আত্মীয় ও আত্মীয়া। যোগাযোগ ও পরিবহনের সুবিধা হবার পর মানুষ যখন কর্মোপলক্ষে স্থানান্তরে গিয়ে বসবাস সুরু করলো, তখন থেকেই ভারতের এই সনাতন পরিবারের ভাঙ্গন ঘটলো ।

একই রকমের পরিবার ভারতের সর্বত্র দেখা যায়না । উপরে যে পরিবারের দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে, তাকে বলা হয় পিতৃশাসিতপিতৃকেন্দ্রিক পরিবার। দেশের অধিকাংশ স্থানেই এই পরিবার দেখা যায়। পিতৃশাসিত-পিতৃকেন্দ্রিক পরিবারের বৈশিষ্ট্য এই যে, এরূপ পরিবারে বংশপরম্পর নির্ণীত হয় পিতা, পুত্র বা পৌত্রের মাধ্যমে। এক কথায়, এরূপ পরিবারে বংশপরম্পরা নেমে আসে পুরুষের দিক দিয়ে। সম্পূর্ণ বিপরীত পদ্ধতিতে গঠিত যে পরিবার ভারতে দেখা যায়, তাকে বলা হয় মাতৃশাসিত-মাতৃকেন্দ্রিক পরিবার। এরূপ পরিবারে বংশপরম্পরা নির্ণীত হয় মেয়েদের দিক দিয়ে, মাতা, কস্তা, দৌহিত্রী ইত্যাদির মাধ্যমে। মাতৃশাসিত-মাতৃকেন্দ্রিক পরিবার গঠিত হয় স্ত্রীলোক স্বয়ং, তার ভ্রাতা ও ভগিনীগণ এবং নিজের ও ভগিনীদের সস্তান-সন্ততিদের নিয়ে। পিতৃশাসিত পিতৃকেন্দ্রিক পরিবারের আর এক বৈশিষ্ট্য এই যে, বিবাহের পর স্ত্রী এসে বাস করে তার স্বামীর গৃহে। কিন্তু মাতৃশাসিত মাতৃকেন্দ্রিক পরিবারে এরূপ ঘটে না। এই পরিবারের কোন স্ত্রীলোক বিবাহের পর অন্যত্র গিয়ে বাস করে না। এরূপ পরিবারের অন্তভুক্ত পুরুষদের স্ত্রীরা এবং স্ত্রীলোকদিগের স্বামীরা অন্য পরিবারে বাস করে। স্ত্রীলোকদের স্বামীরা মাত্র সময় সময় আসা যাওয়া করে। বলা বাহুল্য পিতৃশাসিত পিতৃকেন্দ্রিক পরিবারে স্ত্রী স্বামীর ও সন্তানর পিতার সাহচর্য পায়। মাতৃশাসিত মাতৃকেন্দ্রিক পরিবারে তা পায় না।

পিতৃশাসিত পিতৃকেন্দ্রিক পরিবারই ভারতে প্রাধান্ত লাভ করেছে। উত্তর ভারতের সর্বত্র এই পরিবারই দৃষ্ট হয়। দক্ষিণ ভারতের অধিকাংশ স্থলেও তাই। তবে দক্ষিণ ভারতে এমন অনেক জাতি ও উপজাতি আছে যাদের মধ্যে মাতৃশাসিত মাতৃকেন্দ্রিক পরিবারই প্রধান। এরূপ জাতির অন্যতম হচ্ছে মালাবার উপকূলের নায়ার ও তিয়ান জাতি এবং কর্ণাটকের বানটু ও তুলুভাষাভাষী অনেক জাতি। তামিল নাড়ুর পরিবার প্রধানত পিতৃকেন্দ্রিক ও পিতৃশাসিত। তবে তামিল নাড়র দক্ষিণ অঞ্চলে এমন কয়েকটি জাতি আছে যাদের মধ্যে উভয় বর্গের পরিবারই দেখা যায়। উত্তর ভারতে মাতৃকেন্দ্রিক মাতৃশাসিত পরিবার অত্যন্ত বিরল। বোধ হয় আসামের খাসি ও গারো জাতির পরিবারই এ সম্পর্কে একমাত্র ব্যতিক্রম।

ভারতে ভূ-রকমের সমাজ ব্যবস্থা দেখা যায়। আদিবাসীর সমাজ ব্যবস্থা ও হিন্দুর সমাজ ব্যবস্থা। উভয় রকম সমাজ ব্যবস্থাতেই পরিবার হচ্ছে নূ্যনতম সামাজিক সংস্থা। আদিবাসীদের মধ্যে কয়েকটি পরিবার নিয়ে গঠিত হয় একটি গোষ্ঠী বা দল। আবার কয়েকটি গোষ্ঠী বা দলের সমষ্টি নিয়ে গঠিত হয় একটি উপজাতি বা ট্রাইব। হিন্দুদের মধ্যে ট্রাইবের পরিবর্তে আছে বর্ণ কিংবা জাতি। এগুলির আবার অনেক শাখা ও উপশাখা আছে।

হিন্দুর জাতিই বলুন আর আদিবাসীর ট্রাইবই বলুন, এগুলির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অন্তর্বিবাহ। তার মানে, কেউ নিজ জাতি বা ট্রাইবের বাইরে বিবাহ করতে পারে না। বিবাহ করতে হলে জাতি বা ট্রাইবের ভেতরেই বিয়ে করতে হবে। তবে জাতি বা ট্রাইবের ভেতর যে কোন পুরুষ যে কোন মেয়েকে অবাধে বিয়ে করতে পারে না। এ সম্বন্ধে উভয় সমাজেই খুব সুনির্দিষ্ট নিয়ম কামুন আছে।

আগেই বলা হয়েছে যে জাতি বা ট্রাইবগুলি কতকগুলি গোষ্ঠী বা দলে বিভক্ত। এই সকল গোষ্ঠী বা দলগুলির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বহিবিবাহ। তার মানে কোন গোষ্ঠীর কোন ছেলে যদি বিয়ে করতে চায় তবে তাকে বিয়ে করতে হবে অন্ত গোষ্ঠীর মেয়েকে, নিজের গোষ্ঠীতে নয়। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই যে, যদি কেউ বিয়ে করতে চায়, তাহলে তাকে নিজের জাতির ভেতরেই বিবাহ করতে হবে, কিন্তু নিজের গোষ্ঠীতে নয়, অপর কোন গোষ্ঠীতে। এ নিয়ম না মানলে, কিছুকাল আগে পর্যন্ত একঘরে হয়ে থাকতে হতো এবং আগেকার দিনে একঘরে হয়ে থাকাটা এক ভয়াবহ শাস্তি ছিল।

 

 

হিন্দুদের মধ্যে বহির্বিবাহের গোষ্ঠীগুলি চিহ্নিত হয় গোত্রপ্রবর দ্বারা। আর আদিবাসী সমাজে এগুলি চিহ্নিত হয় টটেম দ্বারা । টটেম বলতে গোষ্ঠীর রক্ষকস্বরূপ কোন শুভসাধক পরমাত্মাকে বোঝায়। এই পরমাত্মা কোন বৃক্ষ, প্রাণী বা জড়পদার্থের মধ্যে নিহিত থাকে। আদিবাসীদের বিশ্বাস যে, গোষ্ঠীসমূহের উৎপত্তি হয়েছে এই সকল বিশেষ প্রাণী, বৃক্ষ বা জড় পদার্থ থেকে। যে প্রাণী বা বৃক্ষ, যে গোষ্ঠীর টটেম, তাকে তারা বিশেষ শ্রদ্ধা করে। কখনও তাকে বিনাশ করে না। সেই প্রাণীর মাংস বা সেই বৃক্ষের ফল কখনও খায় না ।

 

 

একই টটেমের ছেলেমেয়েরা কখনও পরস্পরকে বিয়ে করতে পারে না। বিয়ে করতে হলে তাদের ভিন্ন টটেমে বিয়ে করতে হয়। কিন্তু আদিবাসী সমাজে সবজায়গাতেই যে বহির্বিবাহের বিধি টটেমের উপর প্রতিষ্ঠিত, তা নয়। কোন কোন জায়গায় এগুলি আরাধনা পদ্ধতির উপর স্থাপিত। মধ্যপ্রদেশের গোগুজাতির কোন কোন শাখার মধ্যে বহির্বিবাহের গোষ্ঠীগুলিকে “বংশ” বলা হয়। যে বংশ যত সংখ্যক দেবদেবীর পূজা করে, তার দ্বারাই সে বংশ চিহ্নিত হয়। দুই বংশের দেবদেবীর সংখ্যা যদি সমান হয়, তা হলে তাদের মধ্যে বিবাহ হয় না। মনে করুন, যে “বংশ” সাতটি দেবদেবীর পূজা করে, তাদের ছেলেমেয়েকে বিবাহ করতে হলে, সাত ভিন্ন অন্ত সংখ্যক দেবদেবীতে পূজারত “বংশে” বিয়ে করতে হবে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বহিবিবাহের গোষ্ঠীগুলি গ্রাম বা অঞ্চল ভিত্তিতেও চিহ্নিত হয়। যেমন— ছোটনাগপুরের মুণ্ডাজাতির মধ্যে এই নিয়ম প্রচলিত আছে যে, নিজের গ্রামে কেহ বিবাহ করতে পারবে না। ওড়িষ্যার খগুজাতির মধ্যেও অনুরূপ নিয়ম আছে। খণ্ডদের মধ্যে বহির্বিবাহের গোষ্ঠী গুলিকে “গোচী” বলা হয়। গোষ্ঠীগুলি এক একটা “মুতা” বা গ্রামের নাম অনুযায়ী চিহ্নিত হয়। তাদের এই বিশ্বাস যে, একই গোষ্ঠীর সমস্ত স্ত্রী-পুরুষ একই পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত—এই কারণে তাদের মধ্যে একই রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, সুতরাং তাদের মধ্যে অন্তর্বিবাহ হতে পারে না। হলে সেটা অনাচার হবে । নাগাল্যাণ্ডের অনেক জাতির মধ্যেও এইরূপ গ্রামভিত্তিক বহির্বিবাহ গোষ্ঠী আছে। সেগুলিকে সেখানে “খেল” বলা হয়। বলা বাহুল্য কেহ নিজ খেলের মধ্যে বিবাহ করতে পারে না। বরোদার কোলিজাতির মধ্যেও নিজ গ্রামে বিয়ে করা নিষিদ্ধ। এ সম্বন্ধে তাদের মধ্যে একটা গ্রাম-ক্রম দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে “ক” গ্রামের মেয়ের বিয়ে হয়, “খ” গ্রামের ছেলের সঙ্গে আবার “খ” গ্রামের মেয়ের বিয়ে হয় “গ” গ্রামের ছেলের সঙ্গে, এইরূপ ক্রমে। বরোদার হিন্দুদের মধ্যেও কোন কোন জায়গায় গ্রাম অনুগামী বহির্বিবাহ প্রথা দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে রাজপুত ও লেওয়া কুম্বীরা কখনও নিজ গ্রামে বিয়ে করে না। আবার দক্ষিণ ভারতের তামিল ব্রাহ্মণদের মধ্যে এর বিপরীত প্রথা দেখা যায়। সেখানে কিছুকাল আগে পর্যন্ত নিজ গ্রাম ছাড়া অপর গ্রামে কেহ বিবাহ করতে পারতো না ।


আরো পড়ুন: নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী (পর্ব-১) । রোহিণী ধর্মপাল


 

আগেই বলা হয়েছে যে হিন্দুদের মধ্যে বহির্বিবাহের গোষ্ঠীগুলি চিহ্নিত হয় “গোত্রপ্রবর” দ্বারা। ব্রাহ্মণদের মধ্যে এগুলি আখ্যাত হয় কোন পূর্বপুরুষ ঋষির নামে। ব্রাহ্মণেতর জাতিদের মধ্যে কুলপুরোহিতের গোত্রই অবলম্বিত হয়।

উত্তর ভারতের হিন্দুসমাজে বিবাহ, গোত্রপ্রবর বিধি নিষেধের উপর প্রতিষ্ঠিত। সগোত্রে বিবাহ কখনও হয় না। তামিল নাড়ব ব্রাহ্মণরাও গোত্রপ্রবর বিধি অনুসরণ করে। কিন্তু পশ্চিম ভারতের মারাঠারা ও দক্ষিণ ভারতের হিন্দুসমাজভুক্ত কোন কোন জাতি গোত্রপ্রবর বিধি অনুসরণ করে না। তাদের মধ্যে বহির্বিবাহের গোষ্ঠীগুলিকে “দল” বলা হয় এবং সেগুলি টটেম অনুকল্প কোন প্রাণী, বৃক্ষ বা জড়পদার্থ দ্বারা চিহ্নিত হয়।

 

 

হিন্দু সমাজে অবাধ বিবাহের অপর এক প্রতিবন্ধকতা আছে। সেটা হচ্ছে রক্তের একমূলত সম্পর্কিত দ্বিপাশ্বিক বিধি। একে সপিণ্ড বিধান বলা হয়। সপিণ্ড বিধি বিশেষভাবে প্রচলিত আছে উত্তর ভারতে। এই বিধান অনুযায়ী সপিণ্ডদের মধ্যে কখনও বিবাহ হয় না। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা বিবাহ ব্যাপারে সর্বত্রই সপিণ্ড বর্জন করে। সপিণ্ড বলতে পিতৃকুলে উধ্বতন সাত-পুরুষ ও মাতৃকুলে উধ্বতন পাঁচ-পুরুষ বোঝায়। অঙ্ক কষে দেখা গেছে যে এই নিয়ম পালন করতে গেলে, অগণিত সম্ভাব্য জ্ঞাতির সঙ্গে বিবাহ পরিহার করতে হয়। এজন্ত বর্তমানে সপিণ্ড বিধিকে সংক্ষেপ করে তিনপুরুষে দাড় করান হয়েছে।

কিছুকাল আগে পর্যন্ত হিন্দুসমাজে গোত্রপ্রবর বিধি ছাড়া অবাধ বিবাহের আর এক বাধা ছিল। তাহা কৌলীন্য প্রথা । কৌলীন্য প্রথা বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল বাংলাদেশে ও মিথিলায় । আদিবাসী সমাজেও কোন কোন জায়গায় কৌলীন্য প্রথা দেখা যায়। কৌলীন্য প্রথায়, বহির্বিবাহের গোষ্ঠীগুলি মর্যাদার তারতম্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রথানুযায়ী উচ্চতর গোষ্ঠীভুক্ত মেয়ের বিবাহ, কুলীন গোষ্ঠীতে দেওয়া চাই। হীনতর মর্যাদাবিশিষ্ট গোষ্ঠীতে দিতে পারা যায় না। দিলে তাকে পতিত হতে হতো। সেজন্য যে সমাজে কৌলীন্য প্রথা প্রচলিত থাকে, সে সমাজে কন্যাব বিবাহের জন্য পাত্র পাওয়া অত্যন্ত তুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় বৃদ্ধবয়স পর্যন্ত কুলান কন্যার বিবাহ হতো না। এ কারণে কোন কোন স্থানে কৌলীন্য-কলুষিত সমাজে শিশুকন্যা হত্য প্রচলন ছিল। আবাব কোন কোন স্থলে, যেমন—বালাদেশে কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে পাইকারী হাবে বহুবিবাহ দ্বারা কৌলীস্তোব কঠোর বিধান এড়ান হতো। এরূপ শোন। ঘায় যে কোন কোন ক্ষেত্রে গঙ্গাযাত্রী কুলীন বুদ্ধেব সঙ্গে কুলীন কন্যাব বিবাহ দিয়ে কৌলীন্ত মর্যাদা রক্ষা করা হতো ।

 

 

এছাড়া বাংলাদেশের উচ্চবর্ণেব কোন কোন জাতির মধ্যে আরও কতকগুলি কঠিন প্রতিবন্ধক ছিল । এ সকল জাতির মধ্যে বিবাহ কোন বিশেষ শ্রেণী বা পর্যায়েব মধ্যে হওয়ার রীতি ছিল। যেমন— দক্ষিণ বাঢ়ী কুলীন কায়স্থগণের মধ্যে পুত্রেব বিবাহের জন্ত (এদের মধ্যে কৌলীন্য পুত্রগত, ব্রাহ্মণদেব মত কন্যাগত নয় ) পাত্ৰী নির্বাচন করতে হয় সমপর্যায অপব দুই কুলীন শাখা হতে।

হিন্দুসমাজে সাধারণত পাত্র অপেক্ষা পাত্ৰীব বয়স কম হয়। কিন্তু পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে এই নিয়ম সব সময় পালিত হয় না। তার কারণ সেখানে “বাঞ্ছনীয়” বিবাহ প্রচলন থাকার দরুন প্রায়ই দেখা যায় যে “বাঞ্ছনীয়” পাত্রী, পাত্র অপেক্ষ বয়সে অনেক বড়। এরূপ ক্ষেত্রে বয়সেব তারতম্য দরুন অসামঞ্জস্য দোষ দূর করবার জন্য ছেলের সঙ্গে মেয়ের যত বছরের তফাৎ, মেয়ের বিয়ের সময় তার কোমরে তত সংখ্যক নারিকেল বেঁধে দেওয়া হয়।

বিবাহে সপিণ্ড এড়ানোর নিয়ম দক্ষিণ ভারতে পুর্ণ মাত্রায় পালন করা হয় না। কেননা দক্ষিণ ভারতে বহু জাতির মধ্যে পিসতুতো বোন বা মামাতো বোনকে বিবাহ করতে হয়। অনেক জায়গায় আবার মামা ভাগ্নীর মধ্যেও বিবাহ হয়। বাধ্যতামূলক না হলেও এটাই হচ্ছে সেখানে “বাঞ্ছনীয়” বিবাহ। মামাতো বোনকে বিয়ে করার রীতি অবশ্ব মহাভারতের যুগেও ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ অজু নেব সঙ্গে সুভদ্রার, শিশুপালেব সঙ্গে ভদ্রার, পরীক্ষিতের সঙ্গে ইরাবতীব বিবাহের উল্লেখ করা যেতে পারে। দক্ষিণ মারাঠাদেশে নূনপক্ষে ৩১টি জাতি আছে, যার মামাতো বোনকে বিয়ে করে। আদিবাসীদের মধ্যেও কোথাও কোথাও এরূপ বাঞ্ছনীয় বিবাহ প্রচলিত আছে। মধ্যপ্রদেশের গোণ্ড, বাইগ ও আশারিয়াদের মধ্যে পিসতুতো বোনকে বিবাহ করার প্রথা আছে। এখানে এরূপ বিবাহকে “তুধ লেীটনা” বলা হয়। তার অর্থ এই যে, মেয়ের বিয়ের জন্য কোন পরিবারের যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তা পূরণ কবতে হবে অপর পরিবারকে মেয়ে দান করে। এখানে প্রসঙ্গত বলা যেতে পাবে যে আদিবাসী সমাজে স্ত্রীলোক আর্থিক সম্পদ বিশেষ, কেননা স্ত্রীলোকের পুরুষদের সঙ্গে সমানভাবে শ্রম করে। মারিয়া গোগুদেব মধ্যে পিসতুতো বোনকে যদি বিবাহের জন্য মামাতো ভাইয়ের হাতে না দেওয়া হয়, তা হলে সে ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত হস্তক্ষেপ করে এবং জোব করে দুজনের মধ্যে বিবাহ দিয়ে দেয়। সিকিমেব ভুটিয়ারা মাতৃকুলে বিবাহ করে। কিন্তু পিসির কুলে কখনও বিবাহ করে না। হে ও সাঁওতালদের মধ্যে পিসতুতো-মামাতো ভাইবোনদের মধ্যে বিবাহের একটা বৈশিষ্ট্যমূলক নিয়ম আছে। এদের মধ্যে মামা যতদিন জীবিত থাকে ততদিন মামার মেয়েকে বিয়ে করা চলে না। অনুরূপ

 

 

ভাবে পিসি যতদিন জীবিত থাকে ততদিন পিসির মেয়েকেও বিবাহ করা যায় না।

যদিও বর্তমানে একৃপত্নীত্বই একমাত্র আইনসিদ্ধ বিবাহ বলে পরিগণিত হয়েছে তা হলেও কিছুকাল আগে পর্যন্ত হিন্দু সমাজে বহুপত্নী গ্রহণ ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। প্রাচীন ভারতে বহুপতি গ্রহণও প্রচলিত ছিল। বর্তমানে বহুপতিগ্রহণ প্রচলিত আছে দক্ষিণ ভারতে টোডাদের মধ্যে ও উত্তর ভারতে খসজাতির মধ্যে। বহুপতিক বিবাহ দুরকমের হতে পারে। যেখানে স্বামীরা সকলেই সহোদর ভাই, সেখানে এরূপ বিবাহকে ভ্রাতৃত্বমূলক বহুপতিক বিবাহ বলা হয়। যেখানে স্বামীরা সকলে ভাই নন, সেখানে তাকে অভ্রাতৃত্বমূলক বহুপতিক বিবাহ বলা হয়। উত্তর ভারতের খস্জাতির মধ্যে ও দক্ষিণ ভারতে টোডাদের মধ্যে যে বর্গের বহুপতিক বিবাহ প্রচলিত আছে, তা ভ্রাতৃত্বমূলক। আবার মালাবারের নায়ারদের মধ্যে ও উত্তরে তিববতীয়দের মধ্যে যে বর্গের বহুপতিক বিবাহ প্রচলিত আছে, তা অভ্রাতৃত্বমূলক। এ সকল ক্ষেত্রে সন্তানের পিতৃত্ব নির্ণীত হয় এক সামাজিক অনুষ্ঠানের দ্বারা। আবার অনেকস্থলে দেবর কর্তৃক বিধবা ভাবীকে বিবাহ করার রীতিও আছে। এরূপ বিবাহকে দেবরণ বলা হয় । আবার অনুরূপভাবে যেখানে স্ত্রীব ভগিনীদের বিবাহ করা হয় তাকে শালীবরণ বলা হয়। বর্তমানে বহু জাতির মধ্যে এরূপ বিবাহের প্রচলন আছে। এক সময় বাংলাদেশেও প্রচলিত ছিল।

ভারতে বিবাহ প্রথার বিচিত্রতার কারণ হচ্ছে, নানাজাতি ও কুষ্টির সমাবেশ। অতি প্রাচীনকাল থেকে নানা জাতিব লোক এসে ভারতের জনস্রোতে মিশেছে। তার ফলে, ভারতে নানা নরগোষ্ঠীর মিশ্রণ ঘটেছে। এদের মধ্যে আছে, অষ্ট্রালয়েড বা প্রাক্‌দ্রাবিড়, দ্রাবিড়, আর্য ও মঙ্গোলীয়। অষ্ট্রালয়েড গোষ্ঠীর লোকেরাই হচ্ছে ভারতের আদিবাসী। তারা আজ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে মধ্য ভারতে ।

১৯৬০ সালে লোক গণনার সময় এদের সংখ্যা ছিল ২,৯৮,৮৩,৪৭০ জন। ভারতের সমগ্র জনবাসীর ৬-৮৬ শতাংশ। আদিবাসীরা সাধারণতঃ অষ্ট্রএশীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তভুক্ত দুই প্রধান শাখার ভাষা সমূহে কথাবার্তা বলে। এই দুই প্রধান শাখা হচ্ছে মুণ্ডারী ও মন্‌খেমর। ছোট নাগপুরের আদিবাসীরা মুণ্ডারী ভাষাগোষ্ঠীর অন্তভুক্ত ভাষাসমূহে কথাবার্তা বলে। এর উপশাখা সমূহ হচ্ছে থারওয়ারী, কোরফা, খরিয়া, জুয়াঙ, শবর ও গডব। আবার থারওয়ারীর অন্তভুক্ত হচ্ছে সাঁওতালী, হর, ভূমিজ, কোরা, হো, তুরিম, আমুরী, আগারিয়া ও কোরওয়া। সাঁওতালী ভাষায় কথা বলে সাঁওতাল পরগণার অধিবাসীরা । বাকীগুলি প্রচলিত আছে ওড়িষ্যা ও মধ্যপ্রদেশের নানা উপজাতির মধ্যে। দক্ষিণ ভারতের আদিবাসীরা দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষায় কথা বলে। তার অন্তভুক্ত হচ্ছে কোডাগু, তুলু, টোডা ও কোটা। তবে ছোটনাগপুরের ওরাওরাও দ্রাবিড় ভাষায় কথা বলে। এরূপ অনুমান করবার স্বপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ আছে যে আগন্তুক জাতিসমূহের মধ্যে দ্রাবিড় জাতিই প্রথম ভারতে এসে বসবাস সুরু করে এবং তার অনেক পরে আসে আর্যরা। আর্যরা এসে বসবাস সুরু করে পঞ্চনদ উপত্যকায় এবং পরে ছড়িয়ে পড়ে গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর উপত্যকায়। র্তারাই ভারতে বৈদিক সংস্কৃতির প্রবর্তন করেন এবং বর্ণাশ্রম ধর্ম ও জাতিভেদের স্বষ্টি করেন। দ্রাবিড় জাতি বর্তমানে কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে দক্ষিণ ভারতে আর মঙ্গোলীয় জাতি সমূহ বাস করে উত্তর-পূর্ব সীমান্তে।

যুগ যুগ ধরে পরস্পরের সঙ্গে মেলামেশার ফলে ভারতীয় কৃষ্টি আজ নানা জাতির ছাপ বহন করছে। পরবর্তী অধ্যায় সমূহে আমরা দেখতে পাব যে এর প্রভাব বিবাহ রীতিনীতির উপরও প্রতিফলিত

হয়েছে ।

বিবাহ সমস্যার উপর যৌন অনুপাতের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। যৌন অনুপাত বলতে আমরা হাজার পুরুষ প্রতি স্ত্রীলোকের সংখ্যা বুঝি। স্ত্রীলোকের সংখ্যা যেখানে কম সেখানে প্রধান সমস্যা হচ্ছে পাত্রী সংগ্রহ করা, আর যেখানে পুরুষের সংখ্যা কম সেখানে পাত্র সংগ্রহ করাই প্রধান সমস্যা দাঁড়ায় ।

গত ৭০ বৎসর পুরুষের তুলনায় ভারতে স্ত্রীলোকের সংখ্যা ক্রমশ কমতে আরম্ভ করেছে। ১৯০১ খ্ৰীষ্টাব্দে হাজার পুরুষ প্রতি স্ত্রীলোকের সংখ্যা ছিল ৯৭২ জন। এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৯১১ সালে ৯৬৪ জনে, ১৯২১ খ্ৰীষ্টাব্দে ৯৫৫ জনে, ১৯৩১ খ্ৰীষ্টাব্দে ৯৫০ জনে, ১৯৪১ খ্ৰীষ্টাব্দে ৯৪৬ জনে, ১৯৬০ খ্ৰীষ্টাব্দে ৯৪১ জনে ও ১৯৫১ খ্ৰীষ্টাব্দে ৯৩২ জনে। যে দেশে বিবাহ বাধ্যতামূলক ছিল এবং বহুপত্নী গ্রহণেরও কোন অন্তরায় ছিল না, সেদেশে যে এককালে পুরুষ অপেক্ষ স্ত্রীলোকের সংখ্যাই অধিক ছিল, সেরূপ অনুমান করবার পক্ষে যথেষ্ট কারণ আছে। কি কারণে গত ৭০ বৎসরকাল ভারতে স্ত্রীলোকের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে, তা অনুসন্ধানের বিষয়। তবে এ সম্বন্ধে জনসংখ্যা সম্পর্কিত তথ্যাদি আলোচনা করলে দেখতে পাওয়া যায় যে যদিও ভারতের অধিকাংশ রাজ্যেই পুরুষের অনুপাতে স্ত্রীলোকের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে তথাপি কয়েকটি রাজ্যে যেমন কেরালাপাঞ্জাব, বাজস্থান ও ত্রিপুরায় স্ত্রীলোকের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এই প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আদিবাসীদের মধ্যে পুরুষের অনুপাতে স্ত্রীলোকের সংখ্যা অধিক। আরও দেখা যায় যে, উচ্চবণের জাতিসমূহ অপেক্ষ। নিম্নবর্ণের জাতিসমূহের মধ্যেও পুরুষের অনুপাতে স্ত্রীলোকের সংখ্যা বেশী। আবার শহরাঞ্চল অপেক্ষ। গ্রামাঞ্চলে স্ত্রীলোকের সংখ্য। অধিক । এর কারণ অবশ্য স্বাভাবিক। কেননা গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে আগন্তুক পুরুষের সংখ্যা অনেক বেশী ।

যে সমাজে বিধবা বিবাহ প্রচলিত নেই, সে সমাজে স্ত্রীলোকের অনাধিক্য বিবাহ সমস্যার উপর বিশেষ প্রতিক্রিয়া ঘটায়, বিশেষ করে পাত্রী সংগ্রহ সম্পর্কে । কিন্তু তার চেয়ে বেশী প্রতিক্রিয়া ঘটেছে, বিয়ের বয়সের পরিবর্তন হেতু। বিয়ের বয়স আগেকার দিনে খুব কমই হতো। মনুর বিধান ছিল যে বিবাহের জন্য মেয়ের বয়স আট হবে, আর ছেলের বয়স ২৪ হবে । বিয়ের বয়সের দিক থেকে স্মৃতিকাররা মেয়েদের পাচভাগে বিভক্ত করেছেন। প্রথম “নগ্নিকা” অর্থাৎ যখন সে নগ্ন হয়ে থাকে, দ্বিতীয় গৌরী” অর্থাৎ আট বছরের মেয়ে, তৃতীয় “রোহিনী” অর্থাৎ নয় বছরের মেয়ে, চতুর্থ *কন্যা” অর্থাৎ দশ বছরের মেয়ে এবং পঞ্চম “রজস্বলা” অর্থাৎ দশ বছরের উপর বয়সের মেয়ে। যদিও মনু মেয়েদের পক্ষে আট বছর ও পুরুষদের ২৪ বছর বয়স বেঁধে দিয়েছিলেন, উত্তরকালে কার্যত এ বয়স বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে অনেক কমে গিয়েছিল। তার ফলে হিন্দুসমাজে বাল্যবিবাহই প্রচলিত প্রথায় দাড়িয়েছিল। সম্প্রতি যদিও এর পরিবর্তন ঘটেছে, তথাপি কিছুদিন আগে পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও ওড়িষ্যায় বাল্যবিবাহ ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। বর্তমানে উচ্চবর্ণের জাতিসমূহের মধ্যে এবং বিশেষ করে শিক্ষিতসমাজে বিবাহ আর অল্প বয়সে হয় না। আজকাল মেয়েদের বিবাহ আকছার ২০ থেকে ৩০-এর মধ্যে হচ্ছে । অনেকে আবার আজীবন কুমারীও থেকে যাচ্ছে। অনুরূপভাবে পুরুষদের বিবাহও ২৫ থেকে ৩৫-এর মধ্যে হচ্ছে এবং তাদের মধ্যেও অনেকে অবিবাহিত থাকছে ।

বিবাহের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে সন্তান প্রজনন। সেদিক থেকে মেয়েদের প্রজননশক্তির.উর্বরতার উপর বিবাহের সাফল্য ও জাতির ভবিষ্যত নির্ভর করছে। এ সম্বন্ধে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে হিন্দুদের তুলনায়. উপজাতি সমাজের মেয়েদের উর্বরতাশক্তি অনেক কম । তাদের মধ্যে প্রায়ই স্ত্রীলোকের এক থেকে তিনের বেশী সন্তান হয় না ।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত