| 17 জুলাই 2024
Categories
চলচ্চিত্র ফিচার্ড পোস্ট বিনোদন

ফিচার: বার্ষিকীর আলোয় সত্যজিৎ ও ঋতুপর্ণ । শকুন্তলা চৌধুরী

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

একজন জন্মগ্রহণ করেছিলেন মে মাসের প্রথমে, আরেকজন বিদায়গ্রহণ করেছিলেন মে মাসের শেষে। ১৯৯২ সালে, এক দিগন্তে অস্ত গেলেন এক অসামান্য সৃজনী-প্রতিভা – আরেক দিগন্তে উদয় হল নতুন এক সূর্যের, হাতে সৃজনের প্রথম আলো (“হীরের আংটি”) নিয়ে। ঠিক যেন ‘তোমার হল শুরু, আমার হল সারা’। …  সত্যজিৎ ও ঋতুপর্ণ – তাঁদের দু’জনকে নিয়ে মিল-অমিলের ‘এমনি বহে ধারা’। একজন পরিপূর্ণ জীবনের ঘাটে ঘাটে রেখে গেছেন আলোকোজ্জ্বল স্বাক্ষর, আরেকজন অ-পরিপূর্ণ জীবনের পথে পথে সৃষ্টি করেছেন পায়ে চলার গভীর ছাপ। দু’টি জীবনই অসাধারণ, দুই সৃজনীই প্রতিভাময়। তাই তাঁদের সৃষ্টিকে তুলনার নিরিখে দেখা খুবই কঠিন। তবু সেই কঠিন কাজটিকে তাত্ত্বিক আলোচনায় সহজ করে আনার চেষ্টা করছি আজ, ঋতুপর্ণর মৃত্যুর এক দশক পরে আর সত্যজিতের মৃত্যুর তিন দশক পার করে। 

সত্যজিৎ এবং ঋতুপর্ণকে নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা শুরু করতে গিয়ে প্রথমেই মনে আসে একটি সুতোর কথা – ‘কমন্ থ্রেড্’।সেই সুতোটি রবীন্দ্রনাথ – যাঁর প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর, দু’জনের জীবনেই। দু’জনেই রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে ছবি করেছেন, তবে তাদের সংখ্যা খুব বেশী নয়। তবু রবীন্দ্রনাথ যেন তাঁদের দু’জনের সৃজনেই আবহসঙ্গীতের কাজ করে গেছেন, সদাসর্বদা। সেই আবহসঙ্গীত ঠিক কানে শোনার নয়, অনুভবের। মাধ্যম আলাদা হলেও, রবীন্দ্রনাথের কোমল অথচ অমোঘ বার্তা-শৈলী স্পষ্টতই প্রভাব ফেলেছে সত্যজিৎ ও ঋতুপর্ণের পরিশীলিত সৃজনে। তাই তাঁদের চলচ্চিত্রে দেখি ‘মেসেজ’ আছে কিন্তু ‘মেসেজের’ উগ্রতা নেই, বাস্তব আছে কিন্তু নান্দনিক পরিসীমার বাইরে নয়। এই পরিমিতি বোধটা মননশীল দর্শককে একটা স্বস্তি দেয়, আরাম দেয় – কোথায় যেন ইঙ্গিত দেয় রবীন্দ্র-ঘরাণার। তাই তাঁদের চলচ্চিত্র শেষ হয়েও শেষ হয় না – দর্শককে ভাবায়, এক মধুর সঙ্গীতের মতো হৃদয়ে গুণগুণ করে বহুদিন।

১৯৬১ সালে তৈরী ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ তথ্যচিত্রটি ছাড়াও, সত্যজিৎ রবীন্দ্রনাথের গল্পের ওপর তিনটি বাণিজ্যিক ছবি বানিয়েছিলেন -‘তিনকন্যা’(১৯৬১), ‘চারুলতা’(১৯৬৪) এবং ‘ঘরে-বাইরে’(১৯৮৪)। ‘তিনকন্যা’ অবশ্য তিনটি ছোট গল্পের ওপর বানানো তিনটি আলাদা ছবি, সুতরাং সেই অর্থে সত্যজিৎ মোট পাঁচটি ছবি রবীন্দ্রনাথের গল্পের ওপর ভিত্তি করে বানিয়েছিলেন। ঋতুপর্ণ জীবনের শেষভাগে, ২০১৩ সালে, বানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের জীবন অবলম্বনে ‘জীবনস্মৃতি’ – তথ্যচিত্র হলেও যাকে বলা চলে তুলি দিয়ে আঁকা জীবনের ছবি। এ’ছাড়া রবীন্দ্রনাথের গল্প অবলম্বনে ঋতুপর্ণ বানিয়েছিলেন দু’টি বাণিজ্যিক ছবি – ‘নৌকাডুবি’(২০০৩) এবং ‘চোখের বালি’(২০১০)। ‘তিনকন্যা’ এবং ‘চারুলতা’ সত্যজিতের প্রথম জীবনের ছবি, যেখানে তিনি প্রায় আক্ষরিক অর্থেই রবীন্দ্রনাথের স্ক্রিপ্টকে অনুসরণ করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর তখনও পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়নি, রবীন্দ্র-ভাবনায় ভাবিত দর্শককূল  সাদরে গ্রহণ করেছিল ছবিদু’টি। ‘ঘরে-বাইরে’তে সত্যজিৎ সামান্যভাবে বেরিয়ে এসেছিলেন রাবীন্দ্রিক পরিবেশনা থেকে – ছবিটি কিছু সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিল। পরের শতকে তৈরী ঋতুপর্ণর দু’টি বাণিজ্যিক ছবিতেই ছিল কিছু স্বাধীন ব্যাখ্যা এবং উপস্থাপনা – কিন্তু দু’টি ছবিই বাণিজ্যিক ভাবে সফল হয়েছিল। একি শুধুই সময়ের পথ ধরে বিবর্তন, নাকি পরিবেশন শৈলীর উৎকর্ষতা? 

এই প্রসঙ্গে স্বভাবতই মনে আসে সত্যজিৎ ও ঋতুপর্ণের আরও কয়েকটি ছবির কথা, যেই ছবিগুলো সর্বতোভাবেই ছিল উগ্র নাগরিক সমস্যার চিন্তামূলক দলিল। কিন্তু তাদের পরিবেশনায় ছিল এক রাবীন্দ্রিক সংযম, যা সেই ছবিগুলোকে যুক্ত করেছিল বিরল শিল্পের তালিকায়। ‘মহানগর’ (১৯৬৩), ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ (১৯৭০), ‘জন অরণ্য’ (১৯৭৬) – মোটামুটি বারোবছরের ব্যবধানে তৈরী সত্যজিতের এই তিনটি ছবি ছিল তৎকালীন নাগরিক সমাজের অব্যর্থ চিত্রণ। উল্টোদিকে ‘উনিশে এপ্রিল’ (১৯৯৪), ‘দহন’ (১৯৯৭) এবং ‘অসুখ’ (১৯৯৯) – পাঁচবছরের অন্তর্বর্তীকালে তৈরী ঋতুপর্ণের এই ছবি তিনটিও ছিল সমসাময়িক নাগরিক জীবনের নিখুঁত প্রতিফলন। সত্যজিৎ দেখিয়েছিলেন নাগরিক জীবনের ক্রমবর্ধমান (অর্থনৈতিক) অ-স্থিতিশীলতা, ঋতুপর্ণ দেখিয়েছেন মানবিক সম্পর্কের ওপর এই সামাজিক স্থিতিহীনতা ও তার আনুষঙ্গিক পরিবর্তনের প্রভাব। লক্ষ্যণীয় এই যে সত্যজিৎ দেখিয়েছেন মূলতঃ পুরুষের চোখ দিয়ে, আর ঋতুপর্ণ দেখিয়েছেন মূলতঃ নারীর চোখ দিয়ে। সত্যজিতের ছবিতে সর্বব্যাপী সামাজিক দ্বন্দ্ব উঠে আসে ব্যক্তিগত জীবনে, ঋতুপর্ণের ছবিতে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে পরে বৃহত্তর সামাজিক অবক্ষয়ের প্রবাহে। সম্পূর্ণ আলাদা পটভূমি এবং পরিবেশনা – তবু কোথায় যেন এক সূত্রে বাঁধা এই ছবিগুলো বিষয় এবং মানের দিক দিয়ে সমতার দাবী রাখে। 

আরেকটি ধারা, যেটি সত্যজিৎ এবং ঋতুপর্ণ দু’জনের ছবিতেই উপস্থিত, সেটি হল হাল্কা সামাজিক গল্পের ছবি। গণশত্রু (১৯৮৯), আগন্তুক (১৯৯০), শাখা-প্রশাখা (১৯৯১) – পরপর তিনটি ছবি বানিয়েছিলেন সত্যজিৎ এই ধারায়, যেখানে শুধু গল্পের জন্যই গল্প বলা। খুব জোরালো ভাবে কোনো “মেসেজ” এই ছবিতে তিনি দেওয়ার চেষ্টা করেননি বলেই মনে হয়, তেমনভাবে কোনো সংগ্রামের কথাও বলেননি (যে ‘সংগ্রাম’ সত্যজিতের অন্যান্য বহু চলচ্চিত্রে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত)। মনুষ্যচরিত্রের গল্প হিসাবে তিনটিই সফল। প্রায় একই কথা বলা চলে ঋতুপর্ণের তিনটি সমমানের ছবির সম্বন্ধে – ‘বাড়ীওয়ালী’(২০০০), ‘উৎসব’(২০০০), ‘তিতলি’(২০০২)। শান্ত পটভূমিকায় তৈরী, মনুষ্যচরিত্রের সফল গল্প। 

এবার আসা যাক্ প্রাপ্তবয়স্ক গোয়েন্দা গল্পের তুলনামূলক আলোচনায়। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে সত্যজিৎ বানিয়েছিলেন উত্তমকুমার অভিনীত ‘চিড়িয়াখানা’(১৯৬৭), এই শতকের গোড়ায় ঋতুপর্ণ বানিয়েছিলেন রাখী-শর্মিলার যুগলবন্দী ‘শুভ মহরত’(২০০৩)। মধ্যে পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছরের ব্যবধান। দু’টি চলচ্চিত্রই তারকাখচিত এবং নিপুণ অভিনয়ে সমৃদ্ধ। দু’টি চলচ্চিত্রেরই গল্প তৈরী হয়েছে প্রখ্যাত লেখকদের হাতে – তাই কাহিনীর বুনট দু’টিতেই প্রায় নিখুঁত। একটিতে পুরুষ গোয়েন্দা, আরেকটিতে নারী গোয়েন্দা। এ’ তো গেল শুধু বাহ্যিক তফাত – ঋতুপর্ণের ছবিতে নারীচরিত্ররা সবসময়েই বেশী প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু তাছাড়া আর কি কিছু আছে? যদি ধরে নেওয়া যায় যে ‘সাসপেন্স’ ধরে রাখাটাই সফল গোয়েন্দা-ছবির আসল মাপকাঠি, তাহলে এটা বলা বোধহয় ভুল হবে না যে ‘শুভ মহরত’ সেই কাজটি অনেক বেশী ভালভাবে করেছিল। ফেলুদা’ সিরিজকে এই আলোচনার বাইরে রাখছি, কারণ ঐ সিরিজে প্রাপ্তবয়স্কদের ‘সাসপেন্স’-এর চেয়ে সম্ভবত বেশী গুরুত্ব পেয়েছিল অ-প্রাপ্তবয়স্কদের মনোরঞ্জন।

ফেলুদা’র কথা বলতে গেলে চলে আসে এই ধারার বেশ কয়েকটি ছবির কথা। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে, বাংলা চলচ্চিত্রে ‘ফেলুদা’ সিরিজ’ এবং ‘গুপী-বাঘা সিরিজ’ সত্যজিতের অসামান্য সংযোজন – শিশুদের ছবি হয়েও যারা পুরো শিশুদের ছবি নয়। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’(১৯৬৯), ‘সোনার কেল্লা’(১৯৭৪), ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’(১৯৭৯), ‘হীরক রাজার দেশে’(১৯৮০) – এই ছবিগুলো অ-প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বানানো হলেও, পরিবেশনার উৎকর্ষে প্রাপ্তবয়স্কদেরও টেনে আনে গল্পের স্রোতে। ঋতুপর্ণ সেইদিক দিয়ে নিঃসন্দেহে পিছিয়ে। ‘খেলা’(২০০৮) ছবিটি বাদ দিলে, অ-প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে বা অ-প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ঋতুপর্ণ কোনো ছবি বানাননি বললেই চলে। সত্যজিৎ যে অর্থে এবং যে উৎকর্ষে নাবালকদের ছবি বানাতেন, ঋতুপর্ণ ঠিক সেইখানটি ছুঁতে পারেননি বা ছুঁতে চাননি – এটা বোধহয় দ্বিধাহীন ভাবেই বলা চলে। এই জায়গাটিতে নিঃসন্দেহে তাঁদের কোনো ‘ওভারল্যাপ’ নেই। 

তাঁদের ‘ওভারল্যাপ’ আছে অন্যান্য ধারার বহু চলচ্চিত্রে, যেগুলো নিয়ে মিল ও অমিলের এবং মানের তাত্ত্বিক আলোচনা চলছে এবং চলবে। যদিও সত্যজিৎ গত শতাব্দীর এবং ঋতুপর্ণ দুই শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকলেও বলা চলে একবিংশ শতাব্দীর – মনন ও সৃজনের উৎকর্ষে তাঁরা চলে এসেছেন কাছাকাছি।

সত্যজিৎ ও ঋতুপর্ণের চলচ্চিত্রের অমিলের কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে আসে “চরিত্রচিত্রণ”। ‘চারুলতা’ এবং ‘তিনকন্যা’ বাদ দিলে, সত্যজিতের ছবিতে নারী মূলতঃ পার্শ্বচরিত্র বা বড়োজোর সহচরিত্র। নারীচরিত্রের গভীরে সত্যজিৎ যদি বা কখনো ঢুকেছেন, রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে ঢুকেছেন – যে রবীন্দ্রনাথ নারীচরিত্র এতোটাই বুঝতেন যে সেই যুগে বসেও লিখতে পেরেছিলেন ‘স্ত্রীর পত্র’র মতো অসাধারণ একটি ছোটগল্প। রবীন্দ্রনাথের বাইরে, নারীচরিত্র নিয়ে সত্যজিৎ আর বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেননি। তাঁর ছবিতে নারী এসেছে গল্পের প্রয়োজনে। উল্টোদিকে, ঋতুপর্ণের ছবি নারী-চরিত্র প্রধান। তিনি নারীদের নিয়ে ভেবেছেন, নারীদের নিয়ে লিখেছেন, নারীদের চোখ দিয়ে দেখেছেন এবং নারীদের নিয়ে ছবি বানিয়েছেন। ঋতুপর্ণের বেশীরভাগ ছবিতেই নারীর এই শৈল্পিক প্রাধান্য চোখে পড়ে – কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে।

সত্যজিৎ ও ঋতুপর্ণের চলচ্চিত্রের আরেকটি লক্ষ্যণীয় তফাত হল “পটভূমিকা” বা “আঙ্গিক” -ছবিটি কিসের বা কাদের কথা বলছে। সত্যজিতের বহু (প্রায় ২৯ শতাংশ বাণিজ্যিক) ছবিতেই একটি সৎ চরিত্রের স্থিতিহীনতার এবং বাঁচার সংগ্রাম প্রকট – প্রায়শই অর্থনৈতিক, কখনো বা মূল্যবোধের। এর কিছুটা হয়তো বা তাঁর চেতনার আয়নায় সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন, কিছুটা হয়তো বা তাঁর নিজের প্রথম জীবনের সংগ্রামের প্রতিফলন। এই অবিরাম সঙ্ঘর্ষ এবং স্থিতিহীনতাবোধ সত্যজিতের সৃষ্টির একটা বড়ো অংশ – অন্য কোনো আরেকটি ধারায় তাঁর এত ছবি দেখা যায়নি। বহু ছবিই তিনি করেছেন নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তদের নিয়ে, যাঁদের জীবন বলতে সংগ্রামই বোঝায়। কখনো বা ছবির তালিকায় ঢুকে পড়ে পড়তি জমিদারের এবং অস্তমিত নবাবের গল্প, হাতে ‘অর্থনৈতিক সংগ্রামের’ ছাড়পত্র নিয়ে। সত্যজিতের ছবিতে শিল্পের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনা। গণশত্রু, আগন্তুক, শাখা-প্রশাখা – শেষজীবনের এই তিনটি হাল্কা সামাজিক গল্প ছাড়া, সত্যজিৎ তাঁর আশপাশের শহুরে স্বচ্ছল পরিবারদের নিয়ে খুব বেশী ছবি তৈরী করেননি। ঋতুপর্ণের ছবি সম্বন্ধে আবার ঠিক তার উল্টোটাই প্রযোজ্য – তিনি বেশীরভাগ (প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশী বাণিজ্যিক) ছবিতেই তুলে ধরেছেন তাঁর চারপাশে ঘোরা আধুনিক-মনস্ক, শিক্ষিত, স্বচ্ছল পরিবারের (শহুরে) চরিত্রদের। এই কাহিনীগুলোর চরিত্ররা যেন তাঁর খুব চেনা – কারণ তিনি নিজেও ছিলেন তাঁদেরই একজন। বলা বাহুল্য যে এইসব চরিত্র চিত্রণে ঋতুপর্ণের সাফল্য তর্কাতীত। এটা পরিষ্কার যে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো সংগ্রামই ঋতুপর্ণের ছবির মূল কথা নয়, যদিও সামাজিক পরিবর্তনের ঢেউয়ে সম্পর্কের ওঠাপড়া তিনি অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে ধরেছেন তাঁর একাধিক ছবিতে। এককথায় বলতে গেলে, ঋতুপর্ণের ছবিতে সমাজচেতনা প্রায় কখনোই ব্যক্তিচেতনাকে ছাপিয়ে ওঠেনি। তাঁর শিল্পে, ব্যক্তি মিশেছেন বৃহত্তর সমাজে শুধুমাত্র সম্পর্কের টানাপোড়েনে এবং নিজস্ব অনুভবে।

আরেকটি জায়গায় সত্যজিৎ ও ঋতুপর্ণের তফাত সহজেই ধরা পড়ে – সেটি হল “লয়”। সত্যজিতের ছবিতে ঘটনাবলী তুলনামূলক ভাবে বিলম্বিত লয়ে চলে, যদিও দর্শকের মনোযোগ তাতে মুহূর্তের জন্যও ব্যাহত হয় না। হয়তো যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়েই, ঋতুপর্ণের ছবি সাধারণত চলে একটু দ্রুত লয়ে – বা বলা যেতে পারে, মধ্যম-লয়ে। সত্যজিৎ ছবি বানাতে শুরু করেছিলেন গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে, ঋতুপর্ণ নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় – প্রায় চল্লিশ বছরের ব্যবধান বড়ো কম নয়। জীবন যখন হয়ে ওঠে সদা-চঞ্চল দ্রুতগতি, সমসাময়িক চলচ্চিত্রে তার ছায়া পড়াই স্বাভাবিক। তবে তার সঙ্গেই এসে পড়ে আরেকটি আলোচনা – রবীন্দ্রসঙ্গীতের হাত ধরে। সাবেকী রবীন্দ্রসঙ্গীতের মূল সুরটি হল ধ্রুপদী বিলম্বিত লয়, কিন্তু তা আজও প্রাসঙ্গিক – হয়তো বা ‘নবসুরে রবীন্দ্রনাথ’-এর চেয়ে অনেক বেশী জনপ্রিয়। অনেকের মতে সত্যজিতের চলচ্চিত্র সম্পর্কেও সে কথা প্রযোজ্য, কারণ তা’ “ক্লাসিক”। এবং সেই অর্থে, ঋতুপর্ণের চলচ্চিত্র “ক্লাসিক” নয় – কারণ তা’ কেবলমাত্র মধ্যম-লয়ে কথিত সমসাময়িকতার জীবন-দর্পণ।…                                                                                                  

আসলে ঋতুপর্ণ সত্যজিতের ‘কপি’ হতে চান নি, তিনি হতে চেয়েছিলেন সত্যজিৎ-উত্তর একবিংশ শতাব্দীর গল্পকার। সত্যজিতের মতো সময়ও পান নি তিনি নিজের ‘ব্র্যাণ্ড’ গড়ে তোলার – মাত্রই কুড়ি-একুশ বছরের সৃষ্টিশীল জীবন তাঁর। সত্যজিৎ ভারতীয় তথা বাংলা চলচ্চিত্রে একটা নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিলেন – ইটালিয়ান নিও-রিয়্যালিজমের অনুপ্রেরণায় টলিউডে প্রথম তৈরী করেছিলেন “প্যারালাল সিনেমা”, দেখিয়েছিলেন তারকা-বিহীন আমজনতার ছবি। ঋতুপর্ণ বাংলা চলচ্চিত্রের মরা গাঙে বান এনেছিলেন তারকা-খচিত সার্বজনীন ছবি বানিয়ে – মননশীল (বাঙালী) দর্শককে আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন সিনেমাহলে, প্রযোজকদের উৎসাহিত করেছিলেন টলিউডের ছবিতে লগ্নি করতে। সত্যজিৎ বিদেশী ছবিতে অনুপ্রাণিত হলেও, বিদেশী গল্পের ছায়ায় চলচ্চিত্র তৈরী করেননি। ঋতুপর্ণ বিদেশী গল্পকে স্বদেশী ধাঁচে ফেলে একাধিক ছবি বানিয়েছিলেন। সত্যজিৎ বানিয়েছিলেন চিরকালীন ‘পথের পাঁচালী’, যা ভারতীয় সিনেমাকে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক পরিচিতি। ঋতুপর্ণ ‘অপু ট্রিলজি’ বানাননি, তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের পর্দাটাকেই ছিঁড়ে ফেলে আন্তর্জাতিক প্রবাহে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’র ত্রিধারা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।…অন্য শতাব্দী, অন্য মূল্যবোধ, অন্য লয়, অন্য মাপকাঠি। তাই এক কথায় “সত্যজিৎ না ঋতুপর্ণ” এই প্রসঙ্গে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া একটু কঠিন বলেই মনে হয় – সময়ই বলবে ঋতুপর্ণের চলচ্চিত্র কালজয়ী কিনা, বিষয় নির্বাচনে “ক্লাসিক” কিনা। তবে এটা বোধহয় নিঃসন্দেহেই বলা চলে যে কারিগরি এবং কাহিনী পরিবেশনার উৎকর্ষে, সত্যজিৎ এবং ঋতুপর্ণর চলচ্চিত্ররা প্রায় সর্বত্রই সমতার দাবী রাখে। তাই একটা সতর্কবাণী বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না – যে বাম-ঘেঁষা উন্নাসিকতায় বাঙালী বুদ্ধিজীবিরা একদিন উত্তমকুমারের প্রতিভাকে অবজ্ঞা করার ভুল করেছিলেন (কেন, না উত্তমকুমার মৃণাল-সত্যজিতের ছবির বাঁধা নায়ক নন), সেই ধরণের কোনো ছুঁৎমার্গ দিয়ে তাঁরা যেন আজ ঋতুপর্ণকে মাপতে না বসেন (কেন, না ঋতুপর্ণ…)! 

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত