অমৃত ব্যঞ্জন

 

সকাল আটটার সময় আমাকে অফিস যাবার জন্য বাসে উঠতে হয়। অফিস আমাদের শহর থেকে ষোল কিলোমিটার দূরে। অফিসে হাজিরা ঠিক সময়ে দিতে হয়। আমার ফিরতে ফিরতে রাত আটটাও হয়ে যায় কোন কোন দিন। কোনদিন কাজ কম থাকলেও আগে বের হবার নিয়ম নেই। বলে রাখাই ভালো যে আমি একটি ছোট ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার।

আজ বের হবার সময় আমার স্ত্রী বলল, ‘আজ সেই শরঞ্জা গ্রামের কবিরাজের কাছে একবার যেতে চেষ্টা করো।’ আমি আচ্ছা বলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম।
শরঞ্জা গ্রামে একজন সাঁওতাল কবিরাজ আছে। তার নাম শালখান মুর্মূ। আমার ব্রাঞ্চের জীবন আমার বাসায় একবার এসে আমার অসুস্থ মেয়েকে দেখে অন্য সবার মতোই পরামর্শ দিল। আমার মেয়ের বয়স যখন পনেরো ষোল বছর। ওপর থেকে হঠাৎ দেখলে তাকে অসুস্থ মনে করবার কোন কারন নেই। সে আংশিক জড়বী । এই আংশিক ব্যাপারটা আশি শতাংশের মতো। তার ওপর সে জন্মাবধিই মৃগী রোগের শিকার। এই পনেরো ষোল বছরের মধ্যে এলোপ্যাথিতে যতদূও চিকিৎসা এদেশে সম্ভব সব আমরা করেছি। শেষ পর্যন্ত একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে আর দৌড়াদৌড়ি করি না। স্থানীয় একজন ডাক্তারের পরামর্শে নিয়মিত কিছু ওষুধ খাইয়ে যাই তাকে। তাতে যতটুকু সুস্থ থাকে। একসময় তো সবই মেনে নিতে হয়। কিন্তু আত্মীয়-স্বজন আর শুভানুধ্যায়ীর তো সত্যিই অভাব নেই। তারা যথার্থই আমাদের ভালোবাসে, আমাদের মেয়েকে ভালোবাসে। তার জন্য কষ্টও পায়। আমি এই কথাগুলো যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে বললেও , আমি জানি যে, তারা আমার এই বক্তব্যেও কষ্ট পাবে। তাদের কেউ কেউ সত্যিই আন্তরিকতার সাথে বিশ্বাস করে যে, ভারতবর্ষের অমুক অমুক জায়গায়, অমুক অমুক হাসপাতালে গেলে, আরো নির্দিষ্ট করে ডাঃ অমুক কিংবা ডাক্তার তমুকের কাছে সময়মতো গেলে একেবারে নিশ্চিত আরোগ্য হতো আমার মেয়ের। এসব তো গেল হাসাপাতাল, ডাক্তার এদেও কথা। এরপর আছে হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি, হাইড্রোপ্যাথি, ন্যাচারোপ্যাথি, এইসব। এর সঙ্গে সঙ্গেই এসেছে সাধু, ফকির, কালীসাধক, ঋপ্রাদ্য, ওঝা, ঝাড়ফুঁক, আরো কত কী সৌভাগ্যক্রমে আমি এবং আমার স্ত্রী ছোট বয়েস থেকেই নাস্তিক। তাই যতদূও সম্ভব আমার কন্যার চিকিৎসা যুক্তিগ্রাহ্য ডাক্তারি পদ্ধতিতেই করিয়েছি। তাদেও উপদেশ তো একবারে অগ্রাহ্য করা যায় না। আমাদেও তো স্বজনদেও সঙ্গে সমাজের সঙ্গেই থাকতে হয়। একসময় হতাশায় ধৈয্যচ্যুতি ঘটল আমার স্ত্রীর। হয়তো কারো পরামর্শে সে বুঝল যে ধাতুর কিংবা ভোজের তো দ্রব্যগুণ আছে। তাছাড়া কত কিছুই তো আমরা জানি না! ফলে আরেক জায়গায় আমাদের যেতে হলো মেয়েকে নিয়ে। দূরবর্তী জায়গায় এবং পৌঁছানো কষ্টকর এমন জায়গায়। আমাদের কষ্টের কথা ছেড়ে দিলেও অবোধ মেয়েটার কষ্ট বড় বাজত। শেষে একসময় স্বজন শুভানুধ্যায়ীকেও মুখের ওপর বলে দিতে শিখলাম যে, না ওসব কিছু করবো না আমরা। তারপর আমার অফিসের জীবন এসে আমার স্ত্রীকে শালখান মুর্মূর কথা বলল। জীবন নিজেও সাঁওতাল ঘরের ছেলে। জীবন বাস্কে আমাদের অফিসের থার্ড অফিসার। বলল, বৌদি, খুব নামী কবিরাজ, এ জেলা ছাড়িয়ে আশেপাশের দু’ তিনটা জেলা থেকেও ডাক আসে। গাছ-গাছড়ার ওষুধই তো বুজরুকি নয়। দাদাকে একবার রাজি করান আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। স্ত্রী কদিন ধরেই বলছিলো, আজ একেবারে নির্দিষ্ট করে গ্রামের নামটাই বলে ফেলল। শরঞ্জা! ঠিক মনে রেখেছে। গলায় একটু গাম্ভীর্যও আছে। আসলে ক-দিন ধরেই বলছিলো তো! অফিসে এসে জীবনকে বললাম এসব ফ্যাসাদ কর কেন বলতো? এখন কোথায় সেই শরঞ্জা যেখানে যেতে হবে কবিরাজের ওষুধ আনতে।

জীবন বলল, ‘আপনার কোন চিন্তা নেই দাদা। আপনি গিয়ে শুধু আমার নাম বলবেন। আজ তো আবার ব্লকে মিটিং আছে, নাহলে- ’ আমি বললাম তোমাকে যেতে হবে না। ব্লক অফিসের মিটিংটা জরুরি। তুমি সেখানেই যাও। অফিসের সেকেন্ড অফিসারের ওপর দায়িত্ব দিয়ে সাইকেলটা নিয়ে বের হলাম। একই দিকে ব্লক অফিস। জীবনও আমার সাথে বেরুল। একই বাসে উঠলাম। জীবন আমার সাইকেল বাসের মাথায় উঠিয়ে দিল। মাঝখানে ফের যেখানে সাইকেলসহ আমাকে নামিয়ে দিল, সে জায়গাটা একটা গ্রামের দিকে ঢোকার মুখ। এছাড়া আর কোন বিশেষত্ব নেই। একটা সম্ভবত বিড়ি-সিগারেটের দোকান সেখানে আছে কিন্তু এই দুপুরবেলায় তারও ঝাপ বন্ধ। বাস চলে গেল। আমার জীবনে এইবারই প্রথম মনে হলো কাজটা ঠিক হয়নি। যদিও আমি দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামাঞ্চলের ব্যাংকে কাজ করি এবং জলে রোদে সাইকেলে মাইলের পর মাইল সাইকেল ট্যুর আমার অভ্যাস আছে। কিন্তু আমার বয়স পয়তাল্লিশ পেরিয়ে গেছে এবং রাইনাইটিস নামে একটা রোগ এই ধরনের দীর্ঘ সাইকেল জার্নি অত্যন্ত কষ্টকর করে তুলেছে।

যা থাকে কপালে। ভেবে গ্রামের রাস্তায় সাইকেল ঢোকালাম। সময়টা মে মাসের মাঝামাঝি এবং এ বছর এখনো একফোঁটাও বৃষ্টি হয়নি আর আমাকে যেতে হবে নয়-দশ কিলোমিটার রাস্তা। একটু হাওয়া ছিলো সকাল থেকে। তিন চার কিলোমিটার অবধি সেই হাওয়ায় গায়ের ঘামটা শুকোচ্ছিল। খুব একটা অসুবিধা হচ্ছিল না। মাটির রাস্তার দুদিকেই চাষের খেত। যেখানে সেখানে পুকুর কিংবা অন্য জলের ব্যবস্থা আছে সেখানে পাটের আবাদ হয়েছে। এই জ্যৈষ্ঠ মাসে দেড় দুহাত উঁচু হয়ে ওঠা পাটের খেত। এই এতখানি রাস্তায় একমাত্র চোখের আরাম। চারপাশে কোন ছায়া বিস্তারি বড় গাছ নেই। চাষের খেত সংলগ্ন রাস্তায় সাধারণত বড় গাছ থাকে না। গাছের ছায়া জমির ওপরে যেখানে পড়বে সেখানে ফসল হবে না। তাছাড়া বড় গাছেরা অনেকটা জায়গা জুড়ে জমির যাবতীয় রস শুষে নেয় বলেও ফসল সেখানে বাড়তে পারে না। তিন কিলোমিটারের মধ্যে একটা বড় বট গাছ পেলাম ছায়ায় দাঁড়াবার জন্য। এটা পাশের গ্রামে ঢোকার মুখের গাছ। সেখানে খানিকক্ষন দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিলাম আমি। তারপর আবার সাইকেলে উঠলাম। আস্তে আস্তে হাওয়া গরম হয়ে উঠল। এই সময় রাস্তায় মানুষের চলাচল নেই বলতে গেলে। ক্বচিৎ একজন সাইকেল আরোহী আমার পাশ কাইটয়ে উল্টো দিকে যাচ্ছে। যেখানে পাটের খেত সেখানে নিড়ানি হাতে নিয়ে সারিবদ্ধ একদল নারী পুরুষ জংলা নিড়াচ্ছে। মাথার ওপরে টোকা অথবা গোছা কওে গামছা চাপা দিয়ে। আমার সাইকেলের গতি ক্রমশ ধীর হয়েছে। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়েছে। যে রোগটির কথা আগে বলেছি, সেই রাইনোটিসের ফলে নাসারন্ধ থেকে কপাল অবধি সম্পূর্ণ শুকিয়ে গিয়ে গরম হাওয়া একটা তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করেছে। রাস্তা থেকে ধুলো উড়িয়ে ডানের হাওয়া ঘুরতে ঘুরতে মাঠের মধ্য দিয়ে দূরে চলে যাচ্ছে। এইভাবে ঘন্টা দুয়েক চলার পর আমি আবার গ্রামপ্রান্তে একটা অশ্বত্থ গাছের নিচে দাঁড়ালাম। আমার ধারণা হল আমি প্রায় পৌঁছে গেছি। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে অশ্বত্থ গাছের শোভাই আলাদা। লক্ষ লক্ষ গাছের পাতা কাঁপিয়ে সে তার ছায়াকে শীতল করছে। উজ্জ্বল সবুজ কিশলয় ভারী প্রাণবন্ত। কিছু সময় পরে আমি কিছুটা স্বস্তি বোধ করতে লাগলাম।

একটু পরে দেখি এগারো-বারো বছরের একটি লুঙ্গি পরা ছেলে এক হাতে গামছায় বাঁধা সম্ভবত ভাত-তরকারি এবং অন্য হাতে এক ঘটি জল নিয়ে টিছনের গ্রাম থেকে বেরিয়ে এল। সে সম্ভবত তার বাপ-ভাইকে মাঠে দুপুরের ভাত দিতে যাচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম ‘বাবা, শরঞ্জা আর কত দূর?’
সে বলল, ‘এই রাস্তা দিয়ে যাও, এই গেরামের পিছনের গেরাম শরঞ্জা।’ বলে সে যে গ্রাম থেকে বেরিয়ে এসেছে সে দিকে আঙুল দেখাল।
আমি সাইকেলে উঠে গ্রামে ঢুকলাম। এ বাড়ির উঠান ও বাড়ির গোয়ালঘরের ভিতর দিয়েই প্রায় রাস্তা। গ্রামটা ছোটো। কয়েক জনকে জবাবদিহি করতে করতে গ্রামটা পার হয়ে দেখলাম দিঘীর মতো মতো বড় একটা জলাশয়। দিঘীর পশ্চিম এবং উত্তর দিকের পাড় সংলগ্ন জলের ভিতরে খাগড়ার জঙ্গল। আমি এতক্ষনে শরঞ্জা নামের কারণ বুঝলাম। দিঘীটা প্রাচীন। পশ্চিম ও উত্তর পাড়ে টিলার মতো উঁচু হয়ে আছে মাটি। দেখে মনে হলো কোন অতীতে প্রবল খরার সময় কোন রাজা হয়তো ধানের গোলা খুলে দিয়ে নিরন্ন মানুষকে দিয়ে কাটিয়ে ছিলো এই দিঘী।

জীবন বলেছিলো সাঁওতালেরা একটু উঁচু জায়গায় ঘর বানাতে ভালোবাসে। আমি এ কথা সঠিক কিনা বলতে পারব না। কিন্তু শরঞ্জার সাওঁতাল পাড়া দিঘীর সেই টিলার ওপর। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই শালখান মুর্মূর বাড়িটা আমাকে দেখিয়ে দিল। ঠিক টিলার ওপরে নয়, টিলা কেটে সমতল করে সেখানে তৈরি হয়েছে বাড়িটা। তবে যথেষ্ট উঁচুতেই। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নপ্রশস্ত উঠান। ভিটার একদিকে পুবমুখী দুখানা পাশাপাশি ঘর আর তাদের সামনে চওড়া ঢাকা বারান্দা। অন্যদিকে একখানা ঘর, ঘরের সামনে পাশে বারান্দা দুই দিকে। আমি উঠানে দাঁড়াতেই বয়স্কা এক মহিলা এগিয়ে এল। আমি সংক্ষেপে বললাম, ‘আমি কবিরাজের কাছে এসেছি। আমাকে খিরোইলের জীবন বাস্কে পাঠিয়েছে।।’ মহিলা ভাঙা ভাঙা সুরেলা বাংলায় বলল, ‘কবিরাজ বাড়িতে নাই, গ্রামান্তরে গেছে।’
উঠানের রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে আছি। সাইকেল থেকে নামার ফলে মাথা মুখ থেকে অঝোরে ঘাম গড়িয়ে নামছিল। আমি হতাশ এবং নিরূপায় হয়ে বললাম, ‘আমি অনেক দূর থেকে আসছি। আমি কি একটু বসতে পারি?
মহিলা বলল, ‘আসো’
পুবমুখী ঘরের বারান্দায় সে একখানা তালপাতার চাটাই ঢেলে দিল। আমি সাইকেল ছায়াতে দাঁড় করিয়ে ভিতরে এসে চাটাইতে বসলাম। পুবের ভিটার ঘরটির পাশে একটা ঝাপড়া ডুমুর গাছের ছায়ায় একটা টিউবওয়েল আছে। মহিলা একটা ঘটি এবং একটা গেলাশ ধুয়ে জল নিয়ে এল। আমার হাতে গেলাশটা ধরিয়ে দিয়ে ঘটি থেকে জল ঢেলে দিল। সোনার থেকেও উজ্জ্বল করে মাজা কাঁসার ঘটি গেলাশ। আমি খুব তৃপ্তি করে গেলাশ উঁচু করে গলায় ঢেলে দু’গেলাশ জল খেলাম। তাপওে সামনে বসা মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কবিরাজ কি দূরে কোথাও গেছে?’ সে আগের মতোই সুরেলা বাংলায় বলল, ‘নারানপুর গেছে।’ সে গ্রামটা কাছে না দূরে আমার কোন ধারনা নেই।
বললাম, ‘আসতে দেরি হবে?’
‘হবা পারে-’ তার অনির্দিষ্ট উত্তর।

আমি হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, প্রায় একটা বাজে। বাইরের দিকে তাকালাম, প্রখর সূর্যের তাপ। বললাম, ‘আমি একটু অপেক্ষা করি?’
সে ঘটি গেলাশ তুলে নিয়ে সংক্ষেপে বলল, ‘হঁ’
আমি দেয়ালের দিকে সরে গিয়ে হেলান দিয়ে বসলাম। একটা সিগারেট বের করে ধরালাম এবং অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দেখতে লাগলাম এদের সংসার।
এতক্ষণে আমার নজড়ে পড়ল ওই বয়স্কা মহিলা ছাড়া আরো দুজন অল্প বয়সী মেয়ে আছে এ বাড়িতে। একজন শক্তপোক্ত যুবতী, অন্যজন পনেরো-ষোল বছরের কিশোরী। এই দ্বিতীয় মেয়েটি যেন নন্দলাল বসুর ছবি থেকে নেমে এসেছে। অন্যদিকের ঘর বারান্দায় তারা নিঃশব্দে কাজকর্ম করছে। আমার চোখে ধরা পড়ল শালখান মুর্মূ স্বচ্ছল গৃহস্থ নয়। ধান চালের ব্যাপার যে তার নেই তা বেশ বোঝা যায় তার বাড়িঘর উঠোন দেখেই। অর্থাৎ জমি থাকলেও তা অতি সামান্য।

তিরিশের নিচে বয়স এমন একজন পাশী দুহাতে দুটো দুটো করে চারটা এবং কোমরের পিছনে কোমরবন্ধর হুকে ঝোলানো একটা, এই মোট পাঁচটা ডুংরি ভর্তি তাড়ি নিয়ে উঠোনে ঢুকল। পাশীর কোমরের লুঙ্গি বিপজ্জনক উচ্চতায় শক্ত করে বাঁধা। সবকটা ডুংরিতেই তাড়ি আছে। উঠানে ঢুকেই সাইকেলটা তার নজড়ে পড়র। সে বয়স্কা মহিলাকে জড়ানো গলায় কিছু জিজ্ঞেস করল। আমি বুঝলাম সে মহিলার ছেলে। মহিলা সাঁওতালিতে উত্তর দিলে ছেলে খানিকটা এগিয়ে এসে আমাকে দেখল। আমাকে দেখে খুব উদার ভঙ্গিতে বিস্তৃত হাসল তারপর পুবের ভিটায় উঠে তাড়ির ভাড় রেখে টিউবওয়েলে গিয়ে হাত পা মুখধুয়ে পরিস্কার হল। লুঙ্গি হ্রস্ব থেকে দীর্ঘ করল সে। তারপর একটা ভাড়ের মুখে পাতলা নেকড়া পরিয়ে সে রান্নার জায়গা থেকে একটা পাত্র নিল। সব শেষে উঠান পার হয়ে আমার কাছে এসে মাটিতে লেটকে বসল। ঝকঝকে কাঁসার বাটিতে ভাড় থেকে ছেঁকে একবাটি তাড়ি ঢালল সে। আমি সতর্ক হলাম। শুনেছি খানিকটা তাড়ি খেয়ে নিলে এই রকম খররোদও গাযে লাগে না। সানস্ট্রোক হওয়ারও ভয় থাকে না। কিন্তু শুধু তাড়ি নয় দামী হুইস্কি খেলেও আমার বমি হয়ে যায়।
যুবক খুব ভক্তি ভরে দুহাতে বাটিটা ধরে আমার দিকে এগিয়ে দিল। ‘ধরেন।’ সে ইতোমধ্যে বেশ কিছুটা পান করেছে। অভিজ্ঞতায় জানি এই গ্রামদেশে এই প্রখর রোদ্দুরের সময় বহুলোকেই প্রচুর পরিমাণে তাড়ি পান করে। আমি বললাম, ‘এখন খাব না।, ফিরতে হবে তো। আর আমার অভ্যাস নেই।’ ‘আরে খাও, কিছু হবে না।, এত রোদ-,’ সে বাটি আরো সামনে এগিয়ে দিয়ে অনুরোধ করতে লাগল। আমি আবারো বললাম, ‘না ভাই আমাকে ফিরতে হবে।’ সে আবারো পিড়াপিড়ি করার উদ্যোগ করতে তার মা পুবের বারান্দা থেকে সাঁওতালিতে ঈষৎ ধমকের সুরে কিছু একটা বলল। সে নিরস্ত হল। হতাশ হয়ে বলল, ‘তবে আমিই খেয়ে নিই!’ বাটিটায় চুমুক লাগিয়ে একেবারেই নিঃশেষ করে সে নামিয়ে রাখল।

গামছা দিয়ে মুখ মুছে সে বলল, ‘জীবন বাস্কের অফিসে কাজ করেন আপনি?’ সে মোটামুটি পরিস্কার বাংলা বলে।
আমি বললাম হ্যাঁ
সে বলল, জীবন বাস্কে বড় অফিসার, আমাদের জামাই লাগে।’
আমি জানতাম জীবন স্থানীয় লোক এই দিকেই কোথাও তার শ্বশুরবাড়ি।
আমি একটু হেসে বললাম শুনেছি ওর কাছে।
কার জন্য ওষুধ নিতে এসেছেন? সে জানতে চাইল।
বললাম আমার মেয়ের জন্য।
কী হয়েছে মেয়ের?
আমি তাকে সংক্ষেপে বিষয়টা বললাম। আমি যে ঘরের দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসে আছি, খেয়াল হল, তার দরজায় মহিলা দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনছে। ‘কত বড় বেটি তোমার? সর্বনামের ক্ষেত্রে এখানকার স্থানীয় সাধারণ বাঙালিরাও খুব একটা ক্রিয়া পদের নিয়মের ধার ধারে না। এ জিজ্ঞাসা প্রৌঢ়া মহিলার।
বললাম, ‘ওই ওর মতো,’ সেই কিশোরী মেয়েটিকে মাঝেমাঝেই পশ্চিম আর পুবের ভিটায় চঞ্চলভাবে যাতায়াত করতে দিখছিলাম। আমার মেয়েটিও ইে বয়সী। আহা যদি ওর মতো স্বাভাবিক চাঞ্চল্য ওরও থাকতো! প্রৌঢ়া মুখ দিয়ে একটা একমাত্রিক শব্দ করল, তাও তার দিকে মনোযোগ না রাখলে আমি শুনতে পেতাম না। তার ছেলে অবশ্য চতুর্গুণ বাড়িয়ে চুকচুক করতে লাগল। আমি বাইরের রোদের দিকে বিষণœ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইলাম। ছেলে উঠে গেল আর মা দরজা ছেড়ে বাইরে এসে বাটিটা তুলে পুবের ঘরের দিকে চলে গেল।
আমি এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, কখন যে দেয়াল থেকে গড়িয়ে চাটাইয়ের ওপর পড়েছি, সে খেয়াল নিজেই রাখতে পারিনি।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি, আমি জানি না। ঘুম কেন ভাঙল তাও বুঝতে পারি নি। চোখ খুলতে দেখলাম মা ও মেয়ে সোজা আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত তারা আমাকে কিছু একটা বলে ডেকে উঠিয়েছে। উঠে বসতে প্রৌঢ়া বলল, ‘খাবে?’
খাওয়ার কথা শুনে আমার পেটের ভেতর যেন খিদে মোচড় দিয়ে উঠল। সেই সকাল সাড়ে সাতটায় একমুঠ ঝোল ভাত খেয়ে বেরিয়েছি। উঠে বসে বললাম, ‘কী-খাব?’
মা যা বলল ভালো বুঝতে পারলাম না। বুঝব না, এটা বুঝেই মেয়ে বলর, ‘আমরা যা খাবো!’
লজ্জা কিংবা সংকোচ করবার কোন গরজই আমি নিজের ভেতর খুঁজে পেলাম না। সোজা উঠে দাঁড়ালাম। এমনই খিদে। প্রৌঢ়া বলল, ‘আসো।’
পুবের ঘরের বারান্দায় সেই যুবতী মেয়েটি, যাকে আমার প্রৌঢ়ার ছেলে বউ বলেই মনে হচ্ছিল, ভাতের হাড়ি আর থালা সাজিয়ে নিয়ে বসেছিল। আমি কলপাড়ে গিয়ে হাত ধুয়ে , একবার কুলকুচো করে দাওয়ার ওপরে উঠে আসলাম। আমার জন্যে কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেই। এমন কি একখানা পিঁড়িও নেই। মা, মেয়ে এবং বউ ক্যাঙারুর মতো বসেছে। যদিও পরনে প্যান্ট, আমিও সেভাবে বসলাম ওদের মাঝখানে। কাঁধ উচু অ্যালুমিনিয়ামের থালা, বউ হাঁড়ি থেকে ভাতে বলগ ওঠা ভাত উঠিয়ে দিল, পরে হাঁড়ি থেকে ভাতের জল ঢেলে দিল। একটা মাটির পোড়া পাত্র থেকে হাত দিয়ে বউ এক দলা করে শাক তুলে সবার ভাতের উপর সাজিয়ে দিল। নামমাত্র তেলে শুকনো লংকা কালো করে ভেজে পিঁয়াজ সম্বরা দিয়ে পাটপাতা ভাজা। আমি তাকিয়ে দেখলাম চারখানা থালাতেই ভাত এবং শাকের পরিমাণ একই মাপের। অর্থাৎ যা ছিল তাই চারভাগ হয়েছে। মুখ নিচু করে খেতে খেতে একবার ছেটো মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম ‘তোমার বড়ভাই খাবে না’
সে বলল ‘ও খেয়ে ঘুমোচ্ছে’
খেতে খেতে আমার মনে হল পাটশাক কি এমন সুস্বাদু ব্যাঞ্জন?
এত পরিতৃপ্তি নিয়ে আমি নিজের বাড়িতেও খাই না। কলে মুখ ধুয়ে আমি ফের এসে আগের জায়গায় বসলাম। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম এবং এতক্ষনে ঘড়ি দেখার কথা আমার খেয়াল হল। বেলা প্রায় চারটে বাজে । কবিরাজের এখনো দেখা নেই।
হাতের কাজ শেষ করে প্রৌঢ়া এসে বসলো সেই দরজায় যেখান থেকে আমি তার কথা শুনতে পাচ্ছিলাম কিন্তু দেখতে পাচ্ছিলাম না।
এবার সে বসেছে উল্টোদিকের পালায় পিঠ ঠেকিয়ে, ফলে সে আমাকে পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছে কিন্তু তাকে দেখতে হলে আমাকে ঘাড় অনেকটাই বেঁকাতে হচ্ছে। সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলে। আগে সে মেয়ের সার্হায্য নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলেছে। সে যা থেমে থমকে বলে, অনেকটা এই রকম-
‘একটাই বেটি তোমার?’
‘না আর একটা আছে?
‘কবিরাজ তো এখনো এলো না’।
‘আজকে ফিরবে তো?’
‘কবিরাজ ছিল আমার বাবা, এ লোক তার কাছে কিছু শিখেছে’।
‘ও’ ।
আমার স্ত্রী দ্রব্যগুণে কখনো কখনো বিশ্বাস করে ফেলে। মেয়ের কোমরে কী একটা শিকড় লাল কার দিয়ে বেঁধে রেখেছিল প্রায় বছর খানেক। পরে ফেলে দিয়েছে।
একটি বিখ্যাত সিনেমার প্রধান চরিত্রের মুখ দিয়ে এমন কথা বলানো হয়েছে যে, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নয় এমন আদিবাসী কবিরাজ পাঁচ হাজার ভেষজ বৃক্ষলতা চেনে এবং রোগ নিরাময়ে তাদের গুনাগুন জানে। আমার স্ত্রীর মনে হয়েছে কথাটা বিবেচনার যোগ্য। যে কথাটা পুরোপুরি যদিও ঠিক না।

‘কিন্তু তোমার বেটির যে রোগ, আমার বাবাকে তেমন রোগ আমি সারাতে দেখিনি। তবে তার কাছে তোমার মতো অনেক লোককে আমি আসতে দেখেছি। শেষে সে বলে দিত তাকে দিয়ে হবে না।
এইবারে আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে চোখ রাখলাম। ‘তার মানে আপনি আমাকে চলে যেতে বলছেন?’ ‘তোমাকে তো অনেক দূর যেতে হবে। বেলা পড়ে আসছে।’
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম ‘আচ্ছা তাহলে আমি আসি?’ আচ্ছা নমস্কার।
সেও উঠে দাঁড়াল। সে আমার থেকে বছর দশেকের বড় হবে হয়তো। দু হাতের পাতা একত্র করে গ্রহণের ভঙ্গী করলো। দুবার ঈষৎ দোলালো সেই আঙ্গুলি মুক্ত হাত। মুখে বলল ‘জোহর, জোহর।’
সেই বারান্দা থেকে বার হয়ে সাইকেল নিয়ে বাইরে এলাম। সে আমার পিছন পিছন এলো উঠান পর্যন্ত।
আমি সাইকেলে উঠতে যাবো, সে বলল ‘আর শোন আমাদের জামাইকে এসব কথা কিন্তু বোলো না’ আমি হেসে সাইকেলে উঠলাম।
স্ত্রীকে বোঝানো যাবে এমন কথার সঞ্চয় আমার এতক্ষনে হয়েছে।

আদিবাসীদের, বিশেষ করে পত্র পত্রিকায় ও গল্প কাহিনীতে পশ্চিম বাংলার সাঁওতালদের যে যার প্রয়োজন মতো নানা রকম গুণ ও দোষের ভাগীদার করে। দীর্ঘদিন ধরে এই আদিবাসীদের মধ্যে ঘোরাফেরা করে আমার মনে হয়েছে, এ সবের অধিকাংশেরই কোন ভিত্তি নেই। মানুষ সর্বত্রই দোষ গুণ মিলিয়ে। কোন কোন জাতি বা গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে দুটো একটা বিশেষ গুণ বা দোষের আধিক্য দেখা যায়। যে বিশেষ গুণ বা দোষ দুটির কথা বললাম, এক্ষেত্রে দুটি গুণ একটি অপরিচিত এবং যথার্থই অতিথির সঙ্গে ক্ষুধার অন্ন ভাগ করে খাওয়া, অন্যটি সত্যটা জানিয়ে দেয়া। আদিবাসীদের স্বাভাবিক গুণের মধ্যে সেগুলো পড়ে। এ দুটি আমার…, মানুষ হিসেবে মহৎগুণ।
তার মানে এই নয় যে তাদের সবার মধ্যেই এই গুণ আছে। তার মানে এও নয় যে তাদের মধ্যে চোর, ডাকাত, খুনী, প্রতারক নেই।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত