আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে

আমার যখন ইচ্ছে করে দূরে কোথাও চলে যেতে তখন প্রায় সময় নদীর কাছে ছুটে আসি। আমার সে আসাটাও হয় নদীর তীর থেকে লঞ্চ বা স্টিমারে চেপে নদীর বুকে ভেসে ভেসে। দূরের যাত্রায় লঞ্চ থেকে স্টিমারই আমার প্রথম পছন্দ। প্রায় সময় তাই স্টিমারই হয় আমার যাত্রাসঙ্গী। স্টিমার যাত্রা শুরু করতেই ক্রমে ক্রমে রাত নামে। অন্ধকারে নদীর চেহারা হারিয়ে যায়। তারমধ্যেই চেয়ে দেখি নদীর নদীর কুচকুচে জলে হঠাৎ হঠাৎ তীব্র আলোর চাবুক। রাত শেষ হয়ে দিনের আলোয় দেখি নদীর বুকে ধবল ফেনা ধবলতর উচ্ছ্বাসে ছুটে চলা। নদী পারের গঞ্জ, বাজার, বেচাকেনা আর নৌকা ও নদীর বুকে মাছ ধরা দেখি। এসব দেখে দেখে আশ্চর্য হই আর নিজেকে ভাবি। নদীর সঙ্গে আমার জন্মের ঘটনা মনে পড়ে, কী এক বাঁধন আমাদের। আমাদের একত্র করার কাহিনী হয়তো বিশাল উপন্যাসে পাবে পূর্ণতা কিন্তু জানি আমার কখনও উপন্যাস লেখা হবে না। কোনেও একদিন হয়তো নদী নিয়ে উপন্যাসকে কবিতায় রূপ দেবো। তার আগে চলুন ঘুরে আসি ঝালকাঠি থেকে। এবার আমার গন্তব্য রূপসী বাংলার শ্রেষ্ঠ নদী ধানসিঁড়ি।

ফ্রেব্রুয়ারীর প্রথম সপ্তাহের বুধবার হুট করেই পি এস মাসহুদ এ চেপে ঝালকাঠি রওনা হয়ে বুড়িগঙ্গার জলে শুরু করে ভোর ৫ টায় বরিশালে কীর্ত্তনখোলা হয়ে একটু আগে মানে সকাল সাড়ে আটটায় সুগন্ধার তীরের ঝালকাঠি ঘাটে নেমেছি। ছোট্ট মফস্বল শহর ঝালকাঠি। শহর ছোট হলেও এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিশাল। সুগন্ধা নদী তীরের ঝালকাঠিকে ঘিরে আছে কীর্তনখোলা, বিষখালি, গাবখান, জাংগালিয়া, বাসন্ডা ও ধানসিড়ি নদী আর কীর্তিপাশা, কুরিয়ানাসহ অনেক ছোট-বড় খাল। এখানে রয়েছে কীর্তিপাশা জমিদারবাড়ি, গাবখান সেতু, সুজাবাদ কেল্লা, নেসারাবাদ মাদ্রাসা, কবি কামিনী রায়ের বাড়ি ও রাজাপুরের সাতুরিয়া গ্রামে শের ই বাংলা একে ফজলুল হকের জন্মস্থানসহ শীতলপাটি শিল্প, মৃৎশিল্প ও পেয়ারার গ্রাম ভীমরুলি। আছে চেয়ে দেখার মত অজস্র গাছপালা আর মনে রাখার মত মানুষ। এখানকার মানুষ গুলো আকৃতিতে মানুষ নয়, সত্যিকার অর্থেই মানুষ। মতিলাল রায়, ঝরনা বাড়ৈ, সোহানুর রহমান সহ এমন মনে রাখার প্রিয় মানুষ রয়েছে এখানে। তেমনি একজন ফারদিন লঞ্চের টিকিট মাস্টার ইসহাক শেখ। তার সঙ্গে কথা বলে পাশেই স্টিমারঘাটের কাছের হোটেলে প্রাতরাশ সেরে নৌকাঘাট এসে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করি। তারপর প্রয়োজনীয় রসদ নিয়ে যাত্রা শুরু। ধানসিঁড়ি নদীর রূপ-সৌন্দর্য মুগ্ধ করেছিল কবি জীবনানন্দ দাশকে। নদীর জলে ভেসে ভেসে কবি লিখেছিলেন আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়। কবি তার সে লেখার পর আবার কখনও ধানসিঁড়ির কাছে গিয়েছিলেন কি না জানি না। তবে জীবনানন্দ দাশ তার সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ রূপসীবাংলায় আবার আসিব ফিরে কবিতাটি লিখে ধানসিঁড়ি নদীকে অমর করে রেখে গেছেন।

“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শঙখচিল শালিখের বেশে,

হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়।”

ধানসিঁড়ি নদী সুগন্ধা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে প্রায় নয় কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে রাজাপুরের কাছে জাঙ্গালিয়া নদীতে মিশেছে। আমাদের বাহন ইঞ্জিন চালিত নৌকা এখন সুগন্ধা নদী হয়ে বিষখালি নদীর পাশ দিয়ে মোহনার কাছে চলে এসেছে। আমাদের বামে এখন বিষখালী নদী, পেছনে সুগন্ধা একটু সামনে গাবখান নদী, তারপরই আমাদের কাংক্ষিত ধানসিঁড়ি নদী। চারটি নদীর সংযোগস্থল থেকেই ধানসিঁড়ি নদীর শুরু। আস্তে ধীরে আমাদের নৌকা মোহনা হয়ে ধানসিঁড়ি নদীর দিকে এগিয়ে যায়, তারপর বামে বাঁক নিয়ে সোজা প্রবেশ করে ধানসিঁড়ি নদীতে। ধানসিঁড়ি নদীতে আমার চলা সেই শুরু, সেই প্রথম। এমন ভালো লাগা অনুভূতি, উচ্ছ্বাস প্রকাশ ভাষা হারিয়ে ফেলে। অসংখ্য ভালো লাগার মূহুর্তে মুখ থেকে কেবল অস্ফুটে বের হয়ে আসে-আহ, প্রিয় ধানসিঁড়ি!

জলবায়ু যোদ্ধা প্রিয় অনুজ সোহানুর রহমান সোহান বরিশাল থাকলেও তার শেঁকড় ঝালকাঠিতে। দেখা হলেই সে বলে, ‘চলেন ধানসিঁড়ি বেড়িয়ে আসি। যেখানে ধানসিঁড়ির শুরু সেখান থেকে শুরু করে জাঙ্গালিয়া নদীর যেখানে সে মিশে গেছে ঐ পর্যন্ত আমরা পায়ে হেঁটে অতিক্রম করবো। নদীর যৌবন কালের গল্প শুনবো এলকাবাসির কাছ থেকে। প্রত্যক্ষ করবো প্রিয় কবি নদীর যে রূপ-রসে মুগ্ধ হয়ে আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে উচ্চারণ করেছিলেন, তার সে অবস্থার কি করুন পরিনতি হয়েছে! কিভাবে প্রিয় নদী দখল হল, কেনই বা সে নদীতে বিশাল সব বাদামের নাও বা লঞ্চ-স্টিমার চলাচল বন্ধ হল।’সোহানের সঙ্গে ধানসিঁড়ির তীরে যাওয়া না হলেও এবার শেষ পর্যন্ত ধানসিঁড়ি নদীতে ঠিকই এলাম। সোহানকে সেই গল্প শুনাবো, আমার দেখা ধানসিঁড়ির আমার চোখ দিয়ে কেবল সোহান নয়, আপনারাও দেখবেন, জানবেন। তবে সে গল্প জেনে বসে থাকবেন না। নদীর কাছে ছুটে আসবেন, যেভাবে আপনারা পাহাড়ের কাছে চলে যান। তারপর চেষ্টা করবেন আপনার প্রিয় নদীর অপমৃত্যু রক্ষার!

আনসিঁড়ি নদীর শুরুতে নদীর দুপারে প্রবেশটুকু ছাড়া কোথাও খোলা প্রান্তর ঠিক সেভাবে পেলাম না। প্রবেশ মুখ পার হতেই লক্ষ্য করলাম নদীপথ সরু হতে শুরু করেছে। একটু পরপর বাঁশের তৈরী সেতুর দেখা পেলাম। সে সেতুর নীচ দিয়ে লঞ্চ-স্টিমার দূরে থাক, ছোট পাল তোলা নৌকাও এপার ওপার হবে না। অথচ এই ধানসিঁড়ি নদীর বুক এক সময় বড় লঞ্চ ও স্টিমার সহ বাদাম ওড়ানো বিশাল সব নৌকার গতিপথ ছিলো। সে নদী কেনো এমন মরানদী হল। ভাবতে অবাক লাগে; নদী ও খালের দেশে এমন বা এর চেয়ে বড় বড় খাল রয়েছে। আমরা কুরিয়ানা খাল দেখেছি, দেখেছি কীর্তিপাশা। নদীর দেশে নদীর মৃত্যু, চিন্তা করা যায় না। শুধু নদী কেনো, এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ, নৈসর্গিক সৌন্দর্য কিছুই এখানে আগের মত নেই। চলতি পথে লোকজনের কত অভিযোগ শুনতে হল প্রিয় ধানসিঁড়ির বেহাল দশার জন্য। আমরা বৈদারাপুর নৌকা বাঁধার ঘাট পেয়ে যাত্রা বিরতী দেই। আশিতর দোলারা বিবি হাতে ক্যামেরা দেখে মুখ লুকায় শাড়ির আঁচলে। ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিতুমিয়া। তারপর দুইটা কিছু খেতে তার বাড়ি যেতে অনুরোধ করেন আবু বকর লস্কর। আমরা তার সে অনুরোধ বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে একটা চায়ের দোকান পেয়ে চা পান করি, এলাকার লোকদের সঙ্গে নদীর গল্প করি, সেই অতীত আর বর্তমান পর্যালোচনা করি। চলে আসে শীত ও বরষার পার্থক্য। ইতিমধ্যে ছেলে-বুড়োর ভীড় জমে গেছে, সে ভীড় বাড়তে না দিয়ে আমরা দ্রুত আবার নৌকায় চড়ে বসি। এভাবে যতটাই সামনে এগিয়ে যায় আমাদের নৌকা ততটাই ধানসিঁড়ির ম্রিয়মান অবস্থা দেখে মন কেঁদে ওঠে, দুচোখের পাতা ঝাঁপসা হয়ে আসে। জান্নাতের মাথাচাড়া দেয় সেই পুরাতন প্রশ্ন-

কেন মরে গেল নদী, কেন মরে যায়!

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত