| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য প্রবন্ধ: অন্যরকম উদযাপন হতে পারে শিশু শিক্ষা

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

মুসলমান পরিবারে জন্ম বলেই বছরের দুটো ঈদ এর আনন্দ পারিবারিকভাবে উদযাপন করতে দেখেছি! এই উদযাপনের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে খাবার, পোশাক, আপ্যায়ন এবং বিশেষ করে আমাদের পরিবারে গান! আম্মাকে দেখেছি রাত জেগে রান্না করছেন। আব্বা সময় কাটাচ্ছেন নিজের মতো আর আমরা কাছাকাছি বয়সের দুই বোন নিজেদের সাথেই মিশে থেকেছি খেলায়। খেলার বয়সটাইতো শৈশবে! কিন্তু খেলবো কি?

খেলা নিয়ে ভাবনার একটা গদবাঁধা প্যাটার্ন আমি ঘরে ঘরে দেখতে পাই। যেমন যে কোন ছুটির দিনে শিশুদের নিয়ে বাইরে পার্কে যাওয়া বা বাড়িতে সীমিত খেলনা দিয়ে খেলা বা শিশু একাই নিজের মতো সময় কাটায় পুতুল নেড়েচেড়ে, বল ছুঁড়ে বা অন্য কোন চেনা পরিচিত খেলার মাধ্যমে। আর উদযাপনের সময়তো পারিবারিক কনসেপ্ট থাকলেও বড়দের দল এবং ছোটদের দল হয়ে যায় আলাদা। পরিকল্পিতভাবে সকলের জন্য, সকলকে নিয়ে প্ল্যানিং এর সংস্কৃতির চর্চা দেখা যায় না। অথচ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের কথা আলাদা করে চিন্তা করেই ছুটির দিনগুলোতে সময় কাটানোর পরিকল্পনা করা উচিৎ। আমরা যখন আউটডোরে ঘুরতে যাবার প্ল্যান করি বা বাইরে কোথাও খেতে যাবার কথা ভাবি তখন শিশুদের সাথে নিয়ে পরিকল্পনা কি করা হয়? চলমান ঋতুর কথা ভেবে পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতা কি তাকে দেয়া হয়? আমরা সব সময় বলে দেই বাড়ির ছোট মানুষগুলো কি পড়বে, কি খাবে, কোথায় যাবে। এর মধ্যে আমি অবচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার মানুষিকতা দেখতে পাই। আমি দেখতে পাই ওদের ভাবতে সুযোগ দেয়া মানে সময় নষ্ট করে কি লাভ বা ওঁরা কি বোঝে; এমন মানষিকতা।

একটা মানুষকে সুন্দরভাবে বড় করে তুলতে গেলে তাকে সবার আগে মানুষের মর্যাদা দিতে হয়। সে মানুষ ছোট হোক বা বয়সে বড়! এমন ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে যে, শিশুরা বোঝে না, ভাবতে পারে না! অনেক সময় ভাষাগত দক্ষতার অভাবে ওরা বুঝিয়ে বলতে পারে না। আবার জটিল ডিসিশনের সিমিউলেশন ব্রেইনে করাটাও ওদের বয়স অনুযায়ী সম্ভব হয় না। তবু কথা বলতে হয়। আলোচনার প্রয়োজন আছে। কথার মধ্য দিয়েই জগতের নানা পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা শিশুরা পায়। পরিস্থিতি সামাল দেবার বিষয়গুলোও জানতে পারে। একই সাথে মানুষ, মানুষের চিন্তার প্যাটার্ন, সমস্যার ধরণ, ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্ব, রিএক্ট করার পদ্ধতি; এসব সম্পর্কেও ধারণা তৈরি হবার সুযোগ থাকে। আর প্রধানত ভাষাগত দক্ষতার উপরে একটা ভালো কাজ হয়। কাজেই যে কোন বিষয়ের প্ল্যানিং-এ পরিবারের সকলের অংশগ্রহণ সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে ডাইভারসিটি তৈরি করে।

আমরা যখন কোন উৎসব উদযাপনের কথা ভাবি তখন আমাদের তালিকায় কিন্তু বৈচিত্র্য আনতে পারি। খাবারের ক্ষেত্রে বৈচিত্র আসতে পারে। দেশীয় খাবারের পাশাপাশি অন্য দেশের বিশেষ একটা নতুন কিছু ম্যেনুতে যুক্ত হতে পারে। এ বিষয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে একজিকিউশনের কাজটা একটা চমৎকার পারিবারিক এক্টিভিটি হবে। নতুনত্ব আসতে পারে আউটডোর ভ্রমণের ক্ষেত্রে। এখন অনেকেই নানা ছুটি বা ফেস্টিভ্যালে নিজ নিজ বাসস্থান এর পরিচিত জায়গা ছেড়ে ভ্রমণে যায়। ভ্রমনের মাধ্যমেই উদযাপন করতে চায় ঈদ, পূজো, ক্রিসমাস সহ নানা উৎসবের আনন্দ! এ ক্ষেত্রে স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে নতুন কিছু যুক্ত করা যায়। যেমন সমুদ্রের পাশাপাশি পাহাড় দেখা। হতে পারে মিউজিয়ামে ঘোরা। হতেই পারে রেসোর্টের পাশাপাশি গ্রাম্য পরিবেশে ভ্রমণের পরিকল্পনা। মূল বিষয়টি হচ্ছে পরিকল্পনার সময় হওয়া পারিবারিক ব্রেইন স্টর্মিং এর সুযোগ! ভালো ব্রেইন স্ট্রর্মিং মানে সমাধানের নানা দিকের উন্মোচন। আর এর মধ্য দিয়েই পাওয়া যায় পরিকল্পনার একটা চমৎকার ডিজাইন বা নকশা।

শিশুদের সুন্দরভাবে বেড়ে তোলার ক্ষেত্রে খেলার নানা পরিকল্পনা, ডিজাইন, সামগ্রী, টেকনিক এবং বাবা-মা ও পরিবারের ইনভল্ভমেন্ট চাই। শৈশব মানে কেবল লার্নিং নয় বরং প্লেফুল পরিবেশে লার্নিং! এমন একটা পরিবেশ সেখানে শিশুকে ধরে সামনে বসিয়ে বলা হয়না যে; বস, এখন তুমি শিখবে! আনুষ্ঠানিক ঘোষণা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এবং শেখার ক্ষেত্রে প্রথমেই একটা অপ্রয়োজনীয় রিজিড ভাব তৈরি করে। শিশুদের শেখার আগেই প্রয়োজন একটা চমৎকার ওয়ার্মআপ। ছোট ছোট প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে ওদের আইডিয়া জেনারেট করার জন্য প্রস্তুত করতে হয়। এরপর আলোচনার মাধ্যমে, বইয়ের সাজেশন দিয়ে, ইন্টারনেটে ব্রাউজিং করে, প্রয়োজনে আউটডোরে দেখে; নানাভাবে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হয়, গভীরে যেতে হয়। এভাবেই শিশুকাল থেকে শুরু হয় গবেষণা করার প্রবণতা। একটা বিষয় নিয়ে নানাভাবে চিন্তা করা, সে সম্পর্কে জানা, বই পাঠ, সাইট সিয়িং এ সব কিছুই একটা শিশুর লার্নিংকে এনহান্স করে। শেখার ক্ষেত্রে এর চাইতে ভালো পদ্ধতি আর কি হতে পারে?

মূল বিষয়টি হলো শিশুদের মানুষ হিসেবে দেখা। কলেজে পড়েছিলাম, “size doesn’t matter chopping wood”। কাজেই উচ্চতা না দেখে তার মানবীয় গুণাবলীকেই প্রাধান্য দিতে হবে। একটা শিশু মানব সন্তান হিসেবে কিভাবে ভাবে, কোন কোন ক্ষেত্রে তার কৌতূহল আছে, সে কি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে; এগুলোর প্রতি নজর দিতে হয়। আর পারিবারিকভাবে যে কোন পাল পার্বন, উৎসবে শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হয়। হ্যাঁ ওদের অংশগ্রহণে আলোচনা কিছুটা ধীরে আগায় বটে কিন্তু এটা ভবিষ্যতের একজন চিন্তাশীল মানুষ তৈরিতে টনিক হিসেবে কাজ করে! আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশুদের বড় হতে সাহায্যের প্রয়োজন। একা একা উচ্চতায় বাড়বে বটে কিন্তু চিন্তার জায়গাটা থেকে যাবে সংকীর্ণ! ভবিষ্যৎ এর এই মানুষগুলো শুধু বাবা-মা, পরিবার ভোগ করে না। এই মানুষগুলোর অবদান থাকে একটা সুন্দর পরিচ্ছন্ন পৃথিবী গঠনে! একটা শিশুকে তাই বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে সাহায্য করতে হয়, সৃজনশীল পরিবেশ দিতে হয়, আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হয়, প্ল্যানিং এ রাখতে হয়, উৎসবের আয়োজনে দায়িত্ব দিতে হয়! এই একটা ছোট্ট পদক্ষেপের ভাবনাই একটা মানব শিশুর মধ্যে চিন্তার ম্যাচিউরিটি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে বিস্ময়করভাবে! চলুন শিশুদের বড় করি, হতে দেই এবং নানা বিস্ময়ের আনন্দে ভরিয়ে দেই তাঁদের চমৎকার শৈশব আর নিশ্চিত করি সু-শিক্ষা।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত