| 18 জুন 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য অনুবাদ: লাল তারা । আর্থার কোনান ডয়েল

আনুমানিক পঠনকাল: 11 মিনিট

অনুবাদক: শ্রীদীপ বিশ্বাস

 

বিখ্যাত  প্রাচ্যদেশীয় বণিক  থিওডিসিয়াসের বাড়িটা ছিল, সেন্ট ডিমিত্রিয়াসের গির্জা থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে,কন্সটান্টিনোপল শহরের সবথেকে অভিজাত মহল্লায়। আতিথি অভ্যাগতদের জন্য উৎসব অনুষ্ঠান নিত্য তিরিশদিন সেখানে লেগেই থাকত। সেইসব অনুষ্ঠানের যে রকম রাজকীয় আঢ়ম্বর আর তাতে আনন্দফূর্তীর যে রকম এলাহি আয়োজন থাকত যে স্বয়ং সম্রাট মরিস পর্যন্ত তার আকর্ষণ  এড়াতে  না পেরে,  পার্শ্ববর্তী বুকোলিয়োন প্রাসাদ থেকে চুপিসাড়ে চলে  এসে  ফূর্তিতে যোগ দিতেন।

 

এমনই  এক রাতে আমাদের কাহিনী শুরু হচ্ছে। সময়টা ৬৩০ খৃস্টাব্দের ৪ঠা নভেম্বর। আমন্ত্রিত অতিথিরা সেই রাতে একটু আগেই বিদায় নিয়েছিলেন। গৃহস্বামীর সাথে রয়ে গিয়েছিলেন শুধু তার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তারই মত ব্যবসায়ে সুপ্রতিষ্ঠিত দুজন স্বনামধন্য বণিক। সুরার পেয়ালা হাতে নিয়ে তিনজন বাড়ির মার্বেলের বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। একদিকে তাকালে মার্মরা সাগরে ভাসমান জাহাজের আলো তাদের চোখে এসে পড়ছিল আর অন্যদিকে দিশারী আলোর মালায় স্পষ্ট হয়ে উঠছিল বসফরাস প্রণালীর গতিপথ। ঠিক তাদের সামনে বিস্তৃত ছিল একটা সংকীর্ণ প্রণালী যার অপরপাড়ে শুরু হয়েছিল অন্ধকারে ঢাকা এশিয়ার নীচু পাহাড়ের সারি। আকাশ  ঢাকা ছিল একটা পাতলা কুয়াশার আস্তরনে, শুধু দূরে, দক্ষিন দিগন্তে একটিমাত্র লাল তারা, যেন কিছুটা চাপা আক্রোশ নিয়ে,  অন্ধকারে  জ্বলজ্বল করছিল।  

 

 

রাতের শীতল পরিবেশে, স্নিগ্ধ আলোয়,  অতীতের স্মৃতিচারণ করছিলেন তিন বন্ধু। তারা ফিরে  যাচ্ছিলেন তাঁদের প্রথম যৌবনের সেইসব ঝোড়ো দিনগুলিতে যখন তারা তাদের সম্পত্তি এমনকি প্রান পর্যন্ত বাজি রেখে  দুঃসাহসিক সব অভিযানে নেমেছিলেন যা  তাদের আজকের বিলাস, বৈভব আর প্রতিপত্তির ভিত তৈরী করে দিয়েছিল। গৃহস্বামী থিওডিসিয়াস বলছিলেন মূরদের দেশ উত্তর আফ্রিকায় তার দীর্ঘ যাত্রার কথা; কিভাবে নীল সাগরকে  ডানদিকে রেখে, প্রাচীন কার্থেজ নগরীর ধ্বংসাবশেষ পার হয়ে এক প্রকাণ্ড উত্তাল মহাসাগরের সামনে এসে পড়েছিলেন; কিভাবে ডানিদিকে তাকাতেই ঢেউয়ের আড়ালে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন হারকিউলিসের স্তম্ভ নামে বিখ্যাত  সুবিশাল শিলাখন্ড দুটিকে(১)। শ্যামবর্ণ, চাপদাড়িওয়ালা মানুষ, সিংহ, রাক্ষুসে সাপ, কতকিছুর কাহিনী শোনালেন তিনি।                                                        

 

তারপর ষাট বছর বয়সী  শুষ্কপ্রকৃতির  প্রৌঢ়, সিলিসিয়া প্রদেশের  অধিবাসী  ডিমিট্রিয়াস, শোনাতে শুরু করলেন কিভাবে তিনি কিভাবে প্রভূত ধন্সম্পদের অধিকারী হলেন। ডিমিট্রিয়াস বললেন কিভাবে তিনি ও তার বন্ধুরা ড্যানিয়ুব নদ পার হয়ে, দুর্ধর্ষ হূনদের বাসভূমি আতিক্রম করে প্রকান্ড এলব নদের তীরে জার্মানীর গহন অরণ্যে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। ঈষৎ স্থুলবুদ্ধি, কিন্তু বিশালাকৃতি সব মানুষ, নেশা চড়লে যাদের মাথায় খুন চেপে যায়, মাঝরাতে হঠাৎ বেঁধে যাওয়া দাঙ্গাহাঙ্গামা আর সেখান থেকে দ্রুত পালিয়ে আসা,ঘন বনের গভীরে লুকিয়ে থাকা গ্রাম, বীভৎস সব বলিদান প্রথা  আর উৎসর্গ অনুষ্ঠান, হিংস্র ভাল্লুক আর নেকড়ে অধ্যুষিত বনের পথ, সবকিছু সবিস্তারে বর্ণনা করে গেলেন তিনি। স্মৃতির ভান্ডার উজাড় করে দিয়ে একের পর এক উপাখ্যান বলে যাচ্ছিলেন দুই প্রৌঢ়, আর আসরের  তৃতীয় সদস্য, সোনা আর উটপাখির পালকের কারবারী,সারা লেভান্ত (২) যাকে একডাকে চেনে, সেই  ম্যানুয়েল ডুকাস, চুপচাপ বসে তাঁদের কথা শুনে যাচ্ছিলেন। অবশষে তাকেও যখন একটা গল্প শোনাবার জন্য চেপে ধরা হল তখন গালে হাত রেখে, দূর দক্ষিন আকাশে জ্বলতে থাকা লাল তারাটির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষাকৃত তরুনবয়স্ক বণিকটি  তার আখ্যান শুরু করলেন।  

 

“ওই লাল তারাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে”, ডুকাস বলতে শুরু করলেন। “ তারাটার নাম আমার  জানা নেই । আমাদের বুড়ো  জ্যোতির্বিদ লাস্কারিসকে জিজ্ঞাসা করলে হয়ত বলে দেবে, কিন্তু আমার জানার বিশেষ কোন আগ্রহ নেই। তবু প্রত্যেক বছর এই সময় আমি  তারাটাকে খুজি আর দেখি যে আকাশের ঠিক এক যায়গায় ওটা জ্বলছে। কিন্তু কেন জানি না, প্রত্যেকবার যখন তারাটাকে দেখি তখন মনে হয় যে ওটার আকার আর লালচে ভাব দুটোই আগের বারের থেকে বেড়ে গেছে।

 

আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে পাড়ি দিয়েছিলাম আবিসিনিয়ায়। সেখানে এমন জমিয়ে ব্যাবসা করলাম যে ফেরার সময় একশোটার বেশি উট লেগে গেল চামড়া,সোনা,হাতির দাত, মশলাপাতি আর অন্যান্য আফ্রিকাজাত পণ্যভার বয়ে আনতে। সমুদ্রতীরবর্তী শহর আর্সিনোতে সব জড়ো করে এনে পাচটা দেশী নৌকোয় সব তুলে আমরা আরব উপসাগর বেয়ে ভেসে চললাম। অবশেষে সাবা শহরের কাছে এসে নৌকা ভিড়ালাম। এখান থেকেই কাফিলা গুলি যাত্রা শুরু করে। চল্লিশজন যাযাবর আরবকে রক্ষী হিসাবে ভাড়া করে রওয়ানা দিলাম মাকোরাবা(৩) শহরের উদ্দেশ্যে। স্থানীয় পৌত্তলিকদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র শহর এই মাকোরাবা। বছরে দুবার করে উত্তর দিকে, জেরুসালেম আর  সিরিয়ার উপকূলের পথে যে বিরাট কাফেলাগুলো বেরোয়, তাদের দলে গিয়ে ভিড়তে গেলে এই  জায়গাটাই সব  দিক থেকে সুবিধাজনক।

 

“দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর ছিল আমাদের যাত্রাপথ। আমাদের বাম  দিকে আরব উপসাগর দিনের উজ্জ্বল আলোয় গলানো  ধাতুর মত ঝলমল করত, আর সূর্যাস্তের আলোয় রক্তের মত লাল হয়ে উঠত। আমাদের ডানদিকে ধূ ধূ করত এক অতিকায় মরুভূমী যার বিস্তার ছিল আরব মুলুক ছাড়িয়ে সেই পারসিকদের দেশ পর্যন্ত।

 

“বহুদিন ধরে শুধু আমাদের ভারবাহি উটগুলোর দীর্ঘ সারি আর ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক পরা তাদের শ্যামবর্ণ সহিসরা  ছাড়া প্রানের আর কোনো চিহ্ন আমাদের দৃষ্টিগোচর হল না । এই মরুভূমির নরম বালিতে জন্তুগুলির পা ফেলার কোনো শব্দ ওঠে  না । ফলে তারা যখন নিঃশব্দে চলতে থাকে তখন দিনের পর দিন সেই এক দৃশ্য দেখতে দেখতে একটা সময় আসে যখন গোটা ব্যাপারটাই একটা স্বপ্ন বলে মনে হয়। কাফিলার একেবারে পিছন থেকে যখন  সামনে তাকিয়ে ওই কিম্ভূত মূর্তীগুলিকে দেখতাম তখন মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে কষ্ট হত যে যা দেখছি তা বাস্তব, আর আমি,  ম্যানুয়েল ডুকাস যে কিনা কনস্টান্টিনোপল শহরে থিয়োডিসিয় তোরোনের কাছে থাকে আর প্রতি রবিবার বিকালে হিপ্পোড্রোমের ঘোড়দৌড়ের ময়দানে সবুজ দলের(৪) হয়ে গলা ফাটায়, সে  এই বিচিত্র দেশে এই বিচিত্র মানুষগুলোর সহচর হয়ে  মরুভূমী পাড়ি দিচ্ছে।   

 

“প্রায়ই দূরে সমুদ্রে, সাদা তিনকোনা পাল খাটানো নৌকা চোখে পড়ত। আমরা তীরে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতাম কারন ওই নৌকাগুলি জলদস্যুতে বোঝাই হয়ে থাকত। দুই একবার জলের কিনারায় বামনাকৃতি কিছু জীব চোখে পড়ত। মানুষ না মর্কট, দেখে বোঝাই যায় না ভালো করে। এরা জলজ   আগাছার ঝোপের মধ্যে গর্ত খুঁড়ে ঘর বানায়, নোনা জল পান করে আর হাতের নাগালে যা পায় তাই খেয়ে জীবন ধারন করে। হেরোডোটাস (৫) এদের ‘মৎস্যভুক’ নাম দিয়ে বর্ণনা করে গেছেন। মানবজাতির মধ্যে এরা  নিঃসন্দেহে নিকৃষ্টতম শ্রেনীভুক্ত। আমাদের দলের আরবরা এদের দেখে আতঙ্কে ছিটকে দূরে সরে যেত। লোকে বলে  যে এক বার কেউ যদি মরুভূমিতে মারা পড়ে তাহলে এরা তার ওপরে একঝাঁক মড়াখেকো কাকের মত এসে জুড়ে বসে আর শেষ হাড়টি পর্যন্ত না চিবিয়ে মুখ তোলে  না। আমাদের দেখে কিচিরমিচির করতে করতে ওরা করে ওদের অস্থিচর্মসার হাতগুলো নাড়তে লাগল। জানতাম যে  তাড়া করলেই ওরা সাঁতরে আমাদের নাগালের বাইরে গভীর সমুদ্রে চলে যাবে। হাঙ্গরেও শুনেছি এই জঘন্য জীবগুলির ধারেকাছে ঘেঁষে না ।  

 

“এইভাবে দশদিন ধরে আমরা মরুভূমির মধ্যে দিয়ে চললাম।  প্রত্যেক সন্ধ্যায় আমরা ঘোলা জলের কূয়ো গুলোর ধারে তাবু খাটাতাম। সামান্য পরিমানে বিস্বাদ জল কিছুটা হলেও জুটে যেত। খুব ভোরে উঠে অনেক বেলা অবধি পথ চলার   অভ্যাস করে নিয়েছিলাম আমরা। তবে দুপুরের অসহ্য গরমে বিরতি নিতাম। আশেপাশে গাছপালা না থাকায়, বালিয়াড়ির ছায়ায় গিয়ে গুড়ি মেরে বসে থাকতাম আর তাও না পেলে সুর্যের দহন থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিতাম আমাদের উট আর মালপত্রের আড়ালে। সাত দিনের মাথায় আমরা গিয়ে পৌছালাম সেই জায়গাটায় যেখান থেকে উপকূল ছেড়ে মাকোরাবা শহরে যাওয়ার পথটা শুরু হচ্ছে। দুপুরের বিশ্রাম শেষ করে আমরা যাত্রা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সূর্য তখনো মাথার উপরে গনগন করছে, পরিস্থিতি বেশ অস্বস্তিকর। চোখ তুলে সামনে তাকাতেই এক    অত্যাশ্চর্য্য  দৃশ্য   দেখলাম। দেখলাম যে আমাদের ডানদিকের   টিলাটির ওপরে  চল্লিশ ফুট লম্বা  একটি  লোক দাঁড়িয়ে আছে আর তার হাতে ধরা আছে একটা বর্শা যেটা জাহাজের মাস্তুলের মত বড়। অবাক হচ্ছেন বন্ধুরা? তাহলে ওরকম একটা দৃশ্য দেখে আমার মনের অবস্থা কল্পনা করুন একবার। তবে একটু মাথা ঠান্ডা করে ভাবতেই বুঝতে পারলাম যে  সামনে যাকে দেখছি সে একজন সাধারন যাযাবর আরব। মরুভূমীর উত্তপ্ত বাতাস অলোর প্রতিসারণ ঘটিয়ে তার প্রতিবিম্বটিকে বহুগুনে বিবর্ধিত করে তুলেছে।    

 

  “ তবে  মরুভূমীর মায়া দেখে আমি যতটা না বিচলিত হলাম, রক্তমাংসের কায়াটি দেখে আমার সঙ্গীরা তার থেকে অনেক বেশী অতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সমস্বরে ভয়ার্ত একটা রব তুলে সবাই মিলে জটলা করে দাড়াল আর দূরে মূর্তীটির দিকে তর্জনী দেখিয়ে আকার ইঙ্গিতে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগল।

 

“তখন চোখে পড়ল যে লোকটি একা নয়। আশেপাশের সবকটি বালিয়াড়ি থেকে একসার পাগড়ি পড়া মাথা একদৃষ্টে আমাদের দিকে চেয়ে আছে। আমাদের রক্ষীদলের সর্দার  ছুটতে ছুটতে আমার কাছে এল আর তাদের আতঙ্কের কারনটা ব্যখ্যা করে বলল। পাগড়ীর কিছু বৈশিষ্ট দেখে এরা বুঝতে পেরেছে যে অগন্তুকরা বেদুইনদের মধ্যে সবথেকে দুর্ধর্ষ আর নির্মম বলে কুখ্যাত দিলোয়াস উপজাতির লোক। এরা অবধারিতভাবে  আমাদের কাফিলা লুঠ করার উদ্দেশ্যেই এখানে ওৎ পেতে অপেক্ষা করছিল। আমি উপলব্ধি করলাম যে আবিসিনিয়ায় এত দিনের এত পরিশ্রম, এত ধকল, বিপদ আর ক্লান্তিকর অভিযানের এক করুণ পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে। আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না যা এইভাবে বিপর্যায় এসে  তীরের কাছে আমার তরীর ভরাডুবী ঘটিয়ে দেবে। দস্যুরা স্পষ্টত দলে এতটাই ভারি ছিল যে প্রতিরোধের কথা চিন্তা করার অবকাশ পর্যন্ত ছিল না আমাদের। বস্তুত, এক্ষেত্রে প্রানটুকু টিকিয়ে রাখাই ছিল বিরাট ভাগ্যের ব্যপার। অতএব আমি আমার আত্মাকে আমাদের সন্ত হেলেনার পবিত্র করকমলে সমর্পণ করে একটা গাঁটরির ওপরে বসে পড়লাম,  আর হতাশা ভরা চোখে চেয়ে দেখতে লাগলাম কিভাবে ভয়ঙ্কর আরব দস্যুদল   নিঃশব্দে   আমাদের দিকে  এগিয়ে আসছে।   

 

“ জানি না আমাদের ভাগ্যের জোরে নাকি মনে মনে সন্ত হেলেনার উদ্দ্যশে দামি মোমবাতি-মানত করার ফলে, সেই মূহূর্তে আমার অনুগামীদের মধ্যে থেকে একটা উল্লাসধ্বনি শুনতে পেলাম। ব্যাপারটা কি সেটা ভাল করে করে দেখার  জন্য গাঁটরিটার ওপরে উঠে দাড়ালাম আর যা চোখে পড়ল তাতে মনটা আনন্দে নেচে  উঠল। দেখলাম একটা বিরাট বড় কাফিলা ম্যাকোরাবার পথ ধরে এগিয়ে আসছে। কাফিলাটাতে অন্তত পাচশো উট আর আসংখ্য সশস্ত্র রক্ষী। আপনারা জানেন যে  মরুভূমিতে ভ্রাম্যমান কাফিলাগুলির মধ্যে অলখিত নিয়ম আছে মরুচর দস্যুদের বিরুদ্ধে তারা সবসময় একজোট হয়ে যায়। নতুন কাফিলাটি এসে পড়ার ফলে আমরা দলে ভারী হয়ে গেলাম। দস্যুরা ব্যাপারটা উপলব্ধি করে চোখের নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল। মনে হল যেন  আদিম বালির সমুদ্র মূহূর্তের মধ্যে তাদের গ্রাস করে নিল। ছুটে গিয়ে  একটা বালিয়াড়ির মাথায় উঠে সেই হলুদ প্রান্তরে আমি শুধু ক্ষণিকের জন্য একটা পাক খেয়ে ওঠা ধুলোর মেঘ  দেখতে পেলাম। আর সেই মেঘের মধ্যেই চোখে পড়ল উটেগুলোর লম্বা গলা, ঝাপটাতে থাকা দস্যুদের ঢিলে আলখাল্লা আর বর্শার ফলকের ঝলকানি। এভাবেই দস্যুরা বিদায় হল। 

 

“কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম যে আমি এক বিপদের থেকে আরেক বিপদের মধ্যে এসে পড়েছি। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম যে এই নতুন কাফিলাটি কোন রোমান নাগরিক বা নিদেনপক্ষে কোন  খৃস্টধর্মাবলম্বী সিরীয় ব্যক্তির হবে। কিন্তু দেখলাম যে এই কাফিলাটির সবকটি সদস্যই আরবীয়। এই আরবদেরকে  আমাদের  পবিত্র গ্রন্থে(৬)  ইস্মায়েলের (৭) বংশধর বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এরা নগরবাসী বণিক আরব আর মরুচর বেদুইন, এই দুই শ্রেনীতে বিভক্ত। বণিক আরবেরা বেদুইনদের তুলনায় অনেক শান্তিপ্রিয় বলে পরিচিত। কিন্তু আরব রক্তটাই লোলুপ আর ন্যায়নীতিবিবর্জিত। ফলে যখন দেখলাম ওই কয়েকশো আরব আমাদের উটগুলোকে অর্ধচন্দ্রাকারে ঘিরে ফেলে লুব্ধ চোখে আমার মূল্যবান ধাতুর পেটি আর উটপাখির পালকের মোড়কগুলোর দিকে তাকাচ্ছে, আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম।

 

“নতুন কাফিলাটির নেতা ছিলেন সম্ভ্রান্তদর্শন, অত্যন্ত সুপুরুষ এক ব্যাক্তি। তার বছর চল্লিশ বয়স, ঘনকালো দাড়ি, ধারালো চোখমুখ, আর এমন উজ্জ্বল, মর্মভেদী, তীব্র তার চোখের দৃষ্টি, যে তার সাথে তুলনা করা যায় এমন কিছু আমার সারা ভ্রাম্যমান জীবনে কখনো চোখে দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না।   

 

“আমার ধন্যবাদ আর অভিবাদনের প্রত্যুত্তরে তিনি একটা নিয়মমাফিক নমস্কার জানালেন আর নিজের দাড়িতে  হাত চালিয়ে, নীরবে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন কি প্রভূত পরিমান সম্পদ হঠাত তার হাতে এসে পড়েছে। তাঁর অনুচরদের গুঞ্জন শুনে বোঝা যাচ্ছিল যে তারা লুণ্ঠন শুরু করার জন্য শুধুমাত্র আদেশের অপেক্ষা করছে। একটি উগ্রপ্রকৃতির তরুন যাকে দেখে দলপতির বেশ ঘনিষ্ঠ বলে মনে হল, তাঁর কাছে এসে নিজের সঙ্গীদের মনের ইচ্ছাটা কথায় প্রকাশ করে দিল।

 

 

“হে শ্রদ্ধেয় নবী,’ সে বলল, “ একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে এই লোকগুলি আর এদের ধনসম্পদকে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া  হয়েছে। এসব নিয়ে আমরা যখন পুন্যক্ষেত্রে ফিরে যাব তখন কোরেশরা বুঝতে পারবে যে স্বয়ং ঈশ্বর আমাদের পথনির্দেশ করে  চলেছেন।’

 

“ কিন্তু দলপতি মাথা নেড়ে তাঁর আপত্তি জানালেন। ‘ না, আলি, তা হয় না”, তিনি উত্তর দিলেন। “ এই লোকটিকে দেখে রোমের নাগরিক বলে মনে হচ্ছে। একে আমাদের একজন পৌত্তলিক হিসাবে গন্য করা ঠিক হবে না।’

 

“ কিন্তু ও একজন অবিশ্বাসী,’ বলে যুবকটি তার কটিবন্ধে ঝোলানো একটা বড় ছুরির হাতলে হাত রাখল। “বিচারের ভার যদি আমার ওপরে থাকত তাহলে আমাদের ধর্মবিশ্বাস গ্রহন না করলে পণ্যের সাথে সাথে ওর প্রানটাও আমি বাজেয়াপ্ত করতাম।’

 

“ অপেক্ষাকৃত বয়স্ক ব্যক্তিটি  মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। ‘না, আলি; তোমার মাথা বড় বেশী গরম”, তিনি বললেন। “ এই মূহূর্তে পৃথিবীতে ইমানদারদের সংখ্যা তিনশোও হবে না। আমাদের দলভুক্ত নয়, এমন সবার যদি প্রান আর সম্পত্তি আমরা কেড়ে নিতে শুরু করি তাহলে তো আমরা অন্য  কোন কাজে হাতই লাগাতে  পারব না। ভুলে যেও না বৎস, দয়া আর সততা লাগামের মত সত্যধর্মেকে নিয়ন্ত্রণ করে চলে।’  

 

“ …শুধুমাত্র ইমানদারদের ক্ষেত্রে’, বলে উঠল উগ্র যুবকটি।

 

“ …না, সকলের ক্ষেত্রে। এটাই আল্লাহের বিধান। কিন্তু তবুও-বলতে বলতে তাঁর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল আর দুচোখে এক অপার্থিব আলো ঝলকে উঠল-“ সেই দিনের আর বেশী দেরী নেই যখন করুনার সময় শেষ হয়ে যাবে। আর তখন, যারা সময় থাকতে কর্ণপাত করেনি, তাদের দুর্দশার সীমা থাকবে না। তখন আল্লাহের তরবারি নিষ্কোশিত করা হবে আর সব হিসাব-নিকাশের নিষ্পত্তি  না হওয়া পর্যন্ত তা আর কোষবদ্ধ করা হবে না। প্রথম আঘাত এসে পড়বে পৌত্তলকদের ওপরে, যেদিন আমার নিজেরই আত্মীয়স্বজন আর গোষ্ঠীর লোকজন, অবিশ্বাসী কোরেইশরা, ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে আর কাবার তিনশো ষাটটি  প্রতিমা নগরের বর্জ্যস্তূপে পরিত্যাক্ত হবে। আর তখনই কাবা এক, অদ্বিতীয় আর স্বর্গমর্ত্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ঈশ্বরের আবাসস্থল আর মন্দিরের মর্যাদ্যা পাবে।

 

 

“ ব্যক্তিটির বর্শাধারী অনুগামীরা তাঁকে ঘিরে দাড়াল। তাদের উৎসাহী চোখগুলো তাঁর মুখের ওপরে নিবদ্ধ ছিল আর উন্মত্ত আবেগে কাঁপতে থাকা  তাদের  শ্যমবর্ণ মুখের রেখাগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে তিনি তাদের কতখানি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার পাত্র।

 

 

“আমরা ধৈর্য্য ধরে থাকব। কিন্তু আগামী বা তার পরের বছর, হয়ত সেইদিন আসবে যেদিন মহান ফেরেস্তা গ্যব্রিয়েল আমায় জানাবেন যে রসনার পরবর্তে তরবারি ব্যবহার করার কথার সময় এসেছে।  আমরা দুর্বল আর মুষ্টীমেয়, কিন্তু যদি পরমেশ্বর চান, কার সাধ্য আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়? বিদেশী, তুমি কি ইহুদি ধর্মাবলম্বী? তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

 

“আমি তাকে জানালাম যে আমি ইহুদি নই।

 

“…সেই ভালো তোমার পক্ষে”, তিনি বললেন। কথা বলতে বলতে তার মুখচোখ প্রচন্ড রাগে যেন জ্বলে  উঠল। “সবার আগে  পৌত্তলকদের পতন হবে আর তারপরেই আসবে ইহুদীদের পালা। কারন যে পয়গম্বরদের আগমনের কথা তারা নিজেরাই একদিন ভবিষ্যদবাণী করে বলেছিল, তাদেরকেই তারা চিনতে অস্বীকার করেছে। সব শেষে আসবে খৃস্টানদের পালা, যারা বাস্তবিক এমন একজন পয়গম্বরকে অনুসরণ করে মহত্মের বিচারে যার স্থান মুসা বা আব্রাহামেরও ওপরে। কিন্তু তারা একজন সৃষ্ট জীবের সাথে স্রষ্টাকে এক করে দেখার  মত মহাপাপ করেছে। পৌত্তলিক, ইহুদি আর খৃস্টান -পর্যায়ক্রমে সবাইকেই সব হিসাব চুকিয়ে দিতে হবে।  

 

“ তাঁর পিছনে দাঁড়ানো ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক পরা লোকগুলো তাঁর কথা শুনতে শুনতে নিজেদের হাতের বর্শাগুলো অন্দোলিত করছিল। তাদের আন্তরিকতা নিয়ে আমার মনে কোন সন্দেহ ছিল না। কিন্তু আমি যখন তাদের গায়ের জীর্ন পোশাক আর হাতের মামুলী হাতিয়ার দেখতে দেখতে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ভরা  হুমকিগুলোর কথা চিন্তা করছিলাম তখন আমার হাসি পেয়ে যাচ্ছিল। ভাবছিলাম যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের রাজকীয় রক্ষীবাহিনীর রণকুঠার অথবা আর্মেনীয় অশ্বারোহীদের ভল্লের সম্মুখীন  হলে এদের কি অবস্থা হবে। যাহোক, আমার নিজের চিন্তাভাবনা নিজের মনে রাখার মত কান্ডজ্ঞান আমার ছিল। আমাদের নিজেদের ধর্মবিশ্বাসের ওপরে এই নবতম আক্রমনের প্রথম বলি হবার কোন ইচ্ছা আমার ছিল না।  

 

“ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল আর আমরা স্থির করলাম যে আমাদের কাফিলা দুটি একসাথেই রাতের ছাউনি ফেলবে। ব্যবস্থাটা  আমার পক্ষে বেশ ভালোই হল কারন দস্যুর উপদ্রব যে আর হবে না সেবিষয়ে কোন নিশ্চয়তা ছিল না। আমি আরব দলপতিকে আমার সাথে নৈশভোজ করার আমন্ত্রণ জানালাম। তাঁর অনুগামীদের সাথে দীর্ঘক্ষণ প্রার্থনা করার পর তিনি এলেন আমার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। কিন্তু আমার  আতিথেয়তার যাবতীয় প্রচেষ্টা বিফল হল। তার সম্মানে পরিবেশন করা উৎকৃষ্ট সুরা তিনি স্পর্শও করলেন না আর সুখাদ্যগুলোও খেলেন না। বাসী রুটি, শুকনো খেজুর আর জলেই তিনি ক্ষুন্নিবৃত্তি করলেন। নৈশাহার শেষ হলে  আমরা দুজনে প্রায় নিভে আসা আগুনের কাছে বসে রইলাম। আমাদের মাথার ওপরে মরুভূমির নক্ষত্রখোচিত আকাশে রাতের তারাগুলো ঝলমল করছিল। এইরকম ঘন নীল রাতের আকাশ আর ঝকঝকে তারার মেলা শুকনো মরুভূমী  ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। সামনের ছাউনি থেকে আমাদের সঙ্গীসাথীদের অনুচ্চ  কন্ঠস্বর আর আশেপাশের বালিয়াড়ীর থেকে শিয়ালের তীক্ষ্ণ ডাক ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। সেই আশ্চর্য লোকটি আর আমি ঠিক মুখোমুখি বসে ছিলাম। আগুনের আভা এসে তাঁর উৎসুক, কর্তৃত্বব্যঞ্জক  মুখের ওপরে পড়ছিল আর তাঁর আবেগপূর্ণ চোখদুটিতে প্রতিফলিত হচ্ছিল। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা যা জীবনে  কখনো ভুলতে পারব না। আমার ভ্রাম্যমান জীবনে আমি অনেক জ্ঞানী আর বিখ্যাত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছি কিন্তু আজ অবধি ওনার মত করে কেউ আমার মনে ছাপ ফেলতে পারে নি।

 

“কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর বক্তব্যের বেশীরভাগটাই আমি বুঝে উঠতে পারলাম না, যদিও অপনারা জানেন যে আমি আরবি ভাষাটা নিজের মাতৃভাষার মতই জানি। তাঁর কথাগুলো মধ্যে একটা অদ্ভূত ওঠাপড়া লক্ষ্য করলাম। কখনো তা শিশুর কলধ্বনি, কখনো ধর্মোন্মাদের অসংলগ্ন প্রলাপ আবার কখনো বা পয়গম্বর আর দার্শনিকের সুমহান আদর্শের বাণী । এক এক সময় তিনি যখন দৈত্যদানব, অলৌকিক ঘটনাবলি, শুভ অশুভের পূর্বলক্ষণ ইত্যাদির  কাহিনী বলছিলেন তখন ছোটবেলায় মা-ঠাকুমার মুখে শোনা রূপকথার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অন্যসময় তিনি যখন জ্বলন্ত উৎসাহের সঙ্গে  ফেরেস্তাদের সাথে তাঁর কথপোকথন, সৃষ্টিকর্তার অভিপ্রায় আর মহাপ্রলয়ের বিষয়ে কথা বলছিলেন তখন আমার মনে হচ্ছিল যে আমার পাশে যিনি বসে আছেন তিনি কোন সাধারন মানুষ নন, বাস্তবিকই সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের বার্তাবহ।

 

“আমাকে তাঁর এতোটা ভরসা  করার একটা বিশেষ  কারন ছিল। আমার মধ্যে তিনি কন্সটান্টিনোপল তথা রোমান সাম্রাজ্যে তাঁর বাণীর একজন প্রচারককে দেখতে পাচ্ছিলেন। সন্ত পল যেমন ইউরোপে খৃস্টধর্ম নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি আশা করছিলেন যে সেইভাবে আমিও আমার নিজের শহরে তাঁর মতবাদ নিয়ে যাব। হায়! মতবাদ সে যাই হোক না কেন, আমি কোনকালেই পল বা ওইধরনের সাধুসন্তদের ধাতুতে গড়া ছিলাম না। তবু সেই আরব্য রজনীতে তিনি  তাঁর মনপ্রান দিয়ে আমাকে তাঁর স্বমতে নিয়ে আসার চেষ্টা করে গেলেন। তার নিজের কাছে একটা পবিত্র গ্রন্থ ছিল। সেটা,  তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন ফেরেস্তার কথা শুনে লেখা। কতগুলো হাড়ের ফলকের ওপরে লিখে রাখা গ্রন্থটিকে তিনি উটের নাকে ঝোলানো থলেতে রেখে দিতেন। কয়েকটা অধ্যায় তিনি আমাকে পড়ে শোনালেন। অনুশাসনগুলি বেশ ভালো হলেও গ্রন্থটির ভাষা আমার অতিরঞ্জিত আর কল্পনায় পরিপূর্ণ বলে মনে হল। ওনার কথা শুনতে শুনতে আমি নিজেই মাঝে মাঝে অস্থির আর বিহ্বল হয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি তাঁর ভবিষ্যত কর্মপন্থার কথা আমায় বলছিলেন। আর সত্যি কথা বলতে কি, তিনি যখন কথা বলছিলেন, আমার কেবলই মনে হচ্ছিল যে কোন ভ্রাম্যমান আরব কাফিলার নেতা নয়, একজন মহাপুরুষের সান্নিধ্যে বসে আছি।  

 

“আর কয়েক বছরের মধ্যেই, যখন ঈশ্বর আমাকে পর্যাপ্ত শক্তি দেবেন,” তিনি বললেন,  “আমি সমগ্র আরবদেশকে আমার পতাকার তলায় একত্রিত করব।তারপর আমি আমার ধর্মকে সিরিয়া আর মিশরে ছড়িয়ে দেব।তারপর আসবে পারস্যদেশের পালা ।সত্যধর্ম বা  তরবারি, দুটোর যে কোন একটাকে বেছে নেবার সুযোগ আমি সেখানকার অধিবাসিদের দেব।পারস্য দখল করে নিলে এশিয়া মাইনরে অভিযান চালাতে সুবিধা হবে যাতে কন্সট্যান্টিনোপল আবধি আমাদের যাত্রাপথটা মসৃণ হয়।”

 

 

হাসি চাপতে আমি ঠোট কামড়ে ধরলাম। “বসফরাস প্রনালীর তীরে পৌছাতে আপনার দিগ্বীজয়ী বাহিনীর ঠিক কতটা সময় লাগবে?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

 

“এসব ঈশ্বরের হাতে, আমরা যার ভৃত্য বই আর কিছুই নই” , তিনি বললেন। আমার পরিকল্পনাগুলি যখন বাস্তব রূপ নেবে তখন আমি হয়ত আর বেঁচে থাকব না, তবে আমাদের সন্তানদের জীবনকাল শেষ হওয়ার আগে, তোমাকে  যা যা বলে গেলাম তা অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাবে। ওই তারাটার দিকে তাকিয়ে দেখ, বলে আমাদের মাথার ওপরে একটা স্বচ্ছ সুন্দর গ্রহের দিকে তিনি আঙ্গুল তুলে দেখালেন। ওটা খ্রীস্টের প্রতীক। কি শান্ত আর সমাহিত, ঠিক তার জীবন আর বাণীর মত। আর ওইটা, বলে তিনি দিগন্তের ওপরে একটা লাল, ঘোলাটে তারার দিকে তার  হাত প্রসারিত করলেন- এই তারাটাই, যার দিকে আমরা এখন তাকিয়ে আছি- হল আমার তারা, যা ক্রোধ, যুদ্ধ আর পাপাত্মাদের ওপরে কশাঘাতের কথা ঘোষণা করে।  দুটো তারাই এক আকাশের । আর আল্লাহ এদের যার জন্য যা কাজ নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, এরা সেটাই  পালন করে।  

 

এই হল আমার অভিজ্ঞতার ইতিবৃত্ত যা আজ রাতে এই তারাটাকে দেখে মনে পড়ে গেল। সেই রাতে মরুভূমীতে যেরকম দেখেছিলাম আজও দক্ষীণের আকাশে লাল তারাটা ঠিক এক রকম ভাবে তার ক্রোধ বিকীর্ণ করে চলেছে। ওখানে কোথাও সেই ব্যক্তিটি তার কাজ আর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। হয়ত কোন ধর্মোন্মাদের ছুরিকাঘাতে বা উপজাতীয় দাঙ্গায় তার জীবন শেষ হবে। যদি সেরকম কিছু ঘটে তাহলে সবকিছুর সেখানেই ইতি। কিন্তু তার দৃষ্টিতে আর উপস্থিতিতে কি যেন সেদিন দেখেছিলাম। তাই মনে হয়,  যদি  জীবিত থেকে যান, তাহলে তিনি, আবদাল্লার পুত্র মহম্মদ, তার অন্তরের বিশ্বাসের একটা যুগান্তকারী বহিঃপ্রকাশ না ঘটিয়ে ছাড়বেন না।

 

 

পাদটীকা

 

১। স্পেন আর মোরোক্কোর মধ্যবর্তী জিব্রাল্টার প্রণালীর দুইদিকের দুটি উঁচু ভূখন্ড। ভূমধ্যসাগরীয় প্রাচীন জাতির মানুষেরা এই ভূখন্ডদুটিকে সভ্য জগতের শেষ সীমা বলে মনে করতেন ।

২। ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীরবর্তী অঞ্চল। আজকের সিরীয়া, লেবানন,  ইসরায়েল, প্যালেস্টাইন, জর্ডন, সাইপ্রাস, তুরস্ক আর মিশর।

৩। মক্কা শহরের প্রাচীন নাম।

৪। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের  চিরবৈরী দুই গোষ্ঠী। সবুজ আর নীল দল নামে এরা পরিচীত ছিল।

৫। প্রাচীন গ্রীক ঐতিহাসিক। ইতিহাসের জনক নামে খ্যাত।

৬। বাইবেল

৭। আব্রাহামিক  ( ইহুদি, খ্রিষ্টান আর ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধীয়) কুলপতি আব্রাহামের জ্যেষ্ঠপুত্র ।  

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত