| 17 এপ্রিল 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গদ্য: তব পরশে জীবন লেগে থাকে । পায়েল চট্টোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট




সবাই শুভ জন্মদিন শুভ জন্মদিন বলে যেভাবে হামলে পড়ল , কেকের টুকরোটা লেপ্টে গেল শাড়ির সঙ্গে। শাড়িটার সঙ্গে দামী পারফিউমের গন্ধ মিশেছিল। তার সঙ্গে মাখামাখি কেকের টুকরোটা পাহাড়ের ওপর আগাছার মত দেখতে লাগছিল। পাহাড়ী রঙের শাড়ি বলেই বোধহয় মানুষটাকে পাহাড় বলে ভ্রম হয়। তবুও শাড়ি থেকে গন্ধ ভেসে আসে। চড়া পারফিউমের গন্ধ ছাপিয়ে, কেকের মাখামাখিতে বিরক্ত মুখের গন্ধের গণ্ডি ভেঙে মানুষের গন্ধ। শাড়ির ভেতর লুকিয়ে থাকে অজস্র এমন গন্ধ। শরীরের গন্ধের বাইরেও মনের গন্ধ। মানের গন্ধ।

একটা আলো মাখা সন্ধ্যে। আড্ডা, কথার পিঠে কথা। কথার ভারে মুক্ত কথা। সবচেয়ে মলিন মুখের পরনে ঝিলিমিলি লাগানো উজ্জ্বল শাড়ি। সেই উজ্জ্বল রঙের শাড়িটার ওপর প্রজাপতি এসে বসে অনবরত। ক্রমাগত রং খেলে যায় তাতে। প্রশংসা, ঈর্ষার লোলুপ দৃষ্টি লেগে থাকে শাড়িটায়। তারপর যখন অন্ধকারের সুড়ঙ্গ খুলে যায়, দেখা যায় আদতে আঁধার ভালোবাসা শাড়ি ওটা। ওর গায়ে গুঁড়ি, গুঁড়ি আঁধার লেগে রয়েছে। শাড়ির মালকিন যখন তাঁর শাড়ির গায়ে হাত ছোঁয়ায় কালো রঙের আঁধার হাতে লেগে যায় তাঁর। সেই গুঁড়ি গুঁড়ি আঁধার একটা দানবের আকৃতির মেঘে পরিণত হয়েছে তখন। শাড়িটার ভেতর নিকষ, কালো মেঘ লেগে থাকে। যত সন্ধে হয় মলিন মুখ আরো মলিন হয়, শাড়ির প্রজাপতিরা আরো রঙিন। তবে শাড়ির ভেতরের মেঘটাও দৃঢ়। মলিন মুখ জানে এ শাড়ি বৃষ্টি নিয়ে আসবে। মলিন মুখ যখন একাত্ম হবে শাড়িটার সঙ্গে, তখন ওরা সব প্রজাপতি মুছে ফেলবে। শুধু মেঘ থেকে বৃষ্টি হবে। মলিন মুখের সবটুকু জুড়ে বৃষ্টি। আর এই বৃষ্টির সবটুকু ব্লটিং পেপারের মত শুষে নেবে ওই শাড়িটা। মলিন মুখটা যখন একা একা শাড়িটার সঙ্গে কথা বলবে ওরা একে অপরকে আদরের ওমে জড়িয়ে নেবে। 

হলুদ-কোটা সবে শেষ হয়েছে। মেয়েটার পরনে হলুদ রঙের শাড়ি। শাড়িটার গায়ে হলুদ গন্ধ। হলুদ কোটার সময় মেয়েটা হলুদ শাড়ি পরেছে। ফুল-ছাপ। মায়ের। টিপ টিপ হলুদের দাগ লেগে। হলুদ কোটার জন্যে আগত বৌ-ঝিরা ফিসফিস করছে। এমন সোনার বরণ মেয়ের গায়ে ফিকে একখানা শাড়ি। মেয়েটা শোনে। সব শোনে। হাসে। কখনো কাঁদে। শাড়িটা ওর মায়ের শাড়ি। মা যখন রান্না চড়িয়ে হলুদ মাখা হাত নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করত, মেয়েটা লেপ্টে থাকত মায়ের গায়ে। কদিন বাদেই মেয়েটাকে চলে যেতে হবে। মেয়েটা জানত। পরের ঘরে। অন্য পরিবেশ, অন্য গন্ধ। মায়ের হলুদ হাত-মোছা শাড়ির নিশ্চয়তার গন্ধবিহীন জীবনের ডাক। মানতে হয়। মা আজ কোথায় ব্যস্ত। মেয়েটা ইচ্ছে করে ওই শাড়িটা পরেছে যেটায় সবচেয়ে বেশী হলুদের গন্ধ। মা আছে ওটায়। মাখামাখি হয়ে। হলুদে মাখামাখি হয়ে। শাড়িতে জড়িয়ে। মায়ের গায়ে লেগে থাকার ইচ্ছে করে। হয়ে ওঠে না। তবুও মেয়েটা লেগে থাকে। মায়ের সঙ্গে। শাড়িটার সঙ্গে। মা এসে সব কাজ করবে। গুছিয়ে দেবে। নিপুণ হাতে মেয়েকে সাজাবে, নজর রাখবে সব দিকে। মেয়েটা শাড়িটা জড়িয়ে মাকে জড়িয়ে রাখে।

ন্যাপথালিনের গন্ধে মাখামাখি চারদিক। কী অপূর্ব স্মৃতি-গন্ধ। বেনারসী শাড়িটা কোনও অতীতের ডাক। ঠাকুমার বোধহয়। ঠাকুমা মানে সেই কোন সবুজ প্রান্তর থেকে ভেসে আসা ডাক। যে ডাকে মায়া। সেই ঠাকুমাকে সাদা শাড়িতে দেখা। সাদা চুল। ফোকলা দাঁত, রঙহীন। সাদা শাড়িতে স্নেহ-গন্ধ। ঠাকুমার সাদা শাড়িগুলো কাশফুলের মত দেখতে। নস্টালজিয়া। শেষ বয়সে বিভ্রমে থাকা ঠাকুমা। বারবার রঙ খোঁজা একটা ছায়া-মানুষ। রঙিন শাড়ি পরতে চাইছিল শেষ কটা দিন। সাদা শাড়িটা কুচি কুচি করে কেটে ফেলেছিল। সাদা শাড়ির ওপারে একটা অন্য জগত ছিল। সব রঙ মনে মনে জড়ো করত ঠাকুমা। শেষ কটা দিন রঙিন শাড়ির স্বপ্ন দেখা ঠাকুমা। ঠাকুমার চলে যাওয়ার পর অতীত প্রান্তর থেকে ভেসে আসা বেনারসিটা। কে নেবে তাই নিয়ে কাজিয়া! মাঝে স্মৃতিগুলো ভেসে যায় শুধু। মানুষ ছাড়িয়ে শাড়ির গায়ে লেগে থাকে স্মৃতি। বেনারসির পাশেই কুচি কুচি হয়ে পড়ে থাকা সাদা শাড়ি। বছরের পর বছর মানুষ বয়ে চলা শাড়ি। পরনের বস্ত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটা আস্ত মানুষ হয়ে ওঠা শাড়ি।

সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়ে বারবার শাড়িতে পড়ে। শাড়ির গায়ে দুধ পড়ে, চোখের জল মেশে তাতে। কাল রাতে পুরুষটার বেধড়ক মারের ফলে এদিক-ওদিক ছিড়ে যাওয়া শাড়ি। সেই শাড়ি জড়িয়েই বুকের শিশু ঘুমোয়। সকালে উঠে শাড়িতেই মায়ের গন্ধ শোঁকে শিশু। স্বামীর অত্যাচারে কতবার এই শাড়ি জড়িয়েই মরতে চেয়েছে সে। শিশুটার কান্নামাখা মুখ হতে দেয়নি। এভাবেই জীবন বাঁচিয়ে রাখা শাড়ি। গত বছর  অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে কেনা শাড়িটা।

শাড়িটার ভেতর থেকে নকল বুকগুলো বেরিয়ে আসে। মাঝে মাঝে দম বন্ধ লাগে মানুষটার। কিন্তু উপায় নেই। শাড়ি তুলে নগ্ন হওয়ার ভান করতে হয়। কেউ ভয়ে তাকায় না। বেশিরভাগটাই উপেক্ষা, অবহেলা। এমন অজস্র অনুভূতি বয়ে নিয়ে চলা শাড়িগুলো আসলে জীবন। বড় দামি জীবন। বলা ভালো জীবনের আশ্চর্য পরশ।


error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত