রাণীয়া

ধারাবাহিক: রাণীয়ার রান্নাঘর (পর্ব-১) । ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

Reading Time: 7 minutes
 

উথলে উঠল টোম্যাটো স্যুপ

রাণীয়া গ্যাস আভেন অন করে স্যস প্যানে স্যুপের জল বসালো। টোম্যাটো স্যুপের প্যাকেট কেটে নিল। সাধারণতঃ সে ফ্রেশ ট্যোম্যাটো ব্লাঞ্চ করে টোম্যাটোর  লাল টুকটুকে পাতলা খোসাটা ছাড়িয়ে নেয়। তারপর গ্রাইন্ডারে পিউরি করে নিয়ে স্যুপ বানায় কিন্তু আজ এমারজেন্সি। সময় কম। কুশলের দিনকয়েক সোর থ্রোট। অফিসের মিটিঙয়ে বকবক করতে করতে শুকনো কাশির জেরে জেরবার কুশল। বর্ষার ভেজা ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে সন্ধে। দিন কয়েক ধরে ডালাসে টুপটাপ, ঝিরিঝিরি বর্ষণ চলছে। বৃষ্টির বিরাম নেই। ছিটেফোঁটা হয়েই চলেছে একনাগাড়ে। পার্কিং লটে গাড়িতে ওঠা নামাতেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় বসেছে দিন কয়েক। রাণীয়া কে স্যুপ বানাতে দেখে কুশল বেশ উৎফুল্ল হয়ে বলল, ঠিক এটাই বডি চাইছিল রে। তুই কী করে জানতে পারিস সব?

রাণীয়া বেশ কনফিডেন্টলি বলল, জানতে হয়, নইলে সুগিন্নী হওয়া যায়না। বুঝলি? এবার গিয়ে বোস দিকিনি টেবিলে। আমার টোম্যাটো স্যুপের পার্সোনাল টাচগুলো এক এক করে দিতে দে  দিকিনি। এ তো আর সেই ভারতীয় রেলের গতানুগতিক টোম্যাটো স্যুপ নয়। যুগ যুগ ধরে সে স্যুপের স্বাদ একরকমই থেকে গেল। কথা বলিস না এখন। বকবক করলে ভুলে যাব তো। সুস্বাদু রান্নার স্বাদের মূলে রাঁধুনির কনসেন্ট্রেশন আর মেজারমেন্টই আসল। বুঝেছিস?

আরে কথা তো তুইই বলছিস। কুশল বলে শ্লেষ্মা বিজড়িত ধরা ধরা গলায়।

ওদিকে দুজনের স্যুপের জন্য মেপে নেওয়া দেড় বাটি জল ফুটছে। এদিকে আধ কাপ জলে আধ প্যাকেট স্যুপ পাউডার, এক চিমটে নুন গুলে রাখে রাণীয়া। ধোয়া মোছা কিচেন স্ল্যাবের ওপরে ফ্রেশ ব্ল্যাক পেপার ক্রাশার রাখে। কাঠের চপিং বোর্ডের ওপরে দু’ কোয়া গ্রেট করা রসুন, একটা কুচোনো কাঁচালঙ্কা, এক মুঠো ধনেপাতা আর দু চামচ পেঁয়াজ পাতা ফাইন করে কুচিয়ে সব নিজের মনে রেডি করে নেয়। জুলিয়েন করে কেটে নেয় আদা। ঝিরিঝিরি জিঞ্জার জুলিয়েন স্যুপের প্রতি গরাসে গলায় গেলে ঠিক কমে যাবে কুশলের থ্রোট সোর।

রাণীয়ার গোছানো রান্নাঘরের তাকবাক দেখে কুশল বলে পাতি টোম্যাটো স্যুপের মধ্যে আর কী কী পড়বে এবার?

রাণীয়া বলে কী হবে তোর এসব রেসিপি জেনে? জন্মে বানাবি ? তবু যদি আমায় বানিয়ে খাওয়াতিস একদিন!
কেন? আমি কী রাঁধতে পারিনা? তুই যেদিনই বলবি সেদিনই কিছু একটা বানিয়ে দেব তোর জন্য। কুশল বলে। তুই রাঁধতে পছন্দ করিস তাই আমি কিচেনে ঢুকিনা…

রাণীয়া বলে, থাক অনেক রেঁধেছিস। একটা আইটেম বানাতে গিয়ে তো কিছুই খুঁজে পাস না তুই। তারপর চারটে আলো জ্বালাবি, দুটো আঙুল কাটবি, তিনটে আঙুল পোড়াবি আর তারপর ওপার থেকে তোর মাতৃদেবী হাহুতাশ করে বলবেন, আহারে! বাছারে!  আমার ছেলেটা সারাটা জীবন হস্টেলের খাবার খেলো। তারপর কিছুদিন বিদেশে একলাটি রেঁধে খেলো। বিয়ে দিয়েও শান্তি নেই। পড়াশোনা, চাকরী সব সামলিয়ে আবার রান্নাও করবে সে? তার বউ নাকি রাঁধিয়ে তবুও আমার ছেলেটা এখনও হাত পুড়িয়েই খায়।

কুশল বলে, তোর সব ভালো। শুধু কথায় কথায় আমার মা’কে আবার টানছিস কেন এর মধ্যে? স্যুপের মধ্যে কী কী দিলি বল। অসাম টেস্ট হবে জানি। তাও জিগেস করছি।
কী আবার দেব? ফুটন্ত জলে সব মিশিয়ে ফুটিয়ে স্টার করতে করতে থিক কন্সিস্ট্যান্সি হলেই  নামিয়ে নিয়েই একটা ছোট্ট বাটার কিউব আর যদি বলিস একটু গ্রেটেড চিজ কিম্বা গারণিশিং এর জন্য সামান্য ফ্রেশ ক্রিমের আলপনা এঁকে দিতেই পারি তোর জন্য।

কুশল বলল, তুই পারিস বটে! আর তুই এত পারিস বলেই তো আমি রান্নাঘরের দিকেই যাই না। এই বলে ফ্রিজ থেকে দু স্লাইস ব্রেড বের করে নেয় সে। এবার মাখন লাগিয়ে ননস্টিক প্যানে বসিয়ে দেয় সিম করে। দু’পিঠ কড়কড়ে ভাজা হলেই টুকরো করে নেবে ছুরি দিয়ে। ছুরি নামায় ঝোলানো আংটা থেকে। কোনও অনুষ্ঠানের ত্রুটি হবেনা রাণীয়ার কিচেনে। সব মজুত রান্নাঘরে। হাতের কাছে সবকিছু সামগ্রী মজুত না থাকলে রান্নার তরিবত হয়না। এসব শেখা তার মা অনসূয়া আর দিদা প্রতিভার কাছে।

রাণীয়া অমনি বলে ওঠে, মশাই, ক্রাউটন ওভাবে বানায় না। আগে পাউরুটি টুকরো করে নিতে হয়। তারপর প্যান গ্রিজ করে সিম করে সেঁকতে হয় মুচমুচে করে। টোস্ট করা পাউরুটি কাটতে গেলেই লস। সব গুঁড়ো হয়ে যাবে যে! ডাইনিং টেবিলে দেখ। কাচের বোলে ক্রাউটন রেডি করা আছে।
কুশল ভাবে মায়ের নাম করেছে বলে বউয়ের বিরুদ্ধে ছোট্ট অ্যালিগেশন আনলেও সে ব্যাপারে বুদ্ধিমতী বৌ আর কথা বাড়ায় নি। এই হল রাণীয়া। সব্বার চেয়ে আলাদা। গায়ে মাখেনা কোনো কথা।

রান্নার সিরিয়াস মুহূর্তে আদরের তুই থেকে তার থেকে মাত্র একবছরের বড় বর মধ্যমপুরুষ হয়ে ওঠে। মাথা ঠাণ্ডা হলেই আবারও যে কে সেই।
কুশল রাণীয়ার পেছনে দাঁড়িয়ে বউয়ের ঘাড়ে চকাস করে একটা চুমু খেয়ে ফেলে। বড় ভালো বউটা। ভীষণ গোছালো। বড় ভালো রান্না করে।
স্যুপে চুমুক দিতেই মাথা ঠাণ্ডা হয়ে যায় আরো। গরম হয়ে ওঠে গলার ভেতরটা। সেইসঙ্গে সারা শরীর। আসলে কুশল ছেলেটার মধ্যে একটা সোবারনেস আছে সেটায় মাঝেমাঝে রাণীয়া মোহিত হয়ে যায়। কী সুন্দর শাশুড়ি প্রসঙ্গটা তখনকার মত ঘুরিয়ে নিয়ে রাণীয়ার কোর্টে খুব ধীরে বলটা ঠেলে দিল সে।
রাণীয়া সেই বল আর ফেরত দিল না কুশল কে।
কুশল-রাণীয়ার ঝগড়াগুলো এভাবেই খেই হারায়। নিমেষের মধ্যেই কৌরবপক্ষ থেকে পান্ডবপক্ষে চলে যায় দুজনে। ভাবতে ভাবতেই সেই ধূমায়িত ট্যোম্যাটো স্যুপে চুমুক দেয় কুশল। এই ট্যাঙ্গি ফ্লেবারটা কীসের? বলবি?
রাণীয়া বলে সব টিপস শেয়ার করতে নেই। ওটা শেফ’স স্পেশ্যাল… আ হিন্ট অফ …
কুশল অমনি বলে… পেপসির অ্যাড থেকে ঝেড়েছিস তো? আ হিন্ট অফ লাইম। হুইচ ইজ মাস্ট ইন মশালা পেপসি। কী রে ঠিক তো?

এইজন্যই তো তোর কথায় কথায় গলা ব্যাথা হয়। অফিসের পেপসি ভেন্ডিং মেশিনে দিনে ক’বার খাওয়া হয় এই অখাদ্য সফট ড্রিংক্স গুলো?
কুশল বলে না, রে। খাইনা তো। যা জঘন্য ওয়েদার চলছে…

কুশলের কথাটা শেষ না করেই খেতে খেতে রাণীয়া বলল, জানিস? একটা দারুণ বই পেয়ে গেলাম অনলাইন। অর্ডার করে দিলাম। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে, আই মিন রবিঠাকুরের নিজের ভাইঝি প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর রান্না নিয়ে।
কুশল বলল, তো? কী আছে সেই বইতে? তুই আরও রান্না শিখবি? যেগুলো শিখেছিস সেগুলোয় হচ্ছেনা?
রাণীয়া বলল, মানে? তুই তো জানিস আমার এসব প্যাশন।
কুশল বলল, জাস্ট জোকিং। ভাগ্যি রাণীয়া ছিল আমার পাশে। তোর দিদির মত কেস হলে তো জন্ডিস এক্কেবারে। সত্যিই ! তোরা দুই বোন পোলস অ্যাপার্ট মানে যাকে বলে দুই মেরুতে একদম। তুই রান্নাঘর অন্তপ্রাণ আর তোর দিদির যত্ত গণ্ডগোল সেখানেই ।
রাণীয়া বলল, হ্যাঁ রে। দিদি ছোটো থেকেই অমন। বাড়িতে কেউ এলে মা এক কাপ চা বা কফি করে দিতে বললে তার মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ত। দিদির বিয়ে হয়েছিল এই শর্তে। রান্নাবান্না জানেনা অতএব তাই নিয়ে যেন শ্বশুরবাড়িতে কোনওদিন জোরাজুরি যেন না হয়। সেই শুনে মা বলেছিল রান্নার লোক না এলে সেদিন কী খাবি?
জানিস? সেদিন মায়ের মুখের ওপর রাণীয়ার দিদি সপাটে বলেছিল, হোম ডেলিভারি খাবে সে।
চাকরীবাকরি করা মেয়ের সিলভার টনিকের জোর আছে। আর দিদি আর শৈবালদার আন্ডারস্ট্যান্ডিং খুব ভালো তাই শ্বশুরবাড়ি সেই শুনে আর কথা বাড়ায় নি। মুশকিল হল অন্য শহরে গিয়ে। শৈবাল দা ট্রান্সফার হল ব্যাঙ্গালোর। আই টি জবে খুব প্রসপেক্ট। শ্বশুরবাড়িকে ক্যাঁচকলা দেখিয়ে উড়ে গিয়ে সংসার পাতলো দিদি আর শৈবাল দা। সেখানে কী আর চাকরীর অভাব? দিদির মত প্রমিসিং ইঞ্জিনিয়রকে লুফে নিল এক আইটি কম্পানি। রান্না নিয়ে কেউ আর দিদির কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করবে না। সেটাই রক্ষে।

মা ভাবলেন, ঠাকুর মুখ তুলে চেয়েছেন। বেঁচে গেল আমার দিদিটা।

 
বৌ রাঁধেনা, রাঁধতে পারেনা, রাঁধাবাড়ায় কোনও ইন্টারেস্টও নেই তার। শুধু সাজগোজ, কাজ আর কাজ সর্বস্ব সে। অফিস ছাড়া কিস্যু বোঝেনা। বাড়িটা তার হোটেলের মত। বাড়ি এসে সে কেবল খায় আর ঘুমোয়। কাপড়চোপড় কাচানো, ইস্ত্রী করানো সব রেডি। রাঁধাবাড়া সব রেডি। এসব হোম ম্যানেজমেন্ট করছে সে মেয়ের শাশুড়ি আর তিনি রোজ সেজেগুজে বাড়া ভাতে বসবেন দুবেলা। বিয়ের আগে বলেকয়ে নিলে কী হবে? শ্বশুরবাড়ি কী আর বাপের বাড়ি? সেখানে কী মায়ের মত কেউ মেনে নেবে? কেউ রেয়াত করবে না। বলাই বাহুল্য যতদিন মিঠি আর শৈবাল কলকাতায় ছিল এই ছিল তার শ্বশুরবাড়ির রোজনামচা।

রাণীয়ার দিদি মিঠির শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কথাগুলো যে এক্কেবারে ভুল তা নয়। সবার দ্বারা সবকিছু হয়না। তবে দিনের পর দিন রেকর্ড প্লেয়ারের মত শাশুড়ির মুখে এহেন কর্কশ কথাবার্তা শুনতেও ভালো লাগত না মিঠির। অতঃপর একদিন তো ঈশ্বর মুখ তুলে চাইলেন। কোলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোরে যাবার খবর টা এল হঠাত করেই। বাঁচলো সে যাত্রায় মিঠি। কেবল মুখ ভার হল শৈবালের মায়ের মানে মিঠির শাশুড়ির। বাঁচলেন যেন মিঠির মা অনসূয়া।
মেয়ে ডাল-ভাত রাঁধেনা এমনকি সেদ্ধভাতও করবে না বাড়িতে এমারজেন্সি অ্যারাইজ করলেও। সেটাও তাঁর মত সুরাঁধিয়ের কাছেও বেশ ডিস্টারবিং অ্যাট দ্যা সেম টাইম হিউমিলিয়েটিং ব্যাপার ছিল বৈকি। কিন্তু কী আর করবেন তিনি? জামাই শৈবাল কে নিয়ে তো মেয়ে বা তার বাড়ির লোকজনের কোনও প্রব্লেমই নেই। বরং ওদের নিজেদের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং ফাটাফাটি।  সেটাতেই বুঝি আরও গাত্রদাহ হয় শৈবালের মায়ের। তাঁর অভিযোগ ছেলেটা কেন মুখ ফুটে বউকে রান্নাঘরে ঢুকতে বাধ্য করছে না?

শৈবাল একদিন বলেই ফেলেছিল তার মা’কে, “তোমার প্রবলেম টা কোথায় বলতো মা? মিঠি রান্নাঘরে যায়না ? না কী আমি মিঠির বিরুদ্ধে তা নিয়ে কোনও অভিযোগ জানাই না?”
ওর মা আরও রেগে গিয়ে বলেছিলেন, দুটোই। তুই তোর মা কে দেখিস নি বুঝি?

তবে অনসূয়ার মা প্রতিভা মানে রাণীয়া-মিঠির দিদা নিজেই তো বলতেন, এক চাঁদ ঠিক থাকলে শত তারাতেও কিছু করতে পারে না। ভাগ্য করে নাকি দুটো জামাই পেয়েছেন অনসূয়া। এইজন্যেই বলে দশপুত্র সমকন্যা যদি পাত্রস্থ হয়।
অনসূয়া অবিশ্যি এসব সেকেলে প্রবাদ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে তাঁর মা’কে এখন বলেন, “না, মা। বল যদি মেয়েরা ঠিকমত সুপাত্রস্থ হয়।”  

অনসূয়ার গম্ভীর স্বামীও এসব শুনে মাঝেমধ্যে দু একটা ফোড়ন কাটেন বৈকি। বলাই বাহুল্য সংসারে এসব পাঁচফোড়ন অগ্নিতে ঘৃতাহুতি সম।
দুই মেয়ে অন্তপ্রাণ ভদ্রলোক বলেন, পাত্রস্থ মানে? ওরা কী ফুটো পাত্র না কী তলাপাত্র? ওরা শৌখিন সুরাপাত্রের মত। যত্নে তুলে রাখতে হয় শোকেসে। আমার মেয়েরা কী ফ্যালনা? ওরা নিজেরাই তো নিজেদের গ্রেসফুলি ক্যারি করতে শিখেছে। জামশেদপুরে কনভেন্টে পড়েছে। সেই সঙ্গে বাংলা বলতে ও পড়তে শিখিয়েছি। ওদের গ্রুমিং, আপব্রিংগিং, ভ্যালুজ আজকালকার মেয়েদের মত নয়। নেহাত দুটো ভালো সম্বন্ধ এসে গেল। নয়ত আমার রাণীয়া একটা সোনার বাটি আর মিঠি হল রূপোর ঘটি। তারা কী ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল যে পাত্রস্থ না হলে আমাদের মাথা কাটা যাচ্ছিল। না কী গলায় বিঁধছিল? জামশেদপুরের সব ক্লাবে যেত আমাদের সঙ্গে। কত স্মার্ট ওরা অথচ কথাবার্তায় চালচলনে পুরো বাঙালি ওরা। বড় বড় সব অফিসারদের ছেলের বাপমায়েরা যেচে সম্বন্ধের প্রস্তাব দিত। তাড়াতাড়ি বিয়ে না দিলে ওদের কেরিয়ারে আরও উন্নতি হতে পারত ।
কথার পিঠে কথা চলতেই থাকে।
অনসূয়া ছেড়ে দেবার পাত্রী নন মোটেও ।
বাপরে! এমন ভাব করছো যেন তোমার মেয়েরা তোমার একারই সম্পত্তি। তাদের কী আমি ঘটি বাটি না বলে পিকদানি বলেছি? তারা আমার কাছেও পুজোর জন্য যত্নে তুলে রাখা রাজকীয় পুষ্পপাত্রের মতই। আফটার অল আমি ওদের দশ মাস দশ দিন পেটে ধরেছি।
ভদ্রলোক মানে তপন বাবু চিরকালই একটু কাঠখোট্টা গোছের। পষ্টাপষ্টি কথা বলেন সবসময়ই। বললেন, মেয়েদের পাত্রস্থ বলে লোকে কিন্তু ছেলেদের পাত্রীস্থ বলেনা তো কখনও। আমাদের দুই জামাই দুই রত্ন মানছি আমি। কিন্তু তারাও তো অমন দুটি পাত্রী পেয়ে বর্তে গেছে তাই নয় কী? দুটো বিয়ে দিয়ে আমরা দু-পক্ষই জিতেছি। তবে পাত্রপক্ষ একটু বেশী জিতেছে আমার দুই মেয়েকে পেয়ে। সে তুমি যাই বল।

অনসূয়া বলেছিলেন, সব ক্রেডিট তোমার তাই তো? ওদের যা কিছু ভালো তার মূলে তুমি। সারাজীবন শুধু স্টীল সিটিতে থেকে লোহালক্কড়, আয়রন ওর, স্ল্যাগ, বার অ্যান্ড রড মিল, হট স্ট্রিপ মিল এ দিন কাটালে। ফার্নেসের আগুণে পুড়ে নিজের রঙটা তামাটে করলে। তুমি আর কী বুঝবে মেয়ে মানুষ করার পেছনে মায়েদের কী অবদান?

ভদ্রলোক বললেন, কেন আমি ওদের হাতে ভালো ভালো বাংলা গল্পের বই তুলে দিই নি? কলকাতা বইমেলা গিয়ে ভালো ভালো গল্পের বই কিনে এনে পড়াই নি? বিয়ের পরে তুমি কী বলেছিলে মনে নেই?
“আমায় কী তবে সারাটা জীবন এই অবাঙালী বিহারীদের সঙ্গে জীবন কাটাতে হবে এই জামশেদপুরে? হিন্দি বলতে হবে? আমাদের ছেলেপুলেরা বাংলা শিখবে না তবে ?” সেই ভয়টা আমায় আচ্ছন্ন করে রাখত। তাই ওদের বাংলা শেখার ওপর জোর দিয়েছিলাম আমি।

অনসূয়া বলেছিলেন, সেটা মানছি তবে তুমি বাদবাকি যা সব বললে মানে মেয়েদের বিয়ে এসব নিয়ে সেগুলো ঠিক নয়। আর রাখো তো মেয়েদের কেরিয়ার। মেয়েদের জীবনের পূর্ণতা আসে বিয়ে, সংসার আর মাতৃত্বে। সেই সঙ্গে চাকরী, কেরিয়ার হোকনা। আপত্তি নেই। তাই বলে সারাজীবন কী আর মা, বাবার আঁচলের নীচে থাকবে তারা না কী মা বাবা কে আগলে নিয়ে বসে থাকবে? তাদের নিজেদের জীবন, শখ আহ্লাদ আর সবচাইতে বড় কথা হল ওদের জীবনের একটা সময়ের পর বন্ধু বল বা লাইফ পার্টনার তার দরকার নেই বুঝি? সন্তান এলে তো কথাই নেই। এই তোমার আদরে আদরে মিঠি এত প্যাম্পারড।রান্নাঘরে ঢোকার জন্য যাবতীয় ঝামেলা তার শাশুড়ির সঙ্গে। রাণীয়া কিন্তু একদম আমার কার্বন কপি হয়েছে। সে তুমি যাই বলো।
মিঠি তবে আমার মত। ইঞ্জিনিয়র হয়েছে। তপন বাবু বলে উঠলেন।
অনসূয়া বললেন, তা বটে। বাবার মেয়ে বাবার মতই এক কাপ চা করে খাওয়ায় নি কোনোদিন আমায়।  

সে যাত্রায় এই ঝগড়ায় ছেদ পড়েছিল। মিঠির ফোন আসায়। আর বাড়ে নি অনসূয়া আর তপন বাবুর তরজা। নয়ত চলতেই থাকত তেঁতুল তলার বৃষ্টির মত। সারাদিন ধরে ঝিরিঝিরি, টুপটাপ । তবে কিছুপরেই ঝগড়ার তাল কেটে সব মিটে গিয়ে দুজনের ভাবটুকুনিও দেখবার মত। তার সম্পূর্ণ ক্রেডিট অবিশ্যি অনসূয়ার হাতের খেল। তাঁর শ্বশুরবাড়িতে খুব সুনাম রান্নার জন্য। কলকাতা থেকে স্টিল সিটি জামশেদপুরে প্রায়শই লোকজন আসা লেগেই থাকত। বলা নেই কওয়া নেই। কোলকাতার কাছেই বলে হয়ত। ট্রেন থেকে এক গাড়ী লোক এসে নামত। এতে অনসূয়া বিরক্ত হতেন না মোটেও। বরং পঞ্চ ব্যঞ্জন রেঁধে খাইয়ে তাদের ট্রেনে তুলে দিয়ে এসে শান্তি হত তাঁর। এইজন্যেই বুঝি শ্বশুরকুলে তাঁর সুনাম রন্ধনে দ্রৌপদী বলে।
ছোটো মেয়ে রাণীয়া একদম তার মায়ের মত হয়েছে, সবাই বলে। শুধু তার শাশুড়ি ছাড়া। কুশলের মা আরেক জিনিষ। তিনিও শৈবালের মায়ের মতোই। ভাঙেন তবু মচকান না। অনসূয়া এই নিয়ে একেক সময় ভবেন একলাটি বসে বসে। দুই মেয়েরই এত গুণ তবু ওদের শাশুড়ি ভাগ্যে কেউ যেন ঘটি ঘটি কাদাজল ঢেলে দিয়েছে। তারপরেই ভাবেন, সব কী আর মনের মত হয়?

বড় মেয়ে মিঠির নাহয় কর্পোরেট কেরিয়ার। সে রান্নাবান্না জানেনা, জানতেও চায়না। কিন্তু রাণীয়া? সে তো আপ্রাণ চেষ্টা করেছে শাশুড়ির মন যুগিয়ে চলার। 

ক্রমশ…