অগ্নি বসু’র কবিতা

আজ ২৮ সেপ্টেম্বর কবি অগ্নি বসু চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ইরাবতী পরিবার শোকাহত।


 

বিকেলবেলার চিঠি
‘কী যে দারুণ ফুল ফুটেছে, জারুল বনে…’
আজকে পাওয়া এই চিঠিটাই পড়ছ তুমি,
নিজের মনে ।
একটুকরো একলা-হাওয়া কোথা থেকে হঠাৎ এল…
ছোট্ট চিঠি, ইংরেজিতে লেখা হরফ,
এস্ এম্ এস্-এ..
শব্দগুলো
উড়ে এসে স্বপ্ন হল ।
মনে মনেই বলছ তুমি,
ফুল ফুটেছে জারুল বনে, বেশ হয়েছে,
কার তাতে কী…
আজ বসন্ত, এই কথা তো !
ওতে আমার বয়েই গেছে…
আর কিছুদিন আগে হলে, এসব কথা খুব সত্যি
হয়তো হতো ।
সব রঙ যার মুছে গেছে,
সে কি আজও তোমার মনে সত্যি আছে!
‘তাকিয়ে দেখ, ফুল ফুটেছে
এ বসন্তে, গাছে গাছে,..’

কেন লেখো !

চারপাই
নড়বড়ে এই ঘাড়ে
ডবল মুন্ডু আছে নাকি!
হুজুর যেমন সুতো ছাড়ে,
আমি ঠিক তেমনই থাকি।
আমি চারপায়েতে হাঁটি,
আমি খড়বিচুলি ঘাঁটি,
এদিক সেদিক চ’রে
রাতে ঘুমোই গোয়ালঘরে।
ঘরে জ্বলতে থাকে ধুনি,
মশার গুনগুনগুন শুনি…
গলায় ঘন্টিবাঁধা দড়ি,
আমি মিশেল ফুকো পড়ি,
আমি ষড়জে গান গাই,
পাগল-করা ইমেল পাই।
রাত্রি রোমন্থনে কাটে,
শুতে ইচ্ছে করে খাটে…
শুধু, মুংলিগাইয়ের ডাকে
আমার বুক কাঁপতে থাকে…
আমার কাঁপতে থাকে বুক,
বুঝি, বন্ধনে কী সুখ
ভাবি, ঠিক কালকে ভোরে
ওকে নেবোই ইলোপ করে।
কবে সময় হবে, হায়,

গলায় ঘন্টি বেজে যায় …

ব্রুটাস, তুমিও!
আট সকালে ডাকঘন্টি, এলেন হাউসমেড,
এক কাপ চা, শুগারফ্রি, কুঁকড়ে-যাওয়া ব্রেড।
মেঝেয় লুটোয় নিউজপেপার, পড়তে কি ভাল্লাগে!
পথ হাঁটছি আমি, আমার ছায়া হাঁটছে আগে।
হৃদয়হীনা অফিসকলিগ্, কর্পোরেটে ধ্বস্,
এই প্যাথেটিক জীবনটাকেই টানতে হবে, বস্!
এক্জিটে কিউ, চেকিং, স্ক্যানিং, তকমা দোলে গলায়,
বাইনারি এই জীবন থেকে সুর যে পলায় …
ডিনারে সেই রুমালরুটি, প্ল্যাস্টিকে তড়কা,
যদি প্রেম দিলে না প্রাণে, কিঁউ আয়িরে বরখা!
লেট-নাইট ফিল্ম একটু দেখে, রাত্তিরে কামপোজ,
চার নম্বর হুক মশারির পাইনে খুঁজে রোজ।
স্বপ্ন আসে, বলে, ‘রাতে একটু ঘুমিও..’

আমি কিন্তু জেগেই থাকি, ব্রুটাস, তুমিও!

সেই মেঘদিনে
কাছে আসছে, ভালোবাসছে, ভেসে যাচ্ছে,
আমি কেউ নই,
দোরে কার যে স্মৃতি বাজছে, বেজে যাচ্ছে ডাকঘন্টি,
আমি কেউ নই,
তার মনটি কাকে চাইছে, কেন চাইছে বুঝে পাই না,
আমি কেউ নই,
ভাঙা জানলা ডাকবাংলার, নীল ছায়াপথ,
আমি কেউ নই,
তবু ওই ডাক, কেঁদে-ওঠা শাঁখ, আজও টানছে,
আমি কেউ নই,
রাঙা চন্দন, কোন্ বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে, মন জানছে
আমি কেউ নই,
সেই মেঘদিনে তৃণে আর তৃণে কী প্রতীক্ষা, প্রেমভিক্ষা,
আমি কেউ নই,
কী আনন্দ, কী আনন্দ, দিবারাত্রি নাচে মুক্তি, নাচে বন্ধ,
আমি কেউ নই, আমি কেউ নই .

দুটো কবিতা


এইখানে ছোঁওয়া রেখেছিলে,
এইখানে, বুকের ভেতর।

বোঝোনি তো, নাকি বুঝেছিলে!

পুড়ে গেছে, ছাই হয়ে গেছে..

এ তো গতজন্মের কথা,
তুমি জানো এতদিন পর!

মেঘ এনে রেখে দেবো দোরে,
নয়নদিঘির নোনা জলও,
পারফিউমের শিশি ভরে।

কাঁদিয়েছ।
কেন কাঁদিয়েছ, তুমি বলো।

আবারও দাঁড়াবে হাত পেতে।
বলবে তো, ভালোবাসি, সোনা!

তুমি থেকো। আমি যেতে যেতে
বলে যাবো, ‘আর আসব না…’

ধুলো

১.
এভাবে, এমন করে
যেও না গো, সাঁই।
আমরা পথের ধুলো,
পথে রয়ে যাই…
গান ভালোবাসি শুধু ।
ধু ধু
এ জীবনে, দেখ,
আর কিছু নাই ।
‘আবারও আসবো’ বলো,
বোলো না গো, ‘যাই’…

২.

আজও দেখা
হল না গো, সাঁই,
সাঁকো ভাঙে,
আমি ভেঙে যাই..

৩.

তোমার কথা
অনুভবের ঘরে
দুয়ার এঁটে
একলা বসত করে ..

৪.
এইভাবে
ডাক দিলে, সাঁই !
কী হবে বাঁধন দিয়ে,
যদি মরে যাই …

তোমার পায়ের চিহ্নটুকু

 

সাঁকো ভেঙে গেছে? তুমি তো ভাঙোনি আজও‚

তুমিই তো নদী‚ উপলে উপলে বাজো।

পরিযায়ী পাখি আবার এসেছে শীতে‚

দুটো হাত ধরে পারো না ওপারে নিতে !

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত