| 20 মে 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: শোলমারীর রাত । হামিম কামাল

আনুমানিক পঠনকাল: 10 মিনিট

পিদিম, বড়ইতলা গ্রামের প্রৌঢ় কুমোর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে হাত তুলে বলল, ‘কীসের জানি শব্দ হলো না জয়ি ?’ একবার পেছনে তাকিয়ে, সঙ্গিনীর মাথার ওপর দিয়ে আরও দূরে দেখতে গিয়ে অন্ধকারে পিদিমের দৃষ্টি বাধা পেল। সন্ধ্যা অদৃশ্য হয়ে রাত নেমেছে। নুরু মাঝি যে সময় দিয়েছিল ওরা তার আগেই চলে এসেছে।
নুরু মাঝি বলেছিল, রাত্রি নয়টার ভেতর শৈলমারীর ঘাটে সবাই আলাদা আলাদা আইসে বটতলায় ছায়ার ভেতর লুকায়ে থাকবা। আমি বাজকুরার ডাক ডাকলি পারি একজন একজন কইরে বার হইয়ে আসবা। হুড়মুড় কইরে একসঙ্গে আইসে না জানি। আলাদা আলাদা আসবা সব। মনে থাকপে ?
পিদিম কুমোর বলল, নুরু কিছু মুখে দিয়া যাও।
পিদিমের কথা যেন শুনতেই পায়নি নুরু মাঝি। যেতে যেতে বলল―বৌদি, ছাওয়াল দুইডারে আপনি একটু বুঝায়ে কৈয়েন। আপনার কথা শোনবে। আর পিদিম, বৌদিরে কী কলাম শুনিছ সব ?
শোলমারী পার হয়ে লাভ কী পিদিমের জানা নাই। সেখানে কি রাজাকার শামসু হালদাররা নাই ? আরও নিকৃষ্ট মানুষেরা আছে হয়ত। মিহির, রুপাইয়ের মতো ছেলেদের গলা কাটছে ওরা প্রতিদিন, পিদিমের মতো যারা তাদের দিয়ে কবর খোঁড়াচ্ছে। তারপর গুলি করে দেহ কবরের ভেতর ফেলে তার ওপর প্রস্রাব করতে ডাকছে মিলিটারিদের। জয়াদের মতো যারা―তাদের কথা পিদিম ভাবতে পারছে না। এই গণ্ডগোলের মধ্যে যাদের দশা করুণের ভেতরও করুণ, নিকৃষ্টের ভেতরও নিকৃষ্ট, তারা হলো হিন্দু আর নারী। নারীর কোনও ধর্ম হয় না।
এখানে নোনা জলের কিছু গাছ জন্মে কাঁটা কাঁটা বন তৈরি করে রেখেছে। যদিও মুক্তিবাহিনী যেন লুকিয়ে থাকতে না পারে তাই তুলে ফেলা হয়েছে সব ঝোপঝাড়, গুল্ম, কাঁটাজাতীয় ঝোপাল বিরুৎ। নদীর ধারে প্রচুর গাছ কেটে ফেলে রাখা। পিদিমরা দুটো নোনা গাছের আড়ালে আত্মগোপন করে রইল। ওদের চার জনের দলটা ইতোমধ্যে দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। ছেলেরা আগেই চলে গেছে অশ্বথতলায়।
পিদিম বলল―জয়ি, তুমি আগে বাড়ো। হামা দিয়া যাও যদি দরকার লাগে।
জয়িতা বলল, আমার ডর লাগে। আমি তুমার সঙ্গে সঙ্গে যাব। নাইলে না।
পিদিম বলল, তুমি নুরু মাঝির কথা শুনো নাই ? এমন করে না। তুমি এমন দুই ডাকু ছাওয়ালের মা। তুমার ভয় পাইলি (পালি) চলে ?
জয়া দাঁড়িয়ে রইল। তার মন সায় দিচ্ছে না। এ কেমন নিয়ম। কেউ বের হওয়ার পর যদি গুলি ছুটেও আসে, দুজনের একসঙ্গে মরে যাওয়ার চেয়ে কি একা বেঁচে থাকা ভালো ? জয়িতা একটা লম্বা দম নিল। তারপর দুর্গার নাম করে পা রাখল ছায়ার বাইরে। সঙ্গে সঙ্গে তার কানের পর্দায় প্রবল চাপ পড়তে থাকল। ঘাড় শক্ত হয়ে উঠল। যদি কেউ দেখে, যদি কেউ গুলি করে ? জয়িতার খালি পায়ে একটা ভাঙা শামুক ফুটল। কিন্তু দাঁড়ানোর অবকাশ নেই।
জয়িতা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে। পিদিমের আঁধারে অভ্যস্ত চোখ স্পষ্টই দেখতে পারছিল সব। হঠাৎ জয়িকে হোঁচট খেতে দেখে বুকটা হু হু করে উঠল। কোথাও কোনও সুলক্ষণ নেই। দুপুরে একটু তন্দ্রামতোন এসেছিল। স্বপ্নে দেখল, একটা কাচের টেবিলের ওপর কিছু বস্তু রাখা। কাছে গিয়ে দেখে, গরুর মাথা। খোলা চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের ওপর ঘোলাটে পর্দা পড়া। তন্দ্রা টুটে গেছে। স্বপ্নটার কোনও ভালো অর্থ করা যায়নি।
রুপাই আর মিহির দশ গজ দূরত্ব রেখে একটা বট গাছের দুটো ঝুরির আড়ালে লুকিয়েছে। বটের নিচে রহস্যঘন আঁধার। তার ভেতর দুটো কালো শরীর আলাদা করা যায় না। মিহির শান্ত প্রকৃতির, রুপাই অস্থির, প্রায় সর্বাবস্থায়। দুজনের বয়সের ব্যবধান তিন বছর হলেও মাথায় দুজনেই সমান এখন। এই দুই ছেলের আগে প্রীতম আর জয়া দম্পতির একটা মেয়ে হয়েছিল মায়া নামে। রুগ্ণ মেয়ে। আলতাফ কবিরাজ তার নাড়ি ধরে বলেছিল, এই মেয়ে বাঁচবে না বেশি দিন। মেয়েটা তেরো হতে না হতেই মারা গেছে। রুপাই তখন আট, আর মিহির পাঁচে পড়েছে।
রুপাই বলল―মিহির, ও মিহির! আর কতক্ষণ রে ?
সারারাত।
ভগবান, এটা কোনও কথা ?
মিহির ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারা করল। রাতের বেলা কথা বহু দূর যায়।
রুপাই চুপ করল। আঁধারে চোখ সয়ে এসেছে। এখন একটু আধটু দেখা যাচ্ছে বটের ঝুরির ত্বকে গভীর ভাঁজ, খোড়ল। আলো-ছায়া পার্থক্য করা যাচ্ছে। দূরে ফিতার মতো শুয়ে আছে শোলমারী। তারা আলো ফেরাচ্ছে, ঝিকমিক ঝিকমিক। নাকি কল্পনা। হ্যাঁ, কল্পনাই। শোলমারীর ঘোলা জলে কোনও আলোর প্রতিফলন নাই। থেকে থেকে একটা দুটো অন্ধকার ভেসে যাচ্ছে আঁচ করা যায়। অন্ধকারগুলো মানুষ। এরা নদীর তুলনায় জমাট, নদীর চেয়েও গন্তব্যপ্রিয়। কেমন নির্ভার ভেসে যায়। একবার একটা টুকরো অন্ধকারকে মানুষ বলে চিনতে পেরে রুপাই অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, মানে চোখের আড়াল হওয়ার অবধি দেহটা লক্ষ্য করল। কোনও বাঁকে আটকা পড়ে মাছের খাবার না হলে সমুদ্র দর্শনের আর বেশি দেরি নেই।
মিহির হাঁটু ভেঙে নামাজের ভঙ্গিতে বসেছে। ভঙ্গিটা নতুন শেখা। আগে ভাঁড়ার ঘরের কোণের ছোট মণ্ডপের সামনেও হাঁটু ভাঁজ করে বসতে হতো। বসাটা সেভাবে নয় তবে কাছাকাছি। নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রায় নিস্তরঙ্গ নদী। তবে হাত রাখলে বোঝা যায় স্রোত। উজানের স্রোত শক্তি দেখায় না, শান্তি দেয়।
রুপাই বলল―মিহির, কার বাড়ি যাব আমরা কিছু জানিস ?
নারায়ন গোলদারদের বাড়ি।
নারায়ন গোলদার কিডা। সুবীর কাকা থাকতি আর কারও বাড়ি ক্যান ?
মিহির বলল, তুমি মায়ের কাছে কিছু শুনো নাই ?
কী শুনব আবার। আমার ভালো লাগে না।
সুবির কাকা এখন আর কাপালিডাঙ্গায় নাই। এখেনে তার বাড়ি পুড়ায়ে দিছে।
আর ডুমুরিয়ার বাড়ি ? রুপাইয়ের যেন শেষ আশ্রয়ও ভেঙে গেছে।
মিহির বলল, ডুমুরিয়া এখন লাল ডুমুরিয়া। জানো না ?
লাল ডুমুরিয়া। কে জানে কেন এ কথা এত শক্তি ধরছে। একটা রক্তাপ্লুত ছবি ফুটে উঠল। মিহির বলল, আর যদি ডুমুরিয়া আগের মতোও থাকত, কে (কিডা) যাইত (যাত) অত উত্তরে ? চুকনগরও শেষ। এক কপিলমুণির দিকে (দিক) হলি পথ কিছুটা খোলা।
রুপাইয়ের ঠোঁটে হাসি। মিহির বলল, লীলা পিসি অথির কাকু কেউ নাই। থাকলি বাবু বেতাগার দিকি যাতি চাইত। কিন্তু দেশের ভিতর দিকে (দিক) যাওয়া ঠিক হবি নানে। যাতি হবে সীমান্তের দিকি।
মিহির। তুই আসলে আমার বড় ভাই রে।
ক্যান ?
কীভাবে এত কিছু জানিস তুই ? ভগবান আমার ঘটে কিছুই দেয় নাই।
দাদা চুপ!
মিহির কান খাড়া করে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকল। দুই ভাই মিশে গেল মাটিতে। পায়ের শব্দই তো। কুয়াশা ভেজা মাটি। কারও পায়ের নিচে যেন একটা শুকনো ডাল ভাঙল। একটা মন নরম করা ঘ্রাণ চেতনা আচ্ছন্ন করে তুলতে চায়। কিন্তু আচ্ছন্ন হওয়া চলবে না এখন। বাবা মা এখনও এল না। কোনও বিপদ হলো না তো ওদের ? মিহির চুপ করে পড়ে রইল। রুপাই একটুখানিক মাথা তুলে বটগাছের ছায়ার পরিধির বাইরে তাকাতে চাইল। কারও অবয়ব ফুটে ওঠেনি এখানে। কিন্তু কেউ একজন আছে। কোথাও কোনও শব্দ না থাকলেও কারও উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। রুপাই ঘাড় সোজা করে আবার যথাস্থানে নীরবে উপুড় হয়ে থাকল। তাকিয়ে দেখে মিহির উঠে বসেছে। হাসছে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছনে তাকিয়ে দেখে বাবা মা দুজনই চলে এসেছে। তার ছেলেমানুষী আনন্দ হলো।
বটের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে পিদিম দুই ছেলের উরুতে হাত রাখল। অনেক দিন ছেলেদের এমন স্নেহস্পর্শ করে না। মায়া সবচেয়ে বেশি আদর পেয়েছিল। রুপাই তার খানিকটা পেয়েছে। মিহির আরও কম। মিহিরের পাশে অন্ধকারে একটা সাদা জবার মতো উন্মুখ হয়ে বসে আছে জয়িতা। জয়িতা মা কুন্তির রূপ পেয়েছে। যেন কোনও বার্ধক্য তাকে কোনও দিন স্পর্শ করবে না। পিদিম বলল, জয়ি শুনতিছ ?
জয়ি তাকাল।
হঠাৎ মনে হতিছে, চিন্তার কোনও কারণ নাই। বুজলে ? নুরু মাঝির নৌকায় কইরে সোজা নারান সাধুর বাড়ি। তার লোক আছে বলে শুনিছি। রাতের বেলা কপিলমুনির দিক গাড়ি যায়। এগোতি এগোতি সুযোগ পালিই আমরা বর্ডার পার হয়ে যাবানে, কিরাম।
জয়ি হাসিমুখে তাকাল। রুপাইয়ের চোখে বাবার কথায় সায়, শুধু মিহিরের মুখে কথা নেই। পিদিম বলল, মনে আছে তো তোমাগের নাম ? জয়ি ? তোমার নাম কী।
সালমা।
মিহির ? নাম মনে আছে তো ?
মিহির নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
পিদিম মুখ ঘুরিয়ে রুপাইয়ের দিকে তাকাল। বলল, বাজান তোর মনে আছে তো ?
আছে বাবু। আমার নাম হইলো গিয়ে (হলোগে) জহির। জহির শেখ।
পিদিম বলল, তোর ভাইকে জিজ্ঞেস কর নাম মনে আছে কি না।
রুপাই সংকোচে বলল, মিহির ? কবি না তোর নাম ?
আমার নাম মিহির।
বাতাসে পূর্বপুরুষের সায়। পূর্বজ নারীদের সায়। বটপাতা দুলিয়ে বাতাস এগিয়ে গেল তীর থেকে নদীর দিকে। ওদের শরীরের ঘ্রাণ নক্ষত্রের চাপা আলোর রাতে ওপারে গিয়ে পৌঁছাল। ওপারে পৌঁছাল ওদের মন। পিদিম চাপা স্বরে বলল, মনে হতিছে বাঁইচে যাব। আমার বিশ্বাস মিছা হয় না। হয় জয়ি ?
জয়িতা বলল, তুমার কি ভয় করতিছে ?
পিদিম সহধর্মিনীর দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে চেষ্টা করল। কিন্তু তার মন অবশেষে নিরস্ত হয়েছে।
সবাই মিলে একটা বাজকুরার ডাকের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকল।
পিদিম পালের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে শামসু হালদার। অন্ধকারে হাতঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বলল, জানতাম মালাউনগুলা পলানোর চেষ্টা করতিছে। নুরু গাদ্দারটারে সেদিন লস্কর মিয়া এগের বাড়িত ঢুকতি দেখিছে। লম্বা সুমায় ধইরে ছবক দিছে নুরু হারামজাদা।
রাতের অন্ধকারে শামসু হালদারের মুখের ভাব বুঝতে চেষ্টা করছে আশরাফ। শামসু হালদার চোটপাট বেশি করে। তাকে কথায় সহজেই খচিয়ে দেওয়া যায়। আশরাফ বলল, লস্কর কাছে যায়ে দেখিছে ?
তুমার মতো নাকি বুদ্ধি। কাছে গিয়ে খবরদারি কইরে টের পাওয়ায়ে দিক আরকি ?
পিদিম পালের বাড়ি ঘেরাও করতে তেরোজন এসেছে। ভেতরে যদিও একটা তেলের পিদিম নিভু নিভু জ্বলছে, বাড়িতে কেউ নেই তা বোঝা যায়।
শামসু হালদারের সবচাইতে মারকুটে সহকারীর নাম লস্কর মিয়া। বয়স ত্রিশ। তার মাথা থেকে সরিষার তেলের গন্ধ আসে সারাক্ষণ। তার আরেক নাম সরিষা লস্কর। সে চিৎকার করে উঠল, এই পিদিম! এই মিহির, রুপাই। কনে তুরা! হারামখোরের দল। বাইরা কলাম। আমি আইসে পালি কলাম খুব খারাপ হবি!
সাড়া না পেয়ে লস্কর দরজার পাশে সারি করে মাটির ঘটগুলো লাথি দিয়ে ভেঙে ফেলল। শব্দ পেয়ে সচকিত হয়ে তাকাল পাকিস্তানি সেনা দুজন। একজন গলা উঁচিয়ে কিছু একটা বলল ওদের। উত্তরে শামসু হালদার উত্তরে হাসিমুখে উর্দুতে বলল, এখনই বাইর করতিছি হুজুর।
আশরাফ বলল, আর করিছ। তোমাগের বেশি বুদ্ধি, তাই তো যত গণ্ডগোল। দ্যাহো পলাইছে সব। আমি কষ্ট কইরে হুজুরগের ডাইকে আনলাম। এখন সব পালালি পারি লাত্থি দেবে নে।
শামসু হালদার এইসব পরোয়া করে না।
না, লাত্থির পরোয়া আমিও করি না। তয় আমার রাইফেলখান কাইড়ে না নিলিই হয়। লাথি খালি পারি হজম হইয়ে যাবেনি (যাবেনে)। কিন্তু রাইফেল কাইড়ে নিলি জানে বাঁচপো না।
শামসু বলল, তুমার রাইফেলটা কাইড়েই নিয়া দরকার বুঝিছ ?
আশরাফ শূন্যে তালি মেরে বলল, শালার মশা কেমন বাড়িছে দেখিছ ? গিরাম দেশে কিন্তু এতো মশা থাকে না। গ্রামে স্থানে স্থানে রক্তের ডোবা হয়ে আছে। মড়ার গন্ধে হাঁটা যায় না। ডোবাগুলো লাশের ভাসমান ভাগাড়। এর ভেতর শুধু মশা মাছিই না। বিশেষ একরকমের পরজীবীও আজকাল চোখে পড়ে। এরা কুয়াশার মতো ভাসতে থাকে, চোখে মুখে লেগে যায়। গ্রামে শেয়ালের উৎপাতও বেড়ে গেছে। এই মুহূর্তে একটা শেয়ালের জ্বলন্ত চোখ দেখা যাচ্ছে বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড়ে। নির্ঘাৎ চারপাশে আরও এক ডজন আত্মগোপন করে আছে।
শামসু বলল, লস্কার একা অনেক করিছে। তুমি একটাবার হাঁটুর মটকা ভাঙো দেখি ? নাকি খালি মুখই নাড়বা।
আশরাফ বলল, আইচ্ছা লস্কার আইসে নিক। তোমার জবান ঠাণ্ডা করতিছি। ওরে খালি একটু আগে ভিতরে ঢুকতি কও। তারপর আমি যাই।
আর গেছ! শামসু হালদার হাতঘড়ি দেখল।
আশরাফ বলল, লস্করের আসলে যাতি ভয় করতিছে। মিহির ছাওয়ালডারে লস্কর কলাম একটু ভয়ই করে।
বাড়িটা ঘিরে ফেলেছিল যারা, তারা একে একে উঠানে ফিরে আসছে। হাতে বেয়নেট রাইফেল।
তালি আর দেরি ক্যান। সবরে ডাকো। কও যে বাড়ি ঘিরাও দে আর লাভ নাই। মালাউনগুলান ভাগিছে। কনে যাতি পারে ?
শামসু হালদার বলল, এই বুদ্ধি লইয়ে আইছ তুমি রাজাকারি করতে (করতি)। শৈলমারী ছাড়া আর কনে যাবার পারে। কলাম না নুরু মাঝি আছে এর মদ্যি ?
আশরাফ বলল, তালি ডাকো সবাইরে। হুজুররা যাবে আমাগের সঙ্গে, নাকি ওদের ধইরে আনব।
শামসু বলল, হুজুররা সঙ্গে সঙ্গেই যাবেন। সমস্যা নেই।
লস্কার বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়েছে। কেউ নেই। কিন্তু সারি সারি মাটির তৈজস সাজানো। একটা বড় টেবিলে কিছু বইপত্র। একটা খাতা খোলা পড়ে আছে। দুই পাতার ভাঁজে কিছু একটা রাখা। সেটা যে কী তা দেখতে লস্কর এগিয়ে গেল। কাছে গিয়ে দেখে, বাংলায় চার কলেমা উচ্চারণসহ একটা সাদা পাতার ওপর কালো কালিতে লেখা। লস্কর কাগজটা নিয়ে বের হয়ে এল।
পাকিস্তানি সেনা দুজন অধীর হয়ে উঠে ঘোড়ার মতো পা ঠুকছে মাটিতে। পা থেকে পায়ে ভর বদল করছে। অপারেশনের আগে এরা শরীরে সিরিঞ্জভর্তি ওষুধ প্রবেশ করায়। সেই ওষুধ আবার গড়ে ছয় ঘণ্টা কাজ করে। রূপসা ক্যাম্প থেকে বিস্তর পথ গাড়িতে আসতে হয়েছে। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল খুররমের মৃত্যু।
খুররম নামে এক বেলুচ সেনা ঘাড়ের ধমনী কেটে আত্মহত্যা করেছে। হত্যা না। আত্মহত্যাই। ঝটকা দিতে থাকা তার হাতের ভেতর স্টেইনলেস স্টিলের রুপালি ছোরাটা তখনও সেঁটে আছে। খুররম সেটা মুঠো থেকে ছাড়েনি শেষ পর্যন্ত। এক সপ্তাহ আগে প্লাটিনাম জুট মিলে শ্রমিকদের বয়লারে ফেলে পুড়িয়ে মেরেছিল যারা, তাদের ভেতর খুররম ছিল। ড্রাগের প্রভাব কমে এলে তার উৎসাহ কমে আসে। ধীরে ধীরে একদম নীরব হয়ে গিয়েছিল।
শোলমারী নদীতে কোনও নৌকা ছিল না। কিন্তু একটা বাজকুরা হঠাৎ নিখুঁত ডেকে উঠল। বাজকুরার ডাক শুনলে ভয় করে। মনে হয় কোনও বৃদ্ধার কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে বুঝি। পরমুহূর্তে কর্কশগলার মোরগের ডাকের মতো মনে হয়। একেকবার বাজকুরা হঠাৎ ডেকে উঠে হয়ত ডালবদল করে। তখন তাদের পাখসাটের শব্দ পাওয়া যায়। বাজকুরার বিরাট ডানা। তাকে না দেখতে পেলেও এই ডানার শব্দ কানে আসে। এই ঋতুতে, এই প্রথমবার বাজকুরার ডানার শব্দ পাওয়া গেল না।
সবার আগে জয়ি নড়ে উঠল। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সবাই তাকাল নদীর দিকে। কোনও নৌকা নেই বলেই প্রথম দর্শনে মনে হয়। পরে কচুরিপানার স্তূপের নিচে নৌকার সূক্ষ্মাগ্র কাঠামোটা চোখে পড়ে। নৌকার খলুইয়ে জল ভরে সেটাকে বানানো হয়েছে যথেষ্ট ভারি যেন জলের ওপর তিনভাগের একভাগ চোখে পড়ছে।
নৌকায় ওঠার পর জয়িতা কথাটাই সবার আগে বলল। কচুরিপানা ফেলবেন না ?
নুরুমাঝি নৌকাটা চালিয়ে এপারে আসেনি। ওপার থেকে সাঁতরে নৌকা ঠেলতে ঠেলতে এদিকে এসেছে। তার মাথায় বাঁধা কাপড়টাও আর শুকনো নেই। তবু নেমে আবার যাত্রা শুরুর আগে সেটা পরে নিয়েছিল। একটা খাটো পাঞ্জাবি মতোন জামা। তীরের মাটিতে বৈঠা ঠেকিয়ে নৌকাটাকে গভীর জলে ঠেলে দিল নুরু মাঝি। বলল, যার যার নাম মনে আছে তো তোমাগের ? কলেমা মনে আছে ?
পিদিম বলল, আছে। নারায়ণ গোলদারের বাড়ি কতদূর ?
নুরু বলল, দেখতে দেখতে পৌঁছায় যাবানে। স্রোতের উল্টা দিকে পড়িছে তো―একটু সুমায় লাগতি পারে। সে আমি দেকতিছি। ও নিয়ে চিন্তা কইরে না।
নুরু।
কী।
একটা কথা।
কী কথা ?
নুরু উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে। পূর্ব দিকে মৃত্যুপুরী গ্রাম দুলছে। পশ্চিমে দুলছে আশার প্রান্তর। মাঝখানে নদীর সঙ্গে বৈঠার জলকথা ছাড়া কোনও শব্দ নেই।
পিদিম চোখ বন্ধ করে বলল, না, কিছু না।
নুরু হাসল। বৈঠার পাশ বদল করে বাইতে থাকল। ডান বাহু ধরে গেছে।
নৌকা যখন মাঝনদীতে, ওদের গায়ের ওপর টর্চের আলো এসে পড়ল। তীর থেকে কেউ চিৎকার করছে। জয়ি বলল, কে ডাকে ?
নুরু বলল, কেউ না বৌদি। সবাই যেমন আছ তেমন কইরে থাকো। নড়বা না। আমি দেখতিছি।
নুরু মাঝির নাম ধরে কেউ ডাকছে। শোলমারী মেঘনার মতো প্রশস্ত নদী নয়। এখানে কিনার থেকে কেউ ডাকলে শুনতে পাওয়ার কথা। কিন্তু বাতাসের গতিপথের কারণেই বোধয় কথাগুলো ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল। তীরের দিকে আহ্বান করছে কেউ। পিদিম বলল, হরিনাম করো সবাই। ভয়ানক বিপদ। এই গলা আমি চিনি।
সেই মুহূর্তে বাতাসের বেগ ওদের দিকে ঘুরে গেল। স্পষ্ট ডাক এসে কানে লাগল। এই নৌকা! না ঘুরালি গুলি করব খোদার কসম!
নৌকা ভিড়ল আবার আগের তটে। কচুরিপানা সরিয়ে নৌকার পাটাতন থেকে চারটা জীবিত দেহ আবিষ্কার করল শামসু হালদারের ডানহাত লস্কর। গোটা তীরে আরও বারো তেরোজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঢালু তীর থেকে দূরে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে ধূমপান করছে পাকিস্তানি সৈন্য দুজন। গোটা ঘটনাযজ্ঞে ওরা যেন ঈশ্বর। থেকেও নেই। যখন খুশি আসবে। যখন আসবে, নিয়ন্ত্রণ করবে।
পায়ে পায়ে এগিয়ে আসতে থাকল ওরা।
কূলের নরম ঘাসে সবাইকে হাঁটু গেঁড়ে বসানো হয়েছে। হাত পিছমোড়া করে বাঁধা।
সৈন্যদের একজনের ঠোঁটে হাসি। উর্দুতে বলল, এরা কোন ধর্মের লোক ?
হিন্দু।
ওদেরই বলতে দাও। এই। কোন ধর্মের লোক তোমরা ?
পিদিম মুখ তুলল। কথা ছিল বাঁচার জন্যে মিথ্যে বলবে। কিন্তু এখন আর মন সায় দিল না।
জি, সনাতন ধর্মের মানুষ আমরা।
এটা আবার কোন ধর্ম ? সৈন্য জিগ্যেস করল।
লস্কর বলল, হিন্দু হুজুর।
অ। চালাকি। কী, চালাকি করো নাকি। পিদিমের দিকে তাকিয়ে বলল প্রথম সৈন্য।
পিদিম বলল, জি না।
রুপাই আর মিহিরকে দেখিয়ে বলল, এরা তোমার ছেলে ?
জি না।
সৈন্য বলল, তোমার ছেলে হোক আর না হোক এদের কপাল একই হবে।
লোকটা শামসু হালদারের দিকে তাকিয়ে বলল, এদের আলাদা দাঁড় করাও।
রুপাই আর মিহিরকে বসা থেকে উঠিয়ে আলাদা দাঁড় করানো হলো।
নুরু বলে উঠল, হুজুর। ওদের মারবেন না।
সৈন্য বলল, তুমিও হিন্দু ?
আশরাফ এখানে আসার পর আর কোনও কথা বলেনি। উৎসাহী হয়ে বলল, না হুজুর। ও মুসলমান।
শামসু হালদার বলল, মুসলমান। কিন্তু দ্বীনের শত্রু।
প্রথম সৈন্যের ঠোঁটে হাসি ফুটল। এ সময় দ্বিতীয় সৈন্য এসে তার কানে কানে কিছু বলল। তাকে হাসি আরও বেড়ে গেল। সশব্দেই বলল, দিমাগ খারাব হুয়া তুমহারি ? তফাৎ যাও। লস্করের দিকে তাকিয়ে বলল, এই পাঁঠা। বন্দুক নিয়ে প্রস্তুত হও। ওরা কেউ দৌড়ালে তোমাকে গুলি করব।
লস্কর ভড়কে গেল। আরেক সঙ্গীকে ইশারা করে রুপাই আর মিহিরের দুপাশে দাঁড়াল।
জয়ি বলল, হুজুর ওদের মারবেন না।
দ্বিতীয় সৈনিক উর্দুতে শান্ত গলায় বলল, মাইজি। এটাই যুদ্ধ।
প্রথম সৈন্য বলল, ইকবাল। তুমি এই নারীকে মাইজি বললে কেন ? এদেরকে নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা তুমি জানো। কেন মাইজি বললে ?
মাইজি বললে বা না বললে তোমাদের মতো মানুষের কী আসে যায়।
খবরদার ইকবাল। তুমি ওদের সামনে আমার সঙ্গে কীভাবে কথা বলছ।
ঠিকই করছি। তোমাকে যা বলা হয়েছে তুমি তাই করছ ওয়ারিশ। আমাদের এমন কথা ছিল না।
কী কথা ছিল আমাদের ?
হঠাৎ মিহির সবেগে লাথি মারল লস্করের কব্জিতে। তার রাইফেলের দিক ঘুরে গেল। সঙ্গেসঙ্গে সরব হলো অপরদিকে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় রাইফেল। মিহিরের পা লক্ষ্য করে গুলি করা হলো। লাগল রুপাইয়ের কোমরে। রুপাইকে যেন একটা ষাঁড় এসে ধাক্কা দিয়েছে। উড়ে গিয়ে পড়ল মিহিরের ওপর। চারটা রাইফেল চারদিক থেকে ওদের দিকে তাক করা হলো।
জীবনের সমস্ত চেপে রাখা ব্যথা জড়ো হয়ে রুপাইয়ের কণ্ঠ চিরে বেরোল।
ওয়ারিশ উর্দুতে বলল, একটু খেলতে চেয়েছিলাম। সব মাটি করে দিল। যাক। লোকটাকে সামনে আনো। নিজেকে যে মুসলমান দাবি করছে।
শামসু হালদার নুরুকে ধরে সামনে এনে হাঁটু গেঁড়ে বসিয়ে দিল।
ওয়ারিশ বলল, তুমি মুসলমান ?
জি।
আমি বিশ্বাস করি না।
নুরু মাঝি বলল―ইমানে, আমি মুসলমান।
প্রমাণ দাও। নামাজ পড়ে দেখাও। দুই রাকাত পড়বে। যদি নামাজ শুদ্ধ হয়, তুমিসহ প্রত্যেকে ছাড়া পাবে। ভুল হলে সবাই মরবে। তোমার ওপর নির্ভর করছে সব। কী বললাম শুনেছ ?
জি।
যাও, ওজু করে এস। এই কেউ ওর বাঁধন খুলে দাও।
নুরু মাঝি ওজু করছিল। গুলির শব্দে চমকে তাকাল। সবার বিস্ফারিত চোখের সামনে রুপাইয়ের মাথায় গুলি করা হয়েছে। ওর খুলি ফেটে ছড়িয়ে পড়েছে ঘাসের ওপর।
ওয়ারিশ বলল, এ ছেলে কষ্ট পেত। এটাই ভালো হলো ওর জন্যে। এনিওয়ে। কই। ওজু হলো ?
রুপায়ের দেহটা সরিয়ে নিয়ে গেল লস্কররা। চাপা কণ্ঠে কেঁদে উঠল মিহির―দাদা!
ওয়ারিশ বলল, তুমিই দায়ী তোমার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য। আর কোনও গোলমাল কোরো না।
এই বাস্টার্ড! রাজাকার শামসু হালদারের দিকে রাইফেল তাক করে বলল ওয়ারিশ। ওজু হয়নি ওর ?
শামসু এগিয়ে গেল নুরু মাঝির দিকে। নুরু তখনও ওজু করছে। গুলিয়ে ফেলছে সব। একবারের জায়গায় তিনবার মাথা মাসেহ করল।
ইকবাল কাছে এসে বলল, ওয়ারিশ তুমি থামো।
ওয়ারিশ বলল, তুমি কি নিজের মৃত্যুর পথ পরিষ্কার করছ ? তফাৎ যাও। উই আর অ্যাট এ পয়েন্ট অব নো রিটার্ন নাও। এখান থেকে ফেরার কোনও সুযোগ নেই। তোমাকে একা পেলে ওরা বুনো শুয়োরের মতো মারবে। তুমি জানো।
ইকবাল নির্বাক তাকিয়ে রইল। নুরুর ওজু শেষ হয়েছে।
ওয়ারিশ বলল, আমি কথা রাখব। এই মাঝি যদি ঠিকঠাক দুই রাকাত নামাজ পড়তে পারে, আমি ওদের ছেড়ে দেব। মুসলমানের এক জবান। ঠিক আছে ?
শোলমারীর তীরে রাত। নুরু নামাজে দাঁড়িয়েছে।
আকাশের বিছানায় নক্ষত্রেরা শয্যাবদল করছে। পশ্চিম আলো করে উঠেছে কৃষ্ণপক্ষে চাঁদ।
নামাজ চলছে। বুঝি কোনও দিন শেষ হবে না।

 

 

[চরিত্রের নামগুলো কাল্পনিক। স্থান, কালও লেখকের কল্পিত। নামাজকেন্দ্রিক ঘটনাটা সত্যি। বাস্তবের ‘নুরু’ তীব্র মানসিক চাপে নামাজে ভুল করেছিল। অতঃপর তাকেসহ প্রত্যেককে হত্যা করা হয়। (১৯৭১: গণনির্যাতন-গণহত্যা, সম্পাদনা―আফসান চৌধুরী; কথাপ্রকাশ সংস্করণ)]

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত