| 28 মে 2024
Categories
গীতরঙ্গ

হোইচির লোকগল্পে স্টোয়িক দর্শন ও অলিগার্কিকাল রাজনীতির প্রভাব

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
 
 
 
লোকগল্প উঠে আসে সমাজের উঠোন থেকে। সমসাময়িক অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি কোন কিছুকে উপেক্ষা করতে পারে না লোকগল্প। আনন্দ,বিনোদন এর পাশাপাশি লোকশিক্ষা লোকগল্পের উপজীব্য। জাপান একটি উন্নত দেশ। তার কোণায় কোণায় ছড়িয়ে আছে নানান গল্প গাঁথা। আপাতভাবে সেসব গল্প অলৌকিকতার মোড়কে আবৃত হলেও সামাজিক শিক্ষার দিকটিও সুদূরপ্রসারী। তেমনই একটি গল্প ” হোইচি দ্য ইয়ারলেস।”
 
 
কয়েকশো বছর আগে, দান -নো-উরা-তে একটি মহাকাব্যিক সামুদ্রিক যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে বহু মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলো। হোনশুর দক্ষিণ প্রান্তে শিমোনোসেকি প্রণালীতে হেইক (তাইরা গোষ্ঠী) এবং গেঞ্জি (মিনামোটো গোষ্ঠী) গোষ্ঠীর পারস্পরিক সংঘর্ষে হেইকরা পরাজিত হয়। দীর্ঘ সে যুদ্ধে হেইক গোষ্ঠীর নারী, শিশু এবং শিশু সম্রাট আন্তোকু তেনো সহ বহু মানুষ জীবন দিয়ে আত্মত্যাগ করেন। মহাযুদ্ধের বিশেষ অঞ্চলটি পরবর্তীকালে ভৌতিক স্থান রূপে পরিচত হয় । সমুদ্র উপকূলে দাঁড়িয়ে বহু অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হন স্থানীয় মানুষ। তারা আঁধার রাতে সাগর সৈকতে একপ্রকার ভৌতিক আগুন ঘুরে বেড়াতে দেখেন , যাকে লোকেরা “Demon Fire” বা “দানব আগুন” কিংবা জাপানী ভাষায় ” ওনি-বি” বলেন। সেই স্থানটি আজও অতৃপ্ত আত্মাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। আকামাগাসেকিতে হোইচি নামে একজন জাপানি কিংবদন্তি বসবাস করতেন। তিনি অন্ধ হলেও অসম্ভব প্রতিভাধর বিওয়া বাদক ছিলেন।
 
তিনি বিওয়ায় সুর ঝংকার তুলে সম্রাট আন্তোকুর দক্ষতা এবং তার মর্মন্তুদ করুন পরিণতি গানের মাধ্যমে পরিবেশন করতেন। সেই গাঁথা লোকসমাজে ” Tale of The Heik” নামে পরিচিত।
 
 
মিমি নাশি হোইচির লোককথা বহুল জনশ্রুত। প্রথমে জাপানের এই বিশিষ্ট লোককথার দিকে একবার ফিরে তাকাই।
 
 
বিওয়া বাদক অন্ধ কবি হোইচি ছিলেন খুব দরিদ্র। আমিদাজির পুরোহিত হোইচিকে ভীষণ স্নেহ করতেন। সেইসূত্রে মন্দিরের একটি ঘরে হোইচিকে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। এক সন্ধ্যায় পুরোহিত বিশেষ কাজে মন্দিরের বাইরে যান। রাতে সকল কাজের পর চারিদিক শুনশান হলে একাকী হোইচি মন্দির প্রাঙ্গনে বসে বিওয়া বাজিয়ে আন্তোকুর গাঁথা গাইতে থাকে। পথচলতি এক সামুরাই সে সুরে মুগ্ধ হয়ে হোইচিকে তার প্রভুর কাছে বিওয়া পরিবেশনের অনুরোধ জানায়। হোইচি সানন্দে সে প্রস্তাবে সম্মত হয়। সামুরাইয়ের সাথে স্থানটিকে পৌঁছে অন্ধ হোইচির অনুভূত হয়, ঘরটি সম্ভবত বিশিষ্ট কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির । হয়তো ধনীর ব্যক্তি তার দরবারের জন্য হেইকের গল্প শুনতে চেয়েছেন। শুরু হয় হোইচির গীত। অনবদ্য , প্রানবন্ত পরিবেশনায় সকলে মুগ্ধ হন। তারা হোইচিকে রোজ রাতে আসর সাজানোর অনুরোধ জানায়। তবে তাদের শর্ত ছিলো , এই বিষয়টি নিয়ে হোইচি কাও সাথে কোনো কথা বলতে পারবে না। খুশী মনে হোইচি মন্দিরে ফিরে যায়। আমোদাজির পুরোহিত বাইরে থাকায় তিনি ঘুনাক্ষরে ঘটনাটি টের পান না।
 
 
পর দিন সন্ধ্যায় পুনরায় সামুরাই হোইচিকে সেই স্থানে উৎসুক দর্শকদের কাছে নিয়ে যায়। তবে এই রাতে আমিদাজি মন্দিরের পুরোহিত হোইচির অনুপস্থিতির বিষয়টি বুঝতে পারেন । তিনি ভৃত্যদেরদের হোইচির উপর নজর রাখার নির্দেশ দেন।
 
তৃতীয় দিন রাতে হোইচি সামুরাই এর সাথে রওনা দিলে ভৃত্যরা তাকে অনুসরণ করে। আসলে সেই সামুরাই ছিলেন একজন অশরীরী । হোইচি সে বিষয়ে একেবারেই অবগত ছিলো না। হোইচিকে অনুসরণ করে ভৃত্যরা দেখতে পান স্থানটি কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির গৃহ নয় বরং আমিদাজির কবরস্থান। অসংখ্য পরাজিত সামুরাই এবং সম্রাট আন্তোকু তেনোর স্মারক সমাধি সৌধ সেখানে সজ্জিত আছে। ঐ স্থানে বসেই অন্ধ হোইচি তন্ময় হয়ে তার রচিত বিষাদ গাঁথা পরিবেশন করছে। রাতে ভৃত্যরা হোইচিকে মন্দিরে ফিরিয়ে আনে এবং পুরোহিতকে সবিস্তারে সমস্ত ঘটনা জানায়। হোইচিকে অশরীরীরা সম্মোহিত করেছে বুঝে পুরোহিত তার সুরক্ষার জন্য হৃৎপিণ্ডের সূত্রের কাঞ্জি অক্ষর দিয়ে হোইচির পুরো শরীর এঁকেছিলেন। তিনি হোইচিকে বলেন,
 
” আজ রাতে সামুরাই এলে, তুমি ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকবে। সে যতই ডাকুক, টু শব্দটি করবে না।”
 
 
চতুর্থ সন্ধ্যায়, সামুরাই হোইচিকে নিয়ে যেতে আসেন কিন্তু বহুবার ডেকেও হোইচির সাড়াশব্দ পায় না।
 
কেবল একটি বিওয়া এবং একজোড়া কান দেখতে পান সামুরাই। আসলে হোইচির সারা শরীরে লেখা কাঞ্জি অক্ষরের মহিমায় সে সামুরাইয়ের কাছে অদৃশ্য হয়ে ছিলো। সর্বাঙ্গে কাঞ্জি অক্ষর চিত্রিত হলেও পুরোহিত ভুলবশত হোইচির দুটি কানে
 
হৃৎপিণ্ডের সূত্র লিখতে ভুলে যান। সামুরাই প্রভুর জন্য নির্দেশ পালনের প্রমাণ স্বরূপ হোইচির কান দুটি উপড়ে নিয়ে যান। পুরোহিত হঠাৎ লক্ষ্য করেন, হোইচির ক্ষত থেকে রক্তপাত হচ্ছে। সাথে সাথে হোইচির চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। চিকিৎসায় সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। হোইচির এই কিংবদন্তি “হোইচি দ্য ইয়ারলেস” নামে পরিচিত।
 
কাহিনিটি পাঠ করলে মনে হয়, Stoicism এর শিকড় এই লোকগল্পের গভীরে প্রোথিত। অশরীরী সামুরাই হোইচির কান ছিঁড়ে নিয়ে তাকে ক্ষত বিক্ষত করলেও অসম্ভব রক্তপাতে সে অনড় হয়ে বসেছিলো। এবার হয়তো আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগে পারে, Stoicism কি তাই তো?
 
 
 
Stoicism বা স্টোয়িক দর্শন মূলত অ্যারিস্টটল পরবর্তী গ্রীক দর্শন। গ্রীসের সিটিয়াম প্রদেশের জেনো নামের এক দার্শনিক এর উদগাতা।
 
সিটিয়ামে একটি আর্ট গ্যালারি ছিল। নাম ছিল “স্টোয়া পয়কিলে”। সেখানেই এই দর্শনের মূল তত্ত্বটিকে জেনো প্রথম তুলে ধরেন । আর এই “স্টোয়া” নামটি থেকেই এই দর্শনের নাম স্টোয়িসিজম । জেনোর পরে এই দর্শন মূলত তিন দার্শনিক– এপিক্টেটাস, সেনেকা ও অরেলিয়াস হাত ধরে এই দর্শন প্রচার লাভ করে। এবার আসি, স্টোয়িক দর্শন কি, সে প্রসঙ্গে।
 
 
আমরা বেশীরভাগ সময়ই বাহ্যিক পরিবেশ ও পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকি। কিন্তু স্টোয়িকবাদ অনুযায়ী, আমাদের জীবন আসলে কোনো বাহ্যিক ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হয় না, বরং সে ঘটনাটিকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে আমরা কীভাবে নিচ্ছি, তার ওপরই নির্ভর করে সমস্ত কিছু। অর্থাৎ আমাদের ইতিবাচক অবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। জীবন ঘটনার সমারোহ। কখন কী ঘটে যাবে আমরা হয়তো কেউ জানি না। কারণ বাইরের সব কিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিন্তু সেই পরিস্থিতির ওপর আমাদের মনোভাব কেমন হওয়া উচিত সেটা পুরোটাই আমাদের হাতে থাকে। মানুষ মনোভাবের পরিবর্তন ঘটিয়ে তার জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
 
 
এই কাহিনিতে হোইচির নিজের প্রতি প্রবল নিয়ন্ত্রন ছিলো। দুটি কান ছিঁড়ে প্রবল রক্তপাতেও সেদিকে দৃকপাত না করে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসেছিলো। মনোভাবের প্রতি এই নিয়ন্ত্রনে স্টোয়িক দর্শক এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। সম্ভবত হোইচির কাহিনিটি একটি প্রতিবাদের গল্প। কর্তৃত্ববাদী অলিগার্কিকাল রাজনীতির প্রভাব এর মধ্যে লক্ষ্যনীয়। “অলিগার্কি” হল একটি ছোট গোষ্ঠী যারা একটি নির্দিষ্ট দেশ বা সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করে। রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো এর উদাহরণ। প্রাচীন এথেন্স একসময় অভিজাততন্ত্রের শাসনে ভুগেছিলো।
 
আভিজাততন্ত্র শিল্পকে পদপিষ্ট করতে চায় । এই গল্পে রাজ্যের সহিংসতার প্রতিনিধি একজন সামুরাই। হোইচির কান উপড়ে ফেলার মধ্যে দিয়ে শিল্পকে তারা গলা টিপে হত্যা করতে চেয়েছে।
 
কান শ্রবণেন্দ্রিয় এবং শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে। সেটিকে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে দুটি শক্তি হারিয়ে যায়। হোইচির গল্প পড়ে মনে হয়, অভিজাততন্ত্র হয়তো এভাবেই শিল্পের স্বর কেড়ে নিতে চেয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত