| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: বিদেহী ।  সুমনা সাহা

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

চোখ মেলে পলাশ একটা আগাছার বনে কাদাজলের মধ্যে বিবস্ত্র অবস্থায়চিৎপাত হয়ে পড়ে থাকা নিজেকে আবিষ্কার করে। চার-পাঁচ জন গেঁয়ো-লোক মুখের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে ওকে অবাক চোখে দেখছে। এক ঝটকায় উঠে বসে পলাশ। এরমানেটা কি? লোকগুলোর মধ্যে একজন তার কাঁধের গামছাখানা এগিয়ে দেয় পলাশের দিকে। ওটা কোমরে পেঁচিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়ায় পলাশ। এটা কি ভেলকি বাজি, নাকি স্বপ্ন, কিছুই মালুম হয় না। লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে সে রুক্ষ ভাবে জিজ্ঞাসা করে, “এখানে কি হয়েছিল?” অনেকে একসঙ্গে কোলাহল করে ওঠে।ওদের কথাবার্তা থেকে উদ্ধার হয়, সকালে ধানক্ষেতে আসার সময় এই পথের ধারে পলাশকে এরকম ভাবেই পড়ে থাকতে দেখে ওরাকৌতূহলী হয়ে ব্যাপারখানা দেখতে এসেছে।পলাশজিজ্ঞেস করে, “এটা কোন জায়গা?” “উদাসপুর,” ওদের মধ্যে একজন বলে। “এখান থেকে কলকাতা যাব কি করে?” সকলের মিলিত কলরবে বুঝতে পারে, আরেকটু পরেই ট্রেন আছে, সারাদিনে একটাই ট্রেন যাতায়াত করে। সকালে ছেড়ে বেরিয়ে যায়, আবার ওটাই রাত্রে ফেরে। প্ল্যাটফর্ম মিনিট দশেকেরহাঁটাপথ।পলাশের একটা জিনিস কিছুতেই মাথায় ঢোকে না—এই জায়গায় সে এলো কি করে? আর তার জামা-কাপড়ই বা গেল কোথায়?তার ব্যায়াম করা সবল দেহ। মাথায় ঝাঁকড়া কোঁকড়ানো চুল। মা দুগগার অসুর অসুর গোছের একটা ভাব আছে তার চেহারায়। স্বভাবটাও বেশ ডাকাবুকো। এইভাবে গামছা পরে গোটা রাস্তা যাবে কি ভাবে, ভাবতেই অস্বস্তিতে পলাশ লোকগুলোর মুখের দিকে তাকায়। অবশেষে একটা উপায় হয়। একজন বাড়ি থেকে তার একটা ধোওয়াপায়জামা আর একটা হাফ হাতা ফতুয়া-শার্ট এনে দিল।পলাশযারপরনাস্তিকৃতজ্ঞতাজানিয়েজল-কাদা ধুয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে সেই ধার করা পোশাক পরে স্টেশনের পথ ধরল।

প্রত্যেক শুক্রবার অফিসের পর ওরা চারজন একটা দেশী মদের ঠেকে সময় কাটাতে আসে। নয় নয় করে চার বছর হয়ে গেল, এর নড়চড় হয়নি।ওদের মধ্যে দীপ্তদা বিবাহিত। প্রকাশ পাড়ুই ব্যাচেলর, আর পলাশ ও সজল এখনও সংসারের গোয়ালে ঢোকেনি, তবে বিয়ের শখ আছে একশো ভাগ।মাস ছয়েক আগের ঘটনা। সকাল থেকে আকাশের মুখ গোমড়া। বিকেলের দিকে ঠাণ্ডা হাওয়ার সাথে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হল। তায় শুক্রবার। উইকএন্ডের বাজার। পাঁচটা পর্যন্ত নির্ধারিত অফিস-টাইম হলেও শুক্রবার চারটেরপর থেকেই ছুটি ছুটি হাওয়া। অনেকেই কলকাতায় মেসবাড়িতে থাকেন, হপ্তাহান্তে  ডায়মণ্ড হারবার বা মালদার ট্রেন ধরে দেশের বাড়িতে ছোটেন। অলিখিত নিয়মেই চারটের পর ফাইল-পত্র গুটিয়ে ওরা অফিস থেকে বেরিয়ে হাঁটা দিয়েছিল। ট্রামলাইন পেরিয়ে বাঁ দিকের চেনা গলির মধ্যে ঢোকার মুখেই চড়বড়িয়ে বৃষ্টি এলো। সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। প্রায় দৌড়ে ওরা পৌঁছে গেল রঘুদার দোকানে। বাঁধাধরা কোণার টেবিলে বসে ‘রঘুদা, চারটে দিশি’ হাঁক মেরে যে যার পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথা মোছে।

সেদিন দীপ্তদার নেশাটা একটু বেশীই হয়ে গিয়েছিল। কলেজ লাইফের কথা বলতে বলতে এক সময় ইমোশনাল হয়ে কেঁদে ওঠে। সজল পলাশের দিকে তাকায়। পলাশ কবজি ঘুরিয়ে আনমনে রিস্ট-ওয়াচের দিকে একবার তাকায়। ঘড়ির কাঁটা প্রায় আট ছুঁইছুঁই। বৃষ্টি খানিকটা ধরে এসেছে। কয়েক গেলাস পেটে পড়লে সবারই মনের ভিতরে চাপা দিয়ে রাখা দুঃখগুলো উথলে ওঠে। মধুর মুখটা খুব মনে পড়ছে। বুকের মধ্যে চিনচিনে কষ্টটা ফিরে আসছে। সজল বলে, ‘পলাশ, ওঠ, বাড়ি চল।’ পলাশের মাঝে মাঝে মনে হয়, সজল বোধ হয় অন্তর্যামী, কিম্বা মা মরে গিয়ে সজলের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। যেভাবে মা পলাশের মুখে ছায়ার মতো আনাগোনা করা প্রত্যেকটা ভাবের খেলা অনায়াসে পড়ে ফেলত, সজলও খানিকটা সেরকম ভাবেই পলাশকে পড়ে ফেলে। ওর এখন মনটা খারাপ হচ্ছে, মধুর কথা মনে পড়ছে, আনমনা হয়ে নিজের চারপাশটা ভুলে যাচ্ছে…সব সজল বুঝতে পারছে এক অদ্ভুত ক্ষমতাবলে।

শেষবার যখন মধুর সঙ্গে ঝগড়া করে চলে আসে, সজলকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদেছিলপলাশ। সজল ওর ছেলেবেলার বন্ধু। দুজনার দুজনকে ছাড়া একদণ্ড চলে না। সজল নীরবে পলাশেরকান্না দেখেছিল। ওকে গুছিয়ে নেওয়ার সময় দিয়েছিল। তারপর ওর সব কথা শুনে ওরই মতোকেঁদেছিল।

পলাশ একটা সিগারেট ধরায়। এই মোক্ষম বস্তুটি ওকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।সত্যজিতের‘ফেলুমিত্তির’ সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তেছাড়তে ‘বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া’ দিতেন। পলাশেরও একটা সিগারেট ধরালেই মাথাটা পরিষ্কার হয়। সিগারেটটা ধরিয়ে ও বাইরে বাসস্ট্যান্ডের দিকে তাকায়। লোক চলাচল কমে এসেছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দেখা যাচ্ছে এখনও মিহি বৃষ্টির গুঁড়ো ঝরছে। ম্লান আলোয় কয়েকজন ছাতাধারীবাসের জন্য অপেক্ষমান। হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে যায় দূরে একেবারে কোণের টেবিলে বসা একটি মেয়ের সঙ্গে। খুব সাধারণ চেহারা। একটা কালো টপ আর ফুল ছাপ পালাজোস্কার্ট পরে আছে। কিন্তু ভারি মিষ্টি একটা ঢলঢলে শ্রী মুখের মধ্যে। দ্বিতীয়বার তাকাতেই মেয়েটাহাসলো। আবছা অন্ধকারে ওর শ্বাদন্ত দুটো ঝকমক করে উঠল। চোখে খেলে গেল একটা ঠিকরানো দ্যুতি। মনে হল, যেন দৃষ্টি দিয়ে তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো ও পলাশের চোখের মধ্যে ঢুকে পড়ল। পলাশের মাথাটা আচমকা ভয়ানক ভাবে ঘুরে গেল। ও চোখ বন্ধ করে ফেলল। খুব ধীরে ধীরে চোখ খুলল। ও জানে, সজল ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। পলাশ ভাবছে, ‘আজ নেশাটা কি বেশী হয়ে গেছে? না, ওইদিকে আর কিছুতেই তাকাবো না। এইসব দোকানে কী ধরনের মেয়েরা আসে, সে তো জানা কথাই। মেঘলা সন্ধ্যায় কাস্টমারপায়নি বোধ হয়, ওই হাসিরঅর্থ‘কাস্টোমার’ ধরার ইঙ্গিত। সেই ফাঁদে আগে কখনও পা দেয়নি, এমন নয়, তবে আজ কোনমতেই নয়। আগামীকালটুকাই-এরজন্মদিনউপলক্ষ্যেওরকয়েকজনবন্ধুকেনেমন্তন্নকরাহয়েছে, বৌদিআজকিকিযেননিয়েযেতেবলেছিল, পকেটেলিস্টলেখাকাগজটাআছেতো? ভাবতেভাবতেপকেটেহাতঢোকায়পলাশআরসেইসঙ্গেচোখদুটোওঅবাধ্যছেলেরমতসটানচলেযায়সেইকোণেরটেবিলে… ‘নাহ, ওখানেকেউনেইএখন। সজলকেদেখাবেভাবছিল,যাঃ! মেয়েটাউঠেগেছে! নিশ্চয়অন্যখদ্দেরপেয়েগেছে!’

ছ’মাস আগের সেই শুক্রবার থেকে ব্যাপারটার শুরু। সেদিন পলাশ আর সজল যে যার ঘরের পথ ধরেছিল, কিন্তু সেই রাতে পলাশ ঘরে ফেরেনি। পরের দিন দুপুরবেলা যখন ফিরল, বৌদি চমকে উঠেছিল ওকে দেখে, ‘পলা তুই কার জামকাপড় পড়েছিস? রাত্রে কোথায় ছিলিস? তোর দাদা থানা-পুলিশ করতে বাকি রেখেছে! কত জায়গায় ফোন করেছি, জানিস? তোর ফোন সুইচ অফ কেন?’ এক নাগাড়েপ্রশ্নবাণছুঁড়ে গলা নামিয়ে বৌদি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘মধুর কাছে ছিলিস?’ মধুর ব্যাপারটা বৌদি কি ভাবে জানলো, তখন সেটা পলাশের মনেও আসেনি। কে জানে, হয়তো দুশ্চিন্তায় সজলকে ফোন করেছিল, হয়তো সজলই বলে থাকবে…কিন্তু সেই মুহূর্তে পলাশের মাথা কাজ করছিল না। ওশুধু বলেছিল, ‘চান করে আসি।’

বৌদি নীরবে তাকিয়েছিল, নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিল, ‘ভাত বেড়ে দিই, খাবি তো?’

খাওয়ার সময়ও বৌদি অনেক কিছু জিজ্ঞেস করছিল। পলাশগুম মেরে রইলো, বলল, ‘আমার কিচ্ছু মনে পড়ছে না। আমি একটু ঘুমাবো। দেখি, বিকেলের দিকে যদি কিছু মনে পড়ে…!’ বৌদি ওর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল।

স্টেশনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো মনে পড়ছে। সেদিনের মত আজও তো কিছু মনে পড়ছে না! সজল ভীষণ রাগ করেছিল। দাদা তো অনেকদিন কথাই বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু পলাশ কাউকে বিশ্বাস করাতে পারেনি যে, সত্যিই ওর কিছু মনে নেই। ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম কাঁপিয়ে গমগম করে ট্রেন ঢুকছে। প্রায় ফাঁকা একটা কামরার জানলার ধারে বসে অভ্যাসবশে পকেটে হাত ঢোকায়…ওহ, এ তোনিজের প্যান্টের পকেট নয়! সিগারেটের অভাবে মুখ শুকাচ্ছে। ট্রেনের দুলুনি, জানলা দিয়ে সরে সরে যাওয়া দৃশ্যপট…ঘুম ঘুম পাচ্ছে, কাল কি হয়েছিল, কাল কি হয়েছিল…হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা হাসিমাখা শ্যামলা মুখ…প্রবল একটা নাড়া খেয়ে তন্দ্রা ছিঁড়ে যায়। ভ্যাবলারমতো বসে থাকে পলাশ। গতকাল মনে হচ্ছে শুক্রবার ছিল, রঘুর ঠেক, সেই অল্প বৃষ্টি, কোণার টেবিলের সেই মেয়েটা…চোখাচোখি হতে হাসলো…ব্যাস। তারপর আর কিছু মনে পড়ছে না। তাহলে কি এর পিছনে ঐ বিশেষ মেয়েটার কোন হাত আছে? আচ্ছা, রঘুর ঠেক থেকে বেরিয়ে যখন বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা দিই, তখন কি মেয়েটা পিছন থেকে এসে নাকে ক্লোরোফর্মেভেজানো রুমাল চেপে ধরেছিল? তারপর ওর সঙ্গীসাথীরা আমাকে নিয়ে দূরে কোনও ঝোপেঝাড়ে ফেলে দিয়ে আসে? কিন্তু তাতে কার কি লাভ? আমার পকেটে তো টাকাকড়ি বিশেষ থাকে না। তবে কি শুধু জামাপ্যান্ট নেওয়ার জন্য…ভাবতেই হাসি পায়। কি সব অবাস্তব চিন্তাভাবনা আসছে!

ঘুম ভাঙতেশেষবেলার পড়ন্ত আলো চোখে লাগলো। বৌদি আর টুকাই উদ্বিগ্ন মুখে ওর দিকে তাকিয়ে বসে আছে। টুকাই বলে, ‘কাকাই, তোমার কি হয়েছে? একদিনেই যেন কত রোগা হয়ে গেছ!’ পলাশ ধমক দেয়, ‘এই তুই যা তো! পড়াশুনা নেই তোর?’

বৌদি খুব সন্তর্পণে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস গোপন করে, বলে, ‘পলা, এবার মধুর সাথে মিটমাট করে নে।’ মধুকে পলাশভালোবাসে, একদম ‘দিল আউর জান সে’, ওর বুকের মধ্যে আবার চিনচিন করে ওঠে। মধুর নিষ্পাপ মুখটা মনে পড়ে। আচ্ছা, বৌদি সবটা জানলে কি আর মিটমাটের কথা বলবে? মুখে বলে, ‘বৌদি, চা করো তো, ভালো করে, আদা দিয়ে।’

বাপ-মা মরা মেয়ে মধু তার মুম্বাই প্রবাসী মামার কলকাতার ফ্ল্যাটে থাকে। বৌদির মাসতুতো দিদির মেয়ের বিয়েতে মধুকে প্রথম দেখে পলাশ। সত্যি বলতে কি, ওরকমনিখুঁত সুন্দরী আজকাল বড় একটা দেখা যায় না। যেমন ফিগার, তেমনি মিষ্টি কথাবার্তা, আর প্রথম আলাপেই আপন করে নেওয়া হাসি! পলাশ তো দেখামাত্রই যাকে বলে‘ফিদা’ হয়ে গেল। কিন্তু ও মেয়ে যে পলাশকে পাত্তা দেবে, সেটা স্বপ্নেও ভাবেনি। পলাশের থেকে প্রায় বছর দশেকের ছোট। কলেজে পড়ছে। তনিমা, মানে যার বিয়ে, তারই সঙ্গে, হিস্ট্রি অনার্স ফাইনাল ইয়ার। আলাপের পর ঠিকানা, ফোন নম্বর সবই দিয়েছিল। এরপর অনেকবার অফিস ফেরত ওর কলেজের সামনে গেছে, তারপর রেস্টুরেন্ট, বইমেলা, ভিক্টোরিয়া, অবশেষে একদিন দুপুরবেলা অফিস কেটে সোজা মধুর ফাঁকা ফ্ল্যাটে। মধুর জ্বর হয়েছিল, তাই কদিন কলেজে যায়নি। ওকে দেখতেই আসা। গরমের দুপুর। পলাশঘামছিল। বাড়িতে তখন মধুর কাজের মাসিও নেই। ও নিজেই এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল নিয়ে সোফায়পলাশের পাশে বসেছিল। ‘জ্বর আছে?’ এই বলে বাঁ হাতে জলের গ্লাস ধরে ডান হাতে মধুর কপাল ছুঁয়েছিলপলাশ। তখনই শরীরের ভিতর তিরতির চাপা উত্তেজনা টের পাচ্ছিল। নিস্তব্ধ গ্রীষ্ম দুপুর, ঘড়ির টিকটিক, ফ্যান ঘোরার একটা শব্দ, একেবারে গা ঘেঁষে বসেছিল মধু, একদম ঘরোয়া, একটা ঢিলা সাদা গেঞ্জি আর স্কার্ট, জামার ভিতরে অন্তর্বাস পড়েনি, শ্বাসপ্রশ্বাসের তালে তালেওঠানামা করছে ওর বুক, স্কার্টেরও অনেকখানি উঠে গিয়ে দেখা যাচ্ছে অনাবৃত উরু। জ্বরতপ্ত মধুর গা থেকে একটা পারফিউমের মাদক গন্ধ উঠে আসছে। পলাশের মনে হচ্ছিল ভীষণ কড়া নেশায় ও বুঁদ হয়ে যাচ্ছে। একটু একটু করে ও মধুর গায়ে লেপ্টে বসে। মধুও দেহটাকেএলিয়ে দেয় ওর কাঁধের উপরে। পলাশআগুপিছু না ভেবে মধুর বুকে হাত রেখেছিল। পথ চলতি পাহাড়ি ঝর্ণা যেমন কিছু না বলেই পথিকের গা ভিজিয়ে দেয়, তেমন করে মধু পলাশকেসম্পূর্ণ ভিজিয়েদেয়।তারপর এরকম কতবার! পলাশ মধুকে নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চেয়ে বেশী ভালোবাসে। কিন্তু বিয়ের কথা বললেই মধু এড়িয়ে যায়, ‘আগে এম এ করব, তারপর একটা চাকরি, তারপর বিয়ের কথা ভাববো।’ পলাশ হাসে, ‘ততদিনে আমি তো বুড়ো হয়ে যাবো রে!’ মধু পলাশের ঝাঁকড়া চুল মুঠো করে ধরে হাসতে হাসতে বলে, ‘আমার বুড়োই ভালো।’

সেদিন সিগারেট ফুরিয়ে গিয়েছিল। অফিস পিওন জগাইদাও ছুটিতে। পলাশ নিজেই দুপুরের দিকে সিগারেট কিনতে নীচে বড় রাস্তায় এসেছিল। পরিচিত দোকান থেকে সিগারেট কিনে একটা ধরিয়ে প্যাকেটটা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে রাস্তা ক্রস করছে, ঠিক তখনই সিগনালে দাঁড়িয়ে থাকা বিলাতিমডেলের দামী সাদা গাড়িটার দিকে চোখ আটকে যায়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। গাড়িতে একটা লোকের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে মধু বসে আছে। নিখুঁত ও দামী সাজপোশাক। পলাশ দিন দুপুরে জনব্যাস্ত রাস্তার মাঝখানে নিজেকে কোথায় লুকাবে ভেবে পায় না। মনে হয় যেন এই মুহূর্তে একটা গহ্বর তাকে মাটির তলায় গিলে নিক। বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটা উত্তেজনা আর অস্থিরতা নিয়ে অফিসে ফিরে আসে। বাকি সময়টা একদম মন দিতে পারে না কাজে। অডিট চলছে। সবাই খুব ব্যাস্ত। কেউ পলাশকে অত লক্ষ্য করে না। পলাশের শরীর খারাপ লাগে, মধু কি তাহলে ‘এসকর্ট’? কয়েকদিনের জন্য অন্য শহর বা অন্য দেশ থেকে বিজনেস মিটিঙে আসা বড় বড় বিজনেস ম্যানদের ‘হাই প্রাইস’ মনোরঞ্জনী? এখন যেন মধুর একলা ফ্ল্যাটে থাকা, বিয়ের কথায় আপত্তি, দামী দামী পোশাক সবকিছুর নতুন ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। তিনদিন পলাশ পাগোলের মতো এলোমেলো চিন্তা করে চলে। মধুর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করে না। মধুও ফোন করেনি। অবশেষে একদিন মধুর মুখোমুখি হয় ওর ফ্ল্যাটে। কাটা কাটা শব্দে উচ্চারণ করে, ‘কত দিতে হবে ম্যাডাম? অনেকবার তো ফ্রি সার্ভিস দিয়েছেন!’ মধুকে চুপ করে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখে জ্বালাটা আরও বেড়ে যায়, তীব্র স্বরে উগড়ে দেয় ভিতরের ক্রোধ, ‘তাহলে তুই বেশ্যা?’ আরও অনেক কটু কথা বলেই চলে। মধু কোনও কথার একটাও প্রতিবাদ করে না। অনেকক্ষণ পরে জল ভরা চোখে পলাশের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলে, ‘তোমাকে ভালোবাসি বলেই বিয়ে করতে চাই না। পলাদা, আমাকে ভুলে যাও। একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করো। তুমি সুখী হলে আমি পূজো দেব মায়ের কাছে, বিশ্বাস করো!’ পলাশচিৎকার করে ওঠে, ‘তুই এত কাণ্ডের পর আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিস শালী? তোর মামাকে সব জানাবো আমি।’ মধু একদম শান্ত স্বরে বলে, ‘মামাই তো আমাকে প্রথম নষ্ট করল, এই লাইনে মামাই নামিয়েছে। কাস্টোমার মামাই ঠিক করে। এই ফ্ল্যাটের ভাড়া বাবদঅনেক টাকা দিই প্রত্যেক মাসে।’ দু’হাতে চুল মুঠো করে পলাশ বসে থাকে ঝিম মেরে। অনেকক্ষণ পরে উঠে বেরিয়ে যায়। মধু ওকে পিছু ডাকে না।

তীব্র দহন বুকে নিয়ে পলাশ অফিস করছে, কলিগদের সঙ্গে হেসে কথা বলছে, বাড়িতে দাদা-বৌদি-টুকাই কাউকে কিচ্ছু বুঝতে দেয়নি। শুধু সজল জানে। তাই রঘুর ঠেকে পলাশকে কন্ট্রোল করে, বেশী নেশা করে বেহেড হতে দেয় না। পলাশের এই হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া, ফিরে এসে কিছু মনে করতে না পারা—এই ব্যাপারগুলো হয়েছে মধুর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর থেকেই। ওই দিনের পর থেকে পলাশ আর মধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। মধুও করেনি। সজল শুধু জানে, পলাশের বুকের মধ্যে একটা আগ্নেয়গিরিরঅগ্ন্যুৎপাত চলছে। ও শান্ত ভাবে শুধু পলাশকে আগলে রাখে। এমনকি পলাশের কষ্টটাকেও নিজে ভোগ করতেও চায়, কিন্তু সেটা তো পারে না।

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। অসময়ের ঝড়-ঝঞ্ঝায় শহর বেহাল। ঠাণ্ডাটা যেন ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মতো লাগছে। আজ একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছে সজল। ফোনটা ঝনঝন করে বেজে ওঠে। পরিচিত দুঃসংবাদের আশঙ্কায় বুকটা ঢিপঢিপ করে ওঠে। ফোনের ওপ্রান্তেপলাশের বৌদি কান্নায় ভেঙে পড়েছে, ‘আজও ফেরেনি পলা…’, কথা শেষ করতে পারে না, অঝোরে কাঁদতে থাকে। অনেকক্ষণ বৌদির কান্না শুনতে শুনতে ঠাণ্ডায় না কি দুঃখে না অজানা এক ভয়ে সজলের হাত-পা কাঁপতে থাকে, ফোন রেখে ও চুপচাপশুয়ে পড়ে। পলাশের জন্য বুক খালি করে নিঃশ্বাস পড়ে। ইদানীং পলাশের শরীরটা এতই খারাপ হয়েছে যে ওকে রঘুর ঠেকে যেতে দিতে চায় না সজল। অন্য সময় হলে হয়তো পলাশসজলের কথা শুনত না, নেশা বলে কথা! কিন্তু এখন ওরও মনের জোর নেই। একা একা হাঁটাচলা করতে সাহস পায় না। অসম্ভব দুর্বল হয়ে গেছে। গত আট মাসে ওর প্রায় ছ’কিলো ওজন কমে গেছে। ইতিমধ্যে  আরও বার তিনেকএইরকম রহস্যময় উধাও হয়ে যাওয়া। সজল ছায়ার মতো ওকে অনুসরণ করেও ধরতে পারেনি ঠিক কোন সময় ও গায়েব হয়ে যাচ্ছে। আজ প্রায় দেড় মাস পরে ওরা রঘুর ঠেকে গিয়েছিল। ওখান থেকে বেরিয়ে দু’জন একসঙ্গে বাসে উঠেছে, মাঝখানে সজল নেমে গেল, তার আগে কনডাক্টরকে বিশেষ ভাবে বলে দিয়েছে স্টপেজ এলে পলাশকে নামতে মনে করিয়ে দেওয়ার কথা। কারণ ইদানীং ও যেরকমঅন্যমনস্ক থাকে, তাতে গোলমাল হওয়ার সম্ভাবনা। এখন বৌদির এই ফোন। সজলেরকান্না পায়। ‘ঈশ, কেন ওকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এলাম না!’ ভাবে সজল, তারপর ওর মনে একটা চিন্তা খেলে যায়, এই বৃষ্টি, রঘুর দোকান, শুক্রবার আর পলাশের গায়েব হওয়া—এর মধ্যে কি কোনও কানেকশন আছে? না কি পুরোটাইকাকতালীয়? মনে মনে ফ্ল্যাশব্যাকে দেখে নেয়…নাহ, যতবার গায়েব হয়েছে পলাশ, সবগুলো শুক্রবার ছিল না, সব দিন বৃষ্টিও হয়নি। তবে রঘুর ঠেক থেকে বের হয়েছে প্রত্যেকবারই। নানা রকম চিন্তা করতে করতে এক সময় ঘুম এসে যায়।

শনিবার বিকেলে পলাশের ঘরে বসে চা খেতে খেতে কথা হয়। বৌদি একটু সরে যেতে সজল বলে, ‘মধুর কাছে চল্, আজকে যাবি?’ পলাশ এমন ভাবে তাকায় যেন সজল একটা ক্রিমিনাল অফেন্স করে ফেলেছে। তারপর ধীরে ধীরে শ্বাস নিয়ে বলে, ‘ওর নাম আর করিস না আমার কাছে। ওই ইনফ্যাচুয়েশন্ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছি, তুই কোথায় হেল্প করবি, তা না, আমার ক্ষতি করে দিচ্ছিস। তুই চলে যা।’ সজল বোঝে, এখন পলাশের সঙ্গে অন্যভাবে কথা বলতে হবে। ওকে উত্তেজিত করা ঠিক হবে না। গত কয়েকমাসে অনেকবার ডাক্তার দেখানো হয়েছে। সুগার, প্রেশার সব কিছু নরমাল। অথচ কি চেহারা হয়েছে পলাশের! কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে গেছে, গাল ঢুকে গেছে, চোখের তলায় কালি! সজলের খুব কষ্ট হয়, বুকের মধ্যে মোচড় দেয়। পলাশের যদি কিছু হয়ে যায়! ও ভাবতে পারে না আর। শৈশবের কথা যেদিন থেকে মনে পড়ে, এমন একটা দিনও মনে পড়ে না, যেদিন পলাশকে না দেখে থেকেছে। স্কুল একসাথে, কলেজ একসাথে, এখন অফিসেও একসাথে পাশাপাশি ডেস্কে বসে। অনেকক্ষণ চুপ করে চায়ে চুমুক দেয় দুজন। তারপর সজল বলে, ‘আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবি?’ পলাশ রাগী চোখে তাকাতেই সজল তড়িঘড়ি বলে, ‘আরে না না, মধুর বাড়ির কথা বলছি না! এক জ্যোতিষীর কথা শুনেছি, খুব ভালো বলেন শুনেছি। একবার যাবি? না, এমনি, দেখি কি বলেন? আমিও এসব বিশ্বাস করি না, তুই তো জানিস। কিন্তু তোর এই ব্যাপারটা না, মেনে নিতে পারছি না!’ পলাশ করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘কোথায় বসেন উনি? চল, আজই যাওয়া যা।’ সজল আনন্দে পলাশের দুটো হাত জড়িয়ে ধরে, ‘যাবি তুই? ওঠ তাহলে, জামা-প্যান্ট পড়ে নে,’ একটু ভেবে আবার বলে, ‘পলা, যদি কিছু মনে না করিস, কালকে যে প্যান্ট পড়ে ঘরে ফিরেছিস, সেটাই পড়, দেখ ওর ওয়েভ ভাইব্রেশন থেকে যদি জ্যোতিষী কিছু আঁচ পায়!’ পলাশের ঠোঁটে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটল।

একেবারে সাদামাটা একটা ঘর। মাঝারি আকারের একটা কাঠের টেবিলের দুই দিকে ডাক্তার ও রোগীর মুখোমুখি বসবার মতো করে কাঠের চেয়ার পাতা। এছাড়া আরও দুখানি বেতের চেয়ার রয়েছে ঘরে। টেবিলের উপর জলের গ্লাস ঢাকা দেওয়া, ঘরের জানলা দরজা বন্ধ, ঢুকতেই ধুপের গন্ধ পাওয়া গেল। টেবিলের মাথার উপরে দেওয়ালে বিরাট বড় ফ্রেমে বাঁধানো ধ্যানমগ্ন মহাদেবের ছবি। ঘরের দেখবার মতো ওটাই একটি বস্তু। ওরা নমস্কার করে বসে। ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করেন, কার কাছে শুনলেন? আজকাল বড় একটা বসি না… এসব ভালো জিনিস নয় কি না?

পলাশই বলে, দত্ত-দার কাছে আপনার কথা অনেক শুনেছি। আমি খুব একটা হাত দেখা ফেখায় বিশ্বাস,” পলাশকে থামিয়ে ভদ্রলোক বললেন, কি জানতে এসেছেন?

সেরকম কিছু… আসলে, গলা খাঁকারি দিয়ে পলাশ বলে, সময়টা ভালো যাচ্ছে না।”

ভদ্রলোক কিচ্ছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর খুব ধীরে ধীরে শান্ত ভাবে কথা বলতে শুরু করেন।

জগতে ও জগতের বাইরে এমন অনেক কিছু ঘটে, যার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। আমরা নানা রকম ভাবে সবকিছু ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝবার ও বোঝাবার চেষ্টা করি বটে, কিন্তু সব সময় দুয়ে দুয়ে চার মেলে না। আমাদের বুদ্ধির বাইরেও কিছু থাকে। দেখি আপনার হাত টা।”

পলাশ ডান হাতটা এগিয়ে দেয়। ভদ্রলোক বলেন, দুটো হাত এইভাবে মেলে ধরুন।” উনি ম্যাগনিফাইং গ্লাস নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে পলাশের দুই হাতের রেখা গভীর মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা করেন। তারপর এক সময় চোখ তোলেন। পলাশের স্বভাব, প্রেমে আঘাত ও আরও অনেক কিছু বলে যেতে থাকেন। সজল বলে, আপনার সব কথাই মিলে যাচ্ছে!” ভদ্রলোক রহস্যময় হেসে বলেন, সবকথা জানেন শুধু উনি, মাথার উপর শিবের ছবির দিকে ইঙ্গিত করেন তিনি, তিনি মহাকাল, মানুষের ভূত ভবিষ্যৎ সমস্ত নিয়ন্ত্রণ করছেন। আমাদের কতটুকু ক্ষমতা? যদি হাতের রেখায় কিছু পড়তেও পারি, আপনাকে বলে কি লাভ? যা ঘটবার, তা ঘটবেই।” সজল আবার মাঝখানে কথা বলে, কি ঘটবে? ওকে কি ভূতে পেয়েছে? ও যে কোথায় যায়, মাঝে মাঝে উধাও হয়ে যায়, কিছু মনে করতেই পারে না…।”

ভদ্রলোক চশমা খুলে পিঠ টান করে বসেন। দেখুন, এই পৃথিবীতে আপনি যা দেখতে পাচ্ছেন, সেটুকুই সব নয়। অনেকগুলো প্যারালাল পৃথিবী একসঙ্গে ওভারল্যাপ করে আছে। বেদে সপ্তলোকের কথা বলেছে। ভূ ভুব স্ব মহ জন তপ সত্য—সপ্তলোক। আপনি ভূর্লোকে আছেন। অন্য লোকের অধিবাসীদের সঙ্গে আপনার ইন্টার‍্যাকশন হচ্ছে না। কিম্বা আপনি বুঝতে পারছেন না, কারণ বাকি সব লোকেই বিদেহীর বাস।”

মানে আত্মা? ভূত?

আমরা সব বিদেহ বলতেই ভূত ভাবি। হ্যাঁ, ভূতই বটে। অনেক সূক্ষ্ম দেহী থাকেন, নানা রকম সূক্ষ্ম কামনা বাসনা পূরণের জন্য তাঁরা অনেক সময় এই লোকের জীবের দেহ ব্যবহার করেন। আমাদের মৃত্যুর পর দেহের রন্ধ্র পথে আত্মার নির্গমন হয়। এই দেহ যেন এক রাজপুরী। এই পুরীতে নটি দ্বার থাকে। কিন্তু ঐ দ্বার দিয়ে আপনি আমি স্থূল শরীরে ঢুকতে বা বেরোতে পারব না। মৃত্যুর পরে আমাদের সূক্ষ্ম দেহ, যাকে বলা হয় লিঙ্গশরীর—তা ঐ নয়টি রন্ধ্রের মধ্যে কোনও একটি দিয়ে নির্গত হয়। আর উন্নত যোগী পুরুষরাও এই রন্ধ্র পথে যাতায়াত করতে পারেন। শংকরাচার্যের জীবনীতে গল্প আছে যে, উনি এক রাজার মৃতদেহে প্রবেশ করেছিলেন একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে। এসব নানারকম আছে।”

ওরা ভদ্রলোকের কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিল। এবার পলাশ প্রশ্ন করে, তাহলে আপনি কি বলতে চাইছেন, কোনও অন্য লোকের আত্মা আমার শরীরে ঢুকে পড়ছে, তারপর আমার দেহকে ব্যবহার করে সে কিছু করছে যেটা আমি জানতে পারছি না?

হ্যাঁ, হতেই পারে। অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এটা আপনি প্রমাণ করতে পারবেন না। ডাক্তারি পরীক্ষায়ও কিছু ধরা পড়বে না। আমার কথা বাইরে বেরিয়ে কাউকে যদি বলেন, আমার জেল হতে পারে কুসংস্কার ছড়ানোর অপরাধে, এই বলে উনি হেসে উঠলেন।

সজল বলে, কোন পাথর টাথর পড়লে হয় না? যেটা ওর গায়ে থাকলে অশরীরী আর ওর ভিতরে ঢুকতে পারবে না!

ভদ্রলোক হাসলেন, বাড়ি যান, ভগবানের উপর আস্থা রাখুন। আমি পাথরে বিশ্বাস করি না।”

পলাশ বলে, একটাই প্রশ্ন করব আপনাকে, কোন বিদেহ যদি কয়েক ঘণ্টার জন্য আমার শরীরের উপর কব্জা করে, সে কখন ঢুকছে, টের পাওয়ার কোন উপায় আছে কি?

ভদ্রলোক গম্ভীর ভাবে বললেন, সে কি আপনার দরজায় নক করে ঢুকবে? আত্মা যখন দেহের ভার মুক্ত হয়, তার স্বাধীনতা অনেক বেড়ে যায়। তার আমাদের মতো রান্নাবান্না করে খেতে হয় না, যেখানে খুশী, যখন খুশী সে হাজির হতে পারে, তার সামনে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের ব্যারিয়ার মুছে যায়—একটা বই-এর তিনটে পৃষ্ঠাকে ছিঁড়ে আপনি পাশাপাশি একটা বোর্ডে লাগিয়ে দিন—তাহলে কোনটা অতীত? কোনটা বর্তমান? কোনটা ভবিষ্যৎ? কিছু তফাৎ থাকবে? জেনে রাখুন, এদের কোন মিডিয়াম দরকার হয় না। আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে আলোর রশ্মির মতো এরা আপনার শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তবে, একটা কথা সর্বদা জানবেন, মানসিক ভাবে দুর্বল, শোক ও মোহগ্রস্ত মানুষকে এরা সহজে কব্জা করতে পারে। অবশ্যই মজবুত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কাউকে চট করে কব্জা করতে পারবে না, তাই না?

ভদ্রলোক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, পলাশ জিজ্ঞাসা করল, আপনার ফিজ?

ভদ্রলোক হাসলেন, হাত জোড় করে বললেন, মাফ করবেন, ওসব ছেড়ে দিয়েছি। আপনারা পরিচিত লোকের থ্রু দিয়ে এসেছেন, তাই…আর আমার নিজের একটা শখও রয়ে গেছে!

এর তিনদিন পরে পলাশের দাদার ফোন পেয়ে মাঝ রাত্রে ট্যাক্সি নিয়ে সজল ছুটে যায় পিয়ারলেস হসপিটালে। বৌদি আর টুকাই বাইরে ছিল। সজলকে দেখেই বৌদি কাঁদতে শুরু করল। দাদার সঙ্গে সজল ঢুকল পলাশের কেবিনে। পলাশ ঘুমাচ্ছে। আবছা আলোয় ওকে ঠিক একটা মৃতদেহের মতো দেখতে লাগছে। সজলের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। দাদা চাপা গলায় বলেন, ‘পুলিশ অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছে, টোটালি নেকেড ছিল, এখনও সেন্স আসেনি। একটা জলাজঙ্গলে পড়েছিল। পুলিশ নাইট পেট্রলে বেরিয়ে দেখতে পেয়ে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। এখানে ভাগ্যিস বংকুদা ছিল! বংকুদাকে চিনিস তো? আমাদের পাশের পাড়ায় থাকে, আজ ওনার ওটি-তে নাইট শিফট ডিউটি ছিল। কি ভাবে ওনার চোখে পড়ে গেছে, আইডেন্টিফাই করে আমাকে খবর দিয়েছে।” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে তমালদা থামেন, একটু দম নিয়ে বলেন, পলাটার কি হল বল তো?” সজল তমালদার পিঠের দিক থেকে হাত রাখে কাঁধে, ওইটুকু সহানুভূতির স্পর্শে লম্বা চওড়া মানুষটা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন।

বাইরে আসে সজল। ভোর হচ্ছে। হাসপাতালে দিন-রাত্রি সমান। সেই স্যালাইনের বোতল, সেই নার্সদের ছোটাছুটি, পেশেন্ট-এর আত্মীয়স্বজনের উদ্বিগ্ন মুখ—ওদিকে রাস্তায় গাড়ি চলছে, চায়ের দোকানে চা ফুটছে, তমালদা বৌদি আর টুকাইকে নিয়ে ঘরে চলে গেছেন একটু আগে। সজল ওদের বলেছে, সে আরো কিছুক্ষণ থাকবে। পলাশের জ্ঞান ফিরলে দেখে তবে যাবে। কিছুক্ষণ আগে খবর পেয়েছে, জ্ঞান ফিরেছে। পলাশ এখন ঘুমাচ্ছে। সজল বাইরে থেকে দেখেছে। তোবড়ানো গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চাদরের উপর থেকেও যেন বুকের পাঁজর গোনা যাচ্ছে। কি যে হয়ে গেল! সজল মনে মনে ভাবে, মানুষ মানুষকে ভালোবেসে কত কী উপহার দেয়। পলা রে, বন্ধু আমার, তোকে যদি তোর সুস্থ জীবনটা ফিরিয়ে দিতে পারতাম! তোর শরীরে প্রবেশ করে কোন বিদেহী আত্মা কী বাসনা চরিতার্থ করছে, তাকে আমি আমার শরীরে থাকতে দেব, তুই ভাল হয়ে ওঠ!” চোখের জল মুছে বাড়ি যায় সজল। যন্ত্রবৎ সব কাজ সেরে অফিসে যায়। পলাশের ইদানীংকার খবর সবাই জেনে গেছে। তাই ওদের প্রশ্নের উত্তরে বলতে হল, পলাশ এখন হাসপাতালে। কদিন অফিস আসবে না। পাশের শূন্য চেয়ারটার দিকে বারবার চোখ যায় সজলের। বুক ঠেলে কান্না উঠে আসে। অফিসের পর সন্ধ্যাবেলা একলাই হাঁটা দেয় রঘুর দোকানের উদ্দেশ্যে। রঘুদা বলে, কি ব্যাপার গো দাদা? আজ হরিহরের একজনা নাই যে?” সজল ম্লান ভাবে বলে, ওর খুব শরীর খারাপ। হাসপাতালে।”

তা তুমি যাবে না সেখেনে?

নাহ, ভাল্লাগছে না। তুমি আমার ব্র্যান্ড আর গ্লাস নিয়ে এসো।”

রঘুদা সামনে বোতল আর গ্লাস রেখে অন্য খদ্দেরের কাছে যায়। আজ সারাদিন কিছু খাওয়াও হয়নি সজলের, জমাট কান্না ভরা বুকের মধ্যে দিয়ে তরল নেশা আগুনের মতো জ্বলতে জ্বলতে নামছে। সজল মাথা তুলে উদাস দৃষ্টি মেলে দেয়। হঠাৎ এক শ্যামবর্ণা তরুণীর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায়। যেন তীরের ফলার মতো চোখে কি বিঁধে যায়। এক পলকের জন্য সজলের মাথাটা ঘুরে যায়। পর মুহূর্তেই মাথা ঝাঁকিয়ে সামনে তাকিয়ে আর মেয়েটাকে দেখতে পায় না।

পলাশের জ্ঞান এসেছিল ভোরেই। দুপুরে পথ্য পেয়েছে। বিকেলের দিকে অনেকটা সুস্থ বোধ করে। বৌদিকে বারবার জিজ্ঞেস করে, ‘সজল এলো না এখনো?’

সেদিন সজল আর আসে না। 
error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত