| 5 মার্চ 2024
Categories
গীতরঙ্গ

পারফিউমের বর্ণিল ইতিহাস ও সুগন্ধির সংস্কৃতি । এসএম রশিদ

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

পারফিউম বা সুগন্ধি যাই বলা হোক না কেন, উপাদানটি ঠিক কেন মানুষের এত প্রিয় কিংবা কেন এত মূল্যবান, তার উত্তরটা সরাসরি দেয়া কঠিন। প্রথমত বলা যায় ঘ্রাণ মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের একটি, মানুষ ৫ থেকে ১০ হাজার ঘ্রাণ পৃথক করতে পারে। মানুষের স্মৃতি ও আবেগ তৈরি হওয়ার যে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, তার সঙ্গে ঘ্রাণের সরাসরি সম্পর্ক আছে। কোনো নির্দিষ্ট ঘ্রাণ মানুষের কোনো বিশেষ স্মৃতিকে তাজা করে তুলতে পারে। লেখক ক্ল্যারি বিংহামের কথায়, ‘সুগন্ধি মানুষের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রাথমিক ইন্দ্রিয় অনুভূতি—এটা অনেকটা সংগীতের মতো। এ অনুভূতি আমাদের মুহূর্তের মধ্যে কোনো স্থান বা সময়ে নিয়ে যেতে পারে। মানুষ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্মৃতির ভাণ্ডার সম্প্রসারিত হতে থাকে। একই সঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সঙ্গে নানা ধরনের ঘ্রাণ যুক্ত হতে থাকে। সুগন্ধির সৌন্দর্য হচ্ছে স্মৃতির সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক। এটা আমাদের অতীতের সঙ্গে আবেগঘন সম্পর্ক তৈরি করে কিংবা কাল্পনিক ভবিষ্যতও তৈরি করতে পারে। ফ্রান্সের নিশে পারফিউম হাউজ প্যানোগের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর রানিয়া নায়েম বলেন, বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানো, নানা রঙ-আকার দেখা, ভিন্ন সংষ্কৃতির সঙ্গে মেশা মানুষের কল্পনাশক্তিকে উসকে দেয় এবং নতুন নতুন আইডিয়ার প্রেরণা হিসেবে কাজ করে একটা অ্যাকুয়াটিক নোটের ঘ্রাণ নিতে আপনি দক্ষিণ ফ্রান্সে আপনার শেষ ছুটিতে ফিরে যেতে পারেন, আবার কোনো ঘ্রাণ আপনার স্কুলের স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে।’

বলা যায় মানুষের অনুভূতি, স্মৃতিতে ঘনিষ্ঠভাবে ঘ্রাণ তথা সুগন্ধি জড়িয়ে আছে। তাই মানুষের কাছে সুগন্ধির মূল্য আছে। এ গেল মানুষের বায়োলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সুগন্ধির সম্পর্ক। এবার আরেকটি পরিপ্রেক্ষিত থেকে সুগন্ধির গুরুত্বের দিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ ব্যাপকভাবে প্রসাধনী ব্যবহার করেছে। কখনো এ ব্যবহার ছিল দৈনন্দিন আবার কখনো বিশেষ, যেমন ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা মৃতদের সমাধিস্থ করার আয়োজনে। প্রসাধনীর মধ্যে সুগন্ধি ছিল বেশ জনপ্রিয়। সুগন্ধির প্রথম ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় মেসোপটেমিয়ায়। এরপর মিসর হয়ে সুগন্ধীর বিকাশ ঘটে গ্রিসে এবং বাকি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। সুগন্ধি তত্কালীন সভ্যতায় রীতি-প্রথা, সৌন্দর্য এবং বাণিজ্যের একটি জনপ্রিয় উপাদান হয়ে ওঠে। প্রাচীন পেগান সভ্যতাগুলোয় মানুষের বিশ্বাস ছিল সুগন্ধি দেবতাদের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সুস্বাস্থ্য ও সামাজিক মর্যাদাতেও সুগন্ধি গুরুত্বপূর্ণ। সুগন্ধির গুণমান ও পরিমাণ ছিল সামাজিক মর্যাদার একটি নির্দেশক। প্রাচীন দুনিয়ার বিখ্যাত সব নাম থিওফ্রাস্টাস, প্লিনি, জোনোফোন, অ্যারিস্টটল তাদের কালের সুগন্ধি নিয়ে লিখেছেন। সুগন্ধির গুরুত্ব নিয়ে তাদের কারো মধ্যেই সন্দেহ ছিল না।

ইতিহাস যেমন কালগর্ভে বিলীন হয়, তেমনটা ঘটতে পারে ঘ্রাণের ক্ষেত্রেও। ধরা যাক কাঠের শেলফে চামড়ায় বাঁধানো বই। চামড়া দিয়ে বই বাঁধাই যেমন এখন আর সহজলভ্য নয়, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে এর অনন্য ঘ্রাণও। পুরনো লাইব্রেরি কিংবা বুকশপগুলোয় হয়তো এখনো সে ঘ্রাণ টিকে আছে। এ ঘ্রাণ কেবল সংশ্লিষ্টদের স্মৃতি-আনন্দ নয় বরং এর আছে সাংস্কৃতিক-ঐতিহ্যগত গুরুত্বও। এ রকম কয়েকশ বছরের পুরনো চামড়ায় বাঁধানো বই নির্দিষ্ট তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত ভল্টে রাখা হয়। তাই এসব বইয়ের ঘ্রাণ নেয়াটা এখন আর সহজ নয়। সহজ কথায় সভ্যতার গতি-প্রকৃতির সঙ্গে বদলে যায় ঘ্রাণ-সুগন্ধের প্রাপ্তি, উপভোগ।

পুরনো চামড়ায় বাঁধানো বইয়ের ঘ্রাণের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ইউসিএল ইনস্টিটিউট ফর সাসটেইনেবল হেরিটেজের গবেষক সিসিলিয়া বেমবিরে এ রকম ঘ্রাণ পুনরুৎপাদন ও ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছেন। তার কথায় এ ঐতিহ্যকে আক্ষরিক অর্থেই অবহেলা করা হয়। গ্যালারি, জাদুঘর, ঐতিহাসিক বাড়িতে মূলত গুরুত্ব দেয়া হয় দৃশ্য বা দেখার বিষয়ে। আমি এমন একটি ইস্যুতে গুরুত্ব দিতে চাই, যা নিয়ে গবেষণা হয়েছে সামান্যই—সেটা হলো ঘ্রাণ, যা মানবসভ্যতার একটি ঐতিহ্য।

বিভিন্ন দেশ সুগন্ধ কিংবা দুর্গন্ধ—সব রকম ঘ্রাণের গুরুত্বকেই আমলে নিচ্ছে। ২০০১ সালে জাপানের পরিবেশমন্ত্রী দেশটির ১০০ সেরা সুগন্ধযুক্ত স্পটকে শনাক্ত ও তালিকাভুক্ত করেছে। এতে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় ধরনের স্থানকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০১৬ সালে তুরস্কের কোচ ইউনিভার্সিটির রিসার্চ সেন্টার ফর আনাতোলিয়ান সিভিলাইজেশন একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল—‘সেন্টস অ্যান্ড দ্য সিটি’। প্রদর্শনীটি ছিল ঘ্রাণের মাধ্যমে পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতার অনুসন্ধান।

ইংল্যান্ডের ওয়াইডেনস শহরে উনিশ ও বিশ শতকের শুরুতে ছিল সাবান ও রাসায়নিক দ্রব্য প্রস্তুতের কারখানা। আজ আর সেসব কারখানা নেই, শহরের ঘ্রাণও বদলে গেছে। কিন্তু একটা শহরের ঘ্রাণ কেন গুরুত্ব রাখে? গোল্ডস্মিথস ইউনিভার্সিটির অ্যালেক্স রাইস-টেলর মনে করেন, কোনো শহরের অর্থনীতি কিংবা সংস্কৃতি নিয়ে অনেক কিছু জানা যায় সেখানকার ঘ্রাণ থেকে। যেমন লন্ডনের রাস্তার পাশে ভারতীয় কারি রেস্তোরাঁগুলোর ঘ্রাণ স্মরণ করে দেবে ইংরেজদের ঔপনিবেশিক অতীতের কথা।

সুগন্ধির ইংরেজি শব্দ পারফিউমের উদ্ভব ল্যাটিন ‘পার ফুমাম’ থেকে। এ লাতিন শব্দ ব্যবহূত হতো ধোঁয়া থেকে উত্পন্ন সুবাসকে বোঝাতে। প্রাথমিককালে মূলত সুগন্ধি গুল্ম পুড়িয়ে পারফিউম উৎপাদিত হতো।

সুগন্ধি কেবল এক ধরনের ঘ্রাণ। প্যারাডক্সিক্যালি সুগন্ধির সেভাবে কোনো উপযোগিতা নেই। কেবল আনন্দ দেয়াই এর কাজ। সুগন্ধির উপাদান স্পর্শ করা গেলেও সুবাসকে মানুষ স্পর্শ করতে পারে না। বাস্তব ও কল্পনা, বাস্তব কিংবা জাদুকরী দুনিয়ার মাঝেই যেন কোথাও সুগন্ধির বাস। আধ্যাত্মিক-ধর্মীয় দুনিয়ায় সুগন্ধির ব্যবহার পাওয়া যায় ইতিহাসের ঊষালগ্নেই। প্রথম সুগন্ধি নির্মাতা বা বিশেষজ্ঞ বলা যায় প্রাচীন মিসরের পুরোহিতদের। জেরুজালেমে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর একটি বাড়ির বেজমেন্টে ওভেন, কুকিং পট, মর্টার পাওয়া গেছে, যা ছিল কাছের একটি মন্দিরের পারফিউম ওয়ার্কশপ। সে আমলের দেয়ালে খোদাইচিত্র কিংবা চিত্রকর্মে সুগন্ধি তৈরির বিস্তারিত বিবরণী পাওয়া যায়। মিসরে পারফিউম ছিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অনুষঙ্গ এবং অভিজাতদের মর্যাদার প্রতীক। পরে গ্রিক ও রোমানদের হাতে এটা শিল্পের মর্যাদা পায়। প্রথম তরল সুগন্ধি তৈরির কৃতিত্ব দেয়া হয় গ্রিকদেরই।

ফরাসি-আর্মেনিয়ান পারফিউমার ফ্রান্সিস কার্কজিয়ানের কথায় খাবার ও ওয়াইনের মতো পারফিউমও ফরাসি সংস্কৃতির অংশ, এটা তাদের জীবনের অংশ। ফরাসিরা ১২ বা ১৩ বছর বয়সেই মেয়েদের দোকানে নিয়ে যায় তাদের পছন্দের পারফিউম বেছে নেয়ার জন্য। সপ্তদশ শতকে ফ্রান্সে সুগন্ধি শিল্প দারুণ সাফল্য পায়। ইংল্যান্ডে অষ্টম হেনরি ও রানী প্রথম এলিজাবেথের শাসনামলে সুগন্ধির ব্যবহার বিস্তৃত হয়। রানী যেখানে যেতেন, সেখানে যথেষ্ট সুগন্ধি ছিটানো হতো, কারণ তিনি কোনো দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারতেন না।

মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতেও সুগন্ধি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। পারসিকরাই প্রথমবারের মতো ফুল থেকে তেল আহরণে পাতন পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল। পারস্যের মানুষ নিত্যদিন সুগন্ধি ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্যে যেসব দেশে বোরখা পরার প্রথা রয়েছে, সেখানে নারীরা সুগন্ধি ব্যবহার করেন তাদের উপস্থিতির অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে।

সুগন্ধি মানুষ যতটা না নিজের জন্য ব্যবহার করে, তার চেয়ে বেশ করে অন্যকে প্রভাবিত, খুশি করতে। কথিত আছে, জুলিয়াস সিজারের হত্যাকাণ্ডের পর ক্লিওপেট্রা মার্ক অ্যান্টনিকে যে নৌকায় স্বাগত জানিয়েছিলেন তার পালে ছিল সুগন্ধি মেশানো।

ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে পারফিউমের দুনিয়া আমূল বদলে যায় ঊনবিংশ শতাব্দীতে। রুচির পরিবর্তন ও রসায়নশাস্ত্রের বিকাশ ভিত্তি গড়ে দেয় আধুনিক পারফিউমারির। উনিশ শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত পারফিউম তৈরি হতো একটি ফুলের সুবাস থেকেই। কিন্তু আজকের দিনে পারফিউম বেশ জটিল এক উপাদান। প্রাকৃতিক এবং বিভিন্ন কৃত্রিম রাসায়নিকের মিশ্রণ ব্যবহূত হয়, যা নোটস বা ওভারনোটস নামে পরিচিত। কৃত্রিম উপাদান এবং আধুনিক রসায়ন নীতি ব্যবহার করে তৈরি করা প্রথম পারফিউম ‘শ্যানেল নাম্বার ফাইভ’।

পুরুষরা যে অডি কোলন ব্যবহার করেন, তা আবিষ্কার করেছিলেন এক ইতালীয় নরসুন্দর, যিনি কাজ করতেন জার্মানির শহর কোলনে। এ উদ্ভাবনের মূল নাম ছিল ‘অ্যাকুয়া অ্যাডমিরাবিলিস’ (প্রশংসনীয় তরল)। এটা ‘অলৌকিক ওষুধ’ নামে বিক্রি হতো। নেপোলিয়ন এ সুগন্ধির প্রশংসা করেছিলেন। সুগন্ধির দুনিয়ার এটিই সবচেয়ে পুরনো, যেটি এখনো উৎপাদিত হচ্ছে।

আবার শুরুর আলোচনায় ফিরে যাওয়া যাক। শুধু রসায়নশাস্ত্রের জ্ঞান দিয়ে সুগন্ধি শিল্প কাজ করতে পারে না। তার প্রথমত দরকার হয় দক্ষ ‘নাক’। এমন মানুষদের, যারা গন্ধ শুকে নতুন সুবাস শনাক্ত এবং তার মান সম্পর্কে ধারণা দিতে পারেন। এদের বলা হয় পারফিউমার। তাদের ‘নোজেজ’ বা নাক বলেও সম্বোধন করা হয়। এ কাজে অন্তত ছয় বছর শিক্ষানবিশি করতে হয়। একদিকে যেমন তাকে বিভিন্ন উপাদানের ঘ্রাণ শুকে শনাক্ত করতে হয়, তেমনি তার কল্পনাশক্তি ও রসায়নবিদ্যার জ্ঞানও প্রয়োজন।

আমরা শুরুতেই কোনো কিছুর যে ঘ্রাণ পাই সেটা পূর্ণাঙ্গ নয়। সুবাসের অনেক সূক্ষ্ম স্তর থাকে। সংগীতের কম্পোজিশনের মতো পারফিউমেরও বিভিন্ন নোটস থাকে। মানুষের ত্বকে লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে পারফিউম তার ওপরের নোটটি উন্মুক্ত করে। এর কিছু সময় পর সুবাস ছড়ায় মাঝের নোট এবং সর্বশেষে মুক্ত হয় বেজ নোট। ক্রেতা যখন দোকানে কোনো পারফিউমের সুবাস নেন, তখন সেটা থাকে প্রথম নোটের। এটা ৫-১০ মিনিট টিকে থাকে। কোনো পারফিউম সত্যিই কেমন, সেটা বুঝতে আপনাকে মাঝের নোটে পৌঁছা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। পারফিউমটি আপনার ত্বকের সঙ্গে মিশে মোটামুটি ২০ মিনিট পর মিডল নোট মুক্ত করে। বেজ নোট প্রকাশিত হয় পারফিউমটি পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার পর এবং মজার ব্যাপার হলো একই পারফিউম ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ত্বকে ভিন্ন সুবাস ছড়াতে পারে।

সুবাস এবং মানুষের মনস্তত্ত্বের যে সম্পর্ক, সেটা বৈজ্ঞানিকভাবে অধ্যয়ন করার বিদ্যার নাম ‘অ্যারোমাকোলজি’। নিউইয়র্কে অলফ্যাক্টরি রিসার্চ ফান্ড এক গবেষণায় দেখেছে এমআরআই স্ক্যানে যাওয়া রোগীর মানসিক চাপ ৬৩ শতাংশ কমে, যদি বাতাসে ভ্যানিলার সুবাস ছড়িয়ে দেয়া হয়।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত