| 19 জুন 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: দুইবোন । ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য্য

আনুমানিক পঠনকাল: 26 মিনিট

 

 

প্রথম পর্ব

 

 

“ নাঃ, শীলাদেবী, আমি আপনাকে এ ব্যাপারে কোনও আশা দিতে পারছি না! আই অ্যাম রিয়েলি সরি!”, ম্লান মুখে মাথা নাড়লেন ডাক্তার দেবরাজ চ্যাটার্জি। ডাক্তার চ্যাটার্জি এই বাড়ির হাউস ফিজিশিয়ান। গত প্রায় দশ বছর ধরে এ বাড়ির প্রতিটি মানুষের ছোট বড় নানান রোগের চিকিৎসা করে আসছেন তিনি। শহরের যে ক’জন নাম করা মেডিসিনের ডাক্তার আছেন, তাঁদের মধ্যে ডাক্তার দেবরাজ চ্যাটার্জি প্রথম সারিতেই পড়েন। তার চেয়েও বড় কথা, এই দীর্ঘ সময়ে এ বাড়ির সাথে তাঁর সম্পর্ক এখন ডাক্তার রোগী পেরিয়ে হয়ে এসেছে প্রায় আত্মীয়তার মতোই। তাই কোনও বিষয়ে কিছু বললে যে সবদিক নিখুঁত ভাবে খতিয়ে দেখেই তিনি তা বলছেন তাতে কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

 

বাড়ির কর্তা সুনির্মল মুখার্জির ভেঙে পড়া অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ডাক্তার চ্যাটার্জি,” কি আর বলবো বলো সুনির্মল! এই বিশ্রি টাইপের চিকেন পক্সটা এবার এখানে খুব হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে পুরোপুরি সেরে ওঠা অবধি পেশেন্টকে কমপ্লিট রেস্টে থাকতেই হবে, এতটাই ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে এটা আজকাল। তাছাড়া সাবধানতার দিক থেকেও সেটা জরুরি। বনিকে তাই একদম বিছানা ছেড়ে উঠতে দেওয়া যাবে না। দেখাশোনার ক্ষেত্রে অনেক সময় এক মুহূর্তের ভুল চুকও হঠাৎ করে কন্ডিশন এতটাই ফল করিয়ে দিচ্ছে, যে সাধারণ চিকেন পক্সের পেশেন্টকে অবধি হাসপাতালে ভর্তি করাতে হচ্ছে! স্বাভাবিক ইমুউনিটি সিস্টেমটা টোট্যালি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ভেতর থেকে। আর, বাচ্চা তো, ওদের তাই একটু এক্সট্রা কেয়ারে তো রাখতেই হবে। এমনিতেও বনি একটু ডেলিকেট টাইপের। তাই ওর ক্ষেত্রে শুধু এই পক্সটা সেরে যাওয়া অবধি নয়, তার পরেও অন্তত মাসখানেক ফুল বেডরেস্ট একেবারে মাস্ট!”

 

আর কোনও কথা না বলে এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ডাক্তার চ্যাটার্জি। এতক্ষণ ধরে কথার ফাঁকে ফাঁকে লিখে ফেলা লম্বা দু’পাতা জোড়া প্রেসক্রিপশনটি সুনির্মলবাবুকে দিয়ে জিভ দিয়ে একটা আক্ষেপের চুক চুক আওয়াজ করে ভারী মুখে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন তিনি।

 

সুনির্মলবাবু চোখ কুঁচকে প্রেসক্রিপশনটি দেখলেন। চেনা ওষুধের সাথে সাথে নাম না জানা অন্তত দশরকম নতুন ওষুধের নাম লেখা তাতে। পেনকিলারও আছে দুটি। আর, দ্বিতীয় পাতাটি জুড়ে শুধুই ইন্সট্রাকশন। বুক চিরে একটি ভারী শ্বাস বেড়িয়ে এল তাঁর। বিছানার ওপরে স্থির হয়ে বসে থাকা শীলাদেবীর হাতে কাগজটি দিলেন তিনি। শীলাদেবী প্রেসক্রিপশনটি হাতে নিয়েই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। এতক্ষণ অতিকষ্টে এই কান্নাটুকু চেপে রেখেছিলেন তিনি। যতই কাছের মানুষ হন, ডাক্তারের সামনে নিজের দুর্বলতা দেখাতে চাননি শীলাদেবী। কিন্তু এখন আর পারলেন না। ভেতরের হাহাকারটা সহ্যের সব বাঁধ ভেঙে বেড়িয়ে এল এবার।

 

সুনির্মলবাবু করুণ চোখে একদৃষ্টে তাঁর স্ত্রীর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। কোনও প্রকার সান্ত্বনা দেওয়ার মতো অবস্থা এখন তাঁরও নয়। ধীরে ধীরে ডাক্তারের ছেড়ে যাওয়া চেয়ারটায় বসে পড়লেন তিনি। কি ভীষণ ক্লান্তি তাঁর সারা শরীর জুড়ে, কি অদ্ভুত শূন্যতা! উঃ, ভাগ্যের কি পরিহাস! এতটাও নিষ্ঠুর যে ভাগ্যদেবতা কখনও তাঁদের প্রতি হতে পারেন, তিনি স্বপ্নেও কল্পনা করেননি! আর মাত্র দুটো সপ্তাহ বাকি ছিল! পনেরোটি দিন! সেই ধৈর্য্যটুকুও সইল না ওপরওয়ালার! মোটে এই ক’টি দিন নির্বিঘ্নে পার করে দিতে পারলেই তো স্কুল জীবনের শেষ বড় পরীক্ষাটায় নির্বিঘ্নে বসতে পারত বনি! উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। স্কুলজীবনের শেষ বড় পরীক্ষা। বাল্যকাল অফিসিয়ালি শেষ করে সত্যি সত্যি বড় হয়ে ওঠার প্রথম ধাপে উত্তরণের শুরুর ফাইনাল স্টেপ। উঃ, আর ভাবতে পারেন না সুনির্মলবাবু! মাথাটা একেবারে যেন ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে তাঁর!

 

সুনির্মলবাবু আড়চোখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। শীলা এখনও ফুলে ফুলে উঠে নীরবে কেঁদেই যাচ্ছে। কিছু বললেন না তিনি। ওর ভেতরের কষ্টটা তিনি যথার্থই হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারছেন। বনির আজকের যাবতীয় সাফল্যের পেছনে শীলার অবদান অপরিসীম। শহরের সবচেয়ে নামী সরকারি গার্লস স্কুলটির ফার্স্ট গার্ল তাঁদের বনি। শুধু পরীক্ষার নম্বরের ক্ষেত্রেই নয়, এর পাশাপাশি জেলা ও রাজ্যস্তরে যতরকম অ্যাকাডেমিক প্রতিযোগিতা হয়, সবকটিতেই বনি ধারাবাহিক ভাবে সফল। মাধ্যমিকেও সে বোর্ডে প্রথম দশজনের মধ্যেই ছিল। তাই এবারেও তাকে ঘিরে আশা ছিল তুঙ্গে, আর তা শুধু এই মুখার্জি পরিবারেই নয়, স্কুলের তরফ থেকেও বনি এবারের বোর্ডের পরীক্ষায় এই জেলার অন্যতম সেরা বাজি। এহেন পরিস্থিতিতে এই বিনা মেঘে বজ্রপাত! ব্যাপারটা বোঝা মাত্রই যেন একেবারে ভিত থেকে নড়ে গিয়েছেন তাঁরা। বিশেষ করে শীলা। শীলার সবটুকু জুড়েই যে ছিল বনি! জীবনের এই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটির জন্য গত প্রায় দু’বছর ধরে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল মা আর মেয়ে দুজনেই। এটাই ছিল এতটা সময় ধরে তাদের একমাত্র পাখির চোখ। তারপর, আজকের এই অভাবনীয় পরিস্থিতি!

 

সুনির্মলবাবু একটা গভীর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ভালো লাগুক, আর, নাই লাগুক, বাস্তবকে স্বীকার না করে কোনও উপায় নেই। মন্থর পায়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে ভেতরের বড় ঘরটির দরজার সামনে গিয়ে চুপটি করে দাঁড়ালেন তিনি। ক্ষণকাল পরে খোলা দরজার ভারী সবুজরঙা পর্দা সরিয়ে সন্তর্পণে ভিতরে উঁকি দিলেন। এই ঘরটিই বনির জন্য বরাদ্দ হয়েছে এখন। ভীষণ ছোঁয়াচে এই রোগটির থেকে বাঁচতে রোগীর জন্যে একটি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থা করা এ রোগের চিকিৎসায় খুবই জরুরি। মশারি ঢাকা আয়তাকার বড় বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে থাকা বনির দিকে তাকিয়েই হঠাৎই কেঁপে উঠলেন তিনি। ওটা কে ওখানে! মিনি না! তাঁর থেকে সোজাসুজি ডানদিকের দূর প্রান্তের কোণটিতে বিছানার কাঠের ছত্রীটিকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে একদৃষ্টে ঘুমন্ত বনির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে মিনি! এই অত্যাশ্চর্য দৃশ্যটা দেখে মুহুর্তের জন্য যেন একেবারে হতবাক হয়ে গেলেন সুনির্মলবাবু। এও কি সম্ভব!

 

মিনি বনির থেকে তিন বছরের ছোট। পিঠোপিঠি হলেও দুজনের চরিত্রে আকাশ পাতাল তফাৎ। বনি যতটা শান্ত আর মনোযোগী, মিনি ততটাই দুরন্ত আর দুষ্টু। দুই মেরুর এই দুই মেয়েকে সামলাতে গিয়ে তাঁদের দুজনের প্রায় নাভিশ্বাস ওঠার দশা। সবচেয়ে বেশি করে অবশ্য দৈনন্দিনের এই কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে শীলাকেই, আর, তার জন্যে কখনও সখনও মাথাও ঠিক রাখতে পারেনি সে। লঘু দোষে গুরুদণ্ডও হয়েছে তাই মাঝে মধ্যে। আর, এইসব উঁচ নীচ মিলিয়ে, গত ক’টি বছর ধরে যত সময় এগিয়েছে, দুই বোনের মধ্যেকার মানসিক ব্যবধান যেন ততই বেড়েছে। তার ওপর কৈশোরের স্বাভাবিক অস্থির চরিত্র ও চারপাশের এক অসম্ভব প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এই সমস্যার সমাধান তো করেইনি, বরং ক্রমাগত দূর থেকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছিল ওদের দুজনকে। এই নিয়ে তাঁদের দুজনেরই দুশ্চিন্তার অবধি ছিল না। তাই আজ অকস্মাৎ এমন একটি আশ্চর্য সহদোরী ভালোবাসার ছবি দেখে যারপরনাই বিস্মিত হয়ে গেলেন সুনির্মলবাবু। সেই সঙ্গে, ভেতরে ভেতরে ভারী আনন্দিতও হলেন! ক’সপ্তাহ আগেই মিনির পক্স হয়েছিল। কাজেই এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে খুব সাবধানে রাখা হলেও মিনির থেকেই কোনভাবে বনির এই ছোঁয়াচে রোগটি হয়েছে। তবে এর ফলশ্রুতি হিসেবে মিনির আত্মগ্লানি যে কোনভাবে তাদের দুই বোনের মধ্যেকার বিষিয়ে যাওয়া সম্পর্কটিকে আবার নতুন করে আলোর পথ দেখাতে পারে এটা সত্যিই অভাবনীয়! একটা হালকা হাসির রেখা ফুটল সুনির্মলবাবুর মুখে। যাক, হাজার অন্ধকারের মধ্যেও তাহলে অযাচিতভাবে আশার আলোর দেখা পাওয়া যায়! দুই বোনের এই সুন্দর একান্ত মুহুর্তটিকে পর্দার ওপারেই রেখে ধীর ধীরে আবার বসার ঘরের দিকে পা বাড়ালেন তিনি। সময়টা কঠিন হলেও অদ্ভুত ভাবে এখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত বোধ করছেন তিনি।

 

************

 

বিশাল বড় শোবার ঘরটির অন্য প্রান্তে থাকলেও বাবার উপস্থিতি প্রথম মুহুর্তটি থেকেই অনুভব করেছিল মিনি। বয়েসে এখনও কিশোরী হলেও মাথা আর চোখ দুইই আশ্চর্যরকম তীক্ষ্ণ তার। বিশেষ করে এই সময়, যখন কিনা তার বড় দিদি মাত্র ক’দিন আগেই তার থেকে এই সিজনের সবচেয়ে ভয়ানক আর ছোঁয়াচে রোগটি বাঁধিয়েছে। পক্স মিনির প্রথমে হলেও এখন সে সম্পূর্ণ সেরে উঠেছে, আর তাই, অদূর ভবিষ্যতে নতুন করে এই রোগে পড়ার সম্ভাবনা তার নেই বললেই চলে। কাজেই এ বিষয়ে সে এখন সম্পূর্ণ ভয়শূন্য।

 

ঝট করে একবার ঘরের খোলা দরজাটার দিকে দেখে নেয় মিনি। তার বুকের মধ্যে এখন কানফাটানো দুম দুম ড্রামের আওয়াজ, ঠিক যেন দুর্গাপুজোর অষ্টমী রাত্রের সন্ধিপুজোর বলির পাঁঠার চিৎকার ঢাকতে হাজার ঢাকবাদ্যির শব্দ হয়! সারা শরীরটা এক অজানা উত্তেজনায় থর থর করে কাঁপছে তার! খুব সাবধানে আলতো হাতে মশারির একটা কোণা তুলে ধরে পরম আগ্রহে বনির লালচে ছোট ছোট গোটায় ঢেকে যাওয়া অঘোরে ঘুমন্ত মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকায় সে। উঃ, কি শান্তি! সব অপেক্ষার কি মধুর অবসান! অবশেষে, হ্যাঁ, অবশেষে তাহলে কাজ তার পুরোপুরি কমপ্লিট!

 

 

 

দ্বিতীয় পর্ব

 

“ আরেঃ, মেয়ে হয়েছে!”, অদ্ভুত একটা হাসি কান্না মাখা মুখ নিয়ে ওয়ার্ডের বাইরে বেড়িয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠল নমিতা, হাসপাতালে শীলার দায়িত্বে থাকা মাঝবয়েসী নার্স।

 

বাইরে তখন অধীর অপেক্ষায় ঠায় বসে শীলার মা সুনীতাদেবী, শীলার একমাত্র ননদ মণিকা আর শীলার স্বামী সুনির্মল মুখার্জি। সুনীতাদেবী হতবাক হয়ে নার্সটির মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। কথাগুলো যেন তাঁর কানেই গেল না! আবার মেয়ে! এই তো বছর তিনেক আগেই বনি হল। কি ফুটফুটে সুন্দর আর শান্ত পরীর মতো এক মেয়ে, এবার তো অন্তত তাহলে একটা ছেলে হতে পারত! কত আশা নিয়ে এসেছিলেন তিনি! বুকের ভেতরটা চিন চিন করে উঠল তাঁর। নাঃ, ভগবান তাঁর প্রতি মোটেই প্রসন্ন নন। রোববার রোববার করে দোকান থেকে গণ্ডা গণ্ডা সন্দেশ কিনে না এনে বাড়িতে নিজের হাতে ভালো করে খাঁটি ঘি দিয়ে পায়েস বানিয়ে দিলেই পারতেন! কষ্ট না হয় একটু হত, তবু এ দিনটা তো আর দেখতে হত না!

 

“ বাহ্ বাহ্ বাহ্!”, আনন্দে একেবারে উৎফুল্ল হয়ে আশেপাশের পরিবেশ ভুলে গিয়ে গলা সপ্তমে তুলে বলে উঠলেন সুনির্মলবাবু,” আহ্, কি শান্তি, কি শান্তি! অবশেষে মা সরস্বতী এলেন আমার ঘরে! এইবার ঘরটা যেন আমার পুরোপুরি ভরে গেল! প্রথমবার এসেছিলেন মা লক্ষ্মী, আর এইবার, মা সরস্বতী। ধনবৃদ্ধি আর জ্ঞানবৃদ্ধি, দুইই এবার হাতের মুঠোয়! কি সৌভাগ্য! কি সৌভাগ্য! চলো, চলো, সবাই ভেতরে চলো তো এবার! আমার ছোট্ট মায়ের মুখটা একবার দেখি!”

 

কথা শেষ করেই হড়বড় করে নিজেই আগেভাগে নার্সকে ঠেলেঠুলে ওয়ার্ডের দরজা খুলে কেবিনের মধ্যে ঢুকে গেলেন সুনির্মলবাবু। তাঁর পেছন পেছন গেল মণিকাও। সবার শেষে আস্তে আস্তে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন সুনীতাদেবী। শরীরটা এই মুহূর্তে ভীষণ ভারী লাগছে তাঁর। পা যেন আর চলতেই চাইছে না। কোনমতে ধীর পদক্ষেপে দরজা ঠেলে কেবিনে প্রবেশ করলেন তিনি। বাম কোণে জানালার ধারে শীলার প্রশস্ত বেড। বেডের পাশেই একটি ছোট আলাদা দোলনা মতোন বেডে সদ্যজাত বাচ্চাকে শোয়ানো। কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে আগাপাশতলা জরিপ করলেন সুনীতাদেবী। তুলোর মতো নরম আর সদ্য ফোটা শালিখের ছানার মতো তুলতুলে একটা মিষ্টি মুখের বাচ্চা, কিন্তু, রঙটি গমের মতো, ঠিক যেমনটি তাঁর জামাই সুনির্মলের। ওঃ, ঠাকুর! বুক খালি করে আর একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এল তাঁর। নাঃ, ভগবান সত্যিই এবার তাঁর প্রতি মোটেই প্রসন্ন নন!

 

************

 

মেয়ে হওয়ার পরে খুব বেশিদিন শীলা তার বাপের বাড়িতে থাকল না। আসলে সুনীতাদেবী শারীরিকভাবে বিশেষ শক্তসমর্থ নন। বহুদিন ধরেই আর্থ্রাইটিসে ভুগছেন তিনি। তাই দেখাশোনা করার অসুবিধা। ফলে মাত্র মাস ছয়েক থেকেই শীলাদেবী ছোট্ট মেয়েদুটিকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতার বাপের বাড়ি ছেড়ে তাঁর স্বামীর কাছে উত্তরবঙ্গে চলে গেলেন। সেখানেই এক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ান সুনির্মলবাবু। এখানে এসে ভালো করে এবার গুছিয়ে থিতু হয়ে বসলেন দুজনে। ছোট ছোট দুটি ফুলের মতো মেয়েকে নিয়ে শুরু হল তাঁদের ছোট্ট সংসার। বড়টির সাথে মিলিয়ে ছোট মেয়েটির নাম রাখা হল মিনি। স্ত্রী আর মেয়েদের দেখাশোনা করার জন্যে একজন সারাক্ষণের গভর্নেস রেখে দিলেন সুনির্মলবাবু। কিন্তু গভর্নেস থাকলেও ছোট্ট বনি নিজে থেকেই বোন মিনির নানান কাজ নিজে হাতে করতে ভালোবাসত। সারাদিন মিনির বিছানার পাশে ঠায় বসে থাকত সে, কতরকম আগডুম বাগডুম খেলা খেলত দুটিতে, আবার জেদ করে মা বা আয়ার বদলে খাইয়েও দিত কখনও কখনও, তেল মাখিয়ে রোদ্দুরে নিয়ে গিয়ে লাল রঙের ছোট্ট গামলায় বসিয়ে চান করাত যত্ন করে, এমনকি ওদের মা যখন মিনির পটি পরিষ্কার করত, তখনও শান্ত হয়ে চুপটি করে সে বসে থাকত মিনির পাশটিতেই। মিনিও সে সময় কিচ্ছুটি না বুঝলেও একই রকম চোখে হারাত দিদিকে। কখনও কখনও পাশে না দেখলেই ভীষণ চঞ্চল হয়ে উঠত। তারপর দৌড়ে বনি কাছে এসে তার মুখের ওপর ঝুঁকে পরে হাসলে তবে শান্তি! ছোট্ট বাগানঘেরা একতলা বাড়িটা তখন যেন এই দুটি শিশুর নিষ্পাপ ভালোবাসার সৌরভে সারাক্ষণ একেবারে ম ম করত। কি অপার্থিব আনন্দের দিন ছিল সেসব!

 

তারপর সময় কাটতে লাগল দ্রুত, আর, দেখতে দেখতে দুই বোনও বড় হয়ে উঠতে লাগল ধীরে ধীরে। বাইরে খুব বেশি বন্ধু ছিল না দুজনের কারুরই। দরকারই পড়ত না। একে অন্যের সাথে মিলেমিশে খেলেধুলে দিব্যি সময় কেটে যেত তাদের। তারপর একসময় বনি বাড়ি থেকে একটু দূরের একটা নার্সারি স্কুলে ভর্তি হল। যতটুকু সময় সে না থাকত, মিনি দিদির অপেক্ষায় বাড়িতে বসে থাকত অধীর চিত্তে। কখন দিদি আসবে, আর, কখন তারা আবার একসঙ্গে খেলবে! বাড়ির পাশেই ছিল চারিদিক পথ দিয়ে ঘেরা একটি ছোট মাঠ। বিকেল হলেই দুজনে মিলে ব্যাডমিন্টন, কিতকিত, লুকোচুরি আর ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে যেত সেখানে। তাছাড়াও ছিল আরও কত রকমের নতুন নতুন দুষ্টুমি। আর এই সবকিছুতেই দিদি বনি ছিল বোনের একমাত্র পথপ্রদর্শক। মিনি শুধু দিদিকে অনুসরণ করত আর রকমারি সব দুষ্টুমি শিখত রোজ। একে অন্যের প্রাণ ছিল দুজনে। এমনকি সাজগোজের ক্ষেত্রেও পুজো হোক কি নববর্ষ, দুজনে এক রকমের জামা পড়বেই, কোনও ওজর শুনবে না! শীলাদেবী তাই বছরের এই বিশেষ দুটি সময়ে মনে করে দুজনের জন্যে অর্ডার দিয়ে দোকান থেকে একইরকম জামা বানাতেন। দুজনে একসাথে তাই পরে যখন বেড়াতে বেড়োত, কি সুন্দরই না দেখাত!

 

দিন গড়াতে লাগল নিজের নিয়মে। সময়মতো নার্সারি পেরিয়ে শহরের বড় স্কুলে ভর্তি হল বনি। তারপর দেখতে দেখতে বছর ঘুরল আরও। বনি ধীরে ধীরে ওপরের ক্লাসে উঠতে লাগল, আর, একসময় সেই একই নার্সারি স্কুলের গণ্ডি ডিঙিয়ে মিনিও এসে ভর্তি হল সেই দিদি বনিরই বড় স্কুলে।

 

************

 

“ আরে, শীলা যে! ক’দ্দিন বাদে!”

 

শীলাদেবী চমকে উঠে পেছন ফিরতেই একেবারে মিসেস রীমা দাশগুপ্তের মুখোমুখি হয়ে গেলেন।

 

“ভাগ্যিস, রমেনের রিসেপশনে এলাম, নইলে তো দেখাই হত না! ভালো আছো তো! আর, মেয়েরা? তবে তোমার মেয়েদের স্কুলের হেড মিস্ট্রেস রমাদেবী তো আমাদের পাড়াতেই থাকেন, প্রায়ই দেখা হয়, আর দেখা হলেই বনির, মানে, তোমার বড় মেয়েটির কথা তোলেন। রিয়েলি শীলা, শি ইজ গ্রোয়িং সাচ আ প্রিটি ডিয়ার গার্ল! লুক অ্যাট হার! ঠিক যেন একটা মিষ্টি পরী! আর, আদবকায়দাতেও কি ভীষণ প্রপার অ্যান্ড কারেক্ট! সো ওবিডিয়েন্ট অ্যান্ড সো পেশেন্ট শি ইজ অলওয়েজ, তাও আবার এত ছোট বয়েসেই, জাস্ট ভাবা যায় না! ইউ আর সাচ আ লাকি মাদার শীলা!”, রীমাদেবীর গাঢ় কাজলে আঁকা চোখদুটো যেন গর্বে চকচক করতে লাগল। রীমা দাশগুপ্ত সুনির্মলবাবুর কলেজে ইংরাজী পড়ান। স্বভাবে অত্যন্ত কঠোর এবং অনমনীয় প্রকৃতির হওয়ায় ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয় নন। তবে বিষয়জ্ঞানের দিক থেকে তাঁর মতো শিক্ষক এই শহরে প্রায় নেই বললেই চলে। তাই তাঁর সঙ্গ সময় বিশেষে তেমন সুখকর না হলেও ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে তাঁর মতামতের মূল্য অগ্রাহ্য করা যায় না।

 

শীলাদেবী আড়চোখে মিসেস দাশগুপ্তের দিকে তাকালেন। একটু তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা বনিকে এখন খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করছেন রীমাদেবী। সারা মুখে একটা আশ্চর্য পরিতৃপ্তির ছাপ তাঁর। আসলে এতদিনে আর শুধু সুনির্মলবাবুর কোলিগ নন, এই মুখার্জি পরিবারের এক প্রকার ফ্যামিলি ফ্রেন্ডই হয়ে গেছেন তিনি। এইটুকুনি বয়েস থেকে বনি আর মিনিকে নিজের চোখের সামনে বড় হতে দেখেছেন রীমাদেবী। তাই ওদের ব্যাপারে বরাবর নিজের সন্তানের মতোই খোলামেলা মতামত দিয়ে থাকেন তিনি। তবে ধীরে ধীরে যত সময় গড়িয়েছে, বনিই হয়ে উঠেছে তাঁর প্রিয়, আর, মিনি সরে গেছে দূরে। আসলে জীবনের সব ক্ষেত্রেই নিয়মানুবর্তিতাকে ভীষণই গুরুত্ব দেন রীমাদেবী। তাঁর মতে ঘরের মধ্যে যাই হোক, বাড়ির বাইরে পা রাখা মাত্র কারুর সঙ্গেই কিছুতেই একচুলও বেহিসেবি ব্যবহার করা যাবে না। আর এই বিশেষ গুণটির কারণেই বনি ধীরে ধীরে ওর স্কুলের সব টিচারের সাথে সাথে এখন রীমাদেবীরও চোখের মণি হয়ে উঠেছে।

 

“ কিন্তু তোমার এই ছোটটা! উঃ, মূর্তিমান হনুমান একটা যেন!”, রীমাদেবীর তীক্ষ্ণ শব্দবাণে হঠাৎই চটকা ভাঙে শীলাদেবীর,” রমার কাছেও তো শুনছি মাঝে মাঝেই। আর, ওদের স্কুলের আরও অনেক টিচারও আমার বিশেষ পরিচিত, ফলে তাদের মুখেও প্রায়শই শুনতে পাই, একেবারে হাড়জ্বালানি বিচ্ছু হয়েছে ও! বনির একেবারে উল্টো, পুরো অন্য মেরু যেন! এই নিয়ে স্কুল থেকে তোমাকে ফি হপ্তায় গার্জিয়ান কল যে করে না এই তোমার চোদ্দ পুরুষের ভাগ্যি! আই অ্যাম টেলিং ইউ শীলা, ইউ উইল নিড টনস অফ পেশেন্স টু ডিল উইথ হার! ভেরি স্যাড ইট ইজ, ইনডিড, ভেরি ভেরি স্যাড! এনি ওয়েজ, নাইস মিটিং ইউ ডিয়ার, একদিন বাড়িতে এসো না, বসে কথা হবে তাহলে। কেমন!”, রীমাদেবী আর কথা না বাড়িয়ে তর তর করে হেঁটে সামনেই অন্য একজন পরিচিতা মহিলার দিকে এগিয়ে গেলেন।

 

শীলাদেবীর মাথাটা এক ঝটকায় গরম হয়ে গেল। সব জায়গায় শুধু এই। একটা কোথাও যদি মিনির সম্বন্ধে দুটো ভালো কথা কানে আসে তাঁর! হাড় জ্বালিয়ে দিল মেয়েটা একেবারে! দ্রুত এদিক ওদিক চোখ ঘোরালেন তিনি। কোথায় বদমাশটা! বনির মতোই একই ডিজাইনের থাক থাক একটা সাদা রঙা ফ্রক আজ পড়ে এসেছে মিনি। খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎই সোজা অনেকটা দূরের রিসেপশন মঞ্চের উপর চোখ আটকে গেল শীলাদেবীর। ওই তো মিনি! তর তর করে কোনমতে ভীড় ঠেলে একটু কাছে এগোতেই হাড়হিম করা দৃশ্যটা চোখে পড়ল তাঁর। ও কি করছে মিনি! মঞ্চের উপরে কারুর একটা ছোট্ট সাদা বড় বড় লোমওলা মোটাসোটা কুকুর থেবরে বসে আছে আর ওটার ঠিক মুখের সামনে মুখ নিয়ে গিয়ে মাথা নেড়ে নেড়ে বিশ্রিভাবে জিভ বের করে ভ্যাঙাচ্ছে মিনি! এবং, ওর চারপাশ ঘিরে কতকগুলো ওরই বয়েসী ছেলে মেয়ে জোরে জোরে হাততালি দিতে দিতে মনের আনন্দে ক্রমাগত লাফাচ্ছে। কুকুরের মালিককে আশেপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

 

প্রচন্ড রাগে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে তীরবেগে মঞ্চের ওপর ছুটে গিয়ে পেছন থেকে এক কান ধরে মিনিকে প্রায় শূন্যে তুলে ফেললেন শীলাদেবী। বেগতিক দেখে বাকি ছেলেমেয়েগুলো মুহূর্তের মধ্যে হাওয়া হয়ে গেল। মিনি কয়েক সেকেন্ডের জন্যে প্রথমে বুঝতেই পারল না হচ্ছেটা কি! কিন্তু পরক্ষণেই মুখের সামনে মায়ের রাগত মূর্তি দেখে বুঝল এযাত্রা সত্যিই বিপদে পড়েছে সে। উদভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক তাকাতেই মায়ের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বনির ওপর চোখ পড়ল তার। মুহূর্ত কয়েক মাত্র, তারপরেই চমকে ওঠে সে! এ কেমন ভাবে তাকিয়ে আছে দিদি তার দিকে! ওকে যে এখন একদম মায়ের মতোই দেখাচ্ছে! মিনির এই মুহূর্তে মায়ের ওপর যত না রাগ হল, তার চেয়েও বেশি অবাক হয়ে গেল সে, তার এই কঠিন পরিস্থিতিতে বনির এমন নিশ্চল হয়ে বোবার মতোন দাঁড়িয়ে থাকা দেখে! এমনটা তো হবার কথা ছিল না! সব দুষ্টুমিতে বনিই যে তার একমাত্র পার্টনার! আজকে তাহলে এমন সুর কাটল কেন!

 

বনি একবার মিনির কালো হয়ে আসা অসহায় মুখের দিকে তাকাল, এবং, পরমুহুর্তেই মুখ ঘুরিয়ে স্থির দৃষ্টিতে অন্যদিকে চেয়ে রইল। এই অশোভন পরিস্থিতির মুখোমুখি সে কোনমতেই হতে চায় না। তার পক্ষে এ জাস্ট অসম্ভব। ফর গডস্ সেক, বনি মুখার্জি সে। ঘরের মধ্যে যাই হোক, পাবলিক প্লেসে কোনও মূল্যেই তার সযত্নে গড়ে তোলা এতদিনের গুড গার্ল ইমেজ সে নষ্ট করতে পারবে না। কিছুতেই না!

 

**********

 

সেদিন রাতে সচেতনভাবেই মিনি তার দিদির পাশ থেকে সরে গিয়ে বিছানার এক কোণে কুণ্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে রইল, রোজকার মতোন দিদির গলা আঁকড়ে নয়। আর, এর পর থেকে প্রতি রাতে এই একই নিয়ম বজায় রইল চিরদিনের মতো।

 

 

তৃতীয় পর্ব

 

“ এবার ক্লাস নাইন।“, মঞ্চের ওপর থেকে স্কুলের প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন অনুষ্ঠানের ঘোষিকা রীতা ম্যাডামের জলদগম্ভীর গলা ভেসে এল,” আর, প্রতিবারের মতোই এই বছরও ক্লাস নাইনে ফার্স্ট হয়েছে বনি মুখার্জি। আই আস্ক বনি মুখার্জি টু ইমিডিয়েটলি কাম অন দিস স্টেজ টু কালেক্ট হার ট্রফি। বনি মুখার্জি!”

 

মাত্র কয়েক মিনিট আগেই বনি এসে বসেছিল তার চেয়ারটিতে। গত বছরেও অ্যাকাডেমিক আর এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি মিলিয়ে মোট পাঁচটি প্রাইজ পেয়েছে সে। শীলাদেবী চট করে বনির হাত থেকে সোনালি রঙের চকচকে কাগজে মোড়া সব ক’টি প্রাইজের প্যাকেট তুলে নিয়েই ওকে তাড়াতাড়ি স্টেজের এন্ট্রি গেটের দিকে যেতে নির্দেশ দিলেন। আজ বনির চেয়েও তাঁর আনন্দ শতগুণ বেশি। উত্তেজনায় থর থর করে কেঁপে উঠছেন তিনি থেকে থেকেই। তিন বছর পর পর বনিদের স্কুলের এই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি হয়। সেই হিসেবে বনির এটি দ্বিতীয়বারের পুরস্কার বিতরণী প্রোগ্রাম, আর, গতবারের মতোই প্রতিটি ক্লাসের পুরস্কার ঘোষণাতেই আজও সেই সবার প্রথমে। শীলাদেবী আজ একজন সত্যিকারের সফল মা, গর্বিত মা! এই বিশেষ দিনটির অপেক্ষাতেই তো তিনি দিন গোণেন বছরের পর বছর। অসংখ্য দর্শকে ঠাসা এই সুবিশাল অন্ধকার হলঘরের উচ্ছ্বসিত হাততালির মধ্যেই তো লুকিয়ে রয়েছে তাঁর প্রাণভোমরা! গতবার অনুষ্ঠান শেষে তাঁকে সবাই চিনে নিয়েছিল এক দারুণ ব্রাইট স্টুডেন্টের মা হিসেবে। আর, এই বছর বনির হাত ধরে হলে ঢোকা মাত্রই চারিদিকে চাপা ফিসফিসে গুঞ্জন শুরু। জীবনে কক্ষণো এরকম তারকাসুলভ মুহুর্ত তিনি আগে অনুভব করেননি। সত্যি, বনি তাঁর যাবতীয় স্বপ্ন একে একে সফল করে দিচ্ছে কি অনায়াস দ্রুততায়! এটাই তো তিনি চেয়েছেন এতগুলো বছর ধরে। ঘরে থাকেন তিনি। হাউস ওয়াইফ। এই মেয়ে দুটিই তো তাঁর যাবতীয় স্বপ্নপূরণের একমাত্র মাধ্যম। আর এক্ষেত্রে বনি হয়েছে এক্কেবারে তাঁর উপযুক্ত মেয়ে! পড়াশোনা, এক্সট্রা কারিকুলার বিষয়, এমনকি স্পোর্টস, সবেতেই সে সবসময় সবার আগে। একদম জুয়েল! ওই তো আলোয় ভেসে যাওয়া সুসজ্জিত মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে কি অবলীলায় প্রিন্সিপাল ম্যাডামের হাত থেকে ফার্স্ট গার্লের মেডেলটি নিচ্ছে বনি! মঞ্চে উপস্থিত সবার মুখেই কি আশ্চর্য গর্বের হাসি! উঃ, বুকটা যেন বাঁধভাঙা আনন্দে একেবারে ফুলে উঠল শীলাদেবীর! এই মুহুর্তটির জন্যেই তো তাঁর বাঁচা! বনির হাসিমাখা মুখখানি দেখতে দেখতেই হঠাৎই একটা অন্য কথা মনে পড়ে মনটা এক লহমায় দমে গেল তাঁর। উঃ, মিনিটা যদি বনির অর্দ্ধেকটাও হতে পারত! বনির মতো ওর পেছনেও তো তিনি একই সময় আর পরিশ্রম দিয়েছেন। অথচ সবই হয়েছে ভস্মে ঘি ঢালা! ও মেয়ে ভেতর থেকেই খুঁতো! রাজ্যের যত অপকর্মেই ওর একমাত্র উৎসাহ। দেখতে দেখতে ক্লাস সেভেনে উঠে গেল। কিন্তু স্বভাবে কোনও উন্নতি নেই। বছরের পর বছর ধরে সেই লাস্ট বেঞ্চার! জেনারেল স্টুডেন্ট!

 

“আরে মিসেস মুখার্জি! আমি আপনাকেই খুঁজছিলাম!”, অনুষ্ঠান শেষে বেড়োনোর সময়ে বনির অঙ্কের টিচার স্বাতী ম্যাডামের একেবারে মুখোমুখি পড়ে গেলেন শীলাদেবী,” আর বলবেন না…কি যে মুশকিলে পড়েছি আপনার ছোটটিকে নিয়ে, কি বলব! ওর দিকে প্লিজ একটু নজর দিন…দিন দিন যা দুষ্টু হয়ে উঠছে বলার নয়! আর পড়াশোনাতে তো একফোঁটা মন নেই। জানেনই তো, বনিদের মতো মিনির ক্লাসেও আমি অঙ্ক পড়াই। ভুলেও একমুহুর্তের জন্যে ও ক্লাসে মন দেয় না! আমি বোর্ডে অঙ্ক কষে যাচ্ছি, আর, ও খালি হয় জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখছে, নয়তো ক্লাসঘরের উঁচু সিলিঙের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বসে আছে, কি পাশের মেয়েদের সাথে গুজগুজ ফুসফুস করে গল্প করে যাচ্ছে! একই অঙ্ক প্রতিবার একই জায়গায় ভুল করে। বারবার করে দেখালেও শেখে না। এত্ত অমনোযোগী কি বলব! আমি জাস্ট ফেড আপ উইথ হার মিসেস মুখার্জি…জাস্ট ফেড আপ! আর, গত সপ্তাহে তো ওর ক্লাস ওয়ার্কের খাতা থেকে এক বাণ্ডিল ফিল্মস্টারদের পিকচার পোস্টকার্ড উদ্ধার করলাম আমি! জাস্ট ভাবুন! হ্যাঁ, আপনাকে আর জানাইনি, কারণ, আপনাকে পার্সোনালি চিনি আমি, আর, বনিকেও আমি এত ভালোবাসি, আমাদের স্কুলের বেস্ট গার্ল ও, সেখানে এটা নিয়ে গার্জিয়ান কল করলে প্রিন্সিপাল ম্যাডাম আর বাকি সব টিচারদের সামনে আপনাকেই বড় অস্বস্তিতে পড়তে হত। সেটা আমি ব্যক্তিগতভাবে একেবারেই চাইনি। তবে এই কথাগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনাকে জানাতে চাইছিলাম আমি। ভালোই হল আজ একেবারে সামনাসামনি দেখা হয়ে গেল। ক্লাস সেভেনে উঠে গেল মিনি এবার। বোর্ডের পরীক্ষার চাপ এখন থেকেই শুরু হয়ে যায় কিন্তু! যে করেই হোক, পড়াশোনায় মন এবার দিতেই হবে। নষ্ট করবার মতো এক মুহূর্তও সময় নেই আর। আপনি ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন তো? প্লিজ একটু দেখুন!”

 

রিকশা করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে স্বাতী ম্যাডামের কথাগুলো ক্রমাগত মাথার মধ্যে পাক খেতেই লাগল শীলাদেবীর। মুখটা কেমন যেন তেতো হয়ে গেছে তাঁর। সব সাবজেক্টের মধ্যে অঙ্ক বনির সবচেয়ে ফেভারিট আর এই স্বাতী ম্যাডামের সে একেবারে নয়নমণি! এমনিতেও এই নবীন টিচারটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই স্কুলের মধ্যে ভীষণই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন এবং তাঁর বিষয়জ্ঞানও সুবিদিত। কাজেই তাঁর পরামর্শ ফেলা যায় না। শীলাদেবী চোয়াল শক্ত করে রিকশার সিটে ঠিক হয়ে বসলেন। একটা হেস্তনেস্ত করা ভীষণ দরকার এখনই। ফেলে রাখার মতো আর একটুও সময় নেই তাঁর হাতে!

 

************

 

বাড়ি ফিরতেই রজনী সদর দরজা খুলে শঙ্কিত চোখে শীলাদেবীর দিকে তাকাল,” ইয়ে মানে দিদি…একটা ঘটনা ঘটেছে…!”

 

শীলাদেবী অবাক হয়ে রজনীর দিকে তাকালেন। রজনীর আমতা আমতা ভাব দেখে তাঁর কিছুক্ষণ পূর্বের রাগ এক মুহূর্তে জল হয়ে গেল। মিনির কিছু হয়েছে নাকি!

 

“ কি হয়েছে রজনী? মিনি ঠিক আছে তো?”, উৎকণ্ঠায় তাঁর গলা দিয়ে ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বেড়োচ্ছে এখন।

 

“ না না দিদি…তা নয়…”, রজনী পুনরায় একটু ইতস্তত করে অবশেষে বলে ওঠে,” আসলে, মানে, মিনি বেবি একটা কাণ্ড করে ফেলেছে!”

 

এক মুহূর্ত সময় নিলেন শীলাদেবী কথার অর্থটি বুঝতে। ধীরে ধীরে অনুভব করতে লাগলেন তাঁর হঠাৎই নরম হয়ে আসা মনটা আবার পূর্ববৎ কঠিন হয়ে উঠতে শুরু করেছে। ভেতরের কঠোর অবস্থাটি চেপে রেখে খুব শান্ত গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন রজনীকে,” কি করেছে মিনি?”

 

রজনী শীলাদেবীর স্থির হয়ে আসা বরফ শীতল চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে যেন পাথর হয়ে গেল,” মানে, দিদি, আপনি বলে গিয়েছিলেন না যে আজ বিকালে যেন আমি কোনোমতেই মিনি বেবিকে একা একা পাশের মাঠে খেলতে যেতে না দিই। তা আমি সেটা কত্তবার করে বেবিকে বললাম! কিছুতেই শুনতে চাইছিল না! খালি জোরে জোরে চেঁচিয়ে কাঁদছে আর যা হাতের কাছে পাচ্ছে, ছুঁড়ে ছুঁড়ে ভাঙছে! কিছুতেই শান্ত করতে না পেরে শেষবারের মতো আমি পেছন থেকে জোর করে বেবিকে চেপে ধরতেই মিনি বেবি দাঁত দিয়ে কি ভীষণ জোরে আমার ডানহাতের কব্জিতে কামড়ে দিলো! একেবারে দাঁত বসে রক্ত বের করে দিয়েছিল! আমি তখন একটুক্ষণের জন্য যেই না ওকে ছেড়ে আমার ঘরে গিয়েছি ওষুধ লাগাতে, ওমা, ভীষণ একটা জোর আওয়াজ! ওমনি সব ফেলে ছুট্টে এসে দেখি, বড়ঘরের শেলফের ওপরে রাখা বনি বেবির সব ইস্কুলের মেডেলগুলো বাঁধাই ফ্রেম থেকে ভেঙে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে! ফ্রেমটা পুরো খান খান! দরজার পাশে যে লাঠিটা থাকে ওটা তখনও মিনি বেবির হাতে! তারপর থেকেই গোঁজ হয়ে ওই ঘরের সোফায় ঠায় বসে আছে মিনি বেবি। এই আমি সবে সব কাঁচগুলো পরিস্কার করে এলাম!”

 

শীলাদেবী একটিও বাক্যব্যয় না করে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রজনীর সবকটি কথা শুনলেন। পাশে দাঁড়ানো বাকরহিত বনির দিকে তাকিয়ে অকম্পিত গলায় শুধু বললেন,” যাও, নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও।“

 

তারপর, ধীর কিন্তু দৃপ্ত পদক্ষেপে সোজা এগিয়ে গিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটি বন্ধ করে দিলেন।

 

************

 

ঘড়িতে রাত দুটো। গোটা বাড়ি নিস্তব্ধ। একটা পিন পড়লেও বুঝি শব্দ শোনা যাবে। মিনি খুব সাবধানে পা টিপে টিপে ড্রয়িং রুমের ভেজানো দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে এল। একটু এগিয়ে শোবার ঘরের পর্দা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিল সে। বিছানায় মা আর বাবার মাঝখানে অঘোরে ঘুমিয়ে আছে বনি। চোখদুটো কুঁচকে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দেখল দৃশ্যটা। গলার কাছটায় চাপা কান্নাটা দলা পাকিয়ে উঠল তার। পিঠটা আবার টনটনিয়ে উঠল! উঃ, কি মারটাই না আজ খেলো সে মায়ের কাছে! এমন বেধরক পিটুনি সে আজ অবধি খায়নি। পিঠটা থেকে থেকেই কঁকিয়ে উঠছে খালি। সোজা হয়ে একটানা বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারছে না কিছুতেই। যে লাঠিটা দিয়ে বনির মেডেলগুলোর শ্রাদ্ধ করেছিল সে, সেইটাই আজ তার পিঠে ভাঙল মা। দাঁতে দাঁত পিষল মিনি। নাঃ, শিক্ষাটা দিতেই হবে! নইলে কোনমতেই শান্তি পাবে না সে!

 

খুব সাবধানে একটুও শব্দ না করে অন্ধকার শোবার ঘরের মধ্যে পা টিপে টিপে ঢুকে পড়ল মিনি। দ্রুত চোখ বোলালো আশেপাশে। বইগুলো খুঁজছে সে, যেগুলো কিনা তার আদরের গুডি গুডি দিদি বনি আজই স্কুল থেকে প্রাইজ হিসেবে এনেছে। তাদের স্কুলে ক্লাসে স্ট্যান্ড করলে প্রতিবারই মেডেলের সঙ্গে কোনও একটা ভালো বই উপহার দেয়। কয়েক সেকেন্ড উদ্ভ্রান্তের মতন এদিক ওদিক চোখ ঘোরাতেই অবশেষে ওগুলোকে দেখতে পেল মিনি। যত্ন করে খাটের ওপাশে দেয়াল আলমারির দ্বিতীয় শেলফের একেবারে মধ্যিখানে সার দিয়ে সাজিয়ে রাখা আছে সদ্য পুরস্কার পাওয়া গল্পের বইগুলি। মুহূর্তে একটা নিষ্ঠুর আনন্দে মিনির বাদামি রঙের ছোট ছোট সরু চোখদুটো চকচক করে ওঠে। এইবার বাগে পেয়েছে সে বনিকে। আজকের দিনটা সে যেমন জীবনে কখনও ভুলবে না, তেমনি দিদিকেও এ দিনটা সে কিছুতেই ভুলতে দেবে না।

 

দৌড়ে গিয়ে বই তিনটে শেলফ থেকে খুব সাবধানে নামিয়ে বগলদাবা করে এক ছুট্টে পর্দা ঠেলে একেবারে ড্রয়িংরুমের মেঝেতে গিয়ে বাবু হয়ে বসে পড়ে মিনি। নীলরঙা নাইট বাল্বের হালকা আলোয় ঘরটা উদ্ভাসিত। একটা একটা করে প্রতিটি বইয়ের মলাট উল্টে প্রথম পাতাটি মন দিয়ে পড়ে মিনি। বইয়ের বিজেতা, অর্থাৎ, বনি সম্বন্ধে বইগুলিতে নানারকম সুন্দর সুন্দর প্রশংসাসূচক কথা লেখা। প্রতিটি লেখা খুব মন দিয়ে শব্দ ধরে ধরে শেষ অবধি পড়তে থাকে সে। বুকের ভেতরে তখন তার পাহারপ্রমাণ আবেগের উথালপাথাল ঢেউ ভাঙছে নিঃশব্দে! প্রতিটি শিরায় ধমনীতে কেটে কেটে বসে যাওয়া দুঃসহ যন্ত্রণা, চূড়ান্ত অব্যক্ত ঘৃণা, আর সেই সঙ্গেই, নিদারুণ এক হৃদয়পোড়ানো ব্যথায় ক্রমশই মুচরে মুচরে উঠতে থাকে তার ছোট্ট শরীরটা। তারপর হঠাৎই অবুঝ সর্বগ্রাসী রাগে উন্মত্ত হয়ে প্রতিটি বইয়ের প্রশংসাসূচক বার্তা লেখা পাতাগুলোকে এক এক করে সবেগে ছিঁড়ে ফেলতে থাকে সে। চোখে তার একই সাথে তখন গনগনে রাগ আর নোনতা জলের মিলিজুলি স্রোতধারা। মোট তিনখানি ছেঁড়া পাতা একত্রিত হয়। একসাথে মুঠোয় করে পাতাগুলি নিয়ে দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে দ্রুত কিচেন টেবিলের ওপর চোখ বোলায় মিনি। ওই তো, গ্যাসের ওপাশেই আলগোছে পড়ে আছে জিনিসটা। তৃপ্তমুখে লাল হলুদ নকশাকাটা ছোট্ট আয়তাকার কাগজের বাক্সটা তুলে নিয়ে ভেতর থেকে খুব সাবধানে একখানি মাত্র কাঠি বের করে সে। এক ঝটকায় বাক্সের পাশের অংশে ঘষে আগুন জ্বালিয়েই হাতের মুঠোয় দলাপাকানো কাগজগুলিতে ধরিয়ে দেয় মিনি। নিমেষের মধ্যে চিরিক চিরিক ফুলকি ছড়াতে ছড়াতে গোটা দলাটায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কালো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ক্রমশ কুঁকরে যেতে থাকে পাতাগুলো, আর, মুহূর্ত কয়েক পরেই একেবারে ছাই হয়ে যায় সব ক’টি কাগজই। মিনির গনগনে রক্তবর্ণ মুখে তখন এক দুর্বোধ্য পরিতৃপ্তির হাসি। যাক, আজকের মতো শোধ নেওয়ার পালা তবে শেষ! নাক দিয়ে একটা ক্রূর তাচ্ছিল্যের শব্দ করে গট গট করে এবার সে এগিয়ে যায় শোবার ঘরের দিকে। এখন তার আর কারুর ওপর কোনও রাগ নেই। এখন সে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবে বনির পাশটিতেই। কারণ, এখন তারা আবার সমান সমান।

 

 

চতুর্থ পর্ব

 

“উঃ, মা, আমি কিছুতেই পড়ায় মন দিতে পারছি না! জাস্ট পারছি না!”, বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই বনির উত্তেজিত অভিযোগে শীলাদেবীর ক্লান্ত শরীরটা যেন আরও অবশ হয়ে গেল। ওহহ্, রোজ রোজ এই অভিযোগ অনুযোগের ঠেলা তিনি আর সামলাতে পারছেন না। সবে দু’দিন বাদে একটু বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন কতকগুলো জরুরি জিনিস কেনাকাটি করতে, তাও ফিরে যে একটু শান্তিতে জিরোবেন তার উপায় নেই। পা রাখা মাত্রই শুরু!

 

রজনী ত্রস্তভাবে বনির পাশটিতে দণ্ডায়মান। আজকাল প্রায় রোজের এইসব অভিযোগ অনুযোগের সময়গুলিতে সে মুখে কিছু বলে না। শঙ্কিত চোখে নীরবে দাঁড়িয়ে কেবল দেখে। দু’মাস আগেও অবস্থা এতটা খারাপ ছিল না, কিন্তু, যত দিন যাচ্ছে, পরিস্থিতি যেন ততই হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত তিনটি বছর ধরে সময়ের সাথে সাথে বনি আর মিনি ক্লাসের পর ক্লাস পেরিয়ে এত বড় হয়ে উঠল, অথচ দুই বোনের ভেতরের খটাখটিটা ঠিক হওয়ার বদলে যেন খালি গোল পাকিয়ে পাকিয়ে বেড়েই উঠলো দিন কে দিন। আর গোদের ওপর বিষফোঁড়া  যখন চার মাস আগে মিনি বেবির রেজাল্ট বেড়োল! উঃ, ওই অভিশপ্ত দিনের কথা রজনী আর মনেও করতে চায় না! মিনি বেবি কোনদিনই পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিল না, কিন্তু তাই বলে ক্লাসে ওঠার পরীক্ষায় ফেল করবে! বাড়ির সবার সেদিন সে কি অবস্থা! একমাত্র বনি বেবি ছাড়া বাড়ির কেউ ওই দিন একটি দানাও দাঁতে কাটেনি! আজও ওই দিনটির কথা মনে পড়লে ভয়ে বুক শুকিয়ে যায় রজনীর।

 

হ্যাঁ, ক্লাস নাইনের ফাইনাল পরীক্ষায় মিনি এবার ফেল করেছে। ফলে, ক্লাস টেনের বোর্ডের পরীক্ষা সে দিতে পারবে না। প্রথম যখন খবরটা শোনেন শীলাদেবী, নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেননি! ফেল করেছে তাঁর মেয়ে! তাও আবার এত নীচু ক্লাসের পরীক্ষায়! কি করে যে এমন একটা অঘটন সম্ভব তা হৃদয়ঙ্গম করতেই গোটা তিন তিনটি দিন লেগে গিয়েছিল তাঁর। বাড়ির কারুর সঙ্গে এইসময় একটি কথাও বলেননি তিনি। একেবারে থম মেরে গিয়েছিলেন ভেতর থেকে। যত সাধারণই হোক তাঁর মেয়ে, সে যে কখনও স্কুলের পরীক্ষায় ফেল করতে পারে এ কথা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি শীলাদেবী। তাঁর স্বামী সুনির্মলবাবু অবশ্য এই গোটা সময়টা ভীষণভাবে মাথা ঠান্ডা রেখেছিলেন। এমন একটা চরম কঠিন পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া স্ত্রী আর বিপরীত স্বভাবের ছোট ছোট মেয়েদুটিকে তিনি সামলে রেখেছিলেন শক্ত হাতে। আশ্চর্য এই যে, মিনি কিন্তু এই পুরো সময়টা একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেছিল, প্রতি বিষয়েই রণংদেহী মিনি অদ্ভুতভাবে ওই ক’টি দিন একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। কেন যে তার এতটা খারাপ রেজাল্ট হল বার বার জিজ্ঞাসা করেও জানতে পারেনি বাড়ির কেউই। একে এই রেজাল্ট, তার ওপর মিনির এই দুঃসাহসী অবাধ্যতা, দুইয়ে মিলে শীলাদেবীকে যেন একেবারে উন্মাদপ্রায় করে তুলেছিল তখন। প্রাথমিক হকচকিত দশা কেটে যাবার পর তাই অসহনীয় রাগে তিনি আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেননি। সদর দরজার কাঠের মোটা বাটাম দিয়ে এত মেরেছিলেন মেয়েকে যে পরের প্রায় এক সপ্তাহ মিনি আর বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেনি। রাতের পর রাত তখন মিনির বিছানার পাশে জেগে বসে থাকত রজনী। মাথায় বিলি কেটে দিত আলতো হাতে। অসহ্য যন্ত্রণায় সারারাত বিছানায় গোঙাতো মিনি। আর, অন্য ঘরে বিছানায় শুয়ে ফোঁপাতেন শীলাদেবী। বড় কষ্টের দিন কেটেছে তখন তাঁদের। পরে একসময় মিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল। তবে এতকিছুর পরেও আশ্চর্যভাবে সে কিন্তু স্বভাবে বদলালো না। বরং ক্রমে ক্রমে বাড়ির সবার প্রতি ভেতর থেকে হয়ে উঠল আরও কঠিন। কারুর প্রতিই যেন সে একটুও প্রসন্ন নয়। আর কোনও এক দুর্বোধ্য কারণে সবচেয়ে বেশি রাগ তার পড়াশোনায় তুখোর আর সবার প্রিয় বড় দিদি বনির প্রতি। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা বিশেষ বোঝা যায়নি। কিন্তু এখন যত দিন যাচ্ছে, দুই বোনের মহাদ্বৈরথ সামলাতে বাড়ির সকলের একেবারে হিমশিম অবস্থা। বনি এই বছর ক্লাস টুয়েলভের ফাইনাল পরীক্ষা দেবে। উচ্চ মাধ্যমিক। বোর্ডের শেষ পরীক্ষা। মাস দুয়েক আগে প্রি এক্সাম টেস্ট হয়ে যাবার পর এখন ফাইনাল অবধি বাড়িতে বসেই পড়াশোনা চলছে তার। শিয়রে সংক্রান্তি হওয়ায় পড়ার পাহাড়প্রমাণ চাপের সাথে সাথে তার স্বাভাবিক তিরিক্ষি মেজাজও ইদানীং সর্বদাই আকাশচুম্বী। অন্যদিকে এর মধ্যে মিনিও হয়ে উঠছে ক্রমশই বাঁধনছাড়া! বনিকে উত্যক্ত করার নিত্য নতুন অভিনব দুষ্টবুদ্ধিতে সে যেন প্রতিদিনই নতুন করে ছাড়িয়ে যাচ্ছে নিজেকেও। হাজার মেরে বকেও কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না তাকে।

 

“ আবার কি হল?”, শীলাদেবী তাঁর বাজারের ব্যাগটা রজনীর হাতে দিয়ে ভাবলেশহীন সুরে জিজ্ঞেস করলেন বনিকে।

 

“ আমার ইংলিশের কপিবুকটা আজ কোথাও একটা লুকিয়ে ফেলেছে ও! লাস্ট চ্যাপ্টার ক’টা আজ রিভিশন করতেই হবে আমাকে। কালই তো ফাইনাল মক টেস্ট! ওঃ ভগবান, আই উইল কিল হার টুডে!”, প্রচন্ড রাগে বনির মুখ দিয়ে যেন আর কথা বেড়োচ্ছে না।

 

বনির অভিযোগ শুনে এবার শীলাদেবীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। এটা তো নতুন জিনিস! অ্যাদ্দিন যে যে অভিযোগগুলি তিনি শুনে এসেছেন, সেগুলি সবই ছিল খুবই সাধারণ দুষ্টুমিমূলক, যেমন, বনি পড়তে বসলেই তার স্টাডিরুমের বন্ধ দরজার বাইরে মিনির তীব্র স্বরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গান করা, কি, যখন তখন দুমদাম আওয়াজ করে বনির পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটানো, এমনকি বাথরুমে গেলে বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে অকারণ দেরি করানো, এইসব। কিন্তু যত যাই হোক, আজ অবধি বনির বইপত্রে কখনও হাত দেয়নি মিনি। এই দুঃসাহস থেকে এতকাল সে বিরতই ছিল।

 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইদানীং শীলাদেবী মিনির প্রতি কিছুটা নরমই হয়ে এসেছিলেন। সুনির্মলবাবুর পরামর্শ আর নিজের মাতৃসুলভ বিবেচনাবোধের মিশেলে ধীরে ধীরে মিনির প্রতি খানিকটা কোমল আর সংবেদনশীল হয়ে ওঠারই সিদ্ধান্ত নেন তিনি। শত হোক, তাঁরই তো মেয়ে! যদিও তাঁর পক্ষে এটি একটি খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ, নীতিগতভাবেই তিনি অবাধ্যতা আর নিয়মভাঙা স্বভাব আদতেই সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু এই অভাবনীয় পরিস্থিতিতে সবদিক ভেবেচিন্তে এই ব্যবস্থা মেনে নেওয়া ছাড়া সমস্যা সমাধানের আর অন্য কোনও পথও দেখতে পাচ্ছিলেন না তিনি। মিনি যেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে উঠেছিল তাঁর সব হিসেবের বাইরের এক আজব জীব। কিভাবে যে ওকে বাগে আনবেন, এই দুশ্চিন্তা দিনে দিনে তাঁকে দিশেহারা করে তুলছিল। পছন্দ না হলেও সব রাস্তাই চেষ্টা করে দেখতে তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন একেবারে মরিয়া। তবে এতকিছুর পরেও যে খুব বিশেষ একটা ফল পাচ্ছিলেন তা নয়। এতদিনে সেই আগের ছোট্ট মিনিও তো আর ছিল না। সময়ের সাথে সাথে ভেতর থেকে ভীষণই কঠিন ঠাঁই হয়ে উঠেছিল সেও। তাকে ভাঙা এখন তাই ছিল বড়ই দুঃসাধ্য। তাও কোনমতে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন শীলাদেবী। কিন্তু, বনির আজকের অভিযোগ শুনে ভেতরে ভেতরে শীলাদেবী যেন আবার সেই আগের মতোই অস্থির হয়ে উঠলেন। এই দুঃসাহস তাঁর কাছে অসহ্য!

 

“ কোথায় ও?”, শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

 

“ কোথায় আবার?”, বিশ্রিভাবে মুখ ভ্যাঙালো বনি,” বাগানেই হবে! ওখানেই তো থাকে সারাক্ষণ। কাজ নেই, কম্ম নেই, রাতদিন রাস্তার ছেলেপিলের মতো খালি বাগানে ঘুরছে, আর লাল নীল প্রজাপতি কি ফড়িং ধরে বেড়াচ্ছে! যত্ত আজে বাজে খেলা! একটা সিরিয়াস জিনিসে যদি ওর মন থাকে! আর বাকিদেরও ও মনে করে ওরই মতো, কাজকর্মহীন বেকার টাইপ!”, অসহ্য রাগে বনির দুই কান দিয়ে ধোঁয়া বেড়োচ্ছে যেন,” কোন সাহসে আমার বইতে হাত দেয় ও! কি স্ট্যাটাস আছে ওর স্কুলের সবচেয়ে বেস্ট গার্লের বই টাচ করার! ফেলটু একটা! তাও আবার এত নীচু ক্লাসে! স্কুলের সব্বার সামনে আমার মান ইজ্জত কিচ্ছু রইল না ওর জন্যে! ডু আই রিয়েলি ডিজার্ভ দিজ! তুমিই বলো!”, বনি রাগে দুঃখে প্রায় কেঁদে ফেলে এবার,” আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না আর। তুমি এক্ষুণি ওর কাছে যাও আর যেখান থেকে পারো আমার কপিবুকটা এনে দাও। ব্যস! আমি জাস্ট এই মুহূর্তেই ওটা আমার টেবিলে দেখতে চাই। নাও গো!”, শীলাদেবীর চোখে চোখ রেখে আগুন ঝরানো চোখে কথাগুলো বলল বনি।

 

শীলাদেবী একটি কথাও না বলে কিছুক্ষণ নিষ্পলক স্থির দৃষ্টিতে মাপলেন তাঁর এই বড় মেয়েটিকে। বনির এই রূপ তাঁর কাছে বেশ নতুন। এত পরিষ্কার করে মায়ের মুখের সামনে দাঁড়িয়ে এত কথা বলা সে যে কবে শিখে ফেলল, এই মুহুর্তে তার ঠিক তল পেলেন না শীলাদেবী। তবে সঠিক কারণটি বুঝে উঠতে না পারলেও বনির আজকের এই বেসুরো ব্যবহারে হঠাৎ করেই তাঁর মনটা যেন কেমন বিকল হয়ে গেল। কোথায় যেন কি একটা মেলাতে পারছেন না তিনি এই মুহূর্তে। চিন্তিত মুখে আর একটিও বাক্যব্যয় না করে ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে বাগানের দিকে পা বাড়ালেন শীলাদেবী।

 

************

 

বাড়ির পেছনদিকের তাঁদের এই বাগানটি বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে ছড়ানো। বড় গাছের মধ্যে দুটো নারকেল আর একটা ঝাঁকরা মতো সজনে গাছ আছে। এছাড়াও আছে একটা কাঠগোলাপ, দুটো সাদা টগর আর একটা বড় সড় গন্ধরাজ ফুলের গাছ। বাকি গাছ সার দিয়ে টবে লাগানো। নয়নতারা, গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়া, দোপাটী, রঙ্গন আর সূর্যমুখী। শীলাদেবীর নিজেরই খুব গাছের শখ। এখানকার বাজারের নার্সারিগুলো থেকে নিয়মিত বেছে বেছে গাছ নিয়ে আসেন তিনি। আগে নিজেই যত্ন নিতেন। এখন মেয়েদের দিকে সময় দিতে গিয়ে এসবে আর নজর দেওয়া সম্ভব হয় না। আজকাল তাই রজনীই সব করে। বাগানে তাঁর ইদানীং আর আসাও হয় না বিশেষ। এখন শুধু সুনির্মলবাবু রোববার নিয়ম করে করে বাগানে বসে সকালের কাগজটুকু পড়েন। আর আসে মিনি।

 

বাগানে পা দিয়েই দ্রুত এদিক ওদিক চোখ বোলালেন শীলাদেবী। একটু পরেই ডানদিকে গন্ধরাজ গাছের ঘন ডাল পাতার ফাঁক দিয়ে দূরে দেখতে পেলেন মাটিতে উবু হয়ে বসে থাকা মিনিকে। আর দু’পা এগিয়ে এসে ভালো করে লক্ষ্য করতেই বুঝলেন বনি ঠিকই বলেছে। বনি নিজে কক্ষণো বাগানে আসে না বটে, তবে ওর স্টাডিরুমের জানালা থেকে বাগানের কিছুটা অংশ পরিস্কার দেখা যায়। আর নিশ্চয়ই তাই দিয়েই বোনের কাণ্ডকীর্তি খেয়াল করেছে ও! বাগানের সবচেয়ে দূরের একটা কোণে পাঁচিল ঘেঁষে স্থির হয়ে বসে খুব মন দিয়ে সাদা রঙের গোলাপ ঝাড়ের ওপর দুটো ভারী সুন্দর নীল সাদা টিপ টিপ ছাপওলা প্রজাপতির ওড়াওড়ি লক্ষ্য করছে মিনি। অন্য কোনও দিকে তার দৃষ্টি নেই এখন। খানিকক্ষণ নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে এই অসাধারণ দৃশ্যটি উপভোগ করলেন শীলাদেবী। নিভে আসা গোধূলি আলোয় এর চেয়ে মনোরম দৃশ্য তিনি আগে কখনও প্রত্যক্ষ করেছেন বলে মনেই করতে পারলেন না। মনটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল তাঁর। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, তার পরেই মনে পড়ে গেল ঠিক কি কারণে আজ হঠাৎ এই অসময়ে বাগানে এসেছেন তিনি। ভারী পায়ে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে বাহ্যজ্ঞানরহিত মিনির পিঠে হাত রাখলেন তিনি। চমকে পিছনে ঘুরেই মাথার ওপরে মায়ের চিন্তাক্লিষ্ট মুখখানি দেখে মিনির চোখের আলো নিভে গেল। নিমেষে সে বুঝে গেল তাকে কি করতে হবে। খেলা ফেলে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল মিনি। তারপর নীরবে মাথা নীচু করে বাগানের মাঝখানের লাল ইঁটে বাঁধানো সরু রাস্তা ধরে সোজা এগিয়ে গেল বাড়ির পশ্চিম কোণটিতে। খুব সুন্দর কারুকাজ করা একটি লোহার বাঁকানো সিঁড়ি বাড়ির এই অংশটি ধরে নীচ থেকে সোজা ওপরে দোতলার ছাতের ঘরে উঠে গেছে। রাজ্যের পুরনো আর অদরকারি নানা জিনিসপত্তর ডাঁই করে রাখা থাকে এই চিলেকোঠাটিতে। মিনি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল ওই অন্ধকার হয়ে আসা ছোট্ট কুঠুরিটিতে আর পর মুহুর্তেই বেড়িয়ে এল বনির খাতাটি হাতে নিয়ে। নীচে দাঁড়ানো মায়ের কুঁকরে আসা মুখটা দেখে হঠাৎ যেন বুকের মধ্যে একটা দারুণ ধাক্কা লাগল তার। মাথা নীচু করে এক এক করে সিঁড়ির ধাপগুলি ভেঙে নীচের দিকে সে এবার নামতে থাকল শ্রান্ত পায়ে।

 

পঞ্চম পর্ব

 

 

“ ওহ্ বনি! আমার সোনা মেয়ে! মাই বেস্টেস্ট গ্র্যান্ড ডটার!”, সুনীতাদেবী আনন্দে একেবারে যেন গদ গদ,” তা প্রিপারেশন কেমন যাচ্ছে? আর তো মাত্র ক’টা দিন! উঃ, আমার তো গায়ে কাঁটা দিচ্ছে! এবারও আমার সোনা বনিমা সব্বার ওপরেই থাকবে, দেখে নিস তোরা!”

 

বনির উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আর মাস দেড়েক বাকি আছে। সুনীতাদেবী তাই কলকাতা থেকে দিন কয়েকের জন্য দেখা করতে এসেছেন তাঁর আদরের বনির সঙ্গে। বিদ্যালয়স্তরের এই শেষ বড় পরীক্ষাটির আগে একবার দেখা করে নিজে হাতে আশীর্বাদ করে যাবেন তিনি বনিকে। দুই নাতনির মধ্যে বনিই তাঁর সবচেয়ে ফেভারিট। বরাবর। আসলে ফেলিওর বা মধ্যমেধার লোকজনদের তিনি কোনদিনই দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। ধাতেই নেই ওটা তাঁর। তাই আগেও যখন বরাবর নাতনিদের রেজাল্টের সময় আসতেন তিনি, দিনের দিন সকাল সকাল শীলার সঙ্গে চলে যেতেন বনিদের স্কুলে। বনিদের স্কুলে প্রতিটি ক্লাসেরই একই দিনে রেজাল্ট বেড়োয়। সুনীতাদেবী ওই বিশেষ দিনটিতে সবসময়ই তাঁর বড় নাতনি বনির ক্লাসরুমের সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতেন। বনি প্রতিবারই ক্লাসে প্রথম হত। আর, রেজাল্ট ঘোষণার সাথে সাথে অসীম গর্বে ফুলে উঠত তাঁর বুক। ওঃ, সে একটা মুহুর্ত বটে! মনে রাখার মতো মুহুর্ত একেবারে! সব্বাইকে পেছনে ফেলে সবার আগে তাঁর নাতনি! আশেপাশে দাঁড়ানো বাকি অভিভাবকদের নিভে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে আরও বেশি করে খুশি হয়ে উঠতেন যেন তিনি সেই সময়। কম্পিটিশনেরই তো যুগ এটা। আর এই ভীষণ কম্পিটিশনের ইঁদুর দৌড়ে তাঁর বনি সবসময় সবার আগে, এই ব্যাপারটাই তাঁকে প্রতিবার যেন আরও লোভী করে তুলত! বাড়ি ফেরার পথে বনির হাত ধরে বার বার করে ওকে আরও এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করতেন তিনি, আশপাশের সবকিছু ভুলে আরও বেশি করে নিজের কাজে মন দিতে বলতেন, কারণ যা হয়ে গেছে তা অতীত, সামনের বছর আরও ওপরে উঠতে হবে ওকে, আর, আরও পেছনে ফেলে দিতে হবে বাকি সবাইকে! শীলা এই দিনের গোটা সময়টা হন্যে হয়ে একবার বনির, আর একবার, মিনির ঘরের সামনে ছোটাছুটি করত। ফলতঃ, বেশিরভাগ সময়েই দুই মেয়ের মধ্যে যেকোন একজনের রেজাল্ট নেওয়ার দৃশ্যটি মিস করত। অথচ এছাড়া কোনও উপায় ছিল না তার। কারণ কোন মূল্যেই সুনীতাদেবী মিনির ঘরের সামনে দাঁড়াবেন না। নিজের আত্মসম্মান আর অহংকারের সাথে সমঝোতা করা কোনকালেই তাঁর ধাতে নেই!

 

“ ওহহ্, গ্র্যানি! যা বলেছো! এবার তো আমি এক্কেবারে সুপার কনফিডেন্ট!”, উত্তেজনায় বনির মুখ লাল টুকটুকে হয়ে ওঠে,” তুমি শুধু দেখো, সবকটাকে এবার মাথা পেতে এই বনি মুখার্জির পায়ের ধুলো যদি না নিতে হয়, নিজের নাম চেঞ্জ করে ফেলব আমি! পুরোপুরি প্রিপেয়ার্ড আমি এখন। তুমি একটুও চিন্তা কোরো না। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!”

 

সুনীতাদেবীর সারা মুখ আলো হয়ে উঠল,” ওহ্, মাই ডিয়ার ডিয়ার বনিমা! দ্যাটস মাই গার্ল!”, দু’হাত তীব্র বেগে নেড়ে বলে উঠলেন তিনি,” আর, না, না, তোমার ব্যাপারে আমি একফোঁটাও চিন্তা করি না! নো, নেভার! যতই হোক, তুমি তো আর মিনির মতো নও!”, একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সুনীতাদেবী এবার,” উঃ, কি কাণ্ড, কি কাণ্ড! ফেল করল! তাও এত নীচু ক্লাসে! কি লজ্জা, কি লজ্জা! সব শুনে তো আমি প্রায় অজ্ঞানই হয়ে গিয়েছিলাম! আমাদের বংশে একি কুলাঙ্গার জন্মাল! উঃ, কি যে কেটেছে সে সময়টা! ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়!”, সুনীতাদেবী সেই দুঃসহ সময়টির কথা মনে করে আবার যেন নতুন করে শিহরিত হয়ে উঠলেন।

 

বনি একবার তার দিদিমার আতঙ্কিত মুখের দিকে আর একবার ঘরের দরজার কাছে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বোনের দিকে কৌতূকপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। এটা তার সবচেয়ে ফেভারিট টপিক। আজকাল যত দিন যাচ্ছে মা আর বাবা মিনির প্রতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন একটু বেশিই নরম হয়ে পড়ছে। হাউ অ্যাবসার্ড! ওসব বস্তাপচা সেন্টিমেন্টাল পদ্ধতিতে কিছু হয় নাকি! অসহ্য লাগে তার এসব ন্যাকামি। ফেলিওররা সবসময়ই ফেলিওর হয়। তাদের ব্যাপারে কোনও রকম সিমপ্যাথি দেখানো মানেই স্রেফ নিজেরই মূল্যবান সময় নষ্ট। এইজন্যেই দিদিমার সাথে তার এত্ত ভালো মেলে। কোনও বাজে দুর্বলতা নেই দিদিমার, ঠিক যেমনটা সে নিজে, আর, ঠিক যেমনটা সে পছন্দ করে।

 

দিদিমার কথা শুনে মিনি অসহায়ের মতো দিদি বনির পাশে বসে থাকা মা আর বাবার দিকে তাকায়। ওরাই এই পরিস্থিতিতে তার একমাত্র ভরসা। ভয়ে মিনি আজ এই ঘরে ঢুকতেই সাহস পায়নি। দিদিমা তাকে একটুও সহ্য করতে পারে না। প্রথম থেকেই দিদিমা খালি দিদিকেই পছন্দ করে। তার কোনকিছুই দিদিমার পছন্দ হয় না। আর এখন তো কথাই নেই! কিন্তু আশ্চর্য হয়ে সে দেখল, আজ তার মা বাবাও কেমন যেন পাথরের মতো মুখ করে বিছানার ওপর গ্যাঁট হয়ে বসে আছে। একটি কথাও সরছে না দুজনের কারুর মুখেই। আসলে, শীলাদেবী ও সুনির্মলবাবুও জানেন এই ঘোরালো পরিস্থিতিতে সুনীতাদেবীর কোনও কথার কোনও বিরোধিতা করেই ফল হবে না। কারণ, আর যাই হোক, বনি আর মিনির তুলনা বিষয়ক আলোচনায় সুনীতাদেবী এতটুকুও বিরূপ বক্তব্য শুনতে রাজি নন। তাই এ বিষয়ে কোনরকম বিরুদ্ধ মতামত এখন পরিস্থিতি খারাপ বৈ ভালো করবে না। ভালো না লাগলেও এই মুহূর্তে তাই চুপ করে থাকাই শ্রেয়।

 

মিনি এক এক করে ঘরে উপস্থিত সবার মুখেই দিকে তাকায়, আর তারপর, মাথা নিচু করে দরজা ছেড়ে বাগানের দিকে পা বাড়ায়। তার ছোট্ট চোয়াল এখন পাথরের মতো শক্ত। দু’চোখে ধিকি ধিকি আগুন।

 

**********

 

“ এ তো একদম ক্লিয়ার কেস অফ চিকেন পক্স!”, ডাক্তার দেবরাজ চ্যাটার্জি গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন, “ নিশ্চয়ই স্কুল থেকেই এনেছে! আজকাল ভীষণ হচ্ছে চারিদিকে! কিচ্ছু করার নেই। বাড়ি নিয়ে যান, আর, একটা আলাদা ঘরে খুব সাবধানে রাখুন। জানেনই তো কি ভীষণ ছোঁয়াচে। তার ওপর আপনার বড়টির তো আবার ক’হপ্তা বাদেই পরীক্ষা!”, চিন্তিত মুখে মাথা নাড়লেন ডাক্তার,” খুবই কঠিন পরিস্থিতি! ভীষণ সাবধানে রাখবেন দুজনকেই। কিছুতেই যেন কোনরকম টাচ না হয়! এটা যেকোনও মূল্যে মেনটেন করতেই হবে!”, কথা শেষ করে ডাক্তারবাবু অনেকটা সময় নিয়ে একটা লম্বা প্রেসক্রিপশন লিখে শীলাদেবীর হাতে দিলেন। দুর্বল মিনিকে ধরে ধরে বাইরে নিয়ে এসে সাবধানে একটা রিকশায় তুললেন শীলাদেবী। ডাক্তারখানা থেকে বাড়ি অবধি পুরো রাস্তাটা শীলাদেবীর কিভাবে যে কাটল বলার নয়! কিছুতেই কিছু মেলাতে পারছিলেন না যেন তিনি। ভগবান এটা কি করলেন তাঁর সঙ্গে! আর ক’টাই বা দিন বাকি বনির পরীক্ষার। কি যে বিপত্তি বাঁধালো মিনিটা! কি করে সবদিকটা সামলাবেন তিনি এখন! বনির থেকে এই মুহূর্তে যে তাঁর চোখ তোলারও উপায় নেই!

 

বাড়িতে শীলাদেবী আর সুনির্মলবাবুর শোবার ঘরের লাগোয়া একটা ছোট গেস্টরুম মতো ছিল। মিনিকে সবসুদ্ধু সেখানেই রাখার ব্যবস্থা হল। আর রজনীর ওপর ভার পড়ল তার সর্বক্ষণের দেখাশোনার। এছাড়া আর কোনও বাস্তবসম্মত উপায় শীলাদেবী খুঁজে পেলেন না। বনি নিজেই অন্য কোনও উপায় এই মুহূর্তে মেনে নেবে না। এবং এইসময় বনিকে চটানোর কোনও ইচ্ছে নেই শীলাদেবীর। ওর পরীক্ষাটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর কাছে। বাকি সব পরে।

 

************

 

বনি এই গোটা সময়ে একটিবারের জন্যেও মিনিকে দেখতে আসেনি। মাকেও সে মিনির ঘরে ঢুকতে সম্পূর্ণ বারণ করে দিয়েছিল। ফলে একমাত্র সুনির্মলবাবু আর রজনীরই যাতায়াত ছিল মিনির ঘরে। এমনিতেই মিনির ফেল করা নিয়ে বনি যারপরনাই বিরক্ত হয়েছিল, তার ওপর এই অবস্থা! সবদিক বিবেচনা করে তাই মিনিকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করাই সে তার ভবিষ্যতের পক্ষে শ্রেয় বলে মনে করেছিল।

 

দিন পাঁচেক কেটে যাবার পর মিনির জ্বর ভাবটা খানিকটা কমে এল। এই ক’দিনে তার আশেপাশে মাকে সে একবারের জন্যেও দেখেনি। ঘোরের মধ্যে শুধু বাবা আর রজনীকেই সে দেখত। বড্ড মন কেমন করত তার মায়ের জন্যে।

 

“ মা কোথায় রজনীদিদি? একবার ডাকো না? ক’দ্দিন দেখিনি!”, কাতর গলায় একদিন দুপুরে খাবার পরে রজনীকে জিজ্ঞেস করল মিনি।

 

“ মানে, মিনি বেবি…আসলে হয়েছে কি…”, রজনী কি বলবে ঠিক করতে না পেরে থতমত খায়,” আসলে, তুমি তো জানো ক’দিন বাদেই বনি বেবির পরীক্ষা…ওইজন্য বনি বেবির কাছে কাছে মাকে তো থাকতেই হবে, তাই না! তার ওপর, তোমার এই যে পক্স হয়েছে…খুব ছোঁয়াচে কি না…তা এখন যদি কোনভাবে তোমার থেকে মায়ের এটা হয়ে যায়, আর তারপর, বনি বেবির…কি কাণ্ড হবে বলো তো! তাই আর কি…”, কোনমতে হড়বড় করে কথাগুলো বলে মিনির কালো হয়ে আসা মুখের দিকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকে রজনী। তার বুকের মধ্যে যেন ধুপ ধুপ হাতুরি পড়ছে তখন।

 

মিনি আর একটিও কথা না বলে রজনীর দিকে কয়েক মুহূর্ত একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। তারপর মাথা নেড়ে উল্টোদিকে ঘুরে শোয়। পুরো ব্যাপারটা তার বোঝা শেষ। রজনী একদম মিথ্যে কথা বলতে পারে না। পাশে থাকা কোলবালিশটাকে তীব্র আক্রোশে সর্বশক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে সে। তীক্ষ্ণ নোখের আঘাতে কোলবালিশের নরম সুতির ওয়ার ছিঁড়ে ভেতরের লাল রঙা আবরণ বেড়িয়ে আসে।

 

************

 

গভীর রাত। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। কোথাও এতটুকু শব্দ নেই। সারা বাড়িতে সবাই অঘোরে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। নাইট ল্যাম্পের মায়াবী নীলাভ আলোতে গোটা বাড়িটা যেন অলৌকিক কোনও স্বপ্নপুরী। পা টিপে টিপে একটা একটা করে ঘর পেরিয়ে বাড়ির একেবারে শেষ প্রান্তে বনির শোবার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল মিনি। বনি আজকাল এ ঘরে একাই শোয়, আর, মা বাবা শোয় গেস্টরুমটিতে। পরীক্ষার আগে অনেক রাত অবধি নিজের মনে নিরিবিলিতে পড়াশোনা করার উদ্দেশ্যেই বনির জন্য এই নতুন ব্যবস্থা। ঘরের দরজাটা আলতো করে ভেজানো। খুব সাবধানে একটুও শব্দ না করে দরজাটি খুলে পর্দা সরিয়ে আলো আঁধারি ঘরটিতে প্রবেশ করে মিনি। তারপর, ধীর পদক্ষেপে বিছানায় ঘুমন্ত বনির মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মশারির ওপার থেকে মন দিয়ে দিদিকে লক্ষ্য করে কয়েক মুহূর্ত। তার বুকের মধ্যেকার উথালপাথাল এখন সম্পূর্ণ শান্ত। ক্ষণকাল পরেই আশ্চর্য একটা রহস্যময় হাসি খেলে যায় ওর মুখে। অ্যাট লাস্ট! হ্যাঁ, অবশেষে তবে আজ তার সব প্রতীক্ষার অবসান হবে!

 

চট করে মশারির প্রান্তটা তুলেই নিজের কপাল থেকে একটা লালচে রঙের গোটা টিপে ভেতরের ভয়ংকর ছোঁয়াচে ঘোলাটে সাদা রঙের চ্যাটচ্যাটে রসটা বের করে প্রবল আক্রোশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা বনির সারা মুখে মাখিয়ে দেয় সে। উঃ, অবশেষে শান্তি! কতদিন ধরে একটা ঠিকঠাক প্রতিশোধের অপেক্ষায় ছিল সে। শেষমেষ স্বপ্ন পূরণ! একটা ভীষণ ক্রূর হাসি এবার ফুটে ওঠে মিনির সারা মুখে। পরম তৃপ্তির সাথে মাথা নেড়ে ঘর থেকে বাইরে বেড়িয়ে এসে উঁকি দেয় পর্দা সরিয়ে। সতর্ক চোখে এদিক ওদিক একবার চোখ বুলিয়েই দ্রুতপদে নিজের রুমের দিকে চলে যায় সে। তাড়াতাড়ি বিছানায় উঠে বসে বড় করে একটা তৃপ্তির শ্বাস ফেলে। আর তারপর পরম আনন্দে ছেঁড়াফাটা কোলবালিশটিকে বুকে জাপটে জড়িয়ে ধরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে।

 

 

 

ঠিক পাঁচদিন পরে বনির সারা শরীর জুড়ে লালচে গোলাপি রঙের রসালো গোটা বেড়োয়। বনির চিকেন পক্স হয়েছে!

 

 

 

 

 

 

 

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত