| 14 জুলাই 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-৭) । রোহিণী ধর্মপাল

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট
অর্জুন জানতেন অস্ত্রের ঘরে যুধিষ্ঠির আছেন দ্রৌপদীর সঙ্গে। যদিও শুধুমাত্র শরণ্য মানুষটির জন্যই তাঁর সব ভুলে অস্ত্রাগারে প্রবেশ করার কথা এবং তিনি তাই করতেনও, তবে দ্রৌপদী সেই ঘরে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে আছেন, সে কথা জেনে বোধহয় আরও তাড়াহুড়ো করলেন। সংবাদ পাঠাতেই পারতেন তিনি আসছেন। তাহলে যুধিষ্ঠির সাবধান হয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি সাবধান করতে চাননি। নিয়ম ভঙ্গ করে বারো বছরের জন্য বনবাসে যাওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য। বারোটা বছর তাঁকে না দেখে দ্রৌপদীকে থাকতে হবে। এই দীর্ঘ অদর্শন তাঁর প্রতি দ্রৌপদীর আকর্ষণকে বাড়িয়ে তুলবে। দ্রৌপদী অনুতপ্তও হবেন। হলোও তাই। অর্জুন যেতে যেতে অনুভব করলেন দ্রৌপদীর অভিমান। কষ্ট। নিজেও মনে মনে কিছুটা নরম হয়ে যাচ্ছিলেন বইকী! কিন্তু ক্ষত্রিয় তিনি! প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। তার ওপর তাঁর বনযাত্রার কথা জেনে সঙ্গে চলেছেন আরও কিছু মানুষ। তাঁর সঙ্গে নিরাপদে তাঁরাও ভ্রমণ করবেন, এই ভেবে। তাঁরাও তো একপ্রকার তাঁরই শরণাপন্ন হয়েই বার হয়েছেন। তাঁদেরকেও নিরাশ করা সম্ভব নয়। তাই আরও দ্রুত পা চালালেন তিনি। দৈহিক পরিশ্রম মানসিক কষ্ট ভুলতে সাহায্য করে। তাছাড়া দ্রৌপদীকে এই কষ্টটা তো তিনি ভেবেচিন্তেই দিতে চেয়েছিলেন। তবু যেদিন নাগকন্যা উলূপী এসে তাঁর সঙ্গ প্রার্থনা করল, খোলাখুলি, তিনি প্রথমে না বলেছিলেন। বলেছিলেন তাঁর প্রতিজ্ঞার কথা। কিন্তু বাঁধভাঙা হাসির সঙ্গে উলূপীর যুক্তির তোড়ে ভেসে গেল তাঁর যুক্তি। উলূপী স্পষ্ট বললেন, “তোমার প্রতিজ্ঞা, তোমার এই ব্রহ্মচর্যের পালন তো দ্রৌপদীর জন্য প্রযোজ্য। অন্য কোনও মেয়ের ক্ষেত্রে তো নয়। বিশেষ করে আমি নিজে যেচে এসেছি তোমার কাছে। তোমার দেহসৌষ্ঠব মুগ্ধ করেছে আমাকে। দৃষ্ট্বৈব পুরুষব্যাঘ্র! কন্দর্পেণাস্মি পীড়িতা! তোমার সঙ্গে শরীরী মিলনের কল্পনাতেই আমি উত্তেজিত হয়ে পড়েছি। সেখানে আমাকে প্রত্যাখ্যান করাই তোমার পক্ষে অনুচিত হবে”। এই বলে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন অর্জুনকে। অর্জুন তো এই ধরণের কথাই শুনতে চেয়েছিলেন দ্রৌপদীর কাছে। নিজের বীরত্বের স্তুতি। নিজের সৌন্দর্যের স্তুতি। এবং চেয়েছিলেন দ্রৌপদী তাঁর একার হবে। তা যখন হল না, তিনিই বা কেন আটকে রাখবেন নিজেকে? এমন রূপসী, ক্ষমতাশালী মেয়ের কাছ থেকে! সুতরাং শুরুতে দোনামনা করেও অর্জুন উলূপীর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। মেতে উঠলেন শরীরী খেলায়। সারা রাত ধরে তিনি উলূপীর নারী শরীরকে উপভোগ করলেন সব রকমে। উলূপীও তাই। অর্জুনের রসালো ঠোঁটে, প্রশস্ত বক্ষে, নাভির চারপাশে উলূপীর দাঁতের চিহ্ন পড়ে গেল। দুই কামোন্মত্ত নারী পুরুষের শীৎকারে ভরে গেল ঘর। রাত্রি শেষে, ভোরের আলো ফুটে উঠল, শ্রান্ত অথচ পরিপূর্ণ তৃপ্ত দুজনে ঘুমিয়ে পড়লেন অঘোরে। সেই দিনই অর্জুন আবার বেরিয়ে পড়লেন সামনের দিকে। হিমালয়ের দিকে। কেবল মনের মধ্যে দ্রৌপদীর প্রতি একটা অর্থহীন রাগ রয়েই গেল।
হিমালয়ের নানা স্থানে ঘুরে অঙ্গ বঙ্গের বিভিন্ন তীর্থস্থান দেখে কলিঙ্গে এলেন। কলিঙ্গ, অর্থাৎ উড়িষ্যা। উড়িষ্যার সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে চলা। রাতের বেলা সমুদ্রের সফেন নীল জল যখন কৃষ্ণকালো হয়ে যেত, অর্জুন তাঁর অস্থায়ী ডেরার সামনে বসে থাকতেন। সমুদ্রের সেই কালো রঙে মিশে যেতে দেখতেন নিজেকে আর দ্রৌপদীকে। আকাশের কালো আর সাগরের কালো মিশে একাকার হয়ে যেত। যেমন ভাবে মিশে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর আর দ্রৌপদীর। মনের ভেতরটা যেন হু হু করে উঠত। তারপরেই আবার মনে পড়ত সেই রাতটা, যেদিন দ্রৌপদী তাঁর বীরত্বের দিকে আঙুল তুলেছিলেন। মন খারাপ কেটে গিয়ে অক্ষম ক্রোধ  জেগে উঠত। ফলে মণিপুরে পৌঁছে রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদাকে দেখে অর্জুন আর দ্বিতীয়বার ভাবেননি। একে তো উলূপীর যুক্তি তাঁর ব্রহ্মচর্য পালনের ভাবনাকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছিল। আর শরীরের খিদেটাকেও জাগিয়ে দিয়েছিলেন। এক রাতে কী তৃপ্তি হয়! সমস্ত শরীর আরও ক্ষুধার্ত হয়ে উঠেছিল ওই এক রাতের মিলনে। তাই মণিপুরের রাজার অদ্ভুত শর্তেও তিনি রাজি হয়ে গেলেন। শর্ত ছিল এই যে চিত্রাঙ্গদা আর অর্জুনের মিলনে যে সন্তান আসবে, সে মণিপুরের হবে। পিতৃপরিচয় নয়, সে বড় হয়ে উঠবে মাতৃপরিচয়ে। অর্জুন বেশ কয়েক বছর থাকলেন চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে। জন্ম হল বভ্রুবাহনের। আর অর্জুন আবার এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে। ইতিমধ্যেই বারো বছরের মধ্যে অনেকগুলি বছর কেটে গেছে। শেষ কয়েকটা বছর সখা কৃষ্ণের কাটিয়ে এলে কেমন হয়! সেই বরং ভালো। কৃষ্ণার বদলে কৃষ্ণ। 
অর্জুন কেন, বাকি চার পাণ্ডব কখনও কল্পনাও করতে পারেন নি, দ্রৌপদীর প্রতি কৃষ্ণের ভালোবাসার কথা। দ্রৌপদী অনুমান করতে পেরেছিলেন। মেয়েদের একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় থাকে তো। কিন্তু অনুমান করতে পারেন নি যে এই কৃষ্ণও অর্জুনকে তাঁর থেকে দূরে রাখার জন্য সবচেয়ে নিষ্ঠুর ছকটি কষবেন। নিজের বোনকে তুলে দেবেন অর্জুনের হাতে।

আরো পড়ুন: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-৬) । রোহিণী ধর্মপাল


অর্জুন দ্বারকায় এসে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণ বন্ধুর জন্য সুস্বাদু সুরসালো কত কী খাবারের আয়োজন করলেন। এমনিতেই যাদবেরা ফুর্তি করতে ভালোবাসেন। অর্জুনের আসাটা যেন উপলক্ষ মাত্র। দ্বারকায় ক’দিন থাকার পরে কৃষ্ণ বন্ধুকে নিয়ে গেলেন রৈবতক পর্বতে। সেখানে বৃষ্ণি ভোজ ও অন্ধক বংশের সবাই উৎসবে মেতে উঠলেন। বলরাম তো চিরকালের মদ্যপ। তাঁর আশেপাশে মদের ফোয়ারা ছুটছিল। সেজেগুজে মেয়েরা ছেলেরা সবাই বেরিয়ে পড়েছে দলবেঁধে। হইহুল্লোড় চলেছে রাত দিন। অর্জুন আর কৃষ্ণও ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রঙ্গ রসিকতা করছেন। এমন সময় হলুদ কাপড়টি পরা, গলায় ফুলের মালা, হাতে ফুলের কাঁকন, কালো চুলের ঢল নামা একটি মেয়েকে দেখে অর্জুনের বুকের ভেতরটা কেমন গুড়গুড় করে উঠল। কে এই আশ্চর্য সুন্দর মেয়ে? যাকে দেখলে রক্ত চলকে ওঠে! হদয় স্পন্দন যেন থেমে যায়! কী অপরূপ লাবণ্য!   আহা! 
ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণি
অবনী বহিয়া যায়।
ঈষত হাসির  তরঙ্গহিলোলে
মদন মূরছা পায়।।
সে শ্যাম নাগরে   কি খেনে দেখিলুঁ ধৈরজ রহল দূরে।
নিরবধি মোর  চিত বেয়াকুল
কেন না সদাই ঝুরে।।
হাসিয়া হাসিয়া  অঙ্গ  দোলাইয়া
নাচিয়া নাচিয়া যায়।
নয়ানকটাখে  বিষমবিশিখে
পরাণ বিন্ধিতে ধায়।।
মালতী ফুলের  মালাটি গলে
হিয়ার মাঝারে দোলে
উড়িয়া পড়িয়া  মাতল ভ্রমরা
ঘুরিয়া ঘুরিয়া বুলে।।
কপালে চন্দন- ফোঁটার ছটা
লাগিল হিয়ার মাঝে।
না জানি  কি ব্যাধি  মরমে বাধল
না কহি লোকের লাজে।।
কৃষ্ণ ভালো করেই জানতেন সুভদ্রা রৈবতক পর্বতের এই উৎসবমুখর দিনগুলিতে ঘুরে বেড়াবেন। আর রূপলাবণ্যময়ী সুভদ্রার দিকে অর্জুনের চোখ পড়বেই। অর্জুন বিহ্বল হয়ে সুভদ্রার দিকে তাকিয়ে আছেন দেখেই কৃষ্ণ বলে উঠলেন, “আরে, বনচারী ব্রহ্মচারীর মনে কাম জেগেছে নাকি”? কৃষ্ণ ধরেই নিয়েছিলেন বছর নয়দশ নারীসঙ্গহীন সময় কাটিয়ে অর্জুন একেবারে লোলুপ হয়ে পড়বেন। ইতিমধ্যেই যে দুটি নারীমিলন হয়ে গেছে, অতটা খবর কৃষ্ণ নিজেও জানতেন না। হ্যাঁ, সুভদ্রাকে দেখে শিহরণ অর্জুনের জেগে উঠল ঠিকই। তবে তা শুধু কাম নয়। সুভদ্রাকে দেখে আর কৃষ্ণের বোন জেনে অর্জুনের  সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছিল, এই সেই যোগ্য কন্যা, যিনি অর্জুনের, একা অর্জুনের স্ত্রী হবেন। দ্রৌপদীর তুলনায় সুভদ্রা কম রূপসী নন। কৃষ্ণের বোন যখন, শাস্ত্র ইত্যাদিতেও নিশ্চয়ই দক্ষ। উলূপী ছিল এক রাতের রাণী। চিত্রাঙ্গদা নিজের রাজ্যের জন্য দত্তা। আর দ্রৌপদী বাকি ভাইদেরও। এই মেয়েটি তাঁর সঙ্গে যাবেন। তাঁর একার হবেন। এঁকে পেলে তবেই তিনি দ্রৌপদীর ভাগ হয়ে যাওয়ার কষ্ট ভুলবেন। অর্জুন একবারও ভাবলেন না, তিনি নিজে যুধিষ্ঠিরের কাছে দ্রৌপদীকে বিয়ে করে নেওয়ার কথা শুনেও চুপ করে ছিলেন। মায়ের কথাতেও। নিজে কখনও এমন কোনও আচরণ করেননি, যাতে মা, ভাইয়েরা বা স্বয়ং দ্রৌপদী বোঝেন যে তিনিও দ্রৌপদীকেই চেয়েছিলেন। নিজের ভুল দেখতে না পাওয়া অর্জুন নিজের মনের শূন্যতাকে ভরাতে কৃষ্ণের কাছে সুভদ্রার পাণিপ্রার্থনা করলেন। আর কৃষ্ণ তো আগে থেকেই রাজি হয়ে ছিলেন। অর্জুন একবারও খেয়াল করলেন না যে নিজের বোনের প্রতি অর্জুনের মনোভাবকে কী অনায়াসে কৃষ্ণ “কাম” বললেন। আসলে কৃষ্ণ যে পাঁচ ভাইয়ের কাউকেই দ্রৌপদীর উপযুক্ত মনে করেন নি। এমনকী, সখা অর্জুনের প্রতিও তাঁর মনোভাব কেমন ছিল, তা এই কাম শব্দেই প্রকাশিত হল। অথচ অর্জুনের তখন হাবুডুবু অবস্থা। তিনি সূভদ্রাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল। তাঁর এই ব্যাকুলতাকে আরও বাড়িয়ে কৃষ্ণ বললেন, “সুভদ্রাকে জিজ্ঞেস টিজ্ঞেস করার ঝুঁকি নেওয়ার দরকার কী! এমনকী, কাউকেই জিজ্ঞেস করার কী প্রয়োজন! সুভদ্রার অভিভাবকরা যদি কোনও কারণে রাজি না হন! স্বয়ংবর সভার আয়োজন করলে যদি সুভদ্রার অন্য কাউকে পছন্দ হয়ে যায়! বরং সুভদ্রাকে অপহরণ করো। এও তো একপ্রকার বীর্যশুক্লাই হবে। দ্রৌপদীর মতোই। আমি তোমাকে ঠিক সময় বলে দেব। রথ ঘোড়া দিয়ে দেব। পরে বাকিদের সামলানোর দায়িত্বও আমার। তুমি শুধু যুধিষ্ঠিরকে খবর পাঠিয়ে দাও”। এইবারও অর্জুনের কান এড়িয়ে গেল কৃষ্ণের কুযুক্তি। সুভদ্রাকে অপহরণ করার পর যদি কৃষ্ণ বাকিদের বুঝিয়ে ঠাণ্ডা করতে পারেন, তবে আগেই তা করতে পারবেন না কেন? তাঁর মাথায় শুধু দুটি বিষয় ঘুরতে লাগল। স্বয়ংবর সভাতে যদি সুভদ্রা অন্য কাউকে পছন্দ করেন! আর প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কোনও ক্ষেত্রই তিনি তৈরি করতে চান না। আর দ্রৌপদীর মতো বীর্যশুক্লা! ঠিক! এইভাবে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করার অনুমতি তো ক্ষত্রিয়দের আছেই। আর তাঁকে দেখার পর, জানার পর সুভদ্রার নিশ্চয়ই কোনও রকম আপত্তি হবে না। তা হলে কৃষ্ণ নিজে এমন প্রস্তাব দিতেন না! হায় রে অর্জুন! পুরুষের মন যে কত জটিল হতে পারে, যাকে পাওয়ার কথাই ছিল না, তাকে না পাওয়ার যন্ত্রণায় পুরুষ সেই নারীকেই যন্ত্রণা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে, তা যদি তুমি জানতে!
error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত