Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com, a-taste-of-burmese-poetry

অনুবাদ কবিতা: চারটি মিয়ানমার কবিতা । হান লিন

Reading Time: 3 minutes

ভাবানুবাদ : রেজাউল ইসলাম হাসু

 

মিয়ানমার প্রসঙ্গ উঠলেই মহাকবি আলাওলের নাম উড়ে আসে ইতিহাসের স্বর্ণাভ পাতা থেকে। যিনি ছিলেন সতেরো শতকের তৎকালীন আরাকান রাজ্যের সভাকবি (বর্তমান যে অঞ্চল রাখাইন রাজ্য নামে পরিচিতি)। ভাষাগতভাবে কোনো এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের রক্তধারা আমাদের ধমনীতে বহমান। হয়তো কোনো একদিন আমরা একই ভূমিতে লাঙল জোয়াতাম। ধান, গমের শিষ ছড়াতাম এই উর্বর পলিতে। হয়তো একই খাবারে আমরা আহার করতাম। হয়তোবা একই পোশাকে, একই গানে নাচতে নাচতে হারিয়ে যেতাম উন্মুখ উদাসীনতায়। হয়তোবা একই পঙক্তিতে কণ্ঠ মিলাতাম বাউরি বাতাসে দুলতে দুলতে। হয়তো পৃথিবীর কোনো এক প্রাচীন গুপ্তকোণে লুকিয়ে আছে আমাদের অন্তরাত্মার মেল বন্ধন। হয়তো কোনো এক প্রেমের নদী ভাঙতে ভাঙতে আমাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে পার্থক্যের নাফ। আমরা হয়েছি খণ্ড বিখণ্ড। সুতা ছেঁড়া ঘুড়ির মতো গোঁত্তা খেতে খেতে হয়েছি দূরগামী দ্বীপ। আমাদের হৃদপিণ্ডের মাঝখানে গড়ে উঠেছে কদর্য কাঁটাতার। আজ সেই কাঁটাতারের নাম পরদেশি।

মিয়ানমারের কবিতা-ইতিহাস অনেক পুরনো। সেই ইতিহাসের সঙ্গে রয়েছে মিয়ানমারের  ঐতিহাসিক রাজনীতির সম্পর্ক। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের কবিরা কবিতা লিখেছেন। একইভাবে আগের সেনাশাসনের বিরুদ্ধেও তাঁরা কবিতা লিখেছেন। সেনা সরকার বহু কবিকে কারারুদ্ধ করে রেখেছিল। সে সময় মিয়ানমারের কবিরা চায়ের দোকানে বিভিন্ন সাংকেতিক ভাষায় কথা বলতেন, যাতে ছদ্মবেশী সৈন্যরা তাঁদের আলোচনা বুঝতে না পারে।

এখনও থেমে নেই সেই কবিতার উপর কদর্য চাবুকের ঘা। রাষ্ট্রীয় বন্দুক তাক করে আছে কবিদের মাথায়। তাই কেথ থির মতো মৃতুঞ্জয়ী কবিদের কণ্ঠ রুদ্ধ করতে পারেনি ওদের বিবেকহীন বন্দুক। তলোয়ারের ন্যায় ঝনঝনিয়ে উঠেছে :

 

‘তারা গুলি চালায় মাথায়,

কিন্তু তারা জানে না,

বিপ্লব বাস করে হৃদয়ে।’  

 

অথবা মরতেও মরতেও কে জা উইনরা চিৎকার করে বলে গেছেন :

‘তোমার সঙ্গে আমার দ্বিমত থাকতে পারে,

তারপরও তোমার জন্য আমি আমার জীবন দিয়ে দেব।’

মিয়ানমারে চলমান বিক্ষোভে চার কবিসহ এ পর্যন্ত ৭৯০ জন মানুষকে মেরে ফেলেছে সেনাবাহিনী। আটক করেছে হাজার হাজার মানুষ। তবু থেমে নেই বিক্ষোভ। ক্ষুব্ধ মানুষের হাতে শোভা পাচ্ছে প্ল্যাকার্ড। প্ল্যাকার্ডে লেখা :

‘তোমরা আমাদের মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে চাইছ,

অথচ তোমরা জানো না, আমরা হচ্ছি বীজ।’

 

 

হান লিন (১৯৮৬)

A taste of Burmese poetry

হান লিন একজন কবি ও অনুবাদক। পূর্ব মিয়ানমারের থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী শান স্টেটের একটি মনোরম শহর কালাউতে তার বেড়ে ওঠা। তিনি ২০০১ সাল থেকে রেঙ্গুনে বসবাস করছেন। মিয়ানমারের বিভিন্ন কাগজে তাঁর অসংখ্য কবিতা, অনুবাদ এবং নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি এই প্রজন্মের অসামান্য প্রতিভাবান ও নিবেদিত কবি। তাঁর কবিতাগুলি ‘ইলেভেন ইলেভেন  জার্নাল’এ ২০১৫ সালের ‘জানুয়ারি সংখ্যা’য় প্রকাশিত হয়। তিনি বেশ কয়েকটি প্রকল্পে অনেক মিয়ানমার কবিদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তার প্রথম কবিতাবই- ‘কায়ুং তায়া হান্ড্রেড ক্যাটস ’২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়। এখানে অনূদিত বেশিরভাগ কবিতা হ্যান লিনের দ্বিতীয় বই নো ম্যাটার হাউ ফার এয়ার কমিউনিকেশন’ থেকে নির্বাচিত করা হয়েছে, যা ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়।


 

পাখিদের প্রহরী

এই মিয়ানমারে প্রত্যেকেই অন্তরীণ

লোকজন সাধারণত সংঘর্ষ করে না,

একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গের আঘাতেও না,

অন্তত একবার হলেও না;

না তাদের ছায়ারাও।

কোনো একজন কোনো এক আকাশ থেকে

ছুড়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে নিজেকে।

তাকে থামাও কেন?

উদ্ধাকারীরা আসার আগে

নিজেকে শেষ করতে দাও।

পাখিদের প্রহরী কী পরাজিত হলো!

সে পাখিদের নাম জানে না।

সে এও জানে না

তারা তার মাতৃভূমিতেই হারিয়েছে স্বর্ণাভ পালক,

বিশেষত এই শহুরে খাঁচায়

অথবা এইসব বাড়ির বাগানে।

সে আতঙ্কে শিউরে ওঠে।

আর ফরমান পাঠায় বাড়ি বাড়ি।

সে সতর্কতা ছোড়ে

সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ করা হোক।

সে জোরালোভাবে সতর্কতা ছোড়ে

সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ করা হোক।

সে পাখিদের ছবি তোলে

এবং সেগুলো মেইল করে

কোনো এক পাখি বিশেষজ্ঞের কাছে

যাতে চিহ্নিত করা যায়

তাদের ডানা ও ডুমরু।

আর প্রতিবেশীদের সতর্ক করো

‘সামরিকসেনা ও আশ্রম বিষয়ে’

সে তাদের আশ্বস্ত করে শান্ত থাকবার।

আমি প্রথম বিমানটা সকালে ধরব।

আমি সেখানে থাকব

সেইসব পাখি আমাদের দোরগোড়ায় অবতরণের আগে। ’

     

অবতরণ

কোথায় অবতরণ করতে হবে

তা সে জানত না,

যতক্ষণ না আমি রক্তে স্বাক্ষর করি

আমার কমরেডদের

মৃত্যুর সাথে…

     

যখন আমি নিজেকে ‍সুরভিত করি

যখন আমি নিজেকে সুরভিত করি,

আমার সাড়ে তিন হাত চৌহদ্দি

আমার আয়ুষ্কালকে আরো বাড়িয়ে তোলে।

সৌরভ জড়িয়ে

আমি মানুষের ভিড়ে হেঁটে বেড়াই অনাদিকাল।

আমার সৌরভ

সত্যিই আমাকে অবাক করে দিয়েছে।

আমার পা চলছে

সামনে-পেছনে, আপনা থেকেই।

আমি কেবল হাঁটতে থাকি,

মৃত্যুর ভেতর হাঁটছি

আমি উৎফুল্ল অথবা বিব্রত।

   

লিফট

লিফটের ভেতর

কফিনটা খাপ খাচ্ছে না,

চলো, এটি উল্লম্বভাবে ধরি।

দেহ হবে?

দাঁড়াও,

সবময় কফিন কেন!

খুব ভারী?

আমরা কী ঠেলব

এই রক্তাক্ত চাকাগুলো বারবার?

একজন কফিনবাহক

খুব দরকার।

দ্যাখো, লিফটটা

কী দ্রুতগতিতে

উঠছে আর নামছে!

উৎস : পোয়েট্রি ফাউন্ডেশন ও দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>