| 20 মে 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: দ্বৈরথ । নাহার তৃণা

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

– “আমি বাঁচতে চাই। প্লিজ আমাকে খুন করবেন না।”

অকস্মাৎ এমন আকুতির সামনে কেমন থমকে যান তিনি।

খুনখারাবি তাঁর পছন্দ না। নিতান্ত বাধ্য না হলে ওপথে হাঁটতে চান না। প্রয়োজনেই তিনি নিষ্ঠুর হয়ে ওঠেন। সেই প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তিনি নিরুপায়।

আবারও সে সরব হয়-

-”চাইলেই পারেন আমাকে মেরে ফেলতে?”

– “হ্যাঁ, প্রয়োজনে পারি বইকি।”

-”বাঁচাতেও তো পারেন। কি পারেন না?”

– “সেটাও পারি।” দাম্ভিক ঘোষণার মতো শোনালো তাঁর কণ্ঠ।

-”সত্যিই পারেন? আপনার সেই ক্ষমতা দেখতে চাই।”

এবার যেন সে তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। তার কণ্ঠ থেকে আকুতি উবে গেছে। অসহায়ত্বের পরিবর্তে এখন সেখানে গনগনে ক্ষোভ।

তিনি স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর সামনের খোলা জানালা দিয়ে বাইরে চোখ ফেরালেন। এইমুহূর্তে ভোরের কুয়াশা মিহি পর্দার স্তর সরিয়ে দিনকে পথ করে দিচ্ছে। গাছগাছালির পাতায় পাতায় জমে থাকা শিশির বিন্দু ঝরে গিয়ে রাতের চিহ্নটুকু মুছে ফেলছে দ্রুত। ঘুমভাঙা সূর্যের তদারকিতে দিন শুরুর আয়োজন প্রকৃতি জুড়ে। শব্দহীন আয়োজন। আধোঅন্ধকার থেকে শুরু করে নতুন একটা দিনের বেরিয়ে আসা পর্যন্ত – এই পুরো সময়টা তিনি উপভোগ করেন। অন্ধকার থাকতে বিছানা ছাড়া তাঁর বহুদিনের অভ্যাস। এই সময় মাথা পরিষ্কার থাকে। চিন্তা-ভাবনা কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। কিন্তু আজ তাঁর ভাবনায় বাধা পড়ছে। তিনি থমকাতে বাধ্য হচ্ছেন। বাইরে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তিনি বিরক্তি ভরে তাকালেন সাঈদ তুলুর দিকে।

সাঈদ তুলুর পারিবারিক পরিস্থিতির সবটাই তাঁর নখদর্পণে। ব্যবসায়ী বাবা বেঁচে থাকতে ওদের পরিবার স্বচ্ছল ছিল। বাবার আকস্মিক মৃত্যুশোকের ভেতর ওদের বড়সড় আরেক বিপদের মুখে পড়তে হয়। সাঈদ তুলুর একমাত্র চাচা বাবার মৃত্যুর মাস দুয়েকের মধ্যে পুরো ব্যবসার দখল নিয়ে ওদের প্রায় পথে বসিয়ে দেন। তার দাবি বাজারে বড়ভাইয়ের অনেক ধারদেনা ছিল। অর্ধেক ব্যবসার অংশীদার হিসেবে তিনি যেহেতু সবটাই চুকিয়েছেন, এখন ব্যবসার পুরো অংশই তার। প্রয়োজনে প্রমাণ দেখাতেও তার আপত্তি নেই। কোম্পানির নতুন মালিক হিসেবে সাঈদ তুলুকে  কাজের প্রস্তাব দিতে অবশ্য কাপর্ণ্য করেননি। সম্পর্কের আকস্মিক ভোল পালটানো সেই উৎকট চেহারায় বিস্মিত-ভীত, সাঈদ ও তার পরিবার ক্ষতি স্বীকার করে হলেও নিরাপদ দূরত্বে থাকার তাগিদ তৈরি করে নেয়। মায়ের আপত্তির মুখে সাঈদ তুলু চাচার সাথে কোনো ঝামেলায় জড়ায়নি। অবশ্য চাইলেই সে তাতে সফল হতো তাও না। তার ক্ষমতা বড় সীমিত। সাঈদ তুলুর মধ্যে একধরনের আপসকামীতা রয়েছে। নিজেরটা আদায়ের গাজোয়ারি স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সে। গাছের মতো, নিশ্চল-প্রতিবাদহীন। মায়ের কথার সুর ধরে সেও এই ভেবে সন্তুষ্ট থাকে-মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু আছে ওটাই যথেষ্ট। চাইলে একমাত্র তিনিই এই বিপদের হাত থেকে উদ্ধারের পথ সাঈদ তুলুকে বাতলে দিতে পারতেন। তিনি সেটা করেননি। বরং সাঈদ তুলুর চাচার কূটকৌশলের নিখুঁত ছক তাঁকে উল্লোসিত করেছিল।

সেই তিনিই আবার গেল মাসে সাঈদ তুলুর জন্মদিন ঘটা করে সেলিব্রেটের ব্যবস্হা করেছিলেন। গত মাসে সাঈদ তুলু পঁচিশ পূর্ণ করে ছাব্বিশে পা রেখেছে। পরিস্হিতি বিবেচনায় বাড়াবাড়িই হয়ে গিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর একটা নড়বড়ে সংসারের হাল ধরতে বাধ্য এমন একজনের জন্মদিন পালন হয়তো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। সেরকম পরিস্হিতিতে পাঁচতারকা রেস্তোরাঁয় কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া-দাওয়া অবিবেচকের কাজ। সে কাজে তিনিই ছিলেন প্ররোচনাদাতা। আসলে সেসময় ছেলেটার জন্য একধরনের মায়া কাজ করেছিল তাঁর মধ্যে। দিনের পর দিন ওর কষ্ট আর সংগ্রামের সবটাই তো তাঁর জানা। মাঝে মাঝে ওঁর নিজেরই কেমন অসহনীয় মনে হয়। অথচ ছেলেটা মা ভাইবোনদের কথা ভেবে নিজেকে অল্পে তুষ্ট রাখার কৌশল রপ্ত করে নিয়েছে। ভালোমন্দ খেতে ও খুব ভালোবাসতো। এখন পাইস হোটেলের এক তরকারি ভাতে খুশি থাকে। একদিনের কথা মনে করে তাঁর মতো নির্লিপ্তেরও চোখে পানি এসে যায়। পাইস হোটেলে সেদিন নানা পদের পাশাপাশি পদ্মার ইলিশও রান্না হয়েছিল। বড়সড় এক পিস ইলিশের দাম পঁচানব্বই টাকা। সঙ্গে ডাল ভাত মিলিয়ে দুপুরের জন্য বরাদ্দ হিসেবে বাড়তি আরো টাকা জুড়তে হয়। শর্ষে ইলিশের প্রতি সাঈদ তুলুর ভীষণ দুর্বলতা। কড়াই ভরতি শর্ষে ইলিশের সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন সে বাড়তি খরচে না গিয়ে লোভ সংম্বরণ করেছিল। ব্যাপারটা তাঁর বুকে বেজেছিল। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন, ওকে কোনো দামি রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে একদিন খাওয়াবেন। ওর জন্মদিনটাকে উপযুক্ত মনে হওয়ায় সেদিন ছেলেটির ভালো-মন্দ খাওয়ার ব্যবস্হা করেছিলেন। তাতে যে সে সানন্দে রাজি ছিল তাও না। একা ভালো মন্দ খাওয়া নিয়ে ইদানীং ওর ভেতর অনুশোচনা তৈরি হয়। একটু কৌশল খাটিয়ে নিতে হয়েছিল রেস্তোরাঁয়। এক সময় ওরকম রেস্তোরাঁয় সপরিবারে তারা কম যায়নি। সেসব এখন অতীত। এখন পাঁচটা টাকা বাড়তি খরচের আগে বারদুয়েক ভাবতে হয়।

সাঈদ তুলু কোনোদিন ভাবেনি জীবন এভাবে তাকে মাঝ রাস্তায় থতমত খাওয়াবে। মাথার উপর বাবা ছিলেন। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে শখের সিনেমা বানানোকে সে জীবনের সিরিয়াস লক্ষ্য হিসেবে নেবে। এই ছিল তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। বাবার মৃত্যু এক ঝটকায় তার ছকে রাখা হিসেব উল্টে দেয়। যদিও ওর অন্তর্গত স্বভাব মেনে নেওয়া, আর মানিয়ে নেওয়া। কিন্তু সান্ত্বনার তরিকা হিসেবে এখন সে এমন ভেবে স্বস্তি খোঁজে, যে নিজের স্বপ্ন পূরণে চূড়ান্ত স্বার্থপর হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। ওর পক্ষে আরো অনেক কিছুই সম্ভব হয়নি। মুখোমুখি বাড়ির আরশিকে মনে মনে সে ভালোবাসে। মুখ ফুটে সেকথা বলা হয়নি কখনো। বহু বছরের চেনাশোনার সুবাদে চোখের সামনে আরশিকে সে গুটিপোকা থেকে প্রজাপতি হতে দেখেছে।  আঁকার হাত ভালো হওয়ায় আরশির স্কুল-কলেজের প্র্যাকটিক্যাল খাতা তৈরির দায়িত্ব আগাগোড়া সাঈদের উপর ছিল। স্কুল পেরনো বাড়ন্ত আরশি প্র্যাকটিক্যাল খাতা কিংবা অন্যান্য কাজে বহুবার ওর কাছে এসেছে। যতবার আরশি তার সামনে এসেছে ততবার সাঈদ তুলুর মন বলেছে, এই মেয়ের জন্ম হয়েছে তার জন্য। মেডিকেল পড়ুয়া আরশি এখন দূরবর্তী বাতিঘরের মতো। সাঈদ তুলুর বাস্তবতা বর্তমানে এতটাই দিগভ্রান্ত, যে সেই বাতিঘরের আলোর রেখা ধরে পাঁজরবন্দি গন্তব্যে পৌঁছানোর উপায় তার নেই। ওর বাকি স্বপ্নের মতো আরশিও দূর থেকে দূরে সরে গেছে। আরশির মতো মেয়ে তার জন্য জন্মায় না- এই সত্যি মেনে নেবার জন্য নিজেকে ওর প্রস্তুত করা দরকার। ফুল খেলবার দিন তার জীবন থেকে অন্তর্হিত। তার বর্তমান, ভবিষ্যতের পথকে বেঁকিয়ে দিচ্ছে রোদ থেকে  ঘনমেঘের দিকে।

কোনো রকমে বিএসসির গণ্ডি পেরনো সাঈদ তুলুর পক্ষে একটা চাকরি জোটানোর অভিজ্ঞতা কম বেদনার্ত ছিল না। বিপদে আত্মীয়দের পাশ থেকে উবে যাওয়ার যেসব নিষ্ঠুর সেলুলয়েডীয় চিত্র দেখা যায়, তার সাথে খাপে খাপ মিলে গিয়েছিল ওর অভিজ্ঞতা। শেষমেশ পরিচিত এক বড় ভাইয়ের সূত্রে একটা বেসরকারি কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরিটা জুটে যায়। দশহাজারের সেই চাকরির এগারো মাস পেরিয়েছে। কাজ ভালো করলে বেতন পঁচিশ হাজারে পৌঁছানোর কথা। সেটা কবে নাগাদ সম্ভব জানা নেই। সামনে বিরাট খরচের ধাক্কা। বোনটার বিয়ে পাকা হয়েছে। হাতে মাস কয়েক সময়। পাত্র বোনের সহপাঠী। ওরা একে অন্যকে পছন্দ করেছে। আপত্তির প্রশ্নই ওঠে না ওদের। মা বরং খুশি। বাবাহীন মেয়ের বিয়ে দেওয়ার ভোগান্তিতে অন্তত পড়তে হচ্ছে না। বিয়ের সপ্তাহ খানেকের ভেতর দুজনে উড়াল দেবে উচ্চশিক্ষার্থে। স্কলারশীপের টাকায় পড়াশোনা চলবে- কাজেই ও নিয়ে চিন্তা নেই। এক্ষেত্রে পাত্রপক্ষের চাওয়া সামান্যই। দুজনের টিকিটের খরচসহ বিয়েটা জাঁক জমকের সঙ্গে হওয়া চাই। মা নিজের গহনার উপর ভরসা করে পাত্রপক্ষের শর্তে রাজি হয়ে গেছে। সাঈদ তুলু মায়ের সামান্য গহনায় হাত দেবার পক্ষপাতী নয়। কিন্তু এত টাকাই বা কোত্থেকে জোগাড় হবে!

সাঈদ তুলুকে অবাক করে দিয়ে খরচের ধাক্কা সামাল দেবার একটা সুযোগ হুট করে ওর হাতে এসে গেল। ব্যবস্হাটা তাঁরই পরিকল্পনা মতো কোম্পানির পুরোনো রিপ্রেজন্টেটিভ নিলয় বক্সীর মাধ্যমে সাঈদের কাছে আসে। নিলয়, ম্যানেজার চন্দ্র শীলের খাস লোক। তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী হাসপাতালে, নানা জটিলতা দেখা দেওয়ায় সন্তান প্রসব হুমকির মুখে। এখন তার পক্ষে ঢাকার বাইরে যাওয়া অসম্ভব। সাঈদ তুলুর কাজে তারা সন্তুষ্ট। যে কারণে ওরা তাকে মনোনীত করেছে। খাটুনি কম, লাভ প্রচুর। কাজ তেমন জটিল না। ঢাকায় সে যেভাবে ফার্মেসি, মেডিসিন শপ আর বিভিন্ন ডাক্তারের চেম্বারে কোম্পানির ওষুধ পৌঁছে দেয়, কাজটা সেরকমই। পরিবর্তন যেটুকু তা হলো, ওদের পরিবর্তে পাইকারি ওষুধ ক্রেতার কাছে  চালান পৌঁছে দেওয়া। একটা চালান ঠিকঠাক করতে পারলে পরে আরো কাজের সুযোগ রয়েছে। সাঈদ তুলু আগুপিছু না ভেবে কাজটি করতে রাজি হয়ে যায়।

ঢাকার বাইরে ওষুধের চালানে লাভের মুখ দেখতে সময় লাগে না। এভাবে চালাতে পারলে বোনের বিয়ের খরচের টাকা উঠে যাবে। সাঈদ তুলুর দুশ্চিন্তা কিছুটা কমে। প্রতিদিনের ট্রিপে তাকে দুটো প্যাকেট বাড়তি নিতে হয়। প্যাকেট দুটো বিদেশি ওষুধের। দুর্লভ আর খুব দামি। সে ওষুধের  সঠিক নামধাম  জানে না। তাকে বলা আছে নির্দিষ্ট লোকের হাতে প্যাকেট ডেলিভারি দিতে হবে। তার ডেলিভারি ভ্যানের মধ্যেই থাকে প্যাকেট দুটো। প্রতি ট্রিপের জন্য তাকে দেড় হাজার টাকা দেওয়া হয়। দেড় হাজারের এই ট্রিপ প্রতি মাসে তাকে অন্তত দশটা নিতে হয়। ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন হাতটা সাঈদ তুলুর মাথায় ছোঁয়ানোতে দেড় মাসের মধ্যে চালানের কাজটাতে সে স্হায়ী হিসেবে নিয়োগ পায়। উপরি পনেরো হাজারের আয় তার জন্য এখন আর্শীবাদ বিশেষ।

কিন্তু সেদিন অন্যরকম একটা ঘটনা ঘটলো। ঢাকা থেকে বেরিয়ে গাড়িটা যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার থেকে নেমে কিছুদূর যেতেই পুলিশের একটা গাড়ি সিগন্যাল দিলো। গাড়ি থামতেই চারদিকে ঘিরে ফেলল পুলিশ বাহিনী। গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে আসল ওষুধের সঙ্গে পাওয়া গেল প্রচুর ইয়াবা, মেয়াদ উত্তীর্ণ ও নকল ওষুধ। তল্লাসিতে ওই বিশেষ প্যাকেট দুটো পাওয়াতে ঝামেলা জটিলভাবে জট পাকালো। পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে গেল। ওষুধ সমেত গাড়ি জব্দ হলো। পরদিন পত্রিকায় খবর বেরলো নকল ওষুধ আর দুই কোটি টাকার ইয়াবাসহ সাঈদ তুলু গ্রেফতার। ওষুধ সরবরাহের আড়ালে ইয়াবা পাচার। কাজটা করার জন্য যারা তাকে এতদিন টাকাপয়সা দিতো, তারা সবাই গায়েব হয়ে গেল। তাদের নাম বের করার জন্য একদিন পুলিশের একটা দল তাকে নিয়ে গেল ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জের দিকে একটা জলাভূমির কাছে। এই জায়গাটা লোকালয় থেকে অনেকটা দূরে। নাম বলে দেবার পর তাকে এখানে খুন করে রেখে যাওয়া হবে। সে ব্যাপারে সাঈদ তুলু নিশ্চিত। যাদের নাম সে জানে সেগুলো হয়তো আসল নাম নয়। তবু সে বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা হিসেবে দুজনের নাম বলার সিদ্ধান্ত নিলো। দুষ্টু চক্রের খপ্পরে সে যেচে ঢুকেছে, শেকল কেটে বেরবার পথের খোঁজ তাকেই করতে হবে। ওর জীবন-মৃত্যুর ফয়সালা একজনের মর্জির সুতোয় ঝুলছে। সে বাঁচার চেষ্টা করবে। হাল ছাড়তে রাজি নয় এত সহজে। এগিয়ে আসা মৃত্যুর থাবা কেটে বেরনোর জন্য মরিয়া সাঈদ তুলু মুখ খুললো–

-”আমি বাঁচতে চাই। প্লিজ আমাকে খুন করবেন না।”

হ্যাঁ, একমাত্র তিনিই পারেন তাকে বাঁচাতে। এই গোটা পরিস্হিতিটা ঘুরিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখেন তিনি। তার এই পরিণতির জন্য তিনিই তো দায়ী। সাঈদ তুলু তাঁর তৈরি। তার বাঁচা-মরার পুরোটাই তাঁর হাতে। আর সাঈদ তুলুও খামেখাই মরতে রাজি নয়। জীবনে এই প্রথমবারের মতো সে সরব হয়েছে। স্রষ্টা বলেই অযৌক্তিকভাবে তাঁর চরিত্রকে তিনি খুন করতে পারেন না।

আশ্চর্যের কথা, সাঈদ তুলুর আকুতি তাঁর মধ্যে আলোড়ন তৈরি করেছে। তিনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে গেছেন। ভাবতে শুরু করেছেন, এভাবে ছেলেটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়তো উচিত হচ্ছে না।

তাঁর লেখালিখির জীবনে এমন ঘটনা বিরল। তিনিই তাঁর মর্জির হর্তাকর্তা। প্রথমবারের মতো তাঁর গল্পের একটি চরিত্র তাঁকে দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করছে। গল্পটি নিয়ে গোড়া থেকে আরো একবার ভাববেন, সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি লেখার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। খোলা জানালা দিয়ে দমকা বাতাস তাঁর লেখার টেবিলে হামলে পড়লো। খাতার এলোমেলো পাতাগুলোর দিকে অলস চোখে একঝলক তাকিয়ে তিনি খাওয়ার টেবিলের উদ্দেশে পা বাড়ালেন। চনমনে খিদে পেয়েছে তাঁর।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত