আবু হাসান শাহরিয়ারের একগুচ্ছ কবিতা

কবি ও কথাসাহিত্যিক আবু হাসান শাহরিয়ারের ৬০তম জন্মদিন আজ। তিনি সাংবাদিক হিসেবেও বেশ পরিচিত। বিশেষত মুক্তকণ্ঠ পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক থাকার সময় আট পৃষ্ঠার বহুবর্ণিল সাময়িকী খোলা জানালা বের করে শিল্প-সাহিত্যমোদীদের বাড়তি নজর কাড়েন। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


শব্দাকাশে চাঁদ উঠেছে 

‘আকাশ’ লিখতে চন্দ্রবিন্দু বসিয়ে দিলে ‘আ’-এর মাথায়-
লিখলে ‘আঁকাশ’।
বললে হেসে, ‘আজ আঁকাশে চাঁদ উঠেছে।’এই যে তুমি শব্দাকাশে চাঁদ ওঠালে,
এ চাঁদ কেবল বাঙলা ভাষায় উঠতে পারে।
অন্য ভাষায় এই ঘটনা অনিবর্চন।
তুমিই বলো, তর্জমা হয় এই কবিতার ?
বাঙলা ছাড়া কোন ভাষাতে চন্দ্রবিন্দু হয় বা আছে ?’আকাশ’ লিখতে এখন থেকে বিন্দুসমেত চন্দ্র দেব।
শব্দাকাশে উঠুক না চাঁদ।
এখন থেকে ‘আকাশ’ ভুলে ‘আঁকাশ’ লিখব তোমার জন্য।

নবীনতমকে


কেড়ে কেন নিতে চাও, কেন বল, ‘মাদুর সরাও’?
তুমি এসে গেছ বলে এ মাদুর উঠোনে পেতেছি

এই নাও কবিতার খাতা

কেটেছি সামান্য দাগ—মুছে দিও—রাবারও দিলাম
খুঁটিনাটি আরও যা যা সরঞ্জাম ছিল, সবই দিয়ে যাচ্ছি

অপছন্দ হলে ফেলে দিয়ো

কেড়ে কেন নিতে চাও, অগ্রন্থিত পৃথিবী তোমার

কতকাল আগে লেখা

পাখিদের ক্যালেন্ডারে রোববার-সোমবার নেই; আজ বৃক্ষবার
বনে-বনে আড্ডাবাজ হাওয়াদের ভিড়
কাল সারাদিন ছিল বৃষ্টিবার; তারও আগে রৌদ্রবার গেছে
কতকাল আগে লেখা গতকাল এখনো অস্থির
পাখিদের ক্যালেন্ডারে বৃক্ষবার, বৃষ্টিবার, রৌদ্রবার থাকে
মানুষের ক্যালেন্ডারে চিনের প্রাচীর ।

পালকের ঢেউয়ে-ঢেউয়ে সুরস্রোতা নদী বয়ে যায়
সুরের মাতম লাগে মাটির খাতায়
সুরে সুরে দূরে দূরে আড্ডাবাজ হাওয়াদের ভিড়
কতকাল আগে লেখা গতকাল এখনো অস্থির ।

শ্রোতা
না, কোনও মানুষ নয়, পাখিরা যা বলাবলি করে, আমি শুনি
বাণিজ্যিক ধুলো ওড়ে পাছাভারি বণিক বাতাসে
ধুলোয় ধূসর সব; কে যে কাকে কী যে কথা বলে
কাজ শেষ, কথাও অচল
বিশ্বায়নদুষ্টতায় প্রেমও বোঝে শেয়ার বাজার
চুমুও মুনাফা খোঁজে; কবিতাও বাজারি পাঠক
গাছের বাকলে কারা নাম লিখে ফিরে গেছে ঘরে?
কে সেই অচেনা ফুল, মাঠপাড়ে অনাদরে ফোটে?
কে নদী নীরবে কাঁদে প্রাণঘাতী মানবদূষণে?
কে প্রেম ঋদ্ধ করে বামাচারী পাণ্ডবের গোলা?
কেউ আর কাউকে চেনে না
না, কোনও মানুষ নয়, পাখিরা যা বলাবলি করে, আমি শুনি
আদ্যোপান্ত
তুমি আমার বহুলপাঠে মুখস্থ এক কাব্যগ্রন্থ-

তোমার প্রতি পঙক্তি আমি পাঠ করেছি মগ্ন হয়ে।
বই কখনো ধার দিতে নেই, জেনেও আমি দিয়েছিলাম-
খুইয়েছি তাই।
ছিঁচকে পাঠক হলেও তোমার গ্রন্থস্বত্বএখন তারই।
বইচোরা কি কাব্যরসিক ? ছন্দ জানে ?
বই অনেকের বাতিক, ঘরে সাজিয়ে রাখে-
নাকি তেমন হদ্দ নবিশ ?
চোরের ঘরে ধুলোয় মলিন বুকশেলফে কেমন আছো ?
চোর কি জানে, চোর কি জানত,
আমি তোমায় মুখস্থ পাই আদ্যোপান্ত ?

তুলাদণ্ড

তোমার চোখের চেয়ে বেশি নীল অন্য কোনও আকাশ ছিল না
যেখানে উড়াল দিতে পারি
তোমার স্পর্শের চেয়ে সুগভীর অন্য কোনও সমুদ্র ছিল না
যেখানে তলিয়ে যেতে পারি
তোমাকে দ্যাখার চেয়ে নির্নিমেষ অন্য কোনও দ্রষ্টব্য ছিল না
যেখানে নিমগ্ন হতে পারি
তোমাকে খোঁজার চেয়ে বেশি দূর অন্য কোনও গন্তব্য ছিল না
যেখানে হারিয়ে যেতে পারি।
কেবল তোমার চেয়ে বেশি দীর্ঘ তুমিহীন একাকী জীবন।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত