Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Afghanistan literature

অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যায় আধুনিক আফগান সাহিত্যে

Reading Time: 8 minutesফজল হাসান  

আফগানিস্তানের সমাজ অসংখ্য জাতি, উপজাতি, আদিবাসী, গোত্র ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত । সেখানে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেনি এবং গড়ে ওঠেনি জাতীয়বাদের কোনো ধারণা । ফলে সে দেশে জনগণের মধ্যে কখনই কোনো জাতিগত সংহতি গড়ে উঠতে পারেনি । আদিকাল থেকেই তাদের ভেতর এই বিভাজন রয়েছে । তাই আজও অশান্তি আর অস্থিতিশীলতার ঘেরাটোপে বন্দি দেশটি । গত কয়েক দশক ধরে দেশটিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক রাজনীতি আর ষড়যন্ত্রের কোনো কূল-কিনারা নেই । তার প্রধান কারণ হলো দেশটির ভৌগলিক অবস্থান । আফগানিস্তান এমন একটি জায়গায় অবস্থিত যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে আমেরিকার, স্বার্থ ওতপ্রোতভাবে জড়িত । এছাড়া মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের উত্থানের পর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশের সমাজ ব্যবস্থায় নেমে আসে ঘোর অমানিশা । এসব নেতিবাচক প্রভাব দেশটির শিল্প-সাহিত্যে এনেছে একধরনের নতুনত্ব ।  তবে এ কথা স্বীকৃত যে, জাতি-গঠনে সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম এবং অপরিহার্য । ২০১০ সালে আফগান শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুলের ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য আবশ্যক বিষয় হিসাবে পাঠ্যপুস্তক পরম্পরায় প্রকাশ করে, যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্যকে পুনর্জীবিত করে জাতি গঠনে ব্যবহার করা । এসব বাধ্যতামূলক পুস্তকে ক্ল্যাসিক্যাল কবিদের তুলনায় দারি-পার্শিয়ান ভাষার জাতীয়তাবাদী কবি খলিলুল্লাহ্ খলিলির (১৯০৭-৮৭) লেখা অধিক সংখ্যক অন্তর্ভুক্ত করা হয় ।

আফগানিস্তানের প্রচলিত ভাষা দুটি–দারি এবং পশতু । যেহেতু রাজনৈতিক দিক থেকে পাশতুনরা ক্ষমতাবান, তাই আফগানিস্তানের সরকারি ভাষা পশতু । অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবনে, বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, দারি ভাষা ব্যবহার করা হয় । তাই সামাজিক কারণে সব আফগান দুটি ভাষাতেই পারঙ্গম । যদিও দারি ভাষার উৎপত্তি নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে, তবে অনেকে মনে করেন ‘দরবার’ (অর্থাৎ রাজকীয় বিচারালয়) শব্দ থেকে দারি ভাষার উৎপত্তি । অর্থাৎ দারি ভাষা রাজকীয় ভাষা । তবে অতীতে দারি ভাষা শুধু রাজপরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না । দারি ভাষার ব্যাপক ব্যবহার ছিল সাহিত্যে (বিশেষ করে কবিতায়) এবং ইতিহাসবিদ ও বুদ্ধিজীবী মহলে । অন্যদিকে অনেকে মনে করেন দারি ভাষা ‘দারা’ (অর্থাৎ উপত্যকা) শব্দ থেকে এসেছে । কেননা আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্ব বাদাখশান নামক পাহাড়ী এবং উপত্যকা এলাকায় দারি ভাষা বিস্তার লাভ করেছে । একাদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত কবি হাকিম আবদুল কাশিম ফেরদৌসী পার্সি-ই দারি ভাষায় শাহনামা রচনা করেন । বেশিরভাগ আফগান পণ্ডিত বিশ্বাস করেন যে, অতীতের পার্সি-ই দারি ভাষা থেকে বর্তমানের দারি ভাষার আসল উৎপত্তি ।  যাহোক, ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত এই দশ বছরে পশ্চিমা সাহিত্যের ধারায় প্রভাবিত হয়ে দারি ভাষার কথাসাহিত্যের কলা-কৌশলে নতুনত্ব আনেন আসাদুল্লাহ্ হাবীব, ড. আকরাম ওসমান এবং আজম রাহনাওয়ার জারিয়াবের মতো খ্যাতিসম্পন্ন সাহিত্যিকরা । অন্যদিকে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল এবং কান্দাহার শহরে পশতু ভাষার প্রচলন বেশি । প্রায় এক কোটি আফগান এ ভাষায় কথা বলে । ১৯৩৬ সালে পশতু ভাষাকে আফগানিস্তানের জাতীয় ভাষা হিসেবে গণনা করা হয় ।

মুসলমানদের আবির্ভাবের শুরু থেকেই দারি এবং পশতু ভাষায় সাহিত্যের সূচনা । তবে সেই সময় আরবি ভাষারও ব্যবহার ছিল । আদি আমলে পারস্যের বিখ্যাত কবি ফেরদৌসির দারি ভাষায় লেখা ঐতিহাসিক মহাকাব্য ‘শাহনামা’ [রাজাদের গ্রন্থ] প্রকাশিত হয় ১০১০ সালে । সতের শতকের স্বনামধন্য কবি কুশল কটক দারি ভাষায় ছন্দের মাধ্যমে আদিবাসিদের সঙ্কেত প্রকাশ করেছেন । তবে ষোড়শ শতাব্দীতে পশতু ভাষায় লেখা প্রথম নমুনার হদিশ পাওয়া যায় । ১৬১২ সালে ভারতের মুঘল দরবারে নেয়ামতুল্লাহ রচনা করেন ‘মাখজান-ই আফগান’ । এই গ্রন্থে ইব্রাহীম (আ:) থেকে শুরু করে রাজা তালুত বা সাউল পর্যন্ত আফগান বা পাশতুনদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ।

আফগানিস্তানের ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের ব্যপ্তি ছিল প্রধানত : গদ্য এবং প্রচলিত উপকথা, রূপকথা কিংবা পুরাণ কাহিনি বা গল্প । তবে ক্লাসিক্যাল দারি সাহিত্য থেকে আধুনিক আফগান সাহিত্যের বিস্তর ফারাক রয়েছে । উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অতীতে যেখানে ছিল লোকগাথা ভিত্তিক সাহিত্য, তা এখন রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্ভর সাহিত্যে রূপ নিয়েছে । আগে যেখানে ছিল প্রাঞ্জল ভাষায় কল্পকাহিনি, তা আজ যুক্তি নির্ভর সচেনতা এবং মননশীল সাহিত্যকর্ম । এছাড়া আগে যেখানে ছিল ভৌতিক কাহিনি, আজ সেখানে দেখা যায় দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদের প্রতিফলন । আধুনিক পশতু ছোটগল্পের বিষয়বস্তু লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং মানসপটে আঁকা বিচিত্র কাহিনি, যা চারপাশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে সংগৃহীত । এসব গল্পের কাহিনিতে কোনো ঐতিহাসিক পটভূমি নেই, এমনকি আঙ্গিকের কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষারও বালাই নেই । তবে অনেকের মতে সাংস্কৃতিক এবং ভৌগলিকভাবে পশতু ছোটগল্পের কাঠামো, প্রকাশ ভঙ্গি, গল্প প্রকাশের প্রবণতার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ-ভারত, মিশর, তুরস্ক, রুশ এবং পারস্য সাহিত্যের প্রভাব আছে । বর্তমানে পশতু সাহিত্য তার নিজস্ব পরিচয় খুঁজে পেয়েছে ।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছিল আফগানিস্তান । সেই পরিবর্তনের হাওয়া এসে সাহিত্যকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল । ফলে এক নতুন ধারার সাহিত্যের স্ফুরণ ঘটেছিল । নির্বাসন থেকে ফিরে এসে মাহমুদ তারজি পরোক্ষভাবে ফরাসি এবং ইউরোপীয় ভাষার সঙ্গে তুর্কী ভাষার সংমিশ্রণে চিরায়ত আফগান সাহিত্যকে আধুনিতার মোড়কে পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপন করেছিলেন । মাধ্যম হিসাবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ‘সারাজ-উল আকবার’ পাক্ষিক ম্যাগাজিন । তিনি ছিলেন সেই ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক । তিনি পশ্চিমা সাহিত্যের অনেক বিখ্যাত উপন্যাস, বিশেষ করে জুলভার্নের উপন্যাস, ‘দারি’ ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেছেন । কিন্তু তিনি লেখনীর সনাতন পদ্ধতিকে পরিবর্তন করেননি, বরং চিন্তা-চেতনা এবং মতামতকে আবরণ বানিয়ে নাতন নিয়মের গায়ে আলগা চাদর পড়িয়েছিলেন । পরবর্তীতে গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তর দশকে (১৯৬৪-১৯৭৩) শুধু যে কবিতার সমৃদ্ধি হয়েছে, তাই নয় । সেই সময়ে কথাসাহিত্যের, বিশেষ করে ছোটগল্পের, ব্যাপক প্রসার ঘটেছে । তখনকার চারপাশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কিংবা চিন্তা-চেতনাকে উপজীব্য করে অনেক লেখক সাহিত্য রচনা করেছেন । অন্যদিকে কেউ কেউ সরকারের সমালোচনা করে অথবা বিরোধী দলের প্রশংসা করে কলম ধরেছিলেন । এছাড়া অতীতের গহ্বরে বিলীন হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যও অনেকের উপন্যাস এবং ছোটগল্পে উঠে এসেছে । এদের মধ্যে আরেফ সুলতানজাদাহ্, খালেদ নাউইশা, রাজেঘ মামুন, হুসান ফাকরি অন্যতম ।

আফগানিস্তানের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আফগান সাহিত্যের অন্যতম বিষয় । তাই অভ্যন্তরীণ বিষয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রসারিত হয়েছে বিভিন্ন বিষয় বা কর্মকাণ্ড । পরিব্যাপ্তি-কাল অনুযায়ী বিংশ শতাব্দীর আফগান সাহিত্যকে স্বনামধন্য লেখক মীর হেকমতুল্লাহ্ সাদাত বিষয়-ভিত্তিক কয়েক শ্রেণিতে ভাগ করেছেন, যেমন রাজনৈতিক জাগরণ (১৯০০-১৯), দেশাত্ববোধক মূল্যবোধ (১৯১৯-২৯), অনুভূতি-আশ্রিত সমাজবদ্ধতা (১৯২৯-৫২), বাস্তববাদ (১৯৫৩-৬৩), সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা (১৯৬৩-৭৮), বিপ্লবী কর্মকাণ্ড (১৯৭৮-৮৯) এবং সমঝোতা ও অভ্যন্তরীণ বাঁধা (১৯৮৯-৯২) । বিভিন্ন লেখক লেখার মাধ্যমে এসব বিষয়গুলো পাঠকদের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন ।

দুই.

আফগানিস্তানের অবস্থান এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যবর্তী অঞ্চলে, তাই একধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে দেশটির শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে । গত শতাব্দীর শেষ দুই দশকে যুদ্ধবিগ্রহ, মৌলবাদী তালেবানদের আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতার জন্য দেশটির শিল্প-সাহিত্য ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছে । তবে বর্তমানে এসব নেতিবাচক প্রভাব দেশটির শিল্প-সাহিত্যে ক্রমশ একধরনের নতুনত্বের উন্মেষ ঘটছে । 

১৯৭৯ সালে জোর করে সোভিয়েত রাশিয়া দেশটি দখলের পর থেকে গত কয়েক দশক ধরে দেশটিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক রাজনীতি আর ষড়যন্ত্রের ঘেরাটোপে আটকে গেছে । আশির দশকে পাকিস্তানের সহায়তায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত মৌলবাদী তালেবানদের দুঃশাসন এবং সবশেষে আমেরিকা ও তার দোসরদের সম্মিলিত আগ্রাসন দেশটিকে বিপর্যস্ত করে তোলে । সেই সময়ে আফগান কথা সাহিত্যে, বিশেষ করে ছোটগল্পে, উঠে এসেছে যুদ্ধ-বিগ্রহ, পৈচাশিক কর্মকাণ্ড এবং শরণার্থীদের দুঃসহ জীবনের করুণ কাহিনি । ২০০১-র মার্চে আফগানিস্তানের বামিয়ান পাহাড়ে তালেবানদের হাতে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংস হওয়ার পর তালেবানদের মানসিক অবস্থার কথা জালমে বাবকোহি তাঁর ‘বিচূর্ণ মূর্তির ধুলিকণা’ গল্পটিতে তুলে ধরেছেন । ঘটনার পরপরই লেখা গল্পটি পাঠকমহলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ।

মোহাম্মদ হুসেইন মোহাম্মদীর ‘দাশত্-ই লাইলি’ গল্পটি পাশবিক হত্যাকাণ্ডের বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা । দাশত্-ই লাইলির মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ শুধু আফগানিস্তানের নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের এক অমানবিক, নৃশংস ও জঘন্য ঘটনা । ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০১ সালের ডিসেম্বরে, যা পশ্চিমা মিডিয়াতে তেমন করে প্রকাশ পায়নি । মাজার-ই-শরিফের কালা-ই জঙ্গি দুর্গের কাছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এক পর্যায়ে তালেবান সৈনিকেরা সাদা পতাকা উড়িয়ে ন্যাটো এবং আমেরিকার দোসর ও কমান্ডার দুর্ধর্ষ আফগান জেনারেল আবদুর রশিদ দুস্তমের কাছে আত্মসমর্পণ করে । আত্মসমর্পণের প্রধান শর্ত ছিল আটককৃত তালেবানদের কোনোমতেই শারীরিকভাবে কোনো ক্ষতি করা যাবে না । আটককৃত আনুমানিক সাড়ে সাত হাজার তালেবানকে লোহার কন্টেইনারের বন্ধ ট্রাকে করে কুন্দুজ থেকে শেবিরগানের সন্নিকটে কারাগারে নিয়ে যাচ্ছিল । তখন কন্টেইনারের ভেতর গাদাগাদির জন্য শ্বাসরুদ্ধ হয়ে, অনাহারে এবং তৃষ্ণায় অনেক তালেবান মারা যায় । ভাগ্যক্রমে যারা বেঁচেছিল, নর্দান অ্যালায়েন্সের অঙ্গ-সংগঠনের উগ্র সৈনিকেরা তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে । পরে দাশত্-ই লাইলির মরুভূমিতে মৃত তালেবানদের গণকবর করে মাটি চাপা দেওয়া হয় । গল্পটিতে যুদ্ধের উভয় পক্ষের সৈনিকদের অভিজ্ঞতার কাহিনি নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে ।

মোহাম্মদ আসেফ সুলতানজাদের ‘পেশা’ গল্পটিতে লেখক মার্কিন সৈনিকদের ওপর এক আফগান যুবকের প্রচণ্ড রাগ এবং ক্ষোভের চিত্র এবং মাহমুদ মারহুনের ‘কবরের আলিঙ্গন’ গল্পটিতে একজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী জিহাদি তালেবানের নৈতিকতা, মানসিক টানাপোড়েন এবং কর্মফলের অনুশোচনার চিত্র তুলে ধরেছেন । অন্যদিকে ‘লোকটি পাহাড়ে উঠেছিল’ গল্পটিতে পীর মোহাম্মদ কারওয়ান লেখক যুদ্ধ-বিধ্বস্ত আফগানিস্তানের একজন সাধারণ নাগরিকের দেশপ্রেম, হতাশা এবং উদ্বিগ্নতার এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন । এছাড়া জরীন আনজুরের ‘এভাবেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে থাকে’ গল্পটিতে একজন বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধার গর্বিত পিতার করুণ কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে । পাকিস্তানের শরণার্থী শিবিরে আফগান এক শরণার্থীর জীবনের মর্মান্তিক এবং বিয়োগাত্মক সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে খান মোহাম্মদ সিন্ধের ‘প্রদর্শনী’ গল্পটি । অন্যদিকে ‘পরিচয় পত্র’ গল্পটিতে ওয়ালী শাকের পেশোয়ারের শরণার্থী শিবিরে আফগান শরণার্থীদের দুর্গতি এবং লাঞ্ছনার এক নিখুঁত মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরেছেন । এছাড়া শরণার্থীদের দারিদ্র্য,দুঃসহ জীবন,নস্টালজিয়া ও মাটির টানে মাতৃভূমিতে ফিরে যাবার আকুলতার পরও যে তাদের আত্মসম্মানবোধ থাকতে পারে,সেই স্পর্শকাতর বিষয়কে লেখিকা পারভিন ফায়েজ জাদাহ্ মালাল সাবলীল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন ‘ঘৃণা’ গল্পে ।

তিন.

সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় থেকে আফগান সাহিত্যে দুটি বিষয় স্হান পেয়েছিল  ইসলাম এবং স্বাধীনতা । সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে উঠেছিল পাশতুন অধ্যুষিত পাক্তিয়া প্রদেশে । ১৯৮৩ সালে গুলজারাক জারদান পশতু ভাষায় প্রকাশ করেন ‘আফগানিস্তান দ্য ল্যান্ড অফ জিহাদ : পাক্তিয়াইন আপরাইজিং ওয়েভস্’ । এ কথা স্বীকৃত যে, সোভিয়েত আগ্রাসনের পরপরই অনেক আফগান সাহিত্যিক জীবনের তাগিদে মাতৃভূমি ছেড়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান । পরে তারা পশ্চিমা দেশের অভিবাসী হন । তাই অনেক অভিবাসী লেখকের গল্পের আবহ, পটভূমি এবং মূল বিষয় হলো নিপীড়িত আফগান শরণার্থীদের দুঃসহ জীবনের নানান ঘটনা, অভিবাসী জীবনের অনিশ্চয়তা, দুঃখ-দুর্দশা, হতাশা, যন্ত্রণা কিংবা তাদের উদ্বাস্তু জীবনের করুণ কাহিনি ফুটে উঠেছে । নিশ্চিত জীবনের প্রত্যাশী আফগান অভিবাসী লেখকরা ভিন দেশের অচিন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলেও প্রতিনিয়ত তাদেরকে মাতৃভূমির ফেলে আসা স্মৃতিগুলো পিছু টানে । তাই তাদের লেখায় বারবার ফুটে উঠেছে যুদ্ধের ঘটনা, মানসিক টানাপোড়েন এবং স্বদেশে ফেরার আকুলি-বিকুলির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো । বলা হয়, নির্বাসিত এবং অভিবাসী আফগান সাহিত্যিকরাই সমকালীন আফগান সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে । এই নির্বাসিত এবং অভিবাসীদের জীবন নিয়ে অনেক লেখক উপন্যাস এবং ছোটগল্প রচনা করেছেন । এদের মধ্যে মোহাম্মদ আসেফ সোলতানজাদেহ্, আতিক রাহিমী, হামিদ আলিপুর, নুশীন আরবাবজাদাহ্ এবং জাহেদা গনি উল্লেখযোগ্য ।

‘আমরা আকাশপথে গায়েব’ গল্পটিতে লেখক মোহাম্মদ আসেফ সোলতানজাদ আফগান এক শরণার্থী কিশোরের স্বজন হারানোর করুণ কাহিনি এবং তার ভয়-ভীতি ও আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন । আতিক হামিদীর ‘কাল্পনিক প্রত্যাবর্তন’ এবং জাহেদা গনির ‘আফগানিস্তান’ গল্প দুটিতে ফুটে উঠেছে মাতৃভূমিতে ফিরে আসার প্রবল ইচ্ছা । হামিদ আলিপুরের ‘মাহিনা’ গল্পটি আমেরিকা প্রবাসী একজন আফগান অভিবাসী জীবনের কঠিন সংগ্রাম এবং করুণ কাহিনি নিয়ে লেখা । নুশীন আরবাবজাদাহর ‘স্পটলাইটের নিচে থমকে থাকা খরগোশের মতো’ গল্পটিতে মতানৈক্যের পরেও একজন আমেরিকা প্রবাসী আফগান এবং অন্যজন আফগানিস্তানের আফগানির কথোপকথনের মাধ্যমে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ এবং আমেরিকায় আফগান অভিবাসী নারীদের জীবনযাত্রার বৈষম্য প্রকাশ পেয়েছে ।  

তবে অভিবাসী আফগান লেখকদের মধ্যে আন্তর্জাতিক সাহিত্য মহলে স্বীকৃতি পেয়েছেন খালেদ হোসেইনী । ‘কাইট রানার’ (২০০৩), ‘এ থাউজেন্ড স্প্ল্যান্ডিড সানস্’ (২০০৭) এবং ‘অ্যান্ড দ্য মাউন্টেন একোড’ (২০১৩) তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস । যদিও প্রথম দুটি উপন্যাসের শেকড় আফগানিস্তানে, কিন্তু ব্যাপ্তি ঘটেছে বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে গ্রিস, প্যারিস এবং ক্যালিফোর্নিয়া । উল্লেখ্য, ‘কাইট রানার’ উপন্যাসটি ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস্ বেস্ট সেলার’ তালিকায় একনাগারে ১০১ সপ্তাহ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মধ্যে চারবার প্রথম স্থানে ছিল । অন্যদিকে ‘এ থাউজেন্ড স্প্ল্যান্ডিড সানস্’ উপন্যাসটি ১০৩ সপ্তাহ ‘টাইমস্’-এর বেস্টসেলার তালিকায় ছিল এবং পনের বার শীর্ষস্থান দখল করেছিল । 

চার.

অন্য সব দেশের মতো আফগানিস্তানেও রয়েছে সামাজিক শ্রেণি বিন্যাস, আছে বৈষম্য এবং সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রাম, আত্মপরিচয় আর মূল্যবোধ । আকরাম ওসমানের ‘ব্যবধান’ গল্পটি তার উজ্জ্বল উদাহরণ । এছাড়া নিঃসঙ্গ নারীর দুর্বিসহ জীবনের প্রতি প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা, হতাশা এবং জিঘাংসার চিত্রও ফুটে উঠেছে বিভিন্ন লেখায়, যেমন রয়া খোরশীদের ‘তার বিশ্বস্ত চোখ’ ।

আফগানিস্তানের পুরুষ মানুষের একদিকে গৌরব, আত্মসম্মান, ওয়াদা এবং অন্যদিকে শাশ্বত প্রেম-ভালোবাসার চিরাচরিত টানপোড়েনের কাহিনি –এই দ্বিমুখী আত্মচরিত নিয়ে আকরাম ওসমান লিখেছেন ‘মানুষ কথা রাখে’ গল্পটি । বলা হয়, গল্পটি লেখকের সবচেয়ে সফল এবং অন্যতম ছোটগল্প । গল্পের কাহিনির ওপর ভিত্তি করে ১৯৮৫ সালে সিনেমা তৈরি করা হয় । 

আফগানীদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তারা প্রতিশোধপরায়ণ । তাই বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় ফুটে উঠেছে প্রতিহিংসা, জিঘাংসা । পাশতুন কবি এবং লেখক ঘানী খান ‘প্রতিহিংসা’ লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘অবশ্যই একদিন দুটি মিলিত হবে । প্রতিহিংসা এবং মৃত্যু, মৃত্যু এবং প্রতিহিংসা, সব সময় এবং চিরদিন ।’ এ প্রসঙ্গে শের জামান তেইজির বিখ্যাত ‘জমি’ অণুগল্পের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে ।

‘সুলতান বাছা খুন হয়েছে ।

মীর বাছার যাবজ্জীবন জেল হয়েছে ।

এবং তারা যেই জমি নিয়ে দুই ভাই মারামারি করেছে, তা অন্যেরা দখল নিয়েছে ।’

মাত্র তিনটি বাক্যের গল্পটির মধ্য দিয়ে লেখক পাশতুন উপজাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি, নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন । জনৈক আফগান সাহিত্য সমালোচক এ গল্প সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেছেন যে, এই তিনটি বাক্য সমস্ত পাশতুনদের জীবন কাহিনি । হাজার বছর ধরে পাশতুনরা আত্ম-অহমিকার জন্য জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে আসছে । তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে এবং প্রতিশোধের জন্য আপন ভাইকে শত্রু বানাতে, এমনকি খুন করতেও, বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না । 

পাঁচ.

আফগানিস্তানের অবস্থান এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যবর্তী অঞ্চলে, তাই একধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে দেশটির শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে । গত শতাব্দীর শেষ দুই দশকে যুদ্ধবিগ্রহ, মৌলবাদী তালেবানদের আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতার জন্য দেশটির শিল্প-সাহিত্য ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছে । তবে বর্তমানে এসব নেতিবাচক প্রভাব দেশটির শিল্প-সাহিত্যে ক্রমশ একধরনের নতুনত্বের উন্মেষ ঘটে চলেছে । বলা যায়, উৎস থেকে উত্তরণে পৌঁছুতে আফগান সাহিত্যকে যুদ্ধ-বিগ্রহ, আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো অনেক পরিস্থিতির চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে।

পরিশেষে, মীর হেমতুল্লাহ্ সাদাতের ভাষায় বলতে হয় ‘দ্য আফগান এক্সপেরিয়েন্স রিফ্লেক্টেড ইন মডার্ন আফগান ফিকশন’, অর্থাৎ ‘আফগানদের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যায় আধুনিক আফগান সাহিত্যে’ । 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>