| 15 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-৩১) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায় চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে। নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা।


 

      হিমালয়ে আমার আসাটা সত্যিই ছিল একটা আচম্বিত এবং অভাবনীয় ঘটনা। দিল্লিতে আমরা চিকিৎসা করে থাকা ছয় মাস হয়েছে। রমেন প্রায় পুরোপুরি ভালো। সে হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি ছেড়ে দিয়েছে এবং ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে একটি বড়ো হোটেলের জিমে জয়েন করেছে। জোর জবরদস্তি করে প্রতিদিনই সে আমাকে তার কাছে নিয়ে যায়। তার জন্যই আমিও জিমে ব্যায়াম করা আরম্ভ করলাম, হোটেলের ছোট্ট সুইমিং পুলটাতে সাঁতার কাটতে শিখে ফেললাম। আমার কাউন্সেলার এই সমস্ত কথায় খুব উৎসাহ দেখাল। আমাকে ব্যায়াম, সাঁতার ইত্যাদিতে নিয়ে যাবার জন্য রমেনকে ও প্রশংসা করল।

      ‘ফীসের অর্ধেক আমাকে দিয়ে দেবে,’ রমেন বলল।’ ডাক্তারটা তোকে কী ভালো করবে, আমিই তার চেয়ে বেশি ঠিক করব।’

      কাউন্সেলার আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট সপ্তাহে একবার করে কমিয়ে দিয়েছে। গেলেও বিশেষ কোনো কথা বলে না। নিজের কথাই বেশি বলে।তার শখ হল কাঁটাযুক্ত ক্যাকটাস সংগ্রহ করা এবং পাখি পর্যবেক্ষণ। পাখি পর্যবেক্ষণ মানে দলবল নিয়ে জঙ্গলে গিয়ে বাইনোকুলার দিয়ে পাখি পর্যবেক্ষণ। তিনি আমাকে সেশনগুলোতে এই সমস্ত কথাই বেশি বলেন। আমার কথা দু’একবার জিজ্ঞেস করে পাঠিয়ে দেন।

      ‘সেটাই তো একটা মস্ত ক্রেক। রমেন কথাটা বলায় সে বলল। তোর সঙ্গে দুবার গিয়ে আমি টের পেয়ে গেছি। সে এখন তোকে নিয়ে, তোর পয়সায় নিজের চিকিৎসা নিজে করছে। ব্যাটা জিজ্ঞেস করে কী স্বপ্ন দেখ—শালা বলিস না কেন স্বপ্নে তুই লেংটা একটা মেয়ে নাচতে নাচতে তোর কাছে আসতে দেখেছিস। তোর জায়গায় আমি হলে ভালো হতো, পাগল করে দিতাম। বাদ দে ওটার কাছে যাওয়া ছেড়ে দে।

      একদিন সন্ধ্যাবেলা কাজু কিসমিস এবং ফুলের তোড়া নিয়ে একজন শিখ এসে উপস্থিত হল। সে রমেন সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে চাইল। রমেনের সামনে সে কাকুতি মিনতি করতে লাগল। মস্ত পাঞ্জাবিটা যেন পারলে তার পায়ে হাত দেবে। রমেন তাকে হিসাবপত্র এবং একাউন্টস নিয়ে সকালবেলা আসতে বলে বেশ কঠোরভাবে বিদায় দিল।

      ‘কী ব্যাপার?’ পাঞ্জাবিটা যাওয়ার পরে তাকে জিজ্ঞেস করলাম।

      ‘দিল্লির ঠগ।’রমেন বলল।’অঞ্জুদার এখানে একটা কোম্পানি আছে, ট্রাভেল  এজেন্সি। দুই বছর আগে কিছু ভেবে সস্তায় কিনে নিয়েছিল। এই পাঞ্জাবিটা চালাচ্ছিল। সমস্ত বিক্রি করে শেষ, চেয়ার টেবিল গুলো বিক্রি করাই শুধু বাকি আছে বোধহয়। অঞ্জুদা কাল ফোন করে সবকিছু আমাদের দুজনকে দেখতে বলেছে। আমি তোকে বলব বলব বলে থেকে গেছে। এখন আমাদের এটা নতুন চাকরি বুঝেছিস। দিল্লিওলা ঠগের বুদ্ধির সঙ্গে আমাদের বুদ্ধি এবার তুলনা করে দেখি দাঁড়া। অঞ্জুদার থেকে ফোনে বোধহয় ডোজ পেয়েছে। এসে কাকুতি মিনতি শুরু করেছে।

      কথাটা তখনও আমার মনে কোনো ভাবান্তর ঘটায় নি। ঔষধ আমার চিন্তাভাবনাকে বোধহয় ভোঁতা করে দিয়েছিল। খুব একটা আগ্রহ বোধ করিনি। রমেনের সঙ্গে সঙ্গে ছিলাম মাত্র। পরের দিন দশটার সময় পাঞ্জাবিটা এবং একজন বুড়ো একাউন্টেন্ট মস্ত মস্ত খাতা পত্র নিয়ে এসে হাজির হল। বুড়োটা এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। মানুষটা সন্দেহজনক। ওরা কাগজপত্র বের করে রমেনকে এটা ওটা স্টেটমেন্ট বোঝাতে লাগল। আমি এমনি পাশে বসে রইলাম। রমেন কাগজপত্র দেখার বেশি আগ্রহ না দেখিয়ে সব কিছু রেখে যেতে বলে  মানুষ দুটোকে পরের দিন বিকেলে আসতে বলে দিল।

      ড্ৰইং রুমের টেবিলে স্তূপীকৃত হয়ে থাকা খাতা পত্র গুলি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,’এখন কি করবি?’

      ‘দাঁড়া, কাঁটায় কাঁটা তুলতে হবে। দিল্লি ওয়ালা দিয়ে দিল্লিওয়ালাকে কাবু করতে হবে।’

      পরের দিন সকালে রমেনের সঙ্গে একটা সলিসিটর এবং চার্টার্ড একাউন্টেন্টের অফিসে গেলাম। অঞ্জুদার দিল্লির ফ্ল্যাট কেনার সময় যাবতীয় কাজকর্ম তারাই করেছিল। রমেন ট্রাভেল কোম্পানিটার হিসাবের গোলমাল পরীক্ষা করার জন্য তাদের দায়িত্ব দিল। এবার বিকেলে মানুষ দুটি খাতা পত্র নিয়ে এলে চার্টার্ড একাউন্টেন্টকে জমা দেওয়া হল। তারপর দুটো মানুষ নিয়ে কোম্পানির অফিসে গিয়ে তার কাগজপত্র গুলি বুঝিয়ে দেওয়া হল। পাঞ্জাবি এবং বুড়োর মুখ দুটি দেখার মতো  হয়ে উঠেছিল। ওদের বোধহয় এরকম ঘটতে পারে বলে ধারণাই ছিল না।

      অফিসে পাঞ্জাবিটা বসা  ঘরে রমেন এবং আমি বসার জন্য ব্যবস্থা করতে বলা হল। চা তৈরি করা ছোটো একটি ঘরে তাকে বসতে দেওয়া হল।

      পরের দিন সকাল বেলা অফিসের একটি মেয়ে এসে উপস্থিত হল। কান্নাকাটি করে পাঞ্জাবিটা সম্পর্কে নালিশ জানাল। কীভাবে সে বাবার নামে অন্য একটা এজেন্সি খুলে এখান থেকে ব্যবসা সেখানে নিয়ে যাচ্ছে সেই সমস্ত কিছুই বলল।

      রমেন পাঞ্জাবিটাকে ডেকে নিয়ে বলল,’ আগামীকাল তোর আর আমার জন্য দুটো টিকেট কর। গুয়াহাটিতে তোর আর আমার অঞ্জুদার সঙ্গে দেখা করতে হবে।’

      মস্ত মানুষটা কথাটা শুনেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল– সে এখনই যেতে পারবে না, মায়ের অসুখ, সামনে দাদার বিয়ে ইত্যাদি।

      রমেন নাছোরবান্দা— গুয়াহাটিতে যেতেই হবে।

      অবশেষে সমস্ত হিসেব–নিকেশ চুকিয়ে ফেলার পরে যাওয়াটা ঠিক হল। পাঞ্জাবিটা যেন বেঁচে গেল। সেদিন থেকে সে একেবারে সোজা পথে চলে এল। রমেন বোধহয় তাকে ভয় দেখিয়েছে। সে দুই লাখ টাকা এনে দিল। দুই লাখ টাকা নিয়ে রমেন পাঞ্জাবিটাকে বলল যে হিসেবে এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখ টাকার গন্ডগোল বের হয়েছে। টাকা না পেলে তো কেসটা পুলিশকে দিতেই হবে। কিন্তু রমেন এই ধরনের গন্ডগোলে যেতে চায়না। টাকা পেলেই সে আর কোনো ঝামেলা করবে না। পাঞ্জাবিটা একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ল।

      ‘কত লাখ টাকা সে মেরেছে ঠিক নেই, দুই লাখ যে আদায় করতে পেরেছি সেটা যথেষ্ট। দিল্লিতেও এইভয় কাজ করে দেখতে পেলি তো। ভাগ্য ভালো পাঞ্জাবিটা ভদ্র ঘরের এবং নিঃসঙ্গ ছিল, দলবদলের সঙ্গে থাকলে মুশকিল হয়ে যেত। বুড়ো অ্যাকাউন্টেন্টটা কিন্তু বদমাশ।’

      রমেন কিন্তু বুড়োটাকে রেখে দিল। দুটি স্মার্ট ইংরেজি বলতে পারা মেয়েকে নেওয়া হল। ওদের রমেন স্কার্ট পরিয়ে পুরোনো গ্রাহকদের কাছে পাঠাল। টিকিট দেওয়া এবং পেমেন্ট সংগ্রহ করার জন্য ওদের যেতে হল। হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে ওরা অফিসে অফিসে ঘুরে বেড়াল। এক মাসের মধ্যে বিজনেস বৃদ্ধি পেল।

      কিন্তু চার্টার্ড একাউন্টেন্টের কাছে হিসেব দিতে দিতে আমাদের বুড়ো একাউন্টেন্টের হাইপ্রেশার হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হল।

      একদিন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট অফিস থেকে ফোন করে বলল,’আপনাদের ধরমশালার অফিসের কাগজ এবং হিসেবপত্র পাইনি, তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেবেন।’

      ধরমশালার অফিস? আমরা দুজনেই যেন আকাশ থেকে পড়লাম!

      একাউন্টেন্ট হাসপাতালে, স্টাফদের কেউ কিছু জানে না; বলল যে ট্রেকিং আদির জন্য বুকিং এলে ধর্মশালার কোনো কোম্পানি একটাতে পাঠিয়ে দেয় পাঞ্জাবি। অফিসে তার চেয়ে বেশি কেউ কিছু জানে না। সবাই নতুন। অঞ্জুদা কেনার সময় থাকা সবাইকে পাঞ্জাবি সরিয়ে দিয়েছে। কেবল একাউন্টটেন্ট পুরোনো। হাসপাতালে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করা হল। খবর করার ছলে ফল নিয়ে যাওয়া হল। আমাকে দেখে বুড়োর মুখে হাসি ফুটে উঠলেও তিরতির করা চোখে শংকার ছায়া নেমে এল। কথাবার্তার মধ্যে রমেন ধরমশালার অফিসের কথাটা উত্থাপন করল। বুড়ো বলল যে পাঞ্জাবিটা সেটা মালিক আলাদা কোম্পানি করার জন্য বলেছে বলে কবেই অ্যাকাউন্ট আলাদা করে দিয়েছে। এখানে কোনো রেকর্ড নেই, সমস্ত কিছুই সে নিজে দেখাশোনা করত, আমাদের কিছুই জানাত না।’

      পাঞ্জাবিকে দিল্লিতে খুঁজে পাওয়া গেল না। সে নাকি কানাডায় এমিগ্রেট করবে–তার কাজে সে মুম্বাই গিয়েছে।’আসবে, কানাডায় যাবার আগে সে নিশ্চয় বাড়ি আসবে, তখন আমি তাকে আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলব,’তার বাড়িতে ফোন করায় বাড়ি থেকে তার পিতা জানাল।

      ‘সে আর দিল্লিতে ফিরে আসবে না। মুম্বাই থেকে কানাডায় চলে যাবে। কানাডায় এমিগ্রেট করাটা সে চুপিচুপি কবেই ঠিক করে রেখেছিল,’রমেন বলল। ধরমশালায় কী যে করে রেখে গেছে তা ভগবানই জানে। অফিস টফিস আর নেই বলে মনে হচ্ছে।’

তাই রমেনের নেতৃত্বে আমরা ধরমশালার উদ্দেশ্যে বের হলাম। টয়োটা কোয়ালিশ গাড়িএকটা ভাড়া করে আমরা দুজন, মানে আমি আর রমেন, ভাইটি আর তার একজন বন্ধু, অফিসের পিয়ন যোগসিং সবাই মিলে ধরমশালা অভিযানে বের হলাম। দিল্লি থেকে চন্ডিগড় হয়ে পাঠানকোট, সেখান থেকে ধরমশালা। গিয়ে দেখি ধরমশালায় একটা অফিস আছে, কিন্তু বন্ধ। বিবর্ণ অফিস, বিবর্ণ সাইনবোর্ড, দরজার উপরে পথের ধুলোর গভীর আস্তরণ। পাশেই থাকা অন্য ট্রাভেল এজেন্টের অফিসে খবর করে জানতে পারলাম যে অফিসটা দুই মাস খোলেনি। যে তিব্বতী  ছেলেটি অফিসটা দেখাশুনা করত সে নাকি বহুদিন আসে নি। বাড়ি চলে গেছে।মেকলডগঞ্জে তার বাড়ি। না ,অফিস বিক্রি হওয়ার কথা তারা এখন ও জানতে পারেনি, কেবল বাড়ির মালিক ভাড়া চেয়ে কয়েকবার খোঁজ খবর করেছে।


আরো পড়ুন: অর্থ (পর্ব-৩০) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


      এবার আমরা দ্রুত ম্যাকলডগঞ্জের উদ্দেশ্যে বের হলাম। আঁকাবাঁকা এবং খাড়া পাহাড়িয়া রাস্তা,সাংঘাতিক সংকীর্ণ। দশ কিলোমিটারই অনেক উপরে উঠে যায়। বর্ষার মতো মেঘ এবং ঝিরঝির  বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে আমরা ছোট্ট একটি শহরে পৌঁছালাম। দিয়াশলাই  বাক্সের মতো ছোট্ট একটি শহর। তারই সংকীর্ণ একটি রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকান এবং হোটেল আদির মধ্যখানে চ্যাপ্টা পুরোনো দোতলা একটা ঘরের উপর মহলে আমরা আমাদের অফিসটা খুঁজে বের করলাম। ভাগ্য ভালো অফিসটা খোলা ছিল। সঙ্কীর্ণ সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে গিয়ে দেখি যে অফিসে কেউ নেই। দরজা জানালা খোলা, ফ্রিল দিয়ে সেলাই করা সিন্থেটিক কাপড়ের পর্দা বাতাসে উড়ছে। বিবর্ণ হলেও পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে অফিসটা । দেওয়ালে দুটো পুরোনো হয়ে যাওয়া হিমালয়ের নৈসর্গিক দৃশ্যের বাঁধানো ফোটো, অফিসের টেবিলটির পেছনে দেওয়ালে দালাই লামার হাসিমুখের ফোটো, টেবিলের উপরে দুটো রেজিস্টার খাতা এবং ব্রোসিউর। কিন্তু অফিসটাতে কেউ নেই।

      কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে তিব্বতি পোশাক পরা একটি মেয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এল। আশ্চর্য হওয়ার মতো মেয়েটি প্রথমে আমাদের দিকে তাকাল। টেবিলটার পেছনদিকে গিয়ে বসে কোমল কন্ঠে আমরা কী চাই জিজ্ঞেস করল।

      হুড়মুড় করে ঘরের ভেতর এবার একটি তিব্বতী ছেলে ঢুকে পড়ল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সেও প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকাল।

      আমরা আমাদের পরিচয় দেওয়ার পরে ওদের চোখে প্রথমে অবিশ্বাসের ছায়া নেমে এল। তার পরে ক্রমে ওদের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ছেলে মেয়ে দুটিই একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। না, পাঞ্জাবি চার পাঁচ মাস  আসেইনি, যোগাযোগ করেনি।

‘পাঞ্জাবি আমাদের আমাদের দিক থেকে কোনোরকম যোগাযোগ করতে নিষেধ করেছে,’ছেলেটি বলল।’বহুদিন ধরে তার কোনো খবরা খবর না পাওয়ায় আমি নিজে দিল্লিতে গিয়ে যোগাযোগ করার কথা ভাবছিলাম। আমাদের একটা পিসিওর নাম্বার দেওয়া হয়েছে। সেখানে ফোন করলে ওরা তাকে খবর পাঠায়। তখন সে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু বহুদিন বারবার ফোন করে খবর দেওয়া সত্ত্বেও সে কোনো ফোন করেনি।’

      রমেন জিজ্ঞেস করল,‘কতদিন থেকে এরকম ব্যবস্থা চলছে?’

      ‘৪-৫ মাসের মতো হবে। তার আগে পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কিন্তু চার মাস থেকে যখন বেতন আসা বন্ধ হল, ঘর ভাড়া এল না, তখন একবার ফোন করায় অফিসে থাকা টাকা দিয়ে বেতন নিতে বলল। তারপরে আর কোনো খবরা খবর নেই ।কথাগুলি শোনার পরে আমাদের রাগ হওয়া ছাড়া কোনো কিছু করার ছিল না।

      ‘শালা, ভাগ্য ভালো এই সমস্ত কিছুই বিক্রি করে দিতে পারল না সে,’রমেন অসমিয়াতে অশ্লীলভাবে গালিগালাজ দিল।’এই সমস্ত কিছুই বিক্রি করে দিয়ে কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার মতলব করেছিল পাঞ্জাবি। আমাদের যে সে দুই লাখ টাকা দিয়েছে, সেটাও পার্টি থেকে প্রাপ্য টাকা সেটা তুই জানিস কি? তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিলে বিদেশে যাওয়া হবে না বলে সেই টাকাটা দিয়ে দিয়েছে। সে যে কত টাকা নিয়ে গেছে তার কোনো ঠিক নেই।’

      রমেন এবার হিসেব করে কর্মচারী দুটির বকেয়া বেতনটুকু আদায় করে দিল। বাকি থাকা ঘর ভাড়া দেওয়া হল। অফিসের খরচের টাকাও দেওয়া হল। ওদের দুজনের মুখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অফিসের ঘরটাও বেশ ভালোই। বাইরের ঘরটা অফিস, সেখানে একটা টেবিল, একটা লোহার আলমারি, দুটি চেয়ার এবং একটা সোফা কাম বেড রয়েছে। দ্বিতীয় ঘরটিতে দুটি বিছানা রয়েছে। পেছনের বারান্দায় দুটো কামরা তোলা যাবে। গ্রিল দেওয়া বারান্দাটায় চা-টা করার জন্য একটা টেবিলের ওপরে স্টোভ রাখা আছে। বারান্দার প্রান্তে বাথরুমটা। বিছানা দুটিতে পুরোনো ট্রেকিং সামগ্রী কিছু স্তূপাকারে রাখা আছে।

      ‘একটা সময়ে এটা বড়ো নামকরা কোম্পানি ছিল,’তিব্বতি ছেলেটি বলল। ‘এই অঞ্চলে ট্রেকিং, বিশেষ করে হাই-অলটিটিউড ট্রেকিঙের কাজ এই কোম্পানিটাই শুরু করেছিল। একজন জার্মান সাহেব একজন তিব্বতির সঙ্গে একসঙ্গে কাজটা শুরু করেছিল। পরবর্তীকালে জার্মান সাহেব দেশে চলে যায়। দেশে ফিরে যাবার আগে সাহেব কোম্পানিটা বিক্রি করে দিয়েছিল। বিক্রি হওয়ার পরেও তিব্বতি লোকটিই চালাচ্ছিল। সেই মালিকের কাছ থেকে আপনারা কিনে নিয়েছিলেন। আজ থেকে এক বছর আগে পাঞ্জাবি তিব্বতি লোকটাকে সরিয়ে দিয়েছিল। তখন থেকে আমি দেখাশোনা করি। তিব্বতি যাবার পরে আমি দায়িত্ব নিয়ে অফিস দেখাশোনা করার জন্য এই বোনটিকে আনিয়ে নিই। মেয়েটি আমার খুড়তুতো  বোন। সবকিছু ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু….।’

      ‘কিন্তু কি?’তিব্বতি ছেলেটিকে প্রশ্ন করেছিলাম।

      ‘কিন্তু পাঞ্জাবি উপার্জিত সমস্ত টাকা এখান থেকে নিয়ে যায়। এখানে কোনোরকম খরচই করে না। ট্রেকিংয়ের সরঞ্জাম গুলি, তাঁবুগুলি পুরোনো হয়ে খসে পড়ছিল। সেইসব নতুন করা হলে তবেই মানুষ আসবে। গত সিজনে মাত্র একটি ট্রেকারের দল এসেছিল। এবার তো আসেইনি।’

      ‘এখন সব ঠিকঠাক করে নেওয়া যাবে কি?’ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম।

      ‘কেন করা যাবে না। এখনও যাবে। কিছু সরঞ্জাম কিনতে হবে। ট্রেভেল এজেন্ট গুলির সঙ্গে বুকিং এর বন্দোবস্ত করতে হবে। সবই তো কমিশনের কথা। একটু বাড়িয়ে দিতে হবে। জার্মান সাহেবের নামেই এখনও কোম্পানি সুন্দর চলবে। বেস ক্যাম্পে নিজের ঘরথাকা কোম্পানি খুব কমই আছে।’

      ‘হাই- অলটিটিউড ট্রেকিং যে জায়গা থেকে আরম্ভ করা হয়, সেটাই বেস কেম্প। সেখানে আমাদের নিজেদের একটা ঘর আছে না! ভাড়া ঘর নয়, নিজেদের ঘর। জার্মান সাহেবটি  বেশিরভাগ সময় সেখানেই থাকত। কাল আপনাকে নিয়ে গিয়ে দেখি আনব।’

সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা ছোটো শহরটা বেশ ভালোভাবে ঘুরে বেড়ালাম।

      অফিসটার কাছেই একটা হোটেলে আমরা প্রত্যেকেই রাত কাটালাম। ছোটো শহরটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষে পরিপূর্ণ। দালাইলামার তিব্বতিয় সরকার হল এক্সাইলো এই শহরেই রয়েছে। শত শত তিব্বতি (বৌদ্ধ) ভিক্ষু এবং ভিক্ষুণী,লামা এবং শরণার্থীতে পরিপূর্ণ এই শহর। সবকিছু মিলে চারপাশে এক অপরিচিত অথচ আকর্ষণীয় আন্তর্জাতিক পরিবেশ। আজ এই সমস্ত কিছুর তলে তোলে এক অদৃশ্য বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মতো স্বাধীন তিব্বতের আন্দোলনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। শহরটির দেওয়ালে মেরে যাওয়া পোস্টার, দেওয়াল লিখন, দোকানের আয়নায় প্রচারপত্র সবকিছুই এই অন্তসলিলা উত্তেজনার আভাস দেয়।

      মেকলডগঞ্জে আসা এবং সেখান থেকে বেস কেম্পে যাওয়ার সময় আমি প্রথমবারের জন্য এত কাছ থেকে হিমালয় পর্বতমালাকে দেখলাম। দেখলাম সুউচ্চ ধৌলধার পর্বতমালার মেটে কাজল রঙের শৃঙ্গ শীর্ষ, তুলোর মতো কোমল মেঘের আসা-যাওয়া, শিবালিক পর্বতমালার অভিনব রূপ; দেখলাম দালাই লামার বিহার, ভিক্ষু ভিক্ষুণীৰ দল। নিজের অজান্তেই মনটা একেবারে ভরে উঠল। অনুভব করলাম যেন এক গভীর প্রশান্তি। সন্ধ্যা লগ্নে দালাই লামার বিহারেৰ প্রার্থনার ঘন্টা ধ্বনি যখন শুনলাম, চোখ দুটি নিজের অজান্তেই বন্ধ হয়ে এল।

      ব্যবসায় স্থায়ী অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা করা হল। তিব্বতি যুবকটির পরামর্শ মতে ধরমশলার অফিস বন্ধ করে দেওয়া হল। সেই অফিসের বিশেষ কোনো কাজ নেই। মেকলড গঞ্জের অফিসটাকে মূল করে রাখার সিদ্ধান্ত হল। এই অফিস এবং বেস কেম্পের লগ কেবিনটা থাকবে। দুটোকেই সাজিয়ে গুছিয়ে নতুন করে তোলা হবে। অঞ্জুদা ফোনে সম্মতি দিল,’ যা ভালো বুঝিস তোরা কর। মোটকথা যেন বন্ধ হয়ে না যায়, লোকসান না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে।’ আমরা ফিরে গিয়ে আবার ফিরে আসব। অফিস- টফিস ভালোভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে ঠিকঠাক করে নেব। সমস্ত যোগাযোগ গুলি রক্ষা করতে হবে, এবার সিজনটাতে যেন ভালো ব্যাবসা পাওয়া যায় তার জন্য কমিশন-টমিশন ঠিক করে সবার সঙ্গে যোগাযোগ গুলি ঠিক করতে হবে। তিব্বতি ছেলেটি কথাগুলি শুনে খুব খুশি হল, মেয়েটি ও খুশি হল। নতুন কিছুর প্রত্যাশায় ওদের মুখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ছেলেটির নাম ছিল গ্যাটশ্ব। নাম নয় উপাধি।

      এই ধরনের আলোচনা চলার সময় হঠাৎ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল,’ আমি এখানে কিছুদিন থাকব। এই অফিসটার কাজকর্ম গুলি নিজে দেখি।’

      ‘এটাতো একটা সিজনেল কারবার,’ রমেন বলল। ‘এখন তো সিজন নয়, শুরু হবে মাত্র।’

      ‘সিজনটা আরম্ভ হওয়ার আগে থেকে আমাৰ থাকাটা ভালো হবে। কাজগুলিও নিজে থেকে, দেখে শুনে শিখে নেওয়া ভালো। অফ সিজনে দিল্লি চলে যাব।’

      ‘তাও আবার হয় নাকি । এভাবে থাকলে তো ভালোই হয় ,’ রমেন স্বীকার করল। ‘ কিন্তু পারবি কি?’

      ভাইটিও আমি একা থাকায় আপত্তি করল। তাকে ধমক দিয়ে চুপ করালাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, বুকের ভেতরে অনুভব করছিলাম, হিমালয় আমাকে ডাকছে। হিমালয় ছেড়ে আমি সহজে চলে যেতে পারব না। দিয়াশলাই বাক্সটার সমান এই ছোট্ট শহরটি আমাকে বেঁধে রাখতে চাইছে…  …’

      ‘ থাকতে চাস যদি থাক,’ রমেন আমাকে সম্মতি দিল। বিরক্তি না লাগা পর্যন্ত দু মাস থেকে দেখ। মেম টেমপ্রচুর আছে এখানে, আর আমাদের অফিসে কাজ করা গ্যাটশ্বরের বোনটাকেও দেখতে ভালোই…  …’




 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত