| 23 এপ্রিল 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গদ্য: স্যানিটাইজড । সোনালি

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

 

 

বাবারে বাবা। সারা দিন শুধু স্যানিটাইজ আর স্যানিটাইজ।

মাথা খারাপ হয়ে গেল। হাতের ছাল চামড়া উঠে গেল। জামাকাপড় ছাতাপড়া হয়ে গেল।

তবু আতঙ্ক যায় না।

 ধুর বাবা!

 

আর কত যে স্যানিটাইজ করা যায়।

 

এই যে শুরু হয়েছে করোনা-র গল্প। এর কি আর  শেষ নেই ?

মহামারী,  গল্প উপন্যাসের পাতায় পড়ে জানাছিল। কিন্তু সে যে আদতে কি জিনিস টের পেয়ে এখন সারা পৃথিবীর নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে ।

রুগী সামলাতে সামলাতে ডাক্তার নার্সরা মরছেন একের পর এক ।

নেতা, অভিনেতা, ব্যবসায়ী, ধনী, দরিদ্র,  কে নেই ?

রোগের চিহ্ন চোখে দেখা যায় না  যেহেতু , সেটা এত যে ছোঁয়াচে জিনিসটা,  কেউ বুঝতেই চায় না।

 

চূর্ণি এক লক ডাউন নিয়েই পাগল হয়েছিল।

কলেজ বন্ধ। বাবা মার অফিস বন্ধ। কাজের মাসি আসতে পারবে না । সুতরাং নিজেরা দুবেলা বাসন ধোয়া,  ঘর মোছা।

কাপড় তবু ওয়াশিং মেশিনে ধোয়া যায়। কিন্তু ছাদে টেনে নিয়ে গিয়ে মেলতে ত হয়।

রান্না পুরোটা মায়ের ঘাড়ে ফেলা যায় না ।

এই বাজারে চূর্ণি আটা মাখার মত কঠিন কাজ ও শিখে ফেলেছে।

রুটি বেলতে একটু প্রব্লেম আছে এখনো । কিঞ্চিৎ অস্ট্রেলিয়া আফ্রিকার ম্যাপ হয়ে যাচ্ছে রুটিরা।

স্টিল, চেষ্টা ত করে ?

বাবা মা ওতেই কি ভীষণ আহ্লাদিত ।

 

এর মধ্যে আবার আম্পান এসে গেল।

নাই আলো। নাই জল। নাই খাবার। রাস্তাঘাট জলের তলায়। সে যে কি ভয়ানক অবস্থা। কলকাতা শহরে কোন দিন এই রকম ইংরেজি সিনেমার মত ঘটনা ঘটবে, একমাস আগেও কেউ বললে চূর্ণি হ্যা হ্যা করে হেসে ফেলত , নির্ঘাত।

তারপর ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করত,  কি খেয়েছিস ভাই ? লিকুইড না গাঁজার ধোঁয়া ?

 

এখন চক্ষুচড়কগাছ হয়ে বসে আছে ।

সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে হচ্ছিল মোবাইলের নেটওয়ার্ক। একে কারেন্ট নেই বলে চার্জ দেওয়া সমস্যা। তাও যদি বা পাওয়ার ব্যাংক হেনোতেনো দিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টা ত, ফোনের টাওয়ার উধাও।

 

 

ওদিকে রাতুল পাগল হয়ে আছে ফোনে চূর্ণিকে না পেয়ে। কল যায় না। হোয়াটস্যাপ হয় না। শেষে দু’একটা এস এম এসে অন্তত জানা গেল,  ওরে বেঁচে আছি। তারপর আবার ফোন বন্ধ করে চার্জ বাঁচিয়ে রাখা। কাজেই এছাড়া চূর্ণি আর কিছুই জানাতে পারছেনা।

 

এদিকে সব রাস্তায় গাছ উপড়ে পড়ে আছে। জল, খাবার, এমনকি মোমবাতি ও পৌঁছানোর উপায় নেই ত। কারো কিচ্ছুটি করার ও নেই।

টেক্সটের পর টেক্সট ই চালিয়ে যাচ্ছিল রাতুল । অগত্যা।

 

এইসব সামলে কলকাতা একটু স্বাভাবিক হতে হতেই সেই দুঃস্বপ্নের মেসেজ চলে এল চূর্ণির কাছ থেকে ।

 

আমরা সবাই কোভিড পজিটিভ রে।

তোরা সাবধানে থাকিস।

 

মাথা ঠাণ্ডা রাখতে চেষ্টা করে রাতুল । সব সময়। প্র‍্যাকটিকালি চলে। প্রবাসী বাঙালি পরিবারের ছেলে। ছোটবেলা থেকে একা পড়াশোনা করেছে একটা অন্য শহরে এসে ।

এলোমেলো হয়না সাধারণত।

তাই এখনো মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করে।

 

হোয়াটস্যাপে ওষুধপথ্যের নাম,  অনলাইনের লিংক এইসব পাঠিয়ে বসে থাকছে। খবর পাচ্ছে চূর্ণির মাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হল। ফোনে, ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে তিনি কেমন আছেন সেইটুকু  চূর্ণিকে জানানো ছাড়া আপাতত আর কিছু করা যাবে না। তাই কাঁটা হয়ে বসে থাকা।

বুকের গভীরে কি চলছে,  কতটা ভয় করছে চূর্ণির জন্যে তা মুখ ফুটে বলা ত যাবে না।

 

দিনগুলো কি ভাবে কাটছিল যে।

 

তবু স্বস্তি এল এক দিন।

অবশেষে কোয়ারান্টাইন শেষ। কাকিমা  সুস্থ হয়ে বাড়ি  ফিরেছেন। চূর্ণির বাবা, চূর্ণি নেগেটিভ রিপোর্ট পেয়েছে।

এবং  লকডাউনও উঠে গেছে কলকাতা থেকে। 

 

ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে জীবন।

অসুখ বিসুখ সঙ্গে নিয়েই হচ্ছে।

নানারকম মাস্ক কেনা হচ্ছে। কে ক দিন হাসপাতালে ছিল তার কমপ্যারিজন চলছে।  অফিসকাছারি ও খুলছে আস্তে আস্তে। জীবন ত থেমে থাকতে চায় না এক মুহূর্ত ও।

 

 

চূর্ণির বাবা মা দুজনেই ব্যাঙ্কে কাজ করেন।

অফিসে জয়েন করে গেছেন। চূর্ণির কলেজ ছুটি আছে এখনো।

রাতুলের সফটওয়্যার কোম্পানি ওয়ার্ক ফ্রম হোম টাই চালু রেখেছে।

 

কালীপুজো আসছে সামনে।

আজকাল লোকে বলে দিওয়ালি।

 

রাতুল তুবড়ি বানাতো ছোটবেলায়।

গত বছর চূর্ণির সঙ্গেও অনেক বাজি ফুটিয়ে ছিল।

কিন্তু এবারে ত বাজি ফাটানো বারণ।

 

 

তাও একটা ফোন করল দুপুরে।

 

দিওয়ালির গিফট ছিল একটা। মহারানি বললে এসে দিয়ে যাই।

 

-আসবি বলছিস তো, কিন্তু আমাদের ফ্ল্যাটে ঢুকবি কি করে।বাইরের লোকের এখনো আসা বারণ।  আচ্ছা আমি নিচে নেমে নিয়ে আসব না হয়।

আমরা অবশ্য ফ্ল্যাটের সবাই কোভিড  নেগেটিভ হয়ে গেছি। তাও। বাইরের কাউকে চট করে উপরে উঠতে দিচ্ছে না সোসাইটি থেকে।

 

ফোঁস করে ওঠে রাতুল।

-আমাকে এইসব নেগেটিভের গল্প শোনাস না।

পজিটিভ ছিলি যখন তখনও আসব বলিনি? ওষুধ খাবার সব  নিয়ে আসছি বললাম, না করলি তো। আজ নিচে তো কাকু ও আসতে পারে, তুই নামবি কেন ?

 

ফিক করে হেসে ফেলে চূর্ণি।

 

আহা,  কি কথা।

বাবা মায়ের একটা মাত্র ছেলে, তাকে আমি এরমধ্যে আসতে দিই, আর ইনফেকশন হলে সারা জীবন বিবেকের কামড় খাই, না?

চুপ কর ।

 

যাক গে, আজ আসছিস তো?

বাবা মা ত অফিসে।

আমি একা একাই বাড়িতে বসে। এসে মেন গেট থেকে কল করিস। নেমে যাব।

 

 

ফোনটা ছেড়ে বোকার মত হাসে চূর্ণি । হাসিটা চওড়া হয়ে কান এঁটো হয়ে গেল প্রায়।

তারপর চট করে চান করতে ঢুকে পড়ে। রাতুল যাতে করেই আসুক মিনিট চল্লিশ ত লাগবে। এসে কমপ্লেক্সের মেন গেট  থেকেই ফোন করতে হবে। ততক্ষণে রেডি হয়ে যাবে চূর্ণি।

ফোনটা নিয়ে অনলাইনে একটা ব্ল্যাক ফরেস্ট  অর্ডার দেয় চট করে। ডেলিভারি বয়দের ওপরে আসতে দিচ্ছে । লক ডাউনেও সুইগি, জোমাটো, আমাজন, সব ডেলিভারি দিয়েছে।

এই কেকওয়ালারাও দিয়ে যাক। রাতুল এলে কেকটা  হাতে নিয়ে নামবে। ওখানেই দিয়ে দেবে ওকে।

ইসস, কত দিন যে দেখা হয়নি।

 

 

টিং টং।

দরজায় বেলের শব্দ। কলার বোনে পারফিউমের ফোঁটা দিতে দিতে চূর্ণি ভাবে,

কে রে ? ডেলিভারির লোকটা নিশ্চয়ই।  

 

ফ্ল্যাটের দরজা খুলে হাঁ হয়ে গেল মেয়েটা।

 

-একি??? 

-চুপ।

 

মস্ত একখানা ব্রাউন পেপারের বাক্স হাতে,  রাতুল দাঁড়িয়ে।

এদিক ওদিক তাকিয়ে চটপট ঘরে ঢুকে দরজায় ছিটকিনি দেয়।

 

-আরে হাবা। দাঁড়িয়ে থাকে কেউ ? ঢোক ঢোক।

সিঁড়ি দিয়ে কেউ এলে ?

ভেতরে ঢুকতে ত দিবি ?

 

-এত কেকের প্যাকেট। তুই এই বাক্স পেলি কোথা থেকে?

 

চূর্ণির চোখ এখনো ছানাবড়া হয়ে আছে ।

 

রাতুল উচ্চাঙ্গের হাসি দেয়।

 

 -ক্ষুদ্র বালিকাদের ঘটে এত কঠিন বিষয় বুঝিবার মত ক্ষমতা থাকে না।

আমি এসেছি, খুশী হয়েছিস কিনা?  ব্যস।

কটা থ্যাঙ্কিউ দিবি?

এ সবের জন্যে বুদ্ধি লাগে বুঝলি?

 

 চলেই ত যেতে হবে ভেবেছিলাম নিচে থেকে।

গেটের ভিতর ঢুকতেই ভাগ্যিস দেখলাম ডেলিভারির লোকটা সাইকেল থেকে নামছে। এগিয়ে আসতেই ,  দাদা এই ব্লকটা কোন দিকে বলতে পারবেন, সি মজুমদারের ফ্ল্যাটে যাব,  বলল।

 

নামটা দেখেই বললাম , হ্যাঁ হ্যাঁ, আমাদেরই ফ্ল্যাট,  আমিই সি মজুমদার। দিয়ে দিন। এই যে আমার ফোন নাম্বার মিলিয়ে নিন আগে। নেহাৎ তোর নম্বরটা ঠোঁটের ডগায় থাকে তাই।

এইসব বলে প্যাকেট নিয়ে নিতে পেরেছি।

বুদ্ধি থাকতে হয় কিছু মগজে, বুঝলি?

 

 

চোখটা সরু হয়ে আসে চূর্ণির, রাতুলের ডায়ালগদের প্যাট্রোনাইজিং টোনটায়। মাথা নিঃশব্দে কাজ করতে শুরু করে দেয় হাই স্পিডে।

 

-আচ্ছা ?  হুঁ। দেখি তবে বুদ্ধিমানের দৌড়টা।

 

দরজার সামনে একটা ছোট তাকে বড় স্যানিটাইজার স্প্রে রাখা আছে। যে কেউ বাড়িতে এলেই হাতে স্প্রে করা হয়। কোন জিনিসপত্র ডেলিভারি হলেও প্যাকেট স্প্রে হয়ে তবে ঘরে ঢোকে ।

 

স্প্রেটা হাতে নেয় এবার চূর্ণি।

 

-দাঁড়া। স্যানিটাইজড না হলে ত চলবে না। এলেই হল নাকি।

 

মাস্ক খুলে পকেটে রাখছিল অরিত্র।

মুখ তুলে বলল, ওহ। তা স্প্রে কর।

 

-এমনি স্প্রে করলে চলবে কেন ?

ইমিউনিটি এখন কম আছে আমার। আমার ধারেকাছে আসতে হলে ফুল স্যানিটাইজেশন দরকার।

বাইরের জামাকাপড় এখানেই ছেড়ে  তবে ভেতরে যেতে হবে। সায়েন্টিফিকালি ভাব।

 

গালের হালকা দাড়ির ওপরের চামড়ার রঙটা ক্রমশ লালচে গোলাপি হয়ে উঠছিল রাতুলের।

 

-শয়তানি বুদ্ধি ত কিছু কমেনি কোভিড হয়ে দেখতে পাচ্ছি।

 

স্প্রে হাতে মিটিমিটি হাসে চূর্ণি।

 

-কোনো কথা নয়। এটা মেডিক্যাল সায়েন্স। কাম অন। স্ট্রিপ।

 

স্প্রেটা ঠাণ্ডা।

শরীরের ওপরে নীচে ছড়াতে ছড়াতে ঘরের উত্তাপ  বেড়ে  যাচ্ছিল তর তর করে । আর ভেতরের কাঁপুনি  শীর্ষ ছোঁয়ার দিকে এগিয়ে চলতে চলতেই এবার রাতুল মনে করিয়ে দিল, চূর্ণি ত পোস্ট-কোভিড পেশেন্ট।

 

তার ও স্যানিটাইজড হয়ে তবেই একজন বিশুদ্ধ মানুষের গায়ে হাত দেয়া উচিৎ।

সায়েন্টিফিক থিংকিং।

 

চূর্ণির  বিশেষ আপত্তি করার জায়গা ছিল না।

 ফেয়ার প্লে।

আর খুব একটা ইচ্ছেও ছিল না আপত্তি করার ।

খালি  মাথাটা একটু ঝিমঝিম করছিল আর বুকের ধুকপুকটা বেড়ে চলেছিল সেতারের ঝালার মত।

 

শীত করছিল প্রথমে খোলা গায়ে স্প্রে আর  পাখার হাওয়াটা লেগে।

তারপর রাতুলের হাতের আঙুল  আর ঠোঁটের  গরমের সঙ্গে গরম নিঃশ্বাস ঘাড় গলা বেয়ে বুকের দিকে নামতে থাকায়  মনে হল, পাঞ্জাবি ধাবায় মস্ত তাওয়ার ওপরে দেওয়া মাখনের কিউবের মত কি একটা গলে যাচ্ছে ভিতরে। ভালো লাগারা গড়িয়ে নাভির নীচে, অনেক গভীরে তরল হয়ে জমছে। ড্রয়িং রুমের সোফার নরম গদিতে ডুবে যেতে যেতে কি ভীষণ আরামে চোখ বুজে এল মেয়েটার।

 

মনে হল রাতুলের বানানো তুবড়িগুলো তার ভিতরেই ফুল ছড়াচ্ছে নানা রঙের। একতলা দু তলাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে আগুনের আলপনা।

আর, আশ্চর্য , কি পরিচ্ছন্ন মনে হচ্ছে নিজেকে।

শরীর মনের সব অণু পরমাণু আলোয় ঝলমল করছে যেন।

শরীরের অনেক অনেক গভীরে রাতুলকে টেনে নিয়ে হেসে ফেলে চূর্ণি।

ঘামে স্নান প্রবল তোলপাড় রাতুল কোনমতে নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে তাকায়।

 

-হাসছিস কেন ?

 

-বেঁচে আছি যে।

 

রাতুলের ঘামে পিছলে যাওয়া পিঠটা দু হাতে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখে চূর্ণি।

 

-এত আলো তৈরি করতে পারি আমরা ? এত?

আই নেভার ফেল্ট সো ক্লিন।

 

হাঁফাতে হাঁফাতে আকাশ ছুঁয়ে মাটিতে নেমে আসা রাতুলের মুখে বিশ্বজয়ের হাসি।

 

-বলছিস?

 

চূর্ণির গলায় আবেশ আর সারা পৃথিবীর মায়া।

 

-কি রে তুই?  এত কান্ড করে আদর করতে এসেছিস?  এই অসুখের মধ্যে? নিজের কথা ও ভাবতে হয়। কিন্তু, সত্যি এত আলো আর কখনো দেখিনি। 

 

একরাশ নরম অনুভব নিয়ে চূর্ণির কপালে আস্তে আস্তে কপাল ঠেকায় রাতুল। তারপর ফিক করে হাসে।

 

 

-তবে আর চিন্তা নেই বুঝলি।

ফুললি স্যানিটাইজড।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত