| 18 জুন 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: সুবলবাবুর সমস্যা । তপন রায়চৌধুরী

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

সুবলবাবু শক্তসমর্থ মানুষ। বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। মোটামুটি চাকরি করেন একটা। কারুর সাতে-পাঁচে থাকেন না। সারাক্ষণ নিজের মনেই থাকেন। কোন বন্ধু নেই তাঁর।

তবে আজকাল ছোটখাট দু-একটা ব্যাপারে মাঝেমধ্যেই ভুল হয়ে যাচ্ছে তাঁর। যেমন পরিচিত কোন লোকের সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে চট করে তার নামটা মনে আসে না। হয়ত বা কখনও মনে এল বেশ খানিকটা চেষ্টার পর, কিন্তু অনেকসময় সেটা সম্ভব হয় না। অবশ্য সবসময় মনে করার যে চেষ্টা করেন, তা কিন্তু নয়। কোন ক্ষতি তো হচ্ছে না, চলে যাচ্ছে একরকম।

অফিসেও দু-একবার এরকম ব্যাপার ঘটেছে। তাই তাঁর সহকর্মীরা ঠাট্টা করে মাঝে মাঝে তাকে ‘ভুলোবাবু’ বলেও সম্বোধন করেন।

বাড়িতেও সেদিন একটা ছোট্ট ব্যাপার ঘটে গেল। বাঁহাতের বুড়ো আঙুলের নখের একপাশে সামান্য উঠে থাকা ছোট্ট একটুকরো নখ বড্ড জ্বালাচ্ছিল তাঁকে। সুবলবাবু চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন, আর, অখেয়ালে অন্য একটা আঙুল বার বার তাঁর ওই ছোট্ট নখটাতে চলে যাচ্ছিল, ফলে ব্যথা লাগছিল। তিনি ঠিক করলেন, নেলকাটার দিয়ে ওই ছোট নখটাকে পাশ দিয়ে কেটে দেবেন। ওঁর চেয়ারের পেছনেই একটা বুকশেলফ আছে। সেখানেই নেলকাটারটা আছে। সুবলবাবু সেটা আনার জন্য শেলফের কাছে গেলেন। তারপর হঠাৎই ভুলে গেলেন, কী কারণে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। দু-তিন মিনিট দাঁড়িয়েও তিনি মনে করতে পারলেন না নেলকাটারের কথা। চেয়ারে ফিরে এলেন তিনি এবং যথারীতি কাগজ পড়তে লাগলেন আবার। পড়ার ফাঁকে তাঁর বারেবারেই মনে হচ্ছিল, কী কারণে তিনি শেলফের কাছে গিয়েছিলেন! কিন্তু মনে এল না কিছুতেই।   আবার কাগজ পড়াতেই মন দিলেন তিনি। কিছুক্ষণ বাদে অভ্যেসবশত সেই নখটাতে আবার খোঁচা লাগল।  সঙ্গে সঙ্গে সুবলবাবুর নেলকাটারের কথা মনে পড়ে গেল। একটু হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে তিনি তখনই নেলকাটার নিয়ে এসে ছোট নখটা কেটে ফেললেন।


আরো পড়ুন: শারদ সংখ্যা গল্প: পালাবার পথে । অনিতা অগ্নিহোত্রী


তাঁর এই ভুলের ব্যাপারে সুবলবাবুর স্ত্রীও যথেষ্ট বিরক্ত এবং বীতশ্রদ্ধ। বীথি বিরক্ত হন সবথেকে বেশি যখন সুবলবাবুকে বাজার করতে পাঠান। হয়তো সুবলবাবুকে আনতে বললেন, আলু, পটল, ভেন্ডি, কুমড়ো আর একটু ছোট মাছ, সুবলবাবু এনে বসলেন আলু, কুমড়ো, ঝিঙে, লাউ আর কড়াইশুঁটি। পটল, ভেন্ডি, মাছ বাদ হয়ে গেল। ব্যস, তারপর চেঁচামেচি। বীথি চেঁচিয়ে বলেন, “মাছ কোথায়? আর, পটল ভেন্ডি?” সুবলবাবুও চুপ থাকেন না। বললেন, “আজ তো শনিবার, নিরামিষ না?” বীথি বলে ওঠেন, “আজ শনিবার কোথায়, আজ তো শুক্রবার!” সুবলবাবু কপালে চাপড় মেরে বলেন, “ওই দ্যাখো, একদম ভুলে গেছি।“ এসব প্রায়ই ঘটে।      

তো এরকম ভুলভ্রান্তি সুবলবাবুর হয়ে চলেছে আজকাল। কিন্তু আজকে যেটা হল, সেটার বুঝি সত্যিই ক্ষমা নেই এবং সুবলবাবু সত্যিই বড় চিন্তায় পড়ে গেলেন। বাসে উঠেই ভুলে গেলেন সুবলবাবু, কোথায় নামতে হবে তাঁকে। এটা মনে আছে যে জায়গাটা খুব বেশি দূরে নয়, কিন্তু মনে তো আসতে হবে জায়গাটার নাম। নাহলে বিপদ। নতুন জায়গা বলে কথা। তাছাড়া, কনডাকটার এক্ষুনি এসে টিকিট চাইবেন। কী বলবেন সুবলবাবু তখন? রীতিমত চঞ্চল হয়ে উঠলেন তিনি। একবার ভাবলেন, সামনের স্টপেজেই তাঁর বোধ হয় নেমে যাওয়া উচিত। সেখানে দাঁড়িয়ে জায়গার নাম মনে এলে তখন নাহয় পরের আরেকটা বাসে উঠবেন। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলেন, সেটা ভীষণ বোকা বোকা ব্যাপার হবে। এখনই তাঁকে মনে করতে হবে জায়গাটার নাম। তিনি বাস থেকে নামলেন না। এদিকে গাড়ি ছুটেছে বাইপাস ধরে বেশ জোরেই। হঠাৎ মনে হল সুবলবাবুর, সামনে দাঁড়ানো ভদ্রলোককে কি তিনি জিজ্ঞাসা করবেন,

“দাদা, পরপর কয়েকটা স্টপেজের নাম বলে যান তো।“

পরক্ষণেই ভাবলেন সুবলবাবু, তিনি কি বোকা হয়ে গেলেন ! কী যা তা ভাববে লোকটা তার সম্পর্কে। সুবলবাবু সংযত করলেন নিজেকে। এ তো মহা ঝঞ্ঝাটে পড়লেন তিনি। এখন উপায়? তখনই মনে এল, জায়গাটার ভাড়া সাত টাকা। তিনি নিশ্চিত। কনডাকটার কাছে চলে এসেছে। সুবলবাবু দেরি না করে চটপট সাত টাকার একটা টিকিট কেটে ফেললেন। কিন্তু জায়গার নাম? এখন তো বাস থেকে নেমে যাওয়ারও কোন উপায় নেই। টিকিট কাটা হয়ে গেছে যে! না, না, জায়গাটার নাম তাঁকে মনে করতেই হবে এবার। কী যেন, কী যেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, শেষের একটা কথা ‘নগর’। আহমেদনগর? না, না। অশোকনগর? না, না, সে তো বনগাঁ লাইনে পড়ে। তাহলে! আর তো দেরি করা যায় না। স্টপেজ ছাড়িয়ে বাস চলে গেল না তো? কী নাম, কী নাম, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। অজয়নগর। সেই মুহূর্তে কনডাক্টর ছিলেন সামনেই। সুবলবাবু বলে উঠলেন,

“অজয়নগর একটু বলে দেবেন ভাই।“

কনডাক্টর বলে উঠলেন,

“এই তো অজয়নগর আসছে। সামনের স্টপেজ।“

বাস থামল। সুবলবাবু নামলেন বাস থেকে। তারপর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলেন।

আগামীকাল সুবলবাবুকে ‘বলদেবপুর’ বলে নতুন একটা জায়গায় যেতে হবে। একটা বিশেষ কাজে। সুবলবাবু প্রথমবার, জীবনে এই প্রথমবার ভাবলেন, বাসে উঠে কন্ডাকটরকে জায়গাটার নাম মনে করে বলতে পারবেন তো! বিচক্ষণ সুবলবাবুর চট করে বুদ্ধি এল মাথায়, একটা ছোট চিরকুটে জায়গাটার নাম লিখে পকেটে রেখে দিলেই তো হয়। কিন্তু তার পরেই ভাবলেন, সেই চিরকুটের ব্যাপারটাও মনে আসবে তো?

  

    

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত