| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য প্রবন্ধ: রাসসুন্দরী দেবীর নীরব প্রতিবাদ ‘আমার জীবন’

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

ভূমিকা :

বাঙলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনীর রচয়িতা হলেন একজন নারী। এই নারী কোন সুবিখ্যাত সাহিত্যিক নন; একজন আটপৌরে গ্রাম্য নারী, যিনি সারাজীবন বিশাল সংসারের ঘানি টেনেছেন। তিনি হলেনঅধুনা বাংলাদেশের অন্তর্গত পাবনা জেলার পোতাজিয়া গ্রামের রাসসুন্দরী দেবী। তিনি যে সময়ে জন্মেছিলেন (চৈত্র মাসে ১২১৬, ইংরেজীর ১৯১০) সেই সময়ে সমাজে নারী শিক্ষা বলতে কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। সমাজ ছিল প্রচন্ড রকমের কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং পুরুষতান্ত্রিক। শিক্ষা গ্রহণ করলে মেয়েরা বিধবা হবে, সংসারের অকল্যাণ হবে, স্বামীর অবাধ্য হবে ইত্যাদি নানা ধরণের ধারণাই তখন চালু ছিল। শ্রীজ্যোতিরিন্দ্র নাথ ঠাকুর “আমার জীবন” গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন – “তখনকার কালে স্ত্রীলোকের লেখাপড়া শেখা দোষের মধ্যে গণ্য হইত। তিনি আপনার যত্নে, বহু কষ্টে লেখাপড়া শিখিয়াছিলেন। তাঁহার ধর্ম্মপিপাসাই তাঁহাকে লেখাপড়া শিখিয়াছিলেন”। রাসসুন্দরী দেবীর আত্মজীবনী “আমার জীবন” দুই খন্ডে প্রকাশিত হয়। প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় ১৮৬৮ সালে, যখন তাঁর বয়স ৬০। দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয় ১৮৯৭ সালে, যখন তাঁর বয়স ৮৮ বৎসর।

তিনি ছোটবেলায় দেখেছেন যে বাড়িতে গ্রামের ছেলেদের জন্য স্কুল থাকা সত্ত্বেও মেয়ে বলে সেই স্কুলে পড়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে পড়া ও লেখা শেখার ইচ্ছা দৃঢ় হয়। অবশেষে৪টি সন্তান হওয়ার পর (প্রথম সন্তান ১৮ বছর বয়সে, দ্বিতীয় ২১ বছর বয়সে, তৃতীয় ২৩ বছর বয়সে এবং চতুর্থ ২৫ বছর বয়সে) অতি কষ্টে, পরিশ্রম করে মনের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করে পড়তে শেখেন। নারীর পড়তে শেখা তৎকালীন সমাজে ছিল নিষিদ্ধ অর্থাৎ পড়তে শেখা ছিল সমাজলঙ্ঘণকারী কাজ। তিনি এই সমাজালঙ্ঘণকারী কাজ করেন এবং এই একটি মাত্র সমাজলঙ্ঘণকারী কাজ করেই থেমে থাকেন না। এরপর তিনি লিখতে শেখেন এবং সর্বোপরি নারী হিসেবে তিনি যে বঞ্চনার স্বীকার হয়েছেন, তাঁর মধ্যে যে সকল আক্ষেপ ছিল তা তিনি সর্বসাধারণের সম্মুখে প্রকাশ করেন। তিনি কোন ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে কখনও দোষারোপ করেন নি, তিনি হয়তো জানতেন নারীর প্রতি এই বঞ্চনার কারণ পরিবার বা কোন ব্যক্তি বিশেষ নয়, তা সমাজের প্রচলিত প্রথার ফল। রাসসুন্দরী দেবী তাই আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’ এ একজন নারী হিসাবে তাঁর বঞ্চনার কথা ধর্মের মোড়কে ব্যক্ত করেছেন। তাই বলা যায় পিঞ্জরে বদ্ধ পাখির নীরব প্রতিবাদ হল আমার জীবন।

রাসসুন্দরী দেবীর জীবন:

রাসসুন্দরী দেবীর জন্ম ১২১৬ সালের চৈত্র মাসে (১৮১০ সাল) বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্গত পাবনা জেলার পোতাসিয়া গ্রামে এক অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে[i]। তাঁর বয়স যখন ৪, তখন তাঁর পিতার পদ্মলোচন রায়ের মৃত্যু হয়[ii]। তার ফলে মায়ের আদরে লালিত ও পালিত হন রাসসুন্দরী দেবী এবং অভিভাবক ছিলেন খুড়ো মহাশয়। শৈশবে অতি ভীরু প্রকৃতির হওয়ার জন্য তাঁর খুড়োমশাই তাঁকে (বাড়িতেই গ্রামের ছেলেদের জন্য ছিল পাঠশালা) বাড়ির স্কুলে মেমসাহেবের পাশে বসিয়ে রেখে যেতেন, তখন তাঁর বয়স ৮। এই প্রসঙ্গে তিনি “আমার জীবন”এ বলেছেন, “বাঙ্গালা স্কুল আমাদের বাটীতেই ছিল। আমাদের গ্রামের সকল ছেলে আমাদের বাটীতেই লেখাপড়া করিত। একজন মেমসাহেব ছিলেন, তিনিই সকলকে শিখাইতেন। পর দিবস প্রাতে আমার খুড়া আমাকে কাল রঙের একটা ঘাগরা পরাইয়া একখানা উড়ানী গায়ে দিয়া সেই স্কুলে মেমসাহেবের কাছে বসাইয়া রাখিলেন।……… তখন আমার বয়ঃক্রম আট বৎসর”। এইখান থেকে ৮বছর বয়সে (১৮১৮ সাল) রাসসুন্দরী দেবী অক্ষর জ্ঞান লাভ হয়। তিনি নিজেই বলেছেন, “ছেলেরা ক খ চৌত্রিশ অক্ষরে মাটিতে লিখিত, পরে এক নড়ি হাতে লইয়া ঐ সকল লেখা উচ্চৈঃস্বরে পড়িত। আমি সকল সময় থাকিতাম। আমি মনে মনে ঐ সকল পড়াই শিখিলাম। …… আমি যে ঐ সকল পড়া মনে মনে শিখিয়াছি, তাহা আর কেহ জানিত না”। উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, এই সময়ে শিশু মনেই হয়তো কোথায়ও দাগ কেটেছিল যে, বাড়িতে স্কুল হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র মেয়ে বলে তাঁর পড়াশোনা করার অধিকার নেই।দুভাগ্যক্রমে দুবছর পর বাড়িতে আগুন লেগে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১২ বছর বয়সে (১৮২২ সাল) রামদিয়া গ্রামে রাসসুন্দরী দেবীর বিয়ে হয়ে যায়[iii]। এই সময়ে তাঁর মনের অবস্থা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, “বাস্তবিক আপনার মা ও আপনার সকলকে ছাড়িয়া ভিন্ন দেশে গিয়া বাস এবং যাবজ্জীবন তাহাদিগের অধীনতা স্বীকার, আপনার মাতাপিতা কেহ নহেন – এটি কি সামান্য দুঃখের বিষয়! কিন্তু ইহা ঈশ্বরাধীন কর্ম্ম, এইজন্য ইহা প্রশংসার যোগ্য বটে”। ১২ বছরের একটি শিশুকে বিয়ে দিয়ে শ্বশুড়বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার এই প্রথা অর্থাৎ বাল্যবিবাহ প্রথা কোন ব্যক্তি কেন্দ্রিক সৃষ্ট নয়, এর জন্য কোন একজন ব্যক্তিকে দায়ী করা যাবে না; এটি তৎকালীন সমাজের প্রচলিত রীতি বা প্রথা। তাই রাসসুন্দরী দেবী বলেছেন, ‘ইহা ঈশ্বরাধীন কর্ম্ম’। এরপর ১৮ বছর বয়সে তাঁর প্রথম পুত্র সন্তান বিপিনবিহারীর জন্ম। এরপর ২১ বছরে পুলিনবিহারী, ২৩ বছরে এক কন্যা রামসুন্দরী, এই ভাবে ১২টি সন্তানের মা হন, ৪১ বৎসরে কনিষ্ঠ পুত্রের জন্ম হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য ৩৪ বছর বয়সে পুত্র কিশোরীলালের(১৯৪৪ সাল) জন্ম হয়। ১৮ বছর থেকে ৪১ বছর এই ২৩ বছরে ১২টি সন্তানের জন্ম দেওয়া খুব একটা সহজ বিষয় নয়। তিনি নিজে এই প্রসঙ্গে বলেছেন, “ঐ ২৩ বৎসর আমার যে কি প্রকার অবস্থায় গত হইয়াছে তাহা পরমেশ্বর জানিতেন, অন্য কেহ জানিত না”। এর মধ্যে রাসসুন্দরী দেবী মনের লেখাপড়া শিখে পুঁথি পড়ার বাসনা প্রবল হয়। বড় ছেলের বয়স যখন ৮ বৎসর মানে তাঁর বয়স তখন ২৬ (১৮ বছর বয়সে বড় ছেলেটির জন্ম হয়েছিল) সালটি হল ১৮৩৬ খ্রীস্টাব্দ, তখন চৈতন্য ভাগবদত পুস্তকটি তাঁর হাতে আসে। অনেক কষ্ট করে সকলের অলক্ষ্যে শেষ পর্যন্ত তিনি পড়তে শিখলেন। ‘আমার জীবন’-এ তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আমি অনেক দিবসে, অনেক পরিশ্রমে, অনেক যত্নে এবং অনেক কষ্ট করিয়া ঐ চৈতন্যভাগবত পুস্তকখানি গোঙ্গাইয়া পড়িতে শিখলাম”।পড়তে শিখলেও তিনি দীর্ঘকাল লিখতে শেখেননি। কিন্তু তাঁর সপ্তম পুত্র কিশোরীলাল কলকাতায় পড়তেন, মাকে সেখান থেকে চিঠি লিখতেন। মা পড়তেন, কিন্তু উত্তর দিতে পারতেন না। কিশোরীলাল বাড়ি ফিরে একবার খুব জেদ করে মা যাতে চিঠির উত্তর দেন এবং কাগজ, কলম, দোয়াত, কালি ইত্যাদি কিনে দিয়ে যান। ফলত সময় সুযোগ করে তিনি লিখতে শেখেন। এই প্রসঙ্গে তিনি আত্মজীবনী “আমার জীবন” এ বলেছেন, “ইতিমধ্যে হঠাৎ এক দিবস কর্ত্তাটির সান্নিপাতিকের পীড়া হইয়া চক্ষের পীড়া দেখা দিল। তখন ঐ চক্ষের চিকিৎসা করিতে কর্ত্তাটি গোয়াড়ী কৃষ্ণনগর গেলেন। সে সঙ্গে আমাকেও যাইতে হইল। আমার পঞ্চম পুত্র দ্বারকানাথের বিষয় কর্ম্মের স্থান কাঁঠালপোতা, আমাদের সেই বাসাতে থাকা হইল। সেই স্থানে আমাদিগের ছয় মাস থাকিতেও হইল। তখন বাটীর অপেক্ষা আমার কাজের অনেক লাঘব হইল। সেই অবকাশে যৎকিঞ্চিৎ লেখা আমার হস্তগত হইল”। গোলাম মুরশিদ ‘রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া : নারীপ্রগতির একশ বছর’ গ্রন্থে রাসসুন্দরী দেবীর লেখা শেখার সময়কাল নির্ণয় করে বলেছেন, “কিশোরীলালের বয়স যদি কুড়ি বছর হয়, তা হলে ঘটনাটা ১৮৬৪ সালের। কারণ কিশোরীলাল জন্মগ্রহণ করেন যখন তাঁর মায়ের বয়স ৩৪। আর তাঁর মায়ের জন্ম ১৮১০ সালে”।  ১৮৬৯ সালে রাসসুন্দরী দেবীর স্বামী মারা যান[iv], সুতরাং তখন তাঁর বয়স ৫৯। খুব আশ্চর্যের বিষয় এই সময় বা এর পরই তিনি আত্মজীবনীটি রচনা শুরু করেন। কারণ তিনি নিজেই বলেছেন, “আমার যখন ৬০ বৎসর বয়ঃক্রম সেই সময় আমার জীবন বৃত্তান্ত যৎকিঞ্চিৎ লেখা হইয়াছিল”। এর থেকে বোঝা যায় ১৮৭০ সালে (৬০ বৎসর বয়স) তাঁর লেখার কাজ চলছিল।

আত্মজীবনী রচনার উদ্দেশ্য :

রাসসুন্দরী দেবী ছোটবেলায় বাড়িতে গ্রামের ছেলেদের পড়তে দেখেছেন, বাড়িতে ধর্মগ্রন্থ দেখেছেন কিন্তু মেয়ে বলে পড়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত এই আক্ষেপ থেকে মনের গভীর পড়ার ইচ্ছা আরও জোড়ালো হয়; বলা যায় জেদ বাড়ে এবং পরবর্তীকালে এক সময় বহু কষ্টকর সাধনার দ্বারা পড়তে শেখেন। শুধু পড়তে পারলে কি হয়, তাই ছেলেদের আবদারে লিখতেও শেখেন। এই দুটিই তখনকার সমাজে নিষিদ্ধ কাজ, তবুও এই অবধি ঠিক আছে। এরপরের সমাজলঙ্ঘণকারী কাজ হল আত্মজীবনী রচনা। বাংলা ভাষায় প্রথম প্রকাশিত আত্মজীবনী বলে খ্যাত ‘আমার জীবন’। তাই পূর্বে আত্মজীবনীর অন্য কোন দৃষ্টান্ত দেখে অনুপ্রাণিত হবার কথা নয়। আর বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা পড়া বা চর্চা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না, তাই এর পূর্বে ইংরেজি বা অন্য কোন ভাষাতে কোন আত্মজীবনী রচনা হয়ে থাকলেও তা রাসসুন্দরী দেবী জানার বিষয় নয়। তবে হঠাৎ কেন, কি উদ্দেশ্যে রাসসুন্দরী দেবীর এই আত্মজীবনী রচনা? স্বামী, সন্তান, নিজের পরিবার ও নিজের কষ্টের কথা বলাই কি উদ্দেশ্য? “আমার জীবন” স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের বা শ্বশুড়বাড়ির মানুষজনদের বা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বা সন্তানদের কার্যকলাপ বর্ণনা নয়। এখানেউল্লেখযোগ্য বিষয় রাসসুন্দরী দেবী যে সময় আত্মজীবনী রচনা করেছেন সেই সময় তাঁর সন্তানদের মধ্যে অনেকেই প্রতিষ্ঠিত[v]। এমন কি তাঁর পৌত্র সরসীলাল সরকার[vi], পৌত্রি সরলাবালা সরকার[vii]ও দ্বিতীয় খন্ড রচনার সময়ে বেশ খ্যাতি অর্জনও করেছিলেন। একজন গৃহ বধূর কাছে এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কি! সন্তান ও নাতি-নাতনিরা প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। কিন্তু তাঁর আত্মজীবনীতে কিন্তু এসবের কোন উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় না। শুধু এক জায়গায় বলেছেন, “আমার পুত্রকন্যায় যে কয়েকটি সন্তান হইয়াছিল, তাহারা সকলেই একমত হইয়াছিল। তাহারা সকলেই সুন্দর, সচ্চরিত্র, বিদ্বান, দাতা, দয়াবান, ধার্ম্মিক এবং কখনও গর্হিত কর্ম্ম করিত না”১০

তবে কি উদ্দেশ্যে এই আত্মজীবনী লেখা? কি বলতে চাইছে লেখিকা এখানে? এই প্রশ্নটি বারবার এসে পড়ে।দেখা যায় রাসসুন্দরী দেবী ১৮৬৪ সাল নাগাদ লিখতে শেখেন আর ১৮৬৯ বা ১৮৭০ সাল নাগাদই তিনি আত্মজীবনী লিখতে শুরু করেন।অর্থাৎ লিখতে শেখার পর অন্য কোন সাহিত্য রচনা নয়, বরং বলা যায়, লিখতে শেখার কিছু বছরের মধ্যে তিনি আত্মজীবনী লেখা শুরু করেন। গোলামমুরশিদ এই আত্মজীবনী লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কেবলেছেন, “মহিলাদের অবস্থা কেমন ছিল তা তুলে ধরার, অথবা তার মাধ্যমে মহিলাদের হীনাবস্থা সম্পর্কে সচেতন করে তোলার কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না”।১১ তিনি আরও বলেছেন, “রাসসুন্দরী সংসারের এককোণে সসংকোচে জীবন যাপন করে গেছেন। কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাননি; অথবা কারো ওপর প্রভাবও বিস্তার করতে চাননি। নিতান্ত আপন প্রাণের টানে লিখেছিলেন তাঁর আত্মজীবনী”।১২ কিন্তু এই রকম দাবী কি নিশ্চিত রূপে করা যায়? আপন মনের টানে নিছক আত্মজীবনী রচনার ইচ্ছাতেই লিখে ফেললেন – একথা কি মেনে নেওয়া যায়!তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যদি না চাইতেন তবে নিজের নারী জীবনের বঞ্চনার কথা এভাবে লিখে যেতেন না। শখ, বিলাসিতা বা অনুকরণের কোন জায়গা তসেই সময়ে তাঁর জীবনে ছিল না।উল্লেখযোগ্য বিষয়আগে বা পরেতিনি কিন্তু অন্য কোন সাহিত্য রচনা করেন নি, তাইতিনি কি শুধুমাত্র মনের টানে আত্মজীবনীলিখতে পারেন! বরং বলা যায় নারীজাতির প্রতি অবমাননা, বঞ্চনার বিরুদ্ধে নীরবে দাঁড়াবার জন্যই তিনি তৎকালীন সময়ে এই সমাজলঙ্ঘণকারী কাজটি করেছিলেন।রাসসুন্দরী দেবীর এই সমাজলঙ্ঘণকারী কাজের কারণ তৎকালীন সমাজে বিভিন্ন অধিকার থেকে নারীর বঞ্চনার[viii] প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সুতরাং রাসসুন্দরী দেবী “আমার জীবন” ঊনবিংশ শতকের এক নারীর উত্তরণের চিত্র। এখানে বলা হয়েছে অনেক কিছু আবার না বলা অর্থাৎ অব্যক্ত থেকেও অনেক কথা বলা হয়েছে। এই বলা ও না-বলার মধ্যে দিয়ে এক নারীর উত্তরণের প্রকাশ ঘটেছে; যা আজকের নারীদের কাছেও দৃষ্টান্তস্বরূপ। রাসসুন্দরী দেবী ‘আমার জীবন’ নারীর বঞ্চনা ও অধিকার নিয়ে যে কথা বলে গেছেন তা সমাজের নারীর উত্তরণের কথা, এই উত্তরণের মধ্যেদিয়েই বর্তমান সময়েরনারীবাদী দর্শনের প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়।

বর্তমান দিনে দেশে, বিদেশে মনের শক্তি নিয়ে অনেক গবেষণামূলক কাজ হচ্ছে[ix]। ‘মনের শক্তি’কে এখন প্রায় প্রত্যেক্যেই স্বীকার করে নিয়েছে। Dr Joseph Marfi “The Power Of Your Subconscious” গ্রন্থে বলেছেন, “আপনার মন আপনার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এটি সবসময়ই আপনার সঙ্গে আছে তবে এর অত্যাশ্চর্য শক্তির অধিকারী তখনই হতে পারবেন যখন এটিকে ব্যবহার করতে শিখবেন। আমরা দেখেছি মনের দুটি লেভেল বা মাত্রা রয়েছে – একটি হল চেতন বা বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন লেভেল। অপরটি অবচেতন বা অবিচারবুদ্ধিসম্পন্ন লেভেল। আপনি আপনার চেতন মন নিয়ে চিন্তা করেন এবং আপনি যা ভাবতে অভ্যস্ত তা আপনার অবচেতন মনের কাছে পৌঁছে যায় এবং আপনার চিন্তার প্রকৃতি অনুযায়ী তা পরিবেশ তৈরি করে। এটি সৃষ্টিশীল মন। আপনি সুচিন্তা করলে ভালো কিছু আপনাকে অনুসরণ করবে; আপনি কুচিন্তা করলে খারাপ কিছু আপনার পিছু নেবে। এভাবেই আপনার মন কাজ করে”।১৩ স্বামী বিবেকানন্দ মন ও মনের শক্তি নিয়ে অনেক কথা বলে গেছেন।তিনি বলেছেন, “সংযত ও সুনিয়ন্ত্রিত মন, আমাদিগকে রক্ষা করিবে, মুক্তিদান করিবে”।২৩ ঊনবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে রাসসুন্দরী দেবীযেন এই মনের শক্তির উপরে নির্ভর করেছেন।তিনি নিজের ইচ্ছাকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য কোন সময় বাহ্যিক কোন ব্যক্তি বা বিষয়ের সাহায্য গ্রহণ করেন নি। তিনি নিজ মনের মধ্যেই ইচ্ছাগুলোকে লালিত পালিত করেছেন, দয়ামাধবের কাছে প্রার্থনা করেছেন। রাসসুন্দরী দেবীর ধর্ম কোন বাহ্যিক বিষয় নয়। তাঁর ধর্ম তাঁকে শক্তি দিয়েছে, এই শক্তির জোড়েই তিনি তাঁর ইচ্ছাগুলোকে পূর্ণতা দিয়েছেন। ‘ইচ্ছার পূর্ণতা’ বলতে শুধু নিজের পড়া ও লেখা শেখা নয়, পড়া ও লেখা শেখার সংগ্রামটিকে প্রকাশ করে সমাজের কাছে অনুপ্রেরণা তৈরী করার প্রয়াসকেও বোঝানো হয়েছে। তৎকালীনসমাজ ও পরিবারে নারীর বঞ্চনার কথা, নারী জীবনের আক্ষেপের কথা সমাজের সামনে রাখার জন্যই ‘আমার জীবন’এর সৃষ্টি। ফলত রাসসুন্দরী দেবী আত্মজীবনী রচনা নিছক প্রাণের টানে নয়, বরং বলা যায় পরিবাররূপ পিঞ্জরে বদ্ধ রাসসুন্দরী দেবীর নীরব প্রতিবাদের প্রকাশই ‘আমার জীবন’।

উপসংহার :

ঊনবিংশ শতকের বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামের এক আদর্শ গৃহিনী রাসসুন্দরী দেবী রচিত আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’এ যে নারীবাদী চিন্তা দেখতে পাওয়া যায়, তার সঙ্গে বর্তমান দিনের কেরল গিলিগানের মতের বেশ কিছু সাযুজ্য দেখতে পাওয়া যায়। গিলিগান প্রখ্যাত মার্কিন মনস্তত্ত্ববিদ কোহলবার্গের মনোবিকাশ ও নৈতিকতার স্তরভেদ সম্বন্ধীয় তত্ত্বের বিরোধিতা করে নতুন একটি তত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন। গিলিগান কোহলবার্গের ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক বিকাশ সম্বন্ধীয় তত্ত্বকে পক্ষপাতযুক্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন যে, নারীর স্বতন্ত্র ও নিজস্ব সত্ত্বাবোধ এবং নিজস্ব নৈতিকতাবোধ আছে।

কোহলবার্গ মানুষের নৈতিক বিকাশের ৩টি প্রধান স্তরের কথা বলেছেন –Preconventional বা প্রথাগত স্তর, Conventional বা প্রচলিত স্তর, Postconventional বা উত্তর প্রচলিত স্তর। নৈতিকতার প্রথাগত স্তরে ছেলেমেয়েরা পিতা-মাতা ও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানতে পারে কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ এবং তারা তা মেনে চলে শাস্তি এড়ানোর জন্য। ফলে এই স্তরে নৈতিক ভাবনা নিজের দিকে নিবদ্ধ থাকে – কর্তৃপক্ষকে অনুসরণ করা ও নিজেকে শাস্তি থেকে রক্ষা করা মধ্যে দিয়ে।

কৈশোরে উপনীত হলে তারা সংবদ্ধতা তৈরি করে ও পরিবার, বন্ধুবর্গ, ধর্ম ও জাতির অনুগত হয়। ফলশ্রুতিতে, এই প্রচলিত স্তরে নৈতিকতা গড়ে উঠে গোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যদের কাছে গ্রহনীয় হওয়াকে এবং তাদের রীতিগত নৈতিক মানদন্ড ও নিয়ম অনুসরণকে ভিত্তি করে।

নৈতিক বিকাশের সর্বোচ্চস্তরে অর্থাৎ উত্তর প্রচলিত স্তরে কল্যাণ, ন্যায় ও অধিকার সম্পর্কিত সর্বজনীন নীতির নীতির উপর নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

কোহলবার্গ বলেন মানুষের এই আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে ক্রমেই সার্বিক নীতি ভিত্তিক চিন্তার স্তরে উপনীত হবার ক্ষেত্রে ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ক্যারল গিলিগান তাঁর ‘In a different voice’ গ্রন্থে বলেছেন, “Prominent among those who thus appear to be deficient in moral development when measured by Kohlberg’s scale are  women, whose judgements seem to exemplify the third stage of his six stage sequence. At this stage morality is conceived in interpersonal terms and goodness is equated with helping and pleasing others. This conception of goodness is considered by Kohlberg and Kramer (1969) to be functional in the lives of mature women insofar as their lives take place in the home. Kohlberg and Kramer imply that only if women enter the traditional arena of male activity will they recognize the inadequacy of this moral perspective and progress like men toward higher stages where relationships are subordinated to rules (stage four) and rules to universal principles of justice(stages five and six)[x].১৪অর্থাৎ কোহলবার্গ এখানে যে মানদন্ড ব্যবহার করেছেন সেই অনুযায়ী নারীদের নৈতিক বিকাশে ঘাটতি দেখানো হয়েছে। গিলিগান এর বিরোধিতা করে বলেছেন, “In (Kohlberg’s) version of moral development, however, the conception of maturity is derived from the study of men’s lives and reflects the importance of individuation in their development”.১৫ গিলিগান নারীদের জন্য নৈতিক বিকাশের নিজস্ব পর্যায় তত্ত্ব তৈরি করেছিলেন। প্রথাগত স্তরে (Preconventional stage) নারী নিজের প্রতি যত্নবান থাকে (Goal is individual survival); প্রচলিত স্তরে (Conventional stage) উপনীত হয়ে সে অন্যদের প্রতি যত্নবান হন (Self sacrifice is goodness); এবং সর্বোচ্চ স্তর অর্থাৎ উত্তর প্রচলিত স্তরে(Postconventional stage) সে নিজের ও অন্যদের প্রতি যত্নের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য অর্জন করে (রাসসুন্দরী দেবীও তাঁর জীবনে তাই করেছিলেন)। তাঁর মতে নারী যে ভাবে নৈতিকতাকে দেখে তা পুরুষের দেখা থেকে ভিন্ন। নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নারীরা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বড় করে দেখে, পুরুষরা দেখে থাকে পক্ষপাতমুক্ত বিধিনীতিকে। গিলিগান বারবার সম্পর্কের কথা বলেছেন, যত্নের কথা, দরদের কথা বলেছেন; তাই তাঁর নৈতিক মতাদর্শকে ‘কেয়ার বেসড এথিক্স’ বা ‘দরদ ভিত্তিক নৈতিকতা’ বলেছেন। “গিলিগান বলেছেন আমরা ‘সেলফ’ বা ব্যক্তিক সত্তা বলতে যা বুঝি তা কোনো আধিভৌতিক মৌল নয়। ব্যক্তি সত্তা সৃজিত হয় নানান ঘাত প্রতিঘাতে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক মানুষের ব্যক্তিক সত্তা সৃজনের এক প্রধান উপাদান। এমন বলা যায় না যে ব্যক্তিক সত্তা ও ব্যক্তি বিলোপী সত্তা পরস্পর বিযুক্ত; বলতে হবে এই সত্তা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত অথচ এদের মধ্যে প্রভেদও আছে। যার ফলে একটা সম্পর্কের মধ্যে থেকেও একটা স্বর বা ভয়েস স্পষ্টতই শোনানো যেতে পারে”।১৬

রাসসুন্দরী দেবী আত্মজীবনীতেও এরূপ চিত্র পাওয়া যায়। তিনি পরিবার বা সম্পর্ক নিয়ে বেশি আলোকপাত করেন নি; একদম ঠিক। তবে তিনি কখনই পরিবারের বিরোধীতা, সমালোচনাও করেন নি। বরং স্বামীর প্রতি সম্মান[xi], শ্বাশুড়ীর প্রশংসা, ননদেরও প্রশংসা করতে দেখা যায়[xii]। সন্তানদের নিয়েও তিনি বলেছেন “বস্তুতঃ সন্তান হইতে মাতাপিতার যেমন নানা প্রকার যন্ত্রণা ভোগ করিতে হয়, মনুষ্যকে এত যন্ত্রণা আর কিছুতেই ভোগ করিতে হয় না। বস্তুতঃ পিতার অপেক্ষা এ বিষয়ে মাতার যন্ত্রণাই বেশী। কিন্তু জগদীশশ্বর সদয় হইয়া এ বিষয়ে আমাকে কোন কষ্টই দেন নাই। আমার পুত্রকন্যায় যে কয়েকটি সন্তান হইয়াছিল, তাহারা সকলেই একমত হইয়াছিল। তাহারা সকলেই সুন্দর, সচ্চরিত্র, বিদ্বান, দাতা, দয়াবান, ধার্ম্মিক এবং কখনও গর্হিত কর্ম্ম করিত না। উহাদের চরিত্র বিষয়ে আমাকে কোন কষ্ট পাইতে হয় না”।১৭ তাঁর সন্তানদের অনেকেই সুপ্রতিষ্টিত হয়েছিলেন, এমন কি তাঁর নাতি, নাতনিরাও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর নাতনি সরলাবালা সরকারের রচনা থেকে জানা যায়, “হাইকোর্টের উকিল কিশোরীলাল সরকার, যিনি ‘ঠাকুর ল’, লেকচারার ছিলেন এবং ‘এ ডাইং রেস, হাউ ডাইং’, ‘হিন্দু সিস্টেম অব মরাল সায়েন্স’, হিন্দু সিস্টেম অব রিলিজিয়াম সায়েন্স’, হিন্দু সিস্টেম অব সেল্‌ফ কালচার’ প্রভৃতি পুস্তক লিখিয়াছিলেন, তিনি তাঁহার এক পুত্র। আর এক পুত্র রায়বাহাদুর দ্বারকানাথ সরকার কৃষ্ণনগরের ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তাঁহার পৌত্রেরা সকলেই কৃতবিদ্য। সুপ্রসিদ্ধ মনসতত্ত্ববিদ ডাক্তার সরসীলাল সরকার তাঁহার এক পৌত্র”।১৮ পরিবারে প্রতি তাঁর কোন অনুযোগ বা অভিযোগ ছিল না। সমাজে প্রচলিত রীতি-নীতির দ্বারা পরিচালিত হতো পরিবার সে কথা হয়তো তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’এ পরিবারের সদস্যদের প্রতি অনুযোগ নয়, অভিযোগ নয়; বরং সমাজে প্রচলিত রীতিনীতি দ্বারা নারীরা বঞ্চিত, সেই চিত্রটিই তিনি তুলে ধরেছেন। তাঁর আত্মজীবনীতে দেখতে পাওয়া যায় যে, তিনি যেন মনে করেছিলেন কোন কাজ করতে গেলে পরিবারের মধ্যে থেকেই তাঁকে করতে হবে, পরিবার থেকে বেড়িয়ে গিয়ে নয়।পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যদের প্রতি তাঁর ছিল যত্ন ও দরদের সম্পর্ক। পরিবারের প্রতি কাজে ছিল নিষ্ঠা। পরিবারের কোন সম্পর্ক থেকে নিষ্কাষিত হয়ে কোন পরিবর্তন নয়, বরং পরিবারের মধ্যে থেকেই পরিবর্তন আনতে হবে। “গিলিগানের মতে এই পার্থক্য সামাজিক কারণে হয়ে থাকে। সামাজিক ভূমিকা এমনভাবে নিরূপিত হয়েছে যে মেয়েরা সাহস পায় না ‘এক্সিট’ বা নিষ্ক্রমণের বিকল্প বেছে নিতে। তারা নানা সম্পর্কে সামাজিক কারণে সম্বন্ধ এবং পরবর্তীকালেও তারা মুক্তির পথ খোঁজে সম্বন্ধের ভেতরে থেকেই, সম্বন্ধকে বাতিল করে বেরিয়ে গিয়ে নয়”।১৯ একদম ঠিক, রাসসুন্দরী দেবীর লড়াই পরিবারের মধ্যে থেকেই। বিবাহের পর খাঁচায় বন্দী পাখি হিসাবে শ্বশুড়বাড়িতে বসবাস করলেও, তিনি (এক্সিট করেন নি) বেরিয়ে যান নি। ‘ভয়েস’ এর বিকল্পটি যেন তিনি গ্রহন করেছিলেন। তিনি নীরবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তাই নারীর প্রতি সমাজের বঞ্চনার কথা লিপিবদ্ধ করেছেন, যা সমাজের সকলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেছে।পরবর্তী সময়ে পরিবারের মধ্যে থেকে মুক্তির স্বাদ তিনি পেয়েছিলেন কি না, তা স্পষ্টরূপে না বলা গেলেও এ কথা বলাই যায় যে শেষের দিকে পরিবারের মধ্যে কর্ত্রী হয়েছিলেন। কর্তৃরূপে তিনি স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন। তাই তো ‘আত্মজীবনীর’ প্রথম খন্ড রচনার কিছুদিনের মধ্যে তাঁর সপ্তম পুত্র কিশোরীলাল বই প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। আবার দ্বিতীয় খন্ডটি কিশোরীলালের পুত্র সরসীলাল প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেন। বাংলা ভাষাতে প্রথম ‘আত্মজীবনী’ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে একজন গ্রাম্য সাধারণ নারী হিসাবে কোন বাঁধা আসেনি। এছাড়া রাসসুন্দরী দেবীর পরবর্তী প্রজন্ম দিকে তাকালে বোঝা যায় যে তিনি পরিবর্তনের এক স্রোত তাঁর পরিবারের মধ্যে অবশ্যই আনতে সক্ষম হয়েছিলেন আর এখানেই নীরব প্রতিবাদের মধ্যে দিয়েই তাঁর ‘আত্ম’ হয়ে ওঠার চরম সার্থকতা দেখতে পাওয়া যায়।

[i]“১২১৬ সালে চৈত্র মাসে আমার জন্ম হয়” – “আমার জীবন”, শ্রীমতি রাসসুন্দরী দেবী, পৃ ২

[ii]“চারি বৎসররের সময়ে আমার পিতার মৃত্যু হইয়াছে” “আমার জীবন”, পৃ ৮

[iii]“ঐ বার বৎসরে আমার বিবাহ হয়”। আমার জীবন, পৃ ১৭

[iv]“১২৭৫ সালে ২৯ মাঘী শিবচতুর্দ্দশির দিবসে, আড়াই প্রহর বেলার সময় কর্ত্তাটির মৃত্যু হয়”। (আমার জীবন, পৃ ৬৯) ১২৭৫ সালের ২৯শে মাঘ = ১৮৬৯ খ্রীস্টাব্দের ১২ই ফেব্রুয়ারী

[v]“হাইকোর্টের উকিল কিশোরীলাল সরকার, যিনি ‘ঠাকুর ল’ লেকচারার ছিলেন এবং ‘এ ডাইং রেস, হাউ ডাইং’, ‘হিন্দু সিস্টেম অব মরাল সায়েন্স’, ‘হিন্দু সিস্টেম অব সেলফ কালচার’ প্রভৃতি পুস্তক লিখিয়াছিলেন, তিনি তাঁহার এক পুত্র। আর এক পুত্র রায়বাহাদুর দ্বারকানাথ সরকার কৃষ্ণনগরের ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন”। (রচনাসংগ্রহ সরলাবালা সরকার, ২য় খন্ড, চিত্রা দেব সম্পাদিত, ১৯৮৯, আনন্দ পার্বলিশার্স, পৃ ৬৩৩)

[vi]সুপ্রসিদ্ধ মনস্তত্ত্ববিদ ডাক্তার সরসীলাল সরকার তাঁহার এক পৌত্র।

[vii]১৮৮৭ খ্রীস্টাব্দে সরলাবালা সরকারের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ‘ভারতী’ পত্রিকায়।

[viii]“আত্মসচেতন মানুষের স্বাধীনতার প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষা তো থাকেই। রাসসুন্দরীর আত্মজীবনীতে দেখি বারবার স্বাধীনতা-হীনতার বেদনা নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে”। সুতপা ভট্টাচার্য, মেয়েদের কথা।

[ix] “মন নামক অন্তরিন্দ্রিয়টি সকল ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রক”। (শর্মিষ্ঠা ঘোষ, প্রবন্ধ – মনই সমাজের মস্তিষ্ক, ইরাবতী, ১৭ই ফেব্রুয়ারী ২০২৩,https://irabotee.com/%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0/)

[x]কোহলবার্গ যে ৩টি স্তরের কথা বলেছেন, প্রত্যেকটি স্তর আবার ২টি ভাগে বিভক্ত। প্রথম স্তর প্রথাগত স্তরে – Punishment and obedience বা Might makes right ও Instrumentalism বা look out for number one। প্রচলিত স্তরের প্রথমটি বা তৃতীয় পর্বটি হল Interpersonal relationships। চতুর্থ পর্বটি হল “Maintainingsocial conventions or ‘law and order’ are brief but apt descriptions of the fourth stage. This sense of order becomes generalized beyond close others to society at lerge”. (‘Piaget, Kohlberg, Gilligan and others on Moral Development, Copyright 2005, 2006, J.S.Fleming, PhD, p 9) পঞ্চম পর্ব (উত্তর প্রচলিত স্তরের প্রথম পর্ব) হল Social contract stage (“The understanding is that laws, rules and regulations are created for the mutual benefit of all citizens”) এবং ষষ্ঠ পর্ব হল Universal ethical principle (“Right and wrong are not determined by rules and laws, but by individual reflection on what is proper behavior).

[xi]“তিনি অতি উত্তম লোক ছিলেন। তেমন একটি লোক বড় দেখা যায় না”। (আমার জীবন, পৃ ৮৯)

[xii] “বাস্তবিক ননদে যে ভাইজকে এত স্নেহ করে, এ প্রকার কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না”। (পৃ ৪৮)

তথ্যসূত্র:

১) আমার জীবন, শ্রীমতি রাসসুন্দরী, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং প্রাইভেট লিঃ, কলিকাতা ৭, ভূমিকা

২)শ্রীমতি রাসসুন্দরী দেবী,আমার জীবন, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড, পাবলিশিং কোং প্রাইভেট লিঃ, কলিকাতা ৭, পৃ ৬

৩)ঐ, পৃ ৬

৪)ঐ, পৃ ২০

৫)ঐ, পৃ ৩৪

৬)ঐ, পৃ ৪৫

৭)ঐ, পৃ ৬৫

৮)গোলাম মুরশিদ,রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া : নারীপ্রগতির একশ বছর, পৃ ৩৪

৯)আমার জীবন, পৃ ৯৬

১০) আমার জীবন, পৃ ৫১

১১) গোলাম মুরশিদ,রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া :নারী প্রগতির একশো বছর, বাংলা একাডেমী ঢাকা, পৃ ১৭

১২) আমার জীবন, পৃ ৪৯

১৩) ডঃ জোসেফ মারফি, দ্য পাওয়ার অব ইউর সাবকনশাস মাইন্ড, অনুবাদক অনীশ দাস অপু,২০১৫, মুক্তদেশ প্রকাশন ঢাকা ১১০০, পৃ ৪৪

১৪)Carol Gilligan, In a different voice psychological theory and women’s development, Harvard University Press, 1993, p 18

১৫)In a different Voice, p 18

১৬)শেফালী মৈত্র,নৈতিকতা ও নারীবাদ, নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, পৃ ১৩৫

১৭)আমার জীবন, পৃ ৫১

১৮)সরলাবালা সরকার, রচনাসংগ্রহ ২য় খন্ড, চিত্রা দেব সম্পাদিত, পৃ ৬৩৩

১৯)শেফালী মৈত্র,নৈতিকতা ও নারীবাদ, নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, পৃ ১৩৬

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত