| 12 জুলাই 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: শোধ । গাজী তানজিয়া

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

 

আজ সবাই চোখে এক অদ্ভুত জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকাচ্ছে তার দিকে। এতোদিন, এতোটা বছর হয়ে গেল এ বাড়িতে অথচ এই ঘরটাকে এতোটা বদ্ধ এতোটা আলোহীন মনে হয়নি কখনো। পাঁচ বছর ধরে এ বাড়ির প্রতিটা মানুষ, ইট—কাঠ—আসবাবপত্রের সাথে প্রতিনিয়ত মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে অনুতমা। সেই যেদিন বধূবেশে প্রথম পা রেখেছিল এ বাড়িতে সেদিন থেকে গতমাস পর্যন্ত, সে এই বাড়ির প্রতিটি মানুষকে আপন করে নিয়েছিল। বাড়ির লোকেরাও তাকে কম ভালোবাসেনি। এ কথাটা সে অস্বীকার করতে পারবে না। করতে চায়ও না। তবে যে ভালোবাসা যার ভালোবাসা তাকে পূর্ণ করতে পারত, সেটাই যে নেই!
শ্বশুর, শাশুড়ি এবং দাদী শাশুড়ি সহ এই বিশাল বাড়িটাতে ছিল শুধুমাত্র সে আর তার স্বামী আশিক। তবে উৎসব পার্বণে বাড়িটা আত্মীয় স্বজনে ভরে ওঠে। দেশে ও দেশের বাইরের কর্মস্থল থেকে এসে জড়ো হয় সবাই। অনুতমার চাচা শ্বশুর, চাচী শাশুড়ি, ফুপু শাশুড়ি তার নিজের দেবর—ননদ সবাই। তখন বাড়িটা গমগম করে। গল্প, আড্ডা, হৈচৈ, তর্ক— সব মিলিয়ে বাড়িটা এতোটা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, মাঝে মাঝে অনুতমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়— এমন বাড়িও হয়! যেখানে কারো কোনো কষ্ট নেই, বেদনা নেই, চারিদিকে প্রাণের ছড়াছড়ি। তাহলে কষ্টটা কি শুধু তার! সে—ই কি এদের মধ্যে বেমানান? না—কি তার মতো কষ্ট অন্য কারও আছে, তারাও তার মতো বেমালুম চেপে যাচ্ছে। কিন্তু তার কষ্টটা কি সে চেপে রাখতে পারছে? এই তো সেদিন ছোট ফুপু রান্না ঘরে সব্জি কাটতে কাটতে বলল, কি তমা, মন খারাপ?
চমকে ওঠে অনুতমা, তাহলে কী তার মন খারাপ ব্যাপারটা এখন মুখেও ফুটে উঠছে? অনুতমা এড়িয়ে যেতে চাইল বলল, না সেরকম কিছু না ফুপু।
— তাহলে তোমার মুখটা এখন বিবর্ণ দেখাচ্ছে কেন? আমরা একটা হাসির গল্প করছি আর তুমি কোনো রিঅ্যাক্ট করছ না যে!
হ্যাঁ, তারা একটা হাসির কথাই বলছিল বটে। তাদের কাছে বিষয়টা রসাত্মক হলেও নিষ্ঠুর পরিহাসের মত লাগছিল। ওর শশুর বাড়ির দীর্ঘদিনের কাজের মহিলা পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়সে ছেলে—মেয়ে—নাতি—নাতনী ফেলে প্রেম করে আর একটা বিয়ে করে ফেলেছে। এটা তাদের কাছে হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছে। অথচ বিধবা মহিলা দিনের পর দিন যে ছেলে—মেয়ে—ছেলের বৌদের উপেক্ষা অবহেলায় দিন কাটিয়েছে, না খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে, বছরের পর বছর অন্যের বাড়িতে ঝি—গিরি করে কাটাতে হয়েছে; সেই সময়ে কেউ একজন যদি ভালোবেসে তার হাত বাড়িয়ে দেয়, সেটাকে এভাবে বাঁকা চোখে দেখার কী আছে! তাছাড়া সে আর এখন এ বাড়ির কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। সে আদৌ নিশ্চিত নয় যে তারা কেউ তার কথা বুঝবে বা তার সুরাহা করতে পারবে। আর অনুতমার মন খারাপের ব্যাপারটা যদি ধরা হয়, এটা তো দু’এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। এর সূত্রপাত সেই তার বিয়ের পর থেকেই। ওর বিয়েটা হয়েছিল বেশ ধুম—ধাম করেই। তার স্বামী আশিক দেখতে ফিল্মের হিরোদের মতো। কথা বলে সুন্দর, এটিকেট ম্যানার সব জানে। শিক্ষিত সংস্কৃতিবোধসম্পন্ন পরিবারের ছেলে। কিন্তু অনুতমার ধাক্কাটা লাগল বিয়ের পরেই। আশিকদের পরিবারের সবাই বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে এলেও আশিক তা নয়। তার ভেতরে কিছু গোলমাল আছে যা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। আশিক ব্যবসায়ী। রাত—দিন সে ব্যবসার চিন্তায় বিভোর থাকে। বিয়ের পর বছরখানিক সে স্ত্রীর প্রতি বেশ কেয়ারিং ছিল। তারপরই কী যে হলো! আশিক সময় মতো বাড়ি আসে না। দুপুরের খাবার সে তার শো—রুমেই খেয়ে নেয়। তারপর বাড়ি ফিরতে মাঝরাত। এরই মধ্যে অনুতমা মা হলো। পাপুন এলো তার কোল জুড়ে। স্বামীর উদাসীনতা তখন সে গায়েই মাখেনি। সন্তান লালন—পালনে শাশুড়িমা তার সর্বক্ষণের সঙ্গি। অনুতমা এ বাড়ির নতুন বৌ। নতুন শহরে বাইরের জগতের সাথে তখনো তার কোনো যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি। ঘরে সার্বক্ষণিক শাশুড়ির সঙ্গ। বাইরে কোথাও যেতে হলে শাশুড়ি বা স্বামী যায় তার সাথে। বাড়িতে মেহমান বা বাইরের লোক কেউ এলে বসবার ঘরে তারাই আথিথেয়তা করে। সেখানে অনুতমার সাময়িক উপস্থিতির বাইরে কোনো কাজ নেই।
কিন্তু একদিন বিকেলে ঘটল এর ব্যতিক্রম। বাড়ির সবাই দলবেঁধে কোথাও গেছে। দাদী শাশুড়ি দোতলায় তার ঘরে শুয়ে আছেন। অনুতমা করিডোর পেরিয়ে ডাইনিং রুমে যাওয়ার পথে ড্রইংরুমে দেখল একজন ভদ্রলোক বসে আছেন। কাজের ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলে বলল, চাচাজানের সাথে দেখা করার জন্য বইস্যা আছে।
সে খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি বল নাই যে বাবার বাড়িতে ফিরতে রাত হবে?
হ কইছিলাম, কিন্তু ওই লোক এই বাড়ির কারো একজনের সাথে দেখা না কইর‌্যা যাবে না। তয় আমি ভাবলাম দাদীসাব উঠলে তার লগে কথা কইতে কমু! ভাবীসাব আপনিওতো কথা কইতে পারেন!
— ঠিক আছে তুমি যাও আমি দেখছি। অনুতমার মনে দ্বিধা, সে এতোদিন বাইরের কারো সাথে কথা বলে নাই, সেভাবে তাকে বলতে দেয়া হয় নাই— ব্যাপারটা প্রচ্ছন্ন। তারপরও সে বসবার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
অনুতমা ঘরে ঢুকতেই লোকটা উঠে দাঁড়াল।
অনুতমা তার নিজের পরিচয় দিলে লোকটা যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। বলল, বাড়িতে আর কেউ নাই?
— না, আপনি আমাকে বলতে পারেন। কোনো মেসেজ থাকলে আমি দিয়ে দেব।
লোকটা এবার সরাসরি অনুতমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কথাগুলো আপনাকে বলা ঠিক হবে কি না। আমি চেয়েছিলাম আশিক সাহেবের বাবাকে বলতে। আবার এখন মনে হচ্ছে এ কথা জানার অধিকার আপনারই সবচাইতে বেশি।
— আপনি বলতে পারেন, তেমন কোনো কথা হলে আমার শুনতে অসুবিধা নেই।
— আপনি তো শুনতে চান, কিন্তু কীভাবে যে বলি কথাটা! এমন কিছুক্ষণ দেনামনা করার পর লোকটা যে কথা বলতে শুরু করল— তা শোনার জন্য অনুতমা মোটেই প্রস্তুত ছিল না। তার পায়ের নিচের মাটি সরে যেতে লাগল। যেন সে একটা চোরাবালির ভেতরে ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
লোকটা বলল, আমি আসলে ভীষণ দুঃখিত, কথ্টা আপনাকে এভাবে জানানোর কোনো ইচ্ছা ছিল না। ভেবেছিলাম আপনার শশুর সাহেবকেই বলব। কিন্তু তিনি বাসায় নেই। এদিকে আমিও নিরুপায়। বুঝতেই পারছেন, দিনের পর দিন আত্মীয়—পরিজন, স্ত্রী—সংসার ছেড়ে একটু সুখ স্¦াচ্ছন্দের আশায় বিদেশে পড়ে থাকি। আর ফিরে এসে যখন দেখি সেই লালিত স্বপ্ন, কষ্টার্জিত টাকা সব ধুলোয় মিশে যেতে বসেছে তখন কী আর মাথা ঠিক থাকে— বলেন! আমি ওদেশে থাকতেই খবরটা পেয়েছিলাম যে আমার অনুপস্থিতিতে আশিক সাহেব প্রতিদিন আমার বাড়িতে আসা যাওয়া করে। আমার স্ত্রীর সাথে সে একটা সম্পর্ক করে ফেলেছে। সম্পর্কটা এমন পর্যায়ে গড়িয়েছে যে ব্যাংকে রাখা আমার টাকা—পয়সা প্রায় সব আশিক সাহেবকে দিয়েছে ব্যবসায় ইনভেস্ট করতে।
— কিন্তু আশিক ওনার কাছ থেকে টাকা নেবে কেন? ওর ব্যবসার টাকা তো সব আমার শশুর সাহেব দিয়েছেন। আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।
— আমার কোথাও ভুল হয় নাই ম্যাডাম। হ্যাঁ,আপনার শ্বশুর সাহেব তাকে টাকা দিতে পারেন। কিন্তু আপনি নিশ্চই এটা জানেন যে ব্যবসায় যত ইনভেস্ট তত লাভ! আশিক সাহেবের এই লগ্নির ব্যবসা যে শুধু আমার স্ত্রীর সঙ্গে তা না, এই শহরে যত প্রবাসী লোকের ইয়াং স্ত্রী আছেন তাদের সবার সাথে অলিখিত প্রেমের এক সম্পর্ক আছে তার সাথে। তারা সবাই তার অদৃশ্য ব্যবসার পার্টনার। একথা এই শহরের সবাই জানে। আর আপনি তার স্ত্রী হয়ে একথা জানেন না! আপনি যে একজন প্লেবয় নিয়ে ঘর করতেছেন একথা তো আপনার না জানার কথা না। নাকি টাকার মোহ মানুষকে জগৎ ভুলিয়ে দেয়!
প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতটা অনুতমার প্রতি। কিন্তু এই অপমান কেন সে সইবে? সে কখনো টাকার মোহে বিভোর নয়। বরং এ বাড়ির লোকেরা তার কাছে লুকিয়েছে অনেক কিছু। আর সেই লুকোনোকে হালাল করতে তাকে ভরিয়ে দিয়েছে বৈভবে। তার বাপের বাড়িতে উপঢৌকনের পর উপঢৌকন পাঠিয়েছে প্রতিনিয়ত। সবাই এখন ওদের কথাই শোনে। অনুতমার কথার যেন কোনো দামই নেই কারো কাছে। কিন্তু এই বাইরের লোকটা এসে তাকে অপমান করে যায় কোন সাহসে! মুহূর্তে সে উঠে দাঁড়ায়। এবং কঠিন স্বরে বলে, আপনি এখন আসুন। কাল এসে আমার শ্বশুর সাহেবের সাথে কথা বলে যাবেন।
রাগে অপমানে অনুতমার সমস্ত শরীর রি—রি করতে লাগল। সঙ্গে কতগুলো জিজ্ঞাসা। এজন্যই কি আশিক রাত করে বাড়িতে ফেরে? মাঝে মাঝে রাতে বাড়িতেই আসে না। বিছানায় নিরুত্তাপ থাকে। সে ভাবে কাজের স্ট্রেস হয়ত। অথচ সব কিছুর পেছনে এই! আর তার শশুর বাড়ির লোকেরা ছেলের এসব কুকর্মের কথা জেনেও সব চেপে গেছে তার কাছে! গোটা পৃথিবীটাই কুয়াশাচ্ছন্ন লাগছে এখন তার। ছেলে পাপুনের আধো বোলে ডাকা, ওর আদর— দুষ্টুমি এসবও অনুতমাকে এখন আর আলোড়িত করতে পারছে না। কি করবে সে এখন! কাকে বলবে এসব কথা! দিশেহারা লাগে ভীষণ। যদি তার একজন বন্ধু থাকতো, যাকে খুলে বলতে পারত সব কিছু। এমন একজন মানুষ যে তাকে চেনে না কিন্তু তার দুঃখটা শুনবে শুধু।

এর বেশ কিছুদিন পর ঘটনাটা আচমকাই ঘটল। বা এমন প্রায়ই ঘটে যেগুলো আগে সে আমল দেয়নি। এরকম রং নাম্বারে টেলিফোন তো প্রায়ই আসে। সে রং—নাম্বার বলে কেটে দেয়। কিন্তু এই ফোনটা যে করেছে তার কথা বলার ভঙ্গি, গলার স্বর এমন যে তার ফোন রাখতে ইচ্ছে করল না। বা এমনও হতে পারে লোকটা তাকে ফোন রাখার সময়ই দিলো না।
সে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বলল, হ্যালো প্রিয়ঙ্কা? আমি কি প্রিয়ঙ্কার সাথে কথা বলছি?
এদিক থেকে অনুতমা বলল, না, আমি অনুতমা।
— সরি, কিছু মনে করবেন না। আমি বুঝতে পারছি এটা রং নাম্বার হয়েছে কিন্তু আপনার নামটা এতো সুন্দর আর কন্ঠটাও; আমার মনে হচ্ছে আপনি মানুষটাও অনেক সুন্দর।
ওপাশ থেকে ভেসে আসা কথাগুলো খুব সাধারণ মেয়ে পটানো টাইপ হলেও লোকটার বলার ভঙ্গিতে এমন একটা স্মার্টনেস আছে যে অনুতমা একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল। সে বলল, এই নাম আবার সুন্দর হলো কি করে? অনুতমা অর্থাৎ তমার মতো বাট নট তমা।
— কিন্তু আমার তো মনে হয় আপনি কারো পারফেক্ট প্রিয়তমা হতে পারেন।
— টেলিফোনে কারো সম্পর্কে এতোটা নিশ্চিত আপনি কি করে হতে পারেন?
— কেন, হওয়া যায় না?
— যদি বলি— না।
— ভাবব ভুল বলা হয়েছে।
— ভুল না, ঠিক, কিন্তু সেটা নিয়ে আমি অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলতে চাই না। অনেক সময় কিছু কথা কিন্তু স¤পূর্ণ অপরচিত কাউকে বলতেই মানুষ বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। যেমন সাইকিয়াট্রিস্টকে বলে। কেউ কেউ চার্চে কনফেস করে হালকা হয়। সবটাই কিন্তু এমন কাউকে বলা যে তার অপরিচিত।
— কিন্তু তারা বিশ্বস্ত।
— আমি অবিশ্বস্ত হবো না। ইনফ্যাক্ট হওয়ার কোনো চান্স নেই।
— কিভাবে?
— আপনাকে তো আমি চিনি না।
— এমন তো হতে পারে, আপনি আমাকে চেনেন, কিন্তু আমি আপনাকে চিনি না।
— সে ক্ষেত্রে আর বলার কিছু থাকে না। এটুকু বিশ্বাস আপনাকে করতেই হবে। এ্যাটলিস্ট আপনার ভালোর জন্য।
— আমার ভালোর জন্য মানে? আপনি কি করে ঝুঝলেন যে আমি খারাপ আছি?
— সব কিছু কি দেখে বুঝতে হয় ম্যাম?
অন্য সময় হলে হয়ত অনুতমা এই ফোন কলটাকে পাত্তাই দিত না, কিন্তু আশিকের উপেক্ষা, আশিকের একাধিক নারীর প্রতি আশক্তি আমূল বদলে দিয়েছে তাকে। তার কাছে এখন সম্পর্কের বিশ্বস্ততার কোনো মানেই বহন করে না। সে দিনের পর দিন ফোনের ওপারের ওই মানুষটার সাথে কথা বলে যায়। সে তার মনের সব ক্ষোভ, ব্যথা, অবহেলার কথা অকপটে শেয়ার করে নিয়াজ নামের ওই তরুণের সাথে।
কিছুদিনের মধ্যেই নিয়াজকে তার খুব আপন আর নির্ভরযোগ্য মনে হয়। অনুতমা সিদ্ধন্ত নেয় সব কিছু ছেড়ে নিয়াজের সাথে সে চলে যাবে। কিন্তু পাপুন?
নিয়াজ বলল, পাপুনও যাবে তাদের সঙ্গে। সব সিদ্ধান্ত পাকা এখন শুধু যাওয়ার পালা।
কিন্তু কীভাবে যাবে অনুতমা! বাড়িতে সারাক্ষণ লোকজন। তার ননদ এসেছে দেশের বাইরে থেকে। আরো এসেছে চাচা শশুর, শাশুড়ি তাদের ছেলে—মেয়েরা। তার ওপরে তার তো একা একা বাইরে যাওয়া নিষেধ। তবে আশিক মাঝে মাঝেই রাতে বাড়ি ফেরে না এই যা। সে রকম কোনো এক রাতে বের হয়ে পড়তে হবে। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব! নিয়াজ থাকে অন্য একটা জেলায়। সেখান থেকে তো বেচারা রোজ রোজ তাকে বের করে নেয়ার জন্য আসতে পারে না!
কিন্তু অনুতমার সমস্যার কথা শুনে নিয়াজ সেই কাজটাই করল। সে প্রতি রাতেই একটা মাইক্রোবাস নিয়ে এসে দাঁড়ায় ওদের বাড়ির একটু অদূরে।
তবে এখানেও এক সমস্যা। আসতে যেতে পাড়ার অনেকেই প্রশ্ন করে এই গাড়ি কোথায় এসেছে, কোথায় যাবে? এমন রাতভর এখানে দাঁড়িয়ে থাকে কেন? চোর ডাকাত সন্দেহ করতেও ছাড়ে না কেউ কেউ। ড্রাইভার লোক বুঝে কোন একটা বাড়ি দেখিয়ে দেয়।
এভাবে একে একে তৃতীয় রাতে অনুতমা গিয়ে ওঠে গাড়িতে। গাড়ি সাঁ—সাঁ করে ছোটে, অনুতমা হুহু করে কেঁদে ওঠে পাপুনের জন্যে। ছেলেকে সে সঙ্গে আনতে পারেনি।
নিয়াজ তাকে সান্ত্বনা দেয়। “কেঁদো না অনুতমা, ও শিগগির তোমার কাছে আসবে; কোনো অইন ওকে আটকে রাখতে পারবে না।’’
কিন্তু কিভাবে! ওদেরকে তুমি চেন না নিয়াজ, ওরা কিছুতেই ওদের নাতিনকে হাতছাড়া করবে না। আমাকে তুমি ফিরিয়ে দাও পি¬জ; আমি পাপুনকে নিয়ে আবার আসব।
কিন্তু যার মা একবার বের হয়ে যায় তার কাছে আমরা আমাদের ছেলেকে দেব, কী করে ভাবলা অনুতমা?
চমকে ওঠে অনুতমা, কে, কে কথা বলে উঠল গাড়ির পেছন থেকে?
আমি অনুতমা, আমি আশিক। খুব তো আমাকে লোভী বলো, ল¤পট বলো, এখন এটা তুমি কী করলা বলো তো? এখন যখন তোমাকে নিয়ে যাব বাড়িতে তখন কী জবাব দিবা তুমি সবার কাছে?
নিমেষে নিয়াজের দিকে তাকায় অনুতমা।
নিয়াজ নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
— তাহলে এটা তোমার ট্রিক ছিল আশিক?
— আমি সারাদিন অন্যের স্ত্রীদের চরিয়ে খাই আর আমার স্ত্রী অন্য কারো হাত ধরে ভেগে যাবে তাই হয় বলো? তাই হতে দেয়া যায় কখনো? তুমি এতো বোকা অনুতমা? তোমার জন্য আমার ভীষণ দুঃখ হইতেছে।
— ইউ স্ক্রাউন্ডেল!
— শাট আপ! অনুতমার গালে জোরে একটা চড় বসায় আশিক।
ধ্বংসস্তুপের মতো বসে থাকে সে।

বাড়িতে ফিরিয়ে এনে উত্তর দিকের এই ঘরটার মধ্যে রাখা হয়েছে তাকে। ঘরটার জানালাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সবাই চিড়িয়াখানার যন্তুর মতো অনুতমাকে দেখে যাচ্ছে। কারো মুখে কোনো প্রশ্ন নেই, চোখে আছে ঘৃণা।
অনুতমা ভীষণভাবে চাচ্ছে কেউ তাকে একবার প্রশ্ন করুক। অন্তত একটা কথা জানতে চাক তার কাছে।
কিন্তু না, কেউ না, কেউ তাকে বলছে না কিছু।
এই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পাপুনকেও আসতে দেয়নি তার কাছে। কাজের বুয়া এসে খাবার দিয়ে গেছে ঘরে। অনুতমা মরিয়া হয়ে পাপুনকে দেখতে চাইছে। সে এক সময় চিৎকার করে ডাকল, পা্পুন, পাপুন বাবা!
বাইরে দরজার কাছে শাশুড়ি তাকে শুনিয়ে কাউকে বলল, ওই মায়ের কাছে পাপুন যাবে না। নষ্টা, কুলটা আবার ছেলের ওপর দরদ দেখো। কাল রাতে যখন পালায়ে গেছিল তখন ছেলে কোথায় ছিল? ওকে বলে দাও জামিলা, ও ছেলে পাবে না।
অনুতমা এবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। তাহলে পাপুনকে কে পাবে মা? আমি যদি নষ্টা কুলটা হই ওর বাবাও তো তাই। ও যদি ওর বাবার সাথে মিশে খারাপ না হয়ে যায়, তবে আমার সাথে থাকলে হবে কেন?
শাশুড়ি তার এই কথার কোনো জবাব না দিয়ে ওখান থেকে চলে গেলেন।
অনুতমা ছুটে বের হয়ে এলো, এসে একে একে সবাইকে প্রশ্ন করতে লাগল, বলেন আমার দোষটা কোথায়?
— ফালতু তর্ক করো না তমা! এখন তো তুমি এটা প্রমাণ করে দিলে যে চরিত্র হরণের সুযোগ পাওনি বলে তুমি চরিত্রবান ছিলে!
— না, প্রমাণ হয়নি। আমার চলে যাওয়ার জন্য কারো হাত ধরার প্রয়োজন ছিল না, ওটা আমি তোমাদের একটা সবক দেয়ার জন্য করেছিলাম। ওটা আমার কোনো দুর্বলতা ছিল না আশিক, ওটা ছিল শোধ। আমার প্রতি তোমার করা সব অন্যায়ের এক নির্মম প্রতিশোধ।
— তুমি কি শোধ নিবা সোনা, শোধ তো নিবো আমি! হো হো করে হেসে ওঠে আশিক!
অনুতমা দিশেহারার মতো এতোদিন ধরে তার প্রতি সব বঞ্চনার কথা, লাঞ্ছনার কথা, গ্লানির কথা বলে যায়। কিন্তু সেই কথাগুলো যেন কারো কানেই ঢুকছিল না। তারা সবাই তাকে নিয়ে এক যেন এক নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রে মেতেছে তখন। অনুতমাকে তারা মানসিতভাবে অসুস্থ প্রমাণ করতে চাইছে। একে অপরের সাথে পরামর্শ করছে, ঠিক কোন সাইক্রিয়াট্রিস্টের কাছে নিলে বিষয়টা পোক্ত করা যায়!

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত