| 22 জুন 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: ফুলের নামে নাম । দেবদ্যুতি রায়

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

এক

ঠিক সামনে সোজা হয়ে শুয়ে থাকা মানুষটার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকে সনফুল। মসৃণ সড়কের উপর ছুটে চলা অ্যাম্বুলেন্সে ঝাঁকুনি তেমন না হলেও তার সারাগা কাঁপিয়ে কান্না আসতে চায়। কিন্তু দুই ছেলে, জামাই আর ছোটো মেয়ের উপস্থিতিতে এমন করে কেঁদে ফেলতে কোথায় যেন বাঁধে। সনফুলনেছা তাই দাঁত কামড়ে পাথরচোখে তাকিয়ে থাকে মৃদু মৃদু দোল খাওয়াপ্রায় অচেতন শরীরটার দিকে। এই মানুষটার সঙ্গেই জীবনের ত্রিশটা বছর সে পার করে দিয়েছে সেটা বিশ্বাস হতে চায় না এখন। এই মানুষটার সঙ্গেই শেরপুরের বুড়িরডাবর গ্রামেশখানেক বিঘা জমি, চার চারটা ছেলেমেয়ে, সাতটা নাতি নাতনি নিয়ে তার ভরভরন্ত সংসার! সনফুলের মনে হতে থাকে এর সবই মিথ্যে। রমজান মিয়া নামের এই মৃতবৎ মানুষটাকে সে আসলেকখনো চেনেনি, এই মানুষ তার জীবনে একেবারেই অচেনা আগন্তুক।

সকাল থেকে এই বিকাল চারটা পর্যন্ত খাওয়া বলতে গেলে হয়নি কিছুই। সনফুলের হঠাৎ তীব্র পানির পিপাসা বোধ হয়। ঘোরলাগা চোখে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরটা দ্রুত জরিপ করে সে, ওই তো লিজার হাতে পানির বোতল। নিশ্চয়ই রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে গরমে কাহিল হয়ে পানি কিনেছিলো মেয়েটা।

-ওই লিজা, পানির বোতলটা দে।

ওর নিজের কণ্ঠের শীতলতা নিজেকেই চমকে দেয় যেন। লিজা তড়িঘড়ি করে মার দিকে পানির বোতলটা এগিয়ে দেয়। আধা লিটারের পানির বোতল প্রায় পুরোটাই একবারে খালি করে ফেলে সনফুল।লিজার পাশে বসা ওর জামাই শফিকুল জিজ্ঞেস করে-

বিস্কুট আচে আম্মা। খাবিন?

-না।

সে মাথা নেড়ে মেয়ে জামাইকে আর কিছু না খাওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। ক্ষুধার কোনো অনুভূতি নিজের মধ্যে টের পাচ্ছে না সে এখন। অ্যাম্বুলেন্স এই গতিতে চললে আর রাস্তায় কোনো জ্যামে না পড়লে ওরা আর আধাঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি পৌঁছাতে পারবে। তারপর নাহয় দেখা যাবে খাওয়া দাওয়ার ব্যাপার। আপাতত সনফুল চোখ বন্ধ করে ঝিমায়। আর ওর বন্ধ চোখের সামনে বায়োস্কোপের মতোন অনবরত ঘুরতে থাকে অজস্র ছবি।

রেজিস্ট্রি অফিসেরঅফিসার ছোটোখাটো ভদ্রমহিলা রমজানকেবারবার জিজ্ঞেস করছিলেন সনফুল তার কী হয়। তার দিকে ঘোলা চোখে তাকিয়েবারবার মাথা নেড়ে নেড়ে রমজানউত্তর দিয়েছিলো সনফুল তার চাচাতো বোন। একবার তো সনফুলকে জিজ্ঞেসও করেছিলো, তোর নামটা কী রে বইন!

সেই কথা শুনে তখন মরমে মরে যেতে ইচ্ছে করেছিল সনফুলের। অফিসার, চারপাশে জড়ো হওয়া আরো জনাদশেক মানুষ, সবচেয়ে বড়ো কথা নিজের ছেলেমেয়ে, জামাইদের সামনে নিজেকে বড়ো অপমানিত লেগেছিলোতার। ইমরান কয়েকবার বাপকে বলার চেষ্টা করেছিল, আব্বা, আম্মারে তুমি চিনতে পারতেছ না? রমজান কিন্তু তার কথায় গা করারও দরকার মনে করেনি। অথচ ইমরান, আসাদুল, লিজা এমনকী দুই জামাই শফিকুল আর রহিদুলকেও ঠিকঠাক চিনতে পারছিললোকটা!

দলিলটা শেষ পর্যন্ত করা যায়নি। কারণ ছেলেমেয়েদের চিনতে পারা ছাড়া রমজান সেই অফিসারের আর কোনো প্রশ্নেরই সদুত্তর দিতে পারেনি শেষ পর্যন্ত। তার মাথা যে আজকাল কাজ করে না, সেটা সবাই বুঝে গিয়েছিলো সহজেই তাই দলিলটা ফেরত এসেছে। অথচ জমি বিক্রি করা টাকাটা এই সময়ে খুব দরকার ছিলো তাদের। রমজানের চিকিৎসার পেছনে পানির মতো টাকা বের হয়ে যাচ্ছে। দুদিন পর পর ক্লিনিকে বা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে তাকে আজকাল। হাসপাতাল ব্যাপারটায় রমজান এতোই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে আজ যখন তাকে অফিসার জিজ্ঞেস করছিলেন সে কোথায় এসেছে, রমজান উত্তর দিয়েছিল, শেরপুর হাসপাতাল!

এই কথা মনে পড়তেই সনফুলের ঘুম ঘুম ভাবটা আচমকাই কেটে যায়। হাসপাতাল, ছেলেমেয়ে, নিজের অসুস্থতা সব মনে থাকলো রমজানের, মনে থাকলো না শুধু তার কথা। গতত্রিশ বছরেরপুরোটা সময় নিজের কথা না ভেবে যার পেছনে কাটিয়ে দিলো, আজ অগুনতি মানুষের সামনে সেই লোককিনা বলে বসলো সে তার চাচাতো বোন! সনফুল মেনে নিতো রমজানের অসুস্থতার কথা ভেবে কিন্তু কী করে মানবে? তাকে চাচাতো বোন বলে পরিচয় করিয়ে দেবারপর মুহূর্তেই ছেলেমেয়েদের সবার নাম নির্ভুল বলে দিয়েছিল সে। তাহলে? শুধু কি তাই? রমজানের স্ত্রীর নাম কী, সেই প্রশ্নের জবাবে কী বলেছিল লোকটা? একটুও দ্বিধা না করে রমজান উত্তর দিয়েছিল, হোসনেআরা!

সেই নাম শুনে ছেলেমেয়ে, জামাই সবাই চমকে তাকিয়েছিল সনফুলের দিকে আর সে একা দলাপাকানো কষ্ট গিলে ফেলতে ফেলতে তাকিয়েছিল সেই অফিসার ভদ্রমহিলার দিকে। না, তিনি নির্বিকার ছিলেন হোসনে আরার নাম শুনে, কে জানে, এমন ঘটনা হয়তো তার কাছে নতুন নয়।

কিন্তু এমন ঘটনা সনফুলের কাছে এতোই নতুন আর অপ্রত্যাশিত যে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছিল তার, এই লোকের স্ত্রীর নাম হোসনে আরা! আর সে সনফুলনেছা, বাপের নাম আলেপউদ্দিন মন্ডল, মায়ের নাম হালিমা বেগম, তার স্বামীর নাম কী? সে কার স্ত্রী তাহলে? এমনকী রমজানের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যেও স্ত্রী হিসেবে তার নাম রয়েছে কারণ পরিচয়পত্র তৈরি হবার বহুকাল আগে হোসনে আরা এইদুনিয়া ছেড়েই চলে গেছে আর রমজানের ঘরে সনফুলের পেটে জন্ম নিয়ে বড়োসড়ো হয়ে গেছে চার চারটা সন্তান! অথচ অফিসারের প্রশ্নের উত্তরে রমজান বেমালুম তার নাম ভুলে গেলো, সেই কতো বছর আগে মরে ভূত হয়ে যাওয়া হোসনে আরার নাম বলে দিলো!

লিজা সেই সময় তার গা গেঁষে এসেছিলো, কাঁধের ওপর একটা হাত রেখেছিলো যত্নে। কিন্তু সেই হাত নীরবে সরিয়ে দিয়েছিলোসে। না না, কারো সহানুভূতি কিংবা ভালোবাসার দরকার তার নেই। সাতচল্লিশ বছরের শক্ত শরীরটা সে একাই বয়ে নিতে পারে, বইতে পারে সংসারের নানা আঘাত সয়ে সয়ে এতোটা পথ আসা মনটাকেও।

গাড়িটা মূল রাস্তা থেকে নেমে যায় নতুন বানানো মাটির রাস্তাটাতে। এখানে এই বাঙালি নদীর উপরেসেতুতৈরির কাজ চলছে বলে ছোট্টো আধখানা চাঁদের মতো মাটির পথটুকু তৈরি করা হয়েছে কিছুদিন আগে। এই পথ দিয়ে সনফুল বছর দুয়েক আগে ননদের বাড়ি গিয়েছিলো, তখন এই জায়গায় ছিলোরেলব্রিজের মতোন বেইলি সেতু। স্থায়ী সেতুটার কাজ হলেই এই ছোটো রাস্তাটুকুর কাজ শেষ হয়ে যাবে, ভেঙে ফেলা হবে একে, যেভাবে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এতোকালের ব্যবহৃত বেইলি সেতুটাও। উপযোগিতা শেষ হয়ে এলে সবকিছু একদিন অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে আর মানুষ মরিয়া হয়ে পড়ে সেই অপ্রয়োজনটুকু সরিয়ে দিতে! কী আশ্চর্য!সনফুলের মনে হয়, রমজানের জীবনেও হয়তো তার দরকার ফুরিয়েছে এতোদিনে!

গাড়ির ভেতরের মানুষগুলো অস্বাভাবিক চুপচাপ। সনফুলের থমথমে ভাব দেখে সেই তখন থেকে চুপ মেরে গেছে সবাই। চলন্ত গাড়ির হালকা দুলুনিতেরমজানের শুয়ে থাকা শরীর মৃদু মৃদু দুলতে থাকে, মাথার কাছে ইমরান আর পায়ের কাছটায় রহিদুল বসে আছে যাতে অসুস্থ মানুষটা পড়ে না যায়। চরম ‍বিতৃষ্ণায় সনফুলের এখনসেই দৃশ্যটাও দেখতে ইচ্ছে করে না। যে মানুষটা পুরো জগত সংসারের কাছে তাকে তুচ্ছ করে দিয়েছে, সেই মানুষটার অসুস্থতাও তার মনের বরফ গলাতে পারে না এই মুহূর্তে। তার মনে হয় বাড়ি যাবার পর সে একটু আরাম করে ঘুমাবে, দীর্ঘ ক্লান্তির পর ওটুকু আরাম তার দরকার।

রমজানের পা সরে যেতে গেলে রহিদুল সেটা ঠিক করে দেয়, তারপর নিজের মাথাটা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে বলে- আর বেশি দেরি নাই, আব্বা! আর মিচ্চুনি গেলেই বাড়ি।

ঘোলাটে চোখ মেলে রমজান পাশ ফিরে তাকিয়ে কী যেন খোঁজে। আজ দুপুরের আগে হলে সনফুলের মনে হতো রমজান তাকেই খুঁজছে। সত্যি বলতে গেলে প্রায় অচল এইলোকটা তো আসলেও ওকে ছাড়া অন্য কাউকে খুঁজতো না এতোদিন। কোনোরকমে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতে পারা মানুষটা যার হাঁটতে চলতে খেতে ঘুমাতে প্রাকৃতিক কাজ সারতে সে ছাড়া আর কোনো গতি নেই, তাকে ছাড়া আর কাকেই বা খোঁজার ছিলো রমজানের?নাকি খুঁজতো সে অন্য কাউকে? হোসনে আরাকে?কে জানে। আজ দুপুরের পর থেকে শুধু এই মানুষটা না, গোটা দুনিয়ার ওপর থেকেই বিশ্বাস, ভরসা সব উঠে যাচ্ছে তার।

মুখ খারাপ করে একটা গালি দিয়ে ড্রাইভার হঠাৎ শক্ত করে ব্রেক কষে, গাড়িটা বড়ো একটা ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে যায়। সনফুল তাকিয়ে দেখে সামনে এক ছেলে রাস্তা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে, গাড়ির সামনে পড়ে দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলো বোধহয়। আচমকা ধাক্কায় ইমরান আরোযত্নে ধরে রাখে বাপের মাথা।

ছেলেটা রাস্তা থেকে সরে গেলে অ্যাম্বুলেন্সটা আবার চলতে শুরু করে। আর কিছুটা পথ গেলেই শেরপুর বাজার পড়বে। তারপর আর নয় দশ কিলোমিটার গেলেই তাদের গ্রাম, বুড়িরডাবর। সব মিলিয়ে আর মিনিট কুড়ি লাগার কথা বাড়ি পৌঁছাতে। অথচসনফুলের মনে হয় এই পথটুকু যেন ফুরাতেই চাইছে না।

দুই

সকাল বেলায় সনফুলেরমনটা আজ দারুণ ফুরফুরে লাগছে। জমি বিক্রি বিষয়ক দুশ্চিন্তা, রমজানের অসুস্থতার বাড়বাড়ন্ত কোনোকিছুই তার মনে কোনো ছাপ ফেলতে পারছে না। কাঁচকলায় শিং মাছের ঝোল আর শুধুশুধু আলুঘাঁটি রান্না করে খাইয়েছে রমজানকে। লোকটা মজা করেই খেয়েছে। নিরামিষ আলুঘাঁটি খেতে তেমন অভ্যস্ত না হলেও আজ ছেলেমেয়েসবাই খেয়ে বেশ প্রশংসাই করলো। মন ফুরফুরে থাকলে সনফুলের হাতে যে জাদু খোলে তা অবশ্য জানা কথা।

দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় মাস কয়েক আগে একটা চৌকিতে বিছানা পাতা হয়েছে রমজানের জন্য। পরপর দুটো স্ট্রোক হবার পর থেকে ঘরের ভেতর শুতে পারে না সে। উঠানে বসেলিজার থেকে চুলে তেল দিয়ে নিতে নিতে আরামে চোখ বুজবার আগে সনফুল দক্ষিণের বারান্দায় একবার তাকায়। চৌকির ওপরে দেবে যাওয়া বিছানায় শোয়া মানুষটা বেঁচে আছে কিনা তা তার নিশ্চল শরীর দেখে বোঝবার উপায় নেই। মানুষটাকেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে লিজার গল্পে মন দেয় সে। আধাপাকা চুলের অলিতে গলিতেলিজার তেল চুপচুপে আঙুল আদরবিলি কাটে। লিজা কতো গল্প করে যায়- শ্বশুরবাড়ির গল্প, দেবরের নতুন মিষ্টি বউটার গল্প, নিজের ছোটো ছেলে মুসার দুষ্টুমির গল্প বলতে বলতে লিজা খিলখিলিয়ে হাসে। এ হাসি সনফুলরবড়ো আরাম আরাম লাগে, অনেকদিন থেকে এ বাড়িতেহাসির খিলখিল শব্দ শোনেনি কেউ। এ বাড়ির অনেকদিনের জমে থাকা গুমোট হাওয়াটা যেন বাড়ির ছোটো মেয়ের হাসির শব্দে কেটে যায়। সেই গুমোট কাটানো বাতাসে দোল খেতে খেতে আচমকাই হাসি থামিয়ে গম্ভীর গলায় লিজা প্রশ্ন করে বসে- আ্চ্চা আম্মা, বুবুর কি এডা উচিত হচে? আব্বার যে এতো অসুখ, দুলাভাইও কাল আলো কিন্তু বুবু এ্যানাও আলো না, কামডা কি সে ঠিক করিচ্চে?

বড়ো মেয়ে রহিমার এখনও বাপকে দেখতে না আসাটা আসলে শোভনীয় কিনা সে তর্ক করে নিজের মেজাজটা খারাপ করতে ইচ্ছে করে না তার। সনফুল তাই মেয়েকে নিচু গলায় বলে- বাদ দে তো অহিমার কতা। মুসার বয়স তো চার পার হোলো, তুই আরেকটা ছোইললিবু না?

লিজা সে কথার জবাব দেয় না। মায়ের চুলে আগের মতোই বিলির আদর কাটতে থাকে। এ যুগের ছেলেমেয়েদের মন বোঝা দায়। একটা বাচ্চার পর আরেকটা বাচ্চা নেবে কিনা সেটা ভাবতেই বছরের পর বছর পার করে ফেলে এরা। অথচ তার ছেলেমেয়েরা সব একজন আরেকজনের চেয়ে সর্বোচ্চ দুই বছরের ছোটো-বড়ো। তবু লিজার অনাগ্রহে সে বিষয় নিয়ে কথা বাড়ায় না সে। আসলে এই সকালের সুন্দর ফুরফুরে মেজাজটা সে কিছুতেই নষ্ট হতে দিতে চায় না। এমন নির্ভার সুন্দর সময় সে শেষ কবে কাটিয়েছে মনে পড়ে না তার। এই হঠাৎ পাওয়া সুন্দর সময়টুকু আঁচলের খুঁটে বেঁধে রাখতে মন চায় তার।

লিজার আম্মা আম্মা ডাকে চোখ মেলে সে জিজ্ঞেস করে- কী হলো?

-আব্বা ডাকিচ্চেব্যান, আম্মা। হাত তুললো একবার।

দক্ষিণের বারান্দায় রমজানের শরীর আবার নিশ্চল, হাত সব সময় যেমন থাকে তেমনই শরীরের পাশেই শোয়ানো এখন। হাত পেঁচিয়ে তেল চুপচুপে চুলগুলো একটা খোঁপা করে নিয়ে সনফুলসেদিকে যায়। রমজানের কথা আবার অস্পষ্ট হয়ে গেছে এখন, শ্লেষ্মা উঠে বুজে গেছে গলা। ঘরঘরে গলায় সে জানায় তার প্রস্রাব করতে হবে। অশক্ত শরীরটাকে ধরে বিছানা থেকে নামিয়ে বারান্দার পাশে নিয়ে যায় সে। তার শরীরের ওপর রমজানের পুরো শরীরের ভার। এই শরীর, এই মানুষটার ভার বছরের পর বছর বয়ে চলা সনফুলের আজও সেই ভার বেশি মনে হয় না। রমজানকে আবার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বারান্দার পাশে রাখা বালতি থেকে কয়েক মগ পানি সেই দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাবের ওপর ঢেলে দেয় সে।

তিড়িংবিড়িং নাচতে নাচতে সামনে চলে আসা মুসাকে কোলে নিয়ে হিহি করে হাসে সনফুল। দুই ছেলের বাচ্চারা কোলে নেয়ার মতো ছোটো নেই বলে আজকাল বাচ্চাকাচ্চাকে আদর করে কোলে তোলা হয় না তার। নাতিকে কোলে নিয়ে দোল দিতে দিতে সনফুল ছড়া কাটে- খোকন খোকন ডাক পাড়ি/ খোকন মোদের কার বাড়ি/ আয় রে খোকন ঘরে আয়/ দুধ মাকা ভাত কাকে খায়।

নানির কোলে চাঁদের কণা ছেলে ফিকফিক করে হাসে। বলে- দুদমাকা ভাত মজা না, নানি!

তাই? সনফুল নাতির চুলে সুড়সুড়ি দেয়।- কী মজা নাগে তোমার, খোকন?

-পোটেটো চিপ মজা। জুশ মজা। চকলেত মজা।

নাতির কথা শুনে হাসতে হাসতে চোখে পানি আসে সনফুলের। ছোটোবেলায় দুধভাত খেতে কী যে ভালোবাসত সে! মা গরম সরতোলা দুধ দিয়ে ভালো করে ভাত চটকে খাইয়ে দিতো ওকে রোজ। মায়ের চিকন লম্বা লম্বা আঙুলে মাখানো সেই ভাত ছিলো আদরের অপর নাম। সেই ভাতের লোকমার ঘ্রাণ এই মুহূর্তে এই রোগপীড়িত বাড়ির বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। নাতির পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সনফুল সেই ঘ্রাণসারা শরীরে মেখে নেয়। সেই ঘ্রাণের রেশ ধরে সামনে এসে দাঁড়ায় আলেপউদ্দিন নামেরসফেদ দাঁড়িওলা আদরমাখা একটা মুখ, সেই মুখের হাসির ফাঁকে ছড়া উপচে পড়ে- সনফুল সনফুল, ফুলের নামে নাম/ সনফুল মা আমার, আদর করিলাম…

আব্বার মুখে এই ছড়া শুনলেই তেড়েফুড়ে আসতো কদম, ওর ছোটোভাই। গাল ফুলিয়ে টলটলে চোখে আব্বাকে বলতো- হামার নামও তো ফুলের নামে আব্বা, কই হামাক নিয়া তো তুমি ছড়া বলো না!

আব্বা কদমের কথা শুনে হাহা করে হাসতো আর আদর করে দিতো ছেলেকে। সেই হাসির হাহা শব্দ মনে পড়ে আজ সনফুলের চোখে পানি গড়ায়। আব্বা নামের মানুষটাকে কতোদিন চোখের দেখা দেখেনি সে! কতো জন্ম থেকে মায়ের হাতে দুধমাখা ভাতের লোকমা খেতে পারেনি। এই সংসারের জঞ্জাল টানতে টানতে, রমজান মিয়া আর চার চারটা ছেলেমেয়ের ভার নিতে নিতে সনফুল ভুলে গিয়েছিল তার নিজের কথা। ফুলের নামে নাম মানুষটার রং শুকিয়ে কখন ধূসর হয়ে গেছে তা সে নিজেও টের পায়নি। চোখ বেয়ে অঝোরে নেমে আসা পানি সে হাতের পিঠে মুছে নেয়। অতিরিক্ত ডায়াবেটিস আর শরীরের ব্যথার জন্য আব্বা আর বাড়ি থেকে বেরোতে পারে না, আম্মাও তাকে ছেড়ে আসতে পারে না কোথাও। দুলাভাইকে দেখতে এসেছিল কদম কয়েকদিন আগে।

মুসার ঘুম পেয়েছে মনে হয়। নানির কাঁধে মাথা দিয়ে সেও ও করতে থাকে। লিজাকে ডেকে মুসাকে তার কোলে দেয় সে। তারপর বলে- লিজা, হামি এ্যানা তোর নানির বাড়ি যামু। কয় দিন থাকমু।

বাবার শরীরের এই অবস্থায় মায়ের নানাবাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্তে লিজা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সেই অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে সনফুল বলে ওঠে- হামার বাপোকো হামি ম্যালাদিন দেকিনি, লিজা।

মেয়ের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করে ঘরের ভেতরে ঢুকে যায় সে। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের পর তার জীবনে হঠাৎই আগন্তুক হয়ে ওঠা রমজান মিয়ার অসুস্থতা আজ আর তাকে একমুহূর্তও ভাবায় না। বরং তার কানে দূর থেকে এক সুর ভেসে আসে- সনফুল সনফুল, ফুলের নামে নাম, সনফুল মা আমার আদর করিলাম…

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত