| 28 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

এক ফালি চাঁদ

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

নবীনবাবু পাশ ফিরে শুলেন। এখন রাত বারোটা। তাঁর বাড়ির সামনে দিয়ে বিসর্জনের শোভাযাত্রা চলেছে। মাইক নৃত্য আর বাজির ত্র্যহস্পর্শ। ঘুমেরও বারোটা। যদিও তাঁর ঘরটি একতলা বাড়ির একেবারে পেছনের দিকে। সামনের রাস্তার দিকের পুবমুখো ঘরগুলোতে ছেলেরা থাকে। সদর রাস্তাটাও ওই পূবে। তাঁর ঘর পশ্চিমের বাগান লাগোয়া। মানে ওকে যদি বাগান বলা যায় তবেই। চারটি সুপুরি নারকোল গাছ আর আগাছার জঙ্গলে ভরা ওই জমিটুকু সকলে বাগান বলে। তিনিও তাই বলেন। কিন্তু এতটা ভেতরে ঘর হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঘুমোতে পারছেন না। কানফাটানো আওয়াজে অগত্যা উঠে পরলেন। টেবিলে রাখা জলের বোতল টেনে নিয়ে দু ঢোঁক জল খেলেন। বসে বসে অবিনাশ ডাক্তারের পরামর্শ মতো ব্রিদিং এক্সারসাইজ করলেন। ওতে মনটা শান্ত হয়। ব্লাড প্রেসার কমে।  কিন্তু ওই অবস্থাতেই একটা প্রবল শব্দে তিনি খাট থেকে ছিটকে লাফিয়ে মেঝেতে নামলেন। নাহ, এভাবে ঘুম হয়না। কি এক পূজোর ভাসান বোধ হয় ছেলেগুলো বিকট সব বোম ফাটাচ্ছে। দিনকাল যা, কিছু বলাও যায়না। তিনি উঠে গিয়ে বাগানের দিকের জানলা দুটো খুলে দিলেন। উত্তরের জানলা দুটো বন্ধ করে দিলেন। যাহোক একটু আওয়াজ তো কমবে! তারপর চেয়ারটা টেনে নিয়ে জানলার কাছে এসে বসলেন। একটু ফ্রেস এয়ারই সই, ঘুম তো অসম্ভব।

   জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে ঘন অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনা। কিন্তু নবীনবাবুর চোখে এসে লাগল এক উজ্জ্বল সাদা আলো। সে আলো এমন তীব্র রূপোলী যে নবীনবাবু একটু হকচকিয়ে গেলেন। তাঁর ওই বাগানের পর চক্রবর্তীদের পোড়ো ভিটে। সেখানে দিনে দুপুরেও কেউ যায়না। লোকে বলে – ভুতের ফ্যাক্টরি। চারটি চামচিকে আর ভামবেড়ালের বাসা। কবে যে ওদের শরিকে শরিকে বিবাদ মিটবে! ততদিন অবশ্য নবীনবাবুর এই প্রকৃতির শুদ্ধ পরশ পাওয়া চলতেই থাকবে। কিন্তু এমন তীব্র আলো কি করে আসছে? তবে কি চোরডাকাতের উপদ্রব হল নাকি? নবীনবাবু এমনিতে বেশ সাহসী লোক। শীতের কাকভোরে একা একা মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে পরেন। কিন্তু এখন একটু গা ছমছম করে উঠল। কি জানি বাপু কারা এসেছে! তিনি চশমাটা নাকের ডগায় এঁটে ভালো করে চাইলেন। ওমা! কি কাণ্ড! তাঁর বাগানের ওই সুপুরি নারকেলের জঙ্গলে, গাছের গোড়ায়, যেখানে এসময়ে ঝুঁজকো আঁধার জমে থাকে, ঠিক সেইখান থেকেই ওই রূপোলী আলোটা আসছে যে। তিনি ঠাহর করে দেখলেন একটা খুব বড় গোলাকার রূপোলী জিনিস সেখানে পড়ে আছে। জিনিসটা যেন আলো দিয়েই তৈরি। ওটা কি তবে? তবে কি চাঁদ? তিনি মূর্ছিত হলেননা বটে, কিন্তু ভীষণ অবাক হলেন। কাউকে ডাকতে গেলেন, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলনা। হাত উঠিয়ে জলের বোতলটা নিতে গেলেন, কিন্তু হাত নাড়তে পারলেন না। ভাবলেন ছাতে গিয়ে একবার দেখলে হয়। চাঁদ কি আকাশে সত্যিই নেই? কিন্তু এত রাতে ওভাবে ছাতে যাওয়াটা ঠিক নয়। ছেলেপিলে সারাদিনের পর ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে। দরজার আওয়াজে উঠে পড়বে। তিনি বসে পরলেন।  

   বাড়ির সকলে তখন গভীর ঘুমে। নবীনবাবু চেয়ারে স্থাণু হয়ে বসে আছেন। খানিক ধাতস্থ হয়ে ভাবছেন, চাঁদ যদি এমন করে আকাশ থেকে ভেঙে পড়ে তবে তো ভারী একটা দুর্যোগের আশঙ্কা! কে কবে শুনেছে যে আকাশে চাঁদ নেই! ঘুরতে ঘুরতে সে কি কখনও মাটিতে পড়েছে? তিনি তো চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন চাঁদকে! বেচারা ভেঙে যে পড়েছে সে তো সত্যি! নীচের দিকে কাস্তের মতো এক ফালি অংশ ভেঙে গিয়েছে চাঁদের। কেমন যেন মুখ থুবড়ে পড়েছে মনে হয়। আহা! নবীনবাবুর বড্ড দুঃখ হল। তিনি একদৃষ্টে চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ভারী মায়া জাগছে তাঁর। সত্যিই কি সুন্দর! এই জন্যই তো সেকালে মেয়েদের নাম রাখা হতো চন্দ্রমুখী। তাঁর দিদিমার নাম ছিল। তাঁর ঠাকুমার নাম ছিল জ্যোৎস্নাময়ী। এসব ভারিক্কি নামের পাশাপাশি তাদের বাড়ির সেই ঝিকেও মনে পরল তাঁর। নাম ছিল পূর্ণিমা। তাঁরা ছোটরা ডাকতেন পুনিদিদি। ঠাকুমা ডাকত পুন্নিমে। সে যদিও চাঁদের মতো ফর্সা ছিলোনা, কিন্তু স্বভাবটা ছিল খুব শান্ত আর মিষ্টি। নবীনবাবু যে একটু আধটু জ্যোতিষ চর্চা করেছেন তাইতে তিনি তো জানেন যে চন্দ্রের প্রভাবেই জাতক বা জাতিকা অমন শান্ত ও মিষ্টি স্বভাবের হয়! দিদিমাও তত রাগী ছিলেননা। একটু বেশিরকম অভিমানী ছিলেন। আর ঠাকুমা? তাঁর নাম সূর্যমুখী হলেই বোধ হয় ভালো হতো। এইসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে তাঁর মনে পরল তিনি নিজের ছেলেপুলেদেরও তো ছোটবেলায় আদর করতে গিয়ে কতবার ‘চাঁদের কণা’ বলেছেন। আর আজ কিনা তাঁর বাগানেই ওই চাঁদ! প্রাথমিক হতভম্ব ভাব, ভয় বিস্ময় কাটিয়ে নবীনবাবু ধীরে ধীরে মনের মধ্যে বেশ একটা আনন্দ বোধ করছেন। এত রাতে লোক ডাকাডাকি ঠিক নয়। সকাল হোক। তখন নয় সবাইকে দেখাবেন চাঁদ তাঁর বাগানে ভেঙে পড়েছে। এখন বেচারা জখম হয়েছে। মুখে কিছু না বললেও নিশ্চয় বেদনা অনুভব করছে। সকাল হোক। ততক্ষণে যদি ওর কষ্টটা একটু কমে।

   চাঁদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে নবীনবাবুর চোখে কেমন যেন ঘোর লাগছিল। তিনি কি সম্মোহিত হয়ে পড়ছেন? এইরকম ভাবনা মাথায় আসতেই তিনি দেখলেন গাছের গোড়ায় চাঁদটা যেন একটু নড়ে উঠল। নবীনবাবু কান পাতলেন। তাঁর মনে হল খুব অস্পষ্ট সুরেলা একটা শব্দ যেন তিনি শুনতে পেলেন। ঠিকই! চাঁদের দিক থেকেই সুরটা আসছে। তিনি শুনতে পেলেন কেউ যেন বলছে – এখানে ভেঙে পড়ে গেছি। সেরে উঠতে দুটো দিন লাগবে। ওই ভাঙাটুকু ভরে যাবে। তখন আবার চলে যাবো। এই দুটো দিন সবুর করো বাপু। কাউকে কিছু বোলোনা। নবীনবাবু এই সুর চেনেন। তাঁর মামার বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদে। তাঁর দিদিমা এরকম সুর করে কথা বলতেন। মিষ্টি শোনাত। ভারী ভালো লাগল। বারবার অতীতে ফিরে যাচ্ছেন দেখে নিজেকে শাসন করলেন। এখন যে সমস্যাটা হয়েছে সেটা কম নয়! এত বড় ঘটনাটা তাঁকে গোপন করতে হবে। যাই হোক, তিনি খুব আস্তে আস্তে, ফিসফিস করে বললেন – না, কাউক্কে বলবো না। কিন্তু সকাল হলেই তো সকলে দেখতে পাবে! তখন? চাঁদ যেন ফিক করে হাসল। এরকম ফিক করে হাসি হাসত তাঁর প্রয়াত স্ত্রী। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিন্তু ভালোও লাগল। বহুদিনের ওপার হতে যেন কেউ ফিরে এসেছে। আবার সুরেলা স্বর ভেসে এলো। “তুমি যেমন ভাবছ সকালবেলাতেই লোকে জানতে পারবে, তা নয়। পারবে রাত্তির বেলা। আর একটা রাত কাটলেই তো আমি আবার আকাশে চলে যাবো। দোহাই তোমার, কাউক্কে বোলোনা। দুটো দিন এখানে জিরিয়ে নিই বরং।”

   ওদিকে রাতের ঘন অন্ধকার সরে আস্তে আস্তে আকাশে নীলের আভা লাগছে। নবীনবাবু রোজ মর্নিং ওয়াকে যান। তিনি এরকম সময়ে রোজই ওঠেন। তাই বুঝতে পারলেন আরেকটু পরই ভোর হবে। রেডি হবার আগে জানলা দুটো বন্ধ করে দেবেন তিনি। নাহলে কেউ যদি দেখতে পায় তবে মুশকিল। বেশি ভয় বিচ্ছু নাতিটাকে নিয়ে, আর আরতিকে নিয়ে। আরতি তাঁর ঘর ঝারতে মুছতে এসে সব লক্ষ করে। লুকিয়ে কিচ্ছুটি রাখার জো নেই। দানাদার কি ক্যাডবেরি লুকিয়ে রেখেছেন, ঠিক দেখবেন সেটি নাতির হাতে। সে আবার মজা করে বলবে – দাদু তোমার ওসব খাওয়া বারণ নয়? দাঁড়াও ডাক্তারদাদুকে বলে দেবো। তিনি রাগতে পারেন না। হাসি পেয়ে যায়। জিজ্ঞেস করেন – কোথায় পেলে এসব দাদুভাই? সে আঙুল দিয়ে কর্মরত আরতিকে দেখিয়ে দেয়। আরতি চোখ পাকিয়ে বলে – কাকাবাবু, তোমায় বলেছি এত বাজে বাজে মিষ্টিগুলো খেওনা। দোকানে সুগার সন্দেশ পাওয়া যায় তো। কিনতে পারো না? তিনি কিছু না বলে ঘরে চলে যান। সেই সব দিন খেতে বসে দেখতে পান বউমা নিজের হাতে ঘরে সুগার ফ্রি দিয়ে দই পেতেছে। সন্দেশ বানিয়েছে। মিষ্টি হেসে বলে – বাবা আমি করেছি। শুদ্ধু আপনি খাবেন। দেখুন তো কেমন হয়েছে? তাঁর ভালোই লাগে। এখন তিনি জানলাটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখলেন চাঁদটা কেমন ফিকে হয়ে এসেছে। গায়ের তীব্র রূপোলী আলোটা যেন কেমন মিইয়ে গেছে। চাঁদের হাসি যে শোনা যায় সে তিনি আগে জানতেন না। এই প্রথম শুনলেন। চাঁদ বলল – আ মরণ! ভোরের আলোয় আমার রং ফিকে হবেনা? এবার তো রবিমামা দেবে হামা গায়ে রাঙা জামা ওই। তার খিলখিল হাসিতে নবীনবাবুর মন ভরে গেলো। তিনি রেডি হয়ে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে গেলেন।

           মর্নিং ওয়াকের বন্ধুদের বেশ একটা দল আছে তাদের। একসঙ্গে হেঁটে হেঁটে বড় কারখানার পাঁচিলের পাশ দিয়ে সেই রেললাইনের ধার অবধি হেঁটে যান তাঁরা। বেশ লাগে। দুধের গাড়ি কাগজের সাইকেল সব পাশাপাশি যায়। রাস্তায় জল দিয়ে রাস্তা ধুয়ে চায়ের দোকান মিষ্টির দোকানদার ঝাঁপ খোলে। চায়ের দোকানী উনুনে আঁচ দেয়। কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া আকাশে ওড়ে। তিনি এসবই দেখতে ভালোবাসেন। কয়েকজন অতি উৎসাহী আছে, তারা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে পড়ে। চা খেতে খেতে পাশের মিষ্টির দোকান থেকে গরম কচুরী জিলিপির অর্ডার করে। অবিনাশ বাবু ডাক্তার। তিনি গম্ভীর স্বরে বলেন – এসব হাঁটাহাঁটির কি দরকার? সকালেই ওই অখাদ্যগুলো গিললেন? লেদের কারখানার মালিক অজয়বাবু হ্যাহ হ্যাহ করে হেসে ওঠেন। “এক পিস জীবন, ডাক্তারবাবু, খেয়েপরে কাটিয়ে দিতে পারলেই হল। হাঁটাহাঁটি তো এই আপনাদের সঙ্গে আড্ডা দেবার জন্য। স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে কিহবে? অমর হবার চান্স নেই এ জীবনে।” নবীনবাবু এসব কূটতর্কে যোগ দেন না। তিনি কচুরিও খান না অবশ্য। ওসব বউমারা বাড়িতেই বানায়। কচুরি খেয়ে শেষে অবিনাশবাবুর শরণাপন্ন হতে হবে। ব্যাস, তাহলেই গোপন কথাটি রবেনা গোপনে। আজ তিনি কোনও কথায় কান দিতে পারছিলেন না। অস্থিরতা টের পাচ্ছিলেন। তাই হাঁটতে হাঁটতে রিটায়ার্ড অধ্যাপক তপনবাবুর কাছে চলে এসেছেন। এদিক সেদিক করে তাঁকে জিজ্ঞেস করে ফেললেন – আচ্ছা তপনবাবু, চাঁদ যে আকাশে থাকে সে কি কোনও সুতো টুতো দিয়ে বাঁধা থাকে? না, মানে এমনই এমনই ঝুলে থাকে কি করে? সচরাচর এমন শক্ত শক্ত প্রশ্ন নবীনবাবু করেননা, তপনবাবু চমকিত হলেন। “বলেন কি মশাই! আপনি কি নেট ফেট ঘাঁটছেন নাকি আজকাল? বেড়ে কোয়েশ্চেন করেছেন তো? ব্যাপারটা কিন্তু অবিকল তাই! বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে একটা অদৃশ্য সুতোর জাল আছে কিন্তু। সেখানেই ওই গ্রহ তারা বা সেলেস্টিয়াল বডি যাকে বলে, সেগুলো ঝুলে থাকে।” তপনবাবু আরও অনেক কঠিন কঠিন কথা বললেন। স্টিফেন হকিং বলে এক নাকি অসুস্থ কিন্তু বিখ্যাত বিজ্ঞানী আছেন, তাঁর লেখা বইয়ে এসব প্রাঞ্জল করে দেওয়া আছে। নবীনবাবু অত বুঝলেন না। তিনি ফোঁস করে বলে বসলেন – আচ্ছা, সুতো ছিঁড়ে পড়তেও তো পারে? তপনবাবু হাহা করে হেসে উঠলেন। তারপর নবীনবাবুর পিঠ চাপড়ে বললেন – অতটা এখনও এগোয়নি মশাই। গবেষণা চলছে। তবে আপনার এই ব্যাপারটা কিন্তু আমার দারুন লাগল। আসলে কার মধ্যে যে সুপ্ত বিজ্ঞানী আছে সে কেউ টের পায়না।

   নবীনবাবুকে বাড়িতে টুকটাক কাজ করতে হয়। ছেলেরা সারাদিন অফিস করে আর সময় পায়না। শুনতেই কলকাতার কাছে মফস্বল শহর। গ্রেটার কলকাতা। আসলে অফিস যেতে আসতে অনেকটা সময়। তিনি দোকান বাজার, ইলেকট্রিকের বিল, টেলিফোনের বিল, নাতিকে ইস্কুলে দিয়ে আসা, ইত্যাদি কাজকর্মগুলো করে থাকেন। খারাপ লাগেনা। তবে ছেলেদের বারণ, সন্ধ্যের পর রাস্তায় একা বের হন না। সন্ধ্যের পর তিনি বৈঠকখানায় বসে টিভি দেখেন। কোনও সিরিয়াল তিনি দেখেন না। ভালো লাগেনা। মাঝেমাঝে আরতি এসে জিজ্ঞেস করে – ও কাকাবাবু, একটু দেখোনা, ওপাশে সিংগি বাড়ির বউটা ফিরল কিনা। উনি চ্যানেল এক মিনিটের জন্য ঘুরিয়ে ফের ডিসকভারি হিস্ট্রি ইত্যাদিতে নিয়ে ফ্যালেন। এখন রেগুলার হিস্ট্রি চ্যানেলে এলিয়েনদের নিয়ে সিরিজ দেখে চলেছেন। তাঁরও বিশ্বাস জন্মেছে মনে, এলিয়েনরা আমাদের থেকে অনেক চালাক। একদিন তারা এসে ঠিক আমাদের মাথায় আরও বুদ্ধি ভরে দেবে। আজও বসেছেন ঠিক। সারাদিনে এক আধবার উঁকি দিয়ে এসেছেন জানলার কাছে। না, দিনের আলোয় চাঁদকে দেখা যাচ্ছেনা। তিনি নিশ্চিন্ত। একবার উঁকি দিতে গেলেন। কিচ্ছু দেখা গেলনা। তবু বললেন – বেশ শুয়ে আছ তো! খিলখিল আওয়াজে ফিরে দেখলেন নাতিটি। বলল – কি দাদু? কার সঙ্গে একা একা কথা বলছ? তিনি অপ্রতিভ হয়ে ফিরে এলেন।

   মর্নিং ওয়াক সেরে দোকান বাজার করে জল খাবার খেলেন নবীনবাবু। এবার নাতিকে ইস্কুলে নিয়ে যেতে হবে। জল খাবার খেতে খেতে টেবিলে বসে তিনি বউমাকে ডাকলেন। আর কথাটা চেপে রাখা যাচ্ছেনা। বললেন – শোনো একটা কথা। জানো কাল রাতে পেছনের বাগানে চাঁদ ভেঙে পড়েছে। বেচারার বড্ড লেগেছে। একটু ভেঙেও গেছে। বউমার তো চোখ গোল হয়ে গেছে। “বাবা! কি বলছ কি?” কিন্তু বউমা, মানে তনুশ্রী, খুব বুদ্ধিমতী। সে চট করে ভেবে নিলো যে বাবার হয়ত ছোট খাট স্ট্রোক ফোক হয়ে থাকবে। এরকম ভুলভাল কথা তখনই বলে লোকে। যাই হোক। রাত অবধি অপেক্ষা করা যাক। ছেলেরা ফিরলে বলা যাবে। সে একবার সন্দিগ্ধ চোখে নবীনবাবুকে দেখে বলল – বাবা একটু বিশ্রাম নাও তো। সারাটা দিন টই টই। আমাদেরও অন্যায়। তোমার বয়স হয়েছে, আর দোকান বাজার সব করানো, নাহ আর নয়। এই আরতি” বলতে বলতে বউমা বাকি কাজের কথাগুলো আরতিকে বলতে গেলো। নবীনবাবু বুঝলেন, বিপদ। এত কিছু না বললেই ভালো হতো তো।

   সন্ধ্যের পর জানলার ধারে বসে নবীনবাবু দেখলেন চাঁদ জ্বলজ্বল করছে। তবে কেমন যেন অভিমানী লাগল। দিদিমার মতো। তিনি বললেন – রাগ করেছ নাকি? বড্ড ভুল হয়েছে আমার। চাপতে পারলাম না কথাটা। চাঁদ আবার সেই ফিকফিক করে হাসল। “স্বভাব কি মলেও যায় গো? জানি ঠিক কাউকে না কাউকে বলে ফেলবে। আজকের রাতটুকু ধৈর্য ধরো। কাল আর সমস্যা নেই, বুঝলে?” নবীনবাবু ঘাড় নাড়লেন। “আচ্ছা তুমি তো কাল আকাশে চলে যাবে, তাই না? ইশ বাগানটা আবার খালি খালি হয়ে যাবে। অন্ধকার একেবারে।” নবীনবাবুর গলায় দুঃখ ঝরে পরল। চাঁদের সেই সুরেলা গলা – আমার জন্য মন খারাপ করছ নাকি? এই মানুষগুলোর বড্ড মায়া। দেখো দিকি, আমি কি আকাশে যাবনা? যাকগে, মন খারাপ কোরোনা। তোমার জন্য আমি আমার ভাঙা ফালিটুকু এইখানে রেখে যাবো। তুমি তোমার কাছে রেখো। নবীনবাবু আনন্দে ডগমগ হয়ে গেলেন। চাঁদের কণা! আজ রাতে আর এসব কথা কাউক্কে তিনি বলবেন না। রেখে দেবেন নিজের মনে। কাল রাতে চাঁদ আবার আকাশে। তিনি বৈঠকখানায় এসে টিভিটা চালিয়ে দিলেন।

   ছেলেরা বাড়ি ফিরে এসেছে। এখন একবার খবর দ্যাখে সবাই। আধঘণ্টা মতন। তারপর আবার টিভি নবীনবাবুর হেফাজতে। কিন্তু একি! খবরে কি বলছে! বলছে আজ চন্দ্রগ্রহণ। পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ। সারারাত আকাশে চাঁদ দেখা যাবেনা। তিনি দেখলেন বউমা তাঁর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। ছেলে এই ফাঁকে একবার গম্ভীর গলায় বলে উঠল – বাবা তুমি প্রেসারের ওষুধ ঠিক করে খাচ্ছ তো? কাল সকালে মর্নিং ওয়াকে যেও না প্লিজ। কাল তোমাকে একটু ডাক্তার দেখিয়ে আনি। তারপর। নবীনবাবু আর ভয় পেলেন না। একটা দিন নয় নাই গেলেন মর্নিং ওয়াকে।

   গভীর রাতে তিনি শেষ বারের মতো চাঁদকে দেখবেন বলে জানলা খুললেন। বাঃ কি অপূর্ব! পূর্ণচন্দ্রের কি শোভা! তাঁর বাগান আলোয় আলো হয়ে গেছে। কিন্তু আজ চাঁদ যেন নড়াচড়া করছে। আহা সেরে গিয়েছে যে! কিন্তু চাঁদ হঠাৎ ছোট্ট একটা লাফ দিলো। সেই লাফে সে নারকেল গাছের মাথায় চড়ে বসল। নবীনবাবু ভয় পেলেন। আবার পড়ে যাবে যে! কিন্তু না। আবার একটি লাফ। চাঁদ আকাশে। নবীনবাবু খিলখিল হাসি শুনতে পেলেন। কিন্তু মনটা ভার হয়ে গেলো। তিনি জানলা বন্ধ করে শুয়ে পরলেন।

   সকাল হলে তিনি আর মর্নিং ওয়াকে গেলেন না। বউমা নাতিকে ছেড়ে দোকানপাট সেরে বাড়ি ফিরবে। আরতির জিম্মায় তাঁকে রেখে গিয়েছে। তিনি আস্তে আস্তে খিড়কির দুয়ার খুলে বাগানে বেরিয়ে এলেন। দেখা যাক, সত্যিই এক ফালি চাঁদ তাঁর জন্য পড়ে আছে কিনা। কিন্তু তিনি খুব হতাশ হলেন। কিচ্ছু নেই কোথাও। গাছের গোড়ায় অন্ধকার। যাকগে, কি আর করা। স্বপ্নের মতো মিথ্যে বলেছে চাঁদ তাঁকে। ফিরে আসবার আগে তিনি ভাবলেন দু চারটে সুপুরি কুড়িয়ে নেবেন। পাকা সুপুরি কত যে পড়ে থাকে ওখানে গাছের তলায়। নীচু হয়ে বসে সুপুরি কুড়োতে গিয়ে তিনি হাতে একটা কিসের শীতল স্পর্শ পেলেন। জঙ্গলের মধ্যে নেড়েচেড়ে হাতের মধ্যে একটা কিছু টের পেলেন। তুলে এনে দেখলেন একটা কাস্তে। একটা কাস্তে? ভালো করে লক্ষ করে দেখলেন, এ সেই চাঁদের ভাঙা টুকরোটা নয়? এক ফালি চাঁদ? কিন্তু এ তো দেখতে সাদা এলুমিনিয়ামের মতো! যাই হোক, তিনি লুকিয়ে সেটিকে নিয়ে এলেন ঘরে, চুপচাপ বিছানার তোষকের তলায় রেখে দিলেন। মন ভালো নেই। ঠকে গিয়েছেন বড্ড।

   রাত্রে আকাশে চাঁদ ঝলমল করছে। নবীনবাবু ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু ঘুমের মধ্যেই খিলখিল হাসি শুনে জেগে উঠলেন। তাঁর মাথায় কি যেন খেলে গেলো। তিনই কাস্তের মতো জিনিসটাকে বের করে আনলেন। তারপর খোলা জানলা দিয়ে চাঁদের আলোর সামনে ওটাকে ধরলেন। চাঁদের আলো পড়ে ফালিটুকু ঝকঝক করে উঠল। এক ফালি চাঁদের মতোই। নবীনবাবু খুশিতে নাচতে লাগলেন। সত্যিই চাঁদ কথা রেখেছে! দিনের বেলায় গায়ে আলো না থাকলে কি হবে, রাতের বেলায় চাঁদের আলোয় ওই ফালিটুকুতে  আলো ধরবেই।  

      

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

2 thoughts on “এক ফালি চাঁদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত