Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,শুভ্রর

শারদ সংখ্যা গল্প: দ্বন্দ্ব । সালমা বাণী

Reading Time: 7 minutes

ছেলের মৃতদেহ মর্গে রেখে ঘরে ফিরে এলে নূপুর সরকার। মর্গ থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে গাড়ি চালাচ্ছিল তার ছোট ভাই প্রশান্ত সরকার এবং গাড়িতে ছিল ভাইয়ের দুই মেয়ে পূরবী ও পদ্মিনী। পুরো সময়টা নূপুর সরকার চোখদুটো বুজে বসে ছিল গভীর ভাবনায় ডুবে। তবে তার কপালে গভীর কয়েকটা ভাজ ছিল স্পষ্ট! আজ ভোরে রোড একসিডেন্টে মারা গেল তার একমাত্র সন্তান শুভ্র রহমান। ছেলের মৃত্যু সংবাদে একজন মায়ের যেমন দশা হয় তেমনই হয়েছে নূপুর সরকারের ক্ষেত্রেও । বিলাপ, আর্তকান্না, মাটিতে লুটিয়ে জ্ঞান হারানো, অভুক্ত – অনাহার, শোক কাতরতায় বাকহীনতাসব কিছুই তাকে গ্রাস করেছে। মৃত ছেলের নীরব নিথর মুখখানি এক পলকের জন্যও দেখতে দেয়নি হাসপাতাল ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ নূপুর সরকারকে। কারণ দূর্ঘনায় মৃত ছেলের মুখখানি এমনই ক্ষতবিক্ষত তছনছ করেছে কর্তৃপক্ষ তাকে সে মুখ না দেখার জন্য অনুরোধ ও উপদেশ দিয়েছে। নানাভাবে তাকে বোঝানো হয়েছে কেন সে ছেলের এই চূর্ণবিচূর্ণ থ্যাতলানো মুখখানি দেখবে না। ছেলের সুন্দর সেই মুখখানি তার স্মৃতিতে থাকুক সেটাও বোঝানোর ভেতরে ছিল একটি অন্যতম যুক্তি। শেষ পর্যন্ত নূপুর সরকার মেনে নিয়েছে সেই যুক্তি।

চোখে পড়া মাত্র যে কারো দৃষ্টিতে মুগ্ধতা এনে দেয়ার মতো আকর্ষণ ছিল শ্যামলা রংয়ের শুভ্রর। ছয় ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা। মাথা ভর্তি ঘন কালো সিল্কের মতো ঝলমলে চুল ঘাড়ের গোড়ায় গড়িয়ে থাকে আর মুখ ভর্তি ফ্রেঞ্চ কাট তেমনই ঘন কালো দাঁড়ি মোচ। যেন চুল আর দাঁড়িমোচের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘন হয়েছে চোখের পাপড়িও। গভীর কালো চোখের চাহুনিতে সব সময়ই যেন উঁকি দিতো স্নিগ্ধ এক হাসি। সেই সাথে ছিল তার ধীরস্থির গম্ভীর ব্যক্তিত্ব। কখনোই কোন চঞ্চল, অস্থির, বিক্ষিপ্ত ভাব ছিল না তার আচরণে। নিকট ও দূরের আত্মীয়, পাড়া প্রতিবেশি, বন্ধুরা অথবা কাজের জায়গার কেউ শুভ্রকে কখনোই দেখেনি সামান্য রাগ করতে।তার গার্ল ফ্রেন্ড আলিশা যদি জিজ্ঞেস করতো আচ্ছা শুভ্র তোমার কখনো রাগ হয় না? অথবা ইচ্ছা হয় না রাগ দেখাতে? তখনও শুভ্র হেসে উত্তর দিতো সেটাতে আমার ক্ষতি ছাড়া কোন উপকার নেই, যা করলে আমার মেন্টাল হেলথ নষ্ট হবে সেটা আমি কেন করতে যাবো ইডিয়েটের মতো? তাছাড়া আমি এই রাগারাগি জিনিসটা আমার বাবা ও মায়ের ভেতরে এত দেখেছি যে আমার ওটাতে অনেক অভিজ্ঞতা আছে। বাবা মা দুজনেই ওটা এত বেশি প্রাকটিস করেছে যে ফুরিয়ে গেছে আমার কোটা। সে কারণে ওটা আমি এ্যভয়েড করি ভেরি কনসাসলি। স্বল্পভাষী শুভ্র যেটুকু কথাই বলতো সেটুকুই থাকতো গম্ভীর শান্ত মেজাজের। ঘরে বাইরে বন্ধুদের আড্ডা কোথাও শুভ্রকে কেউ কখনো দেখেনি বেহিসেবি কথা বলতে অথবা আনন্দ উল্লাসে বেপরোয়া মেতে উঠতে।

ঘরে ফিরে মেঝেয় লুটিয়ে কখনো আর্তনাদ করে, কখনো গুমরে গুমরে কাঁদে নূপুর সরকার, একান্নার বিরতি আছে, কিন্তু শেষ নেই। তার এই কান্নার সময় পাথর মূর্তির মতো স্তব্ধতা ও নীরবতা নিয়ে বসে থাকে নূপুর সরকারের ভাই ও তার দুই মেয়ে।তারাও কোন রকম প্রয়াস চালায় না নূপুর সরকারের কান্না থামানোর। দীর্ঘ সময় কান্নার পর কান্না বিগলিত দেহখানি তুলে যখন সে কার্পেটের ওপর সোজা হয়ে বসে তখন সময় এগিয়ে আসে তার সন্তানের শেষকৃত্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণের। নূপুর সরকার দুই চোখের অশ্রুতে ডুবেই দৃঢ় ভঙ্গিতে ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে বলে – শোন আমি আমার সন্তানকে আমার ধর্ম মতোই শেষকৃত্য করবো। আমি ওকে ক্রীমেট করবো।

সে তো না হয় তোমার সিদ্ধান্ত। কিন্তু শুভ্রর বাবা, তারও সিদ্ধান্ত থাকতে পারে? তুমি কী শুভ্রর বাবার সাথে কথা বলেছো?

না, আমি তাকে ফোন করিনি। আমি তাকে কোন কিছুই জানানোর প্রয়োজন বোধ করি না।

কোন কিছু আর শুভ্রর মৃত্যু দুটো কী এক রকম গুরুত্বের বিষয় হলো দিদি? সন্তানতো তোমাদের দুজনারই। দুজনেরই তো সমান অধিকার সন্তানের ওপর, নাকি?

আমি তোমার সাথে একমত না প্রশান্ত! শুভ্র আগে আমার সন্তান তারপর তার বাবার! গর্ভে ধারণ থেকে জন্মদান সবটুকু কষ্টযন্ত্রণার ভেতর দিয়ে আমি গেছি, শুভ্রর বাবা নয়! এটি মায়ের যন্ত্রণা, বাবাদের এই যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় না! নূপুর সরকার নিজেও জানে এটাই স্বাভাবিক মা হওয়ার প্রক্রিয়া। কিন্তু তারপরও সে আপোষহীন এই প্রক্রিয়ার সাথে। এছাড়াও ছেলেকে দীর্ঘ সময় সে-ই লালন পালন করছে একা! সে যা করেছে সেটা তার বাবা করেনি! ছেলের জন্য সেবিরত রেখেছে নিজেকে জীবনে দ্বিতীয় বিয়ের ভাবনা থেকে । যা তার সন্তান শুভ্রর বাবা করেনি। সে চলে গেছে নিজের জীবনের সুখ আনন্দ ও ভোগে। সুতরাং সন্তানের নিরব নিথর দেহের শেষকৃত্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার সিন্ধান্তই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত বলে সে বিশ্বাস করে পরিপূর্ণ দৃঢ়তার সাথে।

সুজন রহমানের সাথে প্রেম ভালবাসারসেই দিনগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নূপুরকে কখনো কোন দ্বিধাদ›েদ্বর ভেতর দিয়ে যেতে হয়নি। যে কোন সিদ্ধান্ত দ্রæত গ্রহণে পারদর্শী নূপুর। এবং তার এই যোগ্যতার কথা বন্ধু মহলে বেশ আলোচিত ও প্রসংশিত। এসবই তার প্রেমে পড়ার একেবারে প্রথম দিনগুলো থেকেই ঘটে আসছে। ইউনিভার্সিটির ক্লাশ ফ্রেন্ডদের সাথে মাঠে বসে আড্ডা দেয়ার সময় সে সবাইকে জানান দিয়ে প্রেম করলো সুজনের সাথে। সুজনকে ভালবাসবো, কাল সকালেই কথাটা সরাসরি জানিয়ে দেবো বলে সে দাপুটে পায়ে বিদায় নিলো বন্ধুদের আড্ডা থেকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়াকরে তৈরি হয়সুজনের সাথে দেখা করার জন্য। সুজনের হোষ্টেলের সামনেরদারোয়ানকে দিয়ে ডেকে নিয়ে আসে নীচে, তারপর সুজনের চোখে রেখে সরাসরি বলে – সুজন আমি তোমাকে ভালবাসি, আমার ধর্ম আমার জন্য কোন রকম বাঁধা না! তোমার ধর্ম তোমার কোন বাঁধা কি না জানতে চাই? সুজন অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, শুধু এই কথা জানার জন্য তুমি এই এত ভোরে হোষ্টেলে চলে এসেছো? হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই, এই সাত সকালে তোমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে তোমাকে নীচে ডেকে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হলো একটাই, তোমাকে সরাসরি আমার সিদ্ধান্তজানানো, আর তোমার সিদ্ধান্তটা আমার জেনে যাওয়া।

সেদিন সুজনেরওদারুন ভাল লেগেছিল বৈকী নূপুরের সেই সরাসারি কথা বলার সাহস ও ধরন এবং দ্রæত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা। নূপুরের চোখে চোখ রেখে সুজন বলেছিল চোখের ভাষা পড়ে নাও। দেখি সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার মতো এই ক্ষমতাটাও কতখানি! সেই শুরু! তারপরমগ্ন থেকেছে দুজন দুজনার প্রেমে। প্রেম গড়িয়ে বিয়ে।

বিয়ের সময় নূপুর আর সুজন দারুন এক আইডিয়া বের করেছিল। জন্মসূত্রে দুজনের জন্ম দুই ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী বাবামায়ের ঘরে। নূপুরের মাবাবা সনাতন হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী আর শুভর বাবামা রক্ষণশীল মুসলিম। কিন্তু জন্মসূত্রে পাওয়া ভিন্ন দুই ধর্ম বাঁধা সাধতে পারেনি তাদের মিলনে। প্রেমে তারা তখন এতটাই তন্ময়, এতটাই মগ্ন ধর্ম বিশ্বাসের ব্যাপারটা তখন কোন দেয়াল হয়ে তখন দাঁড়ায়নি। তারা দুজনে সিদ্ধান্তে এসেছিল কোন ধর্মকেই তারা প্রাধান্য দেবে না তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে। দুই ধর্মের মূলমন্ত্র আর গুরুত্বপূর্ণ আচার অনুষ্ঠানগুলো এক করে দারুন এক অনুষ্ঠান করবে, অভিভূত করে দেবে বন্ধুদের এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে আসা আমন্ত্রিত অতিথিদের। যেই কথা সেই কাজ! একই বিয়ের অনুষ্ঠানে কিছু ইসলাম কিছু হিন্দু ধর্মের মিশেল দিয়ে আর কিছু বাঙলার বিয়ের চিরায়ত প্রথা থেকে নিয়ে সে উৎসব ছিল মনে রাখার মতো। বন্ধুরা খেলেছে হোলি, নেচেছে কাওয়ালির সাথে, জলসা ছিল গজল, কীর্তন সব মিলিয়ে। আর বর বৌ তারা দুজন পড়েছে বিয়ের দোয়া কলেমা এবং মন্ত্র দুটোই। দোয়া আর মন্ত্র দুটোর জন্য এসেছে মৌলভি ও পুরোহিত। কোরআন ও গীতা দুটোকেই সামনে রেখেছে দুই ধর্মগ্রন্থের প্রতিই পরিপূর্ণ ভক্তি ও সন্মান প্রদর্শনের জন্য। বিলিয়েছে মিলাদের মিষ্টি আর পূঁজোর প্রসাদ দুটোই। কপালে সিদূর আর হাতে শাখা নিয়ে ভক্তি ভরে নূপুর মুখস্থ পড়েছে কলেমা। আর সুজন নূপুরের কপালে দিয়েছে সিদূরের চিহ্ন এঁকে, পরিয়ে দিয়েছে দুহাতে শাখা। বিয়ের উৎসবে আসা বন্ধুদের স্মৃতিতে এমন আয়োজন বিস্মৃত হবার নয়। একসাথে হলেই বন্ধুরা আজও স্মৃতিচারণ করে সেদিনের সেই উৎসব নিয়ে।

নূপুর আর সুজন দুজনেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে জীবনে সুখের অনেক উপাদানের মধ্যে বড় একটা উপাদানের নাম হলো আর্থিক স্বচ্ছলতা। এই সংজ্ঞায় বিশ্বাস করে জীবনকে স্বচ্ছল আর গতিময় করে তোলার জন্যদুজনে একসাথে সিদ্ধান্ত নেয় দেশান্তরি হবার। বন্ধুরা অনেকেই চলে গেছে এরই ভেতর ইউরোপ, আমেরিকা, ক্যানাডা। যেমন সিদ্ধান্ত তেমন চালানো হলো প্রয়াস। কিছুদিনের ভেতরেই নানা রকম চেষ্টা তদ্বির করে বাংলাদেশ থেকে সোজা ওরাদুজন চলেএলো ক্যানাডার টরন্টো। সে আসাতেও পোড়াতে হয়েছিল অনেক কাঠখড়। ধার দেনাও হয়েছিল দুজনার তবে দুজনের সিদ্ধান্ত এক হওয়াতে কঠিন হয়নি ধার দেনা পরিশোধ করে একসাথে দেখা স্বপ্নগুলোর বাস্তব রূপ দিতে। হয়েছে বাড়ী, গাড়ী, গুড সেভিংস।

এরই ভেতরেদুজনার কোল জুড়ে এলো ছেলে শুভ্র। শুভ্র কোন ধর্ম প্রাকটিস করবে? এমন প্রশ্ন সামনে আসতেইদুজনাএকই সুরে, এই দৃঢ়তায় বলতো সেটা হবে শুভ্রর সিদ্ধান্ত। শুভ্র বড় হয়ে যখন বুঝতে শিখবে তখন সে গ্রহণ করবে তার ধর্ম। চাইলে সে মায়ের ধর্মে বিশ্বাসী হবে, না হয় বাবার ধর্মে! যদি চায় সে হবে হয় বিলিভার, না হয় ননবিলিভার। আমাদের কোন সিদ্ধান্ত আমরা চাপিয়ে দেবো না ওর ওপর। তেমনই বড় হচ্ছিল শুভ্র। সে মায়ের সাথে মন্দিরে যায় পূঁজা দিতে, মসজিদে যায় জুম্মা অথবা ঈদের নামাজ পড়তে, বাড়িতে বন্ধুদের সাথে নিয়ে ক্রীশমাস ট্রি ডেকোরেট করে ক্রীশমাসের সময়।

এরই মাঝে শুভ্রর মা ও বাবার ভেতরে তৈরি হলো নানারকম দ্বন্দ, মতোভেদ, ব্যক্তিত্বের বিরোধ। ক্রমশ সেটা প্রবল হতে হতে তাদেরকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেল একেবারে সেপারেশন, সেপারেশন থেকে ডিভোর্সের সিদ্ধান্তে। বেশ অনেক বছর একা ছিল শুভ্রর বাবা। হয়ত হাপিয়ে উঠেছিল দীর্ঘ সময় সঙ্গীবিহীন জীবনের একাকীত্বে, নি:সঙ্গতায়! ফিরে গেল বাংলাদেশে এবং সেখানে ফিরে সে পুনরায় আবদ্ধ হলো বিয়ের বন্ধনে। যতদিন শুভ্র কিশোর ছিল ততদিন বাবা নিয়মিত ছিল শুভ্রকে এসে নিয়ে যাওয়া, কাছে রাখা, বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, শপিংয়ে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদিপ্যারিন্টিং কেয়ারে। প্যারেন্টিং কেয়ার ছাড়াও বাবার আদর সোহাগ প্রকাশের যতরকম অভিব্যাক্তি ও দায়িত্ব আছে সে সব পালনে কোন ত্রæটি বা কার্পণ্য রাখেনি সুজন রহমান। শুভ্র আঠারো বছর পার হবার পর হয়ত শুভ্রর বাবা ভেবেছিলো এখন তার নিয়মিত প্যারেন্টিং দায়িত্ব পালন না করলেও চলবে। এলো শিথিলতা দায়িত্ব পালনে। তারপর একসময় শুভ্রকে জানান দিয়ে ফিরে গেলো বাংলাদেশে। দূরত্বের কারণে হয়ত যোগাযোগ কিছুটা শিথিল হয়েছে, কিন্তু কখনোই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়নি।


আরো পড়ুন: তৃতীয় বর্ষপূর্তি সংখ্যা গল্প: আনলকড প্রোফাইল । ক্ষমা মাহমুদ


শুভ্র এখন ছাব্বিস বছরের স্বয়ং সম্পূর্ণযুবক। পড়ালেখার পাশাপাশি তার সময়গুলো দারুণ ব্যস্ত ফ্রেন্ডদের সাথে, নানা রকম সোস্যাল এ্যাক্টিভিটিজে। ব্যাচেলর শেষ করেই চাকরি করেছে নিয়মিত। তারপর শেষ করেছে এমবিএ। বাবার সাথে কথা হয় কদাচিৎ। সেও যদি বাবার দিক থেকে ফোন আসে।নয়ত ভুলে যায় বাবা নামের একজন মানুষের অস্তিত্ব তার জীবনে। নিজের কাজের সঞ্চিত অর্থে অথবা ক্রেডিটে গাড়ি কিনেছে। চাপা স্বভাবের শুভ্র শেয়ার করে না এসব বিষয় মায়ের সাথে। ঘরের ফেরার সময় বেঁধে দিতে হয় না সেও অনেক বছর। ঘরের বাইরে বের হওয়ারসময় মায়ের বিধি নিষেধ এখন শিথিল। কোনদিন হয়ত মাকে বলে যায় কখন ফিরবে, কোনদিন হয়ত সেটাও বলা হয় না। রাত বেশি হলে হয়ত মাকে জানিয়ে দেয় ছোট্ট একটা টেক্সট দিয়ে আজ ফিরবে না। সারা সপ্তাহ কাজের শেষে শনিবার অথবা রবিবার রাতে যায় বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে।

গতরাতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা শেষে বাড়ী ফেরার সময় মালবাহী লরির সাথে দূর্ঘটনা কেড়ে নিল শুভ্রর জীবন।তখন রাত ভোর হয়ে আসছে, এসময় নূপুর সরকারের দরজার বেল বাজে। দরজা খুলে দেখে কয়েকজন পুলিশ। তাকে অনুরোধ জানায় জরুরি ভাবে তাদের সাথে হাসপাতালে আসার।তাকে আরও বলে তোমার ক্লোজ ফ্যামিলি মেম্বার কে আছে যাকে তুমি অনুরোধ করতে পারো হাসপাতালে আসার জন্য। নূপুর সরকার তখন তার ভাই প্রশান্তর ফোন নম্বর দেয় পুলিশকে। হাসপাতালে পৌছালে নূপুর সরকার জানতে পারে তার সন্তানের মৃত্যুসংবাদ। তখন পৌছে গেছে তার ভাই প্রশান্ত, ভাইয়ের বৌ তুলি, তার দুই মেয়ে পূরবী ও পদ্মিনী। নূপুরের এই দু:সময়ে আরও ছুটে আসে তার কাছের বন্ধুরা। পাথরের মতো নির্বাক বিহŸল সন্তানহারা শোক কাতর নূপুর সরকার। দুটো দিন চলে যায় কোনও কথাই বলেনি। দুদিন পর নূপুর সরকার হয়ত বাধ্য হয় শোক সামলে কথা বলতে। সন্তানের শেষ কৃত্যের প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। এবার শক্ত ও দৃঢ় হয়ে বসে নূপুর সরকার। শুভ্রর মৃত্যু সংবাদ তার বাবার কাছে পৌছে দেয়ার তাগিদ বা প্রয়োজন বোধ করে না সে। কাছের বন্ধু ও স্বজনদের জানায় সে তার ছেলের মৃত দেহের সৎকার করবে তার ধর্মের অর্থাৎ হিন্দু ধর্মের অনুশাসনে।

নূপুর ও শুভ্রর বাবার দুজনেরই কমন বন্ধুদেও কয়েকজন সময় দিচ্ছে সার্বক্ষণিক ভাবে। তাদের সকলকেই নূপুর সরকার জানায়তার ছেলের ওপরতার অধিকার অনেক বেশি ছেলের বাবার থেকে। সুতরাং ছেলের শেষকৃত্যের সিন্ধান্ত হবে তার। তার বাবার নয়।

টেলিভিশন ও পত্রিকায় শুভ্রর দূর্ঘটনার সংবাদ প্রচার হয়েছে সেদিন রাতের খবর থেকে পরদিন পর্যন্ত! একমাত্র পুত্র শুভ্রের মৃত্যু সংবাদ তার বাবা সুজন রহমানকে সরাসরি নূপুর সরকার না জানালেও সে দ্রæত জেনে যায় তাদের কমন বন্ধু দেলওয়ারএবং ছোট বোন সুফিয়ার টেলিফোনে। সংবাদ পাওয়া মাত্র শোক সামলে শুভ্রর বাবা তৎক্ষণাত রওয়ানা হয় বাংলাদেশ থেকে। কোন এয়ারলাইনসের সার্ভিস সব থেকে ফাষ্টার, সার্চ করে সেটাতে টিকেট করে চব্বিশ ঘন্টার কম সময়ে এসে পৌছায়টরন্টো। টরন্টো এসেই তিনি ছুটে আসেন প্রাক্তন স্ত্রীর কাছে। কিন্তু নূপুর সরকার তার সাথে দেখা দেয় না। সে বাইরে আসে না নিজের বেড রুম ছেড়ে। দীর্ঘক্ষণ শুভ্রর বাবা সুজন রহমান বসে থাকে লিভিং রুমে।এসময় তাকে ঘিরে থাকে তারআপনজন ও ঘনিষ্ট বন্ধুরা। এবং শুভ্রর বাবার এই অপেক্ষার সময় মা নূপুর সরকার বেডরুম থেকে জানিয়ে দেন তিনি তার সন্তানের শেষকৃত্য করতে চান তার ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী। শুভ্রর মায়ের এই সিদ্ধান্ত শোনার পর সোফা ছেড়ে খাঁড়া হয়ে উঠে দাঁড়ায় সুজন রহমান। তিনি দৃঢ় ও কঠিন স্বরে বলেন, না ছেলে আমারও, আমি চাই আমার সন্তানের শেষকৃত্য হবে আমার ধর্মের অনুশাসনে। আমি কিছুতেই এটা হতে দেবো না।

এবার ঘর থেকে বের হয়ে আসে নূপুর সরকার। শুভ্রর বাবার মুখোমুখি দাঁড়ায় প্রতিদ্বন্দিতায় নামার ভঙ্গিতে। শুরু হয় দুজনের তর্কবিতর্ক, দ্ব›দ্ব,মতানৈক্য। প্রথমেই শুরু হয় কে কতটা বেশি দায়িত্ব পালন করেছে, কার অধিকার বেশি এই বিতর্ক দিয়ে। এরপর আসে দুজনার অধিকারের প্রশ্ন সেই সাথে ধর্মের সমাধান। নূপুর সরকার চায় তার সন্তানের মৃত দেহের শেষকৃত্য হউক হিন্দু ধর্ম মতে। আর সুজন রহমান চায় ইসলাম ধর্ম অনুসারে। দুজন তাদের সন্তানের শেষ কৃত্যের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনড়অটল। দুপক্ষেরই বন্ধুবান্ধব, আতœীয় স্বজন তাদের দুজনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে নানাভাবে, নানা ব্যাখ্যায়।একপক্ষকে ছাড় দেয়ার জন্য অনেক বোঝানো হয়েছে দুজনকে। কিন্তু কেউ তার ধর্মের সাথে আপোষ করতে রাজী নয়! সমাঝোতার আলোচনায় বসে উপরন্ত দুইজনের বাক্য বিনিময় এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে শেষ পর্যন্ত পুলিশের হস্তক্ষেপে সেটা সাময়িক ভাবে স্থগিত হয়।

কয়েকদিন ধরে শুভ্রর মা ও বাবা দুজনার বন্ধুবান্ধব ঘনিষ্টজনেরা পারিবারিক ভাবে মিটিংয়ের পর মিটিং, আলোচনার পর আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। দুজনার দৃঢ়তায় কোন সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না শুভ্রর মৃতদেহ সৎকারের। কোন পক্ষই আপোষ করতে রাজী নয়। শেষ পর্যন্ত তারা শরাণাপন্ন হয়েছে আদালতের। মামলা এখন আদালতে। শুভ্রর মৃতদেহ হীমশীতল কক্ষে অপেক্ষায় আছে তার শেষকৃত্যের !

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>