| 19 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত প্রবন্ধ

অসমিয়া অনুবাদ: সর্বগুণাকর শ্রীমন্ত শঙ্করদেব । নুরুল সুলতান

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

লেখক পরিচিতি-

শঙ্করদেবঅসম সাহিত্যসভার কর্ণধার সমিতির প্রাক্তন সদস্য। বর্তমানে সমিতির কার্যকরী সভাপতি।প্রাক্তন ছাত্র নেতা এবং বর্তমানে একজন বিশিষ্ট সমাজকর্মী লেখক শ্রীমন্তশঙ্করদেব সঙ্ঘের ৮৭ সংখ্যক বার্ষিক অধিবেশনের আদরনী সমিতির একজন উপ সভাপতি নুরুল সুলতান ১৯৬৯ সনে জন্মগ্রহণ করেন।‘জেতুকাপাতর দরে’অসমিয়া চলচ্চিত্র প্রযোজনা করে ২০১১ সনে রজত কমল বঁটা লাভ করেন।লেখকের প্রকাশিত চব্বিশটি গ্রন্থ এবং ছয়টি সম্পাদিত গ্রন্থ রয়েছে।‘নদীর দরে উপন্যাসটি ইতিমধ্যে বাংলায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে।


মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ- বাসুদেব দাস

(১)

জ্ঞান-মধুকর শ্রীমন্ত শঙ্করদেব

হয়তো গুরুজনা ফিরে আসতেন না!ভ্রমণে থাকার মন।ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেলে দিন গড়াতে থাকে।দ্বিতীয়বার যখন ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গিয়েছিলেন,মাধবদেবই ফিরিয়ে এনেছিলেন।এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় গুরুচরিত এবং পন্ডিতদের রচনায়।অনুমান করতে পারা যায় গুরুজনার জীবনশৈ্লী অধ্যয়ন করেছেন।দ্বিতীয়বার ভ্রমণে গিয়ে ফিরে আসার পরে গুরুজনার পত্নী মাধবদেবকে বলেছিলেন-‘বাপু,তোমার কৃপায় আমি আমার স্বামী গুরুকে পুনরায় লাভ করলাম।আমি এতদিন জীবন্মৃত ছিলাম,আজ হে তোমার কৃপায় জীবন লাভ করলাম।’

গুরুজনার জীবন পরিক্রমা অধ্যয়ন করলে অনুভব হয়-লক্ষ্য কেবল ধর্ম প্রচার হিল না।মানুষের মধ্যে থেকে ‘মানুষ’গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল।‘ভালোমানুষ’এর দ্বারা মাত্র একটা সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।সেই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছিলেন।

কয়েকটি গ্রন্থে পাওয়া যায়- ১৩৯৬ শকে গুরুজনার প্রথম পত্নীর মৃত্যু হয়।অসমিয়া সাহিত্যের ‘গুরু’লক্ষ্মীনাথবেজবরুয়া ‘মহাপুরুষ শ্রীশঙ্করদেব আরু শ্রীমাধবদেব’গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন-‘১৩৯৬ শকে শঙ্করের ভার্যা সূর্যবতীর গর্ভে ম্নু নামে একটি কন্যার জন্ম হয়।মনুর যখন নয় মাস বয়স সূর্যবতীর জ্বরে মৃত্যু হয়।তখনসূর্যবতীর বয়স পঁচিশ বছর।সূর্যবতীর মৃত্যুর আগে থেকে শঙ্করদেব তীর্থে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।  

সূর্যবতীর অন্ত‍্যেষ্টিক্রিয়া কার্য শ্রাদ্ধাদি করে শঙ্করদেববর দোয়ায় কিছুদিন ছিলেন। খরার জল শুকিয়েযাওয়ায় জলের কষ্ট হল। শঙ্করদেব কে ভক্তরা সে কথা জানাল। শঙ্করদেব জলের কষ্ট দূর করার নিমিক্ত’বটদ্রবা গঙ্গা’ কীভাবে আনলেন, সেই অলৌকিক কথার বিষয়ে চরিত্রে এভাবে লিখেছেন – উত্তরপ্রদেশে আছে বটবৃক্ষ গোট। লাসে  লাসে  পায় গতি চলিল সন্নিত।। উপরকচায়া পদ আঙ্গুলিরআগে।আটি জল  আবাহন করি মহাভাগে।। হাতরলাখুটি ধরি ধেনুকাঁড় করি। বটর উত্তর প্রান্তে আইলাআঞ্চমারি।।নাম প্রসঙ্গ করি ভক্তগণ  সঙ্গে । সয়নকরিলা গুরু মহা মন রঙ্গে ।। মধ্য রাত্রি গুরুজনাগৈলাতৈক লাগি । তাহানইচ্ছায়ে গঙ্গা আইলন্তভাগি।। মহা ভয়ানক শব্দ ভৈলঅতিশয় । সবে বোলে কিবা আজি প্রলয়মিলয়।।টল-বল করি বট  উপরে পরিল। মহা চোটে বট গোট অভ্যন্তর ভৈল।। সর্বজয় বলরাম লগত  আছিলা। গঙ্গা আগমন বেগ দুই হানো দেখিলা।। তারাজনে বোলে ইটো কিবা বর কাজ । সাত  বৈকুণ্ঠকোদেখিলন্ত   সবে রাজ।। শঙ্করে বলন্তআরুকাতোনকহিবা। ভক্তরবাঞ্ছায়েসর্বসিদ্ধিকজানিবা।। এহিবুলি গুরু আসি শয়নকরিলা। শব্দ শুনি বুঢ়াখাঁআবরজনআইলা।। কিবা ভৈলবুলিয়া  আৱরজন আসি। শোধন্তেকহিলা গুরু বদন প্রকাশি।। কোন ভয় নাহি তোরা চলিয়োক ঘর। প্রভাতে দেখিবা যেন করিলা ঈশ্বর।। সকালবেলাপ্রত্যেকেই বট গাছ থাকা জায়গায়’আকাশী গঙ্গা’ দেখে অবাক হল।

এর কিছু কাল পরে  শঙ্কর রামচন্দ্রকায়স্থের পুত্র হরির কাছে মনুকেবিয়ে দিল। জামাতাকে শঙ্কর ‘ বোলন্ত বাপু শুনিয়ো  জামাই।একগুটী জীউ মোর পুত্র আর নাই।। তুমি সে আমার পুত্র থাকা এই ঘর। যতেক সর্বস্ব আছে সকলো  তোমার।শঙ্করর আজ্ঞা মানি তথা থাকিলা। ধর্ম প্রকাশিয়া দেব শঙ্কর রহিলা।।ভূঁয়াব্রাহ্মণগন আসি প্রতিদিন ।শঙ্করর পাশে করে হরির কীর্তন।।’

পুত্রী মনুকেবিয়েদিয়েগুরুজনা যেন’ সংসার কর্ম’ থেকে মুক্ত হলেন। বিশাল মন। একটা বৃত্তের মধ্যে ঢুকে থাকবেন কীভাবে? তাই ঠিক করলেন ভ্রমণ করবেন। ঘুরে বেড়াবেন। ভিন্ন সমাজের মধ্যে প্রবেশ করবেন। তাই একদিন রামচন্দ্রকে কাছে বসিয়েগুরুজনা মনের কথা ব্যক্ত করলেন।

‘ঘর-বারী তোমাকগতালোঁ।মইতীর্থলৈওলালোঁ।মনুরআরুসকলো দায়িত্ব তোমার।'( ‘নবযুগ’/ বিষ্ণুপ্রসাদরাভা)গুরু মহেন্দ্র কন্দলীর সঙ্গে ১৭ জন যাত্রী নিয়েগুরুজনা যাত্রা আরম্ভ করলেন। সঙ্গে নিলেনপিতৃ-মাতৃ এবং পত্নীর অস্থি। অবশ্য গুরুজনের জন্য বিশেষ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিলদাদিখেরসুতিকে  নিয়ে। সমস্যা দূর হল ভাই বনগয়াঁ গিরির  হাতে দাদিকে সমর্পণকরে।দাদি অবশ্য গুরুজনার তীর্থ ভ্রমণ মেনে নেয়নি। দাদিচেয়েছিলেন গুরু জনা পুনরায় সংসার ধর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ুক। কিন্তু যথাসময়ে সবাইকে শান্ত করে শান্ত পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাত্রা আরম্ভ করলেন–’ প্রথম প্রবাসেবহিলন্ত ঘর সাজি।’

সাত দিনের যাত্রা। নৌকা যাত্রা। ভাটির দিকে গিয়ে পেল পুরুষোত্তম ক্ষেত্র। যাত্রাকালে গঙ্গা স্নান করলেন।’বিধিমতে স্নান দান করিলে’। বিভিন্ন’ লেখা’ অনুভব  করতে পারা যায়, স্পষ্ট করে বলা যায় সেই মুলুক তো গুরুজনা যাবার আগেই গুরুজনাকে জানতে পেরেছিল। উদাহরণস্বরূপ এই কথাটা উল্লেখ করতে পারা যায়– পরমানন্দশঙ্করদেবের জন্য খাওয়ার জিনিস আনতে গিয়ে একজন বুড়িদোকানির কাছে পৌঁছালো, বুড়ি টাকা পয়সা না নিয়েএমনিতেই জিনিসগুলি এনে শঙ্করদেবকে ঈশ্বর জ্ঞানে সেবা করলেন।

পুরীর পাণ্ডাদের গুরুজনার প্রতি আগ্রহ ছিল, শ্রদ্ধা ছিল। আগ্রহ- শ্রদ্ধা না থাকলে গুরুজনাআঠারোনলা- চৌকি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জগন্নাথ মহাপ্রভুর প্রসাদ নিয়ে আসতেন না। এই আগ্রহ, এই শ্রদ্ধার কারণ গুরুজনার শাস্ত্রে থাকা প্রচুর দখল এবং পাণ্ডিত্য। এই প্রসঙ্গে রসরাজবেজবরুয়া লিখেছিলেন – পুরীতে তিনি ব্রহ্মপুরাণের আখ্যান মতে ক্ষেত্রের মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করে এবং অন্য শাস্ত্র নিজের পাণ্ডিত্য প্রকাশ করে পাণ্ডাদের শ্রদ্ধা- ভক্তি আকর্ষণ করেছিলেন।’

মানুষের মধ্যে বিলীন হওয়ার মন গুরুজনার। বাড়িতে ফিরে যাবার মন যেন সম্পূর্ণ ছিল না । নদী থেকে নদীতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা ঘুরে বেড়ানোর মন । প্রত্যেকেরমনতো সেরকম না হতেই পারে। তাই কন্দলী এবং অন্যান্যদের বলেছিলেন – তোমরা সকল আবে গৃহে চলিয়োক। সর্বজয়পরমানন্দ মোর  লগেরৌক। আরু বলরাম এহি  তিনি মোর সঙ্গে। যাইবাকলাগয় আবে গৃহে যাওক রঙ্গে। কন্দলীকপ্রণামিয়াবুলিলা বিস্তর। রামরাম সমে তুমি চলিয়োক ঘর।’

কিন্তু প্রত্যেকেই আপত্তি করেছিল। যুক্তি-তর্ক আরম্ভ হয়েছিল; আর শেষে বলরাম, গুরুদেবছাড়াপ্রত্যেকেইবাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এই যাত্রায়গুরুজনার আদর্শ ছড়িয়েপড়েছিল। বলা যেতে পারে– সেই সময়ে বিস্তর রূপে’ শংকর গুরু’ নির্মাণ হয়েছিল। গুরুজনার এই ‘ভ্রমণ’ প্রসঙ্গে চর্চা হয়েছে। গবেষণা হয়েছে। চর্চা গবেষণার আরও অবকাশ রয়েছে।

গুরুজনা কোথাও যান নি। বারানসী, সীতাকুণ্ড, বরাহকুণ্ড, প্রয়াগ, অযোধ্যা, বৃন্দাবন থেকে বদরিকাশ্রমে ঘুরে বেড়িয়ে ছিলেন। ১২ বছর পার হওয়ার পরে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। এই যাত্রাকালের ছবি–’ গয়া কাশী পুষ্কর আদি করি। শঙ্করো  চলিলা তীর্থকার্যক আচরি।। বারাণসী, প্রয়াগ, সীতাকুণ্ড, বরাহ কুণ্ড, উত্তর বাহিনী, এবং অযোধ্যা ইত্যাদি শঙ্করদেরদর্শন করে।’তৈরহন্তেরূপ সনাতন যৈত আছে। তাহানঘররওচরতপাইলা পাছে।। শুনি দুইজনেআসিলেকলরালরি। ভক্তিভাবে আসি প্রণামিলাপায়ে পরি।।‌ মুর দেব দেব প্রভু বলি দুইজন। পুনঃ পুনঃপ্রণামিলা দুখানি চরণ।। দেখিয়াশঙ্করদেবআলিঙ্গিধরিলা।তোরা দুই ভাই আয়ে কিসকআসিলা।।হাতত  মদিরাদেখোঁ কী ধর্ম আচরা। শুনি রূপে  বোলে তুমি জগতরে বরা।। তোমার আদেশে আমি ভ্রমিনানাস্থান। নামধর্মপ্রকাশিয়াফুরোঁ যত মান। হে জগত গুরু ঈশ্বর মুরারী। তোমার মহিমা কিবা কহিবাক পারি।। জানি কৃপাময় কৃপা করিয়ো এখন। তোমার চরণে যেন নচারয় মন।। নিজ জন বুলি প্রভু করিয়ো উদ্ধার । রাম হরি কৃষ্ণ নাম হৌক সার।।’

এই ১২ বছর যে ঘুরে বেরিয়ে ছিলেন, এমন নয় ।শাস্ত্র চর্চা, সংগীত চর্চার ধারাবাহিকতায় কোনো বাধা পড়েনি। সেই সময়ে রচিত হয়েছিলচিরসবুজ– মন মেরি রামচরণহিলাগু…’।

গুরু জনা মাধব দেবের সঙ্গে দ্বিতীয়বারছয় কুড়ি ভক্ত সহ তীর্থ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন।সেইসময়, যে সময়ে রাজা নরনারায়ণ রাজধানী বরনগর থেকে কোচবিহারের রাজধানীতে নিয়েগিয়েছিল। সন ১৫৫০। এই কথা গুরুজনার পত্নী কালীন্দীকে  দুঃখ দিয়েছিল।কালিন্দীমাধবদেবকে বলেছিল –মাধব,গোঁসাই তীর্থে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছে।কিন্তু তিনি যদি বৃন্দাবনে যান ,তাহলে আর ফিরে আসবেন না।আমি অনাথিনী হব।তাই তোমাকে অনুরোধ করছি গোঁসাইকে বৃন্দাবনে যেতে বাধা দাও।বাধা দেওয়ার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে।তোমার কৃপায় যদি অনাথিনী না হয়ে স্বামীকে লাভ করি।’মাধব কথা দেওয়ায় কালিন্দী গুরুজনাকে তীর্থযাত্রায় বাধা দিলেন না।পত্নী কালিন্দী যে গুরুজনাকে ‘পর্যটনবিলাসী’বলে অনুভব করেছিলেন,সেই কথায় বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।কালিন্দী নিশ্চয় অনুভব করেছিলেন-বৃন্দাবনের সৌন্দর্য বন্দি করে রাখবে।সমস্তভুলিয়েরাখবে।কিন্তু একাংশ বিশ্লেষক বলতে চায় –‘ভ্রমণ বিলাসী’গুরুজনার মনে আসলে লুকিয়ে ছিল বিভিন্ন জায়গার সঙ্গে সেতু নির্মাণ করার স্বপ্ন।কিছু পরিমানে বাস্তবায়িতকরেছিলেন,বিভিন্ন বাধার মাধ্যমে।

এখানে কিছু কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে। ১৫৪৬ খ্রিস্টাব্দেগুরুজনা তার অনুগামীদের সঙ্গে কোচ রাজ্যের অধীনে থাকা পালেংদিবারীতে বসবাস শুরু করেন। এবং পরবর্তীকালে পাটবাউসীতেস্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । রাজা নরনারায়ণ প্রথম অবস্থায় গুরুজনাকে পছন্দ করতেন না কিন্তু যখন ভাই শুক্লধ্বজের  মুখে ‘ শংকর গুরু বন্দনা ‘ শুনলেন , গুরুজনার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করলেন । সাহিত্যচার্যলক্ষ্মীনাথবেজবরুয়াররচনায়পাওয়াযায়’ ছোটো রাজা শুক্লধ্বজের দাদা মল্লনারায়ণ বা নরনারায়ণ রাজা ভাইয়ের মুখে শঙ্করদেবের কথা শুনে শংকরদেবের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করায়শুক্লধ্বজ  সে কথা শঙ্করদেবকেজানিয়েশঙ্করদেবকেনরনারায়ণ রাজার কাছে নিয়ে গেল। রাজা তাকে পরম আদর সম্মান করে তার সঙ্গে অনেক শাস্ত্রালাপ করলেন। রাজা শঙ্করদেবকে বিষ্ণু বৈষ্ণবের কথা, বৈকন্ঠ বিবরণ, বৃন্দাবনের বৃত্তান্ত, শ্রীকৃষ্ণ এবং গোপ- গোপীদের বিবরণ আদি জিজ্ঞেস করায়, শঙ্করদেবসেইসবতন্নতন্ন করে রাজাকে বললেন। এরপরে দাদা -ভাই দুইজন রাজা শঙ্করকে নম্রভাবেজিজ্ঞেস করলেন যে যদি বৃন্দাবনটা এরকম ছিল, সেটা যদি পটে তাদের দেখাতে পারেন তাহলে ভালো হয়। একথা শুনে শঙ্করদেব বললেন–’ মহারাজ, যদি আপনার সেরকম ইচ্ছে তাহলে কাপড়ের পট বানানোর নিমিক্ত নানা বর্ণের সুতোর ব্যবস্থা করুন।চারমাস পরে সেই পট প্রস্তুত করে এনে দেওয়া সম্ভব হবে।’ এ কথা শুনে রাজা খুশি হয়ে সমস্ত কিছু ব্যবস্থা করার আদেশ দিলেন। সঙ্গে এটাও বললেন যে তিনি শঙ্করদেবকেতাঁতীকুছি আদি রাজ্য খন্ডের ওপরে অধিকার প্রদান করে পাটবাউসীতেবড়ভূঁইয়া পদে অভিষিক্ত করলেন এবং সেই খন্ডের রাজ্যের চর্চা, পালন এবং শাসন করার ক্ষমতা দিলেন। দাদা নরনারায়ণ রাজার হাতে শঙ্করদেব এভাবে সম্মানিত এবং সমাদর লাভ করায়শুক্লধ্বজ পরম আনন্দ লাভ করে, শঙ্ককরদেবকে পুনরায় নিজের বাড়িতেনিয়ে এসে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই তাঁর কাছে শরণ নেবার জন্য অনেক অনুনয়- বিনয় করে প্রার্থনা করলেন, শঙ্করদেব তাদের শরণ  দিলেন। এরপরেশুক্লধ্বজশঙ্করদেবকে নৌকা, মানুষ সঙ্গে দিয়েপাটবাউসীতে রেখে আসার বন্দোবস্ত করলেন।

পাটবাউসীতেগুরুজনা বৃন্দাবনে বস্ত্রে’শিল্পকর্ম’ করেন এবং সেই সময়ে রাজা নরনারায়ণের কাছের মানুষ হয়ে উঠেন। অতি আপনজন হয়ে ওঠেন। এমনকি রাজসভাতেও শাস্ত্রযুদ্ধে ব্রাহ্মণদের লজ্জায় ফেলেন। গুরুজনারপান্ডিত্য দেখে মুগ্ধ রাজা নরনারায়ন বলেন–’ চলিয়োক  ঘর আবে দিলোঁ রাজ্য খন্ড ।বড় ভূঁইয়া তুমি গুণ দোষে দিব দণ্ড।। তোমার আজ্ঞাতে চলিবেক সবেপ্রজা। বিদায়দিলন্তসেহিমতেমহারাজা।।’

কোনো কোনো পন্ডিত ব্যাখ্যা করতে চান রাজা নরনারায়ণের সঙ্গে সম্পর্ক মধুর হয়ে থাকুক বলেই গুরুজনাদ্বিতীয়বার  তীর্থ ভ্রমণে গিয়েছিলেন। কেন? এর ব্যাখ্যা এভাবে পাওয়াযায়। সেই সময় ব্রাহ্মণরা গুরুজনের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। গুরুজনা অনুভব করেছিলেন ব্রাহ্মণের যে অংশ তাকে মেনে নিতে পারেনি সেই অংশটির সঙ্গে সময় খরচ করে লাভ নেই আর এদের সঙ্গে পুনরায় রাজসভায়শাস্ত্রযুদ্ধের ও কোনো যুক্তি নেই। তাই এই অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে দূরে থাকাই মঙ্গল। সে যাই হোক না কেন, যাত্রা করেছিলেন, ঘুরে বেড়িয়ে ছিলেন, ভ্রমণ কালে শাস্ত্রচর্চাও করে গেছেন।

একদিন তারা একটি গ্রামের মধ্য দিয়ে যাবার সময়শঙ্করদেব দেখলেন যে এক জায়গায় কিছু পন্ডিত একত্র হয়ে বসে শাস্ত্রের অর্থ ব্যাখ্যা করছে।মাধবদেবকেশঙ্কর দেব জিজ্ঞেস করলেন–’,বঢ়ার পো,ওটা কিসের মেল?’ মাধব উত্তর দিল–’ বাপ শাস্ত্রর অর্থ ব্যাখ্যা হৈছে। এই কথা শুনে শঙ্করদেব বললেন–’বঢ়ার পো,আমারো   অর্থ ব্যাখ্যা করা। গুরুর আজ্ঞা অনুসরণ করে মাধবদেব এই গীতটি রচ‌না  করে গাইলেন–

‘ শুনিলো পন্ডিত।

হরি কথা সেবারসে,থির করু চিত‌‌।

  *          *          *       *

ভকতি সমান বলি নাহি আর।

কখন মাধব গতি নন্দর কুমার॥

এই একই রচনায় উল্লেখ করা হয়েছে– একদিন শঙ্করদেবকয়েকজনঢুলিয়ার ঢোল বাজনা শুনে মাধবদেবকেজিজ্ঞেস করলেন–’বঢ়ার পো ,ওরা কী করছে?’ মাধবদেব বললেন–’ বাবা, ঢোল বাজাচ্ছে।’ শঙ্করদেব এই কথা শুনে মাধবদেবকে বললেন–’বঢ়ার পো , আমার জন্য ও চাই।’ এই বাণী শুনে তখন এই গীতটি রচনা করে গাইলেন–

মুকুন্দ মাধব মুরারীমধুরিপু,

জগত জীবন রাম হরি হরি।’ ইত্যাদি

এক জায়গায়একজনকেকৃষিকাজ করতে দেখে শঙ্করদেবমাধবদেবকেজিজ্ঞেস করলেন–’বঢ়ার পো, লোকটি কী করছে?’মাধবদেব উত্তর দিলেন–’ বাপ, কৃষি কাজ করছে।’ ‘ তাহলে আমারও কর।’ এই কথা শুনে এই গীতটি রচনা করে গাইলেন–”কিরিষি কর আল মনাই।’ ইত্যাদি। অর্থাৎ হরিনামের চাষ করার কথা বলেছেন।

এই কয়েকটি উদাহরণে স্পষ্ট হয়ে আছে গুরুজনার’ভ্রমণের উদ্দেশ্য’। গুরুজনারসমন্বয়ের বার্তা তখন চারপাশে ‘উড়ে’ বেড়াত, ভ্রমণের সময় যখন কবীরের ঘর দেখতে পেয়েছিলেন তখন কবীরের কবর দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। আমরা ইতিমধ্যে উল্লেখ করা প্রবন্ধটি পড়েছি–’ পথে যাবার সময়কবীরের ঘর দেখতে পাই, শঙ্করদেবকবীরের কে আছে বলে জিজ্ঞেস করায়,একজন মহিলা বেরিয়ে এসে ভক্তি ভাবে বললেন যে তিনি কবীরেরনাতনি। শঙ্করদেবকবীর কীভাবে ছিলেন, অনন্তকালে কী হল ইত্যাদি সমস্ত বৃত্তান্ত তাকে ভালোভাবেজিজ্ঞেসকরায় তিনি বললেন–’ আমার পিতামহ কথা। মালীর ঘরে, কায়স্থ কুলে, জনম লভিল তথা।। অতি শিশু কালে, পিতা মাতা দুই প্রানকছাড়িয়াগৈল। রক্ষক নাছিল, দেখি নিকটর যবনে তুলিয়ালৈল।। বয়স ভৈলন্ত, রূপ প্রাণবন্ত, পঢ়িল ধরম শাস্ত্র। ভাগবত ধর্মে, ভৈলন্ত নিরত, হিন্দু ধর্মে সদারত।। কৃষ্ণ যশাচয়,কবিতাকরয়, হরির ভকতি করি। ফুরন্তেআসিয়া কাল ভৈল তান, বৈকুণ্ঠকগৈলা লরি।। যবনবুলিয়াহিন্দুয়েনছুঁয়ে, যবনে হিন্দু বুলিয়া।। নুচুইবার দেখি, গঙ্গার জলত পেলাইছিলোঁ আমার নিয়া।। স্রোতে উঠি গৈলা, চৈতন্য গোঁসাইর,ঘাটত  চাপিলাযেবে। ভকতকদিয়া, দয়ালুগোঁসাই পোতাইয়া থৈলাতেবে।। নদীয়ার রাজা এসন্তোষ মনে, চৈতন্যক রাগ কৈলা।মোর গুরু হুইয়া,যবনজনকপশিয়া, পোতাইয়া থৈলা।। চৈতন্য বদতি শুনা নরপতি,নোপোতোযবনজন। মহন্ত ভকত কবীরা বৈষ্ণব দেখিলে পাইবা প্রমাণ।। নিজে গৈয়া রাজ্য খান্দিয়াদেখিলা, চতুর্ভুজ মূর্তিখান। কাষ্ঠময়হুইয়া, বসিয়াআছয়, গন্ধ বহেবিতোপন।। আচরিত মনে, রাজায়ো   তেখনে, পোতাইলা কবর করি। মহা ভক্তিভাবেচৈতন্যক  নমি, চলিলা নিজ নগরী।।’

কবীরের নাতির মুখে কবীরের  এই বৃত্তান্ত শঙ্করদেব শুনে,কবীরের কবর দেখার ইচ্ছায়বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতেই কবীরেরনাতনি দ্রুত স্বামীর মাথার পাগড়িটা এনে শঙ্করদেবের সামনে রেখে দিয়ে, তার মধ্যে তাঁর চরণের ধুলো দেবার প্রার্থনা জানিয়ে বলল–’ আমার স্বামী বড়ো দুর্ভাগা, তিনি আপনাকে দেখতে পেলেন না। পরে এসে শুনলে মনে খুব দুঃখ পাবে। তাই এই পাগড়িতে আপনার পায়েরধুলো দিন, তিনি এলে তাকে নিয়ে এই ধুলো দেব,তাঁর মহা ভাগ্য লাভ হবে।’

‘ মানবধর্ম চর্চার সঙ্গে ভ্রমণ কালে সংগীত নাট্য করেছিলেন দ্বিতীয় তীর্থযাত্রার সময় জগন্নাথ মহাপ্রভুর নাট্য মন্দিরে গুরুজনা প্রবেশ করেছিলেন এবং গুরুজনের আশীর্বাদে মাধব দেব রচনা করেছিলেন–

‘মোক দেখ না কেনে ওহে জগন্নাথ মই বর পাপীর পাপী।

সংসার কূপতপরিয়া তোমার চরণে নধরো  চাপি।।

 দেবে নাহি পায়  মানবী হৈবাক, মই পাপী আসিয়াপাইলো।

তোমার ভকতি- অমিয়াত‍্যজিয়া বিষয় গরল খাইলো।।

কত তপসাইনরতনু পাই গোয়াইলো বিষয় ভোলে।

 যেন চিন্তামণি অমূল্য রতনিবিকাইলোকাঞ্চরমোলে।।

লোভ মোহ কাম ক্রোধ মদ মান ইসববৈরীর  সঙ্গে।

আপোনইচ্ছায়ে পাপ আচরিয়াবেরাইলোমনত রঙ্গে।।

পর তিরী পর ধনরআশায়েসদয় আকুল ভৈলো।

 তুমি মহাধনতোমাকনেসেবি জনম বিফল কৈলো।।

আয়ুআলেজালেগৈল পাইলে কালে প্রাণ কোন দিন পরে।

যমর যাতনা শুনিয়াহৃদয় কম্পিত ভৈগৈল বরে।।

তোমার অভয় চরণে শরণ বিনে নাহি আন গতি।

তুমি দয়াময়জানিয়াকহয় মাধব মূরখমতি।।’

পুরী ভ্রমণের পরে গুরুজনার পত্নী যে ভয় করেছিল, তাই হল। বৃন্দাবন যাবার জন্য প্রস্তুত হল। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন মাধবদেব। মাধব দেবের আচরণ অতি সহজে অনুভব করলেন গুরুজনা এবং বললেন –’বঢ়ার পো আজি কেনেদেখোন? বৃন্দাবন লৈযোয়া বাট এরি যাব লাগিছাদেখোন।’শ্রীমাধবদেবওনম্রভাবে বললেন – বৃন্দাবন লৈ  যাবর কোনো সকাম নাই।তোমোরাই দশম শাস্ত্রর মনোরম পদ এরিবৃন্দাবনর লীলার সকলোখিনি সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন। তা পড়ে  আমার মন উপশম হয়েছে। বৃন্দাবনে এখন পূর্বের চিহ্ন নেই ।….… বৃন্দাবন দর্শন করার ইচ্ছে নেই ।আপনার চরণে  বাপ এই প্রার্থনা এই ভৃত‍্যেরমনোরথ পূরণ করে ।’

শ্রীমন্ত শঙ্করঃবঢ়ার পো, তোমার কথাই থাকবে। বৃন্দাবন যাত্রা মাথা থেকে বের করে দিলাম।

শ্রী শ্রীমাধবঃ সত্যিই!…তাহলে?

শ্রীমন্ত শঙ্করঃবঢ়ার পো যেখানেই যাই না কেন, সেখানে আমি যাব না। তাই আমরা উজানে যাব।( নাটকঃ শঙ্কর –মাধব/ নাট্যকারঃঅখিলেশ দত্ত)

এখানে আমাদের অনুভব, শ্রীশ্রী মাধব দেবের মুখের বাক্যগুলি পড়ার পরে গুরুজনার ভ্রমণের অন্য একটি উদ্দেশ্য ছিল সমাজ দর্শন করে সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সমাজ দর্শনকরানো। পন্ডিত ডক্টর বিমল ফুকনদেব’মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শঙ্করদেব’ গ্রন্থে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন–’ যাযাবর গুরুর লক্ষ্য ছিল–

(ক) এমন একটি ধর্মপন্থা গড়ে তুলবেন যা সামাজিক সংস্কার সাধন করার সঙ্গে পাঁচশো বছরেরও অধিক কালের অন্তত তার অনুগামীদের কাছে এক জীবন প্রণালী হয়ে পড়বে।

(খ) অসমিয়া কলা এবং সংস্কৃতির কেন্দ্র স্বরূপ অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন।

(ঘ) পুথি- পাঁজি এবং শাস্ত্র সমূহ সংস্কৃত থেকে স্থানীয় অসমিয়াভাষায় অনুবাদ করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া ।

(ঙ) অন্তুর স্পর্শ করা গীত  রচনা করে সর্বভারতীয় ধ্রুপদী রাগে সুর দেবেন এবং কণ্ঠ দান করবেন।

(চ) নাটক রচনা করবেন, অভিনেতার পোশাক বাদ্যযন্ত্র নির্মাণ করার পরামর্শ দেবেন, নাটক মঞ্চস্থ করার সঙ্গে সেইসবের সূত্র দেবেন।

(ছ) এরকম একটি নৃত্যশৈলী সৃষ্টি করবেন, যা একাদিক্রমে পাঁচ শতিকা জুড়ে জীবিত থাকার সঙ্গে ভারতবর্ষের ধ্রুপদী নৃত্য শৈলীর মাঝখানের একটি বলে স্বীকৃতি লাভ করবে। কেবল একজন ব্যক্তির সঙ্গে শুরু থেকে সোজাসুজি যুক্ত হয়ে থাকা এটাই হবে একমাত্র নৃত্যশৈলী।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত