Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,aami binay-mazumdar

আমি বিনয় মজুমদার (উপন্যাসের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ) । অংশুমান কর

Reading Time: 4 minutes

২১.

গায়ত্রীকে আরও একদিন দেখেছে বিনয়। সেটি কলেজ স্কোয়ারে। উদ্ধত গ্রীবা নিয়ে শ্বেতশুভ্র মরালীর মতো গায়ত্রী পার হচ্ছিল রাস্তা। কী ভীষণ জ্যাম তখন কলেজ স্কোয়ারে! বিনয়ের মনে হয়েছিল, গায়ত্রীর জন্যই জ্যাম লেগে গেছে রাস্তায়। শুধু সে নয়, সকলেই যেন গায়ত্রীকে দেখছে, কেউ কেউ যেন সোজা চেয়ে আছে ওর দিকে, কেউ কেউ দেখছে আড়চোখে। থেমে গেছে যানবাহনও। মেয়েটির রূপ, না না, রূপ নয় ঠিক, ব্যক্তিত্ব, তার ব্যক্তিত্ব এমনই। গায়ত্রীকে নিয়ে ইতিমধ্যেই চোদ্দটি কবিতা লেখা হয়ে গেছে বিনয়ের। ঠিক যে ফর্মটির আশায় সে ছিল, তেমনই একটি ফর্মে সে কবিতাগুলি লিখতে পেরেছে। লিখেছে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে। অধিকাংশ কবিতা সে লিখেছে আঠেরো মাত্রায়। এই চলনেই সে স্বচ্ছন্দ। কিন্তু কখনও কখনও সে বাড়িয়ে কমিয়ে নিয়েছে মাত্রা। অক্ষরবৃত্ততেই এই সুবিধে আছে। কবিতাগুলো লিখে সে অনেকখানিই তৃপ্ত। কোন কবিতাটি উতরোল, ঠিক তার নিজের ছাপ দেওয়া কবিতা হয়ে উঠল, সে বুঝতে পারছে। তার মনে হচ্ছে এইবার তার কবিতাকে তার বন্ধুদের কবিতার থেকে একটু আলাদা করে চিনে নেওয়া সম্ভব। দৃশ্যের বর্ণনা দিতে দিতে সে হঠাৎ করে এমন এক-একটি পঙ্‌ক্তি লিখে ফেলছে সে যে পঙ্‌ক্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে একটি গূঢ় সত্য। পঙ্‌ক্তিটি বিনয়ের নিজের কাছেও কীভাবে যে আসে তা সে সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু আসে। যেমন দ্বিতীয় কবিতাটিতেই সে লিখেছে “মুকুরে প্রতিফলিত সূর্যালোক স্বল্পকাল হাসে”। আয়নায় ছিটকে পড়া সূর্যালোক দেখে তার এমনটিই মনে হল সেদিন। লিখে ফেলল তারপর। ওই কবিতারই শেষ পঙ্‌ক্তিটি লিখে বিনয়ে বড় আনন্দ পেয়েছে। একেবারে আনন্দের সমুদ্রে অবগাহন করেছে যেন। সে লিখেছে, “মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়”। এই চোদ্দটি কবিতা নিয়ে একটি ছোট্ট বই প্রকাশ করার কথা ভাবছে বিনয়। আগের বইটি বেশ যত্ন করেই ছেপেছিল দেবকুমার বসু। এবার একটি অভিনব ভাবনা এসেছে বিনয়ের মাথায়। আর পাঁচটা বইয়ের মতো যেন না হয় তার “গায়ত্রীকে”। প্রতিটা পাতায়, মানে এক এক পৃষ্ঠায় যদি একটা করে লম্বা লাইন ছাপা হয়, তবে কেমন হয়? দেবকুমারও লুফে নিল এই ভাবনাটা। সেভাবেই প্রকাশ পেল বিনয়ের দ্বিতীয় বই। তার খুব ইচ্ছে করছিল যে, সে বইটা গায়ত্রীকে দেখায়। অন্তত একটি কবিতা পড়ায় গায়ত্রীকে। কিন্তু তা সম্ভব নয় আর। ইতিমধ্যেই গায়ত্রীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে কলেজ স্ট্রিট ছাড়িয়ে গোটা কলকাতা জুড়ে। ইংরেজি সাহিত্যের এই রকম মেধাবী ছাত্রী নাকি আর আসেনি ইদানিং কালে। ঠিক এই রকমের খ্যাতি ছড়িয়েছিল ইকনমিক্সের অমর্ত্যদাকে নিয়ে। গায়ত্রীর সম্বন্ধে এইসব কথা শুনে বিনয়ের মনে মনে একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব হয়। শত হোক, অন্তত বিনয়ের কাছে তো গায়ত্রী তার প্রেমিকা। গায়ত্রী না হয় নাই বা জানল তার প্রেমের কথা। সে তো গায়ত্রীকে সমস্ত হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছে। “নক্ষত্রের আলোয়” বইটি তেমন সমাদর পায়নি, কিন্তু ‘গায়ত্রীকে’ প্রকাশিত হওয়ার পরেই বইটির অভিনব সজ্জা আর নিবিড় কবিতাগুলির জন্য কলেজস্ট্রিট চত্বরে মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। অনেকেই বলছে, এ এক নতুন ধরনের বই। তবে বইটির কথা সীমাবদ্ধ থাকল কফি হাউস আর কলেজ স্ট্রিটেই। শক্তি অশোক চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “সম্প্রতি”পত্রিকায় একটি সমালোচনা লিখল কিন্তু সে লেখাও খুব বেশি লোকে পড়ল না। এতে বিনয়ের খেদ নেই। এই বইয়ের কবিতাগুলি তো সবই ব্যক্তিগত লেখা। সাধারণ পাঠক এই বই পড়ল কি না তা নিয়ে বিনয় বিচলিত নয়। সে শুধু ভাবে, বইটি কি কোনওভাবে গায়ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব? ইতিমধ্যে আবার অর্থকষ্ট শুরু হয়েছে বিনয়ের। জমানো টাকায় আর কতদিন চলতে পারে? নিজেকে সম্পূর্ণ কবিতায় নিবেদিত করবে কি না বিনয় তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। শক্তি ততদিনে বিনয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছে। সেও বেকার। সে বিনয়কে মাঝে মাঝে বলে, কবিতা এমন ঈশ্বরী যে সাধকের সম্পূর্ণ নিবেদন চায়। কবি হতে গেলে অন্য কাজ করা যায় না। বিনয় খুবই প্রভাবিত হয়েছে শক্তির এই কথায়। তাই তো সে একের পর এক চাকরি ছেড়েও দিয়েছে। কাজের পরিবেশ, সহকর্মীদেরও তার ভালো লাগেনি। কিন্তু, এই ছোটো বইটি নিজের টাকায় প্রকাশ করার পরে, বিনয়ের আবারও অর্থকষ্ট শুরু হয়েছে। তার সত্যিই একটি চাকরি দরকার। এরই মাঝে আরও একদিন কফি হাউসে গায়ত্রীকে দেখল বিনয়। সেই এক ঝলক দেখা। সেদিনই এক ভয়ংকর খবরও পেল বিনয়। গায়ত্রী ইংরেজি অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে হায়ার স্টাডিজের জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছে। সুদূর আমেরিকায়। বিনামেঘে বজ্রাঘাতের মতো এ খবর এসে আছড়ে পড়ল বিনয়ের মাথায়। তার মনে হল তার চৈতন্য লোপ পাচ্ছে। সে কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। অস্থির লাগছে তার। কলকাতাতেও গায়ত্রীর সঙ্গে তার দেখা হয় না ঠিক, কিন্তু কেন জানি না মনে হয় অন্তত একই শহরের তো তারা আছে। যে বাতাস গায়ত্রীকে ছুঁয়ে দিচ্ছে, সেই বাতাসই গায়ত্রীর স্পর্শ বয়ে নিয়ে এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে বিনয়কেও। কিন্তু কী হবে এরপর? তার একটি চাকরিও নেই এখন। সে প্রায় ভবঘুরের মতো কবিতা আর গায়ত্রীকে আঁকড়েই বেঁচে ছিল। অথচ গায়ত্রী চলে যাচ্ছে তাকে ছেড়ে। সে প্রেম দেয়নি বিনয়কে। এটাও ঠিক যে, বিনয় তাকে প্রণয়প্রস্তাব দেয়নি। কিন্তু স্যারের বাড়িতে সেই দেখা হওয়ার দিনে, কফি হাউসে দেখা হওয়ার সময় বিনয় তো গায়ত্রীর চোখে রেখেছে চোখ, কিছুই কি বোঝেনি গায়ত্রী? নাকি বুঝেও গায়ত্রী অবহেলা করল তাকে? যত সে এইসব ভাবছে ততই কী তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে হৃদয়ে! এত যন্ত্রণা নিয়ে কবিতা রচনা অসম্ভব। কবিতাও আর লিখতে পারছে না সে। একদিন বিনয় খবর পেল গায়ত্রী সত্যি সত্যিই চলে গেছে আমেরিকা। কী হবে এরপর? এরপর বিনয় কি পারবে স্বাভবিক জীবনযাপন করতে? এক অজানা আতঙ্ক বাঘের চোখে মতো জ্বলতে থাকে তার সামনে। তার ভয় লাগে। বড়ো ভয় লাগে। চোখের সামনে হঠাৎ হঠাৎ ভেসে আসে সেই কোন ছোটোবেলায় বার্মায় ট্রেঞ্চের মধ্যে খাটিয়ার ওপরে বসে থাকার দৃশ্য। সেই একই ভয় যেন আবার তাকে গ্রাস করছে। তার মনে হচ্ছে বুঝি বা চৈতন্য লুপ্ত হচ্ছে তার। সে যেন এক দৃশ্যের ভেতরে দেখতে পাচ্ছে একাধিক দৃশ্য। পরম্পরাহীন সেসব দৃশ্য, কিন্তু তার মনে হচ্ছে কোথাও যেন একটা সাযুজ্য আছে। কিন্তু সে বুঝতে পারছে সাধারণ মানুষরা, তার বন্ধু-বান্ধবরা তার কথাকে অসংলগ্ন মনে করছে। ওরা কি ভাবছে, সে পাগল হয়ে গেছে? পাগল কিন্তু সে হয়নি। সে এখনও অঙ্কের সমস্ত ফর্মুলা নিখুঁত বলতে পারে। সে তো একটু ভালোবাসা চায় মাত্র, একটু সহমর্মিতা। কিন্তু তার বন্ধুরা তাকে বিশ্বাস করছে না। বাবা-মাও মনে করছে তার মাথার ব্যামো হয়েছে। সকলে মিলে তাকে ভর্তি করে দিল মানসিক হাসপাতালে।

         

আমি বিনয় মজুমদার উপন্যাসের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ। লেখকের অনুমতিক্রমে প্রকাশিত।

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>