Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,সোমেন চন্দ

সোমেন চন্দের জীবন, সাহিত্য ও প্রগতি সাহিত্য আন্দোলন

Reading Time: 7 minutes
সোমেন চন্দ মাত্র ২১ বছর ১৫ দিন বেঁচে ছিলেন, তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯২০ সালের ২৪ মে, অবিভক্ত ভারতে, অধুনা বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার টঙ্গীর আশুলিয়া গ্রামে, মামার বাড়িতে। আর মারা যান ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নির্মম ছুরিকাঘাতে।
১৯৩৬ সালে তিনি ঢাকার পগোজ স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষার উত্তীর্ণ হন। বই খোঁজার আগ্রহ থেকেই শিশুকাল থেকে সোমেন চন্দ পাঠাগারমুখী হন। ঢাকার জোড়পুল লেনের প্রগতি পাঠাগার ছিল সাম্যবাদে বিশ্বাসী মানুষদের পরিচালিত। পাঠাগারে পড়তে পড়তে সোমেন বাংলা সাহিত্যে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং কার্ল মার্কসের তত্ত্বে অনুরক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৩৭ সালে তিনি প্রগতি পাঠাগারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ওই সময়েই মিডফোর্ড হাসপাতালে ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তিও হন। কিন্তু ১৯৩৯ সালে ডাবল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আগেই ডাক্তারি পড়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
স্কুল জীবন থেকেই গল্প লিখতেন সোমেন। তখন তাঁর প্রকাশিত লেখা বা নতুন লেখার কথা পরিবারের কেউ জানতেন না। ১৯৩৭ সালে ১৭ বছর বয়সে প্রকাশ পায় সোমেনের প্রথম গল্প ‘শিশু তপন’ সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায়। এর পর আরও উল্লেখযোগ্য কিছু লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ওই বছরেই প্রকাশিত হয়। এই ১৭ বছর বয়সেই বাংলাদেশে বন্যার যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ভোগ, তা নিয়ে উপন্যাস ‘বন্যা’ লেখেন সোমেন। তাঁর প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ‘নবশক্তি’ পত্রিকায়, যদিও এই উপন্যাসের বড় অংশ হারিয়ে যায়, পাওয়া যায়নি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে উল্লিখিত দুটি বিখ্যাত পত্রিকায় সোমেন চন্দের লেখা ছাপা হওয়া শুধু গৌরবের বিষয় ছিল না, লেখক হিসেবে সাহিত্য-পরিমণ্ডলে প্রবেশের যোগ্যতাকে করেছিল উজ্জ্বল। মৃত্যুর পর সোমেন চন্দের ‘সংকেত’ নামক ছোটগল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন–প্রখ্যাত লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্ত্রী বিশিষ্ট লেখক নীলা রায়। আর ‘ইঁদুর’ নামের গল্পটি অনুবাদ করেন–বিশিষ্ট লেখক, অর্থনীতিবিদ ও এক সময়ের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র। এই দুটি গল্পের অনুবাদের মধ্যে দিয়ে সোমেন চন্দের পরিচিতি শুধু ছড়িয়ে পড়েনি, তার লেখার প্রতি পাঠক, সাহিত্য-সমালোচক ও অন্যান্যদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়।
তাঁর অনবদ্য সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে শিশু তপন, ইঁদুর, সংকেত, বনস্পতি, দাঙ্গা, সত্যবতীর বিদায়, ভালো না লাগার শেষ, উৎসব, মুখোশ ইত্যাদি গল্প। এ পর্যন্ত তাঁর ১টি উপন্যাস, ২৮টি গল্প, ৩টি কবিতা, ২টি নাটক সহ তাঁর লেখা চিঠির সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে। এ যাবত প্রকাশিত সোমেন চন্দের গল্প সংকলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রণেশ দাশগুপ্ত সম্পাদিত, যা ‘সোমেন চন্দের গল্পগুচ্ছ’ নামে ঢাকার কালিকলম প্রকাশনী থেকে ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয়, ১৯৯২ সালে বিশ্বজিৎ ঘোষ সম্পাদিত ‘সোমেন চন্দ রচনাবলী’ ঢাকার বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাদেমি থেকে পবিত্র সরকার সম্পাদিত ‘সোমেন চন্দ গল্পসংগ্রহ’ বের হয় ১৯৯৭ সালে এবং ড. দিলীপ মজুমদার সম্পাদিত ‘সোমেন চন্দ ও তার রচনা সংগ্রহ’ কলকতার নবজাতক প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়। ২০১৮ সালে ঢাকার পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. থেকে বদিউর রহমানের সম্পাদনায় ‘সোমেন চন্দ গল্প সংগ্রহ’ প্রকাশিত হয়, এতে ২৮ গল্প সংকলিত হয়। উল্লিখিত সংকলনের কোনোটায় ১৭টি, কোনোটায় ২৫টি , কোনোটায় ২৬টি গল্প সংকলিত হয়। সোমের চন্দের লেখার পাঠক এখনো রয়েছে, তা উৎসাহব্যঞ্জক। তার সাহিত্য নিয়ে আলোচনা এখনো নিয়মিত হয়। সাহিত্যের পাশাপাশি তাঁর জীবনকর্ম নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা খবর আমাদের চোখে পড়ে।
‘ইঁদুর’ গল্পটির পরিসর বড়–রূপক, প্রতিকী ব্যঞ্জনা ও বর্ণনাভঙ্গিতে হয়ে উঠেছে বিভিন্নমাত্রা নিয়ে উজ্জ্বল। কী এক গ্রামীণ পরিবেশ, উপমা ও প্রতিকী বর্ণনায়, এ-গল্পে : ‘‘ওদিকে মধ্যরত্রির চাঁদ উঠেছে আকাশে, পৃথিবীর গায়ে কে এক সাদা মসলিনের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে, সঙ্গে এনেছে ঠান্ডা জলের স্রােতের মতো বাতাস, আমার ঘরের সামনে ভিখিরি কুকুরদের সাময়িক নিদ্রাময়তায় এক শীতল নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কিন্তু মাঝে মাঝে ও বাড়ির ছাদে নিদ্রাহীন বানরদেও অস্পষ্ট গোঙানি শোনা যায়।’’
সোমেন চন্দের এই গল্পে সংসার নামের চিত্রে পতিসেবা, রান্নাবান্না ও ঘরগেরস্থলির কাজে মা হয়ে নারীর কী অবস্থা, তার করুণ চিত্র আমরা খুঁজে পাই, তার একটি চিত্র–‘শুনতে পেলুম, এর পরে বাবার গলার স্বর রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙে বোমার মত ফেটে পড়ল।–‘তুমি যাবে? এখান থেকে যাবে কি না বলো? গেলি তুই আমার চোখের সামনে থেকে? শয়তান মাগি’…।’’
গল্পে এঞ্জিনের প্রতিকী বর্ণনা আমরা পাই–‘‘একটু এগিয়ে দেখি লাইনের ওপর অনেকগুলো এঞ্জিন দাঁড়িয়ে আছে, মনে হয় গভীর ধ্যানে বসেছে যেন! আমার কাছে ওদের মানুষের মতো প্রাণময় মনে হল। এখন বিশ্রাম করতে বসেছে। ওদের গায়ের মধ্যে কত রকমের হাড়, কত কলকবজা, মাথার ওপর ওই একটি মাত্র চোখ, কিন্তু কত উজ্জ্বল। মানুষ ওদের সৃষ্টিকর্তা। হাসি নেই, কান্না নেই, কেবল কর্মীর মত রাগ।’’
‘ইঁদুর’ গল্পের শেষটুকু এমন–‘‘কয়েকদিন পরে কোনো গভীর প্রত্যুষে একটি ইঁদুর-মারা কল হাতে করে আমার বাবা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বোকার মতো হাসতে লাগলেন। দারুণ খুশিতে নারু আর মন্টুও দুই আঙুল ধরে বানরের মতো লাফাচ্ছিল। কয়েক মিনিট পরে আরও কয়েক ছেলেপেলে এসে জুটল। একটা কুকুর দাঁড়াল এসে পাশে। উপস্থিত ছেলেদের মধ্যে যারা সাহসী তারা কেউ লাঠি, কেউ বড়ো বড়ো ইট নিয়ে বসল রাস্তার ধারে।ব্যাপার আর কিছুই নয়, কয়েকটা ইঁদুর ধরা পড়েছে।’’
সোমেন চন্দের আর একটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘‘দাঙ্গা’’। এই গল্পে লেখক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার চিত্র তুলে ধরে সেই সময়ের নগরের পরিবেশ, পুলিশের আচরণ, সাধারণ মানুষের মানুষের মনোভঙ্গি ও বিভিন্ন পরিস্থিতি খুবই বিশ্বস্তার সাথে তুলে ধরেছেন।
আমাদের ভুললে চলবে না–অবিভক্ত ভারতবর্ষ থেকে বিভক্ত ভারতবর্ষের পাকিস্তান আমল থেকে এখনো এই উপমহাদেশে ধর্মীয় বিভাজনের নামে ও পরিণামে কত হিংসাশ্রিত ঘটনা ঘটেছে, হত্যা হয়েছে, রক্তপাত ঘটেছে, মানুষ হয়েছে বাস্তুচ্যুত। নারীর প্রতিও হয়েছে জলুম। এমন কালজ্ঞ-পর্ব সভ্য মানুষের বিবেক কখনো অনুমোদন করতে পারে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজের প্রজ্ঞা দিয়ে মানুষ বিভিন্ন আদর্শ গড়ে তুললেও মানুষ আদর্শ মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি। এখনো সেই ভেদবুদ্ধির লোকেরা সময় সময় বিভেদরেখা টেনে নিয়ে রাজনীতির নামে ক্ষমতার লোভে মানুষের মানবিকতাকে হিমাঙ্কের নিচে নামিয়ে আনতে চায়। এর বিপরীতে মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধনকে দৃঢ় করতে হবে। সোমেন চন্দের ‘‘দাঙ্গা’’ নামের এই গল্পটি তার উল্লেখযোগ্য গল্প শুধু নয়, বাংলা সাহিত্যেও তা উল্রেখযোগ্য। কালজ্ঞশক্তির লোকদের বিভেদমূলক ভূমিকার কাছে যেন মানুষের শুভবোধ না হয়ে পড়ে অসাড়, সেই বোধের দিগন্ত আমরা খুঁজে পাই–এই গল্পে।
‘‘দাঙ্গা’’ গল্পে সোমেনের ঢাকা নগরের পরিবেশ, ঘটনা ও করুণ চিত্রের বুনন –‘‘লোকটি খুব তাড়াতাড়ি পল্টনের মাঠ পার হচ্ছিল। বোধহয় ভেবেছিল, লেভেল ক্রসিং-এর কাছ দিয়ে রেলওয়ে ইয়ার্ডে পড়ে নিরাপদে নাজিরবাজার চলে যাবে। তার হতের কাছে বা কিছু দূরে একটা লোকও দেখা যায় না–সব শূন্য, মরুভূমির মত শূন্য। দূরে পিচঢালা পথের ওপর দিয়ে মাঝে মাঝে দুই-একটি সুদৃশ্য মোটরকার হুশ্ করে চলে যায় বটে, কিন্তু এত তীব্র বেগে যায় যে মনে হয় যেন এই মাত্র কেউ তাকেও ছুরি মেরেছে, আর সেই ছোরার ক্ষত হাত দিয়ে চেপে ধরে পাগলের মতো ছুটে চলেছে।’’
পরের ভয়াবহ বর্ণনার মুখোমুখি হই পাঠক হিসেবে এই গল্পে, কী এক করুণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে পড়ে মানুষ অসূয়ার কাছে! লিখলেন সোমেন চন্দ, যেন এক অমানবিক সময়ের সিলমোহর–‘‘এমন সময় কথাবার্তা নেই দুটি ছেলে এসে হাজির, তাদের মধ্যে একজন কোমর থেকে একটা ছোরা বের করে লোকটার পিছনে একবার বসিয়ে দিল। লোকটা আর্তনাদ করে উঠল, ছেলেটি এতটুকু বিচলিত হল না, লোকটার গায়ে যেখানে-সেখানে আরও তিনবার ছোরা মেরে তারপর ছুটে পালাল, কুকুর যেমন লেজ তুলে পালায়। লোকটা আর্তনাদ করতে করতে গেটের কাছে গিয়ে পড়ল, তার সমস্ত শরীর রক্তে ভিজে গেছে, টাটকা লাল রক্ত, একটু আগে দেখেও মনে হয়নি এত রক্ত ওই কঙ্কালসার দেহে আছে।’’
আমরা জানি, লেখকরা তাদের অভিজ্ঞতা ও সময়কে তাদের লেখায় টেনে আনেন, মানুষের জীবনকে সময়ের নিরিখে জীবন্ত করে তোলেন, পাঠকরা লেখকের লেখায প্রবেশ করে সেই সময়ের বিভিন্ন ঘটনা উপলব্ধি করে বিভিন্ন বোধে অনুরণিত হন। সোমেন চন্দের আর একটি গল্প ‘‘সংকেত’’, এই গল্পে আমরা লক্ষ করেছি, কীভাবে নদীর ধারে নতুন কলকারখানা গড়ে উঠেছে, কৃষিব্যবস্থার বিপরীতে শিল্পের বিকাশ হচ্ছে, সেই শিল্পে যোগ দিচ্ছে, গ্রামীণ অভাবী মানুষেরা। তাদের নিয়ে যাচ্ছে গ্রাম থেকে কলকারখারখানার দালাল গোছের কিছু লোকেরা বিভিন্ন প্রলোভন ও স্বপ্নের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে গিয়ে তারা পড়ে যায় শোষণের যাঁতাকলে, ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় স্বপ্ন! শ্রমের নামে এতটা শোষণ করা হয়, কোনো ন্যায্য দাবীও তারা মানে না। এমন পরিস্থিতির প্রতিভাস এই গল্পের পরতে পরতে লেখক তুলে ধরেছেন। এই গল্পের একজনের আর্তিমাখা বক্তব্য : ‘‘আমরা স্ট্রাইক করেছি, মিলের কাজ বন্ধ। … আমাদের ঘর নেই, বাড়ি নেই, আজ এখান থেকে তাড়িয়ে দিলে কাল কোথাও দাঁড়াবার জায়গাটা পর্যন্ত নেই–’’ যে গ্রামীণ দুঃখী মানুষেরা নিজের এলকা ছেড়ে মজুর বনে যায়! তাদের কী করুণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা এই গল্পে লেখক তুলে ধরেছেন।
সোমেন চন্দ বাংলা সাহিত্যে গণসাহিত্যের ধারায় কাজ করেন। তিনি প্রগতি লেখক সংঘে যোগদান করেন এবং মার্কসবাদী রাজনীতি ও সাহিত্য আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৪১ সালে সোমেন চন্দ প্রগতি লেখক সংঘের সহসম্পাদক নির্বাচিত হন। তার মৃত্যু সম্বন্ধে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও লেখক সরদার ফজলুল করিমের স্মৃতিচারণ : (উৎস : কিছু স্মৃতি কিছু কথা, পৃঃ৯৩) : “ফ্যাসীবাদ বিরোধী আন্দোলন বাংলার সব জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়ে, যার মধ্যে ঢাকা শহর ছিলো অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র। ১৯৪২ সালের ৮ই মার্চ ঢাকার বুদ্ধিজীবী, লেখক প্রভৃতি শহরে এক ফ্যাসীবাদ বিরোধী সম্মেলন আহবান করেন। স্থানীয় জেলা পার্টির অনুরোধে কমরেড বঙ্কিম মুখার্জি ও জ্যোতি বসু সেখানে বক্তা হিসেবে যান। সম্মেলন উপলক্ষে শহরে খুবই উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং রাজনৈতিক মহল প্রায় তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম যারা সম্মেলনের পক্ষে, দ্বিতীয় যারা সরাসরি বিপক্ষে, তৃতীয় যারা মোটামোটিভাবে তুষ্ণীভাব অবলম্বন করে নিরপেক্ষতার আবরণ নিয়ে ছিলেন। … যাই হোক, সম্মেলনের দিন সকালে উদ্যোক্তাদের অন্যতম তরুণ সাহিত্যিক সোমেন চন্দ আততায়ীর হাতে নিহত হন। তিনিই বাংলার ফ্যাসীবাদী বিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ।’’
পুরনো ঢাকার যে এলাকায় তিনি নিহত হন, সেটা একটি আবাসিক এলাকা, তা এখন আরও ঘনবসতিপুর্ণ, যে গলিতে তিনি নিহত হন, তাতে একটি স্মৃতিফলক আছে, প্রতিবছর ৮ই মার্চে সেখানে গিয়ে ব্যক্তি, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা পুষ্পমাল্য অর্পণ ও অন্যান্য কর্মসূচি পালন করে থাকেন। এছাড়া তাঁর জন্মদিনে বাংলাদেশের নরসিংদিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়ে থাকে। ক’বছর হলো বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ সোমেন চন্দকে নিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন পর্যায় আলোচনা ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।
ভারতবর্ষে প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৩৬ সালে লক্ষ্নৌয়ে। সে-বছর ১০ই এপ্রিল জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন স্থলের পাশে সর্বভারতীয় এক সাহিত্যিক-সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ। এই সংঘ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রগতিশীল সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনের যে সূচনা হয়েছিল, তার প্রভাব ছিল পরাধীন দেশে এবং পরবর্তীতে এর প্রভাব বিভিন্ন পর্যায়ে অনুঘটকের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশেও দেদীপ্যমান হয়ে থাকে।
১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘ-এর ভিত্তিমূল তৈরি হয়েছিল ১৯৩২-৩৪ সালে লন্ডনে। সেখানে মুল্ক্রাজ আনন্দ, সাজ্জাদ জহীর, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ভবানী ভট্টাচার্য, ইকবাল সিং, রাজা রাও, মহম্মদ আশ্রফ প্রমুখ লন্ডন-প্রবাসী ভারতীয়-ছাত্ররা উদ্যোগী হয়েছিলেন। এঁরা অনুপ্রাণিত হোন রোমাঁ রোল্যাঁ, বারব্যুস, গোর্কি, ফর্স্টার, স্ট্রাচি প্রমুখ মনস্বীদের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রামের আহ্বানে এবং হ্যারল্ড ল্যাক্সি, হাবার্ট রীড, মন্টেগু শ¬্যাটার, রজনীপাম দত্ত প্রমুখ বিদেশী মার্কসবাদী বন্ধুদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ আলাপ আলোচনার মাধ্যমেও। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে জর্জি ডিমিট্রভ ততদিনে (১৯৩৫) ‘সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ-বিরোধী যুক্তফ্রন্ট’-তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৩৬-এর এপ্রিলে লক্ষেœৗতে মুন্সী প্রেমচন্দ-এর সভাপতিত্বে গঠিত হলো নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ। প্রগতি লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠায় মার্কসীয় বুদ্ধিজীবী ও কমিউনিস্টদের সক্রিয় উদ্যোগ ছিল। তৎকালে বামপন্থী রূপে পরিচিত কংগ্রেস সভাপতি জওহরলাল নেহরুরও ছিল পরোক্ষ উৎসাহ। সদ্য ইউরোপ প্রত্যাগত সাজ্জাদ জহীর, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়রা ছিলেন এর নেতৃত্বে।
১৯৩৫ সাল থেকেই ইউরোপে ফ্যাসিবাদী আক্রমণ শুরু হয়। ইতালি ১৯৩৫-এ আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) এবং জার্মানি স্পেনের ওপর হামলা শুরু করে। তখন শিল্পী পাবলো পিকাসো প্রতিবাদ জানাচ্ছেন ছবি এঁকে। ১৯৩৬-এর ৩রা সেপ্টেম্বর রোমা রল্যাঁ’র আহ্বানে ব্রাসেলস শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বশান্তি সম্মেলন, তাতে বলা হলো : ‘‘পৃথিবীর সম্মুখে আজ আতঙ্কের মতো আর এক বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা সমুপস্থিত। ফ্যাসিস্ত স্বৈরতন্ত্র মাখনের বদলে কামান তৈরিতে মগ্ন। তারা সংস্কৃতির বিকাশের বদলে বিকশিত করছে সাম্রাজ্য জয়ের উন্মাদ লালসা, প্রকাশ করছে নিজের হিংস্র সামরিক স্বরূপকে।’’
বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ অবশ্য ১৯৪২সালের ২৮শে মার্চ তারিখে কলকাতায় তরুণ কমিউনিস্ট লেখক সোমেন চন্দ-এর স্মরণসভা থেকে নাম বদল করে ফ্যাসিস্ত-বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘে পরিণত হয়। লেখক সোমেন চন্দ ঢাকার রাজপথে নির্মমভাবে ৮ই মার্চ ১৯৪২ নিহত হওয়ার আগের বছর জ্যোতি বসু ও স্নেহাংশুকান্ত আচার্যের উদ্যোগে স্থাপিত হয় সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি। ১৯৪৩-এ প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় গণনাট্য সংঘ। সারা ভারতজুড়ে সৃষ্টি হয় এক মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিজাত জাগরণের। যুদ্ধ, মন্বন্তর, সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রগতি লেখক সংঘ ছিল এই সাংস্কৃতিক জাগরণের মূল ও পথ-নির্দেশক শক্তি।
১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ’। এই ধারাবাহিকতায় সোমেন চন্দ, সতীশ পাকড়াশী, রণেশ দাশগুপ্ত, জ্যোতির্ময় সেনের উদ্যোগে প্রগতি লেখক সংঘ ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪০ সালে গেন্ডারিয়া হাইস্কুল মাঠে প্রগতি লেখক সংঘ-এর প্রথম সম্মেলন করে। এতে কাজী আবদুল ওদুদ সভাপতিত্ব করেন। সম্মেলনে রণেশ দাশগুপ্ত সম্পাদক এবং সোমেন চন্দ সহ সম্পাদক নির্বাচিত হোন। ১৯৪১ সালে জার্মান কর্তৃক সোভিয়েট রাশিয়া আক্রান্ত হলে লেখক সংঘ তার প্রতিবাদে ব্যাপ্টিস্ট মিশন হলে ‘সোভিয়েট মেলা’ নামে সপ্তাহব্যাপী এক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এভাবেই এই সময় সংঘের কার্যক্রম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রগতি লেখক সংঘ দিনদিন আন্তর্জাতিক রূপ পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর রাজনীতিতে পরিবর্তন দেখা দিলে সংঘের কার্যক্রম বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়। ১৯৪৭-এ দেশ ভাগের পর ধীরে ধীরে প্রগতি লেখক সংঘের কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়। ২০০৮ সালে দেশের কিছু প্রগতিশীল লেখকের প্রচেষ্টায় ‘বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ’ পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে। সেসময় একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ৮ আগষ্ট ২০১৪ এ বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের প্রথম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । ১৫ মার্চ ২০১৯ বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের তৃতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
লেখক সংঘের কর্মকাণ্ডের প্রেষণায় লেখক-শিল্পীদের মধ্যে যে চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় অসাম্প্রদায়িকবোধ, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকা, যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবতাবোধের ভিত্তিমূল পাকিস্তান আমলেও ছিন্ন হয়নি। পঞ্চাশ-ষাট দশকে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে যুক্ত থাকা অগ্রসর কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকরা গৌরবের ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁরা এবং তাঁদের উত্তরাধিকারেরা এখনো সক্রিয়। সোমেন চন্দের উত্তরাধিকার হিসেবে সেই বিবেচনাবোধ নিয়ে বাংলাদেশের মূলধারার লেখক-শিল্পীরা এখনো জেগে আছেন ও ভূমিকা রাখছেন, তা আরও অগ্রসর করে নিয়ে সম্মুখবর্তী অবস্থানে দেদীপ্যমান করতে হবে।
(লেখাটা ‘বই’ পত্রিকায় প্রকাশিত)

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>