| 22 মে 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

ইরাবতী গল্প: চাঁদের দেয়ালে ক্যাকটাস । মাহবুব আলী

আনুমানিক পঠনকাল: 18 মিনিট

ওকে দেখে দলছুট কোনো নিঃসঙ্গ নাইটিঙ্গেল মনে হয়েছিল। কখনো তপ্ত দুপুরে শহরের রাস্তায় বিস্রস্ত হাঁটছে। কখনো অসাড় শুয়ে আছে কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের আলো-আঁধারি বেওয়ারিশ বারান্দায়। সুমিত জানে না, নাইটিঙ্গেল দল বেঁধে আকাশে ওড়ে কি না। শুনেছে, যখন শীত চারদিক থেকে তীব্র হয়ে নেমে আসে, বাতাসে শিরশির কাঁপন শরীরে নিয়ে আসে হিম-অলস জড়তা; পাখিগুলো একটু উষ্ণতার জন্য শত শত কিলোমিটার আকাশপথ পাড়ি দেয়। তারপর নেমে আসে কোনো ঝোপ বা গাছের নিরাপদ আশ্রয়ে। যে পাখিরা দল বেঁধে উষ্ণতার দিকে উড়ে যায়, তাদের কেউ কেউ আকস্মিক পথরেখা ভুলে বসে। হারিয়ে একা হয়ে যায়। ওকে তেমনই কোনো ভুল পথে হেঁটে বেড়ানো একলা পথিক মনে হয়েছিল। পথ ভুলে হারিয়ে যাওয়া কোনো বিষণ্ন নাইটিঙ্গেল!

সে তেমন বিষাদের এক গান ধরে। শীত রাতের কনকনে ঠান্ডায় একটু জীবন-উষ্ণতার জন্য। তার সুর বিমূর্ত বেদনার ঢেউ হয়ে ভেসে ভেসে ছড়িয়ে পড়ে দূরে আরও দূরে। কারও বুকে প্রতিধ্বনি তুলে যায়। আশ্চর্য অপার্থিব কণ্ঠ। সেই গান কেউ শোনে কি শোনে না কিংবা আড়ালে কেউ কান পেতে শোনে আর হারিয়ে যায় অন্যকোনো ভূবনে, তেমন ভাবনা নেই। নাইটিঙ্গেল আপনমনে আপন সুরে গেয়ে চলে। তারপর গল্পে যেমন রক্তলাল একটি গোলাপকুঁড়ি ফুটিয়ে ঢলে পড়ে। তার ছোট্ট শরীরের উপর জমে উঠে রুপোলি তুষার। সুনীল আকাশে হারিয়ে যায় সুন্দর প্রাণ…গানের আত্মা। ওকে তাই সে-রকম নরম আর আদরের পাখি মনে হয়। সেজন্যে মনে তার জমে ওঠে কোনো অচেনা অনাস্বাদিত উপলব্ধি কিংবা সেটি কি সে জানে না। একদিন জানা গেল ওর নাম সখি।

রাস্তার ধারে বাড়ি। পুবে জানালা। উত্তর দেয়াল ঘেঁষে ঝুল-বারান্দা মতো ছাউনি। সিমেন্টের বেঞ্চ। গতরাতে হয়তো এখানেই বসেছিল তারা। কিছুক্ষণ। তারপর চলে গেছে। চোখ ছড়িয়ে দিলে খেলার মাঠ। পুবে সারি সারি দোকান। বেদখল ফুটপাত। সস্তা কাঠের চৌকি ফেলে দোকান বসে গেছে। কোনো কোনোটির স্থায়ী রূপ-কাঠামো। উত্তরে শেষ দোকানের চৌকিতে বসেছিল মেয়েটি। উনিশ-কুড়ি কিংবা সতেরো-আঠারো অথবা তারও কম। সঙ্গে প্রায় সমবয়সি আরও দু-জন।

হরতালের দিন। রাস্তায় লোকজন তেমন নেই। দুপুরের আগে আগে হরতালকারি আর পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া হয়ে গেছে। ইটের টুকরো ছড়িয়ে আছে রাস্তার এখানে-সেখানে। প্রায় নির্জন নীরব পরিবেশ। নাইটিঙ্গেল চটুল কোনো গান গাইছিল। অদ্ভুত মায়াবী কণ্ঠের সুর আগমনী সন্ধেকে দখল করে ফেলে। অভূতপূর্ব দুর্মর মুহূর্ত। সুমিতের সবকিছু নস্টালজিক আর মায়াময়। বিহ্বল করে দেয়। সেই ঘোরে হয়তোবা আনমনা ডেকে বসে তাকে। তখন সবকিছু থেমে গেছে। যার ঘোরলাগা মন, সে তেমনকিছু বোঝে না। স্তম্ভিত সময়ে বাতাসে ভেসে আসে শুধু মর্মর ধ্বনি। তারা হেসে হেসে প্রায় অস্থির। ডাক ফেরানো যায় না। তারপর আবার হাসির ঝরনা। সেই ধ্বনির মধ্যে কেমন অজানা রহস্য লুকিয়ে থাকে। ঠিক রহস্যও নয়। তারা কী ভেবে তিনজন উঠে আসে। উদ্ধত বিস্রস্ত চলন। লোভ ঘৃণা কিংবা করুণার জলরঙে আঁকা ছবির মতো। সুমিতের দৃষ্টি সম্মুখে শুধু সেই নাইটিঙ্গেলের দুটো চোখ। সহজ বেদনার্ত অথবা গভীর দুর্বোধ্য দৃষ্টি। কথা বলছিল মেয়েটি।

‘কিছু কইবেন?’

‘তুমি তো চমৎকার গান গাও, কী নাম তোমার?’

‘হি হি নাম দিয়া কাম কী! ভিত্‌রে আইমু?’

তার সঙ্গের অন্য একজন জবাব দেয়। অনেক চঞ্চল আর অকারণ হাসে। এদিক-ওদিক খুব দ্রুত দৃষ্টি ফেলছে।

‘বোকা মেয়ে! আমি তার নাম জানতে চাইছিলাম। কী করো?’

‘বোকা কয় রে ছিনালি, ব্যাডায় ট্যাকা দিব না।’

পাশের মেয়েটি আবার বলে ওঠে। বেশ উদ্ধত। নাইটিঙ্গেল তার দিকে একবার তাকিয়ে সরাসরি দৃষ্টি রাখে চোখের উপর। সে চোখের ভাষা অদ্ভুত মায়াময়। অচেনা শিহরন জাগায় বুকের ভেতর। সুমিত চমকে ওঠে। সে কী বলবে অথবা তার সঙ্গে কী আলাপ? জানে না।

‘আমার নাম সখি।’

‘হ রূপে-রসে-টসটসা সখি। ভাল্‌লাগে?’

অন্য মেয়েটি শুধু চঞ্চল নয় বেশ বাচাল। কথা না বলে থাকতে পারে না। ঠোঁটের কশ বেয়ে পানের রস বেরোয়। সখি বিরক্তি নিয়ে তাকায়। তাতে তার কিছু এসে যায় না। সখি বলে উঠে, –

‘কী করি বোঝেন না? আর কিছু কইবেন?’

‘সখি, বেশ সুন্দর নাম তো। তোমার সাথে আলাপ করি…সময় আছে?’

‘ট্যাকা দিবেন তো, না কি…?’

‘দেব।’

‘এখানেই আলাপ করবেন, না ভিত্‌রে যামু?…বাসায় কেউ নাই?’

‘এই বারান্দায় বসতে অসুবিধা নেই তো?’

‘আমার আছে। আর একটু পরে আসি…রাইত নামুক।’

তিনজন একসঙ্গে কাচের পেয়ালা ভাঙার মতো ঝিরঝির করে হাসে। সে হাসিতে আগের সেই বিহ্বল মাদকতা ছাড়াও জড়িয়ে থাকে অজানা রহস্যময় আহ্বান। তার পরতে পরতে বিষণ্নতার কথাও লুকোনো। একজন মানুষ তো নিজের ইচ্ছেয় এমন কাজে নেমে যায় না। তারপর যদিও দু-একটি কথা, একেবারে খোলামেলা নগ্ন দরদাম। সুমিত বিব্রত বিস্মিত দৃষ্টিতে তাদের চলে যাওয়া দেখে। বাতাসে ভেসে আসে অন্যকোনো চটুল গানের ভাঙা সুরধ্বনি। তখন ওই মেয়েটি গাইছিল না।  


আরো পড়ুন: বিব্রতকর আলাপ-প্রলাপ । মাহবুব আলী


সখির সঙ্গে এভাবেই আলাপের সূত্রপাত। সুমিত ভেবে নেয়, নাইটিঙ্গেল, পাখির শিস দেয়া গানের মেয়েটি; সখি আসবে। তখন অস্বস্তিকর কোনো পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে? অথবা অচেনা অজানা কোনো উপলব্ধি? কে জানে। সন্ধেরাতে নানান দোলাচলে কখনো অস্থিরতা নেমে আসে। বাতাসে ঢেউ তুলে তুলে ভেসে আসা অচেনা সুবাসে সেই ভাবনা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যায়। না…সখি আসেনি। সময় চলে যেতে যেতে একসময় মনে হয় ভালোই হয়েছে। সে আসেনি। তারপরও তখনো মনের গহিনে সামান্য অস্বস্তিময় প্রত্যাশা জেগে থাকে। সেটি দুর্বোধ্য কোনো পাপের মতো কিংবা সকলকে চমকে দেয়ার অনাস্বাদিত পুলক-কাহিনি। ওকে নিয়ে চমৎকার নিউজফিচার লেখা যায়। টেনে আনা যায় অনেক গল্প। সামনের-পেছনের। সে-সবের নেপথ্য ইতিহাস। নাম-বর্ণ-জানা-অজানা রহস্য। এর চেয়ে রহস্যময় অভিযান আর কি হতে পারে?

তারপর রাত বাড়ে। আকাশের পুবকোণার বাঁ-পাশে জেগে থাকা একলা চাঁদ ধীরে ধীরে মধ্য-আকাশ পেরিয়ে যায়। অক্ষম স্তিমিত হয়ে পড়ে কারও প্রতীক্ষা। আসলে বোকা মানুষেরা অনেককিছু বিশ্বাস করে। সে-সবের মধ্যে উচিত-অনুচিত কিংবা যৌক্তিকতা নিরূপণের কোনো পরিসর রাখে না। রাখতে চায় না। পারে না…মনেও থাকে না। সখি…একজন রাস্তায় ভেসে বেড়ানো খারাপ মেয়ে। তার কোনো ঠিকানা নেই। সে এসব ঠিকানাবিহীন সখিদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে আসলে কী করতে চায়? সে আন্তরিকতার মানেই বা কি? সখি…সখিরা এ রকমই, যখন যেদিকে মন চায়, সুবিধা পায়; সেদিকে হেলে পড়ে। নিজেকে বিক্রির পয়সা আঁচলে বেঁধে চলে যায় নিষ্ঠুর দিনযাপনে। কিছুক্ষণ বিচ্ছিন্ন বিচিত্র ভাবনার অনুরণন চলতে থাকে। পরে আর মনে থাকে না। স্বপ্নদোলায় তার দু-চোখে নিবিড় ঘুম নেমে আসে। মধ্যরাতে কে যে দরজায় টোকা দিয়ে জাগাতে চায়, জানাতে চায়, ঘুমঘোরে কে এসে কাছে বসে; হয়তো সে সখি কিংবা চেনা-অচেনা কোনো নারী। সে এসেছিল। কেন এসেছিল ওই বোধ আর সত্যতার যুক্তিতর্ক নিয়ে ভাবনা ছিল না। সখি রূপকথার সেই না দেখা নাইটিঙ্গেল, যার কণ্ঠে মরমী শিস; স্পর্শের রেখায় রেখায় নারীর অনাস্বাদিত প্রেম। অবশেষে সকালের সূর্য নতুন দিন হয়ে জেগে থাকে জীবনভর। নস্টালজিক স্মৃতি হয়ে গোপন অভিসারের কাহিনি লিখে যায় বুকের মধ্যে। সে গোপন প্রেম কিংবা পাপ। সে ভাবনা বা প্রশ্নের অবসর নেই। সখি একজন মায়াবতী নারী হয়ে রইল। অথচ সে-সবই ছিল উর্বর কল্পনা। সখি আসেনি।

এরপর সখির কথা মনে ছিল না। একদিন সকালে নাশতার জন্য মোড়ের রেস্তোরাঁয় যেতে চোখে পড়ে। সেই তিনজন। অদ্ভুত সুন্দর কিংবা চমৎকার কুৎসিত বসে আছে। রেস্তোরাঁর বাইরে। গ্রিলদেয়া জানালার কাছাকাছি। জায়গাটি ফুটপাত কিংবা রিকশাস্ট্যান্ড। বাইরে বিস্তৃত দেখা যায়। সে দেখে রেস্তোরাঁর বেয়ারা হাত উঁচু করে খবরের কাগজে মোড়ানো পরোটা-তরকারির পোটলা তুলে দিচ্ছে। সখি সেটি হাতে নিতে ব্যস্ত। তখন তার সঙ্গে দৃষ্টির সংযোগ। কতক্ষণ কে জানে, মুহূর্তমাত্র কিংবা অনন্তকাল; অদ্ভুত মায়াবী সেই দৃষ্টি বুকের মধ্যে আকস্মিক ধক করে ওঠে। আহা মেয়েটি এত সুন্দর আর মায়াময়! কত মধুর করে হাসে! এ হাসি যে হাজার বছরের চেনা। মন বিষণ্ন হয়ে যায় অকারণ। কোথায় কোন্‌ অ্যাসাইনমেন্টে যেতে হবে মনে থাকে না। সখি কী করে এ পথে এলো? কোথায় তার ঘর-বসত? কোথায় গন্তব্য? অচেনা অস্থির ভাবনা বিহ্বল সত্ত্বায় শুঁয়োপোকার মতো কিলবিল করতে থাকে। তখন প্রিয় খাবার অত্যন্ত বিষাদ। সবকিছু উগড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। সারাদিন সেই অস্বস্তি কিংবা বিমুগ্ধ হাসি যন্ত্রণা শুধু দিতে থাকে।

একদিন পড়ন্ত বিকেল। সুমিত জেলরোডের পশ্চিম ফুটপাত ধরে হেঁটে চলেছে। সঙ্গে প্রভাষক বন্ধু রফিকুল। কলেজের বিবিধ সমস্যার কথা কানে এসে বাজে। সে কখনো ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘ও’ বলে যায়। এরই ফাঁকে আবার সেই তিনজনের দেখা। কৃষি সমপ্রসারণ অফিসের সেই দক্ষিণ কোনায়। অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে বারান্দা। সখি চুল বাঁধে। একজন সেজেগুজে পান চিবোয়। ঠোঁট টকটকে লাল। অন্যজন বিস্রস্ত শুয়ে আছে। সটান…এক লাশ।

চোখ পড়তেই সখি বাঁ-আঁচল এমনভাবে সরিয়ে দেয় যেন অনিচ্ছাকৃত। সুমিত দৃষ্টি না সরিয়ে পারে না। সখি তা হলে তেমন একজনই ভেবে নিয়েছে। তাই কি? কিন্তু মেয়েটি তো তেমন নয় বলেই মনে হয়েছিল। কে জানে! এদের চেনা মুশকিল। চেনা যায় না। তখন রফিকুলকে নিয়ে চা খেতে জেলা অডিটোরিয়ামের পশ্চিম দেয়ালঘেষা রেস্তোরাঁয় চলে আসে। গল্পের তালে তালে ধীরে ধীরে নেমে আসে রাত। কলেজের ম্যানেজমেন্ট, ডনেশনের টাকা লুটপাট, দায়িত্বহীনতা নানান কথা কচকচি মনে হয়। এসব শুনতে ভালো লাগে না। উপায়ও নেই। একজন ভালো শ্রোতা পেলে সকলেই গল্পের ডালি নিয়ে বসে। এরমধ্যে দু-কাপ চা হয়ে যায়। রেস্তোরাঁর ভেতরে অসহ্য গরম। অবশেষে সেখান থেকে বেরোয়। ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানগুলো বন্ধ হতে শুরু করেছে। দোকান মালিকেরা পোটলাপুটলি বাঁধার কাজে ব্যস্ত। কোনো কোনো দোকান উঠে গেছে। পরিত্যক্ত হয়ে আছে চৌকি। রফিকুল তেমন একটিতে বসে ইশারা করে।

শুক্রবারের রাস্তায় লোকজনের তেমন ভিড় নেই। হঠাৎ করে দু-একটি রিকশা ছুটে চলে যায়। আচমকা দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে থেমে গেল। যত গর্জে তত বর্ষে না। তখন কৃষি অফিসের বারান্দা থেকে তিন রূপসী বেরিয়ে পড়েছে। তারা এলোমেলো হাঁটে। চোখের ভাষা অদ্ভুত। খদ্দের ধরার ফাঁদ। সখি মুখের সামনে দিয়ে দু-বার এদিক-ওদিক হেঁটে যায়। তার বুকের বাঁ-আঁচল তেমনই উদ্ধত। সুমিতের খারাপ লাগে। তখন সেই দুপুরের কথা মনে পড়ে যায়। এই মেয়েটি অনেক চেনা অথবা একেবারে অচেনা। এই কথা ভেবে বিব্রত হয়ে পড়ে। তারও কারণ আছে। এড়িয়ে যেতে চায়। তারা সম্মুখ দিয়ে আরও কয়েকবার আসা-যাওয়া করে। বাঁ-দিকের আঁচল সরানো। সুমিত অপাঙ্গে দেখে, রফিকুলের চোয়াল অনেক ঝুলে গেছে।

‘দেখেছেন কালিতলার আস্তানা ভেঙে কী হয়েছে? আমাদের দেশে শুধু সমস্যা। কীভাবে সমস্যা তৈরি করা হবে তার পলিসি। এখন গোটা শহর আউট-অব-বাউন্ড। চলেন এখানে আর বসা যাবে না।’

‘কেন ভাই জীবন মানেই তো সমস্যা। ওটা না থাকলে কাজ কী করে তৈরি হবে? যত সমস্যা তত কাজ। কাজ মানে প্রজেক্ট; প্রজেক্ট হলে টাকা।’

‘আমাদের যে সমাজকর্মী নেতারা আউট অব বাউন্ড ভেঙে দিল। এ নিয়ে কাগজে লিখছেন না কেন? আগে সকল বর্জ্য একটি ড্রেন দিয়ে চলে যেত। সে পথ রুদ্ধ করায় চারপাশে নোংরা ছড়িয়ে পড়ছে। নাকি আপনি উচ্ছেদ সমর্থন করছেন?

‘এ কথা ঠিক। আর লেখার কথা বলছেন…কত লিখবেন? আজকাল লিখে তেমন কাজ হয় না। সবকিছু ম্যানেজ করে চলছে।’

‘তা হলে মিডিয়ার দরকার কী? যে ড্রেন দিয়ে ময়লা পানি চলে যাচ্ছিল তা তুলে দিয়ে এমন বিতিকিচ্ছি কাণ্ড কেন ঘটানো হল?’

‘স্বার্থগোষ্ঠী আর প্রশাসন ম্যানেজ হয়নি বলে।’

রফিকুল এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। ভাবগতিক দেখে মনে হয়, লেকচারের পরবর্তী অধ্যায়ের প্রস্তুতি চলছে। পারেও বটে!

‘বড় যন্ত্রণা! কোথাও একটু বসব…উপায় নেই।’

‘কেন ভাই ভয় লাগছে? সমস্ত সমাজ যখন কালিময়, রং লাগার ভয় কিসের?…ওই মেয়েটিকে চেনেন? আসুন পরিচয় করিয়ে দিই। ওর নাম সখি।’

‘ভাই আপনি ব্যাচেলর মানুষ। সাংবাদিক। আপনি তাদের সাথে কথা বলেন, স্টোরি তৈরি করেন; পত্রিকার পাঠক গিলে খায়। আপনাকে বাহবা দেয়। আর আমি কলেজের মাস্টার। ছাত্রছাত্রি আছে, সংসার আছে, বাচ্চাকাচ্চা আছে; ওদের সাথে কথা বলে ব্যাড-রেকর্ড করতে চাই না। তখন সমাজ তো সমাজ, সংসারে অশান্তি শুরু হবে। চলেন উঠি।’

‘ভুল বলছেন আপনি। বরং ব্যাচেলর মানুষের অসুবিধা বেশি। কোনো বাপ মেয়ে দেবে না…হা হা হা!’

‘হা হা হা যা বলেছেন! চলেন ওঠা যাক। রাতও হল বেশ।’

‘আ রে বসেন বসেন…দাঁড়ান সখির সাথে আলাপ করিয়ে দিই।’

‘আপনি ক্ষেপেছেন দেখছি!’

বার্তা প্রধান হাসনাত ভাই এই কথা বলেছিলেন। ‘নোংরা ডাস্টবিন না ঘেটে, কোথায় কোন্‌ ঘাপলা আছে; দেখতে হবে। একটি কেস ধরতে পারলে বাড়ি-গাড়ি আরাম-আয়েশ, জীবনে আর কী চাই?  ক্লাস ফোর-ফাইভ ডিগ্রি নিয়ে কেউ কেউ তো অনেক সম্পদের মালিক হয়ে গেল। আপনি কী করলেন? ওসব আদর্শ-তাদর্শ করে কিছু হবে না। এখন যুগ অন্যরকম, সেই তুলনায় নিজে অন্যরকম না হলে চলে না।’ তারপরও সুমিত কিছু করতে পারে না। দৃষ্টির সবটুকু জুড়ে শুধু ক্লেদ ভেসে ওঠে। কিছু করতে হবে। সবমসয় এমন তাগিদ। মনের মধ্যে কেউ খোঁচাতে থাকে। তাই সখির কথা বুকে খুব বেজে যায়। স্বস্তি আসে না।

সে ক্রাইম রিপোর্টার। মানুষের চোখে চোখে হাজারও অপরাধের খেলা দেখতে পায়। মানুষের স্বভাব হল ক্রাইম করা। অন্যায় পথে নিজের সুবিধা বাগিয়ে নেয়া। নিজের আখের গোছানো। এতে কার ক্ষতি হলো, অন্যায়-অত্যাচার হলো কি না; মানুষ কিছু দেখে না। দেখেও না দেখার ভান করে। এই হলো সক্ষম মানুষের পুজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা। এতে বলি হয় নিরীহ দুর্বল আর সরল মানুষ। তাদের প্রতিবাদের ভাষা কোথাও বেজে ওঠে। কোথাও বাজে না। তারা মুক ও বধির। তাদের মুখে কথা জোগাতে হবে।

ধৈর্য ধরে থাকতে হয়। যতটুকু সম্ভব চেহারায় ভাবলেশহীন অভিব্যক্তির মুখোশ সেঁটে রাখতে হয়। কাগজে কাজ করার প্রথম কথাই এটি। হাজার লোক হাজার কথা কইবে। অভিযোগ জানাবে। মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। বিশ্বাস করা যাবে না। এখন চারপাশে এমন লোকজনের সংখ্যা বাড়ছে। মানুষের চোখে চোখে দৃষ্টি দিয়ে খুব সহজে বোঝা যায়, সরল মুখোশের আড়ালে রয়েছে অন্য মানুষের মুখ। তাকে চেনার চেষ্টা চলে। অফিসের অ্যাকাউন্টেন্ট যেমন খুব বাবু মানুষ। হাসি-খুশি-মিশুক। আত্মভোলা বন্ধুপ্রতীম সহকর্মী। অথচ ভেতরে ভেতরে এক মহাগাড়োল…নম্বর ওয়ান চোর। কোন্‌ কোন্‌ নামে তাকে ডাকা যায়? ধড়িবাজ, চতুর শয়তান, ধূর্ত আর কী? লোকটিকে কেন জানি অসহ্য লাগে। সম্পাদক মালিকের কানে কানে নানা কথা লাগায়। কানপাতলা প্রভু তাতেই নাচে। বড় আজব এই সমাজ আর দিনকাল। নাকি ক্রাইম রিপোর্ট তৈরি করতে গিয়ে অদ্ভুত সব সন্দেহবাতিক দু-চোখের সামনে মিছিল করে যায়? সে ঠিক বোঝে না। বুঝতে পারে না। বোধের জায়গায় কেউ বলে যায়, সবকিছু কত নিচে নেমে যাচ্ছে! মানুষের চোখে চোখে হাজার অপরাধ…ভেসে বেড়ায় বাতাসে।

সখি একদিন দুপুরে সিনেমার চটুল গান ছেড়ে রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে ওঠে। বাড়ির পুবে সেই বারান্দায় বসেছিল তিনজন। সুমিত কী কাজের মধ্যে ডুব-ডুব আচ্ছন্ন। জানালা দিয়ে ফুরফুরে বাতাস ভেসে আসে। আকস্মিক সেই ঢেউয়ে ‘জীবনও যখন শুকায়ে যায়, করুণা ধারায় এসো’ সুরের মূর্ছনা উঁকি মেরে তাকে হতবিহ্বল করে দেয়। এই কণ্ঠ যে তার চেনা। সখি তা হলে তার বাহির-আঙিনায় এসেছে। সখি তো আর দশজনের মতো নয়। আলাদা। সে নিশ্চুপ শুনতে থাকে। তারপর সম্মোহিত কোন্‌ সময় তাকে ডেকে ভেতরে এনেছিল মনে নেই। ধীরে ধীরে নেমে আসে সন্ধেরাত। ঘরের মধ্যে অদ্ভুত আলো এসে দু-জনের চোখে-মুখে ছড়িয়ে যায়। তারপর অনেক কথা। সখি বলে যায় তার অকথিত গল্প।

‘দুইন্যাটা বড় আজিব…আজিব মানুষের কারবার।’

‘কী করে এ পথে এলে?’

সৎমা আর দূর-সমপর্কের এক মামার সঙ্গে শহরে এসেছিল সখি। কাজ নিয়ে দেবে তারা। গ্রামের স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ছিল। ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছে। স্কুলের বার্ষিক সংগীত প্রতিযোগিতায় জুটেছে পুরস্কার। এসব নিয়েই ছিল আনন্দময় জীবন। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর চার-পাঁচ মাসের মধ্যে সব শেষ। এত বড় পৃথিবীতে অন্য কোথাও ঠাঁই নেয় তেমন কেউ নেই। কেউ খোঁজ-খবর নেবে…কে ছিল? সারাদিন বাড়িতে কাজ আর কাজ। একমুঠো ভাতের জন্য শত গালিগালাজ সহ্য করতে হয়। বেঁচে থাকা অনেক কষ্টের। হাজার হাজার মানুষের পৃথিবীতে সে নিঃসঙ্গ একাকী। একদম একা। সেভাবেই বেঁচে থাকতে চেয়েছিল। পাড়ার সুন্দর করে দেখতে ছেলেটির দু-একটি চিঠি পেয়েছিল। ফুল-লতা-পাতা ছাপা প্যাডের পাতায় আবেগমাখা ভালোলাগার কথা, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া করার আছে কি? সুখের মোহ ছিল না। কোনো বড় স্বপ্ন নেই। মনের গহিনে শুধু একটি প্রত্যাশা। একদিন উঠে দাঁড়াবে। প্রতিষ্ঠা পাবে কিন্তু কীভাবে জানা ছিল না। এখন নোংরা দুর্গন্ধময় জীবন। সখি বলতে বলতে কাঁদে। তাকে কাঁদতে দিতে হয়।

সৎমা খুব ভোরে দু-বাড়ির কাজ করতে চলে যায়। সে সারাদিন একা একা ঘরে বসে থাকে। কখনো কোনো কাজ গোছায়। সে কাজইবা কী! নিভে যাওয়া উনুনে আর কোনোদিন আগুন জ্বলে না। সৎমা সন্ধেয় যেটুকু খাবার নিয়ে আসে, ভাগ করে খেয়ে নেয়। তারপর অন্ধকার রাতে একটি ঘরের এককোণায় পড়ে থাকে দু-জন। রাতে কত শেয়াল-কুকুর কিংবা তক্ষকের ডাক! তার সঙ্গে মানুষের। কোনটি সত্য কোনটি নকল বোঝা যায় না। সে ছিল অন্ধকারের দিনযাপন। অবশেষে সেই মামা আর মা পরামর্শ করে তাকে শহরে নিয়ে আসে। তারও আগ্রহ। শহরে কাজ পাওয়া যায়। একটি কাজ পেলে তাদের আর কষ্ট থাকবে না। জীবনকে সাজিয়ে নেয়া যায়। অন্ধকার অনিরাপদ জীবনে একটু স্বস্তি ফিরে আসবে। নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়া যায় বেঁচে থাকার দিনকাল। অথচ কে জানত, সে আরেক অন্ধকার পঙ্কিল নোংরা জীবনে নেমে যাবে। সেখানে শত শত বার মৃত্যু আর বেঁচে থাকা। সে বেঁচে থাকা দুর্গন্ধময় নরক যন্ত্রণায় কপিশ বিভীষিকাময়।

কাহিনি বলতে বলতে রাত আরও নিশ্চুপ গম্ভীর আর ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ওর দু-চোখে কোনো অশ্রুনদী ভেসে যায়। সেই চোখে আর চোখ রাখা যায় না। ক্যামেরা ধরে থাকা হাত অসম্ভব ভারী হয়ে পড়ে। আসলে কোন্‌ অন্ধকারের ছবি তোলা যায়? সম্মুখে আলোকিত অন্ধকার। তার চোখে-মুখে ফ্লাশগানের আলো কোনো রেখা তুলে আনতে পারে না। তখন সময় শ্লথ আর ঘেমে ঘেমে বয়ে যেতে থাকে। নিজেকে অসম্ভব স্বার্থপর পাষণ্ড মনে হয়।

‘শহরে চাকরি দিবে বইলা নিয়া আসে ওরা, কিন্তু বিক্রি কইরা দেয়।’

‘তুমি ওদের মতলব বুঝতে পারো নাই?’

‘কী কইরা বুঝুম? মা লাগে। আর যারে মামা ডাকি। ওর কোলে-পিঠে চড়ছি কত দিন। সে তেমনকিছু করবে কোনো সন্দেহ হয়নি।’

অনেক দূরের রাস্তা। সখি কোনদিক দিয়ে এসেছে কিছু জানে না। জানা বা বোঝার কথা নয়। তারপর রাস্তায় বমি করে করে নাকাল। কোনোমতো শেষ-দুপুরে গাবতলি নামে। তারপর একটি সিএনজি ধরে ঘিঞ্জি এলাকার এক বাড়িতে। অনেক বড় বাড়ি। সেখানে খুব ভালো ভালো খাবার খায়। মন তৃপ্তিতে ভরে ওঠে। দু-চোখে স্বপ্ন। এবার সে কাজ করবে। পরিপাটি বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্ন দেখে, সে গার্মেন্টেসের মেশিনে বসে সেলাই করছে। তার স্বপ্নবুনন। ভালো লাগে। বিকেলের দিকে মা আর মামা এক ঠোঙ্গা বাদাম হাতে দিয়ে বলে, –

‘তুই এইহানে বইসে বাদাম খা। আমরা তোর কাজের ব্যাপারে আলাপ করে আসি।’

এখানে এসে মেয়েটি নিশ্চুপ হয়ে কিছু ভাবে। স্মৃতি হাতড়ে দেখে নিতে চায় প্রতারিত সেই সময় আর দৃশ্যের কথা। তাকে সময় দিতে হয়।

‘আমার কোনো সন্দেহ হয় নাই। বিকাল থে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থে রাত; তারপর আর কত ঘণ্টা চলে যায়। তারা আর ফিরে আসে নাই। দুই দিন ধরে ওই ঘরে বন্দি। তালা মাইরা রাখে। পরে জানি বিক্রি হয়া গেছি।’

‘ওরা কোনো দুর্ঘটনায় পড়েনি তো?’

‘জানি না। যা হইছে আমার। মাত্র কয়েক হাজার টাকায় বিক্রি হইছি।’

‘তারপর?’

তারপর সেই কান্নার গমকে কোনোকিছু জানার আগ্রহ থাকে না। সে শুধু উপলব্ধির। কত দিন এ সমাজ নারীকে পণ্য করে চলবে? ইতিহাসের শুরু থেকে আর কত কাল? এসব ভাবনার মধ্যে অস্ফুটে তবু কথা ছুটে যায়। তখন সখির দু-চোখ কান্নাভেজা। আলো-আঁধারির দেয়ালে দেয়ালে দীর্ঘশ্বাসের ছবি আঁকে। সে ছবি তাকিয়ে দেখার কোনো সাহস থাকে না। তবু অজান্তে আবার প্রশ্ন ধেয়ে যায়।

‘তারপর?’

‘তারপর আর কি! অন্য মেয়েদের যেমুন হয়। সন্ধ্যা রাইতে তিনজন ঘরে ঢোকে। টাকাওয়ালা ঢ্যামনা মানুষ। অনেক শক্তি তাদের গায়ে। জানোয়ার…কুত্তার বাচ্চা।’

সখির বেদনার গল্প কাগজে লেখা যায় না। সে রিপোর্ট পুব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণের কোনো স্কুপ খবর নয়। সে খবর বা কাহিনি ছড়িয়ে আছে সবখানে। সুমিত তাই যত উৎসাহে রাত জেগে জেগে তৈরি করে, হাসনাত ভাই সব পড়ে হেসে জানালেন সম্পাদককে দেখাতে। সে বেশ হৃষ্টমনে স্ক্রিপ্ট সম্পাদকের টেবিলে দিয়ে আসে। সন্ধেয় সম্পাদক ডেকে বসলেন।

‘এটা কী?’

‘হিউম্যান স্টোরি স্যার। দেখেছেন মানুষের কত দুর্দশা। কীভাবে হিউম্যান ফ্লেশের ব্যবসা বিস্তৃত হচ্ছে। এসব ক্রিমিনালদের শাস্তি হওয়া উচিত স্যার।’

‘আর কোনো স্টোরি নেই? তুমি কী মনে করো আমার কাগজ কামনা বাসনা টাইপের অ্যাডাল্ট ম্যাগাজিন?’

‘জি স্যার, বুঝলাম না।’

সম্পাদক কথা না বাড়িয়ে স্ক্রিপ্ট ছুড়ে দিলেন। একেবারে মুখের উপর। সে ততক্ষণে কিছু বুঝতে পারে। এটি দৈনিক পত্রিকা। রম্য-অ্যাডাল্ট বা তেমন ম্যাগাজিন নয়। দৈনিক পত্রিকা ভদ্রলোকেরা পড়েন। সে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে যাওয়া কাগজগুলো কুড়িয়ে মনে মনে সম্পাদককে ধন্যবাদ জানায়। চেম্বার থেকে বের হয়ে আসে। ভদ্র সমাজ সভ্যতার আলোর মধ্যে কে বা কারা কোথায় কোন্‌ অন্ধকার পঙ্কিলে পড়ে আছে, সেই নিকষ গহ্বর থেকে কেন সামান্য একটু আলো হাতড়ে চলে; সে-সব দেখতে চায় না। এই ভড়ং নিয়েই যুগের অগ্রগতি সামনে এগিয়ে যাবে…এগিয়ে যায়।

সে তারপর নিজের টেবিলে এসে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে থাকে। ভালোই হয়েছে। সখিদের কথা লিখে করুণা আদায়ের হাস্যকর প্রয়াস কেন? এরপর কোনো একদিন দুপুরে সখিকে ডেকে নেয়। সখি হয়তো অনেককিছু বোঝে। তাই রোদেলা আলোয় নিজেকে মেলে ধরার কত বাহানা। সুমিত আরও একবার পথ হারানোর গল্প শোনে। নিজের লেখা পড়ে শোনায়। কেন কী জন্যে? সব অর্থহীন। কোনো ব্যাখ্যা জানা নেই। কখনো তার দু-চোখ আদ্র হয়ে ওঠে। সখির তেমন হয় কিনা দেখা হয় না। দেখতে পারত। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধে; অবশেষে সখি ফিরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালে তাকে কিছু টাকা দিয়ে বলে, –

‘সখি মন চাইলে যে-কোনোদিন এসো।’

মেয়েটি যেমন বিস্মিত, হয়তো খুব কষ্টে হতবাক; বর্ষিয়ান হেসে জবাব দিয়ে ফেলে, –

‘আপনে একটা আজিব চিজ মাইরি! কিচ্ছু করলেন না। অনেক ট্যাকা দিলেন। আমি যে কত্ত খেলা শিখছি, দেহাইতে পারলাম না। তয় একদিন দেখামু…ঠিক দেখামু।’

‘এমন কথা তোমার কাছে আশা করি না সখি। তুমি খুব ভালো মেয়ে।’

‘আপনে আমারে ভালো কইলেন? আমি ভালো…ভালো মাইয়া? হি হি হি! আমি একটা বেশ্যা…কুত্তি। বুঝলেন?’

হাসির মধ্য দিয়ে কোরাস স্তবের সুর ভেসে ওঠে। মেয়েটি আলোছায়া গোধূলিতে এমন করে কেঁদে উঠবে ভাবেনি। তারপর দৃষ্টির সম্মুখ দিয়ে ছুটে-দৌড়ে রাস্তায় চলে যায়। সুমিত আর একটি কথা বলার সুযোগ পায় না।

কয়েকদিন পর ফেরার পথে, প্রতিদিন অনেক রাত হয়ে যায়; সেদিন হলো না। সকালে রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে কী ভেবে সখিকে ডেকে নিয়েছিল। সে বাসায়। যেতে দেয়নি। তখন কেন যে এমন হলো, কেন যেতে দেয়নি, সে তার কে, কোন্‌ অধিকার বা বিশ্বাসে ঘরদোর ছেড়ে এসেছে? সুমিত কিছু জানে না। তার শুধু মনে হয়, সখিকে বিশ্বাস করা যায়। রাস্তায় নেমে অফিসে সেদিনের ঘটনা বারবার মনে পড়ে। কোনোদিন কোথাও এমনভাবে অপমানিত হয়নি। কোনো স্ক্রিপ্ট মাথা নিচু করে কুড়িয়ে নেয়নি। অথচ এমন হয়েছে। কেন? ভাবনার দোলায় দোদুল্যমান অস্থির মন কোন্‌ সময় স্থবির হয়ে গেছে জানে না। কখনো বিষয়টিকে ইতিবাচক ভেবে নিয়ে সান্ত্বনা হাতড়াতে থাকে। জগৎ এমনই। সে যা দেখে বা বোঝে, সকলে তেমন নয়। কেউ চেষ্টা করে…কেউ দেখে যায়; কোথাও অপচেষ্টা। তারপর আবার রাত, আবার সখি; এক নারী। দুঃখকথা গেয়ে চলা বা বিষণ্ন শিস দেয়া নাইটিঙ্গেল।

‘আপনে বোকা মানুষ। আমারে বউ পাইছেন?’

‘এ কথা কেন?’

‘সবকিছু ছাইড়া চইলা গেলেন। আমি যদি চিচিং ফাঁক কইরা দিতাম? কত্‌দিন চেনেন আমারে? আমি হলাম খারাপ মাইয়া…বেশ্যা। টাকা নিয়া শরীর বেচি।’

‘ভালবাসতেও পারো।’

‘সেইডা আবার কি জিনিস? শোনেন আপনেরে নেশা পাইছে, দুইদিন ফুর্তি করবেন মজা লুটবেন; তারপর কুত্তির লাহান ধাক্কা দিয়া বাইর কইরা দিবেন।’

‘আমি কি তেমন মানুষ সখি?’

‘ওই নামে ডাকেন ক্যান? রূপসি-সুন্দরী কবেন। আপনে কেমুন মানুষ? মানুষ না, আপনে একটা চিজ মাইরি! আপনার সমাজ নাই? ভাইবোন মা-বাবা? তারা এই খাসলতের কথা শুনলে ভালো কইব? আমি কি আপনার পিয়ারি? কাল চইলা যামু। আজ যা করনের কইরা লন।’

‘তুমি যেও না।’

‘ক্যান?…বিয়া করবেন?’

মেয়েটি এমন তির্যক দৃষ্টিতে তাকায়, সুমিতের মনে হয় ভেতর-বাহির সব পড়ে ফেলে। নিজেকে তার খুব ছোট মনে হতে থাকে। সে কথা না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সামনে একচিলতে আঙিনা। তার উত্তর কোনায় শখের বাগান। দিনের ফুল নিজেকে প্রায় গুটিয়ে নিয়েছে। রাতের হাস্নাহেনা সকল শাখায় ধবধবে সাদা নিয়ে আহ্বান জানাতে উন্মুখ। নিবেদনের সকল মায়ায় মাটির বুকে নুয়ে পড়তে ব্যগ্র। পারিজাত সুবাসে ভরে গেছে চারপাশ। পুব আকাশের কোনে বিশাল চাঁদ দিগন্ত ছাপিয়ে রুপোলি আলো বিস্তার করে চলে। অভাগা মেয়েটির কথা আশ্চর্য অনুরণন তুলে যায়। সেখানে বিমুগ্ধ ছটফট বেদনা। অস্থির ভাবনা ডানা মেলে দেয়। এই মেয়েটিকে যদি সারাজীবন কাছে পেতে চায়…কী কী বাধা আসবে? কোথা থেকে আসবে? তখন শহর থেকে দূরের কোনো এক গ্রামের আঙিনা কিংবা বারান্দায় বসে থাকা বাবার তীব্র মেজাজি চেহারা ভেসে ওঠে।

‘কী করেন?’

সুমিত টের পায়নি সখি কখন কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। চাঁদের আলোয় তাকে আকাশ থেকে নেমে আসা পরি মনে হতে থাকে। দুপুরে কি ভেবে ওর জন্য একটি শাড়ি কিনে এনেছিল। সেটি পরেছে। এতক্ষণ তেমনভাবে খেয়াল করেনি। সে হতবাক হয়ে যায়। দৃষ্টির পলক খেই হারিয়ে ফেলে। সত্যি মেয়েটি অপূর্ব সুন্দর!

‘ওটা কী গাছ?’

‘এটা ক্যাকটাস। মরুভূমির গাছ।’

‘ফুল গাছ? এহানে বাঁচে? ’

‘হুম…অনেক বছর পর একটি ফুল ধরে।’

‘কেমন দেখতে…সুবাস আছে?’

‘কোনো সৌরভ আছে কিনা জানি না…দেখতে খুব সুন্দর হয়।’

‘কিন্তু যেটা যেহানের সেহানে থাকাই ভালো, তাই না? মরুভূমির গাছ। মরুভূমি তো ধু-ধু বালু আর বালু।

‘তুমি জানলে কী করে?’

সখি হাসে। হাসি এত মধুর! কোনোদিন ভুলবে না। পিয়ানোয় টুং টুং সুর বেজে ওঠে। সুমিত বিস্ময়-বিমুগ্ধ। তার দৃষ্টির সামনে এক মানবী। নিষ্পাপ দু-চোখ বিষাদ সরোবর। সেখানে পদ্ম টলমল আশ্চর্য সরল বিশ্বাস। সে অজান্তে একটি হাত ধরে ফেলে। তারপর এ তেমনকিছু নয়, একটি কথাও বলে না সখি।

সখি পরদিন চলে গেছে। সুমিত বুঝতে পারেনি। একজন মানুষ এত নীরবে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। তার সর্তক শ্রুতি মনোযোগ কোনোকিছু টের পায় না। তাকে সারাদিন শহরময় খুঁজে পাওয়া গেল না। সেদিন সুমিতের প্রথম অফিস কামাই হয়ে যায়।

এরপর সখিকে আর কোনোদিন সে-সব জায়গায় দেখা যায়নি। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হাট-বাজার সিনেমা হলের আলো-আঁধারে অনেক মেয়েমানুষ দৃষ্টি মেলে থাকে। তার মধ্যে কয়েকজন গে-গার্ল থাকা বিচিত্র নয়। কিন্তু সেই তিনজনের দল বাতাসে মিলিয়ে গেছে। সখি নামের সেই মেয়েটি রাস্তায় ছড়িয়ে দিয়েছে অদ্ভুত শূন্যতা। কোথায় চলে গেল? কখনো কাজের ফাঁকে বদ্ধ দেয়ালে ঘুলঘুলি জানালা দিয়ে আলো ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো মনে পড়ে যায়। বুকের কোনো কোনায় অস্বস্তি জেগে ওঠে কিনা ভেবে দেখা হয় না। ওই পর্যন্ত, অথবা…সে কথা না হয় নিজের বুকে থাক। সুমিতের কেটে গেল অনেকগুলো দিন…বেশ কয়েকটি মাস। বছর-দেড় বছর। ধীরে ধীরে মন ভুলে যায় অনেক কথা। বেঁচে থাকা এরকমই। দিনযাপনের সময়রেখায় কখন কে এলো, কে গেল; মনে রাখার সময় বা ফুরসত কোথায়? তারপর আকস্মিক একদিন তাকে দেখে চমকে ওঠে। সেই দুপুর ছিল বুকে রক্ত ছলকে ওঠার মতো গভীর আর স্পর্শকাতর।

সখি হেঁটে যাচ্ছে লিলি সিনেমা হলের মোড় ঘুরে উত্তর রাস্তার প্রান্ত ধরে। উদ্দেশ্যহীন আনমনা। বিস্রস্ত বেশবাস। দুর্বল কাতর পদক্ষেপ। শ্লথ জীবন। অথবা তেমনকিছু নয়। অব্যক্ত ভাবনায় আচ্ছন্ন। তার চেহারা ভেঙে গেছে। চোখ-মুখ কৃষ-কালো। কোলে বাচ্চা। যে-টুকু দূরত্ব ছিল, অনেক কাছাকাছি অথবা দুর্লঙ্ঘ্য ব্যবধান; সব বোঝা যায়। অথবা সবটুকু বোঝা যায় না। দুর্বোধ্য। বুঝতে পারা যায় না। বুঝে কি লাভ অথবা ক্ষতি? মেয়েটির পরনের ছেঁড়াফাটা ময়লা শাড়ি। কোথাও ছোপ ছোপ কালো দাগ। সেটি যেন রক্ত শুকিয়ে ব্যর্থ জীবনের মানচিত্র রেখা।

তখন মাথার উপর গনগনে সূর্য। মাঝে মধ্যে তাপদাহ…হলকা বাতাস। সে থমকে যায়। সেই চেনা সখিকে অনেক অচেনা লাগে। প্রায় অর্ধ-উলঙ্গ হেঁটে চলে। সুমিত এই দৃশ্যে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। আশ্চর্য দোটানায় মন দোলায়মান। কেবলই মনে হয় বিষণ্ন কোনো সুড়ঙ্গের মধ্যে পড়ে গেছে সে। সেখানে কোনো আলো নেই। কোনো দিশা নেই। অন্ধকার আর কালো অন্ধকার। কেউ মুখ ব্যাদান গ্রাস করতে আসে। কতক্ষণ মনে নেই। তারপর এসব ভেবে কি লাভ অথবা কেন সে ভাবে? ভেবে নিয়ে মন শক্ত করার কত চেষ্টা। পারে না। তখন সুনীতির কোমল মুখছবি ভেসে ওঠে। দেখতে দেখতে বছর পেরিয়ে গেল। ফিরে যাবার তাড়া আছে। কখনো আবার ভাবে, একবার জিজ্ঞেস করবে নাকি; কেমন আছে সখি? এতদিন কোথায় ছিল? আগের মতো এখনো কি গান গায়? কিন্তু নিজের প্রতি কাষ্ঠহাসি বা উপহাস ছড়িয়ে সবকিছু এড়িয়ে পালিয়ে আসে। অথচ পারা গেল কই? তখন কোন্‌ রাস্তায় কোথায় চলেছে কিছু বোধ থাকে না। এই পৃথিবী, প্রচণ্ড দুপুর, মানুষজন, বেঁচে থাকা সবকিছু হারিয়ে যায়। বিষণ্ন হয়ে পড়ে মনের সবটুকু খোলা আকাশ। সখিরা রাস্তায় ঘোরে। শহর জীবনে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দিনের আলো কিংবা অন্ধকার কোনায় কত সখি ঘোরে, কে কার খবর রাখে; কার তেমন দায়? মানুষের কুটিলতায় সুন্দর মানুষেরা সখি হয়। বিড়ম্বিত জীবনের সকল কলুষ কিংবা বিষ নিজের বুকে নিয়ে তারা বাঁচে। আমরাই শুধু বেঁচে থাকতে পারি না। এই বেঁচে থাকা প্রহসন। উজ্জ্বল রোদের দুপুর দু-চোখে অন্ধকার রাত হয়ে নেমে আসে।

বেশ কয়েক মাস পর শীতের কোনো সন্ধেরাত। সেদিন বিকেলে অনেকক্ষণ বৃষ্টি হয়ে গেছে। মধ্য-পৌষের বৃষ্টি কারও কাছে আগামিদিনের নিশ্চিত সুদিনের ভাবনা হলেও শিরশির বাতাসে হিম হিম শীতলতা কয়েকগুণ তীব্র। অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে বেশ রাত হয়ে যায়। মনে টান টান উত্তেজনা। নতুন এক অ্যাসাইনমেন্ট শেষে মনে তোলপাড় ফুর্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। এই খবর প্রকাশ পেলে শহরে কেন, দেশের সবখানে হুলস্থুল পড়ে যাবে নিশ্চয়। স্কুপ আইটেম। সেই ভাবনা আর দৃশ্যকল্পে অস্থির হয়ে আছে মন। বার্তা প্রধান হাসনাত ভাই আর সম্পাদক রিপোর্ট পড়ে দু-চোখ ছানাবড়া। অনেকক্ষণ চকচকে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সুমিত এমনভাবে কোনোদিন তাদের খুশি হতে দেখেনি। তাই অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে ঘরে ফিরবার তাড়া। কয়েকদিনের বিচিত্র কৌশল আর পরিশ্রমে শরীর-মন যতটুকু ক্লান্ত, তার দ্বিগুণ বিশ্রামের মধ্য দিয়ে পার করার ইচ্ছে। ছাদের উপর প্রিয় সেই ক্যাকটাসের ফুল ফোটার সময় হয়ে এসেছে। কত বছর কিংবা যুগের পর একটি ফুল। বছরের পর বছর, এই অপেক্ষার শেষ কেমন; কখনো সময় দেখতে দেখতে মন অধৈর্য হয়ে পড়ে। কখনো অদ্ভুত চঞ্চল অস্থিরতা কিংবা প্রসন্নতার তৃপ্তিতে ভরে যায়।

দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসতে আসতে অনেক সময় কেটে যায়। মনের সঙ্গে যত কথা যত ভাবনা সব কেমন বিলম্বিত শ্লথ পরিক্রমণ করতে থাকে। ঘোরলাগা প্রহর। তাই বাড়ির কাছাকাছি আসতে আচমকা থমকে গেল সে। বেওয়ারিশ পড়ে থাকা বারান্দার আলোছায়া অন্ধকার। দক্ষিণে দেয়ালে সিমেন্টের বেঞ্চ। তার নিচে আবছা কোনো ছায়া। কোণের লাইটপোস্ট থেকে ম্লান আলো পড়েছে সেখানে। প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে কেউ একজন হাত-পা গুটিয়ে কুণ্ডলিত বসে আছে। সখি। কষ্ট করেই চিনে নিতে হয় তাকে। অনেকদিন ছিল না। সিনেমা হলের মোড়। বাহাদুর বাজার। ইনস্টিটিউট চত্বর। কৃষি অফিসের পরিত্যক্ত সেই বারান্দা। জেলরোড ফুটপাত। কোনোখানেই একপলক দেখা যায়নি তাকে। আজ আকস্মিক কোত্থেকে এলো? তারপর তার দরজায়? বাচ্চাটি তো কোলে নেই। সখি হয়তো জিজ্ঞাসার জবাব দিতেই এগিয়ে আসে। হতবিহ্বল নির্বাক সময়। আলোছায়া অন্ধকারে দৃষ্টি দেখে নিতে ভুল করে না, অসময়ে অসম্ভব বুড়িয়ে যাওয়া কৃষকায় মেয়েটির সকল আদ্যোপান্ত। ঠক ঠক করে কাঁপছে সে। কোনো ভূমিকা নেই, অশ্রুপাত কিংবা স্মৃতিচারণ; যা ছিল সেটি বোধকরি ভরসা অথবা কী জানে না সুমিত। সব ব্যাখ্যাতীত।

‘দশটা ট্যাকা দেবেন…চারদিন ভাত খাই না।’

ওই একটি কথার মধ্যে সখির নিরুদ্দিষ্ট জীবনের কাহিনি ছিল। সখিদের এমনই হয়। তখন কেমন করে দু-চোখে ভেসে ওঠে একটি সবুজ-শ্যামল গাছের ছায়াঢাকা পাখপাখালির গানে সুললিত গ্রাম। ফসলের মাঠ। পদ্ম বুকে ধরে রাখা কাজলকালো দিঘি। ধান পেটানো আঙিনা। সেখানে এই মেয়েটির একটি কাল ছিল। শৈশব-কৈশোরের দিনকাল। এই তো সেদিনের কথা। এখন সবকিছু অন্ধকারের গহ্বরে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। অথচ এর জন্য সে নিজে দায়ী নয়।

‘দশটা ট্যাকা দেবেন, ভাত খাব। কেউ আমারে দেয় না। দেবেন?’

‘তোমার এই অবস্থ কী করে হলো সখি? একটা বাচ্চা দেখেছিলাম?’

সুমিত আচমকা প্রশ্ন করে নিজেই বোকা হয়ে যায়। এ জিজ্ঞাসা কেন? কোনো ভিত্তি বা সমাপ্তি নেই। সে কিছুক্ষণ বিস্ময়বিমূঢ়। নির্বাক নিশ্চুপ।

‘মাইয়াটাক বিক্রি কইরা দিছি। নিজেই খাইতে পারি না। বুকের দুধ শুকায়া গেছে। কী খাওয়াব ওরে? আমারে দশটা ট্যাকা দেন…দশ ট্যাকা।’

শীতের রাত ডুকরে ওঠা কোনো দীর্ঘশ্বাসে প্রলম্বিত কেঁপে যায়। কাঁপতে থাকে। তখন দমকা বাতাসে গাছের পাতা ঝিরঝির ঝরে পড়ে। অজানা গন্তব্যে ভেসে চলে। দেয়ালের ওপাশে হাত-পা গজিয়ে ওঠা জেসমিনের সুবাস ভাসতে থাকে, কিন্তু এসব কেন জানি অর্থহীন আর অহেতুক মনে হয়। জন্ম যেভাবেই হোক, সখি তো একজন মা। সে তার মেয়েকে বিক্রি করে দিল। দিতে বাধ্য হলো। সুন্দর জীবনের এই বীভৎস রূপ সুমিতকে বিহ্বল করে দিতে থাকে। মনে হয়, ধারহীন কোনো ছুরি তাকে নিশ্চুপ আঘাত করে চলেছে আর সেই ঘর্ঘর নিনাদ হৃৎপিণ্ডের সপন্দনে ছড়িয়ে যায়। কেন জানি বারবার কানে বাজতে থাকে, এই জগৎ সংসার মানুষের সভ্যতা আর সৃষ্টির সকল অহং ভয়ানক রসিকতা বই কিছু নয়। অর্থহীন নিষ্ঠুরতা। কোনো সার্থকতা নেই এসবের।

‘কী হয়েছিল বলো তো?’

‘কিছু না…আমার জন্মটাই তো পাপ; পাপের বোঝা টানতাছি।…উফ্‌ মাইয়াটা যে কেমুন আছে?’

সখি ডুকরে কেঁদে ওঠে। তেমনই আবার নিশ্চুপ দ্রুত চোখ মুছে নেয়। তার বাড়িয়ে ধরা হাত বিশাল এক প্রশ্ন হয়ে জেগে থাকে। সুমিত কী দেবে শূন্য সেই হাতে? সখির কি চাওয়া ছিল? কোনো স্বপ্ন? কী হতে পারত সে? তার জীবন? মনে হয় এগিয়ে ধরা হাত দশটি টাকা নয়, কোনো উত্তর জানতে চায়। তারপর খুব স্বাভাবিক জীবন যেমন চলে, যেভাবে হতদরিদ্র মানুষের বাড়িয়ে ধরা হাতে কিছু দেয়া হয়, তেমন অথবা তেমনভাবে নয়; তার হাত প্যান্টের পেছন পকেটে ওয়ালেট খোঁজে। সে দশ না কি পঞ্চাশ বা একশ দেখা হয় না। লোডশেডিং শুরু হয়েছে। সখিকে দেখা যায় না। অন্ধকারে শুধু এক ছায়ামানবী জেগে ওঠে। প্রাগৈতিহাসিক কোনো অস্তিত্ব। চেনা যায়…চেনা যায় না…সব অচেনা হয়ে পড়ে। সুমিতের মাথার মধ্যে আবার অন্ধকার গহ্বর দীর্ঘ সুড়ঙ্গ তৈরি করতে থাকে। তখন সখি কি বুঝে তাকে সেই উদ্‌ভ্রান্ত গোলকধাঁধায় ফেলে রেখে ছুটে পালাতে চায়।

সুমিতের আকস্মিক শিশুটির কথা মনে বেজে ওঠে। সখি তার সন্তান বিক্রি করে দিয়েছে। সে জানে না এমন নয় যে, একদিন তার মেয়েও তার মতো হবে। শত শত মানুষের সামনে মেলে ধরবে নিজেকে। এই স্বর্গের মতো সুন্দর তীর্থভূমি পৃথিবীর বুকে শুধুমাত্র বেঁচে থাকবার জন্য। শক্তিশালী সক্ষম মানুষেরা তার বুকের উপর চড়ে নিজেদের উত্তাপ কমাবে। মানুষের হাতে হাতে টিস্যু পেপারের মতো ঘুরে চলবে। আমরা গর্ব করব এমন এক সমাজের, সেখানে নিয়ন আলোকিত রাস্তায় রাস্তায় চলমান আনন্দ শোরগোল, সক্ষম মানুষের ঘরে ঘরে আনন্দ-বিনোদন আর উন্নত খাবারের শত আয়োজন; এই আমাদের সভ্যতা। এখানে ঈশ্বর বাস করেন।

গল্প এখানে শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু এই কাহিনির কোনো শেষ নেই। সুমিত তাকে বাইরে বসতে বলে বাড়ির ভেতরে এসে দাঁড়ায়। এখন সে তাকে ভেতরে আসতে বলতে পারে না। সুনীতি আছে। সে অন্ধকার বারান্দার এককোণায় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল। ঘরের মধ্যে একটি মোমবাতি জ্বলছে। সেটির ম্লান আলো দরজা পেরিয়ে বাইরের অন্ধকারে হাঁসফাঁস করে। তাকে স্পষ্ট দেখা যায় না। অনেক কথা বলে দেয় দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি। অনেক গম্ভীর তার মুখ-চোখ।

‘আমি অবাক হই, একটা বাজে মেয়ে তোমার খোঁজে আসে…কে সে?’

‘ওই মেয়েটার কথা বলছ? কখন থেকে আছে?’

‘কে সে?’

ক্রাইম রিপোর্টারের কাজ করি সুনীতি। অনেক মানুষের সাথে জানাশোনা-পরিচয় থাকে। এখন এসব কথা থাক। অনেক কথা, সে গল্প পরে বলব, আগে কিছু খাবার দাও তো; সখি চারদিন ধরে কিছু খায়নি। ভাবতে পারো একজন মানুষ এতদিন না খেয়ে আছে?’

‘ও…এরই নাম তা হলে সখি! চারদিন ধরে কিছু খায়নি? চারদিন না খেয়ে থাকলে মানুষ হাঁটতে-চলতে পারে? মিথ্যে কথা বলছে।’

‘সত্যমিথ্যে পরে যাঁচাই করো সু। অনেক কষ্টে আছে মেয়েটা।’

‘কষ্ট তো দেখি তোমার? এই মেয়েটার কথাই শুনেছিলাম।’

‘কী কথা শুনেছ…কই কোনোদিন তো কিছু বলোনি?’

‘কী আর বলব? ছি ছি ছি!’

‘এসব কথা থাক সু। পরে বলব। তুমি কি একটু ভাত-তরকারি দেবে, নাকি আমি নিজেই নেব?’

‘আমার ভাত অত সস্তা না যে, একজন বেশ্যাকে খেতে দেব। সেই বিকেল থেকে ঘুরঘুর করছে। কী সম্পর্ক তোমার বলো তো?’

সুমিত হতবাক স্তম্ভিত। সুনীতি এমন কথা বলতে পারে কোনোদিন কল্পনা করেনি। তবে কি অন্যকিছু ভেবে বসেছে? সুমিত দ্বিধাগ্রস্ত। কোনো কথা বলে না। যদি অন্যকিছু মনে করে থাকে…সে ভুল পরে ভাঙানো যাবে। এখন কিছু খাবার রেডি করা যাক। সে সাংবাদিক। সমাজে ভালো-মন্দ খুঁজতে খুঁজতে অনেক নোংরাও ঘাটতে হয়। স্তূপিকৃত দুর্গন্ধের ভেতর কখনো কখনো আশ্চর্য সুন্দর ফুল বেরিয়ে আসে। যারা নিজের দোষে নয়, অন্য মানুষের স্বার্থ-লোভ-কুটকৌশল আর হিংস্রতায় বিবর্ণ। তাদের জীবন আর অস্তিত্ব হয়ে পড়ে নিজের কাছেই অসহনীয় বোঝা। দুর্বিষহ দায়। সেই অক্ষম জীবনের প্রতি সামান্যতম সহানুভূতি সমবেদনা ছাড়া আর কি দিতে পারে সে? যদিও এই মমতাটুকু কখনো কখনো উপহাস-করুণা কিংবা দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সে নিজেই থালায় করে ভাত আর মাছের দুটো টুকরো সাজিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সেই আলোছায়া কুয়াশার পটভুমিতে কেউ নেই। কেউ অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল না। চাঁদের মৃদু আলোর নিচে ছড়িয়ে থাকা একটি একশ টাকার নোট। উপহাস করতে থাকে। সখি নিশ্চয়ই তাদের কথা শুনেছে। সুমিত কী করবে? একটু এগিয়ে দেখে আসবে? সে-সময় কেউ একজন পাশে এসে তার হাত চেপে ধরে। রাতের আকাশে সরু দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে দেয়। সুনীতি অমনিই।

‘চলে গেছে মেয়েটা…আহা!’

‘হ্যাঁ ওর খুব অভিমান।’

সখি চলে গেছে। পৌষের তীব্র-শীত-রাতের কুয়াশা অন্ধকারের কোথায় কে জানে। কুহকী অন্ধকার। কোনো গর্ত-খাদ-গহ্বর কিংবা অচেনা ফাঁদের ভয় নেই। ভয় নেই কোনোকিছু হারাবার। যে হারিয়ে যায় তার কোনো ভয় থাকে না। হারিয়ে যাওয়া কত মানুষের কথা আমরা জানি? কে মনে রাখে? এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। সুমিত হয়তো তেমনকিছু ভাবে না। অথবা সবকিছু জট লেগে যায়। তার বিহ্বল-নিশ্চুপ-নির্বাক দৃষ্টি অন্ধকারের মধ্যে কোনো অন্ধকার খোঁজে। খুঁজতে থাকে। তারপর সকল অতীত ভুলে যাওয়া মেয়েটির অভিমান মুখছবি দু-চোখে এসে জ্বালা ধরায়। অকারণেই। তখন চাঁদের আলোয় ছাদের কার্নিশে জেগে থাকা ক্যাকটাসের কাঁটাগুলো উপহাস করে চলে। বীভৎস দেখায়।

সেখানে কোনো ফুল ফোটেনি।          

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত