| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: রাধাচূড়া আর বটের গল্প । দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

ওরা এখানে মাঝে মাঝেই আসতো। সেই ছেলেটি আর মেয়েটি। কখনো একসঙ্গে আসতো, কখনো একজন এসে আরেকজনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতো। কী অস্থিরতা ফুটে উঠতো তখন ওদের চোখে মুখে। বারবার পার্কের গেটের দিকে তাকিয়ে থাকা। কী এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠা। আর দেখা পেলে সেই মুহূর্তটায় চোখে বিদ্যুতের ঝিলিক। ঠোঁটে হাসির ঝর্ণা। প্রেম নাকি এরকমই। 


প্রেম সবাইকে সুন্দর করে তোলে শুধু একে অন্যের চোখে নয় , প্রেমে পৃথিবীটাকেও নতুন করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। নিজেকে নিজের থেকেও বিরাট মাপের মনে হয়, মনে হয় সারা পৃথিবীর ঐশ্বর্য আমার হাতের মুঠোয়। মনে হয় আমি পৃথিবীর সমস্ত নিরন্ন ভিখিরীদের পাত পেড়ে খাওয়ানোর মতো বড়লোক। আমি জানি। কারণ আমিও তো একজন কে খুব ভালোবাসি। দূর থেকে তাকে দেখি। জানি যে তার কাছে হয়তো কোনোদিন আমার যাওয়া হবে না। তবুও ভালোবাসা তো ভালোবাসাই। একতরফা হলেও। 

ওদের দেখে তবে আমার কখনো হিংসে হয় না। আহা কী সুন্দর জুটি। এর চোখে যেন ওর ভালোবাসার কাজল। মেয়েটি কখনো কখনো ছেলেটির জন্য খাবার নিয়ে আসে। দুজনে একসঙ্গে বসে খায়। ছেলেটি কখনো কখনো টিফিনবাক্সে মেয়েটির জন্য রুটি তরকারি নিয়ে আসে। একে , অন্যকে খাইয়ে দেয় ওরা। দেখে আমার নয়নসুখ হয়। 

এখানেই তো প্রথম ছেলেটি মেয়েটিকেভালোবাসিবলেছিলো। মেয়েটি গলে গিয়েছিলো আলিঙ্গনে। এখানেই তো প্রথম এক শীত রোদ্দুরের সকালে ছেলেটি মেয়েটির ঠোঁটে এঁকে দিয়েছিলো চুম্বনচিহ্ন। দুগালে দুটি হাত রেখে ঈষৎ তুলে ধরেছিলো মুখটা , চোখ বন্ধ করেছিল আবেশে।কেউ দেখে ফেলবেমেয়েটি বলেছিলো ফিসফিসিয়ে।

এখানে এখন কেউ নেই। এই বুড়ো বটগাছ আর পাখপাখালি ছাড়াছেলেটি বলেছিলো হেসে।

আমি নাকি বুড়ো। তা হতেও পারে। তবে মনে মনে আমি ছিলাম তরুণ। তাই তো রাধাচূড়া গাছটাকে দূর থেকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। 

কিন্তু নিজের ছায়াটুকুকে অতিক্রম করে আমি যেতে পারি না কোথাও।
আমার শাখায় শাখায় কত পাখি আমার কানে কানে বলতো রাধাচূড়ার রূপের কথা। কেউ বলতো সে খুব অহংকারী , কেউ বলতো– “অমন সুন্দরী এই বাগানে একজনও নেই। অহংকার হবেই তো।” 


কেউ বলতো -“যাই বলিস রাধার মনটা কিন্তু খুব ভালো, আমাদের এই বটু দাদার মতোই। কত পাখি , কাঠবেড়ালী কে যে আশ্রয় দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।” 


আমি তবে কিছু বলতে পারতাম না , যা বলতাম মনে মনে। আমার মনের কথা হাওয়ার তরঙ্গে ভেসে ওর কাছে নিশ্চয়ই পৌঁছতো। খুব কম কথা বলতো অবশ্য। দুটো একটা কথারই উত্তর পেতাম। উত্তর না পেলে আমার খুব মন খারাপ হতো। 


ভাবতাম আমাদের ভালোবাসাটা ওই ছেলেটার ওই মেয়েটার মতো কেন নয়। 

ভাবতাম ওরা কীরকম একে অন্যের মনের কথা বোঝে। বেশিরভাগ সময়েই যে ওরা খুব কথা বলে তা তো নয়। মেয়েটা কেমন ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে -” আজ খাওয়া হয়নি না ? কী হয়েছে বলতো ? বাবা আবার কিছু বলেছে ? দাদা কিছু বলেছে ?”


ছেলেটা কেমন মেয়েটার গলার স্বর শুনেই বুঝতে পারে মনখারাপ।

তাই আমার বেশ রাগ হতো মাঝেমাঝে। তারপর ভাবতাম হয়তো আমি সত্যিই আমার মনের এলোমেলো কথা ভালো করে গুছিয়ে বলতে পারিনা। হয়তো আমাকে ওর মনের মতো দেখতে নয়। 

একদিন ছেলেটাকে মেয়েটা জিজ্ঞেস করছিলো -” তোমার কেমন মেয়ে পছন্দ ? আমার সবকিছু কি তোমার পছন্দ হয় ?” 

ছেলেটা বলেছিলো -” হ্যাঁ তুমি ঠিক আমার মনের মতো। যেমনটা আমি চিরকাল ভেবেছি। স্বপ্নে , ঘুমের মধ্যে চেয়েছি। তুমি ঠিক সেইরকম।

মেয়েটা লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে নিয়েছিল। 


আমিও কথাকটা শিখে তরঙ্গে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। কোনো উত্তর আসেনি।

একদিন ওই দুজনের খুব মান অভিমান হলো। খুব কাঁদলো দুজনে। কেন হলো সে আমি জানিনা। কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগলো। ওরা তারপর অনেকদিন আসেনি আমার কাছে।

অনেক অনেক বর্ষা গেলো , বসন্ত গেলো। আমি ভাবলাম ওরা আর আসবেই না। 


তবে ওরা এসেছে। অনেকদিন পরে। একটু বয়স বেড়েছে ওদের। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে দুজন দুজনকে আড়চোখে দেখছে। আমি দেখতে পেলাম দুজনের ভারী চশমার কাঁচের ফাঁকে সেই স্নেহমাখা দৃষ্টি। আজ এত বছর পরেও দেখলাম দুজনেই দুজনের জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। বেঞ্চে বসে সেই আগের মতোই খাইয়ে দিচ্ছে। আমি তো কাঁদতে পারিনা। কিন্তু ওদের চোখে শিশিরের ফোঁটার মতো জল জমেছিলো দেখলাম। 


ওরা আগের অনেক স্মৃতিচারণ করছিলো। কখনো জোরে জোরে হাসছিলো ওরা আগের মতোই। তারপর ওরা পুরো বাগান ঘুরে ঘুরে কী যেন খুঁজছিলো। 

-“কোথায় গেলো বলতো?”

-” সত্যিই এখানেই ছিল তাই না?”

-” ওই তো কিছুদূরে সেই রাধাচূড়া গাছটা।

বুঝলাম ওরা আমাকেই খুঁজছে। ওরা তো জানেনা। দশ বছর আগের সেই ভয়াবহ ঝড়ে আমি শেষ হয়ে গিয়েছি। তবে পুরোপুরি শেষ হইনি হয়তো। আবিষ্কার করলাম আমারও আত্মা বলে কিছু আছে।

রাধাচূড়ার টানে আমি এই বাগানেই থেকে গিয়েছি। আমার একটা শাখা শেষবারের মতো উড়ে গিয়ে পড়েছিলো রাধার পায়ের কাছে। খুব কেঁদেছিলো রাধাচূড়া সেদিন। ফুলে ফুলে ঢেকে গিয়েছিলো আমার শাখা। 

আসলে আমায় খুব ভালোবাসতো, আমিই বুঝিনি।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত