জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি: আবদুল মান্নান সৈয়দ

আজ ৩ আগষ্ট কবি,গবেষক ও কথাসাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দের জন্মতিথি তে আবদুল্লাহ আল মোহনের লেখায় ইরাবতী পরিবার আবদুল মান্নান সৈয়দকে জানায় বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


১.
আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলা ভাষার একজন অগ্রগণ্য আধুনিক কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও সাহিত্য-সম্পাদক। পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে বাংলা সাহিত্যকে নানান দিকে দিয়ে ঋদ্ধ করেছেন। তবে ঊনিশ শতকের ষাট দশকে আবির্ভূত অন্যতম কবি হিসেবে তিনি সচরাচর অভিহিত। কবিতা ছাড়াও তিনি গল্প, উপন্যাস, সমালোচনা, নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সুপ্রসার ও সুগভীর অবদান রেখেছেন। আবদুল মান্নান সৈয়দ ১৯৪৩ সালের ৩ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, ২০১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি পরলোকগমন করেন। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অনন্যসাধারণ শিল্পী। রবীন্দ্রোত্তর কালে বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যে তাঁর অবদান তুলনারহিত। কবি জীবনানন্দ দাশ এবং কবি কাজী নজরুল ইসলামের ওপর তাঁর গবেষণা প্রবাদপ্রতীম। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দেড় শতাধিক। জন্মসূত্রে তাঁর নাম সৈয়দ আবদুল মান্নান। তবে বাংলাদেশের সাহিত্যমহলে তিনি ‘মান্নান সৈয়দ’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। 

২.
আবদুল মান্নান সৈয়দকে (জন্ম : ৩ আগস্ট, ১৯৪৩ – প্রয়াণ : ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১০) বলা হতো সব্যসাচী লেখক। বাংলা সাহিত্যের যে শাখায়ই তিনি চর্চা করেছেন, সাফল্য ও কীর্তি ধরা দিয়েছে অবলীলায়। বলা হয়েছে এদেশে তাঁর মতো পরিশ্রমী লেখক নেই। যে কোন লেখার মধ্যেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। প্রচণ্ড তোলপাড় করা শক্তি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি। বাংলা কবিতায় কবিতায় তিনি যুক্ত করেছিলেন পরাবাস্তববাদী দিগন্ত। তাঁর উদ্ভাবনী শক্তি ও ব্যঞ্জনা সৃষ্টি তাঁর ভাষাকে করে তুলেছে ব্যতিক্রমী। মহাসমর পরর্তীকালে দুই বাংলাতেই তাঁর মতো সাহিত্যসমালোচক খুঁজে পাওয়া যায় দুষ্কর। বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে ছিল তাঁর অগাধ ধারণা। সমসাময়িককালে তাঁর মতো বড় মাপের লেখক দেখা যায় না। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও কবিতায় তাঁর সৃজনশীলতা অসাধারণ। জীবনানন্দকে তিনি বলেছিলেন “শুদ্ধতম কবি” ; কার্যত: নিজ জীবনেও তিনি ছিলেন “শুদ্ধতার সাধক”। দীর্ঘ শালপ্রাংশু অবয়ব, কাঁধের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া কেশগুচ্ছ, সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন রীতিমতো সুদর্শন সুপুরুষ। একদিকে তিনি পৌরুষদীপ্ত ও ব্যক্তিত্বময় ; অন্য দিকে সদালাপী, সদা হাস্যময়। অন্তরে ছিলেন তীব্র অভিমানী। কথার ফাঁকে কৌতুক করা ছিল তাঁর সুনিপূণ অভ্যাস। স্বভাবে বিজনবাসী হলেও তিনি ছিলেন আড্ডার ভক্ত তবে পড়াশুনা আর লেখালেখির ব্যাপারে এক মুহূর্ত ছাড় দেন নি। এ বিষয়ে তিনি সদা উন্নীদ্র, আমৃত্যু চঞ্চল। রাষ্ট্র ও সমাজ তার যথাযোগ্য মূল্যায়ন করতে পারেনি বলে একটি সূক্ষ্ণ অভিমান তাঁকে তাড়া ক’রে ফিরতো। 

৩.
সর্বসত্তা নিমগ্ন সাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দকে জানতে, বুঝতে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, গবেষক আহমাদ মাযহারের (Ahmad Mazhar) দ্বারস্থ না হয়ে পারা যায় না। স্বজন মাযহার ভাইকে আবদুল মান্নান সৈয়দ বিশেষজ্ঞ বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না। আমার পরম শ্রদ্ধেয় প্রিয়জন মাযহার ভাই তাঁর প্রয়াণের খবর জেনেই ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘বাংলাসাহিত্যের বিচিত্রতলস্পর্শী সর্বসত্তানিমগ্ন সাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দ আর নেই! জানি অনেকেই বলবেন তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু আমার বিবেচনায় এই কথা দিয়ে তাঁর মহত্ত্ব বা প্রতিভা বা সামর্থ থেকে উত্তরপ্রজন্মের বঞ্চনার কথা বর্ণনা করা যাবে না। বাংলাসাহিত্যের সামগ্রিক অনুভবের এক বিস্তীর্ণ জলাশয় ছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ– এই ত্রয়ী দিকপালকে যে গভীরতায় তিনি পাঠ করেছেন এর সমকক্ষতা আমি আর কারও মধ্যে দেখি না। আমি তাঁর যে নৈকট্য পেয়েছিলাম তার জন্য নিজেকে গর্বিত মনে করি। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও আমাকে ফোন করেছিলেন তাঁর পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে। প্রতিদিন সকাল সাড়ে নয়টার দিকে আর তাঁর ফোন আসবে না!’ ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ: তাঁর আধুনিকতা’ প্রবন্ধে আহমাদ মাযহার স্মৃতিচারণ করে লিখছেন, ‘আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় সত্তরের দশকের শেষের দিকে। তখন আমি ছিলাম সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ তরুণ। লেখার নান্দনিক মর্ম ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারার পর্যায়ে না পৌঁছালেও তাঁর লেখার নতুনত্ব বা স্বাতন্ত্র্য আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। আধুনিক সাহিত্যের মহলে তাঁকে যে তখন বেশ সমীহ করা হতো তা অনুভব করতাম। বাংলা সাহিত্যের ওয়াকিবহাল মহলে যেটুকু বিচরণ ছিল তা থেকে আমি বুঝতে পারতাম যে এর একটি কারণ তাঁর সৃষ্টিকর্মের নতুনত্ব আরেকটি কারণ বাংলাসাহিত্যে তাঁর ব্যাপক পঠনপাঠনপরিধি। বিশেষ করে বাংলা কবিতার মুখ্য-গৌণ সব ধরনের কবিরই কৃতির সঙ্গে তাঁর যতটা অন্তরঙ্গ পরিচয় ছিল ততটা অন্য কারো মধ্যে ছিল দুষ্প্রাপ্য।’ আবদুল মান্নান সৈয়দকে সম্পূর্ণ জানার চেষ্টা করতে চাইলে আহমাদ মাযহার লিখিত, পাঠক সমাবেশ প্রকাশিত ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ সর্বসত্তা নিমগ্ন সাহিত্যিক’ বইটি পাঠ আবশ্যিক হয়ে ওঠে। বইটিতে পূর্বকথা, মন্তব্য ও পরিশিষ্ট ছাড়া চারটি অধ্যায় আছে। শোকোলেখন, স্মৃতিলেখ, মূল্যায়ন ও সাক্ষাৎকার—এই চারটি অধ্যায়ের মধ্যে মূল্যায়ন অধ্যায়টি সবচেয়ে বড়। ‘শোকোকথন’ অধ্যায়ের একমাত্র রচনাটি লেখা হয়েছে আবদুল মান্নান সৈয়দের ইন্তেকালের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। ‘স্মৃতিলেখ’ অধ্যায়ে চারটি রচনা, মূল্যায়ন অধ্যায়ে সাতটি রচনা এবং সাক্ষাৎকার অধ্যায়ে আছে একটি সাক্ষাৎকার। ‘১৯৮৬ : আমার ডায়েরিতে’, ‘কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’ ও ‘আমার বিশ্বাস’ রচনা দু’টি ছাড়া এ বইয়ের বাকি সব রচনাই আবদুল মান্নান সৈয়দের ইন্তেকালের পরে ও আগে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত। এ বইয়ের রচনাগুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে লেখা হলেও বইটির গ্রন্থনা সুন্দরভাবে পরিকল্পিত। ফলে এ বই পাঠ করতে গেলে পাঠকের মধ্যে কোনো বিচ্ছিন্নতাবোধ কাজ করবে না। বইয়ের লেখক আহমাদ মাযহার দীর্ঘকাল আগে আবদুল মান্নান সৈয়দের সান্নিধ্যে এসেছেন, অন্তরঙ্গভাবে মিশেছেন। মান্নান সৈয়দকে নিয়ে লেখকের বিরূপ স্মৃতিও আছে, যা এই বইতে ধৃত। লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে তার সম্পর্কের সবগুলো সূত্রকে এ বইতে হাজির করেছেন। একটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে তিনি ধরতে চেয়েছেন পূর্ণাঙ্গ আবদুল মান্নান সৈয়দকে, যেখানে মাযহার বলেছেন, ‘দীর্ঘ দীর্ঘকাল ধরে আমরা তাঁর নামে বিজয় পতাকা ওড়াব।’ আহমাদ মাযহারের এ বইটি সম্ভবত মান্নান মান্নান সৈয়দের ওপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ একক গ্রন্থ। সেদিক থেকে বইটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। লেখক তার নিজস্ব উপলব্ধি ও চেতনার জায়গা থেকেই মান্নানকে নানাভাবে দেখেছেন, বিচার করেছেন। লেখকের এ আয়োজন আবদুল মান্নান সৈয়দকে নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে নানাভাবে সহায়ক হবে।

৪.
‘আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর দশ প্রবন্ধের দশদিক’ প্রবন্ধে লেখক শাহাবুদ্দীন নাগরী বলছেন, ‘কবি’ হিসেবেই থেকে যেতে পারতেন আমৃত্যু, কিন্তু যাঁর স্বভাব সব দরোজা-জানালা খুলে খুলে দেখা, তিনি কি শুধু কবিতার ঘোরের ভেতরেই মগ্ন থাকতে পারেন? অথবা এমনও হতে পারে তাঁর ভেতরে ‘কবি’ হিসেবে বেঁচে থাকবার আত্মবিশ্বাস  ক্রমেই খর্ব হয়ে যাচ্ছিল! জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) সম্পর্কিত অনুসন্ধান করতে গিয়ে এমন একজন বিশিষ্ট কবির শেষ জীবনের রাশি রাশি অশ্রুকণার ভেতর হয়তো তিনি দেখেছিলেন নিজের প্রতিবিম্ব। জীবনের শেষ কটি বছরে জীবনানন্দের অনেক কবিতা আর কথাসাহিত্য ফেরত এসেছে নামিদামি পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তর থেকে। আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০) একটু একটু করে জেনেছিলেন সব। হয়তো-বা এ-কারণেই তিনি আচ্ছন্নতার ভেতর থেকে নিজেকে টেনে তুলেছিলেন মননশীল পৃথিবীতে। কবিতা লেখার চেয়ে অন্যের কবিতা নিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন তাঁর বহুমাত্রিক-বহুরৈখিক কর্মকান্ড। ১৯৭২ সালে জীবনানন্দ-বিষয়ক প্রথম গবেষণাগ্রন্থ শুদ্ধতম কবি প্রকাশিত হলে আবদুল মান্নান সৈয়দ খুঁজে পান তাঁর পদচারণার জগৎ। গল্প-উপন্যাস বা কথাসাহিত্য নিয়েও তাঁর নিজস্ব একটা জগৎ হতে পারত, ১৯৬৮ সালে সত্যের মতো বদমাশ প্রকাশিত হলে সমসাময়িক সাহিত্য-পরিমন্ডলে ব্যতিক্রমী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। পরাবাস্তববাদের ছোবল এখানেও তাঁকে নীলকণ্ঠী বিষে অনন্য করে তুলেছিল। কিন্তু তিনি বারবার ফিরে এলেন তাঁর প্রিয় জগতেই। গবেষণা-প্রবন্ধ লেখায় তিনি এতোই মগ্ন হয়েছিলেন যে, তাঁর পরিচিতির ডানা বাড়তে লাগল ওদিকেই। তাঁর বড়ো পরিচয় হয়ে উঠলো ‘গবেষক-প্রাবন্ধিক’ হিসেবে।’

৫.
আবদুল মান্নান সৈয়দ ১৯৪৩ সালের ৩ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সৈয়দ এ এম বদরুদ্দোজা এবং মা আনোয়ারা মজিদ। পিতা সৈয়দ এ. এম. বদরুদ্দোজা (১৯১০-৮৯) ছিলেন সরকারী চাকুরে; সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী। যৌবনে উর্দ্দুতে কবিতা লিখতেন। মান্নান সৈয়দের লেখালেখির জন্য গ্রীন রোডের বাসায় উঠানের একপাশে আলাদা দোচালা ঘর তুলে দিয়েছিলেন। মাতা কাজী আনোয়ারা মজিদও সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। তাঁরা ছয় ভাই, চার বোন। বিয়ে করেছিলেন চাচাতো বোন সায়রা সৈয়দ রানুকে। একমাত্র কন্যার নাম জিনান সৈয়দ শম্পা। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকার নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৬০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আই এ পরীক্ষায় পাস করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৬৩ সালে স্নাতক সম্মান এবং ১৯৬৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি এইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

৬.
সিলেট এম সি কলেজে প্রভাষক পদে চাকরির মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরে তিনি শেখ বোরহানউদ্দিন কলেজে কিছু সময় এবং জগন্নাথ কলেজে দীর্ঘ সময় অধ্যাপনা করে জীবন অতিবাহিত করেন, ১৯৯৮ সালে উক্ত কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পরে তিনি বাংলাদেশ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রথম স্কলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার-এ স্বল্প সময়ের জন্য কাজ করেন। তিনি ২০০২ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। মাসিক সাহিত্য পত্রিকা শিল্পতরু-তে তিনি দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। 

৭.
আবদুল মান্নান সৈয়দ ১৯৬০ সাল থেকে কবিতা লেখা শুরু করেন এবং পাঁচ দশক ধরে লেখা অব্যহত রাখেন। তাঁর প্রথম গ্রন্থ জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। তাঁর কবিতায় কখনো মৃত্যুচেতনা, কখনো রোমান্টিকতা, কখনো সুররিয়ালিজম, প্রতীকধর্মী আবার কখনো এ্যাবসার্ডধর্মী ভাবনার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। একজন নিরীক্ষাধর্মী গবেষক হিসেবে আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর লেখার বিষয় ও রচনা রীতিতে পুনঃপুন পরিবর্তন আনয়নে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি কবিতায় প্রায়ই চাঁদ, সূর্য, আকাশ ও মেঘকে চিত্রকল্পের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাছাড়া আবদুল মান্নান সৈয়দ ছন্দ বিষয়ে বেশ পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। প্রবোধচন্দ্র সেন ও শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ছিলেন তাঁর ছন্দবিষয়ক শিক্ষক।

৮.
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাহিত্য সমালোচক ও সম্পাদক আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দ ও নজরুল সাহিত্যের অন্যতম গবেষক ছিলেন। তাছাড়া তিনি ফররুখ আহমদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, সমর সেন, বেগম রোকেয়া, আবদুল গনি হাজারী, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, প্রবোধচন্দ্র সেন প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদককে নিয়ে গবেষণা করেছেন।

৯.
কবিতা, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ-গবেষণা, কাব্যনাটক, স্মৃতিকথাসহ তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: কবিতা জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭), নির্বাচিত কবিতা (১৯৭৫), কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (১৯৮২), পরাবাস্তব কবিতা (১৯৮২), পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি (১৯৮৩), মাছ সিরিজ (১৯৮৪), নির্বাচিত কবিতা (২০০২); ছোটগল্প সত্যের মতো বদমাশ (১৯৬৮), চলো যাই পরোক্ষে (১৯৭৩), মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা (১৯৭৭); উপন্যাস পরিপ্রেক্ষিতের দাসদাসী (১৯৭৪),অ-তে অজগর (১৯৮২), গভীর গভীরতর অসুখ (১৯৮৩), ক্ষুধা প্রেম আগুন (১৯৪৪), শ্রাবস্তীর দিনরাত্রি (১৯৯৮); প্রবন্ধমূলক গবেষণা জীবনানন্দ দাশের কবিতা (১৯৭৪). নজরুর ইসলাম: কবি ও কবিতা, করতলে মহাদেশ (১৯৭৯), ছন্দ (১৯৮৫), রবীন্দ্রনাথ (২০০১), আবদুল গনি হাজারী (১৯৮৯), সৈয়দ মুর্তজা আলী (১৯৯০), প্রবোধচন্দ্র সেন ((১৯৯৪); নাটক/কাব্যনাটক চাকা (১৯৮৫),নাট্যগুচ্ছ (১৯৯১), কবি ও অন্যেরা (১৯৯৬); অনুবাদ কবিতা মাতাল মানচিত্র (১৯৭০); সম্পাদনা গ্রন্থ ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৭৫), সমালোচনা সমগ্র: জীবনানন্দ দাশ (১৯৮৩), বাংলাদেশের কবিতা (যৌথ, ১৯৮৮), সমর সেনের নির্বাচিত কবিতা ((১৯৮৯), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সুনির্বাচিত কবিতা (১৯৯০), মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী রচনাবলী (প্রথম খন্ড-১৯৯০, ২য় খন্ড-১৯৯২), মাইকেল মধুসূদন দত্ত: শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯২); শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ: বেগম রোকেয়া (২০০২)।

১০.
সাহিত্যে বিশিষ্ট অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার; ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্র কর্তৃক ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার; ১৯৯৮ সালে নজরুল পুরস্কার (চুরুলিয়া, বর্ধমান, পশ্চিম বাংলা); ২০০১ সালে নজরুল ইনস্টিটিউট কর্তৃক নজরুল পদক; ২০০০ সালে তালিম হোসেন পুরস্কার, লেখিকা সংঘ পুরস্কার এবং ২০০২ সালে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। 

১১.
মৃত্যুর আগে দু’বার হার্ট এটাক তার জীবনী শক্তি অনেকখানি ক্ষয়ে ফেলেছিল। তাঁর অস্তিত্বে সেঁটে গিয়েছিল এক অনপনেয় বিষণ্ণতা। একটি কবিতায় তিনি মৃদু কণ্ঠে বলেছেন: “আনন্দ কাকে বলে—আজ আর মনে নেই আমার।” তবে মৃত্যুঅবধি তিনি ছিলেন একজন জীবিত মানুষ। তাই জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে জীবন দর্শনের পুনমূর্ল্যায়ন করে বলেছিলেন, “একটা বয়সে এসে বুঝতে পারছি, আমি চারপাশে তাকাইনি। দ্বিতীয়বার হৃদরোগের পরে, দীর্ঘকাল শয্যাশায়ী থেকে আমি আমার আশপাশে মানুষদের দেখলাম- আমার পাড়ার মানুষেরা, বাজারের লোকজন, খুব সাধারণ মানুষদের। বুঝতে পারছি, যাদের দিয়ে আমার জীবন চলছে, তাদের জন্য আমি কোনো কিছু করিনি।”[ মান্নান সৈয়দ ছিলেন সাহিত্যের ঘোর লাগা মানুষ। তিনি আপাদমস্তক একজন কবি, সাহিত্যকর্মী। ছোট কাগজের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা। তাঁর নিজের লেখায়ই তো আছে, ‘আমি ষাটের দশকের লিটিল ম্যাগাজিনের আন্দোলনসমূহের জাতক। তবে ষাটের দশকের উপান্ত থেকেই আমি বড় কাগজগুলোর সঙ্গেও যুক্ত হতে থাকি।’

১২.
‘আবদুল মান্নান সৈয়দের বন্ধুতা ও সাহিত্য আড্ডা’ শিরোনামের এক লেখায় প্রাবন্ধিক এবং বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ রচনাবলি’র সম্পাদক অনু হোসেন লিখেছেন, ‘বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, জাতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতিমূলক অনুষ্ঠান, গবেষণাকাজে সব সময় মান্নান সৈয়দের উপস্থিতি ছিল অবিরল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সময়ের ভাষ্যকার। জাতীয় পর্যায়ের রবীন্দ্র-নজরুল বিষয়ক জয়ন্তী ও মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন অনিবার্য বক্তা। তাঁর মতো আত্মবিশ্বাসী দৃঢ়চেতা বক্তা সমকালে আর একজনকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। তিনি ছিলেন কতকগুলো জাতীয় অনুষ্ঠানের অদ্বিতীয় বাগ্মী। তাঁর চিন্তা ও বাচনিকতায় প্রকাশ পেত মৌলিকতা, তীক্ষ্ণতা এবং একইসঙ্গে প্রবল আবেগময়তা। তথ্য উপস্থাপনমূলক রচনা কিংবা তত্ত্ব-উদ্ধারী ব্যাখ্যায় তাঁর স্বভাবসুলভ আবেগাত্মক সাহিত্যিক ভঙ্গি সব সময় বজায় থাকত। জীবনের শেষ দশটি বছর হৃদরোগ নিয়ে কাটালেও তাঁর স্বভাবসুলভ স্পষ্টসুন্দর বাচনিকতায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। আমৃত্যু তাঁকে দেখা গেছে বিশুদ্ধ উচ্চারণে ও মসৃণ অ্যাকসেন্টে কথা বলতে। মননপ্রধান রচনায়ও তিনি আবেগময়তার সংস্থান দিয়ে সৃষ্টি করতে পারতেন প্রবল সংহতি। শুধু রবীন্দ্র-নজরুল কেন, চর্যার পদকারদের কাল থেকে আরম্ভ করে বৈষ্ণব পদাবলি, ভারতচন্দ্র, ঈশ্বরগুপ্ত, লালন কিংবা মধুসূদনসহ উনিশ-বিশ-একুশ শতকের যেকোনো সমকালীন সাহিত্যিকের জীবন বিশ্লেষণ ও সাহিত্যকর্ম মূল্যায়নে তাঁর দক্ষতা ছিল অভূতপূর্ব। পেরিয়ে আসা পুরোনো কালের চেয়ে তিনি বেশি কাজ করেন আধুনিক কাল নিয়ে। বলা চলে তাঁর বিশেষ দুর্বলতার ক্ষেত্রও ছিল আধুনিক কালের সাহিত্য। পূর্বজ ও সমকালীন বিশ্বের তুলনামূলক সাহিত্যতত্ত্ব পর্যবেক্ষণেও ছিল তাঁর স্বচ্ছ দৃষ্টি। সাহিত্যের যেকোনো বিষয়ে তাঁর পাঠ ও পাঠোত্তর অর্জিত জ্ঞান ছিল ঈর্ষণীয়। মান্নান সৈয়দ যখন সাহিত্যমঞ্চের ভাষ্যকার হিসেবে অবতীর্ণ হতেন, তখন দেখা যেত তাঁর রেফারেন্স প্রয়োগে প্রবল আত্মবিশ্বাসী অবস্থান। সাহিত্যপাঠের সারি সারি তথ্যকে তিনি অনায়াসে আলোচনার সমর্থনে যুক্ত করতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। কোনো গতানুগতিক মত কিংবা পূর্বগৃহীত কোনো মন্তব্যকে তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেওয়া কিংবা প্রতিধ্বনি করার দিকে উৎসাহী ছিলেন না মোটেই। প্রতিটি পদক্ষেপে স্বকীয়তাকে তিনি প্রধান অবলম্বন মনে করতেন। এইসব গুণের সমর্থনে তাঁকে সহায়তা দিয়েছে তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও শ্রমনিষ্ঠ মন। তাঁর আলোচনা বা বক্তব্যমাত্রই হত স্বতঃস্ফূর্ত, ক্ষিপ্র, মৌলিক ও আবেগময়ী। মান্নায় সৈয়দকে যাঁরা খুব নিকট থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, দেখেছেন লেখায় এবং বলায় দুই রূপেই তিনি সমভাবে প্রাণবান ও সফল। বলার ক্ষেত্রে তাঁর সুস্পষ্ট ও প্রমিত উচ্চারণ অন্য আলোচকদের চেয়ে পৃথক করেছে সব সময়। তবে বলা না লেখা, ভাষ্যদাতা না লেখকতা কোন রূপে তিনি নিজের কাছে বেশি প্রশান্তি পান। নিশ্চয় লেখক হিসেবে কলম-কাগজের লেখকতা রূপই তাঁর ভালো লাগার কথা। তিনি অকপট বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত শাদা কাগজের পৃষ্ঠায় অক্ষর বসিয়ে যাওয়ার চেয়ে আনন্দ পাইনি আর কোথাও। আজো পাই না। ছাপার অক্ষরে এক জিনিশ, সম্প্রচার এক জিনিশ;- কিন্তু যে-মহূর্তে একটি কবিতা লিখে উঠলাম, একটি গল্প লেখা শেষ হলো, একটি প্রবন্ধ দাঁড় করালাম, নির্মিত হল একটি নাটক- সেই মুহূর্তে পৃথিবীতে নক্ষত্র নেমে আসে আকাশ থেকে; মাটি অর উদ্ভিদ, মানুষ আর পাখি, আনন্দ ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে এক সিরাপ উড়ো নদীর মতো প্রবাহিত হতে থাকে।’

১৩.
কবি বেলাল চৌধুরী স্মৃতিচারণমূলক ‘মান্নানের জন্য কুড়িয়ে-বাড়িয়ে’ লেখায় মূল্যায়ণ করছেন এভাবে, ‘বহু বৈপরীত্যে গড়া আবদুল মান্নান সৈয়দকে আমার বরাবরই বড় জটিল আর রহস্যময় মনে হয়েছে। একই কলমে তিনি লিখেছেন সাত সাগরের মাঝির কবি ফররুখ আহমদ ও শাহাদাত হোসেনের ইসলামি কবিতা নিয়ে। আবার অন্যদিকে লিখেছেন ঋষিপ্রতিম রণেশ দাশগুপ্তর ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ মনোগ্রাহী আলোচনা। কোথাও বিন্দুমাত্র আতিশয্য নেই। নির্মোহ চোখে যা কিছু দেখেছেন, তারই বিচার-বিশ্লেষণের নির্যাস নির্মাণের বিরাট ক্ষমতা না থাকলে এ ধরনের কাজ প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে মান্নান পুরো মাত্রায় সফল।’ কবি বেলাল চৌধুরী আরো লিখছেন, ‘মাঝেমধ্যে মনে হয়, ‘কবিরে পাবে না তার জীবনচরিতে’—এই কথা অশোক সৈয়দ অথবা আবদুল মান্নান সৈয়দের ক্ষেত্রে খুব একটা খাটে না। নিজের লেখালেখির মধ্যে তিনি প্রবলভাবে অস্তিমান। জীবদ্দশায় নিজের লেখালেখি ও পড়াশোনার চুলচেরা বিশ্লেষণ এমনভাবে করে গেছেন, এককথায় একে বিস্ময়কর বললেও কম বলা হয়। জীবনের পড়ন্ত বেলায় আক্রান্ত হয়েছিলেন রোমান্টিকতায়। এটা যেমন তাঁর শেষ দিকের কবিতা-গল্প তথা লেখায় সুস্পষ্ট, তেমনি ওই লেখার মধ্যেই আবার রয়েছে নিজের সম্পর্কে তাঁর সরল কিন্তু ক্ষুরধার বক্তব্য, ‘আমি তো অসামাজিক মানুষ, একদম পুরোপুরি। মানুষের সঙ্গে মিশতে পারি না। যেটুকু মিশতে দেখো, সে আমার ছদ্মবেশ। কিন্তু মনে রেখো, সাধারণ মানুষকেই ভালোবেসেছি আমি, আর যা-ই হোক, অসাধারণ খেতাব আমাকে দিয়ো না। আমি বাড়িতে নির্দেশ দিয়ে রেখেছি, আমাকে যেন কবর দেওয়া হয় আজিমপুর গোরস্থানে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে, আব্বা-আম্মার সঙ্গে। ঘৃণা করি তোমাদের ভদ্দরলোক সমাজকে, যারা কারও মৃত্যু হলে কোথায় কবর দেওয়া হলো, সেটা জিগ্যেস করে। ছিঃ, কবর বাঁধাই করে রাখা হবে, স্মৃতিফলক দিয়ে রাখা হবে, এ রকম ঘৃণ্য লোক দেখানো প্রবণতাকে ধিক্কার দিই আমি। তোমরা যারা সুশীল সমাজের মানুষ, তারা এই সব নিয়ে তর্কে প্রবৃত্ত হও। আমার কথা, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মধ্যে আমি কে? আমি তো একটা বুদ্বুদ মাত্র—’। বহু বৈপরীত্যে গড়া আবদুল মান্নান সৈয়দকে আমার বরাবরই বড় জটিল আর রহস্যময় মনে হয়েছে। একই কলমে তিনি লিখেছেন সাত সাগরের মাঝির কবি ফররুখ আহমদ ও শাহাদাত হোসেনের ইসলামি কবিতা নিয়ে। আবার অন্যদিকে লিখেছেন ঋষিপ্রতিম রণেশ দাশগুপ্তর ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ মনোগ্রাহী আলোচনা। কোথাও বিন্দুমাত্র আতিশয্য নেই। নির্মোহ চোখে যা কিছু দেখেছেন, তারই বিচার-বিশ্লেষণের নির্যাস নির্মাণের বিরাট ক্ষমতা না থাকলে এ ধরনের কাজ প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে মান্নান পুরো মাত্রায় সফল।’

১৪.
আবদুল মান্নান সৈয়দের জন্মদিনকে সামনে রেখে সম্প্রতি (২৯ জুলাই, ২০১৬) দৈনিক সমকালের ‘কালের খেয়া’য় প্রকাশিত একনিষ্ঠ গবেষক, প্রাবন্ধিক, লেখক আহমাদ মাযহার ‘জন্মদিনে রচনাবলির আলোয়’ রচনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করেছেন। সেখান থেকে নির্বাচিত অংশ পাঠ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। মাযহার ভাই লিখছেন, ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ একাধারে ছিলেন সৃষ্টিশীল ও মননশীল সাহিত্যিক। বিশেষ করে কবিতা ও ছোটগল্পে তার সৃষ্টিশীলতা এক সময় সাহিত্যামোদী পাঠকদের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। বিশেষ করে তার ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ [১৯৬৭], ‘জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা’ [১৯৬৯] কিংবা ‘ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ’ [১৯৭৪] নতুন সুর তুলেছিল বাংলাদেশের কবিতা ভুবনে। প্রথম বইয়েই তিনি বাংলা ভাষার প্রথম পরাবাস্তবতার কবি বলে চিহ্নিত হয়েছিলেন। কবিতা রচনায় তিনি যেমন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন, তেমনই তরঙ্গ তুলেছিল তার গল্পও। তার গল্প-সংকলন ‘সত্যের মতো বদমাশ’ [১৯৬৮] কিংবা ‘চলো যাই পরোক্ষে’ও [১৯৭৩] বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে একদা ছিল বহুল উলি্লখিত বিষয়। এর পাশাপাশি চলেছে তার প্রবন্ধ-সমালোচনা-প্রয়াস। তার ‘শুদ্ধতম কবি’ [১৯৭২] জীবনানন্দ-অনুধাবনে নতুন করে উৎসাহী করে তুলেছিল বাংলা কবিতার পাঠকদের। পাশাপাশি নজরুল চর্চায় ‘নজরুল ইসলাম কবি ও কবিতা’ও [১৯৭৭] উল্লেখযোগ্য। জীবনানন্দ বিচারের মতোই নজরুল বিবেচনাতেও তার নন্দনতাত্তি্বক দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশে নজরুল চর্চায় গতি এনেছিল। ভুলে গেলে চলবে না, এ সবকিছুর পাশাপাশি চালু থেকেছে তার রবীন্দ্রচর্চাও [২০০১]। দীর্ঘকালের রবীন্দ্রচর্চার সমন্বিত ফসল তার ‘রবীন্দ্রনাথ’ বইটিও নান্দনিক দৃষ্টিতে রবীন্দ্র-বিবেচনায় মূল্যবান। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ চর্চায়ও আবদুল মান্নান সৈয়দের কৃতি স্মরণীয়- ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’ [১৯৮৬] কিংবা ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ :অগ্রন্থিত রচনাগুচ্ছ অপ্রকাশিত আলোকচিত্র’ [২০০১]। বেগম রোকেয়া ও ফররুখ আহমদ চর্চায়ও তার নিবিষ্টতা লক্ষণীয়=-‘বেগম রোকেয়া’ [১৯৮৩], ‘ফররুখ আহমদ :জীবন ও সাহিত্য’ [১৯৯৩]। সাহিত্যের বিচিত্র প্রসঙ্গে লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ। বিশেষ করে ‘করতলে মহাদেশ’ [১৯৭৯] ‘দশ দিগন্তের দ্রষ্টা’ [১৯৮০], ‘আমার বিশ্বাস’ [১৯৮৪] কিংবা দুই খণ্ডে ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ [১৯৭৬ ও ১৯৮৭] বইগুলোতে বিচিত্র ধরনের সাহিত্যিক প্রবন্ধ ও সমালোচনার নিদর্শন রেখে সাহিত্যরসিকদের ভালোবাসা পেয়েছিলেন। ‘ঈশ্বর গুপ্ত থেকে শহীদ কাদরী’ [২০০৭] কিংবা ‘রবীন্দ্রনাথ থেকে শহীদুল জহির’ [২০১১] বইয়ে বাংলা ভাষার বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট কবি ও কথাসাহিত্যিককে ধারণ করেছেন মূল্যায়নের মাধ্যমে। লিখে চলছিলেন সমসময়ের সাহিত্য-সংশ্লিষ্ট স্মৃতিকথা। তার নাট্য ও কাব্যনাট্য-প্রসঙ্গই বা অনুলি্লখিত থাকে কী করে! বাংলাদেশের সাহিত্যের বহু অনুলি্লখিত প্রদেশে আলো ফেলে চলেছিলেন তিনি। সৃষ্টি ও কর্মে যখন সার্বক্ষণিক তখনই তার আকস্মিক প্রস্থান [৫ সেপ্টেম্বর ২০১০]। জন্মদিনে [৩ আগস্ট] সাহিত্যের এই প্রেমিক ও স্রষ্টাকে স্মরণ করছি তার রচনাবলির সামগ্রিকতার আলোকে।

১৪.২
আবদুল মান্নান সৈয়দের ৭৩তম জন্মদিনলগ্নে ইতিমধ্যে রচনাবলির চারটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। ৫ম খণ্ডও প্রকাশের পথে। রচনাবলি সম্পাদনার ভার দেওয়া হয়েছে কবি-গবেষক অনু হোসেনকে, যিনি আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পর্কে যেমন ওয়াকিবহাল, তেমনি আপন অভিজ্ঞতায় ও আবদুল মান্নান সৈয়দের দীর্ঘ সাহচর্যে সম্পাদনাকর্মেও দক্ষ। সেই দক্ষতার পরিচয় সম্পাদক অনু হোসেন ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ রচনাবলি’ উপস্থাপন করতে গিয়ে দিতে পেরেছেন। অনু হোসেনের সম্পাদনা ও বংলা একাডেমির দায়িত্বশীলতায় আবদুল মান্নান সৈয়দ কীভাবে ও কতটা ধৃত হয়েছেন, তা পর্যালোচনা করে দেখতে পারি আমরা। সৃষ্টির প্রাচুর্যে ও তাৎক্ষণিক খেয়ালিপনার কারণে আবদুল মান্নান সৈয়দের রচনা বিভিন্ন বইয়ে বিচিত্রভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। তা ছাড়া ভুলে গেলে চলবে না, তিনি বিচিত্র মাধ্যমের লেখক। ফলে তার সমগ্রকে বিন্যস্ত করাও কঠিন। 

১৪.৩
আবদুল মান্নান সৈয়দ দীর্ঘকাল সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন। কিন্তু শ্রেণীকক্ষে গতানুগতিকতা ও পুনরাবৃত্তির চর্চা করেননি। ইতিমধ্যে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত রচনাবলির মধ্য থেকে আমরা একজন অবিরল সৃষ্টিমুখর ও মননদীপ্ত লেখককেই খুঁজে পাই। বৈচিত্র্য ও গভীরতা, সাধনা ও নিমগ্নতায় তার তুল্য মানুষ সমগ্র বাংলা ভাষার সাহিত্যেই কম পাওয়া যাবে। কারণ, দেখা গেছে কবিতায় যিনি এতটা নিবিষ্ট তার পক্ষে ধারাবাহিকভাবে কথাসাহিত্যে এতটা সক্রিয় থাকা কঠিন। আবার গবেষণায় যিনি এতটা বিচিত্রচারী, তার পক্ষে কবিতা ও কথাসাহিত্যে এতটা সৃষ্টিক্ষম থাকা খুব কঠিন। বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সামগ্রিক ইতিহাস রচনায় আবদুল মান্নান সৈয়দের খুঁটিনাটি আবিষ্কার আরও বহুকাল উৎস হয়ে থাকবে। বহু গবেষকের পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবেন তিনি এই রচনাবলির সূত্রে। আশা করি, বাংলা একাডেমি যথাসম্ভব দ্রুত রচনাবলির বাকি খণ্ডগুলোও প্রকাশ করবে।

১৫.
কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ-এর কবিতা পাঠ করা যেতে পারে।-

১৫.২
শুধু তোমাকে সালাম– আর কাউক্কে তোয়াক্কা করি না, 
আর-সব-পায়ে-দলা মুথাঘাস– শুধু তুমি ঘাসে রত্নফুল, 
আর-সব নোংরা টাকা-পয়সার মতো : হাতে-হাতে ঘোরে-ফেরে– 
শুধু তুমি অমল-ধবল তুমি, 
তোমার আহারে শুধু ঘড়ি লাগে– আর-কিছুই রোচে না তোমার, 
নামো ঝরনা ফাটিয়ে পাথর– সৃষ্টি তার মুখোশ ছিঁড়েছে, 
বস্তুর বিরুদ্ধে শুধু অফুরান প্রজাপতি ওড়ে ॥ 
(সৃষ্টিশীলতার প্রতি)

১৫.৩
‘একি, আপনি বাজারে? কবিশাহেব, আপনিও কি বাজার করেন?’ 
–হ্যাঁ, আমাকেও বাজার করতে হয়, 
আমাকেও তেল-নুন-মাংসের হিশেব কষতে হয়– 
আমি নই বায়ুভুক রবীন্দ্রনাথ। 
কবিতাকেও হতে হয় পৌরুষেয়– 
শুধু নারীলাবণিগ্রস্ত নয়। 
বসন্তের সংঘর্ষে জ্বলে উঠতে হয় আগুনের মতো। 
জীবনানন্দকেও একদিন খালি গায়ে দুই হাতে দুই ভরা পানির বালতি 
বয়ে নিয়ে যেতে দেখেছিলেন 
অনুজ কবি আলোক সরকার আর অন্ধকার রায় ॥ 
(আলোক সরকার আর অন্ধকার রায় )

১৫.৪
এখানে কবিতা বানানো হয়। 
সব ধরনের কবিতা। 
রাজনীতিক কবিতা, সামাজিক কবিতা। 
নাগরিক কবিতা, গ্রামীণ কবিতা। 
প্রেমের কবিতা, শরীরের কবিতা। 
স্বপ্নের কবিতা, বাস্তবের কবিতা। 
চল্লিশের কবিতা, পঞ্চাশের কবিতা। 
ষাটের কবিতা, সত্তরের কবিতা। 
আশির কবিতাও আমরা বাজারে ছাড়ছি শিগগিরই। 
কবিতার হাত, পা, মাথা, ধড়, 
শিশ্ন, যোনি, চুল, নখ, 
চোখ, মুখ, নাক, কান, 
হাতের আঙুল, পায়ের আঙুল– 
সব-কিছু মওজুদ আছে আমাদের এখানে। 
স্বদেশি ও বিদেশি উপমা ও চিত্রকল্প, 
শব্দ ও ছন্দ, 
অন্ত্যমিল ও মধ্যমিল 
লক্ষ লক্ষ জমা আছে আমাদের স্টকে। 
ব্যাঙের ছাতার মতো আরো অনেক কবিতার কোম্পানি 
গজিয়েছে বটে আজকাল। কিন্তু, 
আপনি তো জানেনই, 
আমাদের কোম্পানি ইতোমধ্যেই বেশ নাম করেছে। 
আর ফাঁকি দিয়ে কি খ্যাতি অর্জন করা সম্ভব, 
বলুন? 
হ্যাঁ, আপনার অর্ডার-দেওয়া কবিতাটি এই-তো তৈরি হয়ে এলো। 
চমৎকার হয়েছে। 
ফিনিশিং টাচ শুধু বাকি। 
একটু বসুন স্যার, চা খান, 
কবিতার কয়েকটা ইস্ক্রুপ কম পড়ে গেছে আমাদের, 
পাশের কারখানা থেকে একছুটে নিয়ে আসবার জন্যে 
এখখুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি লতিফকে। 
(কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড)
১৫.৫
লোকে জিগেস করে— 
তোমার কবিতায় এত বিষণ্ন রঙ কেন আজকাল? 
কোনো জবাব দিই না। 
বলব কি পিকাসোর উত্তরটি? 
তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। 
পিকাসো প্যারিসে তাঁর স্টুডিওয়। 
স্পেনের একটি গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেল জর্মান বোমা বর্ষণে। 
গের্নিকা। 
পিকাসো সেই বিধ্বংস গ্রামের ছবি আঁকলেন ক্যানভাসে। 
জর্মান সৈনিকরা প্যারিসে ঢুকে পড়ল একদিন। 
স্টুডিওয় ঢুকে পিকাসোকে জিগেস করল— 
এই ছবি কি তুমি এঁকেছ? 
উত্তর দিলেন পিকাসো— 
না। এসব এঁকেছ তোমরা।— 
—মুশকিল হলো আমি মুখ ফুটে কথা বলতে পারি না। 
না হলে বলতাম লোকজনকে— 
যে-বিমর্ষতা দেখছ আমার কবিতায়, 
তার কারণ এক ভয়ংকর বোমারু বিমান। 
আমার শান্ত সবুজ নদী-বয়ে যাওয়া গ্রামটির ওপরে 
অহৃদয় বোমার পর বোমা ফেলে 
এ রকম তছনছ করে দিয়েছে যে— 
তাকে আমি চিনি। 
শুধু তার নাম আমি তোমাদের বলব না। 
পিকাসোর মতো সাহস নেই আমার। 
তখন শুধু সেই শ্যামল গ্রামটির স্মৃতি 
আমাকে কষ্ট দিচ্ছে এত। 
তাই আমার কবিতায় আজকাল দ্যাখো এত বিমর্ষতা। 
আনন্দ কাকে বলে—আজ আর মনে নেই আমার। 
আমার সেই গ্রামে তাবত্ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে 
শুধু একটি গাছ 
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 
যার ডালে একটিও পাখি বসে না আজ আর। 
যার কোনো ফুল ফোটে না। 
কোনো ফলও না। 
শুধু কী এক গভীর ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। 
আমি সেই গাছ। 
সেই গাছ। 
(একটি গ্রামের কথা)

(অকৃপণ ঋণ / তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, ইন্টারনেট)

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত