| 23 ফেব্রুয়ারি 2025
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

সাম্যবাদী পশতু সাহিত্য এবং বিপ্লবী কবি সেদাল সোখানদিন

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

সিয়াম সারোয়ার জামিল

 

মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের অধিকাংশ দেশই মূলত মুসলমানপ্রধান। এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যবর্তী হওয়ায় একটা দ্বন্দ্ব রয়েছে এই অঞ্চলের সংস্কৃতিতে।

মৌলবাদ ও যুদ্ধের ক্রমাগত দংশনে এখানকার সমাজ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হলেও এখানকার সাহিত্য পেয়েছে এক অন্যরকম নতুনত্ব। যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত অতীব ভয়ঙ্কর অথচ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অধিকারী দেশ আফগানিস্তানের কবিতায় পশতু অন্যরকম আসন পোক্ত করে রয়েছে। তবে এই আসন পোক্ত করতে সাম্যবাদী সাহিত্যের ভুমিকাও কম নয়।

সেদাল সোখানদান, পশতু ভাষারই ক্ষণজন্মা এক কবি। পশতু সাহিত্যে সাম্যবাদী ভাবধারা সংযুক্ত করার মাধ্যমে তিনি এখনও আফগান কবিতার অন্যতম বীরপুরুষ হিসেবে স্বীকৃত। তার কবিতার বিষয় ও বক্তব্যের বহুমাত্রিকতা একটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। সেদাল বুর্জোয়া রাজনীতির প্রভাববলয় ভেঙ্গে নতুন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় প্রকাশ করেন। আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন, সমাজচেতনা ও মূল্যবোধের সাহিত্যিক জাগরণের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট সাহিত্য আন্দোলনে নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন।

পশতু সাহিত্যের ইতিহাস জানতে এবং সাম্যবাদী কবি সেদাল সোখানদানের অবদান বুঝতে হলে পেছনে ফিরে যেতে হবে। খৃষ্টীয় সপ্তম শতক থেকে সতের শতককে ইসলামী যুগ বলে ধরা হয়। এ সময়েই পশতু ভাষায় সাহিত্যের বিকাশ ঘটে এবং আরবি লিপির ব্যবহার শুরু হতে থাকে ব্যাপক ভাবে। ১৩শ শতকে সুফীসাধক ও কবি জালাল আল-দীন রুমি মহাকাব্য মসনবি-ইয়ে মানাবি রচনা করেন, যা ইসলামী সাহিত্য ও চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলে। সতের শতকের বিখ্যাত যোদ্ধা ও কবি খুশহাল কাট্টাক কবিতার মাধ্যমে উপজাতীয় আচার-আচরণের নিয়ম জুড়ে দিতেন। তবে পশতু ভাষায় সাম্যবাদী ভাবধারা সংযুক্ত হয় আরো পরে, উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে। সেদাল সোখানদিনের আবির্ভাব ঘটে এই সময়েই।
তিনি তার বিপ্লবী কবিত্বের মহিমায় গেয়ে ওঠেন:

“বন্দুক ও বেয়োনেট দিয়ে উপনিবেশবাদের বুক চিরে দাও
সাবাস শ্রমিকসমাজ, সাবাস;
তোমাদের বিশ্বস্ততা ও সংকল্পবোধ বিশ্বকে দেখিয়ে দাও। “

আমৃত্যু সংগ্রামী মাওবাদী কবি সেদাল সোখানদানের জন্মসময় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সঠিক কোনো তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হয়, উনিশ শতকে পঞ্চাশের দশকের গোড়াতে কান্দাহারের এক মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। শৈশব থেকেই আফগানিস্তানের রাজতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আহমদ শাহ দুররানির স্বৈরাচারি শাসন তাকে ক্রমশই প্রতিবাদী করে তোলে।

সেদাল সেখানদান সাহিত্যচর্চায় একটি আধুনিক কাব্যভাষার সৃষ্টি করেছেন। কবিতায় তার স্বতন্ত্রতা এখানেই স্পষ্ট। তিনি গণমানুষের মুক্তির প্রেরণা সৃষ্টিতে মগ্ন ছিলেন। তাঁর প্রতিবাদী কন্ঠ সাম্যবাদী গবেষক-পাঠককে আকৃষ্ট করে রেখেছে সেই কারণেই। একজন প্রগতিশীল কবি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে কখনই বিচ্যুত থাকেন না, চলমান ঘটনাপ্রবাহ ও ভবিষ্যৎকে তিনি প্রত্যক্ষ করেন সচেতনভাবে। সেদান সোখানদানের কবিতায় তা পুরোপুরি স্পষ্ট। খুব কাছে থেকে দেখা আফগান রাজতান্ত্রিক শাসনের ভয়াবহতা তার কবিচিত্তকে আলোড়িত করে। দেশে দেশে বিক্ষোভ, নিরন্ন মানুষের হাহাকার ও প্রতিবাদ কবিতায় তুলে ধরে তিনি নতুন ধারার কবিতা রচনা করেছেন।

“পাহাড়ের প্রান্তরে কুড়ে ঘরে
দিনরাত পিপাসার্ত সন্তান ও তার মা
রাজতান্ত্রিক সুশাসনের অদ্ভুত এক নমুনা !”

১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় ষাটের দশকেই বিদেশী শিক্ষার্থীদের কারণে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। কমিউনিজম, নারীবাদ ও পুঁজিবাদের বিষয়ে এই সময়ের তরুণরা আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেদাল সোখানদান ১৯৭০ সালে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে সমাজের দৃশ্যমান দ্বন্দ্ব তাকেও কমিউনিজমের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। ঐ সময় চীনা কমিউনিস্টদের প্রভাব ছিল ক্যাম্পাসগুলোতে। মাও সে তুংপন্থী একটি যুব সংগঠনের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন কবি সোখানদান। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সাজমান ই জাভানান মুতারাকি (প্রগতিশীল যুব সংঘ) নামের সংগঠনটি আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ধ্যান ধারণা থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ছিল আফগানিস্তানের প্রথম কমিউনিষস্ট সংগঠন। আকরাম ইয়ারি, আব্দুল রাহিম মাহমুদী, আব্দুল হাদী, সাদিক, সেদাল সোখানদান সহ বেশ কয়েকজন কমিউনিস্ট নেতা সংগঠনটি নিয়ন্ত্রণ করতেন।

সোখানদান ভাল বক্তা ছিলেন, অল্প সময়ে মানুষের হৃদয় জয় করার অন্যরকম এক ক্ষমতা ছিল তার। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খুব দ্রুত সংগঠন দাঁড় করাতে সক্ষম হন। একই সময় ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর কুদৃষ্টিতে পড়েন তিনি। “হিজব ই ইসলাম” নামক একটি মৌলবাদী সংগঠনের কর্মীরা তাকে বিভিন্ন ভাবে বাধা সৃষ্টি করতে থাকে। শুরুতে প্রকাশ্য কাযৃক্রম চালাত না প্রগতিশীল যুব সংঘ (পিওয়াইও)। ক্রমসই কর্মসূচি বাড়তে থাকে সংগঠনটির। শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ করত, শ্রমিক-ছাত্রদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ লেগেই থাকতো। কিছু বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক কর্মী এই সময় সংগঠনে সক্রিয় হতে থাকেন। আহমদ শাহ মাসুদ, ডঃ ফয়েজ আহমদ তাদের অন্যতম । “শোলা জাওয়িদ” নামে সংগঠনের একটি প্রকাশনা ঐ সময় বের করা হতো। পত্রিকাটির অন্যতম লেখক ও সম্পাদক ছিলেন সোখানদান। কিন্তু পিওয়াইও`র কর্মীদের উপর খড়্গ নেমে আসে। ১১ তম সংখ্যা প্রকাশের পর সরকার “শোলাই জাওয়িদ”কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

রাজতান্ত্রিক সরকার মৌলবাদী গোষ্ঠি জিহব ই ইসলামকে লেলিয়ে দেয় “পিওয়াইও”র বিরুদ্ধে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী গুলবুদ্দিন হেকমাতিয়ার (আফগানিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী) ছিলেন ঐ জঙ্গী সংগঠনের নেতা। ১৯৭২ সালের জুনের শুরুর দিকে (সঠিক তারিখ জানা যায়নি) কমিউনিস্টপন্থী “সোলাইস” এবং মৌলবাদী “ইখওয়ানিস” গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষের দু`গ্রুপেরই অনেক কর্মী গুরুতর আহত হন। এক পর্যায়ে গুলবুদ্দিন হেকমাতিয়ারের গুলিতে নিহত হন বিপ্লবী সেদাল সোখানদিন। তার মৃত্যুর পর অব্যাহত দমনপীড়নের ফলে “সাজমান ই জাফানান” সংগঠনেরও বিলুপ্তি ঘটে।

বিশ্বের প্রায় পনেরো লাখ মানুষের ভাষা পশতু। পশতু কবিতায় সাম্যবাদের প্রভাব মৌলবাদের কবল থেকে আলো ছড়িয়ে বেরিয়ে আসার প্রতীক হয়ে উঠেছে। আর সেই জায়গায় সেদাল সোখানদানের অবদান যুগ যুগ ধরে মানব সমাজকে আলোর পথে ডাকবে। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের স্পৃহা জাগাতে থাকবে।

 

 

তথ্যসূত্র:
১। পলিটাক্যাল পোয়েট্রি ইন আফগানিস্তান, পারতাও নাদেরি, খামা প্রেস অনলাইন, অক্টোবর ৬, ২০০৬।
২। সমকালীন এশিয় সাহিত্য, রফিক উম মুনীর চৌধুরী, দৈনিক কালের কন্ঠ, ৩০ এপ্রিল ২০১০।
৩। হিসটোরিক্যাল ওভারভিউ অব দ্য রেভ্যুলিউশানরি মার্ক্সিস্ট মুভমেন্টস ইন আফগানিস্তান, এ এল ও মাওয়িজম ডট কম।
৪। আফগানিস্তান: দ্য টরচাস রোড অব রেভ্যুলিউশন, আফগান মাওয়িস্টস, শুরেশ ডট আরইউ ২৬ ডিসেম্বর ২০০৮।
৫। উইকিপিডিয়া

 

কৃতজ্ঞতা: বাংলানিউজ২৪.কম

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত