| 21 মে 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গদ্য: কাজের ভাষা, মুখের ভাষা । স্বপ্নময় চক্রবর্তী

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

যিনি কাঠের কাজ করেন, উনি বললেন, “এই কাঠের জিনিসগুলোকে আলাদা করে পালিশ করাবেন কেন? দোকান থেকে গোপাল বার্নিশ কিনে লাগিয়ে দিন৷” কোনো রঙ-বার্নিশের দোকানে গোপাল বার্নিশ পেলাম না৷ ব্যাপারটা বোঝাতে চেষ্টা করলাম। একটু বলতেই দোকানদার গ্যাপেল বার্নিশের কৌটো দিয়ে দিল৷ গ্যাপেল একটা কোম্পানির নাম৷ এক শ্রমিকের মুখে এটা গোপাল৷ লোহার কাজে নাট-বোল্ট কে বলা হয় নাটুবুল্টু৷ আবার রিভেটকে রিপিট৷ নিশ্চয়ই আইটিআই ট্রেনিং প্রাপ্ত মিস্ত্রিরা বলেন না, যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত নন, কাজ শিখেছেন অন্য কোনো কাজ শেখা গুরুর কাছে, তাদের মুখের কথা এটা৷ ওয়েল্ডিংয়ে অক্সি-অ্যাসিটিলিন গ্যাস কে অফিস-অ্যাসিড গ্যাস বলতে শুনেছি৷ অ্যাসিটিলিনের চেয়ে অ্যাসিড অনেক বেশি পরিচিত৷ ভাষার ধর্মই এটা৷ অন্য ভাষাকে গ্রহণ করে নিজের মতো করে৷ তাই আর্মচেয়ার হয়ে যায় আরামচেয়ার৷ পর্তুগিজ শব্দ অ্যাসিনাস হয়ে যায় আনারস৷

শিল্পাঞ্চলে স্টিলের রোপগুলির নাম হয় রসা৷ রসি বা দড়ির সঙ্গে মিল আছে তাই৷ ফার্নেস হয় চুলা৷ হোল্ডিং ডাউন বোল্টকে বলতে শুনেছি ‘হরিনারান বল্টু’৷ ক্রসিং সুইচকে করসন সুজি৷ বয়লারের আগুনকে চাগিয়ে তোলার ইংরিজি নাম ফ্রিজিং৷ কিন্তু জনগণের মুখে ওটা কিচিং৷ এই শব্দ হয়তো বাংলা অভিধানে ঢুকবে না, কিন্তু কিছু বহুল প্রচারিত টেকনিকাল ইংরিজি শব্দর লোকজ রূপ, বা সাধারণ স্তরের শ্রমিকের মুখের কথার রূপ অভিধানে এসে গেছে যেমন বল্টু৷ যেমন ইস্‌কুরুপ৷ আসলে ওটা স্ক্রু৷ স্ক্রু ডাইভার হয়ে গেছে স্ক্রু ড্রাইভার৷ লোহার ছাঁটের নাম বাবরি৷ খনির সেফটি ল্যাম্প হয়েছে সেপটিপিন বাত্তি৷ এভাবেই শ্রমিকদের মধ্যে চলছে মেশিন ছুরি, ক্যাপ বাতি, তেল জট, ঠান্ডা গ্যাস, মোমছাল।

খনি অঞ্চলে বেআইনি কয়লা বের করার পর যখন মাটি বসে যায়, তখন বলে ভসকা নামা৷ শ্রমিকদের মধ্যেও নানা ভাগ উপভাগ আছে৷ কৃষি শ্রমিকদের মধ্যে যেমন বাগাল, হাফ বাগাল, মাহিন্দর, কোর্ফা ইত্যাদি আছে, শ্রমিকদের মধ্যেও বদলি খাস, হাফ খাস, এরকম সব আছে৷ কোনো লেখক যদি শ্রমিকদের মুখের এই শব্দসমষ্টি তাঁদের আখ্যানে ব্যবহার করেন, তার আবার ব্যাখ্যা দিতে হবে, কিংবা ফুটনোট ব্যবহার করতে হবে, সেটা কথাসাহিত্যের গতিকে ব্যহত ও আহত করে৷

একজন বাড়ি করছেন৷ জমিটা কেনা ছিল, পাঁচিল দেওয়াই ছিল৷ কয়েকজন এসে বলল, “বাড়ি করছেন ভালো কথা৷ রাবড়িটা কিন্তু আমরাই সাপ্লাই করব৷” উনি বলেছিলেন, “সেতো পরের কথা। গৃহপ্রবেশের সময় দেখা যাবে৷” তারপর এরকম সংলাপ৷

-গৃহপ্রবেশ? গৃহ না হলে গৃহপ্রবেশ কি করে হবে?
-কেন বাড়ি হবে তো৷
-নিশ্চই হবে৷ আমাদের রাবড়ি নিলে হবে৷
-কী বলছেন, বুঝতে পারছি না৷ আমার সুগার খুব৷ ফাস্টিং ওয়ান ফিফটি টু…৷
-রাবড়ি মানে ইট, বালি, সিমেন্ট, পাথর৷ জানেন না?
-সরি সরি, জানতাম না৷ কিন্তু কি করে আপনাদের থেকে নিই? আমার বন্ধুকে কথা দিয়েছি যে৷ ওর ছেলে সিমেন্টের ডিলার৷ কিছুটা কমেও পাবো৷
-কত স্কোয়ার ফিটের বাড়ি হবে?
-এই বারোশো মতন৷
-ঠিক আছে, আপনার পছন্দের লোকের কাছ থেকেই নিন, তবে আমাদের এক পেটি আর পাঁচ থাবড়া দিয়ে দেবেন৷

এবারে বলি, এসব সিন্ডিকেটের ভাষা৷ কিছুটা গুপ্ত৷ আসলে ভাষা মানেই ধ্বনির সংকেত৷ বিভিন্ন পেশাতেও এমন কিছু সংকেত আছে৷ রাবড়ি বলতে কি বোঝানো হচ্ছে আগেই বলেছি, এবার বলি পেটি মানে লক্ষ৷ থাবড়া মানে পাঁচ হাজার টাকা৷ থাবড়ার সংকেতটা অস্পষ্ট নয়৷ একটা হাতে পাঞ্জায় পাঁচটি আঙুল থাকে৷

ওই ভদ্রলেক একটু টেটিয়া ছিলেন৷ বলেছিলেন, “কিছুই দেবোনা৷” পুলিশের উপর মহলে চেনাজানা ছিল৷ জানিয়ে রেখে ছিলেন৷ ওরা কিন্তু বলে গিয়েছিল, “আপনার বাড়ি সিঙ্গাঙা হয়ে গেলে আমাদের দোষ নেই৷”

ঢালাইয়ের পর তলায় বাঁশ এবং কাঠের শুঁড়ির ঠেকনা দিয়ে রাখতে হয়৷ কেউ রাত্তিরে সেই ঠেকনাগুলো সরিয়ে দিয়েছিল৷ ফলে ছাদটা ঝুলে গিয়েছিল, যা দেখতে সিঙ্গাড়া আকৃতির। এই তোলা আদায় একটা পেশা৷ যা অবস্থা, ক্রমশ এটা একটা স্বীকৃত পেশার রূপই নিচ্ছে৷ এইসব সিন্ডিকেট সৈন্যদের নাম কন্ডাক্টর৷ মাথার নাম ড্রাইভার৷ খালাসি থেকে কন্ডাক্টর স্তরে পৌঁছতে হয়৷

টেলিভিশন সার্ফ করতে করতে (সার্ফের বাংলা কী হবে জানি না যে) জ্যোতিষ চ্যানেলে পৌঁছেছেন কখনো? ওখানে সবাই শাস্ত্রী কিংবা মহারাজ কিংবা বাবা৷ ওদের কথাবার্তার মধ্যে প্রায়ই শুনবেন ডিসটার্ব৷ মনে শনিটা ডিসটার্বে আছে, মঙ্গলটা ডিসটার্ব করছে৷ আরও কিছু কিছু কথা আছে, যা সাধারণ মানুষ বোঝেনা বলেই আরও রহস্যময়৷ যেমন ‘সাড়ে সাতি’৷ মাঙ্গলিক সাড়াসাড়ি৷ এছাড়াও কতগুলি কথা প্রায়ই বলেন—পজিটিভ এনার্জি, নেগেটিভ এনার্জি৷ কোনো পদার্থবিদ এর ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না যদিও৷

ডাক্তারদের কাছে গেলে কতগুলি শব্দ আমরা শুনে থাকি৷ যার মানে কিছুটা বুঝি, আবার বুঝিও না৷ আমরা যখন চিকিৎসকের কাছে যাই, আমাদের শারীরিক সমস্যার কথা বলি৷ কোমরের উপরের যত সমস্যা, নিজেদের মাতৃভাষায় বলি, কিন্তু কোমরের তলার যত সমস্যা, মাতৃভাষায় বলতে সংকোচ করি৷ অধিকাংশ ডাক্তারবাবুরাও তাই বলেন৷ তা ছাড়া ডাক্তারবাবুদের রোগীর ভাবের আদান প্রদানের ভাষায় একটা সমস্যা থেকেই যায়৷ ডাক্তার বাবুদের কিছু পেশাগত জার্গন আছে, যা রোগীদের কাছে সবটা বোধগম্য হয় না৷ LDL কোলস্টেরল, HDL কোলস্টেরল, হাইপো, হাইপার, ইত্যাদি৷ রক্তে চিনি কমে গেলে যদি বলা হয় হাইপোগ্লাইসিমিয়া হয়ে গেছে…৷ সব রোগী কি ঠিকঠাক বুঝবেন? ডাক্তারবাবুরা একইভাবে এবডোমেন পালমুনারি, আর্টারি, ভেইন, স্টেনোসিস, ক্যালকুলি এইসব শব্দাবলি বলে যান৷ মনে হয় শুধু এখানে নয়, বিহার, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র প্রায় সর্বত্রই৷ চিকিৎসক এবং রোগীর মধ্যে একটা দূরত্ব হয়েই আছে৷ ওঁরা যেন বেদিতে দাঁড়িয়ে কথা বলেন, রোগীগণ বেদিতলে৷ যোগাযোগের ভাষাটা তৈরি হল না এখনো৷ ডাক্তারবাবুরা চেম্বারে থাকুন৷ এখন বরং মাঠে নামি৷

দুই কৃষক কথা বলছেন৷

-ইবার বষ্যা ভালো হবে৷
-কেন বলছ?
-আমে ধান তেঁতুলে বান৷ আম ঝ্যাকোন ভালো হয়িছে, ধান ভালো হবে৷ মানে বষ্যা ভালো হবে৷
-কি ধান লাগাবি?
-মন কত্তিচে মিনিকেট আনারকলি বীজ লোব৷
-আমার পোষাবেনে আইআরেট লোব৷ ফল বেশি৷
-ট্যাকটারের ডিমান হবে ইবার আগেভাগে লিখে লিতে হবে৷

আই আরেট মানে সহজ৷ আই. আর. এইট৷ একটি হাইব্রিড বীজ৷

এইসব চাষ।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত