| 15 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-১৩) । রোহিণী ধর্মপাল

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
 
 
দিন চলে যাচ্ছি দ্রুতই। আর যতটা সম্ভব ভালো করেই। অচিরেই যে কুরুরাজসভার মতোই আবার অপমানিত হতে হবে তাঁকে আর এবারও স্বামীরা, বিশেষ করে যুধিষ্ঠির, সেই চুপ করেই থাকবেন, তা কল্পনাও করেন নি দ্রৌপদী। একটু নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি। বরফের ওপর শুয়ে থেকে আর পারছেন না। বুঝতেই পারছেন সময় আর খুব বাকি নেই। কিন্তু না। ভীমের কথা তাঁকে ভাবতেই হবে। এই শেষ সময়ে হলেও, কেউ জানতে পারবেন না তাঁর মনের কথা, তাহলেও তাঁকে বলতেই হবে। ভীমের ভালোবাসাকে নিঃসঙ্গ, মৃতপ্রায় অবস্থাতেও তিনি গ্রহণ করবেন। আর অর্জুন নয়। শুধু ভীম। একা ভীমকেই তিনি ভালোবাসবেন।
 
 মহারাণী সুদেষ্ণা এতটাই ভালোবেসে ফেলেছিলেন “মালিনী’কে, যে এমনকী বিরাট রাজার জন্যেও অনুলেপন বানানোর দায়িত্ব তাঁকেই দিয়েছিলেন। সেই বিশেষ প্রলেপটি কপালে মাখিয়ে দিলে চমৎকার নির্ভাবনায় ঘুম হতো রাজার। কোনও একদিন দ্রৌপদী আরেকজন সখী বলেছিলেন লেপনটি তৈরি করে দিতে, রাজা ঠিক বুঝেছিলেন। সুদেষ্ণা পরদিন হেসে বলেছিলেন, “কিগো মালিনী, রাজা তো তোমার হাতের বাটাবুটিও টের পান! তোমার প্রেমে পড়লেন নাকি! দেখো আবার!” আসলে এই কয়েক মাসে সুদেষ্ণা অনুভব করে ছিলেন এই মেয়েটির কোনও উচ্চাকাঙ্খা নেই। এ একা থাকতেই ভালোবাসে। তাই একে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবুও…….এতো রূপলাবণ্যবতী, এত যৌন আবেদনময়ী আর এমন গুণবতীও, যে খানিক আশঙ্কা তো হয়ই। আর এই আশঙ্কা থেকেই তিনি কীচকের প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বলে দিয়েছিলেন।
 
অন্তঃপুরে রাজা ছাড়া অন্য কেউ ঢুকতে পারেন না। কোথাওই না। তাই দ্রৌপদী নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতেন। বিরাটরাজা এলে তো আগেই জানতে পারতেন। এমনই এক দিনে, দ্রৌপদী চলেছেন পাকশালের দিকে, উত্তরার মহল হয়ে যাবেন, স্থির করেছেন।নকুল সহদেবের খবর ভীমের থেকেই পান। বিশেষ করে তাঁর কাছে কুন্তীর প্রার্থনা তিনি কখনও ভোলেন না। বনবাসে যাওয়ার সময় কুন্তী তাঁর দুই হাত ধরে বলেছিলেন, “আমার সহদেবকে দেখো। ও বড় নরম। মুখচোরা। নিজে থেকে কিছু বলে না।” তাই তিনি বিশেষ করে সবসময়ই সহদেবের প্রতি খেয়াল রাখতেন। এই অজ্ঞাতবাসের সময়েও।  অর্জুনের সঙ্গেও দেখা হবে। ভীমের সঙ্গেও। মাঝে মাঝেই তিনি রাণীকে নানা ধরণের পানীয় তৈরি করে দেন, যা জিভের রুচিবর্ধক, বা স্নায়ুউত্তেজক, কখনও বা ঘুমের জন্য উপকারী। নানা ধরণের মশলা পিশে, ফলের রস দিয়ে সেই সব পানীয় তৈরি করেন দ্রৌপদী। ভীমের থেকেই এইসব কিছু শিখেছেন তিনি। ভীম তো শুধু খেতে ওস্তাদ ছিলেন না, নানারকম রান্নাবান্নাতেও ওস্তাদ ছিলেন। নিত্যনতুন রান্না নিয়ে ভাবতেন। চর্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয়, সবরকম। এমন কিছু নতুন স্বাদের রান্না তিনি মধ্যম পাণ্ডবের থেকে শিখেছেন যা এখন দারুণ ভাবে কাজে লাগছে। দ্রৌপদী একটু হাসলেন। যখনই ভীম নতুন কোনও পদ তৈরি করতেন, দ্রৌপদীকে চাখাতেন। আর উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে থাকতেন। “কিগো, কেমন হয়েছে”? “ঝাল কি একটু কম হবে”? “আরেকটু পোড়া হবে কি”? “মিষ্টি ঠিক আছে”? একেক রান্নায় এক এক প্রশ্ন। আর প্রতিবার দ্রৌপদী বলতে বাধ্য হতেন, “এই ষণ্ডমাংসের কাবাবটি অসাধারণ হয়েছে। ঝাল আর ধোঁয়ার গন্ধটি একেবারে যথাযথ”। 
“আহা! এই পানীয়টি বুঝতেই পারছি না কী কী দিয়েছেন। চমৎকার হয়েছে। প্রতি চুমুকে কী আরাম”! 
“হাঃ হাঃ! তুমিও বুঝতে পারলে না তো! আমলকি আর কাঁচা তেঁতুল গো! সঙ্গে সৈন্ধব লবণ আর সামান্য মিষ্টি। গর্ভবতী মেয়েদের খুব প্রিয় হবে এটি। এটির রঙ একটু শ্যামলা বলে তোমার নামে নাম দিলাম। কৃষ্ণা।”
 
এই পানীয়টি সুদেষ্ণারও বড় পছন্দের। সবটাই আসলে ভীমের কৃতিত্ব। সেদিনও আমলকি আর কাঁচা তেঁতুল সংগ্রহ করতেই যাচ্ছিলেন পাকশালে। তখনই এসে দাঁড়াল পুরুষটি। 
“আরে! কে তুমি সুন্দরী? তোমাকে তো আগে দেখিনি এখানে! আহা আহা! কী কান্তি! কী আশ্চর্য দেহসৌষ্ঠব! এমন পদ্মগন্ধ আসছে কি তোমার শরীরটি থেকে?”

আরো পড়ুন: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-১২) । রোহিণী ধর্মপাল
 
 
দ্রৌপদী ভ্রুকুটি করলেন। কে এই অর্বাচীন পুরুষ! আর অন্তঃপুরেই বা ঢুকল কী করে? এত দুঃসহ স্পর্ধা যে তাঁর শরীর নিয়ে কথা বলে! তিনি পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলেন। এমন কুৎসিত ভাবে বলা কথার উত্তর দেওয়াও অন্যায়! কিন্তু তাঁর মনে একটি ছোট্ট দুশ্চিন্তার মেঘ তৈরি হলো। ভীমকে কি জানাবেন আজকের ঘটনা? নাঃ। থাক্। বরং নিজেই সামলে নেবেন। আর রাণী নিজেও তো আছেন। নিশ্চয়ই এমন কোনও পাষণ্ডের কথা জানলে তাকে উচিত শাস্তি দেবেন তিনি।
 
পাষণ্ড ততক্ষণে রাণীর নিজের ঘরে ঢুকে পড়েছে। কীচক। রাণী সুদেষ্ণার ভাই। বিরাট রাজ্যের অজয় সেনাপতি। যার বাহুবলকে সবাই ভয় পায়। স্বয়ং রাজাও। বৃদ্ধ হয়েছেন। অথচ তাঁর রাজ্যটি অতীব সমৃদ্ধ। কয়েক লক্ষ শুধু গোসম্পদই রয়েছে। এবং আশেপাশের বহু রাজ্য যে তাঁর গোধনের ওপর চোখ দিয়ে আছে, তা তিনি ভালো করেই জানেন। রাজকুমার উত্তীয় এখনও বালক। কে রক্ষা করবে এই অযুত সম্পদ? কীচকই ভরসা। কীচক নিজেও জানে সে কথা। তাই সে সোজা দিদির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কে এই সুন্দরী তোমার মহলে? আগে তো দেখিনি। তাকে দেখে পর্যন্ত আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ওই রমণীকে আমার বিছানায় চাই। যেভাবে হোক। বিবাহিতা হোক বা কুমারী,  একে না পেলে আমার শরীর ঠাণ্ডা হবে না!”
“কী বলছ কীচক? কার কথা বলছ? মালিনী”? 
“মালিনী”? হা হা করে হেসে উঠল কীচক। 
“দারুণ নাম তো। মালিনী। আমার বাগানের মালিনী হবে ও। আমার দেহের। আমি ভুলতে পারছি না ওর যৌবনবতী শরীরকে। অমন রূপের যে আধার, তাকে দাসী করে রেখেছ? আমার সব কিছু ওর পায়ে ঢালতে রাজী আছি আমি।ওকে শুধু আমার কাছে পাঠাও”।
“এ হয় না কীচক। ওর পাঁচজন গন্ধর্ব স্বামী আছে। আর আমার কাছে মোটেও দাসী রূপে ও থাকে না। আমি ওকে সম্মান করি। আমি কখনোই তোমার কাছে ওকে সঁপে দিতে পারব না।”
 
 “পারবে না? বলো কী? আমাকে প্রত্যাখ্যান করছ? জানো, এর কী ফল হতে পারে? আর শুধু আমার জন্য কেন, নিজের জন্যেও ভাবো। এমন একটি রসালো শরীর পেলে মহারাজ তো তোমাকেই ভুলে যাবেন! বুড়ো রাজার তো বীর্যস্খলন হয়ে যাবে গো দিদি! নিজেকে বাঁচাও। সঙ্গে আমাকেও”।
 
সুদেষ্ণা ভুলেই গেলেন যে এই দশ মাস মালিনী রাজার আসার খবর পেলেই নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে। রাজার জন্য যা কিছু বানিয়েছে, রাণীর হাতেই এনে দিয়েছে। এমনকী, রাজা জিজ্ঞেস করলে যাতে মালিনীর কথা না ওঠে, তাই সবটুকু রাণীকে শিখিয়েও দিয়েছে। সব ভুলে গেলেন রাণী। শুধু কীচককে বললেন, “কিভাবে তোমার কাছে পাঠাব আমি? এমনি বললে তো যাবে না। তুমি বরং তোমার প্রাসাদে কোনও উৎসবের আয়োজন করো। সেই অছিলায় আমি কিছু না কিছু আনার কথা বলে ওকে পাঠাব। তারপর কিন্তু তোমার দায়িত্ব। “
“বেশ বেশ। এই তো বুদ্ধিমতীর মতো কথা! কী দারুণ উপায় বার করলে! আর নিশ্চিন্ত থাকো দিদি, জীবনে কত মেয়েকে সঙ্গিনী করেছি! একে তো মাথায় তুলে রাখব। আমার দেহমন তোলপাড় হয়ে গেছে একে দেখে। যতক্ষণ না এই মেয়ের সঙ্গে সঙ্গম না হচ্ছে, আমার শান্তি নেই। আমি উৎসবের ব্যবস্থা করে তোমাকে খবর পাঠাচ্ছি।”
 
ঠিক দুটি সূর্যোদয়ের পরে সুদেষ্ণা ডেকে পাঠালেন দ্রৌপদীকে। 
“মালিনী, একটি বিশেষ কাছে তোমাকে ডেকেছি। আমার ভাই এবং এই রাজ্যের সেনাপতি মহামান্য কীচক তাঁর প্রাসাদে আজ একটি উৎসবের আয়োজন করেছেন। সেখানে আজ অতি উত্তম ও মহার্ঘ্য সব সুরা তৈরি হচ্ছে। আমি চাই, তুমি নিজে গিয়ে আমার জন্য সেই সুরা নিয়ে এসো।”
error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত