Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Akashe Chorano Megher Kachakachi

গল্প: কাগজের ডানা মেঘের কাছাকাছি  । মুহাম্মদ রফিক ইসলাম

Reading Time: 6 minutes
চাকুরী আছে, বেতন নেই।
কথাটি শুনতে আজব মনে হলেও এটাই বাস্তবতা ডিজিটাল বাংলাদেশে বেসরকারী শিক্ষকের একাংশের ক্ষেত্রে।  সরকারি বিধিবিধান মেনেই একজন শিক্ষকের গড়ে ওঠা। একই কারিকুলাম, একই সিলেবাস, একই পাঠদান পদ্ধতি সত্ত্বেও কেউ সরকারি, কেউ বেসরকারি আবার কেউ নন-শিক্ষক! সভ্যতার দ্বারপ্রান্তে এসেও শিক্ষকসমাজে নব্য-শ্রমদাসের বিরল দৃষ্টান্ত নন-শিক্ষকরা! শিক্ষক কথাটির সাথে পরিচিতি  থাকলেও নন-শিক্ষকের ব্যাপারটা মাথায় ঢুকে না, ফারিনের।
নুসরাত জাহান ফারিন। পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া। মেধায় যেমন তীক্ষ্ণ তেমনি গুনবতী সে। মেধাবীরা একটু ডানপিটে হলেও ফারিনের ক্ষেত্রে এর বিপরীত। নিরিহ স্বভাবের শান্তশিষ্ট। একটু জেদি। জেদি শিশুরা জীবনে সাইন করে বলেই গুনিজনের ধারনা। স্কুলের শিক্ষকগণ তার খুব তারিফ করেন।
ফারিনের বাবা একজন কলেজ শিক্ষক। গ্রামের কলেজেই ইতিহাস পড়ান। বেড়ে ওঠার পর থেকে নন’ কথাটি মা-বাবার মুখে শুনে আসছে সে। নন’ মানে ‘না’ বা ‘অর্ধেক’ কিছুই বুঝে আসে না ফারিনের। দিন গড়ানোর সাথে সাথে তার এই কৌতুহলও দৌড়োয়।
‘নন-এমপিও’ কথাটি কি? তার বাবাও ‘নন-এমপিও’ শিক্ষক? এতদিন ঘরের বাইরের মানুষের জিজ্ঞাসা ছিলো। সবার জানতে চাওয়ার ভঙ্গি যে এক নয় তা অতি সহজেই বুঝতে পারেন মিজান সাহেব। তিনি তথাকথিত একজন নন-এমপিও শিক্ষক, ফারিনের বাবা। কেউ সমব্যথি হয়ে, কেউ আন্তরিকতার প্রশ্নে, কেউ তাচ্ছিল্যের সুরে, কারো আবার জানার জন্যেই জানা। কলিগদের মধ্যে যারা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ছিলেন তাদের জানতে চাওয়ার ধরণটা গরম তেলে পানি ছিটানোর মতো। ডিগ্রি স্তরের যারা ছিলেন তারা কেউ কারো কাছে জানতে চাইতো না। একজন আরেকজনের মুখোমুখি হয়ে গেলে চোখ নামিয়ে নেয়। আশপাশে পরে থাকে কিছুটা গরম বাতাস। হয়তো একই গোয়ালের পোড়া গরু বলে নতুন করে পোড়ার গন্ধ শুঁকতে চাইতো না। দই দেখে চুনের কথা মনে পড়তো তাদের। মেয়ের প্রশ্নবানে আঁতকে ওঠেন মিজান সাহেব। কিছুই বলতে পারলেন না ফারিনকে। চোখ স্থির হয়ে যায়। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে। একজন শিক্ষক হয়েও নিজের পরিচয় দিতে পারেন না মেয়ের কাছে। বুক থেকে বেড়িয়ে গেলো একটা অস্পষ্ট আকুতি।
 চাকুরীর এতো ব্যবস্থা থাকতেও নন-শিক্ষক হয়ে পরিবার-সমাজে নিজেকে লুকিয়ে রাখেন তিনি; এড়িয়ে চলেন পাবলিক সমাগম। জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ান। লাস্টবেঞ্চির বন্ধুটিও এখন তাঁকে আঙুল দেখিয়ে প্রথম শ্রেণির পথ ধরে হাঁটেন। তাঁর অদ্ভুত এক পেশা; বেতনবিহীন পেশা। যে পেশার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আছে, অর্থনৈতিক মুক্তি নেই। ছটপট করেন মিজান সাহেব। দীর্ঘশ্বাসের অদৃশ্য ধোঁয়া বুকটা চেপে ধরে। ওজন লাগে, মাপা যায় না। মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন তিনি। চুমো খেতে গিয়ে ঠোঁটগুলো নামিয়ে নেন। অতৃপ্ত ঠোঁটগুলো শুকনো পাতার মতো ভাঙ্গে, শব্দ হয় না। তরঙ্গে কম্পনের অভাবেই শব্দ ভূমিষ্ট হয় না, গর্ভপাত হয়।  চোখের কোণে ব্যথার বুদবুদ লাভায় বিস্ফারিত হয়, লবণপানিতে গরম লাভা। মেয়েকে আড়াল করার অভিনয় করেন মিজান সাহেব। অভিনয়ই জীবনের অন্য ভাবার্থ। পরিপক্ব অভিনয় শিল্পীর অভিনয় শিখতে হয় না, বুঝতে হয়। পরিস্থিতির সাথে বুঝা। সন্তানের কোমল মনে ব্যথার আগুনটা না জ্বালিয়ে নিজেই নিজেকে পোড়ান পুড়ার নিজস্ব নিয়মে। ফারিন নাছোড়বান্দা। ছাড় দিতে রাজী নয়। দরজার আড়াল থেকে মেয়ে-বাবার লুকোচুরি দেখে ফারিনের মা বলে, পড়তে বসো, ফারিন। নিজের ঘরে যাও। দরাজ গলায় মেয়েকে টেবিলে পাঠিয়ে স্বামীর নীলাভ মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেন তিনি। স্বামীর চোখের শান্ত সাগরে নিজেকে ভাসিয়ে তিনি তাঁর স্বামীর আকুতি সইবেন কেমন করে? কেমন করে স্বামীর বাকহীনতার তীরের আঘাত বইবেন? কোনো নারী-ই তাঁর স্বামীর মাথা খাটো দেখতে চান না। স্বামীর সম্মান তাঁর অলঙ্কার, বেঁচে থাকার অবলম্বন। মেয়ের সামনে স্বামীকে তিনি ছোট হতে দিতে পারেন না। তারর কাছে সন্তানের অনুযোগ বা অনুনয়ের চেয়ে স্বামীর সম্মানের দাম বেশী, অমূল্য। তবু একটা অজানা বিষের তীর ওড়ে এসে চলে গেলো বুকের পিছনের দিকে। স্ত্রীয়ের বেদনায় কাতরাতে লাগলেন মিজান সাহেব। এই কাতরানো অদৃশ্য, অসহ্য।
মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ! দুই এপ্রিল থেকে পরীক্ষা। ফারিন বুঝে গেছে, এমপিও কি? বেতন-ভাতার সরকারি অংশ, যা তার বাবা পায় না। তার বাবা একজন কলুর বলদ এবং একুশ শতকের শ্রমদাস! একই শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি নীতি। বেসরকারিতেও আবার উপভাগ আছে: কেউ বেতন-ভাতার সরকারি অংশ পায়, কেউ পায় না। শিক্ষাব্যবস্থার এই বৈষম্যমূলক নীতিটির সাথে ব্রিটিশ আমলের দ্বৈতশাসনের সাদৃশ্য খুঁজে পায় ফারিন। দুইয়ের মধ্যে মৌলিক বিষয়ে ভিন্নতা থাকলেও আদর্শগত ব্যাপারটা যে অভিন্ন সেটা বুঝতে  বাকী থাকে না তার। ভাবতে ভাবতে মনটা খারাপ হয়ে যায় ফারিনের।
 স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও ফারিনের বাবা অর্থনৈতিক মুক্তি পায়নি। সে ভাবে, তার বাবার পায়ের বেড়ী খুলে ডানা দু’টো কেটে দেওয়ার মতো স্বাধীনতা দিয়েছে সরকার; চাকুরী দিয়েছে, বেতন দেয়নি। সরকারের উর্ধ্বমহল এমপিও প্রদান নিয়ে নতুন নতুন নীতিমালা তৈরি করছে, সে নীতিমালার সংশোধন-পরিমার্জন করছে, আবেদন নিচ্ছে, এমপিও ঘোষণার তারিখ দিচ্ছে- পাল্টাচ্ছে দিনের পর দিন…।
প্রহসনের শীলে-পাঁঠায় ঘষাঘষি চলছে, মরিচের মতো পিষে যাচ্ছে স্বাধীন বাংলার মিজান সাহেবেরা। স্বাধীন ভূখণ্ডে অর্থনৈতিক পরাধীনতায় নন-এমপিও শিক্ষকরা কেমন আছেন তা ফারিন বুঝতে পারে ওর বাবার মুখের দিকে তাকিয়েই।
বান্ধবীদের পরিপাটি প্রস্তুতি ফারিনকে ভাবিয়ে তুলে।
ওরা টিউশন-কোচিংয়ের আর্শীবাদ পেলেও ফারিনের ভাগ্যে জুটেনি।  প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় এক্সট্রা গাইডনেস প্রতিটি শিক্ষার্থীই কামনা করে। গৃহশিক্ষকের প্রসঙ্গে ওর বাবা বরাবরের মতোই নীতির বুলি আওড়িয়ে শিক্ষকতার আর্দশের রামায়ণ বুঝাতেন মেয়েকে এবং নোট-গাইডের প্রসঙ্গে শিক্ষা আইনের মুখস্থ করা ষোলোকলা ঝাড়তেন। শিক্ষক হিসেবে টিউশন বা নোট-গাইডের ঘোরবিরুধী ছিলেন মিজান সাহেব। তাঁর ধারণা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও গ্রহনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মনোযোগী হলে এসব কমার্শিয়াল বিষয়ের প্রয়োজন নেই। টিউশন-কোচিং এক শ্রেণির অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীর কাছে নিছক ফ্যাশান ও অর্থের বাহাদুরি দেখানো ছাড়া অন্য কোনো কারিশমা আছে বলে মনে করেন না, মিজান সাহেব।
সামনে পরীক্ষা। ফারিনের বান্ধবীরা নতুন নতুন ড্রেস কিনেছে। ওর অনেক বান্ধবীর বাবা তৃতীয় শ্রেণির শ্রমজীবী। বান্ধবীদের নতুন ড্রেসাপে ফারিনের মন কেঁদে ওঠে। অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কথা ভেবে কোনোদিন সে তার বাবাকে বলতে পারেনি। নতুন পোশাকের স্বপ্ন তার কাছে অলীক ও বিলাসিতার ডাকনাম। সে জানে, তার বাবার বেতন-ভাতা হয়ে গেলেই স্বপ্ন আর স্বপ্ন থাকবে না।
মায়ের মনে বাধ মানে না। বোবা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। একমাত্র মেয়ের সামন্যতম চাওয়া পাওয়ায় রূপান্তরিত করতে না পারার ব্যর্থতার ক্ষত বুকে। যন্ত্রণা ও বেদনার ক্ষত। মলিন মুখে এক ঝলক অভিনয়ের হাসি ফুটিয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। চুমো খান। এই-তো আর ক’টা দিন। সামনের বছরে বেতনটা হয়ে গেলে আর দু:খ থাকবে না। ফারিন ছোট করে ঢোক গিলে। কিছুই বলে না। অপলক চেয়ে থাকে মায়ের দিকে। ব্যথা-ব্যর্থতার গ্লানি চিরে একটা বাসী ফুলের পাপড়ি ঝরে যায়। অভাবের সংসারে দানবের হানা। দানবের সাথে আবেগ-অনুভূতি যায় না। না পাওয়ার ব্যথা থেকে তার মায়ের করুণ, বিবর্ণ মুখের ছলনায় বেশী কষ্ট পায়, ফারিন। সে তার মাকে বুঝাতে পারে না, মায়ের বুকে বেদনার প্লাবনধারা যে ওর বুকেও বহে। চোখ মুছে সে।
মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে ফারিন অনেক খুশি। মায়ের চোখে আনন্দের জল। বাবার বুকে গর্বের ঢেউ। শিক্ষকদের মুখে তৃপ্তির হাসি। শুধু খুশি নয় ওর বান্ধবীরা। ওদের ধারণা, ফারিনের বাবাই পৃথিবীর সবচেয়ে কৃপণ বাবা। যে বাবা একমাত্র মেয়ের জন্য মোটা একটা কাপড় কেনার সামর্থ রাখে না, টিফিনের জন্য একটি টাকাও দেয়ার ক্ষমতা রাখে না; সে বাবা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর নিষ্ঠুর বাবা।
ফারিনের বান্ধবীরা মিষ্টি নিয়ে আসে। সে যায়নি কারো বাড়িতে। বাবার প্রতি এবার ক্ষোভ ফারিনের। এমন খুশির দিনে বাবার শুকনো আদরে মন ভরে না তার।  ছাইচাপা কষ্ট বুকে নিয়ে ফারিন ঘুমিয়ে যায়। মেয়ের মাথার হাত বুলাতে বুলাতে ফারিনের মা গা এলিয়ে দেন বিছানায়।
গভীর রাত। মিজান সাহেব মেয়ের ঘরে যান। ফারিনের মাথার কাছে বসেন। নিজের ঠোঁট দুটো মেয়ের মুখের উপর রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। বাবার সামনে সন্তানের ঝিমিয়ে থাকার কষ্টে চোয়াল বেয়ে বুকের জমিন উপচে যায়।  শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নটাই আজ তাঁর জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়। নিয়তির আজব লীলায় গ্রাজুয়েশন-পোস্ট গ্রাজুয়েশন করেও তিনি যে একজন শ্রমদাস তা বুঝাতে পারেননি মেয়েকে।  সামান্যতম চাহিদা পূরণ করতে না পারা অক্ষম পিতা যে সন্তানের জীবনে অপদার্থ, কুলাঙ্গার তা নিজে বুঝতে পারেন মিজান সাহেব, মেয়েকে বুঝাতে পারেন না।
খাটুনি। গাধার সামনে মুলা ঝুলিয়ে সরকার দিনের পর দিন নন-শিক্ষকদের জীবনের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রহসন করছে। বছরের পর বছর বিনা বেতনে খাটুনি খেটে শিক্ষাক্ষেত্রে যে অগ্রগতি বয়ে চলেছেন শিক্ষকরা তা পুঁজি করে সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় নিজেদের উন্নয়নের মাইলফলক উদ্বোধন করছেন। নোনতা জলের পরশে ফারিনের ঘুম হালকা হয়ে ওঠে।   ঘুমের ঘোরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে ফারিন। অস্পষ্ট ভাষায় ভীর ভীর করে বলে, ‘আমি উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞানে পড়বো, ডাক্তার হবো…।’
ক’দিন ধরেই ফারিনের মায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। বুকের বা’পাশটায় বড্ড ব্যথা। ডাক্তার বলেছেন, উন্নত চিকিৎসা ছাড়া যেকোন সময় রোগীর বড় ধরনের এক্সিডেন্ট হতে পারে! স্ত্রীয়ের পাশে বসে মাথার চুল এলিয়ে দেন, মিজান সাহেব। প্রাপ্তির হিসাবে তিনি যে একজন অযোগ্য, অক্ষম স্বামী তা চিবিয়ে নিজেই নিজের প্রতি তাচ্ছিল্যের হাসি ছুঁড়ে দেন। স্বাধীন বাংলার স্বাধীন জনগন দেখে যাও, ‘পরের ঘরে আলো ছড়ানো একজন শিক্ষকের নিজের ঘরেই অন্ধকার! এমন বেহুদা-বেয়াক্কেল, মূর্খের পরিণতি দেখে যাও! তোমরাও হেসে যাও, তাচ্ছিল্যের হাসি! ধীক্কার দিয়ে যাও…!’ স্ত্রীয়ের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসার মূল্য থাকে না, মূল্য থাকে অর্থনৈতিক সম্পর্কের। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না, আত্মচিৎকারে ভেঙ্গে পড়েন তিনি।
চোখের সামনে নিভে যায় তাঁর প্রিয়তমার জীবন প্রদীপ! ভালোবাসার রেণুগুলো অপরিপক্ক থেকে যায়। অন্য পেশায় চলে যেতে চাইলে স্ত্রীয়ের অনুনয়ের কাছে হেরে গিয়ে চাতকের মতো মুখ থুবড়ে পড়ে থাকেন মিজান সাহেব। বার্ধক্যও ঘিরে ধরে। পার্থিব জীবনে একমাত্র অপার্থিব ছিলেন তাঁর স্ত্রী। স্বামীর প্রতি স্ত্রীয়ের কোনো অভিযোগ, চাওয়া-পাওয়া ছিলো না। শুধু অননুয় ছিলো, ‘তিনি মরে গেলে কাপনের কাপড় কিনতে না পারলে পরনের কাপড় দিয়ে কবরে দিলেও তাঁর কোনো আফসোস থাকবে না’! স্ত্রীয়ের স্মৃতিচারণায় মিজান সাহেবের বুকটায় কিছু একটা ভেঙ্গে পড়লো; শব্দ হলো না, চির ধরলো। স্ত্রীয়ের মহাতী ত্যাগ, মহিমায় মিজান সাহেব ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন, এক অদৃশ্য শ্রদ্ধায় অবনত হন।
পুকুর পাড়ে মায়ের কবরের পাশে বাবার হামাগুড়ির নির্মম দৃশ্য আর সহ্য হয় না ফারিনর। তার মা মারা যাবার পরপরই ওর বাবা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শরীরের বা’পাশের নিয়ন্ত্রণ হারান। বাবার অষুধ আর খাবারের সংস্থানে ফারিনকে ঘুরতে হয় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। গলাধাক্কা আর ধীক্কারে জীবনযুদ্ধ বাপ-মেয়ের সংসারে।
দিন যায়, রাত আসে। দু:খের প্রহর লম্বা হয়। বাবার অষুধের মাত্রার সাথে তার রোজগারের পারদ ওঠে না। চিকিৎসার অভাবে বিছানাশায়ী মিজান সাহেব।  বাবার অকাল পরিণতির কথা ভেবে ফারিন দ্বারস্ত হয় স্থানীয় চেয়ারম্যানের।
ফারিনের জীবনে দিন আসে, দিন যায়। দিনের প্রতি তার আকর্ষন থাকে না। রাতের আঁধার তার খুব ভালো লাগে। একেক রাতে একেক সাজে বেড়িয়ে যায় সে। তার নগ্ন পায়ের দিকে চেয়ে থাকে একজোড়া চোখ। সে যুগল চোখে ঘৃণা নেই, ক্রোধ নেই। অভাবের কাছে নেই মানবিক বা অমানবিক বাচবিচার। রাত স্তব্ধ হয়, আর্তনাদের তীব্রতা বাড়ে। লাজের মাথা খেয়ে শুকতারা জ্বলে ওঠে পুবের আকাশে। কাক ডাকে, ভোর হয়। একজোড়া অগোছালো পা ওঠে আসে নর্দমা হতে। একটি কুকুর ফুঁপিয়ে কাঁদে।  পথটি এগিয়ে যায়। স্কুলটি পিছনে পড়ে। ফারিনের নাকে ভেসে আসে জাতীয় সঙ্গীতের সুমধুর সুর !

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>