| 24 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ গল্প: রঘুনাথ, কাপড় পর । অতনু ভট্টাচার্য

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস

 

লেখক পরিচিতি-১৯৬৮ সনে মেঘালয়ের শিলঙে গল্পকার অতনু ভট্টাচার্যের জন্ম হয়।মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছোটো ছোটো ঘটনার মধ্য দিয়ে লেখকের গল্পে উন্মোচিত হয় মানবীয় অভিজ্ঞতার কিছু তিক্ত মধুর তাৎপর্য।প্রকাশিত গল্প সঙ্কলন ‘ওভতনি যাত্রা,নীলার বাবে অলপ ভালপোয়া,চেকুর,রঘুনাথ কাপোর পিন্ধা ইত্যাদি।কবিতা সঙ্কলন গুলি যথাক্রমে সহযোদ্ধা,অশ্লীল রাতির কবিতা,জীবনর ভগ্নাংশ,প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি।


রঘুনাথ গীটার বাজিয়েছিল।

লোকে বলে–ছেলেটির আঙ্গুলে জাদু ছিল।

অবশ্য কাগজে-পত্রে কোথাও সে কথার উল্লেখ নেই। নিদানপুরের শিল্পী সমাজের পরিচয় মূলক গ্রন্থে নেই সেই সম্পর্কে কোনো উল্লেখ। এমনকি কৌশিক বরুয়া প্রণয়ন করা সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষটিও সেই সম্পর্কে নীরব।

কেউ কেউ বলতে চায় যে সেই দিনগুলিতে রঘুনাথের উচ্চতা ছিল প্রায় পাঁচ  ফুট চার  ইঞ্চি। কোঁকড়া চুলের সঙ্গে তার মাথাটা ছিল ছোটো এবং মুখটা কোমল, দাড়ি না গজানো একটি ভালো লাগা কিশোর মুখ।

রঘুনাথের বন্ধুমহলে পুরোনো ফোটো বের করে দেখায়– এই দেখ, বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয়জন। পাশে চেক শার্ট পরা আমি।

অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মানুষ সেই ফোটোগুলি দেখে। এটা রঘুনাথ? ওই আমাদের রঘু?

হ্যাঁ হ্যাঁ– বন্ধুমহল বলে– সেই জনই, সেই জনই। চোখ দুটির দিকে তাকাও। চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে  ও আমাদের রঘুনাথ কিনা।

মানুষ বিশ্বাস করতে চায়।

মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না।

কিন্তু যারা জানার তারা জানে যে গিটারের তার গুলিতে রঘুর আঙ্গুল সুন্দরভাবে খেলা করত। সেই খেলা মঞ্চে একা দেখানোর তখন সুযোগ কোথায় ছিল! কিন্তু সে যে ছিল একজন নিপুণ গিটার বাদক, সেই কথায় তারা আপত্তি করত না।

সেই রঘু এক রাতে মঞ্চ থেকে নেমে আসার পরে অতিথিশালার বারান্দায় বসে, হাতে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে একটা গীতের কলি গুনগুন করে গাইল। শেষ রাতের গম্ভীর পরিবেশে রঘুনাথের সুর আশেপাশে থাকা বেশ কিছু লোকের দৃষ্টি( প্রকৃতপক্ষে কর্ণ) আকর্ষণ করল। দু-একজন লোক তার আশেপাশে জমায়েত হল এবং প্রত্যেকেই তাকে মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগল। অতিথি শালার আহার জোগানদার তো একপ্রকার কেঁদেই  ফেলল। কোনো একজন  যেন রঘুনাথকে আর ও একটি গান গাওয়ার অনুরোধ করল। সেই অনুরোধে ভর  দিয়ে আর ও একটি সুর লক্ষ্যহীনভাবে রাতের আকাশে ছড়িয়ে পড়ল।

কেউ বলল–’ আরও একটি।’

অন্য একজন বলল–’ এত সুন্দর কন্ঠ আমি জীবনে শুনিনি।’

খবরটা তখন ছড়িয়ে পড়ল–যখন নিদান পুরের কোনো একটি শহরমুখী গ্রামের না-খাওয়া উৎসবে রঘুনাথকে একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে এককভাবে আমন্ত্রণ জানানো হল একের পর এক সেদিন সে সাতটা গীত পরিবেশন করে মঞ্চ থেকে নেমে এল। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গীত শুনতে থাকা একদল হাত-তালি বাজাতে ভুলে গেল। জর্দা পান খেয়ে পিক ফেলতে উঠে যাওয়া একজন শ্রোতা ফিরে এসে বলল যে লিটনপুরে এই ধরনের গান কেউ কখন ও শোনেনি।


আরো পড়ুন: অনুবাদ গল্প: মেয়েটা । সাদাত হাসান মান্টো


নিদান পুরের যুবকরা বলতে লাগল যে রঘুনাথের গান প্রকৃতপক্ষে ওদের জীবনের কথা, ওদের হৃদয়ের গান।

একজন সংগীত বিশারদ মন্তব্য করে বলল– জিনিয়াস। সিম্পলি জিনিয়াস।

আর তারপরেই অবলীলাক্রমে রঘুনাথের জীবন পরিবর্তিত হয়ে গেল।

রঘুনাথ যেন আর ও অল্প বেশি শিল্পী হল।

ঠিক তখনই একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। রঘুনাথের সহচর একজন একদিন সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল যে রঘুনাথের মাথাটা ছয় ফুট উচ্চতার একটি দরজার চৌকাঠে বেশ জোরে ধাক্কা খেল। কী হল? কীভাবে হল? রঘুনাথ কীভাবে হঠাৎ এত উঁচু হয়ে গেল?

সহচরটি এই অস্বাভাবিক কথাটা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু দুয়েকজনকে বলল। দুজন বিশ্বাস করল, তিনজন করল না। বিশ্বাস না করা তিনজন মনে মনে প্রমান চাইতে গেল। ব্যাপারটা আসলে কী? মানুষ এত  চট করে উঁচু হয়ে যেতে পারে কি ?

পরবর্তী কয়েকটি মাসে শিল্পী অভাবনীয় যশ এবং আর্থিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখল। রঘুনাথের মুখ ম্যাগাজিনের কাভার পেজে দেখা গেল। একদিন কোনো একটি ক্লাবের নিমন্ত্রণ পত্রে ছাপা হল–’ মিট দ্যা বাডিং সিঙ্গার রঘুনাথ’।

ব্যস্ততার জন্য– বোধহয় ব্যস্ততার জন্য রঘুনাথ নিজেও জানতে পারল না যে তার উচ্চতা ইতিমধ্যে ছয় ফুট তিন ইঞ্চি হয়ে পড়েছে। না হলে সে হয়তো ভাবতে থাকল যে তার উচ্চতা ততটুকুই। তার পাতলুনগুলি যেহেতু বিভিন্ন আকার এবং আকৃতির ছিল, তাই সে দিক থেকে শরীরের বাড়া কমাটা হয়তো তার চোখে পড়েনি। কাজেই এই ধরনের কথায়  মাথা ঘামানোর কোনো সুযোগ পেল না। 

তারপরে?

তারপরে রঘুনাথের কাছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে উদযাপিত সোহাগ মনি উৎসব গুলির অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী সঙ্গীত আর সমাপ্তি সঙ্গীত পরিবেশনের আমন্ত্রণ আসতে থাকল। রাজ্যের মূল ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত অঞ্চলটি থেকে অডিও ক্যাসেট এবং ভিডিও অ্যালবামের জন্য অনুরোধ এবং প্রস্তাব আসতে থাকল। আর রঘুনাথ এক ধরনের নতুন সুরে সমগ্র নিদানপুর ডুবিয়ে ফেলল।

এই নতুন সুরটা আনার জন্য রঘুনাথ বিখ্যাত পপ গায়ক, বীটলস গ্রুপের সদস্য জন লেননের অ্যালবামগুলি অনুসন্ধান করতে লাগল। পশ্চিমের সুরগুলিতে খাপ খাওয়ার মতো নিদান পুরের ভাষাটা নিজের সুবিধা অনুসারে সাজিয়ে গুছিয়ে নিল। এমনকি বব ডিলানের রীতিতে সে গানও লিখল এবং সেসব রেকর্ড করার জন্য বন্ধুর স্টুডিওতে অনেক রাত পার করল। অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে এই কথা ছড়িয়ে পড়ল যে নিদানপুরে একজন যথার্থ শিল্পীর অভাব পূরণ হল এবং সেদিক দিয়ে রাজ্যবাসীর অপেক্ষার অন্ত পড়ল।

অবশ্য দু-এক জন নিন্দুক বলল– এগুলি তো গান নয়, গানের নামে এসব আর্তনাদ,ক‍্যাকফনি,যন্ত্রণাক্লিষ্ট   ঘোড়ার চিৎকার কেবল।

এই ধরনের কটু মন্তব্যের প্রতিবাদ করা মানুষের ও অভাব হল না। ঝগড়ার সূত্রপাত হল। কেউ কারোকে ভয় দেখাল, কেউ কারোকে মারাত্মকভাবে মারধর করল। মোটকথা রঘুনাথকে নিয়ে নিদানপুরে  এক ধরনের চর্চা আরম্ভ হল।

এই সময়ে আরও কিছু ঘটনা ঘটল। প্রথম পর্যায়ের সফলতার পরে রঘুনাথ নিদানপুরের হাজার বছরের পুরোনো লোকগীত গুলি নিজস্ব ধরনে সংরচনা করল এবং অত্যন্ত কম দিনের মধ্যে সেইসব স্টুডিওতে রেকর্ডিং করে বাজারে মেলে দিল।তারপর সে শুরু করল দেহবিচারের গীত।এই লোকগীত এবং দেহবিচারের গীতসমূহ এক ধরনে জনপ্রিয় হল।খবরের কাগজে সেই খবরগুলি রঙচড়িয়ে ছাপা হল। টিভি চেনেলের ঘোষিকারা বারবার বলতে লাগল যে রঘুনাথ নিদানপুরের আকাশ-বাতাস থেকে হারিয়ে যেতে চলা লোকগীত সমূহের পুনরায় নতুন প্রজন্মের ঠোঁটে ফিরিয়ে এনেছে। যুবকরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রঘুর গান শুনতে আর গাইতে লাগল।সেলুন,রেস্তোরা,ডিটিপি সেন্টারগুলিতে রঘুর গান বাজানো শুরু হল। রঘুর গান না শুনে কোথাও নিরলে বসা বা কোথাও যাওয়াটা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল।এরকম মনে হল যেন নাইট সুপার এবং সিটিবাসগুলিতে রঘুর গান না বাজালে বাসের চালককে অনেক টাকার জরিমানা ভরতে হবে।

পোস্টার আঁকা হল,হোর্ডিং ঝোলান হল,মঞ্চ সজ্জিত হল।

মঞ্চের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা যুবতিরা রঘুর সঙ্গে সেলফি উঠার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।মঞ্চ থেকে কিছুটা দূরে পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকরা জোরে চিৎকার করে বলতে লাগল –’উই ওয়ান্ট রঘু,উই ওয়ান্ট রঘু। র-ঘু…র-ঘু।

আর কী আশ্চর্য।অচিরেই রঘুনাথের উচ্চতা ছয় ফুট নয় ইঞ্চি হয়ে পড়ল।এই উচ্চতা দেখে নিদানপুরের একদল মানুষ উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠল,একদল মানুষ সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল।রঘুর অনুরাগী একদল গর্বের সঙ্গে বলল  যে এই উচ্চতার আশেপাশে আর কেউ নেই।রঘু একক। রঘু অনন্য।

রঘু সাত ফুট তিন ইঞ্চি হল।

রঘু নয় ফুট হল।

একদিন রঘুনাথ চৌদ্দ ফুট উঁচু একটা বিশাল অবয়ব হল।

একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলল যে এটা আসলে শিল্পীর পিটুইটারি গ্লাণ্ডের সমস্যা।মানুষের গ্রোথ হরমোনের মূলে রয়েছে এই পিটুইটারি গ্লাণ্ড,যা মানুষের হাড় এবং শরীরের অন্যান্য টিসুসমূহের বৃদ্ধি

 স্টিমুলেট করে।চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রচুর জ্ঞান থাকা অন্য একজন কথাটাকে আংশিকভাবে সমর্থন করল।তিনি বললেন যে পৃ্থিবীতে জাইগান্টিজম নামে একটি শারীরিক সমস্যা নিশ্চয় আছে,কিন্তু সেটা কেবল শিশুর ক্ষেত্রেই সম্ভব।

একাংশ মানুষ বলতে লাগল যে এটা একটি দানব।কিন্তু অন্য একাংশ প্রবল আপত্তি জানাল। তাঁরা বলল যে রঘু যেহেতু মানুষ বধ করে না বা মানুষের মাংস  খায় না,তাই সে দানব হতে পারে না।কিন্তু যে সব মানুষ রঘুকে দানব বলতে চাইছিল তারা যুক্তি প্রদর্শন করে বলল যে রঘু ইতিমধ্যে কিছু কিশোর-কিশোরীর মগজ খাওয়ার তথ্য প্রমাণ পুলিশের হাতে মজুত রয়েছে।অবশ্য তাদের এই যুক্তি ধোঁপে টিকল না,কেননা একাংশ বলল যে মগজ খেলেও রঘু বলপূর্বকভাবে কারও কোনো রকম হানি করেনি।যা হয়েছে,সেই সমস্ত কিছুই সম্মতি সাপেক্ষে হয়েছে,সম্পূর্ণ্টাই রঘুনাথ এবং মগজের মালিকের বোঝাবুঝির মাধ্যমে হয়েছে।

ঘরোয়া আলোচনা এবং ফেসবুকের চর্চা যাই হোক না কেন ,রঘুনাথের সঙ্গী্তানুষ্ঠানের আয়োজনকে কেন্দ্র করে অন্য কিছু অথন্তর ঘটতে লাগল।প্রথমত একটি বিশাল এবং প্রচণ্ড উঁচু মঞ্চের প্রয়োজন হয়ে পড়ল। সুউচ্চ পেণ্ডেল বানানোটা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ল।ফলে অবিশ্বাস্য ধরনে খরচ বাড়ল। এর সঙ্গে যুক্ত হল শিল্পীর ক্রমবর্ধমান সম্মান মূল্যটা।অবশ্য টকার যোগাড় কোনো সমস্যা হল না।  একদল শিল্প রসিক বলল যে প্রতিভার সামনে ধন কিছুই নয়।ধন হাতের ময়লা।তাছাড়া নিদানপুরের বাইরে থেকে এসে বসতি করা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতি সহজেই এই বিশাল ধনরাশি সংগ্রহ করতে পারা গেল।টিভি চেনেল সমূহ তাঁদের নিজস্ব দর্শক বৃ্দ্ধির প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ল।চৌদ্দ ফুট উঁচু শিল্পী একজনের গান,কথা,বেশভূষা,অভিব্যক্তি একটা ছোটো পর্দায় দেখাতে পারাটা তাঁদের জন্য কৃৃ্তিত্বের কথাও হয়ে পড়ল। প্রত্যেকটি চেনেলে রঘুনাথের অনুষ্ঠানের ‘এক্সক্লুসিভ টেলিকাস্ট’করার দাবি করে বিজ্ঞাপন দিতে থাকল।

নিজের মাটির কথা শোনার জন্য প্রবাসীর কাতর মন।তাই দুবাই থেকে  আমন্ত্রণ এল।আমেরিকার আমন্ত্রণ এল।

স্থানীয় টিভির ঘোষক- ঘোষিকাদের কাছ থেকে জানা গেল যে এখন রঘুনাথ একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী।বোঝা গেল যে এই আন্তর্জাতিকতায় পন্ডিত রবিশঙ্কর এবং ওস্তাদ বিসমিল্লা খাঁর সঙ্গে রঘুর কোনো পার্থক্য নেই।অবশ্য এই সমস্ত কথায় কারও যেন কোনো ক্ষতি হল না।

এদিকে শিল্পীর কদর বোঝা একাংশ বলল চৌদ্দ ফুট উঁচু একজন শিল্পীর জন্য তাঁরা যে কোনো ধরনের পরিশ্রম করতে ইচ্ছুক।গড়ে উঠল ‘রঘুনাথ অনুরাগী সমাজ’। সেই সমাজ বলল যে রঘুনাথের নামে তাঁরা যে কোনো কাজ করতে সঙ্কল্পবদ্ধ।তার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তাঁরা একটি বাস এবং তিনটি ট্রেভেলার নিয়ে -অবশ্যই সারাটা পথ রঘুর গান গেয়েগেয়ে –নেপালের ভূমিকম্প পীড়িত  লোকদের সাহায্য করা হল।কিছু লোক অন্য একদিন অন্য কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে নিদানপুর থেকে শিলঙে বাইক রেলি করল।

রঘুর নিজেরও মনে হল  যে সমগ্র নিদানপুরের যুব সমাজ আক্রান্ত হয়ে পড়ল এক অদ্ভুত ধরনের জ্বরে।এই জ্বর রঘু জ্বর।এই জ্বর রঘুনাথ জ্বর।

এই ধরনের আনন্দ উন্মাদনার মধ্যে কোনো এক এপ্রিল মাসের এক শনিবার রঘুনাথ তাঁর মাথার একদিকের চুলে ক্ষৌরকর্ম চালিয়ে একটা নতুন রূপ ধারণ করে এল। আর কী আশ্চর্য! সোমবারে দেখা গেল‐- ছাল ছাড়িয়ে পরিষ্কার করা নারকেলটার মতো নিদানপুরের সহস্রাধিক যুবকের  মাথার এক পাশ পরিষ্কার হয়ে পড়েছে। সেপ্টেম্বরের একদিন রঘু তার বাহু এবং তলপেটে ড্রাগনের টাটু অংকন করে এল। পরের দিন নিদারনপুরের   লক্ষাধিক বাহু আর পেটে ছোটো বড়ো ড্রাগনের ছাপ দৃষ্টিগোচর হল। নিদানপুরের যুবতি সমাজ যারা মাথার কেশের হানি করায় আগ্রহী ছিল না‐ তারা তাদের নাভির নিচে প্রায় মুছে না যাওয়া অক্ষরে লিখিয়ে নিল‐- আই লাভ রঘুনাথ। আই ডাই ফর রঘু।

এই ধরনের কথা রঘুনাথের মাথাটা খারাপ করে ফেলল। শহর নগরের সাংস্কৃতিক সন্ধ্যাগুলির মঞ্চে রঘু উদ্ভট আচরণ করতে লাগল। একদিন গীত পরিবেশনের কোনো একটি পর্যায়ে রঘু তার শার্ট এবং গেঞ্জি খুলে দর্শকের মধ্যে ছুঁড়ে দিল। একদল কিশোর এবং যুবক সমস্বরে চিৎকার করে উঠল। রঘুনাথ অনুরাগী সমাজ চিৎকার করল‐- ব্রে-ভো, ব্রে‐ভো, ব্রে‐ভো। 

রঘুনাথ অস্থির হয়ে উঠল। সে তার প্যান্টের বোতাম খুলতে উদ্যত  হল।

অনুরাগীরা পুনরায় চিৎকার করল‐ব্রে-ভো,ব্রে-ভো,ব্রে-ভো।

রঘুনাথ প্যান্টটা শেষ পর্যন্ত খুলে ফেলল।

মঞ্চের সামনের পঞ্চাশোর্ধ মানুষগুলি, বিশেষ করে প্রৌঢ়া নারী সমাজ মাথা নিচু করে বসে রইল। তাদের অনেকই বিভিন্ন কাজের অজুহাতে‐ কেউ কেউ শরীর খারাপ লাগছে বলে‐ বাড়িমুখো হল। দুই-চার জন শিল্পীর এই ধরনের আচরণের কঠোর ভাষায় নিন্দা এবং প্রতিবাদ করল। অন্য একাংশ কাতর ভাবে, কিন্তু মুখের ভেতরে কাকূতি  করে বলল‐- কাপড় পর রঘুনাথ, কাপড় পর।

অথচ রঘুনাথের সমর্থনে উৎফুল্লিত চিৎকার ভেসে আসতেই থাকল‐ ব্রে-ভো,ব্রে-ভো,ব্রে-ভো।

রঘুনাথ উন্মত্ত হল। সমর্থনের চিৎকার এবং বাদ্যযন্ত্রের মিশ্রিত কোলাহলের মধ্যে রঘুনাথ সম্পূর্ণ বিবস্ত্র  হল। সঙ্গে সঙ্গে তুমুল হর্ষধ্বনি হল। ভিডিও ক্যামেরার দায়িত্বে থাকা একটা ছেলে তার ক্যামেরার লেন্স জুম করল। ফেসবুক এবং হোয়াটসঅ্যাপে আপলোড করার আগ্রহে বহু মোবাইল ফোনের ক্যামেরা সক্রিয় হয়ে উঠল।

টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক প্রশ্রয় ভরা মৃদু কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,’ রঘুদা, আমাদের কাছে দর্শকরা জানতে চাইবে আপনি এভাবে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হওয়ার কারণ কি। আপনি রাজ্যবাসীকে কী বার্তা দিতে চাইছেন?’

রঘুনাথ দীপ্তকন্ঠে উত্তর দিল যে তার এই নগ্নতার প্রদর্শন প্রকৃতপক্ষে রাজ্যটির নগ্নতার প্রতীকী  প্রতিবাদ।

উত্তরটা একজন মানুষ হজম করতে পারল না। কিন্তু অন্য একদল বলল যে রঘুনাথের এই উত্তর যথার্থ উত্তর। রঘুনাথ কেবল একজন শিল্পীই নয়, সে একটি বিপ্লবী সত্তা। সে নিদানপুরের এক প্রতিবাদী কন্ঠ।

পরবর্তী সময়ে ও এই ধরনের প্রতিবাদী কন্ঠ জাগ্রত হয়ে থাকল। সুযোগ পেলেই রঘুনাথ উলঙ্গ হতে লাগল। সামান্তরাল ভাবে তার জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেতে লাগল। জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কথা বলা নিদানপুরের কোনো ব্যক্তির পক্ষেই সহজ হয়ে রইল না। বরং সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানোর জন্য নিদানপুরের টিভি চ্যানেলগুলি তৎপর হয়ে উঠল। এদিকে নতুন ভোটাধিকার লাভ করা যুবকদের ভোটের আশায় দুই একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনী ভাষণের মঞ্চে রঘুনাথকে চাইতে লাগল।

রঘুনাথ আর ও দেড় ফুট উঁচু হল।

তার আশেপাশে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না। নিদানপুরের সঙ্গীত জগতের ব্যবসার ক্ষেত্রে সে হয়ে পড়ল প্রায় একচ্ছত্র সম্রাট। কাজেই গীত পরিবেশনের মধ্যে মধ্যে সে বিভিন্ন টিপ্পনি কাটতে  লাগল। তাঁর টিপ্পনির ভাষা, তাঁর অভিব্যক্তি, তাঁর ইঙ্গিত,তাঁর সিদ্ধান্ত মানুষের চর্চার বিষয় হয়ে পড়ল।

রঘুনাথ পরিস্থিতিটা আকন্ঠ উপভোগ করতে লাগল। বিভিন্ন মঞ্চে সে শার্ট, গেঞ্জি, প্যান্টের বোতাম খুলতে লাগল। সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে চেরা জিভ  দিয়ে সে যে কোনো বিষয়ে মন্তব্য দিতে লাগল। যে হাসার হাসল, জ্যাক দেওয়ার যে জ্যাক দিল, ঈর্ষণীয় ব্যক্তি ঈর্ষা করল, নিজেদের যারা জড়িয়ে নিল তারা রাগ করতে লাগল।

আর কিছু মানুষ মার খাবার ভয়ে নীরব হয়ে রইল।

এদিকে শিল্পীকে যারা অন্তর থেকে ভালোবাসে শোনা না শোনার মতো করে কাতর ভাবে বলতে লাগল‐ রঘুনাথ, কাপড় পর। কাপড় পর, রঘুনাথ।

ফেসবুকে তুমুল বিতর্ক হল।

একদল লিখল‐ রাজনীতি রঘুনাথের ক্ষেত্র নয়। তার সঙ্গীতেই মনোনিবেশ করা উচিত।

একজন প্রত্যুত্তর দিল‐ রাজনীতি কার ও পৈতৃক সম্পত্তি নয়।

অন্য একজন লিখল‐ কিন্তু সে লেং…( ছাপার অযোগ্য)

একজন চেপে ধরল‐ তাতে তোর কী?

এই মন্তব্যকে সমর্থন করে একজন লিখল‐ কাপড় পরা শিল্পী বুদ্ধিজীবী অনেক দেখেছি। আমাদের সব জানা আছে।

একজন পুনরায় লিখল‐- হ্যাঁ, হ্যাঁ। নিদানপুরের মানুষগুলি শালা এরকমই। নিজের জায়গার মানুষের উন্নতিতে ঈর্ষা করে। রাজ্যের বাইরে কোথাও এরকম দেখা যায় না।

মন্তব্যটা একজন কাটল। সে লিখল‐ রাজ্যের বাইরে শিল্পীকে এভাবে দর্শকদের সামনে উলঙ্গ হতেও দেখা যায় না।

অপরজন লিখল- তুই চুপ থাক।

একজন লিখল‐ তুই ( অশ্লীল)… চুপ করে থাক।

ক লিখল‐…( ছাপার অযোগ্য)।

খ লিখল‐…( ছাপার অযোগ্য)।

কেউ কাউকে ট্রল করল; কেউ কার ও ‘ মেমে’ বানাল। রঘুর সমর্থনে কিছু নতুন বন্ধুত্ব গড়ে উঠল; ক্রোধ এবং ক্ষোভে কিছু দীর্ঘদিনের সম্পর্কের অবসান ঘটল।

এর মধ্যেই রাজ্যের সঙ্গীত জগতে নানান সংকটের সৃষ্টি হল। একদিকে ক্যাসেট এবং সিডির পাইরেসি শিল্পী সমাজের যথেষ্ট ক্ষতি করল। অন্যদিকে নিদানপুরে একদল সঙ্গীত মাফিয়ার সৃষ্টি হল। এই নতুন অভিভাবকরা বাজারটাকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলল। কাগজের বিনোদনের পৃষ্ঠায় রঘুর খবর লেখার জন্য রাতারাতি নতুন লেখকের সৃষ্টি হল। রাতের মধ্যে নতুন গীতিকার- সুরকার সৃষ্টি হল।

গ্রামে দোতারা নিয়ে বসে থাকে একটি শুকনো মুখ‐ হারাধন রায়। সারিন্দা নিয়ে বসে থাকে একটি রুক্ষ শরীর‐ গোপাল বর্মন। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে থাকে তারা। আর্থিক অনটনে জর্জরিত হয়ে কোনো একজন সারিন্দাবাদক আত্মহত্যা করে। কাগজের ভেতরের পৃষ্ঠায় সেই খবর ছোটো করে ছাপা হয়। সংবাদদাতা ব্যস্ত হয়ে পড়ে রঘুর সর্দি-কাশির জ্বরের খবরে।

চেপে ধরে, চেপে ধরে‐ খবর খবর কে চেপে ধরে।

পশ্চিমের লঘু এবং জনপ্রিয় সুরগুলি নিদানপুরের নিজস্ব সুরকে ছাপিয়ে উঠে। মাইকেল জ্যাকসন, অ্যালটন জন, পল মেক কার্টনী আদির সুর এবং গায়কীর আমদানি হল। কেউ ভাবতে না পারা করে ঘরের জানালা দিয়ে ঢুকে এল রিকি মার্টিন, এনরিকে, সেলিন ডিয়ন। এবং নিদানপুরের প্রাচীন, সুরেলা, বনগীত গুলি দূরে কোথাও হারিয়ে গেল। আইরন মেটেল এবং মেটেলিকা বুকে ভর দিয়ে এল। ফ্রেডি মার্কারীর রক এল, জাস্টিন টিম্বারলেকের পপ এল। রঘুর হাত ধরে বয় জর্জের গীতের কথা এবং সুর এত চোরাবাজারির মতো এল যে সাধারণ নিদানপুরবাসী ধরতেই পারল না চোর কে, গৃহস্থই বা কে। 

ধীরে ধীরে নিজামপুরের মানুষগুলি সঙ্গীত নামে কারবারটিকে শ্রবণের পরিবর্তে দৃশ্যের সামগ্রী বলে ভাবতে শুরু করল। রঘুর পথে এগিয়ে যেতে চাওয়া শিল্পীরা কন্ঠের পরিবর্তে প্রসাধন এবং শরীরচর্চায় মনোনিবেশ করতে লাগল। মঞ্চগুলিতে তারা সুর- তাল- লয়ের পরিবর্তে উঠক- বৈঠক, দৌড়-ঝাঁপ এবং চিৎকার চেঁচামেচিতে গুরুত্ব আরোপ করল। প্রত্যেকেই যখন একই রকম চিৎকার করতে লাগল তখন মানুষের মনোযোগ আকর্ষণে ভীষণ অসুবিধা দেখা দিল। কাজেই একাংশ শিল্পী কিছু অশিষ্ট, অশালীন, শব্দের শরণাপন্ন হল। এদের গীতের বিষয় হয়ে পড়ল স্থূল যৌনতা এবং নারীর শরীর। এই নতুন শিল্পীদেরও কোনো একজন হঠাৎ উঁচু হয়ে গেল, কোনো একজন হয়ে পড়ল আশ্চর্যজনকভাবে মাংসল।

এদিকে দেহতত্ত্বের গান গাওয়া ক্ষীণ নিস্তেজ শিল্পীটি ক্রমশ বেঁটে হয়ে যেতে লাগল। নিদানপুরের কয়েক শতক জোড়া প্রাচীন ভক্তিমূলক গান পরিবেশন করার শিল্পীরা বেঁটে হয়ে যেতে লাগল। অথচ রঘুনাথ পনেরো ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা হয়ে গেল।

রঘুনাথ যতটা উঁচু হল, তাকে পরিবেষ্টিত করে রাখা সাঙ্গোপাঙ্গদের দলটা ততটাই শক্তিশালী হল। তারা নিদান পুরের জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের তাচ্ছিল্য করতে লাগল। রঘুনাথের সমালোচনা করা লেখক এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন ধরনে আক্রমণ করতে লাগল। তারা অন্যদের গানকে অপছন্দ করতে লাগল। অন্য কার ও গান শুনতে প্রত্যাখ্যান করতে লাগল।

অনেক আশা করে সেদিন মঞ্চে উঠেছিল রঘুর পিতা। সেদিন যে তার সেলিব্রেটি পুত্র লেখা একগুচ্ছ গীতের সংকলনের উন্মোচন! মঞ্চে দাঁড়িয়ে পিতা অভিভূত হয়ে পড়লেন। সামনের বিশাল অনুরাগী সমাজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কেউ তার গলায় পরিয়ে দিল একটি গলবস্ত্র। একজন মাইক্রোফোনটা তার দিকে এগিয়ে দিল। তিনি জানেন‐ কেবল তিনি জানেন কত যত্নের সঙ্গে এই পুত্র একদিন গিটার শিখেছিল। প্রতিটি বাদ্যে সুর-তাল বাজাতে জানত। অনেক অবহেলা অনেক অভাবের মধ্যেই একদিন সেই শিশু সুরে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। মায়ের কোলে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে থাকা শিশুটি একদিন হয়ে উঠেছিল পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতার গিটার বাদক। সেই দিনগুলির কথা কেবল তিনি জানেন। তিনি কেবল বলতে পারেন এখন এই পনেরো ফুট ছয় ইঞ্চি হয়ে পড়া পুত্রের হর্ষ- বিষাদ, উত্থান- পতনের বহু কথা।

অথচ মঞ্চের সামনের দর্শকরা অধৈর্য হয়ে উঠল।

একজন চিৎকার করল‐- এই বুড়ো আমরা তোর কথা শোনার জন্য এখানে দাঁড়িয়ে নেই।

সঙ্গে সঙ্গে একটা স্পষ্ট হর্ষ ধ্বনি শোনা গেল।

একজন অত্যুৎসাহী যুবক কাগজের দলা পাকিয়ে মানুষের গায়ে পড়ার মতো ছুড়ে দিল। যুবকটি চিৎকার করল এ কে বে? কী লেকচার মারতে এসেছে?’

রঘুনাথের পিতার মাথাটা আচমকা  ঘুরে উঠল। তিনি নিথর হয়ে সোফায় বসে পড়লেন।

প্রায় একুশ ফুট উচ্চতা থেকে রঘুনাথের চোখ দুটো এই সমগ্র দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে লাগল। সে শুনতে থাকল মঞ্চের সামনে থেকে ভেসে আসা সেই ছন্দোবদ্ধ ধ্বনি‐ উই ওয়ান্ট রঘুনাথ। উই ওয়ান্ট র‐ঘু।

এক ধরনের গ্লানি রঘুনাথকে পীড়া দিতে লাগল। মঞ্চের ওপরে সে ধীরে ধীরে, ইঞ্চি করে বেঁটে হতে লাগল। আনন্দের আতিশয্যে  থাকা দর্শকরা কথাটা অবশ্য ধরতে পারল না। তাঁরা পূর্বের মতো একই সুরে চিৎকার করতে থাকল‐ উই ওয়ান্ট রঘু। উই ওয়ান্ট র-ঘু।

আর তখনই রঘুনাথ হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।

পৌষ মাসের প্রবল ঠান্ডাকে অগ্রাহ্য করে, খোলা মঞ্চে ছড়িয়ে পড়া কুয়াশা

র আচ্ছাদন উপেক্ষা করে রঘুনাথ এক পদ এক পদ করে তার কাপড়গুলি খুলতে লাগল।

প্রথমে সে গলার মাফলার এবং চামড়ার জ্যাকেটটা খুলে ফেলল।

একদল কিশোর-কিশোরী সমস্বরে চিৎকার করে উঠল।

তারপরে সে খুলল জামাটা। জামার পরে গেঞ্জিটা।

রঘুনাথ অনুরাগী সমাজ চিৎকার করল– ব্রে-ভো, ব্রে-ভো, ব্রে-ভো।

রঘুনাথ প্যান্টটা শেষ পর্যন্ত খুলে ফেলল।

আনন্দে মাতাল হয়ে থাকা মানুষের দল ধরতে পারল না যে রঘুনাথের চোখ দিয়ে বেরিয়ে এল কান্না। একটি বিশাল মঞ্চে একদল উদভ্রান্ত, মাতাল যুবকের সামনে দাঁড়িয়ে রইল রঘুনাথ‐- উলঙ্গ রঘুনাথ।

আয়োজক সমিতির দু’একজন কোথা থেকে একটি চাদরে এনে রঘুনাথের শরীরটা ঘিরে দিতে চেষ্টা করল। রঘুনাথ চাদরটা ফেলে দিল। কেউ শীত থেকে একটু অবকাশ দেওয়ার জন্য রোগীর পিঠটা হাতের তালু দিয়ে জোরে জোরে  ঘষে দিল। রঘুনাথ নিঃশব্দে মানুষটার হাত দুটি সরিয়ে দিল।

রঘুনাথ দাঁড়িয়ে রইল, দাঁড়িয়ে রইল, নিঃশব্দে কেবল দাঁড়িয়ে রইল।

কেউ তাকে নাড়াতে পারল না। কেউ তাকে টলাতে পারল না। মাইক্রোফোনের শব্দ, মানুষের কোলাহল, চেয়ার টেবিল টানার শব্দ, মোবাইল ফোনের রিংটোন,হামি- কাশি- দীর্ঘশ্বাস সমস্ত শব্দ যেন হঠাৎ নাই হয়ে গেল।

অনেক সময় নীরবতার পরে বৃদ্ধ পিতা সোফা থেকে উঠল। উলঙ্গ পুত্রের কাছে গিয়ে তিনি একজন পরাজিত মানুষের স্বরে বললেন‐-‘ কাপড় পর, রঘুনাথ। ও রঘুনাথ, রঘুনাথ হে, কাপড় পর।’ 

গল্পটির একটি ওপরঞ্চি অংশ

শ্রদ্ধেয় পাঠক বৃন্দ, রঘুনাথের এই গল্পটা আমি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মহলে, এখানে সেখানে, দু একটি সুবিধা জনক জায়গায় বলতে আরম্ভ করলাম। স্বাভাবিকভাবেই দুই চার জন তির্যক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতে লাগল, দুই চারজন মুচকি হাসল, একজন নিদান পুরের প্রকৃত ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য লেখককে অনুনয় করতে লাগল। আফ্রিকার রোয়ান্ডা দেশের একজন বন্ধু টেলিফোনে জিজ্ঞেস করল‐-‘ ইজ ইট এবাউট দা টেলস অফ হুটু, তুঝছি অ্যান্ড তোয়া অব আওয়ার কান্ট্রি?’

বলিভিয়া থেকে নিদানপুরে আসা একজন গবেষিকা ছাত্রীকে গল্পটা একদিন বলতে হল। সে চিৎকার করে উঠল‐-‘ হাউ স্ট্রেঞ্জ!হাউ স্ট্রেঞ্জ! ইজ ইট রিয়েলি এ স্টোরি? এটা গল্প কি? না ইতিহাস?’

আমি বললাম‐’ এটা একটি গল্প হাস।’

শব্দটা স্বাভাবিকভাবেই সে বুঝল না। একটা ভিজে হাসি হেসে পুয়ের্তো রিকো দ্বীপে উদ্ভূত রিকেটন নামের এক ধরনের জনপ্রিয় অথচ ভদ্রলোকের জন্য অস্বস্তিকর সঙ্গীতের কথা বলল। সে এটা ও বলল যে এই ধরনের গান কিউবা, পানামা, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকার বহু দেশ; গ্রাস করে ফেলেছে অনেক স্থানীয় সঙ্গীত। তারপরে যথেষ্ট সহমর্মিতার সঙ্গে সে বলল‐’ মে বি, সাম রেগুনাটস আর দেয়ার টু। হয়তো সেই সমস্ত দেশে কিছু রঘুনাথ আছে।’

আমি একটি আশঙ্কার অভিব্যক্তি প্রকাশ করলাম।

দু কাপ কফি নিয়ে একদিন অনুরাধা দিদি এবং আমি গ্রীন ভিউ রেস্তোরার ছোটো একটি টেবিলের দুপাশে দুটি চেয়ার নিয়ে বসলাম। বাইরে ধারাসার বৃষ্টি পড়ছে। রেস্তোরাঁর জানালার বড়ো আয়নাগুলির মধ্য দিয়ে দিদি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করল, কফির কাপে দীর্ঘ একটা চুমুক দিল এবং তারপর বলল’ তাহলে একটি গল্প শোনা যাক।’

আমি রঘুনাথের গল্পটা বলতে আরম্ভ করলাম। মনে হল, দু চোখ বন্ধ করে গানের তালে তালে মাথা নাড়ানোর ভঙ্গি করে দিদি গল্প শুনছে। কিন্তু গল্পের একটি পর্যায়ে তিনি অস্থির এবং অধৈর্য হয়ে উঠলেন। শেষে হতাশার স্বর একটা নিয়ে যেন তিনি বললেন,’ গল্পটি বড়ো আশ্চর্য ধরনের।’

আমি দিদিকে মনে করিয়ে দেবার জন্য বললাম যে সত্য কখনও গল্পের চেয়েও বেশি আশ্চর্যজনক। ফ্যাক্টস আর স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন।

তাহলে ফ্যাক্ট কি? গল্পের আড়ালের সেই ভয়াবহ সত্য কি?

মঞ্চে সেদিন রঘুনাথকে কোনো গ্লানি পীড়া দিচ্ছিল না। মঞ্চের ওপরে সে ধীরে ধীরে, ইঞ্চি ইঞ্চি করে বেঁটে হয়নি। পিতাকে করা চরম অপমানের পরেও সেদিন রঘু মঞ্চে কোনো প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেনি। পৌষ মাসের প্রবল ঠান্ডা বাতাসকে অগ্রাহ্য করে, খোলা মঞ্চে ছড়িয়ে পড়া কুয়াশার আচ্ছাদন উপেক্ষা করে রঘুনাথ সেদিন কোনো প্রতিবাদ করেনি। পিতার জন্য রঘুনাথের চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসেনি কান্না।

এই ব্যাপক প্রচার, এই এগ্রেসিভ মার্কেটিং, এই উন্মাদনার বিরুদ্ধে কথা বলে বেঁটে হওয়ার জন্য রঘুনাথের কোনো গরজ ছিল না। অনুরাগীর  চিৎকারের মধ্যে সেদিন রঘুনাথ‐ সেদিন ও রঘুনাথ বিভোর হয়ে তৃপ্ত হয়ে হয়ে ক্রমান্বয়ে উঁচু হয়ে যেতে থাকল।

রঘুনাথ ষোলো ফুট চার ইঞ্চি হল।

রঘুনাথ একুশ  ফুট দুই ইঞ্চি হল।

উঁচু হতে হতে রঘুনাথের মাথাটা কেউ আর দেখতে না পারার মতো হয়ে গেল।

গল্পের আড়ালের এই সত্যটা সেদিন অনুরাধা দিদিকে বলা হল না।

আমি কেবল বললাম,’ বৃষ্টি কমেছে।’

দিদি, ইঙ্গিতে রেস্তোরার একজন পরিচারককে ডাকল, কফির বিল পরিশোধ করল আর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,’ চল’।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত