| 24 মে 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: শ্রাবন্তীদের দিনরাত্রি (পর্ব-১) । ইকবাল তাজওলী

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

বৃষ্টি ঝরছে অঝোরধারায়। শ্রাবণের বৃষ্টি। রাত থেকে নেমেছে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। আকাশের যে অবস্থা মনে হয় সারাদিন ঝরবে। থেমে থেমে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বিদ্যুৎ চমকানির সঙ্গে সঙ্গে মেঘের গর্জনও ধেয়ে আসছে।

শ্রাবন্তী বিছানার বাঁদিকে একটু কাত হয়ে দেয়ালঘড়িটা দেখে নিল। এখন সকাল সাতটা বেজেছে। ওর ঘুম ভেঙ্গেছে ভোরে। শুক্রবার হওয়ায় আজ আর অফিসে যাওয়ার তাড়া নেই। তাই আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে কখন যে সাতটা বেজেছে টের পায়নি।

আজ আর আজিজের মায়ের আসার সম্ভাবনা নেই। এমনিতেই বেটি আসে না, তারওপর মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আজিজের মায়ের হয়েছে পোয়াবারো।

শ্রাবন্তীকে আজ সবকিছু সামলাতে হবে।

এই আজিজের মা টাকে নিয়ে হয়েছে বিপদ। একদিন আসে তো তিনদিন আসে না। শ্রাবন্তীর মা আরজুমান্দ বানু এ ব্যাপারে নিজেও কিছু বলেন না, মেয়েদেরকেও কিছু বলতে দেন না। বলেন,‘ছুটা কাজের বেটি, থাকুক, তাও তো আসে। কাজেই, আজিজের মায়ের তোলা হয়েছে আশি টাকা। ইচ্ছে মতো আসে, আর ইচ্ছে মতো যায়।

প্রায়দিনই শ্রাবন্তীকে ঘরদোর পরিষ্কার করে নাস্তা বানিয়ে অফিসে যেতে হয়। তারপর ক্লান্ত শরীরে অফিস থেকে ফিরেও নিস্তার নেই, ভাত চড়িয়ে রাতের বেলা মায়ের জন্যে রুটি বানাতে হয়। আগে এ কাজটি করত অবন্তী। অবন্তীর এখন পরীক্ষা সামনে, তাই শ্রাবন্তীকে সবকিছু সামলাতে হচ্ছে।

অবন্তী, শ্রাবন্তীর ছোটোবোন। শ্রাবন্তীরা তিনবোন। শ্রাবন্তী,অবন্তী,শ্রায়ন্তী। আর শাওন তাদের একমাত্র ছোটোভাই। অবন্তী ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবে। শ্রায়ন্তী টেনে, আর শাওন ক্লাস এইটে পড়ে।

শ্রাবন্তীর বয়স যখন বছর বারো তখন তার বাবা আহমদ আলি গৃহপরিচারিকা নূরজানকে বিয়ে করে নিরুদ্দেশ হন। ছোটো ছোটো চার সন্তান নিয়ে আরজুমান্দ বানু পড়ে যান অথৈ সাগরে। শুরু হয় তাঁর জীবন সংগ্রাম। সেলাই খুব ভালো জানতেন। শুরু করলেন প্রতিবেশীদের কাপড় সেলাই। ছোটো শ্রাবন্তী বাড়ি বাড়ি গিয়ে তখন  কাপড় সংগ্রহ করে আনত, আর আরজুমান্দ বানু সেই কাপড় সেলাই করে মেয়েকে দিয়ে ডেলিভারি দিতেন। আহারে! কতই না কষ্ট করেছেন মা! সেই সব দিনের কথা স্মরণে এলে শ্রাবন্তীর চোখে জল এসে যায়। কতদিন পরিশ্রম করে খেয়ে না খেয়ে আরজুমান্দ বানু ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন!

বছর তিনেক হয় আরজুমান্দ বানু সেলাই করা বাদ দিয়েছেন। শ্রাবন্তী গ্র্যাজুয়েশন করার পর চাকরি পেয়ে অনেকটা জোর করে  মাকে অবসর দিয়েছে। বলেছে,‘তোমার আর সেলাই করার দরকার নাই, মা। বেতন যা পাই, তা  দিয়েই সংসার চলবে। এবার তুমি বিশ্রাম কর, মা।’

আরজুমান্দ বানু মেয়ের কথা অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিয়েছেন। বয়স তো আর কম হলো না। তাছাড়া, আজকাল আর আগের মতো কাজও করতে পারেন না।

আড়মোড়া ভেঙ্গে মুখহাত ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকে চুলা জ্বালিয়ে এককাপ চা বানাল শ্রাবন্তী। মায়ের জন্যে। ঘুম থেকে ওঠে প্রতিদিন খালি পেটে মাকে চা খেতে হয়। খালি পেটে মায়ের এই চা খাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘদিনের। সারাদিন নাকি তাতে সতেজ থাকা যায়। বয়াম থেকে দুটো বিস্কুট বের করে চা-বিস্কুট মায়ের টেবিলে রেখে শ্রাবন্তী আবার ফিরে এলো রান্নাঘরে। নাস্তা বানানোর জন্যে।

এ সময় অবন্তীর গলা শোনা গেল। অবন্তী রান্নাঘরে প্রবেশ করে বলল,‘আপা, আজ আর রুটি বানাস না। আমি খিচুড়ি করছি। ডিমও আছে। দারুণ লাগবে।’ তাদের কথার মাঝে শ্রায়ন্তী ও শাওন এসে যোগ দিল। রান্নাঘরে ছেলেমেয়েদের হৈ-হুল্লোড় ধ্বনি শুনে আরজুমান্দ বানুও থাকতে পারলেন না। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যোগ দিলেন।

সকলে মিলে মজা করে খিচুড়ি খাওয়া হলো।

এখন বিকেল। ঘণ্টা খানেক হয় বৃষ্টি পড়া বন্ধ হয়েছে। সারারাত ধরে মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ার কারণে মাঠঘাট ভিজে  একাকার হয়ে গেছে। ঘর থেকে বের হওয়া দায় হয়ে পড়েছে। শ্রাবন্তীর  ইচ্ছে ছিল বাড়ি থেকে বের হয়ে শিউলির বাসায় যাবে। শিউলি, শ্রাবন্তীর বান্ধবী। স্কুল জীবনের বান্ধবী। বছর খানেক হয়, শিউলি স্বামীসহ শ্রাবন্তীদের মহল্লায় ভাড়া বাসায় উঠেছে। গলির মুখে যেতে-আসতে শিউলির স্বামী আবিদের সঙ্গে শ্রাবন্তীর প্রায়ই দেখা হয়। কোনো এক অজানা কারণে শ্রাবন্তী এড়িয়ে চলে আবিদকে। দেখেও দেখে না। কিন্তু শিউলি আসে। প্রায়ই আসে। এলেই বলে,‘এই শ্রায়ন্তী- অবন্তী, তোরা যাস না কেন আমার বাসায়! যাবি।’ তারপর হেসে হেসে বলে,‘মানুষের কুটুমিতা যাওয়া-আসাতে, আর গরুর কুটুমিতা লেয়া-লেয়িতে।’ সকলে একসঙ্গে হেসে ওঠে।

মাথা ব্যথা থাকায় শ্রাবন্তী বিছানায় শুয়ে আছে। এই রোগটা তার বেশ পুরনো। বছর তিনেক আগে ডাক্তার দেখিয়ে চোখে চশমা নিয়েছে। তারপর আর তেমন একটা মাথা ব্যথা হয়নি। আবার মনে হচ্ছে ডাক্তার দেখাতে হবে।


আরো পড়ুন: ধারাবাহিক: রাণীয়ার রান্নাঘর (পর্ব-১) । ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


ওয়াহিদ সাহেবকে মিষ্টি সহ আসতে দেখা গেল। তাঁর বাড়ি শ্রাবন্তীদের লাগোয়া। সম্পর্কে তিনি শ্রাবন্তীদের দুলাভাই। বছর পাঁচেক হয় তাঁর স্ত্রী গত হয়েছেন। চল্লিশোর্ধ হলেও তাঁকে দেখায় তরুণদের মতো। আজ লাল সার্ট পরিধান করায় তাঁকে পঁচিশোর্ধ দেখাচ্ছে। তার একমাত্র সন্তান অর্ণবের বয়স ছয়। এ বাড়িতে তার অবারিত দ্বার। আরজুমান্দ বানুকে সে লালনানু বলে ডাকে। যত আবদার তার এই লালনানুর সঙ্গে। লাল নানুর ন্যাওটা সে।

অর্ণব লালনানুর কোলে বসে মিষ্টি খাচ্ছে। বাবাকে বলে সে লালনানুর জন্যে মিষ্টি এনেছে। দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার জন্যে তার এই মিষ্টি আনা।

ওয়াহিদ সাহেবকে মিষ্টি-চা-বিস্কুট দেয়া হয়েছে। চা-বিস্কুট খেতে খেতে তিনি কথা বলছেন। এ বাড়িতে এলে শ্রাবন্তীর হাতের চা না খেয়ে তিনি যান না। এজন্যে তিনি সাধারণত শুক্রবারে আসেন। আর চা পান করে মন্তব্য করেন,‘দারুণ চা!’ আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। বললেন,‘দারুণ চা-রে শ্রাবন্তী।তোর আপাও এরকম চা বানাতো।’

ওয়াহিদ সাহেব আপাদমস্তক একজন ভালো মনের মানুষ। পেশায় ব্যবসায়ী। তরুণ বয়স থেকে ব্যবসা করে প্রচুর বিত্তের মালিক হয়েছেন। তা সত্ত্বেও তাঁর মনে কোনো অহংকার নেই। বছর দশেক থেকে সুখে-দুঃখে তিনি শ্রাবন্তীদের সঙ্গে রয়েছেন। কোনো ধরণের চাওয়া-পাওয়াও  তাঁর নেই।

চা-টা খেয়ে ওয়াহিদ সাহেব শাওনকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। বললেন,‘আয়, দরকার আছে।’

অর্ণব গেল না। লালনানুর সঙ্গে রয়ে গেল। এবং দুষ্টুমিতে সারা বাড়ি সরগরম করে তুলল।

চা পাণের কারণে শ্রাবন্তীর মাথা ব্যথা কিছুটা হলেও সেরেছে। সে অর্ণবকে সঙ্গে নিয়ে উঠোনে পেয়ারা গাছের নিচে গেল। থোকায় থোকায় পেয়ারা ঝুলতে থাকায় তার আনন্দের সীমা-পরিসীমা রইল না। এবারই দুটো গাছে প্রথম পেয়ারা ধরেছে। হাত বাড়িয়ে সে পেয়ারা স্পর্শ করল। পেয়ারা স্পর্শ করতে গিয়ে বাড়ির সম্মুখের রাস্তায় এক যুবককে দেখে তার দৃষ্টিশক্তি আটকে গেল। দৃষ্টি বিনিময় হতেই যুবকটি হেঁটে দূরে সরে গেল।

শ্রাবন্তী অবন্তীকে ডাক দিল।

তারপর বেছে বেছে দু-চারটা পাড়তে পাড়তে জিজ্ঞেস করল,‘ছেলেটা কে রে ?’

‘কোন ছেলে ?’

‘রাস্তায় যে দাঁড়িয়ে ছিল।’

‘খেয়াল করিনি।’

শ্রাবন্তী আর কিছু বলল না। অর্ণবকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।

বৃষ্টি পড়া আবার শুরু হয়েছে। বৃষ্টি পড়ার আগে আগে পেয়ারা দিয়ে অর্ণবকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

শাওন একটা বড়ো রুইমাছ নিয়ে ফিরেছে।

ওয়াহিদ সাহেবকে রাতের বেলায় দাওয়াত দেয়া হয়েছে। শ্রাবন্তী ভাইকে সঙ্গে নিয়ে নিজে গিয়ে দাওয়াত দিয়ে এসেছে। ওয়াহিদ সাহেব একশর্তে রাজি হয়েছেন। শর্ত হলো, ভাত খাওয়ার আগে ও পরে  চা খাওয়াতে হবে।

 

 

ক্রমশ…

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত