স্যার

ইরাবতী ধারাবাহিক:ফুটবল (পর্ব-৮) । দেবাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

Reading Time: 5 minutes

অষ্টম শ্রেণির দুই বন্ধু রাজ আর নির্ঝর। রাজ আর অনাথ নির্ঝরের সাথে এইগল্প এগিয়েছে ফুটবলকে কেন্দ্র করে। রাজের স্নেহময়ী মা ক্রীড়াবিদ ইরার অদম্য চেষ্টার পরও অনাদরে বড় হতে থাকা নির্ঝর বারবার ফুটবল থেকে ছিটকে যায় আবার ফিরে আসে কিন্তু নির্ঝরের সেই ফুটবল থেকে ছিটকে যাবার পেছনে কখনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নির্ঝরের জেঠু বঙ্কু। কখনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় বঙ্কু ও তার ফুটবলার বন্ধু তীর্থঙ্করের বন্ধুবিচ্ছেদ। কিন্তু কেন? সবশেষে নির্ঝর কি ফুটবলে ফিরতে পারবে? রাজ আর নির্ঝর কি একসাথে খেলতে পারবে স্কুল টিমে? এমন অনেক প্রশ্ন ও কিশোর জীবনে বড়দের উদাসীনতা ও মান অভিমানের এক অন্য রকম গল্প নিয়ে বীজমন্ত্রের জনপ্রিয়তার পরে দেবাশিস_গঙ্গোপাধ্যায়ের নতুন কিশোর উপন্যাস ফুটবল আজ থাকছে পর্ব-৮।


 

রাজরা যে মাঠে প্র্যাকটিশ করবে সেটা স্কুল থেকে একটু দুরে।  মিল লাগোয়া মাঠে।এদিকটা  বাড়ির উল্টোদিকে পড়ে।  এ পথে   রাজ খুব কম গেছে। একবার-দুবার। আজ  যাবার সময় সে চারপাশ দেখতে দেখতে গেল। সে একটু অবাকই হল।জায়গাটা বেশ অন্যরকম। চারপাশে ছোট ছোট লাল রঙের পুরানোবাড়ি, বাড়িগুলোর নকশাও এখনকার মতো নয়। রাস্তাগুলোও বেশ চওড়া।  বিকেলে  যেতে যেতে রাজসাইকেল দাঁড় করিয়ে চারপাশ তাকায়। জায়গাটা ফাঁকা। লোকজন খুব কম চলাচল করে।

একটু পরে রাজ ফের সাইকেল চালাতে মনস্থ করল। মাঠে তাড়াতাড়ি না গেলে মৈনাকস্যার বকুনি দেবেন।  নির্ঝর নিশ্চয়ই এতক্ষনে মাঠে চলে গেছে। সে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিতে যাবে। সেসময়ে  হঠাৎ তার কাঁধ কে একজন স্পর্শ করল। সে চমকে ফিরে তাকাল।

“কি বাবু? কি দেখছ?”

লোকটা লম্বা, গায়ে একটা অপরিচ্ছন জামা,মুখটা ভাঙাচোরা। কিন্তু ভ্রুদুটো ভীষন মোটা।সে একবার তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল,“কিছু না।“

“উহু। কিছু তো বটেই । এসব বাড়িঘর দেখবার জিনিষ ।কি সুন্দর বল।“

লোকটাকে দেখে তার অস্বস্তি হচ্ছিল ঠিকই। কিন্তু লোকটার গলার স্বরে আন্তরিকতার ছোঁয়া। সে মাথা নেড়ে বলল,“হ্যাঁ।“

লোকটা বলল,“এসব কি এখনকার জিনিষ! ব্রিটিশ পিরিয়ডে্র। সাহেব-সুবোরা সবাই থাকত এখানে। খুব হইচই হত।“

“আপনি দেখেছেন নাকি?”

“উহু। আমি কি করে দেখব! সে কতযুগ আগের কথা। বাবা-দাদুর মুখ থেকে শুনেছি।ওই যে তখন তাদের সব অফিসাররা, মিলের বড় বড় সাহেবরা এখানে থাকত।“

  লোকটা হাত তুলে  সামনের দিকে দেখাল। রাজ দেখল একটু দুরে একটা দুটো বড়সড় বিল্ডিং।

“ তাই।এখন থাকে না?”

“উহু! মিল বন্ধ। কে থাকবে এখন? তবু দুচারজন পুরনো লোকজন থাকে।তবেআগের মত আর জৌলুস নেই।“

রাজ মাথা নাড়ে। লাল রঙের বাড়িগুলো দেখতে সুন্দর। কিন্তু তার গায়ে যেন বহু  বছরের ময়লা লেগে আছে।

লোকটা বলল,“এদিকে দেখো।“

রাজ চোখ ঘুরিয়ে  উল্টোদিকে  তাকাল। অনেকগুলো পুরানো ঘর।ছোট,ছোট।

লোকটা বলল,“ওখানে আগে সব মজুররা থাকত।কাজ করত।“

“ওখানেও কেউ নেই?“

“মিল বন্ধ হয়ে যাবার পর  বেশীরভাগ লোক চলে গেছে।কেউ বা মরে গেছে।

“আপনি?”

“আমার অবশ্য মিল বন্ধ হবার আগেই কাজ চলে গেছিল। পার্মানেন্ট ছিলাম না।  ক্যাজুয়াল লেবার ছিলাম। তবু জায়গাটা ছাড়তে পারি নি।“

রাজের শুনে খুব মায়া লাগল। ওই ভাঙাচোরা ঘরের মধ্যে মানুষটা   থাকেন কি করে সে ভেবে পায় না। কিন্তু এখন আর তার কথা শোনার সময় নেই। সে বলল,“জেঠু। আমি পরে একদিন আসব।এখন যাই। খেলা আছে।“

“খেলা! ফুটবল না ক্রিকেট?

“ফুটবল”

“বাহ!কোথায় খেলতে যাচ্ছ? মিলের মাঠে? চল। আমিও ঘুরে আসি।“

রাজের  একটু লজ্জা লাগল। বড়মুখ করে লোকটাকে সে বলল বটে কিন্তু স্যার আদৌ তাকে ও নির্ঝরকে হয়ত খেলায় নেবেন না। সে বলল,“যাবেন?”

“চল যাই।“

স্যার অনেক আগেই চলে এসেছেন। অন্য ছেলেরাও মাঠে দাঁড়িয়ে। দুরে নির্ঝরও রয়েছে। তা ভেবে স্বস্তি হল তার।  কিন্তু নিজের জন্য বুক ঢিপ ঢিপ করল। তার দেরী হয়ে গেছে।স্যার এমনিতেই রাগী। তাকে যদি না নেয়! তাছাড়া সেদিনের পর থেকে স্যার একটু খেপে আছেন। সে খেয়াল করল অনীকদা আসবে না বলেও ঠিক এসেছে।সে মুখ টিপে হাসল।বলা যায় না।  না এলে স্যার সত্যিই বাদ দিয়ে দিতে পারেন।অনীকদা ঝুঁকি নেয় নি।

স্যার অবশ্য রাজের দিকে তাকালেন না। তার পাশে পাশে মানুষটার দিকে তাকিয়ে বললেন,“আরে।তীর্থঙ্করদা আসুন।“

রাজ একটু অবাক হয়ে তাকাল। এমন অদ্ভুতেড়ে লোকটাকে স্যারের খ্যাতির কারণ সে বুঝতে পারল না।

স্যার তার দিকে চেয়ে বললেন,“হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলি কেন? লাইনে দাঁড়া।“

“যাচ্ছি স্যার।“

প্রায় কুড়িজন মত ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। এরমধ্যে স্যার বেছে নেবেন। তার না হোক, নির্ঝরের হলেই সে আনন্দ পাবে।রাজ ভাবল। কিন্তু  তার মনের মধ্যে একটা দ্বিধা ওকে নিয়ে আছে। নির্ঝর  দৌড়াতে পারে, কিন্তু ওকে সে কোনদিন ফুটবল খেলতে দ্যাখে নি। ও কি করবে তা নিয়ে চিন্তা আছে তার। নির্ঝরকে কিছু বলতে গিয়েই সে হঠাৎ লাইনে ইমনদের দেখতে পেল। স্যার ওদেরও ডেকেছেন। তবে  ইমন ও কল্লোল এসেছে। শিলাদিত্যকে সে দেখতে পেল না।

রাজরা মাঠ নেমে একটু দৌড়ঝাঁপ করে নিল। নির্ঝর তার সঙ্গে দৌড়তে শুরু করল। ইমনরা পেছনে ছিল।পাশ দিয়ে যাবার সময় নির্ঝরকে ঠাট্টা ছুঁড়ে দিয়ে গেল,“কি রে? নির্ঝর?তুই কি রেফারী হবি? সারা মাঠে দৌড়াবি?”

রাজ একবার ওদের দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। যাক, এখন রাগ দেখিয়ে লাভ নেই।তাছাড়া সেও জানে না নির্ঝর  আদৌ খেলতে পারবে কিনা?

দৌড়ঝাঁপ শুরু হবার পর  স্যার  চলে এলেন। দুই  দাদাকে ডাকলেন “শোন  আমন, ইন্দ্র।,তোরা দুজন  গোলে যা। এদের আমি দেখে নেব কেমন শট করতে পারে।সবাইকে আগে একবার দেখে নি।“


আরো পড়ুন: ইরাবতী ধারাবাহিক:ফুটবল (পর্ব-৭) । দেবাশিস গঙ্গোপাধ্যায়


পেনাল্টি বক্সের মাথায় বল বসিয়েছেন স্যার। এক একজন করে ডাকছেন।এদের মধ্যে পাঁচমিশেলী ছাত্র আছে।ক্লাস এইট থেকে টুয়েল্ভ পর্যন্ত। গোল হয়ে পেছনে দাঁড়াল রাজরা। একে একে বল মারতে শুরু করল।

এখানে যারা এসেছে তারা মোটামুটি খেলতে পারে। সবারই অল্পবিস্তর ফুটবল খেলা সম্পর্কে ধারনা আছে।প্রত্যেকেই খেলোয়াড় সুলভই বল মারল। কিন্তু গোলকিপার আমন ও ইন্দ্র , দুজনেই শক্ত ঘাঁটি। বিশেষ করে ইন্দ্রদা এখানকার সেরা গোলকিপার। কেউ এখনো পর্যন্ত গোলে বল ঢোকাতে পারে নি।

ছয় নম্বরে রাজ এল। এবার গোলে দাঁড়িয়েছে আমনদা। রাজ একটু দুর থেকে ল্যাপ নিল। আমন  বাঁ-দিক দুর্বল। সে খেয়াল করে দেখেছে। বাঁ-দিক ঘেঁষে বল মারলে গোল হবার সম্ভাবনা আছে।একটু দৌড়ে এসে রাজ বলটা মারল। বাঁ-দিকে বারের মাথা বরাবর  বলটা যেতে শুরু করল। আমনদা বুঝতে পারে নি,সে ঝাঁপ মারলেও তার হাত পৌছাবে না ।রাজ নিশ্চিত।ঠিক তাই হল। আমনদা বাঁ-দিকে বলটাকে  বার করে দেবার জন্য লাফাল ঠিকই।কিন্তু বল তার হাতে লাগল না।রাজ নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে রইল।কিন্তু তার ভাগ্যও ভাল নয়। বলটা বারপোষ্টে লাগল।

স্যার বলে উঠলেন,“ওয়েল ডান। ওয়েল ডান।“

আরো দু-একজন মারল।ইমন এমন ভাব দেখাচ্ছিলযে সে যেন বলে বলে গোল করবে কিন্তু সে গোলের সীমানার মধ্যে  বল রাখতে পারল না । স্যার ধমক দিয়ে  বললেন,“ষ্টাইল তো শিখেছিস।আর বল মারার সময় কিছুই পা্রিস না।“

ইমনের মুখ থমথমে। রাজ খেয়াল করে নি আগে।  জার্সি-শর্টস ছাড়াও ওর হাতে রিষ্টব্যান্ড, মাথায় চুল কোন একটা খেলোয়াড়ের মত চুড়ো করে বাঁধা।

স্যার ইমনকে বললেন,“আমি আগে  তোকে দেখি নি। আমার এখানে আসবি।ওমন চুল, ওমন স্টাইল করে আসবি না। দুর করে দেব।“

নির্ঝর  একদম শেষে দাঁড়িয়ে আছে। ও যেন ইচ্ছে করে পেছনে চলে গেছে।এখনো স্যার কারুকে সিলেক্ট করে নি।তবুরাজের মনে হচ্ছে সে চান্স পেলেও পেতে পারে। কিন্তু নির্ঝরের হবে না মনে হয়। সে না হয় ফুটবলে হবে না।কিন্তু দৌড়ের ব্যাপারটা সে স্যারকে আবার বলবে। রাজ ভাবল।

স্যার বাঁশি দিলেন। প্রথম বাঁশি। এবার গোলে দাঁড়াল ইন্দ্রদা।  ইন্দ্রদার হাইট, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সবই দেখার মত। সে সবসময়ই সিরিয়াস।ঠিক মধ্যিখানে  এসে সে স্থির হয়ে দাঁড়াল।সেদিনের ম্যাচটায় ইন্দ্রদা খ্যালে নি। গোলে আমনদা খেলছিল।দুই গোলে তারা তাদের হেরে গেছিল।রাজের বিশ্বাস ইন্দ্রদা থাকলে  স্কুল হারত না।

স্যার আরেকটা বাঁশি বাজালেন। নির্ঝর দৌড়াতে শুরু করল।ওর গতিবেগ দেখে রাজ বুঝল ফুটবল সম্পর্কে ওর কোনো ধারণা নেই।এটা কি  একশ মিটার দৌড়! আদৌ ও বল মারতে পারবে কি না সন্দেহ। রাজের ভয় হল  বল  পায়ে  লেগে  ও উল্টে না যায়।

কিন্তু অবিশ্বাস্য বলে একটা কথা আছে! রাজদের চোখের সামনে যেন সেই ঘটনাই ঘটে গেল! কেউ ভাবতে পারছে না নির্ঝরের  পায়ের জোর!

সত্যিই অকল্পনীয়!  নির্ঝরের মারবার পর ইন্দ্রদার কিছু করার ছিল না। তার চোখের সামনে বলটা গোলার মত  এসে গোলে আছড়ে পড়ল ।কিছুক্ষন সবাই চুপ করে রইল। তারপর রাজরা হাততালি দিয়ে উঠল।

ইন্দ্রদা  কিছুক্ষন থতমত খেয়ে দাঁড়াল।তারপর সে হঠাৎ দৌড়ে গেল নির্ঝরের  দিকে। ওর সাথে হ্যান্ডসেক করে  সে পিঠ চাপড়ে দিল।

স্যার এবার সবাইকে ডাকলেন।বললেন,”ওকে। এবার চল টিম করে খেলা যাক।“

 খেলাতেও অবিশ্বাস্য খেলল নির্ঝর !মাঠের মধ্যে তাঁর খেলা দেখে সবাই স্তম্ভিত। তীর্থঙ্করবাবুবলে লোকটা সারাক্ষন চুপ করে বসেছিলেন। ওর খেলা দেখে সারাক্ষন  সাইড লাইন ধরে দৌড়ে গেলেন। রাজ ওর টিমেই খেলছে। সে নিজের খেলা ভুলে নির্ঝরের খেলা দেখে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। সে শুধু নয় অনীকদা, ইন্দ্রদা সবার চোখে অবাক চাহনি।

খেলা শেষ হতে সবাই ওকে ঘিরে ধরল।স্যার  ধীরেসুস্থে এগিয়ে এলেন।

ইন্দ্রদা বলল ,“স্যার। কাদের নেবেন ঠিক করলেন?”

স্যার বললেন,“আজ একজনকেই নেব। সে নির্ঝর।“

   

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>