| 15 জুলাই 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: শ্রাবন্তীদের দিনরাত্রি (পর্ব-৬) । ইকবাল তাজওলী

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

১২.

আরজুমান্দ বানু ভয়ে কুচকে গেছেন। ভোররাতে অলক্ষ্মী পেঁচা ডেকেছে। অলক্ষ্মী পেঁচা ডাকলেই বিপর্যয় নেমে আসে। তিনি বিপর্যয় আশঙ্কা করছেন। সেই রাতেও অলক্ষ্মী পেঁচা ডেকেছিল, তারপর তাঁর জীবনে বিপর্যয় নেমে এলো।
শ্রাবন্তী শুনে মাকে বলল,‘মা এসব কুসংস্কার। সেইরাতে পেঁচা না ডাকলেও বাবা নূরজানকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হতেন। পেঁচার ডাকের সঙ্গে এর কোনো দূরতম সম্পর্ক নেই।’
‘কী জানিরে মা। আমরা পুরনো কালের মানুষ, আমাদের বিশ্বাস নিয়ে থাকতে দে।’
মায়ের কথা শুনে অবন্তী হেসে উঠল।
পরক্ষণেই আরজুমান্দ বানুর মেজাজ উঠল সপ্তমে। বললেন,‘বেহায়া, লজ্জা-শরম নাই। আজকে রেজাল্ট বের হবে। একটু আল্লা-খোদার নাম নে।
‘আল্লা-খোদার নামটা নিয়ে এই মুহূর্তে লাভটা কী মা? রেজাল্ট যা হওয়ার তাই হবে। কোনো হেরফের হবে না।’
‘ছি ! ছি ! কী বললি রে! এই ইবলিস শয়তান্নিকে আমি পেটে ধরেছি! যা তুই আমার সামনে থেকে দূর হয়ে যা। যা।’
অবন্তী কেঁদে উঠল। বলল,‘আপুকে তো কিছু বল না। আপুর সাত খুন মাফ!’
আরজুমান্দ বানু তেড়ে গেলেন। চড়ও দিলেন একটা।
অবন্তী চোখের পানি মুছে চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল শিউলির বাসায়।
‘কী রে রাঙাদি। এসেছিস? অধমের ঘরে কদমের পাড় ! নে, বস। বাবুকে ধর। দুত্তু দুত্তু তোনারে নজর দিও না। কী রে মন খারাপ? ডাক্তারের সঙ্গে অভিমানপর্ব চলছে? ডাক্তার কি বলেনি,‘অভিমানী গো কথাটি শোন, এসো না কাছে। মান-অভিমানের আরও যে সময় পড়ে আছে।’
‘মা বকেছেন।’
‘আর তুই বেরিয়ে এলি!’
‘শিউলি আপু, বাবুর নাম রেখেছো?’
‘রেখেছি। নেফারতিতি।’
‘কে রেখেছে? তুমি না দুলাভাই?’
‘কেন, আমি।
অবন্তী বিকেলে ফিরে এল।
রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। পাশ করতে পারেনি।
আরজুমান্দ বানু তেমন কিছু বলেননি, শুধু বলেছেন,‘গাধা। সারাদিন শুধু সাজগোজ নিয়ে থাকিস। আর পাশ করার দরকার নাই।’
শ্রাবন্তীও কিছু বলেনি।
ওয়াহিদ সাহেব এসেছেন। এসেই অবন্তীর রেজাল্ট শুনেছেন। তিনি অবশ্য এরকম ধারণাই করেছিলেন। অবন্তীর অনেক কিছুই তাঁর নজরে এসেছে। তিনি দেখেও না দেখার ভান করেন। কর্তব্য হিসেবে পরোক্ষভাবে আরজুমান্দ বানুর নজরে আনার চেষ্টা করেছেন। হয়ত আরজুমান্দ বানু বোঝেননি, অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করেছেন। ওয়াহিদ সাহেব আর এগোনো সমীচীন মনে করেননি।
আজ আর ওয়াহিদ সাহেব চা খেলেন না। বসলেনও না। অবন্তীকে ভালোভাবে পড়াশোনার করার পরামর্শ দিয়ে আস্তে আস্তে চলে গেলেন।


আরো পড়ুন: শ্রাবন্তীদের দিনরাত্রি (পর্ব-৫) । ইকবাল তাজওলী


১৩.

মাঘ মাস। শীত পড়েছে প্রচণ্ড। কুয়াশায় চারদিক আছন্ন। কোনো কোনো দিন সকাল নয়টা- দশটা পর্যন্ত সূর্যের দেখা মেলে না। আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী তীব্র শৈত্যপ্রবাহ চলছে উত্তর ও উত্তরপূর্বঞ্চলে। পুরো সপ্তাহ জুড়ে এটি অব্যাহত থাকবে। তাপমাত্রা ছয়ডিগ্রি নেমে এসেছে এ অঞ্চলে। আরজুমান্দ বানুর কাশি বেড়ে গেছে, সঙ্গে শ্বাসকষ্টও। এই শ্বাসকষ্টটা তাঁর নতুন। শ্রাবন্তী বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মাকে ইনহেলার কিনে দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, তিনি ভালোভাবে ইনহেল করতে পারছেন না। ডাক্তার বলেছেন, বৃদ্ধ মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরণের সমস্যা হয়ে থাকে। তারপরও তাঁর শ্বাসকষ্ট কমে গেছে।কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্য উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছে। আজিজের মা এখনও আসেনি। সময় যত বয়ে যাচ্ছে তার আসা তত ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। শ্রাবন্তী অনেক আগেই অফিসে চলে গেছে।
অবন্তী বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্তুকে নিয়ে আজ সারাদিন সে ঘুরবে। আরজুমান্দ বানু অবন্তীকে বললেন,‘বাইরে যাবি, যা। তবে আজিজের মা আসেনি। কাজটা করবে কে? আমার কি সে বয়স আছে? কাজ সেরে একটু পরে যা।’
অবন্তী মায়ের কথা ফেলতে পারল না। কাজে লেগে গেল। কাজ-টাজ শেষ করে তারপর বের হলো।

শ্রায়ন্তীর খবর পাওয়া গেছে। তারা স্বামী-স্ত্রী বাড়ি ফিরে এসেছে।আজিজের মা খবরটি নিয়ে এসেছে। আরজুমান্দ বানু চোখের পানি মুছছেন আর মেয়ের খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করছেন। আজিজের মা বলল,‘মাইয়া আফনার রাজরাণী অইয়া আসে। একমায়ের একপুত আফনার মাইয়ার জামাই। আমি বাড়িঘর সব দেইখাই আইছি। এর লাইগাই তো আইতে দেরি অইসে। কী সুন্দর আফনার মাইয়ার জামাই! এই দেহেন আমারে একশ টেহা বখশিস দিসে। আর কইসে, আমার হরিরে ( শাশুড়ি ) লইয়া আইও।’ আরজুমান্দ বানুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বার বার শ্রায়ন্তীর কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। আজিজের মা বলল,‘আফায় আফনার কথা জিঙ্গাইল। কইল,‘আজিজের মা, আমার মা ভালো আছে?’ হেরপর হকলের কতা জিঙ্গাইল।’
‘তুমি কী বললে, আজিজের মা?’
‘কইসি, আফনে বেশি বালা নাই। ফাঁপানি না কী একটা রোগ অইছে। আর শরীলডা ভাইঙ্গা গেসে। তারপর শ্রাবন্তী আফার কতা জিঙ্গাইল, অবন্তী আফার কা জিঙ্গাইল আর শাওন বাইরে যেইতে কইল।’
আরজুমান্দ বানু চোখ মুছতে মুছতে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন। তারপর, একটু জোরে জোরেই দোয়া করতে লাগলেন। বিকেলবেলা শাওনকে পাঠালেন শ্রায়ন্তীর বাড়ি। আলমিরা থেকে শ পাঁচেক টাকা বের করে দিয়ে বললেন,‘মিষ্টি নিস।’
সন্ধ্যার আগে আগে প্রায় বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে অবন্তী ফিরে এলো।
মায়ের দৃষ্টি এড়াল না। আরজুমান্দ বানু মেয়েকে জেঁকে ধরলেন। বললেন,‘বল, কোথায় গিয়েছিলি? সত্যি করে বল।’
‘বান্ধবীর বাড়ি, মা।’
‘বান্ধবীর বাড়ি! বেহায়া, বেলাজ। অতি বাড় বাড়িস না। সবকিছুর একটা সীমা আছে। সীমা লঙ্ঘন করিস না। সীমা লঙ্ঘন করা ভালো না।’
শাওন সন্ধ্যারাতে খুশি মনে ফিরে এলো। বলল,‘মণিবু খুব সুখে আছে, মা। মণিবু আমাকে একা ছাড়েনি; দুলাভাইকে দিয়ে পাঠিয়েছে।’
শ্রাবন্তী বলল,‘গাধা। বাড়িতে আনতে পারলি না।’
‘আপু, গাধা, গাধা কর না। গাধা আমি না। গাধা রাঙাবু। দুলাভাই আমাকে পাঁচ দুই সাতশত টাকা দিয়েছে, আর মণিবু লুকিয়ে দিয়েছে আরও পাঁচশত টাকা। হিপ হিপ হুররে!

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত