আকাশে ওড়ার দিনগুলো (পর্ব-১)

পর্ব-এক
সীমাহীন আকাশে কোন দিকনিশানা দেখে উড়োজাহাজ এগিয়ে চলে তা ভাবলে আমার ভীষণ অবাক লাগে। মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে কী বিস্ময়কর ক্ষমতাই না দিয়েছেন! নিজের মেধা, বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে কত কিছুই না করতে পারে একজন মানুষ। চাইলে মানুষ আকাশেও উড়তে পারে।
ছোটবেলায় যখন কোনো উড়োজাহাজের গর্জন শুনে আকাশের দিকে তাকাতাম, তখন মনে হতো পাখির মতো উড়ছে কেমন ঐ উড়োজাহাজ, ইস্ আমি যদি উড়তে পারতাম!
জীবনে মনেপ্রাণে কিছু চাইলে সৃষ্টিকর্তা বোধহয় সেই সাধ অপূর্ণ রাখেন না। তাই একদিন ঠিক ঠিক আমিও আকাশে উড়েছি। জীবনে প্রথম আকাশে উড়েছিলাম ঢাকা থেকে কক্সবাজার ভ্রমণের সময়। সেদিন শরতের আকাশের খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘ দেখে আবেগে আপ্লুত হবার বদলে আতংকিত হয়েছি। প্রচ-ভাবে ভয় পাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল-এই বুঝি মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গেলাম, যেকোনো মুহূর্তে হয়তো আকাশ থেকে ছিটকে পড়ে যাবো।
এরপর থেকে যতবার আকাশপথে ভ্রমণ করেছি, বিমান টেক অফ আর ল্যান্ডিং এর সময় প্রচ- আতংকে গলা শুকিয়ে এসেছে। কানের কাছে ঝাঁ ঝাঁ শব্দ হয়ে শ্রবণশক্তি হারিয়ে গেছে। মনে হয়েছে, মৃত্যুরথে উঠেছি। আর ফেরা হবে না মাটির পৃথিবীতে।
এখনো প্রতিবার উড়োজাহাজে উঠলে একই অনুভূতি হয়। কিন্তু বিমান যখন উড়তে শুরু করে তখন আবার ছোটবেলার মতোন প্রচ- বিস্ময় নিয়ে ভাবি, এত ভারি একটা জিনিস কীভাবে ঈগলের মতোন আকাশে ওড়ে! বিমানের ডানা বিমানকে নিয়ে সাঁই করে যখন আকাশে উঠে ভাসতে থাকে তখন মাটির পৃথিবীর কাগুজে ঘরবাড়ি আর আকাশের দলছুট মেঘের দলের অদ্ভুত দৃশ্যপট দেখতে দেখতে আতংক আর বিস্ময়ের মিশ্রণে অদ্ভুত এক অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
এই সৌন্দর্য দেখার অনুভূতি কেমন শরীর বিবশ করা। ধীরে ধীরে ধাতস্থ হলে মুগ্ধ হয়ে আকাশে উড়ি। যেনো পাখির চোখ থেকে আকাশকে দেখা। তবে এই মোহময়তা একা দেখা মুশকিল। কিন্তু জীবনে বেশিরভাগ কাজই একা একা করতে হয়। সিডনিতে যাবার আগে সেভাবেই মনকে প্রবোধ দিচ্ছিলাম।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে প্রশিক্ষণে যাবার খবরটা নিশ্চিত হবার পর প্রথমেই বাচ্চাদের দেশে রেখে যাওয়ার ভাবনা আমাকে দুপা পিছিয়ে দিচ্ছিল। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মাানিত যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) জনাব বিকাশ কুমার সাহা স্যার যেদিন ফোনে আমার যাওয়ার বিষয়টি কনফার্ম করেন সেদিন তিনি আমার বাচ্চাদের বয়স কত এবং বাচ্চারা আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে কিনা সেই বিষয়ে জানতে চাইছিলেন। আমি বলেছিলাম, স্যার ওদের বাবা আছে সাথে, ওরা হয়তো থাকতে পারবে স্যার। আমারই ওদের ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে। স্যার বলেছিলেন, তোমাকে কতদিনের জন্য দিলে ভাল হয় এক মাস না পনের দিন? আমি বলেছিলাম, স্যার কম দিন হলেই ভাল হয়। বাচ্চাদের ছাড়া অত দূরের দেশে থাকা!
আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাচ্চারা ছোট থাকায় অনেক নারী কর্মকর্তা নিজেকে প্রশিক্ষণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। বিশেষত দীর্ঘ মাসের প্রশিক্ষণ থাকলে বাচ্চাকে কোথায় রাখবেন সেই অসুবিধার কথা ভেবে প্রশিক্ষণের তালিকা থেকে নিজের নাম কাটান। অথবা প্রশিক্ষণ যথাসময়ে না করে বাচ্চাদের খানিকটা বড় হবার অপেক্ষায় থাকেন। এটা করতে গিয়ে তারা পরবর্তীতে অনেক প্রশিক্ষণের জন্য পুনরায় ডাক পান না।
আবার কোনো নারী কর্মকর্তা প্রশিক্ষণে এলে, তাদের অনেকেই এমন পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষণের সময়কাল কাটান যে, পুরো সংসারের বোঝা ঘাড়ে করে নিয়ে আসেন এবং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাচ্চা বা বাচ্চাদের রাখার ব্যবস্থা করেন বা প্রায় পুরো সংসার তুলে নিয়ে আসেন। কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রাত্রিযাপন না করে সুবিধাজনক দূরত্বে কোনো আত্মীয়ের বাসায় থাকেন এবং সকালে ছুটে এসে ক্লাস করেন আবার ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফেরেন। এতে মানসিক ও শারীরিক উভয় শান্তি কিভাবে ব্যাহত হয় তা নারীমাত্রই জানেন।
এ তো গেল দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণের কথা। দেশের বাইরে প্রশিক্ষণ বা উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রেও একজন কর্মজীবী মাকে নানান প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। শিশুসন্তানের কথা ভেবে অনেকে এসব সুযোগ প্রত্যাখানও করেন।
পরিবারকে দেশে রেখে জীবনে প্রথমবারের মতো এতদিন দূরে থাকা আর যাত্রাপথের দীর্ঘ সময়ের কথা ভেবে মনে মনে আমিও খুব ভয় পাচ্ছিলাম। যদিও বিষয়টা বাড়তে দিচ্ছিলাম না, মনের বাঘ আমাকে আগেই খেয়ে ফেলবে তা আমি চাইছিলাম না। তবু আমার মনের দোটানা অবস্থা কাটছিল না। গত বারো বছর ধরে সবসময় সফরসঙ্গী হিসেবে একজন মানুষ পাশে থেকেছে। তাকে ছাড়া নয় হাজার কিলোমিটার পথ কীভাবে পাড়ি দিবো সেটা ভেবে ভেবেও ভেতরে ভেতরে কান্না পাচ্ছিল খুব। যাবার দিন যতো ঘনিয়ে আসছিল, আফসোসও লাগছিল-সে যাচ্ছে না।
তবে আমার পরিজনহীন একাকী সফরের অনিশ্চয়তা নিমিষেই একজন মানুষ উড়িয়ে দিয়েছিলেন-তিনি আমাদের বিচার বিভাগের অন্যতম তুখোড় কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব উম্মে কুলসুম ম্যাডাম। ম্যাডামের সাথে কাটানো সময়গুলো আমার জীবনের অন্যতম ঐশ্বর্যময় সময়। যাহোক, ব্যক্তিবন্দনা করতে বিব্রত লাগে, সেই প্রসঙ্গ তাই থাক। এবার সিডনি ভ্রমণের গল্পের পাকানো সুতোর বান্ডিল খুলতে বসেছি, তাই করি।
আমি ২০১৮ সালের মার্চ মাসে রাজশাহীতে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। দূরত্বের কারণে এবং অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে Capacity Building of Law and Justice Division for Strengthening Subordinate Judiciary Management প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের ৪০ জন সদস্যের একজন হিসেবে একেবারে শেষ মুহূর্তে অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য আয়োজিত ব্রিফিং সেশনে আমি অংশগ্রহণ করতে পারি নি। ১৪ মার্চ আমাকে রাজশাহী থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের জন্য ঢাকায় যেতে হয়।
১৫ মার্চ সকালে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) জনাব বিকাশ কুমার সাহা স্যারের হাত থেকে ভিসা, টিকিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিতে নিতে আমি কেবল ভাবছিলাম, সত্যিই ভীষণ ভাগ্যবান আমি। অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে হুট করে চল্লিশ জনের প্রশিক্ষণার্থী দলের সাথে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পৃথিবীর একটি অনন্য সুন্দর আর উন্নত দেশে প্রশিক্ষণে যাবার মতোন সুযোগ পেয়ে গেছি!
তাই কুলসুম ম্যাডামের সাথে সেদিন চমৎকার একটা দুপুর কাটাবার পর আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমার ভ্রমণকালীন সময় আমি পুরোপুরি উপভোগ করবো, নিজেকে সময় দিবো এবং যে উদ্দেশ্যে সরকার আমাদের প্রশিক্ষণে পাঠাচ্ছেন তার সদ্ব্যবহার করবো। মন্ত্রণালয় থেকে ফেরার সময় যুগ্ম সচিব উম্মে কুলসুম ম্যাডাম আমাকে একটা শ্যাম্পু আর চমৎকার একটি রোদটুপি উপহার দিয়েছিলেন। কুলসুম ম্যাডামের স্নেহধন্য হয়ে মোটামুটি মন শক্ত করে সকল পিছুটান ভুলে প্রশিক্ষণকালীন সময়ে স্থির থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম মেঘের ডানা লাগিয়ে ভীষণ উড়বো।
ক্রমশ…

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত