| 20 জুলাই 2024
Categories
গীতরঙ্গ

শারদ অর্ঘ্য প্রবন্ধ: মেরিলিন আর সিলভিয়া: মোমবাতির আগুন ও আলো

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

 

১.
সময়টা গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক। স্থান পুঁজিবাদী সভ্যতার রাজধানী আমেরিকা। নিউইয়র্কের কোন সিনেমা হল থিয়েটারে কবি সিলভিয়া প্লাথ বন্ধুদের সাথে ছবি দেখতে গিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করছেন।টেকনিকালারে নির্মিত ছবির উৎকট রঙের পোশাক, সঙের মতো অভিনেত্রীরা, উদ্ভট গতানুগতিক গল্প দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে ছবির মাঝখানে উঠে যাচ্ছে সিলভিয়া।  ফুটবল দলের অধিনায়ক নানা ঘটনার শেষে যৌনাবেদনময়ী দুষ্ট মেয়ের বদলে লক্ষ্মী ভালো মেয়েটিকে বেছে নেয়।ভালো মেয়ে মন্দ মেয়ের এই সাধারণীকরণ সিলভিয়ার পছন্দ হচ্ছে না।আমরা ধরে নিই ঐ যৌনাবেদনময়ী অভিনেত্রীটি মেরিলিন মনরো। যিনি একই সময়ে পর্দা কাঁপিয়ে চলেছেন তার ব্লন্ডরঙা সোনালি আগুনে,যদিও স্ক্রিপ্ট নিয়ে নায়িকা নিজেও অসন্তুষ্ট কিন্তু  পরিচালক তাকে অভিনয়ের সুযোগ দিতে নারাজ।কারণ তার রূপের আগুন বিক্রি করে পরিচালকের ব্যবসা চলে।
পাঠকের মনে সহজেই প্রশ্ন জাগতে পারে,
কেন মেরিলিন আর সিলভিয়া?
কোন নিক্তিতে দু’জনকে এক পাল্লায় মাপা চলে?
একটা প্রবাদ আছে, তুমি যা দেখতে চাইবে পৃথিবী  তোমাকে সেভাবেই দেখাবে জীবনকে।প্রতিদিনের সূর্য ওঠা কাউকে আলো দেয়,পথ দেখায়,প্রভাত পাখির গান শোনায়।আবার কাউকে মানুষিক সৈনিক সেজে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াবার নির্দেশ দেয়।প্রায় চার বছর হলো সিলভিয়া প্লাথের ছোটগল্প অনুবাদের কাজের সুবাদে তাকে জানা হয়েছে অনেকটা। জীবনানন্দ দাশের মতনই তিনি আমাকে এ্যাবসার্ডিটির জগতে নিয়ে ঘোরগ্রস্ত করে ফেলেছেন আবারও।তবে সিলভিয়া প্লাথের সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের সামঞ্জস্য খোঁজাতে কেউ বিস্মিত হবেন না হয়তো, কিন্তু মেরিলিন? বিশ্বজোড়া যার রূপের খ্যাতি, অভিনেত্রী হয়েও যার প্রতিভাকে পাশ কাটিয়ে সৌন্দর্য হয়েছে কিংবদন্তী,তার সাথে কীভাবে তুলনা করা যায় বিষণ্নতায় আক্রান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা অন্তর্মুখী স্বভাবের সিলভিয়ার।
জগতে অনেক অপার্থিব ঘটনা ঘটে। সম্পূর্ণ দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা, রেল লাইনের মতো পৃথক জীবন যাদের, কোন বিন্দুতে গিয়ে তারা এক হয়ে যান?আসলে
শিল্পের স্রষ্টার যে বেদনা বহমান থাকে,সেই বিষন্নতায় তারা আলাদা হয়ে যান সমষ্টির স্থূলকায় পরিধি থেকে।
দুজনই আত্মজীবনী লিখে গেছেন,কিন্তু অসম্পূর্ণ ও খণ্ডিত চেহারায়। অনেক কিছু বলতে চেয়েও পারেন নি হয়তো। তার আগেই তলিয়ে গেছেন
বিষাদে-অন্ধকারে-অন্তিমে।

২.
মেরিলিন মনরোর জন্ম ১৯২৬ সালে,আমেরিকায় ক্যালিফোর্নিয়ার লস এ্যাঞ্জেলসে।বাবা হিসেবে পাওয়া যায় চার্লস স্ট্যানলি গিফোর্ডের নাম,মা গ্ল্যাডিস পার্ল বেকার।মনরোর অন্য নাম নর্মা জিন মর্টিনসন।তার মা,মায়ের বাবা এবং দাদী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে মৃত্যু বরণ করেন।মায়ের ভাই আত্মহত্যা করেন। বাড়িঘর হাতছাড়া হয়ে যায় ঋণের দায়ে।
বাবাকে কখনো দেখেননি,মা একটা ফটোগ্রাফ দেখিয়ে জানিয়েছিলেন ওটাই তার বাবা। বড় হন এতিমখানায় আর বিভিন্ন পরিবারের আশ্রয়ে।সেসব পরিবারে অল্প বয়সেই এ্যাবিউজের শিকার হন।প্রিয় কুকুরটাকেও কেউ মেরে ফেলে যখন তখন তার অনুভূতি দাঁড়ায়, ‘যা-ই আমি পছন্দ করি মানুষ সেগুলোর কাছে যেতে আমাকে বারণ করে দেয়।’
মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে ৩৪টি সিনেমা করেছেন। ২৫ বছর বয়সের আগেই তিনবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।ঊনত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে ১২বার গর্ভপাত করেন।বিখ্যাত হওয়ার আগে অর্থের প্রয়োজনে নগ্ন ফটোগ্রাফির জন্য সমালোচিত হন।বিস্ময় লাগে শুনে যে তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে সাঁইত্রিশ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের নাম পাওয়া যায়।
মেরিলিনের জীবন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দ্বারা সর্বতোভাবে আক্রান্ত বলে মনে হতেই পারে।
সিলভিয়া প্লাথের জন্ম আমেরিকাতেই,ভিন্ন শহর বোস্টনের ম্যাসাচুসেটসে,১৯৩২ এ।মেরিলিনের জন্মের মাত্র ছয় বছর পর।মনে হতে থাকে,তাদের দুজনের দেখা হয়েছিল কি কখনো? যদিও সিলভিয়ার জন্ম মোটামুটি সচ্ছল পরিবারে।বাবা অট্টো প্লাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক,মা অরেলিয়া প্লাথও উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন ।আট বছর বয়সেই সিলভিয়া ছবি আঁকা,কবিতা লেখায় কৃতিত্ব অর্জন করতে থাকেন।কিন্তু সেই বছরই বাবার মৃত্যুতে  সিলভিয়ার পরিবার অনেকটাই সমস্যাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।সিলভিয়ার ডিপ্রেশনজনিত সমস্যাও শুরু হয় কাছাকাছি সময়ে।মাত্র ৩২ বছরের জীবনে বেশ কয়েক বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এরপর আজীবন তিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের অধীনে চিকিৎসা নিয়ে গেছেন,কিন্তু শেষ পর্যন্ত লাভ হয়নি।ভালবেসে একবারই বিয়ে করেছিলেন কবি টেড হিউজকে।দুটি সন্তানের জন্ম দেন।কিন্তু প্রেততাড়িত বিষন্নতা তার পিছু ছাড়েনি কখনো। যদিও সেরা কবিতাগুলো লিখেছেন এই সময়ই। দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পরপরই স্বামীর পরকীয়ার জেরে তাদের সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে।সাত বছরের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পরই সিলভিয়ার একমাত্র উপন্যাস ‘দি বেল জার’প্রকাশিত হয় ভিক্টোরিয়া লুকাস ছদ্মনামে। তার মাত্র মাসখানেক পর তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেন।

৩.
জীবনের কাছে কী চাওয়া ছিল মেরিলিন আর সিলভিয়ার?অন্য আর দশজনের মতো কেন সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে পারেননি তারা?
শিল্পী মাত্রই সংবেদনশীল হওয়ার কথা। কিন্তু সংবেদনশীলতা মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে বিপদ সংকেত দেখা দেয়।
আড্ডা, পরচর্চা, হৈ-হল্লার ভেতর দিয়ে সত্যিমিথ্যার মিশেলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিজেদের জীবনের নানা অপরাধের ছায়ায় বেঁচে থাকার গ্লানিবোধটুকু কাটিয়ে ওঠে।সেই ভিড়ের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত সংবেদনশীল মানুষের আসল চেহারাটা ধরা পড়ে যায়।
সিনেমা জগতে বিখ্যাত হওয়ার পর মেরিলিন পার্টিতে যেতেন,কিন্তু সবার মধ্যে আলাদা হয়ে থাকতে হয়েছে তাকে।এক সময় মনে হয়েছে, ‘রূপকথার গল্পের মতো সুখী হওয়ার সমস্ত উপাদান আমার চারপাশে ভিড় করে থাকলেও দিন দিন আমি যেন কেমন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম।এক সময় হয়ে উঠলাম বিধ্বংসী। জীবনটাকে আগের মতোই ভুলে ভরা, অসহ্য মনে হলো।’
সিলভিয়া প্লাথের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে দেখা যায় এসথার নামের মেয়েটি পার্টিতে বা হাসপাতালে একইরকম প্রতিক্রিয়া দেখায়।
১.ততোক্ষণে দেয়ালজোড়া পাইন কাঠের প্যানেল আর সাদা লাল গালিচার পটভূমিতে আমার শরীরটা কুঁচকে একটা কালো বিন্দুর মতো হয়ে গেছে বলে মনে হলো;মনে হলো মাটির মধ্যে আমি যেন একটা গর্ত।
২.যখনই একদল মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়,তাদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলি,আর পুরোটা সময় মনে হয় দলের বাকিরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে এবং এক ধরনের অন্যায় সুবিধা নিচ্ছে। তাছাড়া একটা মানুষ খুব খারাপ অবস্থায় আছে জেনেও মেকি হাসি হেসে সে কেমন আছে জানতে চাওয়া এবং জবাবে সে ‘দারুণ আছি’ বলবে এটা আশা করাকেও ঘৃণা করি।
তারা দু’জনই বাথটাবে দীর্ঘ সময় কাটাতেন।মেরিলিন অনেক সময় শ্যুটিং বা পার্টিতে যেতে দেরি করে ফেলতেন এই স্নানের অভ্যেসের জন্য। তারা কি দুঃখকে ধুয়ে ফেলতে চাইতেন? মেরিলিন যেসব পরিবারে আশ্রিত ছিলেন সেসব বাড়িতে সবার শেষে স্নান সারতে হতো, মাপা জলে।এখন তাই অতিরিক্ত সময় নিয়ে সেই অভাবকে পুষিয়ে নিয়ে শোধ তোলেন।
আর সিলভিয়া পুরো দুই পৃষ্ঠা জুড়ে পার্টি থেকে ফেরার ক্লান্তি,হীনম্মন্যতা,অবমাননা, দুঃখবোধকে ধুয়ে ফেলার কার্যকারিতা হিসেবে স্নানের বর্ণনা দেন।বাথটাবে শুয়ে থেকে ধ্যান করেন তিনি। ব্যাপটিজম বা জর্ডান নদীর পানিতে বিশুদ্ধ হওয়ার চাইতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন গরম পানিতে।
বিয়ে বা যৌথ সম্পর্ককে কোন চোখে দেখেছেন তারা?
পুরুষ সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতাতে কতটুকু মিল ছিল তাদের?
তিন তিনবার বিয়ে করলেও মেরিলিন তার আত্মজীবনীতে বিয়ে সম্পর্কে কমই বলেছেন। হয়তো বিয়ে বা যৌথ সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে তিনি বিশ্বাসই অর্জন করতে পারেননি।বিয়েকে তিনি অবসরপ্রাপ্ত চিড়িয়াখানার পশুদের মতো এক খাঁচা থেকে আরেক খাঁচায় জায়গা বদল হওয়া বুঝেছেন শুধু।সহজে জৈবিক সম্পর্ক করার সুবিধা ছাড়া আর কোন ইতিবাচক দিক পাননি, যদিও প্রথম বিয়ের পর সেই আগ্রহটাও হারিয়ে গিয়েছিল তার।প্রথম বিয়েতে একটাই প্রাপ্তি ঘটেছিল বলে জানিয়েছেন তিনি, ঐ বিয়ে এতিম পরিচয় থেকে মুক্তি দিয়েছিল তাকে,তিনি নীল সাদা ড্রেসের কারাগার থেকে বের হতে পেরেছিলেন।
সিলভিয়া প্লাথের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস তার কবিতার মতনই স্বপ্নালু,অনুভব আবিষ্ট,সুররিয়ালিজমের ধোঁয়াশায় ঘেরা।কিন্তু বিয়ের মতো দু’একটি বিষয়ে তার ভাষা ব্যবহারে সকল ধোঁয়াশা কেটে গেছে, জীবনের প্রতি মুখব্যাদান করে তাকিয়ে দেখেছেন তিনি। তার কাছে বিয়ে মানে বরের জন্য সকালের নাস্তা ডিম বেকন টোস্ট কফি,তারপর সারাদিন বাসনকোসন কাপড় ঘরদোর পরিষ্কার, তারপর আরো রান্না, আরো পরিষ্কারের চক্রবিশেষ।পনেরো বছর ধরে এ গ্রেড পেয়ে আসা সিলভিয়া কখনও এরকম জীবন আকাঙ্ক্ষা করেননি।তিনি তার বন্ধু বাডি উইলার্ডের মায়ের কথা জানান। এক সময়কার বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের স্ত্রী হয়েও সারাদিন তার কাজ থোড় বড়ি খাড়ার চক্রে সীমাবদ্ধ।
‘বিয়ের আগে মেয়েদের ওপর যতই গোলাপ,চুমু আর রেস্তোরাঁর দামী খাবারের বন্যা বইয়ে দিক পুরুষেরা,বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর মেয়েদেরকে মিসেস উইলার্ডের রান্নাঘরের ঐ পাপোশের মতো নিজের পায়ের নিচে পিষে ফেলাই তাদের একমাত্র চাওয়া হয়ে দাঁড়ায়।’
সিলভিয়ার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন মেরিলিন প্রথাবদ্ধ সমাজের নিয়ম মেনে যাকে চলতে হয়নি।তিনবারের মধ্যে দুই বার নিজের পছন্দে বিয়ে করেছেন,তবু টেকেনি।অসংখ্য পুরুষের সংস্পর্শে গেছেন তবু বিষণ্ণতা আর নিঃসঙ্গতার বোধ তাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থেকে স্বেচ্ছামৃত্যু পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে।সারা বিশ্ব যার রূপের আগুনে পুড়েছে সেই দেবীকেও হাহাকার করতে হয়েছে, প্রকৃত প্রেমিক হচ্ছে সে যে তোমার মাথায় একটু স্পর্শ করে অথবা চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে বা এমনিতে তাকিয়ে থেকেই তোমাকে কাঁপিয়ে দেয়।’বলা বাহুল্য, তেমন পুরুষের দেখা তিনি পাননি।তৃতীয় স্বামী বিখ্যাত পরিচালক আর্থার মিলারের সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর অসংখ্য ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সবশেষ সম্পর্কটি ঘটেছিল প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সঙ্গে।
এই সম্পর্ক স্থায়ী হওয়া অসম্ভব ছিল। একে বিবাহিত, তার ওপর প্রেসিডেন্ট।সেজন্যই কি মরিয়া ছিলেন মেরিলিন? তার সাথে দেখা করতে তিনি ছদ্মবেশ পর্যন্ত ধারণ করেছিলেন বলে জানা যায়। প্রেসিডেন্টের জন্মদিন ২৯ মে তারিখে পার্টিতে গান করেন মেরিলিন, হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার প্রেসিডেন্ট। এই অনুষ্ঠানের মাত্র দু’মাস পর মেরিলিনের মৃত্যু ঘটে রহস্যজনকভাবে।নগ্নভাবে চাদরের নিচে শায়িত,হাতে ফোনটা ধরা,শেষ কলটি ছিল প্রেসিডেন্ট কেনেডির জন্য। অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ পাওয়া যায় রক্তে।
কিন্তু আত্মজীবনীতে এই সম্পর্কের বিষয়ে কোন লেখা পাওয়া যায় না।আসলেই লেখেননি নাকি সেই লেখা যথাযথ কারণবশত আলোর মুখ দেখেনি কে জানে। ঠিক যেভাবে সিলভিয়ার লেখা শেষ চিঠিটি গ্যাস ওভেনের আগুনে পুড়ে গিয়েছিল, নাকি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল তা আর জানার উপায় থাকে না।
সিলভিয়াও তার উপন্যাসে বিবাহিত জীবন পর্যন্ত পৌঁছান নি।শুধু ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে জানা যায়, বিবাহিত জীবনে দুটি সন্তানের জন্ম দিলেও যৌথ সম্পর্কে তারা ভালো ছিলেন না।জীবনীকারগণ সাধারণত সিলভিয়ার মৃত্যুর জন্য তার বিষাদগ্রস্ত মানসিকতাকেই দায়ী করে ফেলেন।অথচ তাকে সেই বিষাদ থেকে তার সঙ্গী তাকে মুক্তি দিতে চেয়েছিল এরকম কোন যথাযথ উদ্যোগের কথা জানা যায় না। বরং স্বামী টেড হিউজের খ্যাতির কথা জানা যায়, এবং তার একাধিক সম্পর্কের কথা। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে সিলভিয়া জানতে পেরেছিলেন টেড হিউজ আসিয়া উইভিলের সাথে(যাকে পরে বিয়ে করেন এবং সেই নারীও আত্মহত্যা করেন) এক বাড়িতে থাকছেন যেখানে কেটেছে তাদের বিবাহিত জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো।
ফেব্রুয়ারির কঠিন শীতে চলে যান তিনি।ওভেনের আগুনে পুড়ে আলো রেখে যান আমাদের জন্য।

৪.
সবকিছুর ওপরে তারা দুজন শিল্পের দুই ভুবনের সফল অভিযাত্রী হিসেবে স্বীকৃত। কেমন ছিল তাদের এই অসম্পূর্ণ পথের যাত্রাটুকু?
এতিমখানায় বড় হওয়া মেরিলিন শৈশব কৈশোরে একই সাদা টপস আর নীল স্কার্ট পরে থাকতে থাকতে এক সময় পোশাকের চাইতে নিজের নগ্ন শরীরকে ভালবাসতে শুরু করেন।তবে পুরুষ বন্ধুদের আড্ডায় যোগ দিতে পারেন না বতিচেল্লি,লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, ফ্রয়েড বা ইয়ুং সম্পর্কে জানা নেই বলে।ছোটবেলায় পড়াশোনার ভালো সুযোগ না পাওয়ায় মেরিলিন সেই ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করেন।আয়ের বেশির ভাগ খরচ করতে থাকেন বইয়ের পেছনে।
সিলভিয়া সবসময় এ গ্রেড পাওয়া ভালো ছাত্রী হয়েও প্রেমিকের সান্নিধ্যে হীনম্মন্যতায় ভোগেন তার চমৎকার শরীর নেই বলে।  তার আরো মনে হয় রাজনীতি নিয়ে বাকচাতুর্য দেখাতে পারলে ছেলে বন্ধুটি তার সাথে সম্পর্কিত হতে আগ্রহী হতো।
আমেরিকার শহরগুলোতে তখন যেভাবে গণহারে মেয়েরা সিনেমায় নামতে নাম লেখাচ্ছিল,অপরদিকে ক্যারিয়ার হিসেবে পত্রিকার সম্পাদনার কাজের জন্যও মেয়েদের মধ্যে হিড়িক পড়েছিল।
দুই ক্ষেত্রে দুজন নির্দয় রকমের চড়াই উৎরাই পার করেছেন সফলতা পেতে।ব্যর্থতার মুহূর্তগুলোতে দুজনই রেস্টুরেন্টের ওয়েট্রেস হয়ে জীবন ধারণ করার কথা ভেবেছেন। সিলভিয়ার মা চাইতেন পড়াশোনার পাশাপাশি সে যেন শর্টহ্যান্ড বা টাইপিং শেখে,কারণ তাদের সংসারে তখন বেশ টানাটানি চলছে।সিলভিয়া বাবার ভক্ত হলেও তার মা স্বামীর ওপর বিরূপ ছিলেন কোন বীমা রেখে যাননি বলে।
তবে দারিদ্র্য, এ্যাবিউজ বা জীবন সংগ্রাম শিল্পীকে কখনো পুরোপুরি আটকে রাখতে পারে না। তাই নর্মা জিন স্বপ্ন দেখে প্রকৃত অভিনেত্রী হওয়ার।
‘আমি জানি আমার কোন গোপন প্রতিভা নেই। আমি জানি আমি দেখতেও এমন কিছু নই।কিন্তু আমার মধ্যে একটা পাগলামি আছে, যা আমাকে ছাড়ছে না।এটা আমার সাথে কথা বলে।শব্দের মাধ্যমে না,নানারকম রঙে।রাঙা স্বর্ণাভ তার,কখনো উজ্জ্বল সাদা,গাঢ় সবুজ আর ঘন নীল।এগুলো হচ্ছে সেইসব রঙ যখন আমি এই রঙহীন, ভালবাসাহীন পৃথিবী থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য এতিমখানায় বসে দেখতাম।’
এটা সেই সময়,যখন যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ অর্ড্রে হেপবার্নের মতো তারকা জন্ম দিয়েছিল যাদের পুষ্টির অভাবজনিত শারিরীক অবয়ব আদর্শ হিসেবে গণ্য হতে শুরু করে। মেরিলিনও প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে বেকারত্বের সময়গুলোতে না খেয়ে থাকাটাকে আশীর্বাদ হিসেবে ধরে নিত।মেদ কমানোর উপায় হিসেবে। আসলে এতকিছুর পরও তার কাছে খাদ্যের চেয়ে বড় সমস্যা হয়ে উঠেছিল নিঃসঙ্গতা। আমৃত্যু একজন যোগ্য সঙ্গী খুঁজে গেছেন তিনি। নারীদের ঈর্ষার শিকার হয়েছেন,পুরুষেরা শীতল বলে অপছন্দ করেছে। কিন্তু শত বাধা সত্ত্বেও ‘কাস্টিং কাউচে’ শুয়ে তিনি ক্যারিয়ার নির্মাণ করতে চাননি।অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তাকে দর্শকের পছন্দের তালিকা পর্যন্ত পৌঁছাতে হয়েছিল।মেরিলিন তার জীবনের একমাত্র খাঁটি বন্ধু জনি হাইডকে বিয়ে করতে রাজি হননি। কারণ বন্ধুত্ব খাঁটি হলেও মেরিলিন তাকে ভালবাসতে পারেননি।অথচ মৃত্যু পথযাত্রী জনি চেয়েছিল বিয়েটা,কারণ তাতে তার মৃত্যুর পর মিলিয়ন ডলারের মালিক হতে পারত মেরিলিন। 
সততার আগুনে নিজের জীবন পুড়িয়ে আলো দিয়ে গেছেন এইসব শিল্পের স্রষ্টারা।তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন মিখাইল চেখভ,লেখক আন্তন চেখভের আত্মীয়, রাশিয়া ও হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা। তিনি তাকে বোঝান,তার অভিনেত্রী হতে চাওয়া না চাওয়ায় স্টুডিওর কর্তাদের কিছু আসে যায় না।কারণ তারা খুব সহজেই মেরিলিনের শরীরকে ব্যবহার করে টাকা কামাতে পারছে,তাই সে কিছু না করে শুধু দাঁড়িয়ে থাকলেও তাদের কিছু আসে যায় না।দর্শক যা দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাদের শুধু সেটুকুই দরকার। মেরিলিন তাই জীবনের শেষ দিকে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েন।সম্পর্ক, ক্যারিয়ার, নিজের সেক্স সিম্বল ইমেজ — কোনকিছু নিয়েই তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি।সোনার পিত্তল মূর্তি ব্যবহৃত ব্যবহৃত হতে হতেও মাংসপিণ্ড হয়ে যায় নি।সুঅভিনেত্রী হতে চেয়েছিলেন, ইন্ডাস্ট্রি তার সেই চাওয়াকে মূল্যায়নই করেনি।যদিও শেষের দিকে মেরিলিন মিখাইল চেখভের কথামতো লড়াই করতে চেয়েছিলেন মিলিয়ন ডলারের বদলে অভিনেত্রী হওয়ার, পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত না হয়ে সত্যিকার শিল্পী হওয়ার কিন্তু এত বিশাল পুরুষতান্ত্রিক ফিল্ম ইণ্ডাষ্ট্রির বিরুদ্ধে যুদ্ধটা তিনি চালিয়ে যেতে পারেননি।হেরে গেছেন ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও।
সিলভিয়া প্লাথ অবশ্য জীবদ্দশাতেই কবি হিসেবে মোটামুটি স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছেন।কিন্তু আত্মজীবনীতে কিঞ্চিৎ আভাস মেলে, জীবনকে নিজের মতো করে যাপন করতে পারেননি,সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন বিয়ের আগে ও পরে।বিষাদের প্রেতাত্মা আপাদমস্তক দখল করে নিয়েছে শেষ পর্যন্ত।
জীবন যুদ্ধে দুই নারী,দুই শিল্পের পথের পথিক হার মেনেছিলেন।
সত্যি কি হার মেনেছিলেন?নাকি দুই ভুবনের দুই নারীর সুন্দরের জন্য না-ফুরানো অনুসন্ধান প্রভাবিত করতে পেরেছিল পরবর্তী প্রজন্মকে?

৫.
শিল্পের দুই ভুবনের দুই পথিক শেষ পর্যন্ত জিতে যান পৃথিবীর সময়ের কাছে।সময় সবচাইতে বড় নিরামক।তাই এ্যারো এ্যান্ড দ্য সঙ কবিতার মতো তাদের গেয়ে যাওয়া গান,লিখে যাওয়া কবিতা, নির্মিত চলচ্চিত্র যুগ যুগ ধরে প্রবাহিত হয়ে চলেছে পাঠক দর্শক শিল্পের বোদ্ধাদের কাছে।কেবল তাই না,আজকের প্রজন্ম সহজে কোনকিছু উপেক্ষা করতে দিচ্ছেও না।প্রযুক্তিগত কল্যাণে মেরিলিনের আত্মহত্যাটি হত্যা কি না সেই বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। সিলভিয়ার গ্রেভইয়ার্ডের নামফলক একাধিক বার ভেঙে দেয় তার ভক্তরা।কারণ সেখানে নাম লেখা ছিল সিলভিয়া প্লাথ হিউজ। হিউজ নামটি বারবার ঠিক করে দেয়া হয়।ভক্তরা শেষে বই দিয়ে হিউজ লেখাটুকু ঢেকে ছবি তোলে।দেখা যাচ্ছে সফলতা,সার্থকতা শেষাবধি তাদের পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়েছে।মোমবাতির মতো নিজের জীবনকে পুড়িয়ে আলোকিত করে যান তারা মানুষকে।
জীবনের নিভৃত কুহক যারা বুঝে যান,সব ভালবাসা যাদের বোঝা হয় তারা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকে ভালবেসে আলিঙ্গন করেন।ব্যাখ্যার অতীত এইসব মৃত্যু আমাদের বিস্ময় জাগিয়ে রাখে,মৃত্যুর চাইতে মহৎ,জীবনের চাইতে বৃহৎ হয়ে তারা জন্ম দেন নতুন ইতিহাসের।

 

সহায়ক গ্রন্থসমূহ

১.সিলভিয়া প্লাথ,দি বেল জার (অনুবাদ:মোস্তাক শরীফ)
বাতিঘর, ঢাকা, ২০১৮
২.মেরিলিন মনরো,মাই স্টোরি(অনুবাদ: কামরুল আহসান) আদর্শ প্রকাশনী,২০২৩

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত