| 5 মার্চ 2024
Categories
গল্প পুনঃপাঠ সম্পাদকের পছন্দ সাহিত্য

ইরাবতী পুনর্পাঠ গল্প: আমার মা । রমানাথ রায়

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট
মা আমাকে ভালোবাসে না। মা ভালোবাসে দাদাকে। বাসবেই তো। দাদা যে ছেলে। আর আমি যে মেয়ে। তাই দাদার জন্য কেনা হয় দামি পোশাক, দামি জুতো। আমার জন্য কম দামের পোশাক, কম দামের জুতো। দাদার জন্যে আসে রাবড়ি, রসগোল্লা। আমার জন্য আসে বোঁদে, গুঁজিয়া। কিছু বলতে গেলে মা বলে, আমরা গরিব। এত পয়সা কোত্থেকে পাব? তাছাড়া তুই মেয়ে। তুই পরের ঘরে যাবি। তোর বিলাসিতা ভালো নয়। আমি কিছু বলি না। চুপ করে থাকি। শুধু থেকে থেকে মা-র ওপর অভিমান হয়, রাগ হয়।
 
আমাকে ভালোবাসত বাবা। বাবা আমাকে টুনটুনি বলে ডাকত। সেই বাবাও একদিন মারা গেল। অফিসের দয়ায় মা বাবার অফিসে চাকরি পেল। সামান্য মাইনে। সংসার চালাতে মা হিমশিম খায়। ফলে মা দিন দিন রুক্ষ হয়ে উঠল। কথায় কথায় মা মুখ ঝামটা দেয়। আমি তাই ভয়ে ভয়ে থাকি। মা যা বলে তাই শুনি। মা অফিসে যায়। আমি সংসারের সব কাজ করি। আমি রান্না করি, বাসন মাজি, কাপড় কাচি, ঘর গোছাই। তারপর স্কুলে যাই। দাদা কিছু করে না। খায়-দায় আর স্কুলে যায়। পড়াশুনোয় ঘোড়ার ডিম। স্কুলে মাস্টারমশাইরা আমাকে ভালোবাসে। আমি প্রতিবছর ক্লাসে ফার্স্ট হই। এর জন্য মা আমার ওপর রেগে যায়। দাদা রেগে যায়। মা তো একদিন বলেই ফেলল, তুই মেয়ে। এত লেখাপড়া শিখে কী করবি? কোন কাজে দেবে? শেষপর্যন্ত হাঁড়ি ঠেলা ছাড়া কোনও গতি নেই। আমার শেষপর্যন্ত কী গতি হবে জানি না। না জানলেও আমি লেখাপড়া করব। তাতে যা হবার হবে।
 
একদিন আমার হাত থেকে একটা কাচের গ্লাস মেঝেয় পড়ে ভেঙে গেল। মা আমার গালে ঠাস করে একটা চড় কষিয়ে দিলো। দিয়ে বলল, তুই সংসারে একটা অলক্ষ্মী, তুই যে কবে বিদেয় হবি জানি না।
 
আমার চোখ ফেটে জল চলে এলো। বুঝতে পারলাম, মা আমাকে আর সহ্য করতে পারছে না। আমাকে বিদেয় করার কথা ভাবছে। আমার কী অপরাধ জানি না। জানি না মেয়ে হওয়া অপরাধ কি না।
 
স্কুল ছেড়ে সবে কলেজে ঢুকেছি, সেই সময় একদিন আমাকে দেখতে লোকজন এলো। মা আমাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে তাদের সামনে নিয়ে এলো। তারা আমাকে পছন্দ করল। কিন্তু আমার পছন্দ হলো না। লোকজন চলে গেলে মাকে বললাম, আমি এখন বিয়ে করব না।
 
মা রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, বিয়ে করবি না! কেন?
 
—আমি লেখাপড়া শিখব। বিএ পাশ করব। তারপর বিয়ে।
 
—আর লেখাপড়া করতে হবে না। যথেষ্ট হয়েছে, —বলে একটু থেমে মা বলল, এদের আবস্থা ভালো। এখানে বিয়ে হলে তুই সুখী হবি।
 
—আমার এখন বিয়ে করার ইচ্ছে নেই।
 
—সারাজীবন তুই আইবুড়ো হয়ে থাকবি? আমার ঘাড়ে বসে খাবি?
 
—তুমি এ নিয়ে চিন্তা কোরো না।
 
—তুই আমার মেয়ে। আমি তোকে পেটে ধরেছি। তাই এ নিয়ে আমাকে চিন্তা করতে হবে।
 
এবার জোর দিয়ে বললাম, না—চিন্তা করতে হবে না। আমার ব্যবস্থা আমি নিজে করব।
 
মা গলা উঁচিয়ে বলল, তা সেটা কবে করবি?
 
—সময় হলেই করব।
 
—কবে যে সে সময় হবে জানি না। —বলে গজগজ করতে করতে মা চলে গেল।
 
২.
 
একদিন সন্ধেবেলা মাসি এলো। আমি তখন বাড়িতে। আমি মাসির জন্যে চা করে দিলাম।
 
চা খেতে খেতে মাসি বলল, খুব ভালো চা করেছিস। তবে শুধু চা করলে হবে না, রান্নাবান্নাও শিখতে হবে।
 
মা বলল, ও সব পারে।
 
মাসি বলল, এ তো খুব ভালো কথা। এবার তাহলে আর দেরি করা উচিত নয়।
 
মা জানতে চাইল, কীসের কথা বলছ? বিয়ের?
 
মাসি বলল, হ্যাঁ। এবার বিয়ে দিয়ে দাও। আমার হাতে একটা ভালো পাত্র আছে। পুলিশে হোম গার্ড-এর চাকরি পেয়েছে। তুমি যদি বলো তাহলে আমি ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করি।
 
মা বলল, ও এখন বিয়ে করবে না।
 
মাসি আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, সত্যি?
 
আমি বললাম, হ্যাঁ। আমি এখন পড়াশুনো করতে চাই।
 
মাসি বলল, এ তো ভালো কথা নয়।
 
মা তখন মাসিকে বলল, তুমি ওকে ভালো করে বোঝাও দেখি।
 
মাসি এবার মা-র কথায় উৎসাহিত হয়ে আমাকে বোঝাতে লাগল, আমরা গরিব মানুষ। আমাদের ঘরে লেখাপড়া চলে না। আমাদের পাশের ঘরে একটা মেয়ে লেখাপড়া শিখে বসে আছে। সে না পাচ্ছে চাকরি, না পারছে পরের বাড়ি কাজ করতে। পরের বাড়ি কাজ করতে সম্মানে লাগছে। আবার লেখাপড়া জানা মেয়েকে কেউ বিয়ে করতে চাইছে না। খুব সমস্যায় পড়েছে। তোরও সেই দশাই হবে। আমি বলি, তুই লেখাপড়া ছেড়ে দে। ছেড়ে দিয়ে….
 
আমি বিরক্ত হয়ে মাসির কথা থামিয়ে দিয়ে বললাম, তুমি যতই বলো, আমি এখন বিয়ে করব না। আমি লেখাপড়া শিখব।
 
মাসি তা শুনে কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল। তারপর বলল, তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই। তুই যা খুশি কর। শুধু তুই একটু তোর মা-র কথা ভাব।
 
—মা-র কথা ভাবি বলেই তো এখন বিয়ে করব না। মা-র কথা ভাবি বলেই তো লেখাপড়া শিখছি। আমি চলে গেলে মা-র দেখভাল কে করবে? দাদার তো ওই ছিরি।
 
মা বলল, আমাকে নিয়ে তোকে আর চিন্তা করতে হবে না।
 
আমি বললাম, সে হয় না মা। তুমি আমাকে যতই বকোঝকো তুমি আমার মা।
 
এ কথা শুনে মা খুশি হলো। মাসি খুশি হলো না। আমাকে গাল পাড়তে পাড়তে চলে গেল।
 
এরপর একদিন মামি এলো, পিসি এলো, জেঠিমা এলো। সকলের মুখে একটাই কথা, লেখাপড়া বন্ধ করে বিয়ে দিয়ে দাও। নইলে এই মেয়ে কোনদিন কী করে বসবে তার ঠিক নেই।
 
কথাটা মা-র মনে ধরল। মা আমার কলেজের মাইনে দেওয়া বন্ধ করে দিলো। বইখাতা কেনার টাকা বন্ধ করে দিলো। অথচ মা দাদার বেলায় অন্যরকম। দাদা এখনও স্কুল পেরোতে পারছে না। বারবার ফেল করছে। তবু মা দাদার স্কুলের মাইনে দিয়ে যায়। বইখাতা কেনার পয়সা দিয়ে যায়।
 
এবার চিন্তায় পড়ে গেলাম, ভাবতে লাগলাম কী করা যায়।
 
একদিন কলেজের সিঁড়িতে বসে কাঁদছিলাম। তা সুমন আমার পাশে এসে বসল। সুমন আমার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ে। ওর বাবার একটা ছোটোখাটো মুদির দোকান আছে।
 
সুমন জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন?
 
আমি তখন কাঁদতে কাঁদতে সব কথা বললাম।
 
সুমন বলল, তোর অবস্থা আমার মতোই। আমার বাবার শরীর ভালো নেই। আর ক-দিন বাঁচবে জানি না। বাবা রোজ বলছে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে দোকানে বসতে। কিছু বলাও যায় না। কী করব জানি ন। —বলে একটু থেমে বলল, তুই কলেজ ছাড়িস না। আমি টাকা দেবো।
 
কান্না থামিয়ে বললাম, সত্যি?
 
সুমন বলল, সত্যি।
 
ব্যাস! আমার আর চিন্তা নেই।
 
বাড়িতে এসে মাকে বললাম, তোমাকে আর টাকা দিতে হবে না। আমি আমার ব্যবস্থা করে ফেলেছি।
 
মা জানতে চাইল, কী ব্যবস্থা করেছিস?
 
—আমাকে একজন লেখাপড়ার খরচ চালাবে।
 
মা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল, কে সে?
 
—সুমন।
 
—সুমন কে?
 
আমার সঙ্গে পড়ে। আমাদের ঘরেও দু-একবার এসেছে। খুব ভালো ছেলে।
 
—ও তোকে বিয়ে করবে?
 
এই প্রশ্ন শুনে আমি হেসে ফেললাম। বললাম, তুমি কি আমার বিয়ে ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারো না?
 
মা এ কথার উত্তর দিলো না। চুপ করে রইল।
 
৩.
 
আমাদের বংশে কেউ কোনওদিন স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি। আমি প্রথম বিএ পাশ করলাম। সুমনও বিএ পাশ করল। মা খুব খুশি। খুশিতে মা-র চোখে জল চলে এলো। দাদার লেখাপড়া হলো না। তবে গাড়ি চালাতে শিখেছে। ভালোই গাড়ি চালায়। এখন এক ডাক্তারের গাড়ি চালায়। মাসে বারো হাজার টাকা মাইনে পায়। কিন্তু দাদ একদিন বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেল। সংসারে আর কিছু ঠেকায় না। মা-র চাকরিও আর বেশিদিন নেই। মা একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার চাকরি আর ছ-মাস আছে। তারপর কী হবে?
 
আমি বললাম, তুমি কেঁদো না সব ঠিক হয়ে যাবে।
 
মা বলল, তুই যদি এই সময় একটা চাকরি পেতিস তাহলে আমার কোনও চিন্তা থাকত না।
 
কিন্তু কে আমাকে চাকরি দেবে? কোথাও আমার জন্যে চাকরি নেই। এখন মনে হয় লেখাপড়া শিখে কী লাভ হলো আমার? উল্টে ক্ষতি হলো আমার। এখন বিএ পাশ করে পরের বারিতে বাসন মাজতে পারব না, রান্নার কাজ করতে পারব না। এখন একটা প্রাইমারি স্কুলে চাকরি পেলে বেঁচে যেতাম। ঘোরাঘুরি তো করছি। দেখা যাক কী হয়। সুমন মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ি আসে। মা সুমনকে খুব ভালোবাসে। সুমনকে আমি চাকরির কথা বলেছি। সুমন আমার জন্যে চেষ্টা করছে।
 
একদিন সুমন এসে মাকে বলল, মাসিমা, একটা কথা বলতে এলাম।
 
মা জিজ্ঞেস করল, কী কথা?
 
—আমি ওকে বিয়ে করতে চাই। আপনার কোনও আপত্তি আছে?
 
মা খুশি হয়ে বলল, আমার কোনও আপত্তি নেই।
 
আমি তা শুনে বললাম, আমার আপত্তি আছে।
 
মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কীসের আপত্তি?
 
বললাম, তুমি একদিন আমার চেয়ে দাদাকে বেশি ভালোবাসতে। সেই দাদা তোমাকে ছেড়ে চলে গেল। এখন আমি চলে গেলে কে তোমাকে দেখবে?
 
সুমন বলল, মাকে নিয়ে তোমার চিন্তা করার দরকার নেই। তোমার মা আমাদের কাছে থাকবেন।
 
মা বলল, আমরা গরিব। তাই বলে জামাইয়ের বাড়িতে থাকা ভালো নয়। এটা অসম্মানের।
 
আমি বললাম, মা ঠিক কথাই বলেছে। তাই মাকে ছেড়ে আমি তোমার ঘর করতে পারব না!
 
সুমন তা শুনে জিজ্ঞেস করল, কবে পারবে?
 
—জানি না। —বলে বললাম, আমাকে একটু ভাবতে দাও।
 
সুমন বলল, ভাবো। যতদিন খুশি ভাবো। আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করব। —বলে সুমন চলে গেল।
 
মা বলল, আমার কথা ভাবতে হবে না। সুমন খুব ভালো ছেলে। ওকে বিয়ে করলে তুই সুখী হবি।
 
আমি তা জানি। কিন্তু মাকে ছেড়ে কী করে যাবো?
 
আমি রোজ একটা করে স্বপ্ন দেখতে লাগলাম।
 
প্রথম স্বপ্ন: মা অসুস্থ হয়ে ঘরে শুয়ে আছে। আমি আর সুমন আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছি।
 
দ্বিতীয় স্বপ্ন: আমি আর সুমন সমুদ্রের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। মা পিছন থেকে ডাকছে, আমাকে ফেলে যাসনে। তোরা ফিরে আয়।
 
তৃতীয় স্বপ্ন: বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে বাবার সঙ্গে দেখা। পাশে সুমন। বাবা আমার মাথায় হাত রেখে বলল, তোরা সুখী হ।
 
আমি তো সুখী হতে চাই। কিন্তু কীভাবে? মা বেঁচে থাকতে আমর কপালে সুখ নেই? মা কবে মারা যাবে?
রমানাথ রায়
স্বাধীনতা পরবর্তি কথাসাহিত্যে পথিকৃৎ। তাঁর অদ্বিতীয় গদ্য স্টাইল পাঠকের কাছে খুব পরিচিত। প্রথম গল্প প্রকাশ ১৯৬২ সালে। সমালোচকেরা তাঁর লেখাকে ব্ল্যাক হিউমার, অ্যাবসার্ড, ম্যাজিক রিয়ালিজম ইত্যাদি আখ্যা দিয়েছেন। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ছবির সঙ্গে দেখা’ -কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম অ্যান্টি নভেল বলা হয়। ষাটের দশকে, প্রচলিত গল্পরীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের প্রবর্তক তিনি। সেই আন্দোলনের অন্যতম বক্তব্য ছিল- বহু ব্যবহারে বাস্তববাদী রীতি জীর্ণ হয়ে গেছে। পরবর্তি কালে একটি প্রবন্ধে রমানাথ লেখেন- এই সময় বাস্তববাদী রীতির চর্চা করা হল নতুন করে ইলেকট্রিক বাল্‌ব আবিষ্কারের চেষ্টা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত