| 27 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ভাসাবো দোঁহারে

ভাসাবো দোঁহারে: বিনোদপুরের জ্যোতি । হরিশংকর জলদাস

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

জ্যোতির সঙ্গে আমি ক্লাস ফাইভ অবধি পড়েছি। বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুলে।
আমি আসতাম নমুদের পাড়া থেকে। আর জ্যোতি আসত জমিদার বাড়ি থেকে। জ্যোতির বাবা ক্ষিতীশ চৌধুরী বিনোদপুর জমিদার বাড়ির শেষ প্রতিনিধি। চৌধুরী পদবিটি ছাড়া ক্ষিতীশ চৌধুরীর পোশাকে আশাকে বা গায়েগতরে জমিদারের কোনো চিহ্ন ছিল না। কাঁধ বরাবর লম্বা সাদা চুল, দীর্ঘ শ্মশ্রু, দুই জেরের শুভ্র ফতুয়া পরে গাঁময় ঘুরে বেড়াতেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। ধুতির গোছা বাম হাতে ধরে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে হাঁটতেন। লোকেরা প্রণাম জানালে পুরুলেন্সের চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে সামান্য মাথা নাড়তেন তিনি। তাঁর কাজ ছিল বিনোদপুরের আনাচে-কানাচে ঘুরে ঘুরে খাসজমি চিহ্নিত করা। তাঁর হাতে গোল করে গুটানো বিনোদপুরের ছিট। জেবে থাকত কাঠ পেন্সিল, কাঁটা কম্পাস আর আতস কাঁচ। খাল-নাল, স্যাঁতসেঁতে জলাভ‚মি দেখলে মাটিতে ছিটটি বিছিয়ে কম্পাস দিয়ে ছিটের ওপর মাপজোখ শুরু করতেন। তারপর ওই জমির ক্রেতা খুঁজতেন। ক্রেতারা যত টাকা বলত, তা নিয়ে খুঁটি পুতে ক্রেতাকে জায়গা বুঝিয়ে দিতেন। এমনও হয়েছে, এক জায়গা দুই-িিতনজনের কাছে বিক্রি করেছেন চৌধুরী মশাই। মাঝেমধ্যে মান-অপমানেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। এসব গায়ে মাখতেন না তিনি। নির্বিকার থাকতেন। মাঝে মাঝে এর ওর কাছ থেকে ধার নিতেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। ধার নেওয়াকে ইনকাম বলে মনে করতেন তিনি। শোধ দেওয়ার ঝামেলায় যেতেন না। মনে করতেন, এ টাকা ওঁর প্রাপ্য। মনে করতেন, এই গাঁয়ের সবাই তো একসময় জমিদারের প্রজা ছিল। বছর বছর জমিদারকে খাজনা দিত। ‘এখন তো দিস না। দিস না বলেই ধারের চাতুরি করে খাজনাটা আদায় করি তোদের কাছ থেকে’ মনে মনে বলতেন আর আপনমনে মুচকি একটু হাসতেন ক্ষিতীশ চৌধুরী।
ক্ষিতীশ চৌধুরী এসব করতেন শুধু পেটের দায়ে। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য ক্ষয়াটে জমিদারবাবুর আয়ের অন্য কোনো পথ ছিল না। ঘরে তাঁর দুই পুত্র, এক কন্যা। স্ত্রীও তখন রোগগ্রস্ত। বখাটে পুত্র দুটোকে নিয়ে চৌধুরী মশাইয়ের কষ্টের অন্ত ছিল না।

জমিদার বাড়িটি তখন বারো ভ‚তে টানাটানি করছে। নিচের তলাটা নানা আত্মীয়স্বজন দখল করে নিয়েছে। ওপরতলার অর্ধেকাংশ কাকাতো ভাই সুমন্ত চৌধুরী ভাড়া দিয়ে সপরিবারে শহরে থাকে। বাড়ির চারদিকে চৌহদ্দি একটা আছে বটে, তবে তা না থাকারই সামিল। ভাঙাচোরা দেয়ালের ফাঁক-ফোঁকর দিতে জমিদার বাড়িতে ঢুকতে কেউ বাধা দেয় না।

এরকম জমিদার বাড়ি থেকে জ্যোতি প্রাইমারি স্কুলে পড়তে আসত। একটু দেরি করেই স্কুলে ভর্তি হয়েছিল জ্যোতি, একেবারে ক্লাস ত্রি-তে। ভর্তি হয়ে বার্ষিক পরীক্ষায় ফার্স্ট। জ্যোতির ফার্স্ট হবার পেছনে হেড স্যারের কোনো কারসাজি ছিল না। জ্যোতি মেধাবী ছিল। মেধার জোরেই সে ফার্স্ট হয়েছিল। ফোরের প্রথম দিকে আমাকে খেয়াল করেছিল জ্যোতি। মুখচোরা আমি পেছন বেঞ্চে বসতাম। বসতাম মানে অজিত চক্কোত্তী স্যারই বলে দিয়েছিলেন পেছনের বেঞ্চিতে বসতে। নমুপাড়া থেকে আসা বিভাস তো পেছনের বেঞ্চেই বসবে!
‘নমুপাড়ার ছাওয়াল’ হলে কী হবে, দেখতে আমি লালটুস ছিলাম। মহেন্দ্র স্যার বø্যাকবোর্ডে অংক করাতে করাতে পেছন দিকে সরে আসতেন। আমার ফোলাফোলা গাল দুটো ডান হাতের বুড়ো আর তর্জনী দিয়ে টিপে দিয়ে বলতেন, ‘কীরে লালটুস, অংকটা বুঝতে পারছিস?’
আমি দাঁড়িয়ে অংক খাতাটা এগিয়ে ধরে বলতাম, ‘অংকটা আমি করে ফেলেছি স্যার।’
খাতায় চোখ বুলিয়ে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মহেন্দ্র স্যার বলতেন, ‘তুই করলি! এই ক্লাসে বসে! আমি করার আগে!’
আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
স্যার হইচই করে বলে উঠতেন, ‘বিভাস রে, তুই আমাদের স্কুলের মান বাড়াবি রে!’
একদিন অংক ক্লাস শেষ হলে জ্যোতি আমার কাছে এসেছিল। ক্লাসের সবাই চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে থেকেছিল। জ্যোতি ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বাড়ির মেয়ে হলে কী হবে, ভেতরে ভেতরে দেমাকটা ছিল। যার তার সঙ্গে কথা বলত না জ্যোতি। সামনের বেঞ্চে বসত। ক্লাসে শিক্ষক না থাকলে নির্লিপ্ত চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকত।
সেই জ্যোতি যখন একদিন আমার বেঞ্চির কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল, সহপাঠীরা সবাই আঁতকে উঠেছিল এই বুঝি জ্যোতি বিভাসকে অপমান করে!
জ্যোতি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি অংকে এত ভালো কী করে?’
সমস্ত শরীর শিরশির করে উঠা, মাথার ভেতর আলুথালু অবস্থা- এইসব ব্যাপার তখনো তো আমার মধ্যে তৈরি হয়নি! তবে বুকের নিচে বেশ খুশি খুশি যে লাগছিল না, এমন নয়। কিন্তু জ্যোতির জিজ্ঞাসার উত্তরে কী বলব বা কী বলা দরকার, তা ওই মুহূর্তে ঠিক করতে পারছিলাম না। কিছু না বলে আমি খাতায় পেন্সিল দিয়ে এলেবেলে আঁকছিলাম।
জ্যোতি আমার বাহুতে মৃদু ঠেলা দিয়ে বলেছিল, ‘এই বিভাস, তোমাকে বলছি, শুনতে পাওনি?’
আমি জ্যোতির দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘জানি না। এমনি এমনি।’
‘কী জানো না! কী এমনি এমনি!’ আমার ছন্নছাড়া উত্তর শুনে জ্যোতি বলে উঠেছিল।
আমি বোকা কণ্ঠে বলেছিলাম, ‘কী করে যে কঠিন অংকগুলি হয়ে যায়, জানি না। অংক করতে শুরু করলে এমনি এমনি হয়ে যায়।’
অন্য মেয়ে হলে আমার এরকম খাপছাড়া উত্তর শুনে খিল খিল করে হেসে উঠত। কিন্তু জ্যোতি হাসল না। ভর্তি হওয়ার পর থেকে দেখেছিজ্যোতি শক্ত ধাঁচের মেয়ে। সহজে হাসে না, ক্লাসে বসে সহপাঠিনীদের সঙ্গে হইচইও করে না। খট খট করে কথা বলে। শিক্ষকের ভুল ধরিয়ে দিতে দ্বিধা করে না। রহিম স্যার একদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমাদের ছোটনদী’ পড়াতে গিয়ে বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথের বাবার নাম দ্বারকানাথ ঠাকুর।’
অমনি ফোঁস করে জ্যোতি দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সতেজে বলেছিল, ‘ভুল বলছেন স্যার, দ্বারকানাথ নন, রবীন্দ্রনাথের বাবার নাম দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।’
এরকমই ছিল জ্যোতি। ওইদিন সে আমাকে আরেকটি প্রশ্ন করেছিল, ‘তুমি এত ভালো ছাত্র, পেছনে বসো কেন?’
কেন পেছন বেঞ্চিতে বসি, সেকথা কি আর জ্যোতিকে বলা যায়! চক্কোত্তী স্যার যে এখানে বসতে বলে দিয়েছেন, সেকথা চেপে রেখে চুপ করে থাকলাম আমি।
জ্যোতি বলল, ‘কাল থেকে তুমি সামনের বেঞ্চে বসবে। আমার পাশে বসবে।’
আজকাল স্কুল-কলেজে ছেলেরা-ছেলেরা মেয়েরা-মেয়েরা বসে। আজ থেকে পঞ্চান্ন বছর আগের অজগ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ওরকম বসত না। ছেলেমেয়েরা পাশাপাশি বসে বিদ্যার্জন করত।
এবার আমার অবাক হবার পালা- বলে কী জ্যোতি! পাগল নাকি! মেয়ের পাশে আমি বসব! তাও আবার জ্যোতির পাশে! জমিদার বংশের মেয়ের পাশে!
আমার উত্তরের জন্য জ্যোতি দাঁড়িয়ে থাকেনি। নিজের বেঞ্চিতে ফিরে গেছে।
পরদিন ক্লাসে ঢুকতেই দরজার মুখে আমাকে আটকে দিয়েছিল জ্যোতি। নিজের পাশে জায়গা দেখিয়ে বলেছিল, ‘এখানে বসো।’
আমি ইতস্তত করলে জ্যোতি নামের ফ্রক পরা মেয়েটি আমার হাত থেকে এক ঝটকায় বইখাতা কেড়ে নিয়েছিল। থপ করে হাই বেঞ্চিতে ওগুলো রেখে বলেছিল, ‘আজ থেকে তুমি এখানেই বসবে।’
আমি জড়সড় হয়ে জ্যোতির পাশে বসে পড়েছিলাম। তার জন্য আমাকে খেসারতও দিতে হয়েছিল।
অজিত চক্কোত্তী স্যার ক্লাস নিতে এসে বিমূঢ় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কিছুক্ষণ পর হুঁশে ফিরে বললেন, ‘কী নমুর পোলা রাজকইন্যার পাশে! চাঁদ পাইতে ইচ্ছা করতাছে তোর? বাঁদরের গলায়…।’
চক্কোত্তী স্যারকে আর কথা বলতে দিল না জ্যোতি। হিসহিসিয়ে বলল, ‘আপনি জাত নিয়ে কথা বলছেন কেন স্যার? বিভাস নমু বলে কি মানুষ নয়, আর আপনি চক্রবর্তী বলে কি দেবতা?’
চক্কোত্তী স্যারের চোখ দুটো বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। ওই সময় পেছন দিকের বেঞ্চি থেকে কে একজন হাততালি দিয়ে উঠল। তার দেখাদেখি গোটা ক্লাস হাততালিতে ভরে গেল! চক্কোত্তী স্যারের উপর ছেলেমেয়েরা ক্ষুব্ধ ছিল। কারণে অকারণে ছাত্রছাত্রীদের অপমান করতেন তিনি। আজ সুযোগ পেয়ে ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা হাততালি দিয়ে সেই অপমানের শোধ নিল।

চক্কোত্তী স্যার চাইলে জ্যোতিকে বকাঝকা করতে পারতেন, দু’চারটা বেতেরবাড়িও দিতে পারতেন। কিন্তু ওসবের কিছুই করলেন না তিনি। চুপ করে জ্যোতির দিকে তাকিয়ে থাকলেন শুধু। জ্যোতিকে যে কিছুই করতে পারবেন না চক্কোত্তী স্যার! পাথরের নিচে যে তাঁর এখনো হাত রয়ে গেছে! ক্ষিতীশ চৌধুরী থেকে যে জায়গাটি কিনে তিনি ঘর তুলেছেন, তার যে এখনো রেজিস্ট্রি দেননি জ্যোতির বাপ!
এর পর থেকে ফাইভের বার্ষিক পরীক্ষার আগ পর্যন্ত জ্যোতির পাশেই বসে পড়ালেখা করে গেছি আমি।
জ্যোতি আমার জন্য কত কিছু যে নিয়ে আসতো! ডাঁসা পেয়ারা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলত, ‘আমাদের গাছের।’
কোনোদিন কলাপাতা মুড়িয়ে পাটিসাপটা এনে বলত, ‘আজ সকালে মা বানিয়েছে। খাও।’

এইভাবে একদিন আমাদের প্রাইমারি স্কুল শেষ হলো। জ্যোতি বলল, ‘আমাদের বাড়িতে এসো বিভাস।’
আমি বলেছিলাম, ‘হাইস্কুলে পড়বে না?’
‘আমাদের গ্রামে তো মেয়েদের জন্য হাইস্কুল নাই। দেখি বাবা কী করে!’ বলেছিল জ্যোতি।
ও-ই জ্যোতির সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আমি বিনোদপুর হাইস্কুলে সিক্সে ভর্তি হলাম। হিন্দুপাড়ার রঞ্জনের কাছে শুনলাম- জ্যোতিকে কুমিল্লায় তার মাসির বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওখানেই মেয়েদের স্কুলে পড়বে সে।
তারপর ১৯৬৫-তে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ লেগেছে। পূর্ব পাকিস্তানে দাঙ্গা হয়েছে। অনেক হিন্দু ভারতে চলে গেছে। ক্ষিতীশ চৌধুরীর কাকাতো ভাই তার অংশটি একজন মুসলমানের কাছে বিক্রি করে দিয়ে দেশত্যাগ করেছে। ওই ক্রেতাটি সেই সাম্প্রদায়িক হিংস্রতার সময়ে নিজের অংশটির দখল নিতে এসে গোটা জমিদার বাড়িটিই দখল করে বসেছে। ক্ষিতীশ চৌধুরী এর পর সপরিবারে কোথায় যে হারিয়ে গেছেন, খবর রাখিনি!

একাত্তরের স্বাধীনতার পর পঁয়তাল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে।
আমি ইনকাম ট্যাক্স অফিসের মাঝারি কর্মকর্তা। অনেকের ইনকাম ট্যাক্সের ফাইল আমার টেবিলে। তদবিরের জন্য প্রতিদিন আমার কাছে নানা ধরনের লোক আসে।
একদিন মধ্যবয়সী একজন মানুষ এলেন আমার টেবিলে। সেদিন কাজের খুব চাপ। এক ফাঁকে মাথা তুলে দেখলাম, লোকটি সামনের চেয়ারে বসে আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে আছেন।
হঠাৎ আমার বড় মায়া লাগল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোনো সমস্যা?’
তিনি টেবিলে পড়ে থাকা লাল একটি ফাইল দেখিয়ে বললেন, ‘যদি দয়া করেন!’
আমি ফাইলটি নিয়ে দেখলাম, সামান্য কাজ। টাকার জন্য পিয়ন আমার সামনে দেয়নি। আমি ফাইলটা পাস করে দিলাম।


আরো পড়ুন: গল্প: দায় । হরিশংকর জলদাস


আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, যান। আপনার কাজ হয়ে গেছে।’
তারপরও লোকটি যান না। আচমকা বলেন, ‘আপনি জ্যোতি নামের কাউকে চিনতেন?’
‘জ্যোতি!’ আমি বিহ্বল চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
‘হ্যাঁ। জ্যোতিদি এখনো আপনার কথা বলেন।’
আমার ঘোর তখনো কাটেনি। ঘোরের মধ্যেই আমি বললাম, ‘জ্যোতি! কোথায়!’
লোকটি বলল, ‘আমি অমূল্যরতন। জ্যোতিদির বড়দার শ্যালিকাকে বিয়ে করেছি। জ্যোতিদি এখন খুলনা শহরে থাকে।’
‘তার ফোন নম্বর?’ আমি তখনো সুস্থির হতে পারিনি। পঞ্চাশ বছর আগেকার স্মৃতিগুলো আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
একটা কাগজে জ্যোতির মোবাইল নম্বর লিখে আমার দিকে এগিয়ে দিয়েছিল অমূল্যরতন।

কী কাকতালীয় ব্যাপার! আগামী সপ্তাহে আমি খুলনা যাচ্ছি, অডিটে। আগে থেকেই ঠিক করা আছে আমার সঙ্গে স্ত্রী ও পুত্রটিও যাবে। কাজ শেষে তিনদিন থেকে যাব। ওই তিনদিন সুন্দরবন, ষাটগম্বুজ মসজিদ, খানজাহান আলীর মাজার ঘুরে ঘুরে দেখব।
যথাসিদ্ধান্তে খুলনা গিয়েছিলাম আমরা। দুদিনের অডিটের কাজ।
এক বিকেলে জ্যোতিকে ফোন দিয়েছিলাম।
জ্যোতি বলেছিল, ‘কে?’
আমি বলেছিলাম, ‘বিভাস। বিনোদপুরের বিভাস।’
ওপার থেকে কোনো কথা বলছিল না জ্যোতি। আমি হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছিলাম। বহুক্ষণ পর জ্যোতি ফোঁপানো গলায় বলেছিল, ‘আমাকে কাঁদতে দাও বিভাস। আমি বুক ভরে একটু কেঁদে নিই বিভাস!’
আমি আর কী বলব, চুপ করে থেকেছিলাম।
অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল জ্যোতির সঙ্গে। কোথায় আছি, কেন খুলনা শহরে এসেছি, সঙ্গে কে কে আছে? একের পর এক প্রশ্ন করে গেছে জ্যোতি। উত্তর দিতে দিতে আমার পাগল হয়ে যাবার অবস্থা।
জ্যোতি বলেছে, ‘কাল বিকেলে আমার ছেলে গিয়ে তোমাদের নিয়ে আসবে। রাতে আমাদের বাড়িতে খাবে তোমরা।’ তারপর ঠাট্টা করে বলেছে, ‘বউকে নিয়ে আসবে কিন্তু। দেখি আমার চেয়েও সুন্দরী বউ পেয়েছ কিনা!’
আমি বলেছি, ‘রাতে খেতে পারব না জ্যোতি। অফিসের পক্ষ থেকে ডিনার আছে। ডিনারে এ্যাটেন্ড করা জরুরি।’
‘আচ্ছা বাবা, আচ্ছা। নাস্তা তো খেতে পারবে।’ হাসতে হাসতে বলেছে জ্যোতি।
রাতে স্ত্রী-পুত্রকে বলে রেখেছি, ‘আগামীকাল বিকেলে আমার এক ক্লাসমেটের বাসায় যেতে হবে। পঞ্চাশ বছর পর দেখা হবে জ্যোতির সঙ্গে। আমার প্রাইমারি স্কুলের সহপাঠী।’
পরদিন বিকেলে জ্যোতির ছেলে এসে আমাদের নিয়ে গিয়েছিল। জ্যোতির ছেলেটি আমার ছেলেরই বয়সী, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে।
ছিমছাম দোতলা বাড়ি। উঠান জুড়ে আম-জাম-কাঁঠাল গাছ। দরজা খুলেই আমার ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল জ্যোতি। দুহাত নিজের হাতে নিয়ে বলতে থাকল, ‘সেদিনের সেই পুঁচকে বিভাস কত বড় হয়ে গেছরে! একটু মোটা হয়েছ ঠিক, দিব্য চেহারাটা ধরে রাখতে পেরেছ রে বিভাস!’ যেন শুধু আমি প্রবীণ হয়েছি, জ্যোতি হয়নি!
আমার স্ত্রীর হাত ধরে, পুত্রটিকে জড়িয়ে ঘরের ভেতর নিয়ে গেল জ্যোতি। সাজানো ড্রইংরুমে বসতে দিল। স্বামীকে দোতলা থেকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দিল। স্বামী নবকুমার বাবু স্থানীয় একটা সরকারি কলেজের অধ্যাপক।
তারপর কত কথা! কথার ফাঁকে ফাঁকে নানা ধরনের খাবার পরিবেশন করে যেতে লাগল জ্যোতি।
এক সময় আমার মুখোমুখি বসে পড়ল জ্যোতি। বলে গেল আমার অজানা তার জীবনের বৃত্তান্ত।
টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেছে। এসএসসি ফাইনালের জন্য তৈরি হচ্ছিল জ্যোতি। সাত মার্চের ভাষণের পর দেশে ঝড় উঠল। লন্ডভন্ড হয়ে গেল সবকিছু। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। জ্যোতি মাসির পরিবারের সঙ্গে আগরতলার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিল। কাট্টলিতে আশ্রয় নেওয়া জ্যোতির মা-বাপকে পাকুরা গুলি করে মারল। ভাইয়েরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচল।
মিষ্টি একটু হেসে জ্যোতি বলল, ‘ওই শরণার্থী শিবিরে নবকুমারের সঙ্গে আমার পরিচয়। বরিশাল বাড়ি। কলেজে পড়ছিল তখন। যুদ্ধশেষে দেশে ফিরে আমি ভুলে গেলেও নবকুমার আমাকে ভোলেনি। একসময় বিয়ে হলো আমাদের। খুলনায় পোস্টিং নবকুমারের। সেই সুবাদে এই শহরে গাড়ি-বাড়ি।’
এর মধ্যে খাওয়া হয়ে গিয়েছিল আমাদের। উঠি উঠি করছি, উঠতে ইচ্ছে করছে না। জ্যোতি বার বার বলে যাচ্ছে, ‘আর একটু বসে যাও বিভাস। আবার কখন দেখা হয়! পঞ্চাশ বছর পর দ্বিতীয়বার দেখা হলো।’
আমি হেসে বললাম, ‘একবার যখন খুঁজে পেয়েছি তোমায়, আর হারাতে দেব না। তাছাড়া ফোন তো রইলই। যখন তখন কথা বলা যাবে।’ ঘড়ি দেখলাম, ডিনারের সময় হয়ে গেছে। আমি জ্যোতিকে তাড়া দিলাম, ‘এবার আমাদের সত্যিই ছেড়ে দিতে হবে জ্যোতি।’
জ্যোতি অদ্ভুত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘তোমাকে ছাড়তে যে ইচ্ছে করছে না বিভাস!’ যেন পাশে তার পুত্রটি নেই, যেন স্বামীটি নেই, যেন আমার পাশে আমার পুত্র-পরিবার নেই। সবকিছু ভুলে জ্যোতি আমার দুটি হাত তার হাতের মুঠোয় ভরে নিল। তারপর গাঢ় কণ্ঠে বলল, ‘সবকিছু ঠিক থাকলে আমি তোমাকেই তো বিয়ে করতাম বিভাস!’
পলকে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালাম আমি, দেখি সুমিত্রার চোখমুখ বিষণ্ণতায় ছাওয়া আর নবকুমারবাবু মিটিমিটি হাসছেন।
রাস্তার মাথা পর্যন্ত এগিয়ে দিল জ্যোতি। বারবার বলতে লাগল, ‘ফোন করো বিভাস। তোমার সঙ্গে আমার আবার দেখা হওয়া চাই। মরার আগে অন্তত একবার!’
না, জ্যোতির সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। ফোনে কথা হয়েছে কয়েকবার। যতবারই ফোন করেছে জ্যোতি, বলেছে, ‘তোমার সঙ্গে দেখা করতেই আমি চিটাগং আসব। তুমি খুলনায় এসো বিভাস।’
তারপর এক সময় ফোন করাকরি কমে এসেছিল। চাকরি থেকে রিটায়ারমেন্টে গেছি আমি। পরিবার গুছাতে গুছাতে কখন বছর তিনেক পার হয়ে গেছে!
এর পর এলো করোনার কাল। বিষাদের রাত্রি! নিরন্নের দিন। দহনের কাল। হাজারে লক্ষে মানুষ মরছে। গৃহের অভ্যন্তরে মরণের ভয়ে মাথা গুঁজে বসে আছি।
এই বিপন্ন সময়ে হঠাৎ এক দুপুরে আমার জ্যোতির কথা মনে পড়ে গেল। আমি পড়িমরি করে মোবাইল হাতে নিলাম।
বললাম, ‘হ্যালো! হ্যালো জ্যোতি!’
ওপার থেকে পুরুষকণ্ঠ ভেসে এলো, ‘কে আপনি? কাকে চাইছেন?’
আমি বললাম, ‘আমি বিভাস। জ্যোতি কোথায়! তার সঙ্গে কথা বলতে চাইছি!’
পুরুষ কণ্ঠ বলল, ‘ও, বিভাসদা! জ্যোতি তো নেই!’
আমি বললাম, ‘নেই! নেই মানে!’
নবকুমারবাবু বললেন, ‘চারদিন আগে জ্যোতি মারা গেছে। করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল। বাঁচাতে পারিনি।’ বলে ছোট শিশুর মতো চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন নবকুমার।
নবকুমার তো কেঁদে বুক হালকা করছেন, আমি কিভাবে বুক হালকা করব? এই মুহূর্তে আমার বুক ছাপিয়ে দুচোখ ভাসিয়ে যে কান্না আসছে না!

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত