| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: দুই বিছানা । শাহনাজ মুন্নী

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

ঘুম ধুম ষ্টেশনে ট্রেনটা এসে থামলো দুপুরের একটু আগে আগে।
কয়েক জোড়া অল্পবয়সী দম্পতি ছাড়া ছোট্ট নিরিবিলি ষ্টেশনটাতে খুব বেশি যাত্রী নামলো না। নিজেদের সুটকেসটা হাতে নিয়ে ষ্টেশনের বাইরে বেরিয়ে এলো তারেক ও রুমানা। কয়েকটা রঙীন চক্চকে রিকশা দাঁড়িয়ে আছে যাত্রী তোলার জন্য।
রোজ মেরী তারকা হোটেলের নাম বলতেই একটা রিকশা এগিয়ে এল। চমৎকার মিষ্টি একটা রোদ উঠেছে চারপাশ আলো করে। শান্ত শহরটা পরিচ্ছন্ন, গাঢ় ঘন সবুজ আর বেশ ফাঁকা ফাঁকা। সোজা রাস্তাটা একটা বাঁক নিতেই দূরে দেখা গেল নদীর সরু রুপালি রেখা, সূর্যের আলো পড়ে চিক্্ চিক্ করছে। মনটা হাল্কা ফুরফুরে হয়ে গেল ওদের।
একটা ছিমছাম দোতলা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থামলো রিকশাটা। এটাই রোজমেরী। সামনেই রিসিপশান।
তরুণ বয়সী রিসিপশনিষ্ট ছেলেটির পরনে সাদা শার্ট। গলায় কালো বো। জেল দিয়ে পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল। মুখে নম্র আর বিনয়ী হাসি। রেজিষ্টার খাতাটা দেখে নিয়ে সে বললো,
‘আপনারা দুজনের জন্য একটা রিভার ভিউ রুম চেয়েছিলেন স্যার, আমরা সেরকম রুমই দিয়েছি …’
রুমটা প্রশস্ত আর পরিস্কার। পশ্চিমদিকে দেয়াল জোড়া কাঁচের জানালা, পর্দায় ঢাকা।
‘পর্দা সরালেই নদী আর পাহাড় দেখতে পাবেন স্যার।’ সুটকেস হাতে নিয়ে সঙ্গে আসা অল্পবয়সী হোটেল বয় বললো। কিন্তু জানালার দিকে তাকিয়ে নয়, ঘরের আসবাবের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে গেল তারেক —রুমানা দম্পতির।
একটু অবাক হয়েই তারেক জিজ্ঞেস করলো, ‘এই রুমটাই কি আমাদের জন্য? ঠিক জানো তুমি?’
‘জ্বি, স্যার এটাই, রুম নং —১২৩।’
রুমানা তাকালো স্বামীর দিকে, ‘ব্যাপার কি? তুমি কি ওদের ঠিকভাবে বলো নাই?’
তারেক বললো, ‘বলেছি তো। বুকিং—এর সময়ই বলেছি, ডাবল রুম, ডাবল বেড।’
‘তাহলে এটা কি?’
রুমানা আঙ্গুল তুলে দেখায়। আঙ্গুল দিয়ে না দেখালেও চলতো কারণ শুধু রুমানা না, তারেকও দেখেছে, রুমের দুই পাশে দুইটা চিকন সিঙ্গেল খাট পাতা। বিয়ের দুই বছর পর এক্কেবারে নতুন আর অচেনা এই পর্যটন স্পটে দ্বিতীয় হানিমুনে এসেছে ওরা। সেখানে এই কি থাকার ব্যবস্থা? নাকি অব্যবস্থা?
তারেক আর রুমানা দ্রুত রিসিপশানে নেমে আসে।
রিসিপশনিষ্ট ছেলেটি বিনয়ে একদম গলে যায়, ‘কি অসুবিধা স্যার? আপনি যেমনটি বলেছিলেন, তেমন রুমই তো দিয়েছি স্যার! সবচাইতে সুন্দর ভিউ এই রুমেই আছে! একবার পর্দাটা সরিয়েই দেখুন না স্যার’
তারেক বললো, ‘ না, না, ভিউ ঠিক আছে। বাট, রুমটা বদলে দিন আমাদের। উই আর কাপ্ল। ডবল বেডের একটা রুম দিন।’
‘ডাবল বেডই তো আছে।’
‘টু সিঙ্গেলের ডাবল না, একটা ডাবল বেডের রুম চাই।’
‘কিন্তু, ক্ষমা করবেন স্যার, আমাদের এখানে আর কোন ডাবল বেডের রুম নেই স্যার !’
‘কি বললেন?’
‘জ্বি স্যার, মাফ করবেন, এটা পর্যটনের ভরা মৌসুম। এখন আর কোন রুমই খালি নেই।’
‘ঠিকাছে, এক কাজ করুন, বেড দুটো একসাথে জোড়া লাগিয়ে ডাবল করে দিন।’
‘সেটাও তো সম্ভব নয় স্যার ! ওগুলো ফিক্সড বেড !’
রেগে গেল তারেক। বললো, ‘থাক্। এই হোটেলে—ই থাকবোই না। চলো, শহরে নিশ্চয়ই আরো ভালো হোটেল আছে।’
রিসিপশনের ছেলেটি হা হা করে উঠে।
‘যাবেন কেন স্যার? আর যাবেনই বা কোথায়? আমাদের পুরো ঘুমধুমে এই একটাই ভাল হোটেল। অন্য যেসব আছে সেগুলি সব চিৎ কাৎ হোটেল, পান্থ নিবাস আর সরাইখানা, ম্যাডামকে নিয়ে থাকতে পারবেন না। পরিবেশ একদম ভাল না। নোংরা।’
তারেক একটু দমে যায়। জায়গাটা তার ঠিক চেনা নয়। বন্ধুদের কাছে শুনে আর ইন্টারনেট দেখে ওয়াইল্ড এ্যডভেঞ্চার করার উদ্দেশ্য নিয়েই এখানে এসেছে ওরা। শুনেছে এখানকার পাহাড়ি নদীটা অসাধারণ, পাহাড় পেরুলে একটা চমৎকার মন ভুলানো ঝর্ণাও নাকি দেখতে পাওয়া যায়, অথচ গোল বাঁধালো কিনা হোটেল রুমের এই বিসদৃশ শয্যা বিন্যাস !
তারেক খানিকটা অসহায়ের মতো রুমানার দিকে তাকায়। আর রুমানাই এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করে তাকে, বলে, ‘আচ্ছা, এখন মাথা গরম করো নাতো, চলো, আগে রুমে যেয়ে ফ্রেশ হই, তারপর দেখা যাবে !’
‘ধুর ! আমাদের কোন কিছুই ঠিকঠাকভাবে হয় না।’ রুমে এসে হতাশ গলায় বলে তারেক। ‘কোথায় এক বিছানায় শুয়ে তোমার সঙ্গে জড়াজড়ি করে থাকবো, তা না, এই পারে আমি আর ওই পারে তুমি।’
রুমানা সুটকেসের তালা খুলে চেঞ্জ করার জন্য জামা কাপড় বের করে বললো,
‘এই, তুমি যেভাবে ‘ডাবল বেড’ ‘ডাবল বেড’ বলছিলে, লজ্জ্বাই লাগছিলো আমার ! বেড মানেই কেমন শোয়া—শুয়ির ব্যাপার এসে যায় …’
‘তো কি হয়েছে? শোয়া এবং বউকে জড়িয়ে ধরে শোয়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ! গবেট হচ্ছে এই হোটেলের লোকগুলো যারা কাপলদের জন্য সিঙ্গেল বেড রেখেছে !’
বলতে বলতে রুমানাকে জড়িয়ে ধরে তারেক । টপাটপ কয়েকটা চুমু খায়। শরীর মুচড়ে তারেকের আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হয়ে বাথরুমে চলে যায় রুমানা। এবার জানালার পর্দা সরায় তারেক, মনে হয়, জলরঙে আঁকা স্রোতস্বিনী নদীটা ঝপ্ করে চোখের সামনে উঠে এলো, আর সবুজের একটা স্নিগ্ধ স্রোত মুহুর্তে ভাসিয়ে দিলো তাকে। মুগ্ধ হয়ে গেলো তারেক। বাথরুম থেকে বেরিয়ে একই মুগ্ধতায় আলোড়িত হয় রুমানাও।
রোজমেরীর রেষ্টুরেন্টে দুপুরের খাবার সেরে একটা সিঙ্গেল খাটেই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে প্রায় লেপ্টালেপ্টি করে শুয়ে থাকে দুজন। এই দু’হাত প্রস্থের খাটে গড়াগড়ি করার সুযোগ নেই, গড়ান দিলেই নিচে পড়ে যাবার সমূহ আশংকা।
‘সব খারাপেরই একটা ভাল দিক আছে, বুঝছো রুমি !’ বেশ বিজ্ঞের মতো বলে তারেক।
‘কি রকম?’
‘এই যে ধরো, খাট—টা সিঙ্গেল বলেই না তুমি আমার বুকের কাছে এমন লেগে আছো, ডানে বামে জায়গা থাকলে তুমি ঠিক গড়িয়ে সরে যেতে, জায়গা নাই, তাই তোমার সরবার উপায়—ও নাই। হে হে হে …’
তারেক রুমানাকে আরো জোরে বুকের উপর চেপে ধরলে, রুমানা নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। হুড়োহুড়িতে আর রুমানার ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে সরু খাট—টা থেকে গড়িয়ে ঠাস্ করে নিচে পড়ে যায় তারেক। স্বামীর এই আকস্মিক পতন দেখে কয়েক মুহুর্তের জন্য থমকে যায় রুমানা,
‘এই ব্যাথা পেয়েছো? কেন যে এমন করো …’
পরে গিয়ে প্রথমে একটু থতমত খেয়ে গেলেও একটু পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে হো হো করে হেসে উঠে তারেক। আরেক দফা হাসাহাসি আর জড়াজড়ি, আর গড়াগড়ি চলে।
বিকেলে ঘুরতে বের হয় দুজন। নদীর পার দিয়ে হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়ায়, টং—এর দোকান থেকে গরুর দুধে বানানো ঘন চা কিনে খায়। নদীর জলে অপরূপ সূর্যাস্ত দেখে। তারা একমত হয় জায়গাটায় রূপের তীব্র চমক না থাকলেও এক ধরনের স্নিগ্ধতা আছে।
রাতের খাওয়া সেরে যখন তারা রুমে ফিরে এলো, তখন দুজনের শরীরই ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে।
‘দেখো, রাতে একদম অসভ্যতা করবে না, দুইটা খাট আছে, দুইজন চলো আরাম করে ঘুমাই।’ রুমানা বলে।
প্রথমে একটু আপত্তি করে তারেক। ‘এটা কেমন কথা? এমন জায়গায় বউকে কাছে না পেলে চলে ..’ এসব বলে গাঁইগুঁই করে সে। তারপর হার মানে। বলে,
‘ওকে। তুমি যা চাও তাই হবে। তোমার কথাই আমার কাছে আদেশ।’
সেই মতে, গত দুই বছরের মধ্যে প্রথম দুই জন দুই পাশ ফিরে দুই বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে। অবসন্ন শরীরে ঘুমিয়ে পড়তেও খুব বেশি দেরী হয় না।
পরদিন সকালে যখন রুমের ভেতর সূর্যের আলো এসে লুটোপুটি খাচ্ছে তখন প্রথম ঘুম ভাঙে রুমানার। বেশ একটা প্রশান্তিময় ফুরফুরে আনন্দের অনুভুতি হয় তার। যেন অনেকদিন পর এমন আরামের নিরবিচ্ছিন্ন একটা ঘুম হলো। সে দেখলো, পাশের বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে তারেক। তাহলে কি ওর’ও রুমানার মতোই ভাল লেগেছে একা একা ঘুমাতে?
রুমানা নিজের বিছানা থেকেই তারেক—কে ডাক দেয়, ‘এই দুপুর হয়ে গেলো, উঠো না , শুনছো? উঠো..’
ডাক শুনেই হয়তো এপাশ ওপাশ করে উঠে বসে তারেক। বিছানায় বসে হাই তোলে, আড়মোড়া ভাঙে,
‘যা দারুণ একটা ঘুম হলো না, মনে হলো অনেকদিন এমন চমৎকার শান্তির ঘুম ঘুমাই না।’
সকালের নাস্তা খেয়েই ওরা বেরিয়ে পড়লো, একটা নৌকা ভাড়া করে চলে গেল নদীর অন্য পারে, ছোটখাটো পাহাড়টা হাঁচড়ে—পাঁচরে পেরিয়ে এসেই চোখে পড়লো একটা হাসিখুশি চঞ্চল ঝর্ণার উদ্দাম উচ্ছল নৃত্য। পুরোটা বিকেল সেখানে কাটিয়েও যেন তৃষ্ণা মিটলো না ওদের। পাহাড় আর নদী পেরিয়ে রুমে ফিরতে ফিরতে রাত নামলো। ক্লান্ত ছিল দুজনেই, ফলে যার যার বিছানায় শুয়ে আগের রাতের মতোই গভীর ঘন গাঢ় ঘুমে ডুবে গেল ওরা। পরদিন সকালে সেই একইরকম আনন্দ ও আরামের অনুভ’তি নিয়ে ঘুম ভাঙলো ওদের। সকালটা শহরে টুকটাক ঘোরাঘুরি করে দুপরের ট্রেনে চড়ে ঢাকা ফিরে এলো তারেক—রুমানা দম্পতি।
‘দুটো দিন কি ভালই না কাটলো !’
উত্তরায় নিজেদের ছোট ফ্ল্যাটে রাতে এক বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে ঘুমধুমে কাটানো দিনগুলির স্মৃতিচারণ করছিলো রুমানা।
‘হুম! ঠিকই বলেছো!’ মুখে স্ত্রীকে সমর্থন করতে করতে একটা পা লম্বা করে রুমানার পায়ের উপর উঠিয়ে দেয় তারেক । এটা ওর পুরনো অভ্যাস, এতদিন পর্যন্ত স্বামীর এই অভ্যাসটাকে প্রশ্রয়—ই দিয়ে এসেছে রুমানা, কিন্তু আজ কেন যেন ব্যাপারটা ভাল লাগলো না তার।
‘তারেক, প্লিজ, পা সরাও, কি যে বাজে অভ্যাস না তোমার !’ একটু রুক্ষভাবেই হয়তো বললো রুমানা।
তারেক কিছু না বলে আস্তে করে পা—টা সরিয়ে নিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে কাৎ হয়ে শুলো।
‘এই, রাগ করলে নাকি?’ রুমানা জিজ্ঞেস করলো।
‘না। কিন্তু তোমাকে একটা কথা বলি, কিছু মনে করো না, তুমি না ঘুমের মধ্যে খুব হাত পা ছোঁড়াছুড়ি করো, আক্ষরিক অর্থেই, প্রতি রাতে তোমার লাথি হজম করতে হয় আমাকে।’
‘তুমি কিন্তু ঘুমের মধ্যে খুব শব্দ করে নাক ডাকো, এমন বিছ্ছিরি শোনায় …’
‘আর তুমি? তুমিতো ঘুমের মধ্যে সারাক্ষণই কথা বলো, একবার চিৎকার করে আপাকে ডাকো, ভাইয়াকে ডাকো একবার বাবা—মাকে ডাকো .. বিরক্ত লাগে ..’
‘তা বেশ। এত বিরক্ত হলে আলাদা বিছানায় থাকলেই হয় !’
‘হয়—ই তো।’
তারেক তার বালিশ নিয়ে ড্রইংরুমের সোফায় চলে যায়। আর বেডরুমের বিছানায় কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে ঘুমুবার জন্য চোখ বুঁজে রুমানা। পরদিন গেষ্ট রুমে একটা নতুন খাট নিয়ে আসে তারেক। ঘোষণা দেয়, আমি এখন থেকে এখানেই ঘুমুবো।
প্রতিদিন সকালে উঠে সাতটার মধ্যে বেরিয়ে যায় রুমানা, একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ায় সে। আর তারেক বের হয় আরেকটু দেরী করে দশটার দিকে, ফেরে রাতে আটটা নয়টার দিকে। রুমানা বিকেলের দিকে ফিরে আসে, রান্না বান্না করে, ঘর বাড়ি গুছায়। আগে রাতে ঘুমুবার আগে বিছানায় শুয়ে সারাদিনের এটা ওটা নিয়ে গল্প করতো দুজন। এখন আর সেটা হয় না। তারেক হয়তো টিভি দেখে, নয়তো মোবাইল ফোন টেপে আর রুমানা—ও হয় বই পড়ে নয়তো সকালে উঠার অজুহাতে নিজের বিছানায় হাত পা গুটিয়ে আগে ভাগে ঘুমিয়ে যায়। যেন হঠাৎ করে ওদের দু’বছরের বিবাহিত জীবন কেমন সাদামাটা আর নিরুত্তাপ হয়ে পড়ে। নিজেদের মধ্যে কথা—বার্তা, মান—অভিমান. খুনসুটি সব কিছুই কমে যায়।
এরমধ্যে রাজশাহী থেকে চিকিৎসা করাতে কয়েকদিনের জন্য ঢাকায় আসে রুমানার মা।
‘আম্মা, তুমি রাতে আমার সাথে ঘুমাবা।’ মায়ের গলা ধরে সোহাগ করে বলে রুমানা।
মা একটু অবাক হন, বলেন, ‘না, না, সে—কি তোরা স্বামী স্ত্রী তোদের মতো থাক, আমি গেষ্ট রুমে ঘুমাবো, কোন অসুবিধা হবে না।’
রুমানা বলে, ‘আসলে আম্মা, হয়েছে কি, গেষ্টরুমে তারেক ঘুমায়, তুমি আমার সঙ্গেই থাকো।’
রুমানার মা কপাল কঁুচকান, ‘গেষ্ট রুমে ঘুমায় মানে? তোদের মধ্যে কি ঝগড়া—বিবাদ হইছে? তারেক আলাদা ঘুমায় কেন? ব্যাপার কি?’
রুমানা মাকে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে আসে। তারপর দরজা বন্ধ করে সব কিছু খুলে বলে। সেই ঘুমধুমের হোটেল থেকে শুরু করে ঢাকায় নিজেদের কথা কাটাকাটি পর্যন্ত সব কিছু। মেয়ের বিছানায় শুয়ে শুয়ে চুপ—চাপ সব বৃত্তান্ত শুনেন রুমানার মা। তারপর বিশেষজ্ঞের মতো মাথা দুলিয়ে বলেন, ‘কাজটা ভাল করো নাই মা। খুব অবুঝের মতো কাজ করছো। শোনো, জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলে গেছেন, যত কলহ—বিবাদ হোক, স্বামী—স্ত্রীর বিছানা কখনো আলাদা করতে হয় না। বিছানায় অনেক কিছুর সমাধান হয়, টেবিল চেয়ারে হয় না।’
মায়ের কথা শুনে একটু ঘাবড়ে যায় রুমানা। বলে, ‘ কিন্তু .. কিন্তু.. এখন আমি কিভাবে আবার নিজে থেকে ওকে এক বিছানায় আসার কথা বলবো আম্মা? আমার একটা মান—সম্মান আছে না? .. আমি পারবো না, ওর কাছে ছোট হতে।’
রুমানার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘কি জানিরে মা, আমাদের আমলে তো স্বামীর কাছে মান সম্মানের কোন বালাই ছিলো না! তোদের দিনকালই আলাদা!’
দুই রাত মেয়ের বাসায় থেকে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তারেকের সাথে মিলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে ছেলের বাসায় চলে যান রুমানার মা। সেদিন সাপ্তাহিক ছুটি। খাবার টেবিলে বসে রুমানা হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা, এই যে আলাদা করে থাকছি, কেমন লাগছে তোমার?’
‘কেমন আবার? ভালই তো ! বেশ ব্যাচেলর ব্যাচেলর লাগে। তোমার লাত্থি—গুতা খেতে হয় না, ঘুমের মধ্যে আবোল তাবোল প্রলাপ বকা শুনতে হয় না।’
‘ঠিকই বলেছো, আমারো খুব শান্তি লাগে, তোমার ভয়াবহ নাক ডাকা শুনতে হয় না, যখন তখন গায়ের উপর কেউ একটা ভারী লোমশ পা তুলে দেয় না।’
রুমানা’ও মুখ ঝামটা দিয়ে প্রতি উত্তরে বলে। এরপর দুজনের কথা বার্তা আর বেশি এগোয় না। ঘরের মধ্যে একটা হিম—শীতল নীরবতা নেমে আসে।
সেদিন বিকেলের দিকে ওদের বাসায় আসে তারেকের প্রায় সম—বয়সি খালাতো ভাই কাম বন্ধু মোরশেদ। মোরশেদ চিটাগাঙে থাকে, অফিসের একটা কাজে ঢাকা এসেছে, পরদিনই আবার চলে যাবে। এমনিতে বেশ ফুর্তিবাজই ছিলো ও, কিন্তু মাস ছয়েক আগে স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স হওয়ার পর থেকে কেমন যেন গম্ভীর আর বিষণ্ণ হয়ে গেছে সে, হয়তো খানিকটা অস্বাভাবিক’ও।
মোরশেদ ঘরে ঢুকেই এদিক সেদিক মাথা নাড়িয়ে নাক টেনে গন্ধ শোঁকার ভঙ্গী করতে শুরু করে। ওর কান্ড দেখে ধমকে উঠে তারেক। ‘কিরে, কি কুকুরের মতো গন্ধ শুক্ছিস তখন থেকে? বস। একটু বিশ্রাম নে… হলোটা কি তোর?’
মোরশেদ আরো কিছুক্ষণ ঘরময় গন্ধ শুকে বেড়ালো। তারপর বললো, ‘রুমানাকে ডাক । আমার কাছে ব্যাপারটা ভাল ঠেকছে না।’
রুমানা রান্না ঘরে ছিলো, মোরশেদের ডাকাডাকি শুনে চা নাস্তা নিয়ে সামনে এসে বসলো।
‘ব্যাপার কি মোরশেদ ভাই?’
মোরশেদ বলে, ‘একটা সন্দেহজনক গন্ধ পাচ্ছি, নীতা যখন আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো তখন আমাদের সংসারে এই গন্ধটা প্রকট ভাবে পেতাম। তোমাদের ব্যাপার কি, বলো তো ভাই? সব কিছু ঠিক আছে তো? আমার যেন কেমন কেমন লাগছে…. ’
‘সব ঠিক আছে …’ তারেক এক ফুঁয়ে সব সন্দেহ উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। বলে, ‘আমরা চমৎকার আছি, দুইজন দুই ঘরে থাকি, কোন ঝগড়া—ঝাটি নাই, বিবাদ—বিসম্বাদ নাই। অল কোয়ায়েট ইন দ্যা ওয়েষ্টার্ণ ফ্রন্ট।’
তারেক হাত দিয়ে দেখায় সব শান্ত । মোরশেদ চায়ের কাপ হাতে তুলে নেয়, তারপর বলে, ‘বুঝেছি। ঠিক গন্ধটাই নাকে লেগেছে। আমাদের ডিভোর্স হওয়ার তিন মাস আগে থেকে আমরাও, মানে আমি আর নীতা আলাদা থাকতে শুরু করেছিলাম, আলাদা বিছানায়, আলাদা ঘরে …’
‘আরে না, না সেরকম কিছু না..’ তারেক ওকে বাঁধা দিয়ে বলে।
‘আসলে আমরা দুজন পারস্পরিক সম্মতিতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি..’ রুমানা বলে।
মোরশেদ কথা শেষ হওয়ার আগেই মাথা নাড়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘হঁ্যা, ঠিক। নীতা আর আমিও নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তো তোদের সমস্যাটা কি, বলতো দেখি ! সমস্যাটা জানলে সমাধানের একটা চেষ্টা করা যায়।’
তারেক আর রুমানা পরস্পর মুখ চাওয়া—চাওয়ি করে। ‘সমস্যা? কোন সমস্যা তো নেই।’
কিন্তু মোরশেদ সেটা বিশ্বাস করলে তো ! সে পীড়াপীড়ি শুরু করে। বলে, ‘দেখরে ভাই, কোন কিছু হারানোর আগে বোঝা যায় না, তার মূল্য কত ? নীতাকে হারিয়ে আমি বুঝতে পারছি কি হারালাম ? প্লিজ, তোরা মিটমাট করে নে। নয়তো আমাকে বল্্, আমি মধ্যস্থতা করতে রাজি আছি।’
তারেক আর রুমানা যতই বলে, কিছুই হয়নি, সব ঠিক আছে, মোরশেদ ততই বিষয়টি পেঁচাতে থাকে। ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকে। বার বার নাক কঁুচকে গন্ধ শোকার চেষ্টা করে।
শেষ পর্যন্ত মোরশেদ-কে শান্ত করার জন্যই তারেক বলে,‘শোন, আমরা চমৎকার আছি। তুই নিজের চোখে দেখে যেতে পারবি, আজকে রাতে তোর সম্মানে আমরা একসাথে এক ঘরে এক বিছানায় থাকবো, খুশি তো?’
মোরশেদ বলে, ‘ না, না, আমার সম্মানে নয় শুধু, সারাজীবন তোরা নিজেদের ভালোর জন্যই একসাথে থাকিস, তাহলেই খুশি হবো। ভাঙনের গন্ধ অসহ্য লাগে আমার।’

রাতে এক বিছানার দুই পাশে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকে দুই জন। রাত বাড়ে। তারেক হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, ‘ঘুমাইছো?’
‘উহু’ রুমানা বলে। কিছু সময় নিঃশব্দে কেটে যায়। ‘এই’ রুমানা ডাকে।
‘কি?’
‘তোমার পা—টা আমার পায়ের উপর একটু রাখো না প্লিজ ..’
‘ভারি, লোমশ পা?’
‘হুম।’
‘খারাপ লাগবে না তো?’
‘উহু।’
রুমানার অস্ফুট লাজুক কন্ঠ শোনা যায়। বহুদিন পর তারা আবার দুই থেকে এক হয়। এক থেকে বহু হয়। ঘুমধুমের অচিন ঝর্ণা নেমে আসে তাদের বিছানায়, ঝর্ণার ফেনীল জলে ভাসতে ভাসতে তারা প্রজ্জলিত হয়, এক জোসনা থেকে আরেক জোসনার ঘোরে নিমজ্জিত হয়, এক যমুনা থেকে আরেক যমুনায় প্রবাহিত হয়।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত