তৃতীয় বিশ্বের জনগণের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব

হেগেল তাঁর The Philosophy of Right গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, বুর্জোয়া সমাজের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের জন্য একদিকে সম্পদের অতি পুঞ্জীভবন এবং অপরদিকে ক্রমবর্ধমান দরিদ্র জনগোষ্ঠী দায়ী। সুতরাং, এ সমস্যার সমাধান হতে পারে ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী পন্থায়।

হেগেলের মতো ধনকুবের সেসিল রোডসও বিশ্বাস করতেন, দেশের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধ এড়াতে সাম্রাজ্যবাদ বা উপনিবেশবাদই হতে পারে একমাত্র সমাধান। বৈরি সামাজিক সম্পর্কের উদগাতা পুঁজিবাদ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পরিসরে পুঁজিপতি ও নির্যাতিত শোষিত শ্রেণীর মধ্যে দ্বাদ্ধিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। পুঁজিবাদ তার অন্তর্নিহিত শ্রেণী বৈষম্যের নিয়মকে উপেক্ষা করতে পারে না। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ হিসেবে তা রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সংঘাত টিকিয়ে রাখে। বৈশ্বিক পুঁজির বিস্তার রক্ষা করতে গিয়ে এসব সংঘাতের জন্ম। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার সার্বিকীকরণ করতে গিয়ে যে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের উদ্ভব, তা-ই এখন কেন্দ্র ও প্রান্তের দ্বন্দ্বের সৃষ্টির প্রাথমিক অন্তর্নিহিত উপাদান হিসেবে কাজ করছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে এ দ্বন্দ্ব সবচেয়ে প্রখর হয়ে উঠেছে।

নব্য-উদারবাদী বিশ্বায়ন ও গ্যাট চুক্তি কার্যকর করার পর বৈশ্বিক অসমতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। ধনিক কল্যাণে নিবেদিত নব্য-উদারবাদী বিশ্বায়ন ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর পরই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধনীদের মোট পরিসম্পদ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বিশ্বের উৎপাদন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও এ উৎপাদনের সুফল ভোগ করেছে স্বল্পসংখ্যক ধনাঢ্য ব্যক্তি, সাধারণ মানুষের গড়পরতা আয় বৃদ্ধি পায়নি। এ অসম বিশ্বব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী ও সর্বোচ্চ সুবিধাবঞ্চিতের মধ্যকার পর্বতপ্রমাণ ব্যবধান কখনোই নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্বময় এ অসম সমাজকাঠামো টিকিয়ে রাখা হয় ফ্যাসিবাদী বা প্রাধিকারবাদী শাসনব্যবস্থা তৈরি করে। এ ধরনের কর্পোরেটবাদী শোষণকাঠামো ও কৌশল দেশে দেশে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংকট সৃষ্টি করে। সাধারণত উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে এ ধরনের সংকট মোকাবেলার উদ্যোগ নেয়া হয়। বিদ্যমান শ্রমবাজার ও শিল্পনির্ভর নীতিমালা রক্ষার জন্য উদারবাদী সংসদীয় গণতন্ত্র প্রায়শ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজে স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের দাবি জানায়। নতুন আঙ্গিকে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিতে সংসদীয় ও আমলাতান্ত্রিক শাসন টিকিয়ে রাখা খুবই জরুরী। বহুত্ববাদী সাধারণীকরণের নামে কর্পোরেট স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এ ধরনের প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখে। এভাবে গণতন্ত্রায়নের মধ্য দিয়ে বাজার অর্থনীতির সামাজিকীকরণ ঘটে। পুঁজিবাদী যুক্তি অনুযায়ী, গণতন্ত্র সামাজিক প্রগতির পরম শর্ত। পূর্ব ও দক্ষিণের দেশগুলো যাদের জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন অত্যন্ত ব্যয়বহুল তারা এ ধারণাটি নির্বিচারে গ্রহণ করেছে খুব বেশিদিন আগে নয়। পুঁজিবাদী বিশ্বে এ আনুষ্ঠানিক মতবাদটি শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এ শাসকগোষ্ঠীই আবার লাতিন আমেরিকায় সামরিক একনায়কতন্ত্র ও আফ্রিকায় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে যুক্তিসিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে।

গণতন্ত্র একটি আধুনিক ধারণা। আর আধুনিক যুগের ইতিহাস হচ্ছে পুঁজিবাদের ইতিহাস। তাই আধুনিক যুগে গণতন্ত্রের ধারণাটিও পুঁজিবাদী শাসক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী চক্রজালে বন্দী। ইতিহাসের বস্তুবাদী দর্শন আমাদের এই শিক্ষাই দেয়। সুতরাং, সাম্প্রতিক সময়ের গণতন্ত্রের আদর্শটি উন্নত পুঁজিবাদী শাসক শ্রেণীর মতাদর্শিক হাতিয়ার। উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বকে দেখা গেছে, তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে প্রত্যাখ্যান করতে। ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়া, ১৯৬২ সালে ডোমিনিকান রিপাবলিক, ১৯৭৩ সালে চিলি, ১৯৯০ সালে হাইতি ও সাম্প্রতিককালে মিশরের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি গণতান্ত্রিক সরকারকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করা হয়। বিপরীতক্রমে, মার্কিন আগ্রাসনের পর ডোমিনিকান রিপাবলিক ও গ্রানাডা, মার্কোস শাসনাধীন ফিলিপাইন, ১৯৮৮ সালে মেক্সিকো ও ১৯৯৪ সালের এল. সালভাদরের প্রহসনমূলক নির্বাচনকে প্রধান পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক বলে ঘোষণা দেয়। এ বৈপরীত্যই পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বরূপটি উন্মোচন করে। এ গণতন্ত্র তৃতীয় বিশ্বের জনগণের আশা-আকাংখার প্রতিফলন নয়, বরং কর্পোরেট নির্ভর বাজার স্বার্থের রক্ষক। তাই বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্রের নামে তৃতীয় বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে আমদানি উদারিকরণ নীতি, অহেতুক ঋণের বোঝা, মুদ্রার ভাসমানতা, উচ্চ সুদের হার,অধিক হারে ব্যক্তি মালিকানাকরণ প্রভৃতি শোষণমূলক ব্যবস্থা।

আজকের দিনে কর্পোরেটবাদ কোনো সুবিন্যস্ত সামাজিক, রাজনৈতিক বা নীতিদর্শন অনুসরণ করে না। কারণ এসব কর্পোরেট এজেন্ডা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন ও বিদ্যমান বৈষম্যমূলক শ্রেণী কাঠামোকে টিকিয়ে রাখায় ব্যাপৃত। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে অন্তত তিনটি ধাপ রয়েছে। প্রথমত, পুঁজিবাদী ব্যক্তিগত সম্পত্তির ব্যবস্থাকে পুনরায় নীতিসিদ্ধকরণ এবং একে অধিকারের মতো সামাজিক বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে নিয়ে আসা। দ্বিতীয়ত,প্রলেতারিয়েতদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি ও সহিংস হবার পথে বাধা তৈরির জন্য সামাজিক অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে শ্রমিকের কর্তব্যের দিকটিও যুক্ত করা হয়। তৃতীয়ত, বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে উভয়কেই কর্পোরেশনের ক্রিয়া-কলাপের সাথে সাংগঠনিকভাবে সম্পৃক্ত করা। এতে তাদের উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা গড়ে ওঠে এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা রক্ষা করা সহজ হয়।

বিশ্বময় পুঁজির চলাচল অবাধ ও নিরাপদ রাখার জন্য এসব পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজি ও শ্রমের দ্বদ্বকে আড়াল করার জন্য ট্রেড ইউনিয়নের কর্পোরেটকরণের মাধ্যমে স্পেন, পর্তুগাল ও লাতিন আমেরিকায় এক ধরনের প্রাধিকারবাদী কর্পোরেটবাদ গড়ে তোলা হয়েছিল। এ ব্যবস্থায় জনপ্রিয় সামাজিক শক্তিগুলোর অংশবিশেষের সহায়তায় অসমতাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। অসম প্রবৃদ্ধি শ্রমিক ও সম্পত্তিমালিকের ব্যবধানকে তীব্র করে তোলে এবং বিচ্ছিন্নতার সমস্যাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। তাদের সৃষ্ট এ নব্য সমাজে পুঁজি ও সম্পত্তি মালিকানা অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমের প্রতি ক্ষতিকারক উপাদানগুলোর প্রভাব বাড়তে থাকে, মানুষ চাকুরীর নিরাপত্তা হারায়, দারিদ্রীকরণের প্রবণতা বেড়ে চলে এবং একটি বিপুল জনগোষ্ঠী সামাজিক বঞ্চনার শিকার হয়।

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত