| 24 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-১৯) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায় চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে ।নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা।


‘ আমাদের সবগুলি ঘরের বুকিং কমপ্লিট হয়েছে কি?’ বাবা শ্রীমানকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি ইতিমধ্যে সকালে উঠে এককাপ খালি চা খেয়েছেন। চা খেতে খেতেই তিনি সকালের খবরের কাগজ গুলির হেডলাইন দেখছেন এবং রান্না করে কাজ করতে থাকা মাকে দু-চারটি খবরের কথা তিনি নিজের মন্তব্যসহ বলছেন।

শ্রীমান মাথা নেড়ে একটা খবরের কাগজ টেনে নিল।

‘ মাথাটা যে নাড়াচ্ছিস, সবগুলো বুকিং হয়ে গেছে কি?’

বাবার কণ্ঠস্বরটা কোমল। আজকাল তিনি শ্রীমানের সঙ্গে খুব কোমল ভাবে কথা বলেন।

‘ হয়েছে। একটাও বাকি নেই। কেবল উপরের ফ্লোরটা এখনই বুকিং করতে হবে না বলেছে অঞ্জুদা।’

‘ সেটাই জিজ্ঞেস করছি। ওই ফ্লোরটা কেন খালি রাখতে হবে। আমাকে কয়েকজন লোক বলছে। দিয়ে দিলে আমরা বুকিংয়ের কমিশনের টাকা গুলি পাই।’

শ্রীমান কিছু বলল না। বাবার বুকিঙেরকাজটা খুব একটা খারাপ চলছে না। চারটি ফ্ল্যাট এবং তিনটি দোকানের বুকিং তিনি করে ফেলেছেন। শ্রীমান নিজে ঠিক করা পার্টি গুলিও বাবাকেই দিয়েছে। বুকিং করিয়েই তিনি প্রায় ১৩ লাখের মতো পেয়েছেন। 

মা ফুলকো লুচির প্লেট এবং আলুর দমের একটা বাটি শ্রীমানের সামনে দিয়ে গেল। এটা তার বড়ো প্রিয় খাদ্য। মায়ের কাছে সব সময় বায়না ধরে এটা বানানোর জন্য। এখন নিজে থেকেই মা মাঝেমধ্যে বানিয়ে দেয়।

‘ এবার ডাল ভাত ভাজা লুচি খাইয়ে ছেলেটির পেট খারাপ করাবে তুমি,’ বাবা রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বলল।

‘ আপনার জন্য শুকনো রুটিই বানাচ্ছি।’

‘ না না, আজকে লুচিই দাও, কত আর শুকনো রুটি খাব!’

মা সামনে রেখে যাওয়া লুচি আলুর দমের প্লেটটার দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্টির সঙ্গে তিনি বললেন ওর বেতনটা আসলে আমাকে দেওয়াই উচিত ছিল বুঝেছ। ওর চেয়ে কনস্ট্রাকশনের কাজ আমিই বেশি দেখি। আমি না দেখলে ঠিকাদার, সাপ্লায়ার ওদেরকে ঠকিয়ে শেষ করে দিত। সেদিন নরেন নামে সেই সাপ্লায়ারটি বালি দেবার সময় পাঁচ কিউবিট দিয়েছে শুনে আমার কেমন যেন সন্দেহ হল। পরীক্ষা করে দেখি সাড়ে চার কিউবিটের চেয়ে কম।’

‘ নরেনকে কী করলে তুমি?’ শ্রীমান আগ্রহ সহকারে জিজ্ঞেস করল।

‘ ট্রাকে তার বালি ফিতা মেরে দেখলাম। দৈর্ঘ্য ,উচ্চতা সমস্ত কিছু মেপে দেখে অঙ্ক করে দেখতে পেলাম চার দশমিক চার কিউবিট ।’

‘নরেন কী বলল?’ শ্রীমান জিজ্ঞেস করল।

‘ ও বেটা আর কী বলবে, বলল আসার সময় গাড়ি থেকে বাতাস হয়তো উড়িয়ে নিয়ে গেছে। আনার সময় আমি পাঁচের চেয়ে বেশি এনেছিলাম।’

‘ খুব ভালো করেছ’, শ্রীমান বলল।

‘ রাস্তায় কোনো দোকানে নিশ্চয় সে কয়েক টিন বালি রেখে এসেছে। খুচরো বিক্রি করবে।’ অনেক টাকার মাল সে নিশ্চয় সে  সর্ট সাপ্লাই দিয়েছে। পাথর-গিট্টিতে  তো ধরার কোনো উপায় নেই। খুব আরামে আলুর দম দিয়ে মেখে এক টুকরো লুচি মুখে ঢুকিয়ে প্রসন্ন চিত্তে সে চিবোতে লাগল। মা আরও দুটো লুচি আলুর দম এগিয়ে দিয়ে নিজেও বসল।

‘ কতটা কাজ হয়েছে?’ মা জিজ্ঞেস করল।

শ্রীমান কিছু বলার আগেই বাবা বলল,’ ও আসলে জানেই না কতটা কাজ হয়েছে, শোন।নিচের দোকানগুলির ফিনিশিঙের কাজ শেষই।দুই একটিতে নেওয়া মানুষেরা ভেতরের শোকেস ইত্যাদি বানানোর জন্য প্লাই,সানমাইকা ফেলে রেখেছে।মিস্ত্রি লাগিয়েছে।এক থেকে দুমাসের ভেতরে হয়তো বাজারের পার্টটা হয়ে যাবে,নয় কি?’

শ্রীমান মাথা নাড়ল।

‘আমাদের রুম দুটি কি করেছে?’মা জিজ্ঞেস করল।

‘এখন তো দুটো রুমেই সাইট অফিস হয়ে আছে,অফিসের কাজ শেষ হয়ে গেলে কী করা যায় চিন্তা করতে হবে। কিন্তু ওরা কিবা ভাবছে?’ শেষের কথাটা তিনি শ্রীমানের দিকে তাকিয়ে বললেন।

শ্রীমান খবরের কাগজ দেখতে শুরু করেছিল।

‘ তোরা কিছু একটা ভেবেছিস কি?’ মা তাকে জিজ্ঞেস করল।

‘ কেন ফার্মেসি এবং চেম্বার করার কথা ছিল নাকি? সে অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিল।

‘ কী করলে ভালো হবে সবদিক ভেবেচিন্তে দেখতে হবে। জায়গাটা তো বেশ বড়ো। রুম দুটিও বড়ো বড়ো এবং দুটো একত্রে করার জন্য আরও বড়ো বলে মনে হচ্ছে। সেদিন আমাকে এসে একজন বলল, সাত লাখ টাকা নাকি সেলামি পাওয়া যাবে।’

‘ না না না,’ মা হাহাকার করে উঠল।’ একবার কাউকে ভাড়া দিলে আর কখন ও ফিরে পাবে না। আবার আগের মতো হবে।’

‘ ভাড়া দেবার কথা নয়,’ বাবা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল।’ আমি কথাটা বলছি মাত্র। পার্মানেন্ট কিছু একটা করতে হবে। আমাদের কিছু একটা চিন্তা করতে হবে। কী বলব। এখন তো অফিস আছেই, কিছুদিন পর্যন্ত থাকবেই।’

বাবা দশটার সময় প্রতিদিন সাইট অফিসে যায়। দুপুর পর্যন্ত তিনি কনস্ট্রাকশনের কাজকর্ম দেখে ভাত খেতে আসেন। ভাত খেয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে আবার বিকেলে যায়। কাজকর্ম দেখে শুনে বন্ধুবান্ধবকে ফোন করে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসে বেশ আড্ডা মারেন।

‘ বাবার বেশ মজা হয়েছে। করার জন্য একটা কাজ তো পেয়েছে।’ শ্রীমান রমেনকে একদিন বলেছিল। আসলে বাবা এসে এত কাজের তদারকি করতে থাকায় তার কেমন যেন সংকোচ হচ্ছিল।

‘ খুব ভালো হয়েছে বুঝেছ। খুব ভালো হয়েছে। প্রতিদিন বিকেল বেলা সিনিয়র মানুষরা এসে এভাবে গল্প গুজব করে, ব্যাপারটা দেখতেও ভালো লাগে। তুই বুঝতে পারছিস না।’

‘ না বুঝতে পারছি না।’

‘ নাম ভালো হয় রে বোকা। নামটা ভালো হয়। বাবা, একজন উকিল ,একজন কটন কলেজের রিটায়ার্ড প্রফেসর, একজন ইউনিভার্সিটির, একজন হাইকোর্টের রিটায়ার্ড রেজিস্টার। এই ধরনের মানুষগুলি প্রতিদিন বিকেলে এসে বসার জন্য প্রজেক্টের সুনাম হয়। আমি সেই জন্য ভালো চেয়ার আনিয়ে রেখেছি। মিনারেল ওয়াটারের ব্যবস্থা করেছি এবং কাঞ্ছাকে বলে দিয়েছি চা-কফি যা লাগে জিজ্ঞেস করে দিতে থাকবে। অঞ্জুদাও ব্যাপারটাতে খুশি হয়েছে । তোর বাবা তো পপুলার মানুষ । প্রতিটি বুড়ো মাঝেমধ্যে ওপরে উঠে কাজ দেখতে যায় । তুই দেখেছিস কিনা ।’

শ্রীমান মাথা নেড়েছিল। এক প্রকার স্বস্তি অনুভব করেছিল। কথাটা এভাবে সে কখন ও ভেবে দেখেনি।

বাবা মাকে বোঝাতে শুরু করল কীভাবে ওপরের ফ্ল্যাট গুলিতে মিস্ত্রি দিন রাত কাজ করে চলেছে। প্লাস্টার অফ প্যারিসের কাজ করছে, ইলেকট্রিকের সুইচ গুলির নিচের বক্স লাগাচ্ছে, বাথরুমের ফিটিংগুলি ঠিক করছে‐- ঝড়েরগতিতেকাজচলছে‐রাতেরবেলাতোলাইটজ্বালিয়েকাজচলছে।

‘ আমাদের ওপরের ফ্ল্যাট দুটো তুই ঠিকঠাক করার কথা বলছিলি না, কী করেছিস?’ মা শ্রীমানকে জিজ্ঞেস করল।

‘ আমাদের তো ফ্ল্যাট দুটির এখনই প্রয়োজন নেই,’ শ্রীমান বলল।’ দুটো ফ্ল্যাটের মধ্যে সংযোগী একটা দরজা রেখেছি যাতে ভেতরে ভেতরে দুটো ফ্ল্যাট একটার মতো হয়ে পড়ে।’

‘ তাই নাকি? তুই আমাকে বলিস নি,’ বাবা অভিযোগ করার মতো বলল।

‘ আমি ভাবছি, দুটো ফ্ল‍্যাট মিলে ছয়টা বেডরুম, ছয়টা টয়লেট। আরও দুটি বেডরুম বের করা যায়– এখন একটা গেস্ট হাউস করে রাখলে কেমন হয় ?’

শ্রীমান এবং রমেন এই বিষয়ে কথা বলেছিল। আইডিয়াটা ছিল অবিনাশের হাতে এরকম একটি গেস্ট হাউস থাকলে খুব ভালো হবে, বিজনেসও হয়ে থাকবে ফুর্তিও করা যাবে। সন্ধ্যাবেলা কখনও বন্ধুবান্ধব মিলে পার্টিও করা যাবে । তাস- টাস খেলার জন্য ও একটা জায়গার দরকার। সব সময় আর হোটেলে কত যাব। ভালো লাগেনা।


আরো পড়ুন: অর্থ (পর্ব-১৮) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


‘ আর দেখ, এই কলেজের মেয়েদের যেখানে সেখানে নিয়ে যাওয়া যায় না। হোটেলে যেতে চায়না, কিন্তু এখানে আসতে ওরা অপছন্দ করবে না,’ অবিনাশ বলেছিল।

‘ গেস্ট হাউস পরে হবে,’ বাবা হঠাৎ বলল।’ গেস্ট হাউস পরে হবে। কিন্তু প্রথমে আমরা তাতে কিছুদিন থাকব।’

‘ তাতে থাকব মানে? শ্ৰীমান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‘ ফ্ল্যাট গুলিতে আমরা কয়েক দিন থাকব। বাবা বেশ জোর দিয়ে বলে উঠলেন।’ নতুন ফ্ল্যাট গুলিতে না থাকলে কীভাবে হবে! আর আমাদের এই পুরোনো বাড়িটা কী রকম হয়ে গেছে দেখছিস না? আরও এক কাঠা জমি থাকলে এখানেও ফ্ল্যাটের কথাই চিন্তা করতে পারা যেত।’

‘ লাগবে না লাগবেনা, এখানে ফ্ল্যাটের কথা চিন্তা করতে হবে না,’ মা বলে উঠল।

‘ না ,না করছি না।’ বাবা বললেন।’ কিন্তু একটি কথা। এই বাড়িটার অবস্থা দেখেছ কি? ফুলওয়ালের ঘরটা ভালোই। কিন্তু দরজা জানালাগুলি কত পুরোনো। আরও দুটি ছেলের জন্য এটাচড বাথরুম থাকা দুটো ভালো বেডরুম বানাতে হবে। ওদের বিয়ে-শাদির কথা তো চিন্তা করতে হবে, হবে না কি? আমি ভাবছি আমরা সেখানে থেকে এই বাড়িটা ভালো করে রুম-টুম দুটো বাড়িয়ে নেওয়া ভালো হবে। আমি আর্কিটেক্টের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি এই বাড়িটা একটা সুন্দর বাংলোতে রুপান্তরিত করতে পারবেন বলেছেন।’

বাবার পরিকল্পনা শুনে শ্রীমান কিছুই বলতে পারল না।

‘ সেটা ভালো হবে। এই বাড়িটা সারিয়ে তোলার সময় এসে গেছে,’ মা আগ্রহের সঙ্গে বলল।

‘ অনেক খরচ হবে,’ শ্রীমান দুর্বলভাবে বলল।

‘ দুটো ফ্ল্যাট, দোকান দুটি হয়ে যাওয়ার পরে খরচের জন্য আমি চিন্তা করছি না। এমনিতেও তো বাড়িটা মেরামত করতে হতো, করাতাম। আরও একটি কথা, গেস্ট হাউস খোলার কথাটা আবার ভালো করে চিন্তা করে দেখ, ভাইকেও জিজ্ঞেস করে দেখ। একবার গেস্ট হাউস করলে পরে আর বন্ধ করতে পারা যাবে কি? অসুবিধা আছে। অনেক সমস্যা হতে পারে। তার তার চেয়ে ব্যাংক ইত্যাদিকে নির্দিষ্ট দিনের জন্য ভাড়া- টাড়া দেওয়াই ভালো হবে নাকি? কি বলিস?

শ্রীমান চট করে কোনো উত্তর দিতে পারল না।

‘ আর একটা ফ্ল্যাটে  তো আমরা থাকবই, বাবা বলে গেল। একটা ফ্ল্যাট থাকবে। সেটা এখন ভাড়া দেওয়া যাবে। গেস্ট হাউসটা এখনই খোলা যাবে না।’

‘ ফ্ল্যাটে তো কোনোদিন থাকি নি,’ মা বলল,’ থাকতে কী রকম বা লাগবে, বুঝতেই পারছিনা,’

মানুষটা সত্যিই চিন্তায় পড়ল।

‘ অন্য ধরনের এক্সপিরিয়েন্স বুঝেছ, আলাদা এক্সপিরিয়েন্স। একেবারে ফরেনের মতো লাগবে। ফরেনে তো সমস্ত মানুষ ফ্ল্যাটে থাকে হা-হা-হা।’ বাবা প্রাণ খোলা হাসি  হেসে উঠল।

‘ রান্নাঘরের এই নোংরা মিটসেফ পুরোনো আসবাব গুলি কিন্তু আমি পানবাজারের নতুন ফ্ল্যাটে  নিয়ে যেতে পারব না’, মা বলল।’ লজ্জা করবে।’

পুনরায় সবাই জোরে হেসে উঠল।

সামনের খবরের কাগজটার হঠাৎ একটা খবরে শ্রীমানের চোখ পড়ল। তখন পর্যন্ত সে কাগজটা ভালোভাবে দেখেনি; চা খেতে খেতে, কথা বলার সময় হেডলাইনগুলির উপর চোখ বুলিয়েছিল মাত্র। কাগজটা টেবিলের উপর চাপা দিয়ে রেখে সে ভালোভাবে খবরটা পড়তে লাগল।’ অপরিচিত মৃতদেহ উদ্ধার’– শহরের অনতি দূরে একটি জঙ্গলের কাছে দুটো যুবক ছেলের মৃত দেহ উদ্ধার হয়েছে। মৃত দেহ দুটি মাটিতে পুঁতে রাখা ছিল। শিয়াল- কুকুর মাটি খুঁড়ে বের করেছে। সকালে হালচাষ করতে গিয়ে নাকি কাঠ কাটতে গিয়ে মানুষ দেখেছে…  …

শ্রীমানের বুকটা ধপধপ করতে শুরু করল।

মৃতদহ দুটি গলে পচে গেছে যদিও যুবক ছেলের বলে বুঝতে পারা যাচ্ছে। খবরের কাগজে লিখেছে যে যুবক দুটির হাত দুটি পেছনদিকে তার দিয়ে বাধা ছিল এবং মাথায়, মাথায় গুলি করে ওদের হত্যা করা হয়েছিল…   …

শ্রীমানের হৃদস্পন্দন যেন বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল।

হত্যা আরম্ভ হয়েছে! খবরের কাগজে লিখেছে।

খবরটিতে আরও বলা হয়েছে যে এই হিংসা খুব শীঘ্রই শহরে ছড়িয়ে পড়তে পারে– আন্ডারগ্রাউন্ডের অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত একটা দল ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে শহরের উপকণ্ঠে ঢুকে পড়েছে এবং পুলিশ এবং প্রাক্তন আন্ডারগ্রাউন্ডের মানুষ দলবেঁধে ওদের খুঁজে বেড়াচ্ছে…    …

শ্রীমান তার হাত দুটি কেঁপে উঠছে বলে যেন টের পেল।

খাদান! বালির খাদানের সেই মুখটার কথা তার পুনরায় মনে পড়ে গেল।

বালির খাদানের মুখটা!

এতদিন সে মুখটির হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়েছিল । ভুলে গিয়েছিল – এখন ,এখন আবার সেই মুখটা ফিরে আসবে নাকি! 

শ্রীমান মানুষটা যেন ঘেমে উঠল। টেবিলে থাকা জলের গ্লাসটা নিয়ে সে ঢক ঢক করে জল খেতে লাগল।

বাকি কয়েকটি কাগজ ও সে ছিনিয়ে আনার মতো  সামনে নিয়ে এল। আজকাল প্রায় প্রতিটি কাগজই নেওয়া হয়। বাবা ঘরের কাজ দেখার জন্য যাবার সময় কাগজগুলি সঙ্গে নিয়ে যায় এবং অফিসে বসে সবগুলি কাগজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে।

না, বাকি কাগজ গুলিতে  দেখছি এই খবরটা নেই!

আছে, আছে- এই কাগজটিতেও ছোট্ট করে একটা খবর বেরিয়েছে‌। দিয়েছে, দিয়েছে।

একটিও ইংরেজি খবরের কাগজে নেই।

এই যে ,তৃতীয় অসমিয়া কাগজটিতেও খবরটা দিয়েছে। বিস্তারিত লিখেছে। আরও অনেক খুঁটিনাটি খবর দিয়েছে এখানে। অতি শীঘ্র শহরে হিংসা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে এখানেও লিখেছে– লিখেছে আরও হত্যা হতে পারে।

শ্রীমানকে খবরের কাগজে কিছু একটা খুঁজতে দেখাটা বাবা লক্ষ্য করল।’ এত করে কী দেখছিস বাবা? কী খবর? তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

বলব না বলব না করে শ্রীমান বলল,’ দুটি ছেলের মৃতদেহ পাওয়া গেছে।’

বাবা উঠে এসে খবরটা দেখলেন।’ ইস, আবার আরম্ভ হয়ে গেল। মাঝখানে এতদিন ছিল না।’

শ্রীমান কিছুটা অসহায় ভাবে বাবার দিকে তাকাল। বাবা খবর পড়ায় ব্যস্ত। এত কাছে এসে দাঁড়ানো বাবার শরীর থেকে বোঝাতে না পারা একটা আশ্চর্য গন্ধ এসে তার নাকে লাগল। এই গন্ধটা সে কখন ও পায়নি‐- সত্যিআশ্চর্যের।আগেবাবাবেশকড়াগন্ধথাকাকেন্থেরাইডিননাল’মা বা সেরকম কোনো একটি তেল চুলে মাখত। সে আর ভাই বলে বলে ছাড়িয়েছে। মাও নিষেধ করেছিল। সেই গন্ধটা কেমন ছিল আজ দেখছি মনে পড়ছে না। ভাইয়ের জন্ম হওয়ার পরে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত সে বাবার সঙ্গে ঘুমোত। তখন বাবার গন্ধ কেমন ছিল? তার মনে পড়ছে না। কিন্তু মায়ের গায়ের কোমল গন্ধটা  যেন তার মনে পড়তে চায়। এখন বাবার গন্ধটা এত আলাদা, এত আশ্চর্যের! একজন অপরিচিত মানুষ যেন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সে কিছুটা অবাক হওয়ার মতোই বাবার দিকে তাকাল।

‘ সাবধানে থাকতে হবে ,বুঝেছিস বাবা,’ বাবা বললেন।খুব সাবধানে থাকবি। আর রমেন বা তার সঙ্গীদের সঙ্গে গাড়িতে উঠে একসঙ্গে কোথাও যাবি না। বুঝেছিস?’

শ্রীমান দুর্বল ভাবে মাথা নাড়ল।

‘ দুজন একসঙ্গেই বেরিয়ে যাব দাঁড়া,’ বাবা বললেন।’ তুই গাড়িটা বের কর, আমি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসছি।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত