| 20 মে 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য ভ্রমণ: মোখার সঙ্গে মোলাকাত । শৌভিক রায়

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

 

সাত মে সকাল সাড়ে নটায় যখন পোর্ট ব্লেয়ারে নামলাম, আকাশ তখন ঝকঝকে নীল। মিনি বে’র ন্যাভাল কোয়ার্টারের ফাঁকফোকর দিয়ে স্বচ্ছ জলের সমুদ্র দেখে ওখানকার লোকদের সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল।

 

আস্তানা ছিল কাপুরদের হোম স্টে। ফিনিক্স বে’র মওলানা আজাদ রোডের ধারে এই বাড়িটি শতাব্দী প্রাচীন। পুরোনো আন্দামান যেন জড়িয়ে রয়েছে বাড়িটিকে। বাড়ির নাম সিভিউ দেখে বিস্মিত হতেই, মিসেস কাপুর হেসে জানালেন, বহুতল হয়ে এখন আর কিছুই দেখা যায় না। আগে তিন-চারশ মিটারের মধ্যে খেলা করত সমুদ্র।

 

মে মাসের এই গরমে, মোচা যখন চোখ রাঙাচ্ছে, আন্দামান যাচ্ছি শুনে অনেকেই মানা করেছিল। কিন্তু চিরদিন তো উল্টোটাই করে এসেছি। সঙ্গী মহিলাটিও তাই। অবশ্য ঘূর্ণিঝড়ে সমুদ্র কীরকম মারাত্মক হয় সেটা দেখবার একটা চাপা ইচ্ছেও ছিল। কিন্তু সেল ফোনে মৎসজীবীদের সমুদ্রে যেতে সাবধান করা আর দুই এক জায়গায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার মেসেজ ছাড়া ঝড়ের কিছুই বুঝতে পারিনি আজ সকালেও।

 

বরং প্রথম দুদিনে ফটফটে রোদে চুটিয়ে পোর্ট ব্লেয়ারের আশেপাশের দ্বীপগুলি ঘুরে নিয়েছি। তাপমাত্রা খাতায় কলমে ৩২ ডিগ্রি ছিল, কিন্তু ‘ফিল’ ছিল আটত্রিশের কাছাকাছি। গরমে ক্লান্ত মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা বর্ষীয়ান কুলকার্নি দম্পতি একগাল হেসে বলছিলেন, “ময়েশ্চার জাদা, ইস লিয়ে থক গয়ে।”

 

আর্দ্রতা যে বেশি সেটি অবশ্য বুঝতে পারছিলাম নিজের ঘেমো অবস্থা দেখে। কিন্তু ঝড়ের বিন্দুমাত্র চিহ্ন পাইনি এই দুদিন। নিম্নচাপ ঘনীভূত হলে এরকম গরম হয় শুনেছি। হয়ত সেটাই ছিল পূর্বাভাস।

 

অসহ্য গরমের পর গতকাল সকালে একটু বৃষ্টি পেলাম। মেঘের ডাক শুনলাম দুই একবার। কিন্তু সেসব অতি সাধারণ। সাড়ে সাতটায় পোর্ট ব্লেয়ার থেকে হ্যাভলক (স্বরাজ দ্বীপ) আসার দুই ঘণ্টার জলপথে বরং ভেসেল এত দুলছিল যে, অনেকে জানালার ধার থেকে উঠে মাঝে চলে এলেন। বাকি সব একই। সারা রাস্তাতেই মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি খেলা। গত দুদিনের তুলনায় নীল সমুদ্র কিছুটা ঘোলাটে।

 

হ্যাভলক ঝিরিঝিরি বৃষ্টি দিয়ে স্বাগত জানালেও ঘন মেঘ ছিল না। শরতের পেঁজা তুলোর মতোই এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিল তারা আকাশের ক্যানভাসে। হ্যাভলকের বাসিন্দারা অবশ্য অপেক্ষা করে ছিলেন বৃষ্টি নামার। তাহলে নাকি গরম কমবে। যদি মোচা আসে? “ঝড় সহ্য করার অভ্যেস আছে। জীবনের ঝড়ের কাছে কী এমন কঠিন সে?” সহজ দর্শন তাদের। কিন্তু ঝড় এলে তো ক্ষতি। কিছু করার নেই। মেনে নিতে হবে সেটাই। তাছাড়াও এটি হল উৎসস্থল। হাওয়া বইতে পারে। বৃষ্টি হতে পারে। জলপথ চলাচল বন্ধ থাকতে পারে। এর বেশি খুব কিছু হবে না। নিশ্চিন্ত এখানকার স্থানীয়রা।

 

 

 

ব্রিটিশ জেনারেল স্যার হেনরি হ্যাভলকের নামে পরিচিত এই দ্বীপ আজ স্বরাজ দ্বীপ বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদি ২০১৮ সালে দ্বীপের নতুন নামকরণ করেন। এই নামকরণের ইতিহাস অবশ্য লুকিয়ে ১৯৪৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে স্বাধীন ঘোষণা করার বার্তায়।

‘রিচিস আর্কিপেলাগো’র অন্যতম বৃহৎ এই দ্বীপটি লম্বায় ১৮ কিমি, চওড়ায় ৮ কিমি। দ্বীপের কোস্টলাইন হল ৫৮.৫ কিমি। অন্যান্য দ্বীপের মতো এটিও টিলা আর জঙ্গল অধ্যুষিত। তবে জঙ্গলে কোনও হিংস্র প্রাণী নেই। বাড়িঘরগুলি ইতস্তত ছড়ানো। মাঝে প্রচুর ফাঁকা জায়গা।

কিন্তু রিচিস আর্কিপেলাগো ব্যাপারটি কী? আর্কিপেলাগো বলতে বোঝায় ছোট ছোট দ্বীপের ক্লাস্টারকে। ব্রিটিশ মেরিন সার্ভেয়ার জন রিচি দুই দশক ধরে আন্দামান ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে প্রথম আন্দামান ও নিকোবর সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য তাঁর এই অসাধারণ কাজ সে আমলে বিশেষ পাত্তা পায়নি। হতাশ মানুষটি ১৭৮৭ সালে নিজের দেশে ফিরে যান। আর কী পরিহাস, তার ঠিক বছর দুই পরে তাঁরই দেখানো দ্বীপপুঞ্জে পেনাল সেটেলমেন্ট তৈরি করতে পা রাখে ব্রিটিশরা।

হ্যাভলক দ্বীপে আমাদের আস্তানা হল ডলফিন রিসোর্টে। আধা-সরকারি এই বিরাট রিসোর্টটির ব্যবস্থাপনা অতুলনীয়। বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি হওয়া রিসোর্টে বিভিন্ন ধরণের কটেজ রয়েছে। আছে রেস্টুরেন্ট, বার, অ্যাসেম্বলি হল আর নিজস্ব বিচ। সম্পূর্ণ রিসোর্ট নারকেল বাগিচায় ছাওয়া। তা বাদেও আছে নানা ধরণের গাছ, ফুল। ঝুনো নারকেল পড়ে রয়েছে সর্বত্র। কেউ তাকিয়েও দেখছে না। ব্যাগপত্র রেখে দৌড়লাম নিজেদের রিসোর্টের বিচে। সবুজ পান্নার মতো জল। জোয়ারের সময় বলে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। একদিকে মিহি বালি আর অন্য দিকে শক্ত মাটি। সময় যে কোনদিক দিয়ে কেটে গেল টেরও পেলাম না!

 

ঠিক করাই ছিল রাধানগর বিচে অনেকটা সময় কাটাব। দেখব সানসেট। হ্যাভলকের এই বিচটি ২০০৪ সালে টাইম পত্রিকার বিচারে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বিচের মর্যাদা পেয়েছে। পৃথিবীর সেরা দশটি বিচের অন্যতম এটি। এছাড়াও ২০২০ সালে পেয়েছে অত্যন্ত মর্যাদাকর ব্লু ফ্ল্যাগ বিচের তকমা। Foundation for Environmental Education থেকে প্রদত্ত এই পুরস্কারের ক্ষেত্রে জলের কোয়ালিটি, পরিবেশ সম্পর্কিত তথ্য, পরিবেশ রক্ষা এবং সুরক্ষা ও সার্ভিস ইত্যাদি দিকগুলি দেখা হয়। যেসব জায়গায় স্থানীয় কমিউনিটি নিজেদের প্রচেষ্টায় কোনও বিচকে প্রোমোট করে, তারাই এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।

রাধানগর বিচের বিশালত্বের মাঝে মুহূর্তেই হারিয়ে গেলাম। উত্তরের দিকে জঙ্গল আর টিলা আর সামনে বিরাট বেলাভূমি ও সমুদ্র। তার রঙ কখনও নীল হচ্ছে, কখনও সবুজ। ঢেউ ভাঙছে খুব মৃদু লয়ে। আবার কখনও বিরাট বিরাট ঢেউ আছড়ে পড়ছে নিজেদের খুশি মতো। দক্ষিণের দিকে কিছু রক আর টিলার এগিয়ে আসা অংশ। সেটা পার করেও একই রকম চঞ্চল সমুদ্র। দুই কিমি লম্বা এই বিচের ট্রপিক্যাল অরণ্যও অসাধারণ।

একটা গাছের গুঁড়ি দেখে জাঁকিয়ে বসলাম। লোকজন খুব কিছু নেই। তবু তার মধ্যে অস্ট্রিয়া থেকে আসা বারবারা নামের এক তরুণীর সঙ্গে আমার সঙ্গী মহিলাটির ভাব হয়ে গেল। হাত ধরাধরি করে খানিকক্ষণ দুজনে ঘুরে ফিরেও বেরালো। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি প্রতিটি মুহূর্ত নিংড়ে নিলাম! এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। এর কোনও তুলনাই হয় না!

সাড়ে নয়টার মধ্যে ডিনার হয়ে গেলেও, রিসোর্টের বিচে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। রাতের সমুদ্রের একটা অন্যরকম মাদকতা আছে। বিরাট বিরাট রকের গায়ে ধাক্কা খেয়ে জল যখন ছড়িয়ে পড়ে, আধা-অন্ধকারে তার রূপ আলাদা হয়ে যায়! সঙ্গে রয়েছে সমুদ্রের নিজস্ব সঙ্গীত। সেই গান যে শুনেছে সে মরেছে!

 

দশ মে সূর্যোদয়ের আগেই উঠেছিলাম। দেখি সমুদ্র অনেকটা দূরে সরে গেছে। ভোরের আকাশ বেশ পরিষ্কার আর ঝকঝকে। অদ্ভুত এক মায়াময় পরিবেশ। সকালের নরম আলোয় হ্যাভলককে মনে হচ্ছিল স্বর্গ যেন! রিসোর্টটিকেও অপূর্ব লাগছে। নিজেদের মতো বেশ খানিকটা সময় কাটানো গেল রিসোর্টের বিচে বসে আর মাটিতে পড়ে থাকা নারকেল কুড়িয়ে।

 

ঝটপট রেডি হয়ে চলে গেলাম কালাপাথর বিচে। আগেই ঠিক ছিল, এলিফ্যান্ট বিচ দেখব না। ওই বিচে হাতি রাখা থাকলেও সেগুলি বুনো নয়। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের পোষ মানা। ডুয়ার্সে বড় হয়ে ওঠা ও উত্তরবঙ্গে থাকবার সুবাদে হাতি প্রাণীটির সঙ্গে এমনিতেই বিশেষ পরিচয় রয়েছে। নতুন করে আর দেখতে চাইনি তাই। তার চেয়ে চললাম কালাপাথর বিচে।

 

কালাপাথর বিচের কথা প্রথম শুনেছিলাম ছোট ভাই প্রসূনের কাছে। নিজে দেখে বুঝলাম এক বর্ণ বাড়িয়ে বলেনি ও। সত্যিই পিকচার পোস্ট কার্ডের মতো এই বিচ। ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এখানে সমুদ্রের সঙ্গে মিলে এমন শিল্প সৃষ্টি করেছে যে, তার দ্বিতীয় উদাহরণ একটিও নেই। আর সমুদ্রের পান্না সবুজ চোখে বিভ্রম ঘটেছে মুহুর্মুহ। এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

 

বসে বসে দেখছি সেসব। কোচবিহার থেকে ফোন এলো। টিভিতে দেখাচ্ছে সামুদ্রিক ঝড় মোখা চোখ রাঙাচ্ছে। আমরা কেমন আছি! দিব্যি রোদ। দারুণ সুন্দর চারদিক। হাসিই পেলো। ঝটপট ছবি তুলে পাঠিয়ে দিলাম।

 

বৃষ্টি শুরু হল বেলা এগারোটায়। সমুদ্রও সামান্য অশান্ত হল। সমুদ্রে বৃষ্টির অন্য রূপ। অনবদ্য লাগছে। রং পাল্টে গেল জলের। একটু ঘোলা, একটু আলাদা। কিন্তু দুরন্ত চারধার। ম্যানগ্রোভ, রক, সমুদ্র আর বৃষ্টি…..এক অনবদ্য কম্বিনেশন!

 

একটু পরেই পেলাম খারাপ খবরটা। মোখা তাণ্ডব শুরু করেছে। দ্বীপে বসে বোঝা না গেলেও সমুদ্র নাকি উত্তাল। অতএব পোর্ট ব্লেয়ার থেকে কোনও ক্রুজ আসেনি। হ্যাভলক থেকেও জলযান ছাড়বার অনুমতি মেলেনি। সাধারণত হ্যাভলক থেকে দফায় দফায় নিল যাওয়ার বোট মেলে। কিন্তু নিল দ্বীপ ওপেন সি তে হওয়ায় সেখানে সমুদ্র উত্তাল। হ্যাভলক খানিকটা খাঁড়ির মধ্যে।

মাথায় হাত পড়ল। ভাই রুদ্রর মুখে শুনে শুনে নিল সম্পর্কে আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু শুধুমাত্র নিলের জন্য এতদিন অপেক্ষা করা বোকামি। কেননা পরশু আমার যাওয়ার কথা ডিগলিপুর। যে কোনও ভাবে আগামীকাল পোর্ট ব্লেয়ার পৌঁছতেই হবে। কাল সকালে আবহাওয়া ঠিক হলে না হয় নিল ছুঁয়ে পোর্ট ব্লেয়ার চলে যাব। থাকলাম না নিলে। সেরকম হলে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে দিন এসে দিন ফিরে যাব। এসব নানা ভাবনার মধ্যেই খবর এলো দিন তিনেকের মধ্যে নিলে যাওয়ার অনুমতি আর পাওয়া যাবে না!

কী করব, না করব বুঝতে পারছি না। সাহায্য করল অনন্ত। আমি ঠিক ট্যুর অপারেটরের সাজানো সূচিতে না ঘুরলেও, হোটেল বুকিং আর গাড়ির জন্য সাহায্য নিচ্ছিলাম। হ্যাভলকের বাঙালি তরুণ অনন্ত সেরকমই একজন। যাহোক বিকেলের দিকে সমুদ্রের আবহাওয়া একটু ভাল হওয়ায় পোর্ট ব্লেয়ার থেকে নওটিকা সহ আরও একটি ক্রুজ এলো।

কখনও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি, কখনও হালকা রোদ আর মেঘ এরকমই চলছিল। বুঝবার কোনও উপায় নেই মাঝ সমুদ্রে কী চলছে। যাহোক অনন্ত আমাদের ব্যবস্থা করে দিল। এমনিতে আমাদের টিকিট ছিল হ্যাভলক থেকে নিল আর নিল থেকে পোর্ট ব্লেয়ার। মাঝে নিলে এক রাত থাকা। হ্যাভলক-নিল টিকিট ক্যানসেল হচ্ছে। কিন্তু নতুন করে টিকিট কাটবার দরকার নেই। ওই টিকিটেই হয়ে যাবে। কেননা নিলে আগামী তিন চারদিন কোনও ভেসেল যাবে না।

আমাদের ভেসেল নওটিকায় জানালার ধারে বসলাম। নিল দেখতে পেলাম না বলে মন বিষন্ন হয়ে রয়েছে। তবে এই মুহুর্তের পরিস্থিতি বিচারে পোর্ট ব্লেয়ার ফেরাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

 

 

 

মিনিট দশেকের মধ্যে মাঝ-সমুদ্রে এসে পড়লাম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক ক্রুজে বসে টের পাচ্ছিলাম সমুদ্রে প্রলয় চলছে। হাওয়ার প্রবল বেগ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

আমাদের সমান্তরাল চলছে আর একটি ক্রুজ। খানিক পর শুরু হল প্রবল দুলুনি! একতলা দেড় তলা বাড়ির সমান উঁচু এক একটি ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করল ক্রুজের গায়ে। খোলামকুচির মতো একবার ঢেউয়ের ওপরে উঠছি, মুহূর্তেই ধপ করে নিচে নামছি। ঢেউ কখনও ঢেকে দিচ্ছে ডাবল ডেকার ক্রুজকে। আমাদের সঙ্গে থাকা ক্রুজটি পিছিয়ে গেছে। অথবা ফিরে গেছে।

অবর্ণনীয় অবস্থা। জানালার ধারে বসেছি বলে সমুদ্রের অবস্থাটা ভাল করে বুঝতে পারছিলাম। কোথায় সেই গাঢ় নীল অথবা পান্না সবুজ সমুদ্র! বরং কুচক্রির ঘোলাটে চোখের মতো তার রঙ। দু’হাত তুলে বিপুল জলরাশি সে ছুঁড়ে দিচ্ছে আমাদের দিকে। রীতিমতো ছেলেখেলা করছে।

বাতাস আর সমুদ্রের মিলিত গর্জনে ক্রুজের আওয়াজ চাপা পড়ে গেছে। ঢেউ ওপরে উঠে যেন থাপ্পড় মারছে ভেসেলের মাথায়। টালমাটাল অবস্থা। এ ওর গায়ে পড়ছে। বিলাস বহুল ক্রুজের স্মার্ট টিভি থেকে শুরু করে সব কিছু বন্ধ। শুধু পরিত্রাহি চিৎকার। আমার চোখে শুধু পুত্রের মুখ ভাসছে! যে অবস্থা তাতে আর উপায় নেই। আজ আর বাঁচব না। সলিল সমাধি হবে বুঝতে পারছি। থর থর করে কাঁপছে নওটিকা। অন্ধকারও ঘনিয়ে এসেছে। ক্রুজের নিচে থেকেও বিকট যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে আসছে।

এরপর বোধহয় শুরু হল আরও বেশি তাণ্ডব। এক মুহুর্ত থেমে নেই ক্রুজের দুলুনি। সমুদ্র আরও মারাত্মক। কোনও ব্রেকার নেই। শুধু ঢেউ আর ঢেউ। আর এক একটা ঢেউয়ের কী বিরাট উচ্চতা! কল্পনা করা যায় না। প্রবল অভিঘাতে ক্রুজ একবার এদিকে আর একবার ওদিকে টলছে। বার কয়েক পুরো উল্টে যেতে যেতেও রক্ষে পেল যখন তখন দিক পরিবর্তন করলেন ক্যাপ্টেন। ফিরে চললেন আবার। হ্যাভলকে। সেদিনের যাত্রা বাতিল হল। বললেন, পরদিন সকালে আবার চেষ্টা করবেন।

ডলফিন রিসোর্টে বুকিং নেই আর। ইতিমধ্যে যারা এসেছে তারা আর আমরা এই যাত্রা বাতিলের দল মিলে মোটামুটি ভাল ভিড়। তবু একটি রিসোর্টে জায়গা হল। ফোনে ছেলের বকুনি শুনে ঘুমোতে গেলাম। কিছুতেই ঘুম এলো না। ভোরে উঠে আবার দৌড়লাম জেটিতে।

বিগত দিনের মতো অশান্ত না হলেও সেদিনও যথেষ্ট ভয়ঙ্কর সমুদ্র। আসলে ঘূর্ণিঝড় পাক খাচ্ছে যে অঞ্চলে তার মাঝে পড়েছিলাম গতকাল। হাওয়া তখন বিপরীতে বইছিল। এই বারো তেরো ঘণ্টায় তার গতিপথ সামান্য বদল হওয়ায় খানিকটা রক্ষে। তবু বেশ কয়েকবার সেই বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে ফেলল। এভাবেই দুলতে দুলতে ঘণ্টা দুয়েক পর রস আইল্যান্ডকে দেখতে পেয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। পোর্ট ব্লেয়ার এসে গেছে!

 

হ্যাভলক স্মরণীয় হয়ে রইল এই একটি কারণেই। না, হ্যাভলকের সৌন্দর্য নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। এত সুন্দর একটি দ্বীপে যারা থাকেন তাদের সত্যিই ঈর্ষা হয়, যদিও ওদের জীবন মূল ভূখণ্ডের চাইতে অনেকই কঠিন। অত্যন্ত সুন্দর এক একটি বিচ আর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানুষজনের হ্যাভলক এক কথায় অসামান্য। আর সঙ্গে যদি মোখার মতো সামুদ্রিক ঝড়ের অভিজ্ঞতা হয়, তবে বলতেই হয় জীবন সুন্দর হলেও ঝড় আসবেই! আর সেটা আসে বলেই বোধহয় জীবনকে এত ভালবাসা!

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত