| 26 মে 2024
Categories
ধারাবাহিক

ইরাবতী ধারাবাহিক: কদমতলি (পর্ব-৯) । শ্যামলী আচার্য

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

       সকালের খবরের কাগজটা খুলেই মেজাজ খিঁচড়ে গেল উত্তমের। এই বাংলা কাগজটা একদম কোনও কাজের নয়। কংগ্রেসের দালাল একটা। রাতদিন বিশ্বনাথ প্রতাপের মুণ্ডুপাত। আরে বাবা, একটা ঠিকঠাক যুক্তিতে ফেল। তা’ নয়। এতদিনের পুরনো দল থেকে বেরিয়ে এসে জনমোর্চা গড়ে দেখিয়ে দিয়েছে লোকটা। শুধু দল গড়লেই তো হয় না। সব ক’টা বিরোধী দলকে এক ছাতার তলায় আনতে হয়। বিরোধী জোট অত সোজা নাকি! এমনিই আমাদের নানা ভাষা, নানা মত। খেয়োখেয়ির তো শেষ নেই। হ্যাঁ, আমাদের রাজ্যে একটা মিলিজুলি আছে বটে। সে অন্য ইকুয়েশন। দুশো একান্নটা আসন কি এমনি এমনি হয় নাকি? অনেক হিসেব আছে।  

এমনিই সাদা মনে ভাবলে মন্ত্রিসভার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী একজন প্রধানমন্ত্রীকে একের পর এক ইস্যুতে নাজেহাল করছে, মন্ত্রিসভা থেকে তাকে তাড়ানো হচ্ছে, লোকসভা থেকে রিজাইন করে বেরিয়ে গিয়ে আবার জিতে সে লোকসভায় ফিরে আসছে, আজকের দিনে বেশ নাটকীয় মনে হয়। ভারতীয় গণতন্ত্র এত সুস্থ মতামত পেয়েছে আগে? পেয়েছে হয়ত। বাবারা তো কম গল্প শোনায় না। প্রচুর ইডিওলজি ঝাড়ে। নকশাল পিরিয়ডের আগে ছেষট্টির খাদ্য আন্দোলনে একবার ঢুকে পড়লে তো আর রক্ষে নেই। প্রচুর বকে যাবে। কবে ভাত না খেয়ে রুটি খাওয়ার পরামর্শে আন্দোলন শুরু হল। সেখান থেকে দেশভাগ, দাঙ্গা, গোলটেবিল স্বাধীনতা, মন্বন্তর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কমিউনিস্ট পার্টির উত্থান অবধি পিছিয়ে পিছিয়ে যে কোথায় গিয়ে থামবে! ক্লোজ শট থেকে লং শট পুরো। কিন্তু এতকিছুর পরেও এ হল অস্ত্র কেনাবেচার মতো সেনসিটিভ ইস্যু। ভদ্রলোকের দম আছে ভাই। বললে হবে? একচেটিয়া পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন।    

       রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও অত্যন্ত দূরদর্শী। নেতা একেই বলে। ব্রিগেড শুধু ওঁর কথা শুনতেই উপচে পড়ে। উত্তম ভাবে, একজন অত ছোটখাটো চেহারার মানুষ ওইরকম ক্যারিশমা নিয়ে চলেন কী করে? আসলে চেহারা আর স্মার্টনেস দুটো সম্পূর্ণ আলাদা কনসেপ্ট। ঝাঁ-চকচকে পোশাক আর ইংরেজির ফুলঝুরি দিলেই নেতা হওয়া যায় নাকি? ভদ্রলোক একাই জহর কোট আর নেহরু টুপির দিন শেষ করে দিয়েছেন। সরল সাদাসিধে বক্তব্য। ঝাঁঝ নেই, অথচ এমন মোক্ষম হুল ফুটিয়ে দেন… ব্রিগেডে মাত্র দু’বার গেছে উত্তম। আহা… ব্রিগেড!  

       রোজ সকালে খবরের কাগজের কিছু খুঁটিনাটি মুখস্থ না করলে পার্টি অফিসে গিয়ে খুব চাপে পড়তে হয়। ইউনিয়ন রুমেও জয়দীপের মতো কিছু ত্যারা ছেলেপুলে আছে। কেবল এদিক-সেদিক দিয়ে চেপে ধরে। আং-সাং কথা বলে কাটানো যায় না। যদিও কোনও নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তরে সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কী করে অন্য বিষয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলতে হয়, আর ক্রমাগত কথার জালে জড়িয়ে অপরপক্ষকে নাজেহাল করতে হয়, এই স্টাইল উত্তম ক্রমশ রপ্ত করে ফেলছে। কিন্তু নিজে উত্তেজিত হলে হবে না। হাসিমুখে থাকতে হবে। নো এক্সাইটমেন্ট। অপোনেন্টের প্রশ্নের ফাঁদে পা দিয়েছ কি গেলে। পপাত চ। বরং উল্টোদিকের লোকটাকে খুঁচিয়ে দাও।  এটাসেটা বলে রাগিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। তার আসল প্রশ্ন গুলিয়ে যাবে। উত্তর না পেয়ে অন্য কথার জালে জড়িয়ে পড়বে। অনেকটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যাবে। ব্যস। খেল খতম।    

       ডায়েরিতে চটপট নোট নিচ্ছে উত্তম। আগের দিন জয়প্রকাশ নারায়ণকে নিয়ে কথা শুরু হওয়ায় চুপ করে থাকতে হয়েছে ওকে। ওর কেবল মনে পড়ছিল, অষ্টাশি সালে ওই ভদ্রলোকের জন্মদিনে জনতা দল তৈরি হল। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়াই করার জন্য প্রথম গাঁটবন্ধন। জনমোর্চা, জনতা পার্টি, লোকদল, সমাজবাদী কংগ্রেস মিলে জনতা দল। দ্রাবিড়া মুন্নেত্রা কাঝাগম, তেলুগু দেশমঅসম গণ পরিষদ ইত্যাদিকে নিয়ে জাতীয় মোর্চা। অনেক কষ্টে এই নামগুলো মনে রেখেছে। সংগঠন মানেই মেমোরি। কে কবে কখন কী। উত্তমের এই জায়গাটা ঘেঁটে যায়। ওর যেমন জাতীয় মোর্চার দলগুলোর নাম ছাড়া আর কিচ্ছু মনে নেই। তেমন কিছু তথ্যও পায়নি কোথাও। আর কলেজের মধ্যে ইউনিয়নের কাজে সারাদিনের নানান ছোটাছুটিতে জেনে নেবার কথাও মনে পড়েনি। পার্টি অফিসে গিয়ে রজতদা’কে একবার জিগ্যেস করলেই বুঝিয়ে দিতেন ঠিক। দু’চারটি কাঁচা প্রাকৃত শব্দ শুনতে হত। ওটা ফাউ। ওগুলো ধরতে নেই।  


আরো পড়ুন:  কদমতলি (পর্ব-৮) । শ্যামলী আচার্য


  

       এখন যেমন উত্তম কয়েকটা জিনিস খুঁজে পেতে পড়তে চাইছে। শ্রীলঙ্কা আর এলটিটিই। যুদ্ধ হলেই তো হল না। কেসটা ঠিক কী জানতে হবে। কে কেন কার ওপর চড়াও হল। আর সেখানে ভারতের ভূমিকা কী। শুধু তা’ই নয়। কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা আর বামপন্থীর স্ট্যাণ্ডপয়েন্ট, দুটোই বুঝতে হবে। পঞ্জাবের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে বাংলা কাগজে শুধু গল্প থাকে। ইন্দিরার মৃত্যুর পর থেকে রং-চড়ানো গল্প আরও বেড়েছে। এমন কোনও তথ্য থাকে না যা দিয়ে গুছিয়ে তর্ক করা যায়। আর একটা বিষয় উত্তমকে খুব ভাবাচ্ছে। চীনের ছাত্র আন্দোলন নিয়ে বাংলা কাগজগুলোতে তেমন কোনও খবর নেই। এদিকে পার্টি অফিসে ঢুকলেই চীন। উত্তম তো চীনের পাঁচিল আর চীনের চেয়ারম্যান ছাড়া কিচ্ছু জানে না। তা’ও চীনের চেয়ারম্যান রেফারেন্সে সেই গত দশকের নকশালদের হুটোপাটির গল্প।   

 আগের দিন এলসি’তে রজতদা খুব ঝেড়েছেন।    

“তুমি কোথাকার আমদানি হে? বাহাত্তর থেকে সাতাত্তর জানতে হলে তার আগেকার দিনগুলো জানবে না?”

উত্তমের কেবল মনে হচ্ছিল, ওর জন্মটা সাতের দশকের মাঝে না হয়ে আর একটু আগে হলে কী এমন ক্ষতি হত?

পরদিন রাগটা গিয়ে শিবপদর ওপরেই পড়ে। মধ্যবিত্তর যা হয়। বিপ্লব এবং প্রতিবিপ্লবের প্রাথমিক প্রয়োগ সংসারে।

“আচ্ছা বাবা, রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নিয়ে বইপত্র কিছু আছে তোমার কাছে?”

শিবপদ চক্রবর্তী, সরকারি বাসের কণ্ডাকটর ছিলেন এই কিছুদিন আগেও, পরে বার বার শরীর খারাপের জন্য বাসগুমটিতে তাকে অফিসের টুকটাক কাজে বসানো হয়; যদিও অনেকেই জানে বাস কর্মচারী সংগঠনের নেতৃস্থানীয় এই মানুষটিকে বিভিন্ন কাজকর্মে রাখার জন্যই তাকে সহজ কাজ দিয়ে রাখা হয়েছে, তিনি উত্তমের প্রশ্নে বিচলিত হন না একটুও। সকালে বাজার থেকে এসে কিছুক্ষণ ঘরের বাইরে রোদে বসে থাকেন। সকালের দিকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে আজ সারাদিন আর জ্বালা করবে না পেটের মধ্যে। বাজার করতে করতে চায়ের দোকানে চা খেয়ে খানিক খবরের কাগজ পড়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথায়বার্তায় পাড়ায় আজকাল যতটুকু জনসংযোগ করেন, তার চেয়ে অনেক বেশি মিশুকে তিনি। তার এককালের জঙ্গি মেজাজ অনেকেই ভুলতে পারেনি। যে কোনও মানুষের আপদে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার স্বভাব সকলেই জানে। উদ্বাস্তু কলোনীতে অবশ্য সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে। কিন্তু বেগড়বাঁই করা জনগণকে কড়কে দিতে হলেও শিবপদকেই লাগে। পাড়ায় এখন তিনি শিবুকাকা, শিবুজ্যাঠা। কারও কাছে দাদা। নাম ধরে ডাকার লোকেরা ধীরে ধীরে সংখ্যায় কমছে।

শিবপদ -এর আজকাল কারও সঙ্গেই বেশিক্ষণ কথা বলতে আর ভালো লাগে না। শরীরের মধ্যে আনচান। মনে হয়, ঘরে গিয়ে ঠাণ্ডা ছায়ায় একটু যদি শুয়ে থাকা যায়। সকালের রোদ মেখে মেখে যদি শুষে নেওয়া যায় আর একটু টাটকা হাওয়ার গন্ধ। 

আধশোয়া হয়ে রোদে বসেছিলেন। সকালের রোদটা ভালো লাগে। উত্তমের প্রশ্নে ফিরে তাকালেন।

“হঠাৎ একেবারে রাশিয়া?”

“হঠাতের কী আছে? আমার কাল রাতে মনে হল ১৯১৭ তে রাশিয়ার রেভলিউশনটা ভাল করে পড়তে হবে। কত করে তোমায় তখন বললাম, ইতিহাস নিয়ে পড়ি। তুমি কমার্সে ভর্তি করে দিলে। কী লাভ হচ্ছে আমার কমার্স পড়ে?”

“ইতিহাস পড়েই বা কী লাভ হত শুনি? ইস্কুল মাস্টারি জোটানোর মতো নম্বর বা যোগ্যতা কোনওটাই তোমার নেই। কমার্স পড়ে তবু দু’চারটে রাস্তা খোলা থাকে। কলেজে তো নামেমাত্র যাও। কি ক্লাস করো, সে আমার জানা আছে।”    

“ব্যস। অমনি তুমি শুরু করে দিলে তো? আরে জিগ্যেস করছি … আমার কমিনটার্ন নিয়ে একটু ডিটেলে জানা দরকার। তোমার তো বইপত্র ছিল কিছু। সেগুলো কোথায়? বেচে দিয়েছ?”

শিবপদ চক্রবর্তী, সরকারি বাসের শ্রমিক সংগঠনের রাজ্য স্তরের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, মনেই করতে পারেন না তার ইতিহাস বইগুলো ঠিক কোথায় রাখা আছে। এক ঝলক ভাবতে ইচ্ছে করে একটা জামগাছ। ঝাঁকড়া গাছটার পাশে বসে জানলা দিয়ে তার দিকে চেয়ে থাকে এক শ্যামলা বরণ কিশোর। অসিতস্যার ক্লাসে পড়াচ্ছেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দুটো মূল ধারা। জাতীয় বিপ্লববাদী আন্দোলন। অসহযোগ সত্যাগ্রহ আন্দোলন। আরেকটা পথ গড়ে উঠছে একটু একটু করে। সেটা কমিউনিস্ট আন্দোলন।  

গ্র্যাজুয়েশনের পরীক্ষা আর দেওয়া হল না। কিন্তু বইগুলো ছিল। অসিতস্যার কিনে দিয়েছিলেন দুটো বই। পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কিছু নিজে কিনেছিলেন পরে। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথে ইতিহাসের কোনও বই দেখলেই হাতে তুলে নিয়ে গোগ্রাসে গিলে নিতেন শিবপদ। যতটা নিয়ে নেওয়া যায় মগজে, মনে।

“তুমি মা’কে জিগ্যেস করো, তোমার মা জানবে পুরনো বইপত্র কোথায় আছে। যা রেখেছে ও’ই রেখেছে। উই-টুই ধরে কী আর কত অবশিষ্ট আছে সে জানে। তবে রাশিয়া ইত্যাদি এত কিছু আমার কাছে নেই। ওটা তুমি বাড়িতে পাবে না।”

উত্তম বিরক্ত হয়ে ওঠে। কাজের জিনিস একটা কিছু যদি বাড়িতে পাওয়া যায়।

বলতে বলতেই বাইরে থেকে হাঁক পাড়ে বিল্টু, “খোকন, কাগজটা…”

উত্তম মুখ বাড়ায়, “এই নিয়ে যা বিল্টুদা”।

দৈনিক কাগজটি উত্তমের কাছে আধঘন্টার জন্য দিয়ে যায় কাগজওলা বিল্টু। পাড়ায় কাগজ বিলি করা শেষ হলে উত্তমের কাছ থেকে এই কাগজটি ফেরত নিয়ে সে চল যাবে বাড়ির পথে। বাড়ির রাস্তায় এক রিটায়ার্ড ভদ্রলোকের বাড়িতে এটি নামিয়ে দেয় সে। ভাঁজ খোলা কাগজে আর নতুনের টাটকা আমেজ থাকে না। তাতে সে মানুষটির কিছু অসুবিধে নেই। বিল্টুরও কৈফিয়তের দায় নেই। একটি কাগজ দু’বার হাতবদল হয়। উত্তমের কাছে মাঝেমধ্যে বিড়িসিগারেটের খুচরো পয়সা নিয়ে বিল্টুও সন্তুষ্ট।  

বিল্টুর গলা পেয়ে শিবপদ জিগ্যেস করেন, “বিল্টু, সব ঠিকঠাক?”

“হ্যাঁ কাকা।”

“পড়ালেখা হচ্ছে তো?”

“হ্যাঁ কাকা।”  

“কিছু লাগলে বলিস।”

“বলব কাকা।”

“সরকারি চাকরির ফর্ম ফীল আপ করলি?”

বিল্টু প্যাডেলে চাপ দিয়ে বলে, “ক্লার্কশিপও জুটবে না কাকা। অঙ্কে গোল্লা পাব। বড্ড কঠিন।”

বিল্টুর সাইকেলের চাকা ঘুরে যায়। শিবপদ সেদিকে তাকিয়ে বলেন, “খোকন তুই লিখেপড়ে একটা ভালো চাকরি জোগাড় করলে শান্তি পেতাম রে।”  

উত্তম দেখে সকাল আটটা কুড়ির রোদ্দুর বাবার কাঁচাপাকা দাড়ির পাশ দিয়ে সিধে গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে দালানের কোনায়। কেরোসিনের স্টোভে ভাত ফুটছে বগবগ করে। কেরোসিনের গন্ধওলা ভাত ঠাকমা একেবারে খেতে চায় না। গুনগুন করে কাঁদে। মায়ের মনখারাপ হয়।

কয়লার উনুনের ধোঁয়াতে আজকাল আশেপাশের বাড়ির প্রতিবেশিরা আপত্তি করছে।

উত্তম চোখ সরিয়ে নেয়।

নিজের পায়ে দাঁড়ানো যাকে বলে, এখনও তার রাস্তায় ঢুকতে পারেনি সে। শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে।   

        

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত